অসম বয়েসি বন্ধু হয় না? হয়। সেই বন্ধুত্বটা তখন বেশি জমে, যখন অল্প বয়েসিটা হয় ‘ইঁচড়ে পাকা’ আর বড়টি হন পাকায় ইঁচড়। আমার আর সাযযাদ কাদিরের বন্ধুত্বটা বটে বয়েসের ঢের ফাঁক থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু বন্ধুত্বটা যখন হয়, তখন আমিও ইঁচড় নই সাযযাদ ভাইতো ননই। মানে পাকায়-পাকায়। কিন্তু জ্ঞানে-গুণে, জানা-বোঝায়, অভিজ্ঞতার তুলনায় আমি নিতান্ত অর্বাচীন, সেই সত্যকে সবসময়ের জন্য খেয়ালের মধ্যে সমুন্নত রেখেছি। আমরা যারা বয়সেতো বটেই, জ্ঞান-বিদ্যায়ও আর চাইতে তৃণমূল উচ্চতায় খাটো তারা যেনো তার পাণ্ডিত্ব দেখে ঘাবড়ে না যাই, সে জন্য যতটা সহজ হওয়া দরকার, সাযযাদ ভাই দেখেছি অতখানি নিচে নেমে এসে ছোটদের সাথে গলায়-গলায় বন্ধু হয়ে উঠতে প্রয়াস পেতেন। নইলে তার মতো মহীরুহের সাথে আমার তো খাপেখাপে মিল খাওয়ার কথা নয়। তিনি যদি আমাকে অনেক খানি ছাড় না দিতেন, তাহলে তার সাথে বেশখানিটা মেশামিশি করতে পারি আমার এমন কী যোগ্যতা। ঘাড় বাঁকিয়ে যে উচ্চতাকে দেখতে হয়, সেই পাহাড়চূড়াটি অনুগ্রহ করে আমার দৃষ্টিসীমার সমতায় এমনভাবে এসে দাঁড়াতেন যে, সেটা ‘অনুগ্রহ’ নয় ‘ভালোবাসা’। সেটাকে ‘স্নেহ’-এ নামিয়ে আনতে অনেকবার প্রয়াস পেয়েছি, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। কতবার বলেছি: সাযযাদ ভাই, আপনি আমাকে ‘তুমি’ করে বলবেন।’ কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি বেশ অনড়: আরে না কী বলেন, আপনি কম পণ্ডিত নাকি? আমি পণ্ডিত নই সেতো আমিও জানি তিনিও জানেন। কিন্তু এই যে প্রিয়পাত্রের প্রতি তার অন্তরের বিরাটত্ব, তার মূল্যটা যাচাই করবে আমাদের সাহিত্যসমাজে সেই উদারতার কি ঘাটতি নেই?
দেখাসাক্ষাৎ অনেক পরেই। কিন্তু চেনাজানা বহু বহুদিন আগে। আর সাথে এই ব্যাপারটা বহুলোকেরই এই একই রকম। কারণ লেখালেখি, কলেজে শিক্ষকতা, পত্রিকা সম্পাদনার কাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স টিচারের কাজ, প্রেস ইনস্টিটিউটে কাজ, ফিল্ম ইনস্টিটিউটে কাজ, রেডিও-টিভিতে কাজ, তারপরে নানান সব সামাজিক সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকা। এতোসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যিনি উজ্জ্বল অবস্থানে, তাকে বহু মানুষ দেখার আগেই চিনবেন এটাই স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিকত্বটি ঘটেছিল যুক্তিসঙ্গত ভাবেই আমার বেলাতেও।
‘তুমি’ করে বলতে বলতাম, সেটাতো তিনি মানতেনই না, পাল্টা আমাকে ‘বিলু ভাই’ বলতেন, যেখানে শুধু নামটুকু বললেই যথেষ্ট ছিল। ‘সাযযাদ কাদির’ বলে যে নামে তিনি খ্যাত, সেটা তার লেখালেখির নাম। এক অর্থে নকল বা পোশাকি নাম। আসল নাম ‘শাহ নূর মোহাম্মদ’। আমরা অনেকেই তার এই আসল নামটা জানি, কিন্তু উনার ডাকনামটা? সেটা অনেকেরই জানা থাকার কথা যা ‘বাবর’। দেলদুয়ার টাঙ্গাইলে বাপের বাড়ি, মঠবাড়িয়া পিরোজপুরে শ্বশুরবাড়ি। এই ধরনের আটাপৌরে তথ্য দিতে গেলে তাকে নিয়ে সাতকাহন গদ্যতো লেখাই যায়। বরং সেই বিষয়গুলোকে বেশি করে বলার প্রয়াস থাকা দরকার, যেটা অনেকের জানা থাকার কথা নয়। এবং সেটা বলতে গিয়ে প্রসঙ্গান্তরে অন্য যা কিছু আসে সেটাই ভালো এবং উপরি।
সাযযাদ ভাইয়ের উপস্থিতিতে অনেক জায়গায় অনেকবার বক্তৃতা করার সুযোগ হয়েছে আমার। কিন্তু সে জন্য আমি কখনো কোনো বিশেষ সাবধানতা এবং বলার ক্ষেত্রে হিসাব করে গোছগাছ করেছি এমন নয়। বলাই বাহুল্য, যেখানেই আমার বলার সুযোগ বা প্রশ্ন এসেছে সেখানে আমার ডাক পড়েছে সাযযাদ ভাইয়ের আগে বা বেশ আগে। বিশেষ করে কাঁটাবনের কনকর্ড টাওয়ারের বেজমোট একটা সাপ্তাহিক কবিতার আসরে বহুবার তার সামনে আমাকে কথা বলতে হয়েছে কবিতা বিষয়ে। লক্ষ্য করেছি যখন সাযযাদ ভাই বলতে দাঁড়াতেন, তিনি প্রায়সই আমার বলা থেকে একটা দুটো সেই ধরতেন বা সূত্র টানতেন এবং তার ধনাত্মক ব্যাখ্যা মূল্যায়ন করতেন। তাতে বোঝা যেতো পচা বক্তৃতা যে তিনি মন দিয়ে শোনার মতো ভালো শ্রোতা সেটা খুবই সত্য। তিনি বহুদিন আমার বক্তৃতা সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন যে, আমি নাকি উকিল হলে খুব ভালো করতাম। কটাক্ষতো নয়ই, নিশ্চয়ই আশীর্বাদ যে, আমার বাক্যবিনুনির ভেতরে তার বিবেচনায় ফোকর থাকতো কম। সেই কারণে ব্যবহারজীবী হলে আমার ভবিষ্যৎ ছিল। কবিতা বিষয়ে তার যে পাণ্ডিত্য তা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে আগাধ জানা শোনা, সেটা তার অ্যাকাডেমিক লেখা, প্রতিষ্ঠানিক কাজের অভিজ্ঞতার জন্য আমাদের পক্ষে জানা বা অনুমান করাটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এর বাইরে যারা তার বক্তৃতা শুনেছেন, এ বিষয়ে তার প্রতি তাদের বিস্ময় আরও ঢের বেশি হতে বাধ্য। আর তার সাথে যারা সামান্যও আড্ডা দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তারাতো আরও বেশি জানেন যে, আমাদের অনুমান-ভাবনা অতিক্রম করেও তার জানাশোনার উচ্চতা আরও কতটাই বেশি। আমি একবার একটা বক্তৃতায় ফার্সি শের থেকে একটা পদ্ধতি দিয়েছিলাম। আমার অনেক পরে বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়ে সাযযাদ ভাই আমার ঐ পদ্ধতির একটা ভুল এমনভাবে ধরিয়ে দিলেন, যেন এই মাত্রই আমি আমার বক্তব্যটি শেষ করেছি। আমার বলায় মাত্র একটা নু জবর ‘না’ ছুটে গিয়েছিল, কিন্তু তাতেই কেন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে সেটা তিনি চমৎকারভাবে এক বাক্যে বুঝিয়ে দিলেন যে, ওভাবে বলার জন্য না বাচকটা হ্যাঁবাচক হয়ে গেছে। ওটা ঐভাবে না, এই ভাবে হবে। এইরকম মানুষের কাছে মর্মে শ্রদ্ধা অনুভব না করে পারা যায় না। কনকর্ডের আড্ডায় একদিন প্রধান বা মধ্যমণি যে কবি তিনি দেরি করে এসেছেন। কবিতো বেশ লজ্জিত, অনেকের কাছে তিনি মৃদু প্রশ্নবিদ্ধও। কিন্তু ব্যাপারটাকে নিমিষে হালকা করলেন সাযযাদ ভাই। কবি ইকবাল কোনো কবিতার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়েও অনেক বিলম্বে এসেছিলেন। এই নিয়ে সভাকক্ষে চাপা অসন্তোষ। তো কবি ইকবাল বললেন: ইকবাল তো দেরি করেই আসবে। তা না হলে তার ‘ইকবাল’ নামের সার্থকতা কী? আমরা বলি না ‘লেট লতিফ’ ইকবালের বাংলা অর্থও আসলে তা-ই। খুব রসিয়ে বলেছিলেন সাযযাদ ভাই। বক্তৃতা দেয়ার সময় কত যে পেছনের স্মৃতিকে তিনি টেনে আনতেন তা বলার নয়। সেসব অতীত তর্পণে এমনসব রাজনৈতিক, সাহিত্যিক, সামাজিক বিষয়-আশয় উটে আসতো যে, তার কোনো কোনো অংশ আশ্চর্য রকমভাবেই আমাদের কাছে নতুন। সাযযাদ ভাইকে ভালো লাগার এটা একটা কারণ যে, অনেক মূল্যবান অজানাকে তিনি কত সহজেই সবার মধ্যে পেশ করতেন।
দোষ-গুণ যাই বলি, সাযযাদ ভাই খুশি হলে সেটা যেমন অকপটে প্রকাশ করতেন, অখুশি প্রকাশ করতেও তার তেমনি কোনো কুণ্ঠা বা সংকোচ ছিল না। মানে যাকে বলে অসংকোচে সত্য বলার সাহস, সেইটে তার ছিল। এই বিষয়গুলোকে সাযযাদ ভাই যেমন অনুভব করতেন তেমনই উচ্চারণ করতেন। ফলে কারো কারো তিনি অপ্রিয়, কেউ কেউ তার অপ্রিয়। আর বলাই বাহুল্য তার প্রিয় মানুষ অনেক, তিনিও প্রিয় মানুষ অনেকের। আমার নিজ বিবেচনায় তিনি ছিলেন দোষেগুণে মানুষ, প্রীতিতে মমতায় ঋদ্ধ মানুষ, ভেতরে দুঃখ এবং রাগকে দমিয়ে রাখাতে সচেষ্ট মানুষ। কিন্তু যারা নিবিড়ভাবে তার সাথে আড্ডায়-আসরে গল্পেগুজবে বসেছেন, তারা তার সব গোপন এবং অগোপন বেদনার আঁচ খুব অনুভব করেছেন। কোথায় তার সন্তুষ্টি এবং তার কারণ, কোথায় তার অসন্তুষ্টি এবং তার কারণ। মানুষের প্রতি-সমাজের প্রতি মানুষের সন্তুষ্টি থাকার এটা স্বাভাবিক, কিন্তু অসন্তোষের ব্যাপারগুলো স্বাভাবিক নয়। এই অস্বাভাবিকত্ব যে কতটাই সঙ্গততরভাবে তাকে কামড়ে ধরেছিল বিশেষ করে বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার রাগান্বিত যন্ত্রণা বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। মানুষটা আজ নেই, আমরা তাকে কী দিয়েছি সে হিসাব বড়ই সামান্য। কিন্তু তার কী প্রাপ্ত ছিল আর আমরা তাকে তার কতটুকু দিয়েছি, দেয়া উচিত ছিল কিনা, দেখা সত্যিই অসম্ভব ছিল কি না, সেই সোস্যাল অডিটটা হওয়া বোধহয় দরকার। মানে আত্মমূল্যায়ন।
সাযযাদ ভাইয়ের শেষ জন্মদিনটি পালন হয়েছিল সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে। পরীবাগে আয়োজনটি করা করেছিলেন, সেটা এখনও আমি ঠিক ভালো করে জানি না। সাযযাদ ভাইয়ের কাজ, সাংস্কৃতিক অবদান, লেখালেখি, শিক্ষকতা, সম্পাদক জীবন ইত্যাদির যোগ করলে যে টোটাল সাযযাদ কাদির, সে তুলনায় জন্মদিনের ঐ আয়োজনটি নিতান্তই যে অকিঞ্চৎকর সেই সত্য বলতে ইচ্ছে হয় না, তবুও বলতে হচ্ছে, বিষয়টি অনুধাবনে আনার জন্য। অবশ্যই ওর চাইতে অনেক বর্ণাঢ়্য আয়োজনে, ঐ কামরার তুলনায় অনেক-অনেক বড় অডিটোরিয়ামে জন্মদিনের উৎসব হওয়াটা বাঞ্ছনীয় ছিল। তবু যারা সেটার আয়োজন করছিলেন, তারা ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। তো যেদিন তার জন্মদিন, ১৪ এপ্রিল, ঠিক ঐ দিন সকালে সাযযাদ ভাই আমাকে ফোন দিলেন বিলু ভাই কেমন আছেন? শিষ্টাচার শেষ হলে পর তিনি বললেন ওরা একটা অনুষ্ঠান করছে, আমার জন্মদিন, আপনি আসবেন। আমি বললাম, কিন্তু ওরাতো আমাকে নেমন্ত্রণ্য করেনি। মানে তাদের আয়োজনের একটা হিসাব-নিকাশ আছে না? ছোটো ঘরোয়া অনুষ্ঠান, বসার জায়গা, কেকের ভাগ, সমস্যা না? তিনি বললেন: আরে আমিই তো আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি। ব্যাস যেতে আমার ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু তাকে উপেক্ষা করি সাহস কুলোয় না। গিয়েছিলাম। বুলবুল মহলানবিশ আপাসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। আমাকে কিছু বলার জন্য এবং একটা কবিতা পড়ার জন্য ঘোষণা এলো। আমি বললাম তার সম্পর্কে আমার লক্ষ্যায়ন, জন্মদিনের আয়োজন বিষয়ে আমার ফিলিংস এইসব। শেষে একটা কবিতা আওড়ালাম, সেই যে হুমায়ুন কবির-এর কি আর এমন ক্ষতি, যদি আমি চোখে চোখ রাখি’। জন্মদিনে কবিতাটি বেশ মানিয়ে যায়। আমি যখন কোনো মুখস্থ কবিতা বলি, তখন দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শ্রোতাদের সাথে আই কন্ট্যাক্ট করি। যখন উচ্চারণ করছিলাম ‘বলোনিতো’ গেলো রাতে চাঁদ ছিল, দোতলার টবে নিরিবিলি ক’টা ফুলে তুমি ছিলে একা।’ তখন সাযযাদ ভাইয়ের চোখে তাকিয়ে দেখি তিনি কেমন বিমুগ্ধ টলমলো অনুপস্থিত হয়ে পড়েছেন।
কবিতা শেষে আমি সাযযাদ ভাইয়ে দীর্ঘায়ু কামনা করে বসে পড়লাম। সাথে সাথে তিনি দাঁড়িয়ে ইশারা করে ঘোষককে থামিয়ে দিয়ে আমার কবিতা পড়ার প্রতিক্রিয়া বলতে দাঁড়ালেন। এবং তার বলায় কবি-কবিতা বিষয়ে কি ব্যাপক তার খোঁজখবর সেটা বোঝা গেলো। প্রথমত তিনি আমাকে খুব বাহবা দিলেন যে, জন্মদিন উপলক্ষে ঠিক এই কবিতাটি আবৃত্তি করেছি বলে। তার স্বভাবসুলভ আমার প্রতি একটা প্রেম প্রকাশের ব্যাপারতো ছিলই। তারপর তিনি যা বলেন, তা প্রায় সকলের জন্যই নতুন এবং জ্ঞাতব্য এই কবিতার কবি তেমন আলোচিত নন, খুঁটিয়ে পঠিত তাও নন, তিনি বলেন: হুমায়ূন কবিরের বাড়ি বরিশালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। এই কবিতাটি সে বইয়ের, তার নাম ‘কুসুমিত ইস্পাত’। এই মানুষটা সিরাজ সিকদারের পার্টি করতেন। পার্টির সিদ্ধান্ত এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে তার সাথে পার্টির মতদ্বৈধতা হয়। তারপর একদিন কেবা কারা তাকে গুলি করে হত্যা করে। কেউ বলে পার্টির লোকেরাই তাকে হত্যা করেছে। কেউ বলে এটা রক্ষীবাহিনীর কাজ। ঐ বাড়ির সাথে তার ব্যক্তিগত স্মৃতি ইত্যাদি অনেক কথা তিনি বলেন তার নির্ধারিত সময়ে বলার আগেই মানে আমাকে নগদে নগদে একটা ধন্যবাদ জানানোর মোহে। এই রকমের একজন মানুষের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে দুর্বল না থেকে পারা যায়?
আরেকবার ঠিক ঐ জন্মদিনের দাওয়াতের মতো তিনি আমাকে বললেন, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে তার কি একটা অনুষ্ঠান, আমাকে যেতে হবে। অ্যারেঞ্জমেন্টটা করছেন। ‘ধমনি’র সম্পাদক স্বপন ভাই। তো আমাকে যেতে হবে এবং তার সাথে। তিনি টিকেট করতেন। আমার সেই ঠুঁটো যুক্তি: যাবো যে, ওরাতো আমাকে দাওয়াত করেনি। এই আপত্তিকে তিনি এক ধরশায় পাল্টে দিলেন: আমিইতো দাওয়াত করছি আপনাকে। এবার মান্য একটা ওজর তুলে ধরলাম: দু’টো দিন সময় বের করা আমার জন্য কঠিন। প্রতি মাসে কুষ্টিয়ায় যেতে হয়। খুব প্ল্যান করে আমি বছর জুড়ে ছুটি ভোগ করি। ঢাকা শহরের মধ্যে হলে নিশ্চয়ই যেতাম। তিনি বিষয়টি মেনে নিলেন। কিন্তু এর পনেরো-ষোলোদিন পর, প্রোগ্রামের ঠিক আগের দিন তিনি আমাকে খুব জোর করেছেন, যদি রাজি হই, বা কোনোক্রমে একটু সময় বের করতে পারি। আমি মুগ্ধ হলাম, নিজেকে প্রশ্ন করলাম ‘ঐ’ মাপের একজন মানুষ, এই তুচ্ছকে কেন এতটা গুরুত্ব দেন? উত্তর অনুধাবন করতে বেগ পেতে হয়নি। কোনো কারণ নেই একমাত্র ভালোবাস ছাড়া, আমার প্রতি তার! কিন্তু ক্ষমা চেয়ে নেয়া ছাড়া আমার উপায় ছিল না। যাইহোক পরে তিনি অনুষ্ঠান শেষ করে ফিরে এসে ঢাকায় আমার অফিসে এসেছিলেন। চা খেতে খেতে বললেন: যাননি ভালোই করেছেন। অনুষ্ঠান ভালো হয়নি। ওদের সামাজিক যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক দক্ষতা দুর্বল। আমি খুব হতাশ হয়েছি। আমি তার কথার পিঠে কোনো মন্তব্য করিনি। তবে অনুভব করলাম তিনি বেশ আহত হয়েছেন, আমার ব্যাপারে নয়, বাজিতপুরের ব্যাপারে। স্বপনের জন্য দেখলাম তার বেশ মায়া এবং রাগ রাগ, মানে ঠিক রাগ নয়, বিরক্তি। বিরক্তিও নয়, সেই একটা কি ধরনের যেনো দুঃখের অনুভূতি। তার ভেতরে যন্ত্রণা নেই তবে কষ্ট। দুঃখবোধ।
দুঃখবোধ কথাটি যখন উঠলোই, আরেকটা জীবন থেকে নেয়া ঘটনার কথা বলি: একদিন তিনি আমার অফিসে এলেন। কাজ ছিল। দেখলাম তার মনটা বেশ বিক্ষিপ্ত। কোনো সমস্যা? জিজ্ঞাসা করলাম। জবাবে সাযযাদ ভাই বললেন: মনটা খুব খারাপ। বেড়ালটা বাড়ি ফেরেনি! বাড়ি ফেরেনি তো কী হয়েছে? তিনি দেখি করুণ সুরে বলছেন : আরে সেতো নিজে নিজে খেতেও পারে না। মানে? আমাদের পোষা বেড়াল, ওর সবকাজ আমরা করে দিই। বুঝলাম ওনার মধ্যে একটা শিশুও আছে। বিষয়টি আমার মনে খুব যে দাগ কাটলো তা নয়। তবে সাযযাদ ভাইয়ের যেনো সন্তানকে ছেলেধরা ব্যাটা হরণ করেছে। আমি বললাম : বন্দি বেড়াল-কুকুর বা বছরের কোনো কোনো সময় একটু ঘরছুটরা বাহিরমুখো হয়। আবার ফিরে আসে। দেখবেন ঠিক ফিরে আসবে। বেড়াল কখনো পথ ভোলে না, মনিবকে তো ভোলেই না। তার মুখে মৃদু হাসি : আপনি বলছেন। আমি বললাম : হ্যাঁ বলছি। দেখবেন, ঠিক ফিরে আসবে। তাঁর মনটা ভালো হয়ে গেলো, আমরা কাজে মন দিলাম।
এ বছরে ফেব্রুয়ারির বইমেলায় তার একটা বই আমি আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশ করেছিলাম। এটাই বোধ হয় তার শেষ বই। ‘রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন শ্রীনিকেতন বিশ্বভারতী’। এইটিই বুঝি জীবদ্দশায় বেরুনো তার শেষ বই। বইটির প্রচ্ছদ পরিকল্পনাটা আমার। আছে পাঞ্জাবির কাপড়ের মতো ছাইরঙা জমিন, ওপরে কালচে মেরুন শিরোনাম, লেখকের নাম কালো। খুব সিম্পল। নিচে চার রঙে পুরো শান্তিনিকেতন এলাকার বিমূর্তপ্রায় মানচিত্র। যেখানে বিভিন্ন ভবন-পল্লী-জনগণের অবস্থা ইলাস্ট্রশন করা হয়েছে। কিন্তু আটপৌরে মানচিত্র তার পুরনো আল ভেঙে কেমন যেনো মাছের বাংশালের মতো শিল্পিত হামাগুড়িতে বেরিয়ে এসেছে। তিনি যে কি খুশি। সম্পূর্ণ অন্যরকম একটা প্রচ্ছদ। কিন্তু সব বাহবা সে আমার প্রাপ্য নয় সেই কথা তাকে মনে করিয়ে দিলাম। আমার সহকর্মী, গ্রাফিক্সের জামান ভাই, তিনি এর শিল্পী। তখন সাযযাদ ভাই তার রুমে গিয়ে তাকে ধন্যবাদটা জানিয়ে এলেন।
অফিসের কথা যখন আসলোই আরো কিছু কথা সেরে নিই এই বেলা। একদিন মনে হয় উমার মনটা বেশ ফুরফুরে। পুরানা পল্টনে কোনো কাজে আসবেন বা আসবেন না। আমার সাথে তার কোনো কাজ নেই। তিনি সকাল ১০টার দিকে ফোন করেছেন: বিলু ভাই! আপনার অফিসে আসলে আজকে দুপুরে খেতে দেবেন? কী আনন্দ! আমি রসিকতা করে বললাম: লাঞ্ছনা? শব্দটা তার কাছে নতুন এবং রসালো। তিনি হেসে কোন্থেন। হ্যাঁ, হ্যাঁ! লাঞ্চ করাবেন? অবশ্যই। কিভাবে? যেভাবে আপনি চান। অতিথি নারায়ণ। আমিই খাওয়াবো, অথবা অফিস। আপনি শুধু মেনুটা বলেন। তিনি বললেন: না-না, আপনি না, অফিস। ঠিক আছে অফিসই। কী খাবেন? তিনি বললেন: আচ্ছা এসে তারপর জানাবো। আচ্ছা, বলে কথা শেষ হলো। দুপুরে এলেন যথারীতি। কয়েকটা খাবায়ের কথা আমিই বললাম। তিনি দেখি হেসে হেসে বললেন: ওরে বাবা, বাসায় টের ফেলে বকা দেবে। রিচ খাওয়া একদম মানা। যাই হোক তারপর তার পছন্দমতো সাদা ভাত, ছোটো মাছ, সবজি, মুরগি, ডাল। ছোটো মাছ দুই আইটেমে দেখে তিনি খুব খুশি। আমরা দুই ভাই আমাদের কনফারেন্স রুমে বসে গল্প করে করে অনেকক্ষণ ধরে খেলাম। সে-ই কোনো দুপুরে একসাথে আমাদের প্রথম এবং শেষ খাওয়া। আমি রসিকতা করে ঐদিনের লাঞ্চকে লাঞ্ছনা বলেছিলাম। সেটা লাঞ্ছনা না হলেও অল্প সময়ের মধ্যে এতোটাই বেদনার স্মৃতি হয়ে যাবে তাতো বুঝতে পারিনি।
শাস্তিনিকেতন শ্রীনিকেতন নিয়ে তার যে বইটা বের করলাম, সেটা ফেব্রুয়ারির মেলায়। তবে মেলার কয়দিন আগেই সেটা হাতে চলে এলো। সাযযাদ ভাই কত খুশি। আমার প্রতি তার ভালোবাসার এবং বন্ধুত্ব হবার একটাই কারণ আমি খুঁজে পেয়েছি। সেটা হতেও পারে এতসব পুরস্কারের উৎস। কখনো কোনো বিষয়ে তার সাথে আমার কথা-কাজে গরমিল হয়নি। যাইহোক এই বই বেরুনোর আগে এবং পরে একটা ঘটনা হলো। বইটির সবকিছু যখন আমরা গুছিয়ে নিলাম, ডিড পর্যন্ত শেষ। প্রচ্ছদ, ফ্ল্যাপ সব শেষ। এবার তাকে বললাম একটা ভূমিকার জন্য। তিনি বললেন এক আশ্চর্য অভাবনীয় কথা। তিনি লিখবেন প্রসঙ্গকথা। আর ভূমিকা লিখাবেন বলে যার নাম প্রস্তাব করলেন, আমি লজ্জায়-ভয়ে-বিস্ময়ে বাঁচি না। বললাম যে থাক, তাহলে আর ভূমিকার দরকার নেই, শুধু আপনার প্রসঙ্গকথা হলেই চলবে। এবার তার কথায় আমি ‘হাতি ধপ্পাস’ হবার যোগাড়: না, আমি অনেক ভেবেচিন্তেই বলছি, আমার এই বইয়ের ভূমিকা আপনিই লিখবেন। এর পেছনে আপনি অনেক শ্রম দিয়েছেন সেটাই বড় কথা নয়। নানান ভাবনা চিন্তায় মূল্যায়নেই আমি আপনাকে নির্বাচন করেছি। আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম: সাযযাদ ভাই, তাকে মানুষ হিসেবে নাতো? আপনাকে বোঝাতে পারছিতো যে, কী বালখিল্যটা আপনি করতে যাচ্ছেন? আপনার বইয়ের ভূমিকা লিখবো আমি! আপনি যতোই মনোনয়ন দেন, এটা আমার জন্য মস্তো দুঃসাহস হয়ে যায় না? তিনি বললেন: আপনি তো আর আপনাকে দেখতে পান না, আমি পাই। মানুষ হাসবে না। আপনি দুঃসাহসী হয়েই লিখে ফেলেন। আগত্যা রাজি হলাম এ যেমন সত্য, ভেতরে কিছুটা দ্বিধান্বিত পুলকতা জাগলো, সে কথায় মিথ্যা নয়। ‘কলাম’ লেখার অভ্যাসতো আছেই, দ্রুত এবং খেঁচাখেঁচ আট-দশ পাতা লিখে কম্পোজে দিয়ে দিলাম। সেটাকে চূড়ান্ত করে প্রস্তাব দিলাম সাযযাদ ভাইকে যে, তিনি একটু দেখে দিন। না তাতেও তিনি রাজি নন। বই বেরুনোর আগে সেটা তিনি পড়বেনই না। সত্যি বলতে কি আমি ভেতরে কেমন শক্তি অনুভব করলাম। আমার প্রতি তার এই আস্থা যে একটা স্বীকৃতিও পুরস্কার হয়ে উদ্ভাসিত হলো।
ঐ লেখায় আমি তাকে যেমন অভিনন্দিত করেছিলাম, স্পষ্টভাবে বিরূপ সমালোচনাও করেছিলাম। বিশেষ করে তার বানানরীতি, আটপৌরে উচ্চারণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমার দ্বিমত পর্যন্ত। কিন্তু হাকিম নড়েতো হুকুম নড়ে না’র চাইতেও দৃঢ় তিনি। এ বেলায় হাকিমও নড়ে না, হুকমতো নড়েই না। পুরো ব্যাপারটাই ধনাত্মক দৃষ্টিতে দেখেছেন তিনি। ফলে আমাকে যা নই তাই বিশ্লেষণ দিয়ে মুঠো ফোনে তার সে কি উচ্ছ্বাস।
এখনো মনে হয় তার বই কিছু লেখক কপি তার পাওনা রয়ে গেছে। আর আমাকে একটা গদ্যের পাণ্ডুলিপি দিতে চেয়েছিলেন তিনি এই মে-জুনে। কিন্তু না আমি জানতাম, না তিনি জানতেন, সেই রকমের সুবর্ণ মে-জুন আর আমাদের জীবনে আসবে না।
আমার হিসাবে আশিটির মতো বই লিখেছেন সাযযাদ ভাই। এর মধ্যে কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধ, গবেষণায়, সংকলনে, শিশুসাহিত্যে, স্মৃতিকথায়, অনুবাদে, সম্পাদনায় সমানে তার পাণ্ডিত্য দক্ষতা এবং পারঙ্গমতা লক্ষ্য করে বিস্ময় না মেনে পারা যায় না। কলেজ শিক্ষক হিসাবে তার খ্যাতি কম নয়। কিন্তু তিনি খুব যে দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করেছেন তা নয়। সা’দত কলেজে তিনি ১৯৭২ থেকে ৭৬ মানে তিন-চার বছর পড়ানোর কাজ করেছেন। তার সবচেয়ে বেশি সময় গেছে যে পেশায়, সেটা হলো সম্মাদনা ও প্রিন্টমিডিয়া বা খবরের কাগজের লাইনে। মাসিক কণ্ঠস্বরে কাজ করেছিলেন ১৯৬৬-৬৮, সহকারী সম্পাদক হিসেবে। এই দিয়ে শুরু। তারপর ছিলেন সহকারী সম্পাদক: মাসিক বিচিত্রা ১৯৬৮-৬৯, নিয়মিত প্রদায়ক: রহস্য পত্রিকা ১৯৬৮-৬৯ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: সাপ্তাহিক রণাঙ্গন ১৯৭১-৭২, সম্পাদক: সাপ্তাহিক সংকেত ১৯৭২, সহকারী সম্পাদক: সাপ্তাহিক বিচিত্রা ১৯৭৬-৮২, সহকারী সম্পাদক: দৈনিক সংবাদ ১৯৮২-৮৫, সম্পাদক: সাপ্তাহিক আগামী, পাক্ষিক তারকালোক, কিশোর তারকালোক ১৯৮৫-৯২, বার্তা সম্পাদক। ফিচার সম্পাদক দৈনিক দিনকাল ১৯৯২-৯৫, পরিচালক। সহযোগী সম্পাদক: বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট ১৯৯৫-২০০৪, যুগ্ম সম্পাদক: দৈনিক মানবজমিন, জুলাই ২০০৪-জানুয়ারি ২০১৫। মানে যোগ হলো টানা আধা শতাব্দী। বড় কম কথা নয়। পঞ্চাশ বছর ধরে মুড়ি কুড়িয়ে পালা দিলেও একটা পাহাড় হয়, সেখানে তিনি কুড়িয়েছেনই পাপড়ি, তাহলে জানিয়েছেন যা, তাকে কী নামে অভিহিত করা যাবে? এর মধ্যে মহান মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে তিনি যে একজন হতে পারেন তাতো সহজেই অনুধাবন করা যায়। সে নাকি খুবই জাকানদানির মতো একটা ব্যাপার। শ্লীলকেও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হয় আবার অশ্লীলকেও ভালো করে দেখতে হয়। কারণ লক্ষ-কোটি টাকার একটা প্রডাকশন মানে বিনিয়োগ ভেস্তে যাবে তাদের অনানুমোদনের ওপর। অর্থাৎ সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসাবে একটা পচা সিনেমাকে ঘেন্নার সাথে দেখতে হলেও মানবিক চোখটাও খোলা রাখতে হয় যেনো ইনজাস্টিজ না ঘটে।
এতো যার বর্ণাঢ্য কর্ম ও সাহিত্যিক জীবন, তার ঝুলিতে সম্মাননা এবং পুরস্কারের পরিমাণই বা কম থাকবে কেন। সে নিয়েও অবশ্যি আমার কথা আছে, তারও ছিল, অন্যদেরও আছে কম বা বেশি। নানা সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পুরস্কার এবং সম্মাননা নিয়ে তার মুখে কথা শুনেছি। কখনো খুশি, কখনো উষ্মা কখনো তা কটাক্ষ। সে কথায় পরে আশা যাবে। তার আগে একটু দেখা যেতে পারে কী কী পুরস্কার তিনি পেয়েছেন আর তাহলেই দেখা যাবে কী কী পুরস্কার তিনি পাননি। সম্মাননার ব্যাপারেও তা-ই, কোন্টা পেয়েছেন এবং কোনটাও পাওয়া উচিত ছিল।
তার প্রাপ্ত পুরস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে, টাঙ্গাইল জেলা নাট্য-উৎসব পুরস্কার ১৯৭৬; একুশে স্মৃতি স্বর্ণপদক ১৯৯৪; কবি জসীমউদ্দীন পুরস্কার ১৯৯৭; নন্দিনী পুরস্কার ২০০১; কবি সুকান্ত সাহিত্য পুরস্কার ২০০২; সৈয়দ আবদুল মতিন স্বর্ণপদক ২০০২; বাচসাস পুরস্কার; আজিজ মিসির ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ড ২০০২; ট্রাব অ্যাওয়ার্ড- লাইফ টাইম অ্যাসিভমেন্ট (ক্রিটিক) অ্যাওয়ার্ড। শিশুসহিত্যে এম নুরুল কাদের পুরস্কার ২০০৪; কবিতা পরিষদ পুরস্কার, সাতক্ষীরা ২০০৪; সাহিত্যে ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাব পদক ২০০৬; শেকড় নাট্যগোষ্ঠী পুরস্কার ২০০৭; কপোতাক্ষ সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার ২০০৮; টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ পুরস্কার-ভাষাসৈনিক শামসুল হক পদক ২০০৮; বিজয় সাহিত্য পুরস্কার, সাতক্ষীরা ২০০৮; কবি বিষ্ণু দে পুরস্কার; সাংস্কৃতিক খবর (২২তম বাংলা কবিতা উৎসব), কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত ২০১০; গাঙচিল সাহিত্য স্বর্ণপদক, খুলনা ২০১৩; প্রবন্ধ সাহিত্যে বিশ^ভারতী পুরস্কার, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত ২০১৩; জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ২০১৬।
তার প্রাপ্ত সংবর্ধনার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, থানা কমান্ড, দেলদুয়ার ১৯৯৭; ভোরের কাগজ পাঠক ফোরাম, টাঙ্গাইল জেলা পরিবার ২০০১; জাতীয় প্রেস ক্লাব ২০০৩; সাতক্ষীরা সাহিত্য একাডেমি ২০০৪; অধ্যাপক সৈয়দ নূরুল হাসান ডিগ্রি কলেজ, ফারাক্কা, মুরশিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত ২০০৫; বিন্দুবাসিনী স্কুল, টাঙ্গাইল ২০০৫; শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্মাননা ২০০৫ এবং ছন্দক, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত ২০০৭।
তিনি সাপ্তাহিক রণাঙ্গনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এটি একটি বিশেষ ব্যাপার। এই পত্রিকাটি দেখার সুযোগ আমার হয়নি। এই তথ্য নিয়ে কারো কারো মৌখিক দ্বিমত আছে। তবে আমি সাযযাদ কাদিরের নিজের দেয়া আত্মতথ্য থেকে এই উল্লেখটা করেছি।
রেডিও, টেলিভিশনের অনুষ্ঠান রচনা-উপস্থাপনা, পরিচালনায় তার পারদর্শিতা ছিল। গণচীনের রেডিও বেইজিং এ ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেছিলেন ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সাল অবধি। বাংলা ব্যাকরণতত্ত্ব বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান ছিল। চীনা ভাষা জানতেন একেবারে ব্যাকরণ সিদ্ধভাবে। তিনি চীনের রাজধানী বেইজিং-এ মুনীর চৌধুরী’র ‘কবর’ নাটকের, নিজ পরিচালনায়, মঞ্চায়ন করেন ১৯৮০ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে। এ ছাড়া তিনি রাষ্ট্রীয় সাংবাদিক প্রতিনিধি হয়ে ফ্রান্স সফর করেন ১৯৮৪ সালে, বঙ্গীয় কবি প্রতিনিধি হয়ে ভারত সফর করেন ১৯৯২তে।
তিনি যে চলচ্চিত্রের সেন্সর বোর্ডের সদস্য ছিলেন এটিও তার কাজের বহুমুখিতা এবং যাকে বলে অভিজ্ঞতার একটা উল্লেখযোগ্য দিক। এই কাজে যে সুপ্রচুর বিড়ম্বনা এবং বিবমিষা জাগানিয়া মনোভাবও ছিল সেই গল্প তিনি একদিন শুনিয়েছিলেন কাঁটাবন সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্রে বসে। ভালো লাগুক আর নাই লাগুক, প্যানেলে বসে আনসেন্সর্ড দেশি চলচ্চিত্র দেখা যে কি আজাব তা নাকি আর বলার নয়। ভালোও যেমন দেখা হয়, পচা গদবাধও তেমনই গুরুত্ব গিয়ে দেখতে হয়। যেসব প্রডাকশন অনুমোদন পায় তারই যা হাল, তাহলে যে ছবি অনুমোদন পায় না, তা দেখাটা কী পরিমাণ কষ্টকর।
সংখ্যার দিক দিয়ে এই পুরস্কার এবং সম্মাননা যথেষ্টই বলতে হবে। মানের দিক দিয়ে সব পুরস্কার সমান নয় এটাই স্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশের একটা দুটো পুরস্কার তাকে পরিগণনায় আনেনি বলে তার মনের গভীরে একটা করুণ জিজ্ঞাসা ছিল। অনেক সময় আলাপে আড্ডায় এই সত্য তার কাছ থেকে অভিব্যক্ত হয়েছে। সেই মনোকষ্ট বহিঃপ্রকাশে কখনো কখনো কোনো কথা বিষোদ্গারের মতোও যে মনে হয়েছে, সেই সত্যের সাফাই গাইবো না। আমাদের দেশে যারা বড়ো বড়ো পুরস্কার পেয়েছেন, তারা অবশ্যই সেই পুরস্কার পাবার যোগ্য, কারো যদি প্রশ্ন থাকে তাহলে সেটাও ফেলনা নয় সেটাও সত্য, কিন্তু তাদের সবার চাইতেই কি সাযযাদ কাদির গুণে-প্রতিভায় ইনফিরিয়র? অথবা তিনি কি তাদের কারো চাইতেই সুপিরিয়র নন? এই প্রশ্ন দেখেছি অনেকেরই! তিনি যেমন অনেক বিষয়ে এবং ব্যক্তি কারো কারো বিষয়ে বিরূপ মতামত ব্যক্ত করতেন, তেমনি তার বিষয়েও কাউকে কাউকে বিরূপবার্তা পরিবেশন করতে দেখা তো গেছেই। সেই জন্য বলেছি যে, তিনি দোষেগুণেই মানুষ ছিলেন, তবে আমার হিসেবে গুণের পাল্লাই ভারী।
এইবার বইমেলায়, (সতেরোর বাংলা একাডেমি বইমেলায়) তিনি আসলেন ‘বটেশ্বর বর্ণন’ এর স্টলে। সেখানটায় আমি দাঁড়িয়ে। এসেই বললেন: আরে আমি আপনাকে খুঁজে মরছি। আমি হেসে বললাম: না-না, মরবেন কেন। সাথে মনে হয় সিলেটের একদল ইয়াং কবি। তাদের কারো হাতে বইয়ের বান্ডেল। একজনের হাতে একটা মিষ্টির বাক্স। ধাঁই ধাঁই করে আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম, মাঝখানে সাযযাদ কাদির। পাশে মনে হয় আমি। একটা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবেন। ঐ যে বুকের সাথে উল্টো করে বই ধরে দাঁড়াতে হয়, মানে ক্যামেরা যাতে প্রচ্ছদটি দেখতে পারে, সেই ভাবে আমরা হাসি-হাসি মুখ করে দাঁড়ালাম, ক্যামেরার চোখে বাতি জ্বলে জ্বলে উঠলো। তারপর সেই মিষ্টির বাক্স খোলা হলো। ইয়া বড়ো বড়ো মিষ্টি। আমি খেলাম না, অন্যরা সবাই খেলেন, সাযযাদ ভাইও। আসার সময় তিনি আমাকে তার একটা বই দিলেন, পড়ে মতামত জানাতে বললেন। বইটি আমি পড়েছি, কিন্তু মতামতটা জানাবো সেই সুযোগ প্রকৃতি আমাকে দিলো না। এখন আমি কী করবো?
তিনি যে মেলায় আমাকে পেয়েই বলেছিলেন: ‘আরে আপনাকে খুঁজে মরছি। সেই ‘মরছি’ কথাটা এখন অনেক বড়ো বেদনা হয়ে আমার হৃদয়ের টানা তারে এমন ভাবে টোকা দিচ্ছে, যেন স্পষ্টই সেটা সাযযাদ ভাইয়ের কণ্ঠসর। আমি যে বলেছিলাম: ‘নানা মরবেন কেন!’ সেই কথাটির যে এক পয়সা মূল্য নেই, সেই সত্য আমাকে কুরে কুরে খায়। তার আত্মার শান্তি হোক।