চল্লিশ দশকের এক অনন্য কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েন উদদীন (১৯১৮-১৯৮৩)। বাংলাসাহিত্যে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ছোটগল্প ‘নয়ান ঢুলী’ দিয়ে। এ নামে তাঁর গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে। এরপর ১৯৫৫ সালে বের হয় আরো দুটি গল্পগ্রন্থ ‘খোরস্রোত’ ও ‘বীরকণ্ঠীর বিয়ে’। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় ‘অষ্টপ্রহর’ এবং ১৯৭৩-এ বের হয় ‘বেলা ব্যানার্জীর প্রেম’ নামক দুটি গল্পগ্রন্থ। এ সব গল্পগ্রন্থে তাঁর ষাটের অধিক গল্প রয়েছে; যাতে ফুটে উঠেছে ১৩৫০-এর দুর্ভিক্ষের চিত্র, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, চল্লিশ দশকের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।
‘নয়ান ঢুলী’ পঞ্চাশের মন্বন্তরে বিপর্যস্ত দারিদ্র্যপীড়িত এক ঢুলীর জীবনের করুণ কাহিনী। ‘এক ঘর এক বাড়ি। ঘর তো নয় ঝুপরি।’ যে ঘর থেকে রাত্রিতে আকাশের তারা গোনা যায়। নয়ান ঢুলী টাকার অভাবে স্ত্রীকে চিকিৎসা করাতে পারে না। বহু কষ্টে টাকার যোগাড় করে ডাক্তারের কাছে গেলেও উল্টো ডাক্তার চুরির টাকা বলে তাকে সন্দেহ করে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেয়। নয়ান ঢুলী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে দেখে স্ত্রী-কন্যা দুজনেই বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছে। অবিবেচক সমাজের ধনী-গরিবের এক চিরন্তন বৈষম্য ফুটে উঠেছে এ গল্পে; যেখান থেকে নয়ানের মতো লোকদের কিছুতেই নিষ্কৃতি নেই, নেই সততার মূল্য।
‘বাতাসী’ গল্পটিও দারিদ্র্যপীড়িত সহিস মদিন ও তার বাতাসী নামের স্ত্রী ঘোড়ার জীবনের করুণ কাহিনী। মদিন তার ঘোড়াটিকে সন্তানের মতোই ভালোবাসে। ঘোড়াটি অসুস্থ হলে টাকা-পয়সার অভাব সত্ত্বেও মদিন তার চিকিৎসা করে ওকে সারিয়ে তোলে। মদিনের স্ত্রী এতে বিরক্ত হয়। এতে মদিন স্ত্রীর প্রতি রাগত স্বরে বলে, ‘দুনেয় কেবল নিজের পেট-ই চিনলি অথচ যার কামাই পেটে যায় তারে চিনলি না।’ এ গল্পে শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পের ছায়াপাত লক্ষ্য করা যায়। গফুর যেমন মহেশকে সন্তানের মতো ভালোবাসে তেমনি মদিনও বাতাসীকে সন্তানের মতোই ভালোবাসে। গল্পের পরিণতিও প্রায় একই রকমের।
‘তালাক’ গল্পটিতে রক্ষণশীল বাঙালি মুসলিম সমাজের এক সুনিপুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। এ গল্পে তৎকালীন সময়ের বহু বিবাহ আর ঘন ঘন সন্তান উৎপাদনের আবরণের ভিতরে রয়েছে এক বেদনাক্লিষ্ট নারী নুরজাহানের হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস; পরিশেষে প্রতিবাদমুখিতা। নুরজাহান তার নামের মতোই সুন্দরী-রূপসী। অল্প বয়সেই তার ওপর নজর পড়ে শিক্ষক হাশেম মৌলবির। পড়াকালীন সময়ে মৌলবির প্রলোভনে পড়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে সে। পরে মুখ রক্ষার্থে মৌলবির তৃতীয় স্ত্রী হয় নুরজাহান। সংসারে এসে তার সুখ উবে যায়। ফি-বছর সন্তান উৎপাদন হয় কিন্তু তার কোনো চিকিৎসা নেই, নেই কোনো প্রতিকার। ভরসা একমাত্র তাবিজ-কবজ আর পানিপড়া। ক্রমশ ক্ষীণকায় হয়ে যায় নুরজাহান। চব্বিশ বছর বয়সেই সে বুড়িয়ে যায়। উপায়ান্তর না দেখে এক সময় নুরজাহান প্রতিবাদী হয়। তার ছোটবেলার বান্ধবী বাসন্তীকে খবর দেয়। বাসন্তীর স্বামী বড় ডাক্তার। তাকে দিয়ে নুরজাহান চিকিৎসা করাবে। খবর পেয়ে বাসন্তী ছুটে চলে আসে নুরজাহানের বাড়ি। কিন্তু বাদ সাধে স্বামী হাশেম মৌলবি। বলে, ‘অ্যাঁ পরদা পুশিদা জায়গা পর পুরুষকে দেখিয়ে চিকিৎসা? নাউজুবিল্লা, নাউজুবিল্লাহ…’ কিন্তু নুরজাহান অনড়; সে চিকিৎসা করাবেই। মৌলবিও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তাকে তালাক দেয়। নুরজাহান যেন হাঁফছেড়ে বাঁচে। বলে, ‘হাজার শুকুর।’ এ গল্পে পুরুষের বহু বিবাহ, ধর্মীয় কুসংস্কার, স্ত্রী নির্যাতন প্রভৃতির পাশাপাশি মুখ বুজে সহ্য নয় বরং নারীকে প্রতিবাদী হয়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন লেখক।
‘প্রাণিজ’ গল্পটিতেও দেখা যায় বহু বিবাহের কুফল। পঞ্চাশোর্ধ্ব হিসামুদ্দিনের তৃতীয় স্ত্রী হয়ে ঘরে আসে যুবতী বিধবা হুরজান। তবে হিসামুদ্দিনের আগের দুই স্ত্রী জীবিত নেই। ঘরে দু’পক্ষের বিবাহযোগ্য দুটি ছেলেমেয়ে। হাঁপানিপীড়িত হিসামুদ্দিন হুরজানকে ঘরে এনে বেশ উৎফুল্ল হয়। গরিব ঘরের মেয়ে হলেও সমাজে ভদ্র পরিবার বলে পরিচিত ওরা। হুরজানের আগ্রহেই মেয়েটির ধুমধাম করে বিয়ে দেয় কৃপণ হিসামুদ্দিন। কিন্তু অসুস্থ হিসাম বুঝতে পারে না মেয়েটিকে তাড়াহুড়া করে বিয়ে দেয়ার কারণ। ছেলে ফইমুদ্দির সাথে হুরজানের নির্বিঘ্নে রাত কাটানোই তার এত ছলাকলা। এ গল্পে মানবদেহের তাড়নার কথা অতি সন্তর্পণে এবং শিল্পিত রূপে তুলে ধরেছেন লেখক। গল্পের কোথাও নাগ্নিক বর্ণনা নেই। জৈবিক তাড়না এমনই যে তা কোনো সম্পর্কের বাঁধনে ঠেকিয়ে রাখা যায় না- এটাই ‘প্রাণিজ’ গল্পের সারকথা।
‘খোর¯্রােত’ ও ‘দুষ্কৃতকারী’ দুটি গল্পে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের কিছু চিত্র পাওয়া যায়। ‘খোরস্রোত’ গল্পটিতে ফুটে উঠেছে ছাত্র আন্দোলন ও ভাষা আন্দোলনের কথা। উচ্চবিত্ত ও অভিজাত পরিবারের ছেলে মুনির। এমএ পাস করার পর ছেলে একটি ভালো চাকরি করবে বাবা খান বাহাদুর সাহেবের এমনি ইচ্ছা। কিন্তু ছেলে রাজনীতির সাথে জড়িত। বাবার অপছন্দ সত্ত্বেও মুনির নাগরিক অধিকার আদায়ে সোচ্চার। পুলিশ এক সময়ে মুনিরকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় বাড়ি থেকে। বাবা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান। পরিশেষে দেখা যায়-শহিদবেদিতে পুষ্পমালা দেয়ার জন্য ছাত্ররা মুনিরের বাসায় আসে। বাবা খান বাহাদুর অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘মুনিরকে যে কাল পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে, আমি গেলে চলবে বাবা সকল?’ এ গল্পে দেখা যায় অহঙ্কার আর আভিজাত্যের কাছে দেশপ্রেমই জয়লাভ করে।
‘দুষ্কৃতকারী’ গল্পটি মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রচিত। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশে কিছু মুক্তিযোদ্ধা বিপথে যায়। এ গল্পের মতো যার ছায়াচিত্র আমরা দেখতে পাই খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’ চলচ্চিত্রে। ‘দুষ্কৃতকারী’ গল্পের নায়ক-নায়িকা শফিক চৌধুরী ও শামিম খান একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। বাড়িও একই জেলায়। শামিম সাধারণ পরিবারের মেয়ে আর শফিক চৌধুরী হলো দুলাই জমিদারের উত্তর পুরুষ। শামিম কমুনিস্ট রাজনীতির সাথে জড়িত আর শফিক পুঁজিবাদী রাজনীতির সাথে জড়িত। বিপরীত মেরুর দু’জনের সাথে এক সময় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দেখা যায়Ñ শফিকই শামিমের প্রতি বেশি অনুরক্ত। শামিম শফিকের প্রতি অনুরক্ত হলেও ঘৃণা করে সামন্তবাদীর উত্তরসূরি শফিকের অর্থ-বিত্ত আর রাজনীতিকে। এক সময় শফিক বিদেশ চলে যায়। প্রচুর অর্থ কামাই করে দেশে ফিরে আসে। অনেক দিন পর আবার দুজনের দেখা হয় এক রাস্তার মোড়ে। শফিক পূর্বের মতোই ভালোবাসার আগ্রহ নিয়ে শামিমকে নিজগাড়িতে তুলে নেয়। কিন্তু শামিমের মধ্যে আগের মতো আবেগ কাজ করে না। ভিতরে জ্বলে তার শ্রেণিশত্রু খতমের জিঘাংসা। পরিশেষে শামিমের হাতেই শ্রেণিশত্রু প্রেমিক শফিক খুন হয়। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে পুঁজিবাদের উত্থান, শাসকশ্রেণির দুর্নীতি-শোষণ এর বিপরীতে কমুনিস্ট রাজনীতির শ্রেণিশত্রু খতমের মিশন ইত্যাদি চিত্র ফুটে উঠেছে গল্পটিতে।
পরিশেষে বলা যায়Ñ সরদার জয়েন উদদীনের গ্রামীণজীবনকে দেখেছেন খুব কাছে থেকে। ফলে গ্রামের মানুষ তথা সমাজের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দরদ ফুটে উঠেছে তাঁর গল্পগুলোতে। প্রতিটি গল্পের ভাষাই সহজ-সরল ও সাবলীল। তাঁর গল্পগুলো তীক্ষ্ণ সমাজবোধ তথা সমাজবাস্তবতায় উজ্জ্বল। গ্রামীণজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, দলন-নিপীড়ন, অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মুখচ্ছবি প্রভৃতি প্রতিফলিত হয়েছে তার গল্পগুলোতে। সরদার জয়েন উদদীনের গল্প সম্পর্কে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেছেন, ‘কুৎসিত পর-শাসনের নির্মম শোষণ, ভাষা-সংস্কৃতি, অর্থ-বিত্তের বিবেকহীন অধিগ্রহণ- আর অপ্রতিরোধের জ্বলন্ত আগুন। এই কঠিন সময়ের বাস্তবতার মধ্যে জয়েন উদদীন ফিরে গিয়েছিলেন গ্রামবাংলার বাস্তবতায়। তাঁর গল্পে আধুনিকতার ছাঁচহীন মানুষগুলি যেন শোষণের তীব্র অগ্নিশিখায় অঢেল সরবরাহ করা জ্বালানি। তারা দাউ দাউ করে পোড়ে না, পোড়ে তুষের আগুনের মতো ধিকিধিকি।’