এক.
“যে সাহিত্য পড়লে শিশু-কিশোর নিজেরাই বুঝতে পারে, বই পড়ে নিজের মনের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে কোন শিক্ষকের উপস্থিতি যার ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, তাই শিশুসাহিত্য।” আল-কামাল আবদুল ওহাব
শিশুসাহিত্য হলো শিশুদের উপযোগী সাহিত্য। তাই শিশুসাহিত্যর জন্য প্রকাশভঙ্গিটা সরল ও স্পষ্ট হয়, যেখানে তাদের সার্বিক আনন্দ বিধানের ব্যবস্থা আর প্রয়োজনীয় শিক্ষার বিষয়টি নিহিত থাকে। শিশুসাহিত্যে শিক্ষার পরিধিতে তাদের আনন্দ ও মনোবিকাশের পাশাপাশি থাকে সততা, সাহস, ধৈর্য ও বিশ্বাসের মৌলিক উপকরণ। জোসেফ ফ্রাঙ্ক বলেছেন- শিশুসাহিত্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাই যা পাঠককে প্রত্যক্ষ ও কল্যাণকর অভিজ্ঞতা দেয়, সে অভিজ্ঞতা যেমন অনুভূতির তেমনি জ্ঞানেরও। শিশুসাহিত্যের বিষয়বস্তু হবে-‘পৃথিবী সুন্দর, বিস্ময়কর জীবজগৎ, মানুষের প্রতি বিশ্বাস।’
দুই.
প্রাচীন বাংলা শিশুসাহিত্যের লিখিত ইতিহাস নেই। মৌখিক সাহিত্যের ছেলে-ভুলানো রূপকথার বর্ণনা, লোককথা ইত্যাদি প্রাচীন সমাজের সৃষ্ট। সওদাগরজীবী রূপকথাগুলো বাংলার বণিক যুগের। পরীকাহিনি এ দেশে এসেছে মুসলিম শাসনামলে চাকরি ও অভিবাসন সূত্রে আগত আফগান ও ইরানিদের মাধ্যমে। ব্রিটিশ উপনিবেশকতার সূত্রে ভারতবর্ষের রাজধানী শহর হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে কলকাতা। যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মুদ্রণশিল্পের উদ্ভব ও বিকাশের মধ্য দিয়ে কলকাতা আধুনিক বাংলাভাষা ও সাহিত্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ঊনবিংশ শতকের শেষ দশকে আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যের জন্মসূচনা হয়। আদি লালন ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার দুটি স্কুল বুক সোসাইটির হাত ধরে। উদ্দেশ্য ছিলো ইংরেজি রচনার অনুবাদ, পূর্ণবর্ণনা এবং স্কুল পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্তি ও ছাত্রদের মনোরঞ্জন। ঊনবিংশ শতকের বাংলায় যখন শিশুসাহিত্যের চর্চা শুরু হয় তখন তার মূলে ছিলো প্রধানত জ্ঞানচর্চার প্রেরণা। প্রারম্ভিক পর্যায়ে প্রকাশিত শিশুতোষ বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- গোলকনাথ শর্মার গল্প-অনুবাদ ‘হিতোপদেশ’ (১৮০২), রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের ‘নীতিদর্শন’ (১৮৪০), রাধামাধব মিত্রের ‘কবিতাবলী- ১ম ভাগ’ (১৮৫৬), সাতকড়ি দত্তের বিজ্ঞানবিষয়ক বই ‘প্রাণিবৃত্তান্ত’ (১৮৫৯), হরিনাথ মজুমদারের ‘দ্বাদশ শিশুর বিবরণ’ (১৮৬২), গোবিন্দ প্রসাদ মুখার্জির ‘কবিতাকল্প’ (১৮৭৩) এবং মোজাম্মেল হকের ‘পদ্যশিক্ষা’ ইত্যাদি। ১৮৮৪ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত সময়কে শিশুসাহিত্যের বিকাশপর্ব বলা যায়। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা হচ্ছে- আনন্দচন্দ্র মিত্রের ‘পদ্যসার’ (১৮৮৬), এস. মহলানবিশের জীবনী বই ‘রাজা রামমোহন’ (১৮৮৬), কালীপ্রসন্ন ঘোষের ‘কোমল কবিতা’ (১৮৮৮), হিন্দু পুরাণধর্মী প্রথম উপন্যাস অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শকুন্তলা’( ১৮৯৫), যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লৌকিক ছড়ার প্রথম সংকলন ‘খুকুমণির ছড়া’ (১৮৯৯) এবং মোজাম্মেল হকের জীবনী বই ‘মহর্ষি মনসুর’(১৮৯৬)। ১৮৭৮ সালে কেশবচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় প্রকাশ পায় শিশুপত্রিকা ‘বালকবন্ধ’ু। কলকাতার বাইরে বরিশাল থেকে এ কে ফজলুল হকের সম্পাদনায় প্রকাশিত শিশুপত্রিকা সাপ্তাহিক ‘বালক’( ১৯০৩)।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ প্রবর্তিত ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির মধ্য দিয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। কলকাতার পাশাপাশি ঢাকাকেন্দ্রিক নতুন সাহিত্যধারার সূত্রপাত ঘটে। পূর্বতন রাক্ষস-খোক্ষস, দৈত্য-দানব, রাজা-রাণীর উদ্ভট গল্প-কাহিনির অপলাপ আর গা ছমছম ভূত-প্রেত থেকে ঢাকাকেন্দ্রিক শিশুসাহিত্যে জেগে ওঠে সাহসী রোদ ঝলসানো ছন্দ বাস্তবতা। যেখানে উঠে আসে মানবিকতা, সাহস, সংযম, ধৈর্য, নৈতিকতা, আদর্শ সর্বোপরি বড়ো মানুষ হওয়ার শিক্ষা। ঢাকাকেন্দ্রিক আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ ছিলেন ইব্রাহিম খাঁ, খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দিন, জসীম উদদীন, মোহাম্মদ মোদাব্বের, শামসুন নাহার মাহমুদ, মোহাম্মদ নাসির আলী, কাজী আবুল কাসেম, হোসনে আরা প্রমুখ।
১৯৭১ সালে পূর্ববাংলার মানুষ পাকিস্তান ঔপনিবেশকতা থেকে মুক্তিলাভ করে। নতুন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। সত্তর দশকের যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের গতি-প্রকৃিতকে বিচ্ছিন্ন করে। অবশ্য ১৯৭৬ সালে শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা পায় এবং শিশুসাহিত্য চর্চায় বাংলাদেশে নবযাত্রার সূচনা হয়। বাংলাদেশ পর্বে শিশুসাহিত্য সক্রিয় ও নিবেদিত অভিযাত্রীগণের মধ্যে রয়েছেন-
ফররুখ আহমদ, সুফিয়া কামাল, সাজেদুল করীম, হাবীবুর রহমান, আতোয়ার রহমান, শামসুর রাহমান, ফয়েজ আহমদ, হালিমা খাতুন, আবদার রশীদ, আবদুল্লাহ আল-মূতী, আবুল খয়ের মুসলেহ্ উদ্দীন, হোসনে আরা শাহেদ, আল-কামাল আবদুল ওহাব, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, সুকুমার বড়ুয়া, খালেদা এদিব চৌধুরী, হায়াৎ মামুদ, রফিকুল হক, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, আশরাফ সিদ্দিকী, সাজেদুল করিম, এখলাস উদ্দীন আহমদ, বিপ্রদাস বড়–য়া, বুলবুল ওসমান, হোসেন মীর মোশাররফ, শাজাহান কিবরিয়া, ফজল-এ- খোদা, মাহমুদ উল্লাহ, মোমেন চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, চেমন আরা, নিয়ামত হোসেন, আবু কায়সার, আখতার হুসেন, ইশতিয়াক আলম, হুমায়ূন আহমেদ, কাইজার চৌধুরী, আলী ইমাম, আবু সালেহ, এনায়েত রসুল, আ শ ম বাবর আলী, খালেক বিন জয়েনউদদীন, শাহাবুদ্দীন নাগরী, আবুল হোসেন আজাদ, আসলাম সানী, হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী, রহীম শাহ, জহুরুল আলম সিদ্দিকী, আনজীর লিটন, আহমাদ উল্লাহ, ফারুক নওয়াজ, সুজন বড়ুয়া, লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, রাশেদ রউফ, মকবুলা মনজুর, রাবেয়া খাতুন, রাহাত খান, জুবাইদা গুলশান আরা, আবদুল হাই শিকদার, সেলিনা হোসেন, ফরিদুর রেজা সাগর, মোশাররফ হোসেন খান, সাজজাদ হোসাইন খান, আসাদ বিন হাফিজ প্রমূখ।
তিন.
বাংলা শিশুসাহিত্যের একজন আলোকিত অভিযাত্রী আবুল হোসেন আজাদ (জন্ম ০৪ জুলাই, ১৯৫৫)। তাঁর শিশুসাহিত্য প্রসঙ্গ আমাদের আলোচ্য বিষয়। লেখকের প্রথম প্রকাশিত শিশুতোষ রচনা ‘ঈদুল ফিতর’ যা ১৯৬৭ সালে সাপ্তাহিক পাক জমহুরিয়াত পত্রিকার ঈদসংখ্যায় প্রকাশ পায়। আর লেখকের প্রকাশিত প্রথম শিশুতোষ বই ‘তেঁতুল গাছে ভূতের নাচ’ যেটা ২০০৬ সালে ঢাকার প্রতিভা প্রকাশন থেকে প্রকাশ পায়। ২০০৬-২০১৮ এই এক যুগের মধ্যে তাঁর প্রকাশিত শিশুতোষ বইয়ের সংখ্যা ৯টি। এগুলি যথাক্রমে-(১) তেঁতুল গাছে ভূতের নাচ (২০০৬), (২) সূয্যিমামা মেঘের ভাঁজে (২০০৭), (৩) রেলগাড়ি রেলগাড়ি (২০০৯), (৪) মারিয়াঙের যাদুর তুলি (২০০৯), (৫) নীল আকাশের সমুদ্দুরে (২০১১), (৬) খোকন ফেরেনি (২০১১), (৭) টাপুর টুপুর ছুটির দুপুর (২০১৬), (৮) চালতা বাদুড় (২০১৬), (৯) বাদাবনের বাঘ (২০১৮)। মারিয়াঙের যাদুর তুলি এবং খোকন ফেরেনি -বই দু’খানি গল্পের বই, অন্যগুলো ছড়ার।
শিশুমনে আনন্দের সঞ্চার করা শিশুসাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিষয়টি মাথায় নিয়েই লেখক শিশুদের জন্য আনন্দদায়ক অসংখ্য ছড়া লিখেছেন। ‘তেঁতুল গাছে ভূতের নাচ’-বইয়ের পাখির বাসা, বৌ চলেছে বাপের বাড়ি, খাজা, পাখি, ফড়িং, মশা আর মাছি, কাঠবিড়ালি, বৌ কথা কও, ব্যাঙের সর্দি, মাছরাঙ্গা, তেঁতুল গাছে ভূতের নাচ এবং ‘রেলগাড়ি রেলগাড়ি’ বইয়েরÑ দইয়ের হাঁড়ি, খুকু, শুভ বিয়ে, ব্যাঙ চলেছে, বাঘ ও মোষ, টুনটুনি ইত্যাদি এ ধরনের ছড়ার উদাহরণ। দইয়ের হাঁড়ি-ছড়াটি এখানে উল্লেখযোগ্য-
কমলাপুর ইস্টিশান/ লোকটা কেনে মিষ্টি পান
গাদাগাদি ভিড়টা ঠেলে/কষ্ট করে উঠলো রেলে
যাবে কোথায় কত দূর/ অনেকটা পথ দিনাজপুর।
দিনাজপুরে মামুর বাড়ি/ যাচ্ছে নিয়ে দইয়ের হাঁড়ি
নামতে হঠাৎ পায়ের গুতোয়/হাঁড়ি ভেঙে দই যে জুতোয়
লোকটা যে তাই বুদ্ধি এঁটে/ খেতে থাকে জুতো চেটে।
শিশুতোষ ছড়া বা কিশোর কবিতায় কবিকে হতে হয় একই সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত ও ছান্দসিক। বিষয়বন্তু যত কঠিনই হোক ছড়ার জগৎ শেষ পর্যন্ত শিশুর মনোজগতের ভেতরেরই পৃথিবী। শিশুরা গল্প শুনতে বেশ ভালোবাসে। তাই ছোট ছোট ঘটনা বা গল্পকে যদি ছড়ায় রূপায়ণ করা যায় সেক্ষেত্রে শিশুমনে আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ হয়। লেখকের ‘চালতা বাদুড়’ বইয়ে এ রকম কিছু ছড়া রয়েছে। যেমন- বাঘ ও সিংহের লড়াই, কাক ও কোকিল, টিয়ের ছানা, গোলপাতা ইত্যাদি। এক কলকাতাইয়া বাবুর সুন্দরবনে গোলপাতা দেখার গল্পটির শেষাংশ এ রকম-
দেখেন বনে ঘুরে ফিরে/ বাইন হেতাল গরানও
কেওড়া ডালে বানর দেখে/ জুড়ায় যে তার পরানও।
দেখেন পাখি মদনটাকও / চোখে চশমা লাগিয়ে
হঠাৎ দেখেন সামনে যে তার/ বাঘ আছে এক বাগিয়ে
চিৎকার করে দৌড়টা দিয়ে/বাঁচাও মাঝি তুমিরে
এই বলে ঝাঁপ দিলে গাঙে/ ছুটে এলো কুমিরে।
সাঁতরে মাঝি তুলে আনে/নদীর পাড়ে ডাঙাতে
হাবুডুবু খেয়ে বাবু/ থাকেন শুধু গোঙাতে।
শিশুমন কল্পনাপ্রবণ। শিশুতোষ লেখকগণকেও তাই শিশুর মতো ভাবতে হয়। লেখক আবুল হোসেন আজাদ তাইতো কল্পনার পাখায় ভর করে কখনো পুকুর জলে শাপলা হয়ে, ফুলের মাঝে ভ্রমর হয়ে, মাঝি হয়ে নদীর ঢেউয়ের সাথে বৈঠা হাতে পাল্লা দেন। আবার কখনো নীলিমার নীলের ফাঁকে, ধূ-ধূ অসীম পাহাড়ের দেশে, রাতের চাঁদে, জোছনার ঢেউয়ে কিংবা আকাশের হাজার তারার হাতছানিতে হারিয়ে যান। ‘বাদাবনের বাঘ’ বইয়ের -মন চায়, যায় হারিয়ে মন এবং ‘নীল আকাশের সমুদ্দুরে’ বইয়ের- পরীর দেশে, পান্না হীরে মোতি, আমার খুশি, কতনা সাধ, মনের জানালা ধরে ইত্যাদি ছড়ায় লেখক নিজেই শিশু হয়ে উঠেছেন। নীল আকাশের সমুদ্দুরে- ছড়াটির অংশবিশেষ এখানে উল্লেখযোগ্য-
নীল আকাশের সমুদ্দুরে/ আবার রাতের চাঁদে
মন ছুটে যায় জোছনা ঢেউয়ে/ তখন নির্বিবাদে।
আকাশ জুড়ে দেখি হাজার/ তারার ফুলের মাঠে
স্বúœ আমার জরির পরী/ নূপুর পরে হাটে।
জ্ঞানের অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম লক্ষ্য। কোমলমতি শিশুদের জ্ঞান ও শিক্ষার বিকাশে, তাঁদের অনুসন্ধিৎসু মনের খোরাক জোগাতে ছড়ার মাধ্যমে ভূমিকা রেখেছেন লেখক। তাঁর ‘সুন্দরবনে’ শীর্ষক ছড়ায় বনের পশু-পাখি ও গাছ-পালার তথ্যচিত্র উঠে এসেছে সহজ ও নিপুণভাবে-
সুন্দরবনে কী কী আছে/ রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে
হরিণ বানর শূকর আছে/ কেওড়া ডালে কেওড়া আছে।
সুন্দরবনে আর কী আছে/ গোলপাতা গাছ গরান আছে
বাইন হেতাল গেওয়া আছে/ নদীর জলে কুমির আছে।
নজরুল ইসলাম বাংলাভাষা ও বাংলাদেশের জাতীয় কবি। নানাবিধ বিশেষণে বিভূষিত এই সাহিত্যিক দেশ বিভাগ-পূর্ব কলকাতা পর্বে বাংলা শিশুসাহিত্যে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। আমাদের জন্য তিনি অনুকরণযোগ্য ও অনুসরণযোগ্য এক প্রিয় কবি। হ্যাঁ, ‘প্রিয় কবি নজরুল’ শিরোনামের ছড়ায় আবুল হোসেন আজাদ লিখেছেন-
আমাদের হৃদয়েতে / ফুটে আছে কোন ফুল
সেই ফুল সুরভিত / প্রিয় কবি নজরুল।
আবুল হোসেন আজাদ কাজী নজরুল ইসলাম-এর সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁর ‘ভোর হলো মা’ কবিতায় নজরুলিয়ানা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। ‘কাঠাবিড়ালি ছানা’ ছড়ায় নজরুল ইসলামের কাঠবিড়ালী’র প্রভাব রয়েছে। তাঁর ‘প্রজাপতি’ ছড়াটি যেন কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রজাপতি’ ছড়াটির ২য় পর্ব। আর ‘চালতা বাদুড়’ ছড়াটিতে নজরুলিয়ানা আরো বেশি পরিষ্কার হয়ে উঠেছে-
পাকা ডাসা রসালো সব/ ফলগুলোরে পাও
পটপট করে অমনি তুমি/ মজা লুটে খাও।
সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়েই একজন সাহিত্যিকের লেখকসত্তা ফুটে ওঠে। লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব এবং আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটে। আবুল হোসেন আজাদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। সমাজের যত কালো ও অন্ধকার দূরীভূত হয়ে আলোকিত সুন্দর সকাল-ই যাঁর প্রত্যাশা । সঙ্গত কারণেই ‘ভোর’ শব্দটি অনিবার্য প্রত্যয় হিসেবে তাঁর লেখায় বার বার ব্যবহৃত হয়েছে। ‘বাদাবনের বাঘ’ বইয়ের- ভোর, রাত নেমে আসে, ভোরের পাখি, ছানা প্রজাপতি, পাখি ডাকা ভোর এবং ‘তেঁতুল গাছে ভূতের নাচ’- বইয়ের রূপময় রাত, টাপুর টুপুর, ভোর হলো মা, ভোরের পাখির গান, আর ‘টাপুর টুপুর ছুটির দুপুর’ বইয়ের জোনাক জ্বলে, ঘুম নেই, শরতে, আমি গাঁয়ের ছেলে, ভোর হলো মা- ছড়াগুলো এখানে উল্লেখ্য। ‘রূপময় রাত’ ছড়ায় বাতাসের মাধ্যমে জোছনার কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন-
এই রাত শেষ হয়ে/ হবে রাঙা ভোর
দূর হবে অমানিশা/ খুলে যাবে দোর।
চার.
শিশুসাহিত্যের প্রকরণসমূহের মধ্যে গল্প অন্যতম। গল্প শুনতে কে না ভালোবাসে? শিশুরা তো গল্প শুনার জন্য বায়না ধরে। গল্পের বিষয়বস্তু শিশু মনে দাগ কাটে এবং এর শিখন স্থায়ী হয়। আবুল হোসেন আজাদ-এঁর লেখা শিশুতোষ গল্পের বইয়ের সংখ্যা-২টি। প্রকাশিত প্রথম গল্পের বই ‘মারিয়াঙের যাদুর তুলি’ (২০০৯)। বইটি দেশি-বিদেশি লোককাহিনি ও রূপকথা অবলম্বনে লেখা ১০টি গল্পে সমৃদ্ধ। ঘুমপুরি ও সিনড্রেলা গল্প দু’টি ইউরোপীয় রূপকথা অবলম্বনে এবং জিনাং ও তার বন্ধু, মারিয়াঙের যাদুর তুলি, ছোট্ট পাখি চন্দনা- গল্প ক’টি চীনা রূপকথা অবলম্বনে লেখা। অন্যদিকে দেশীয় লোককাহিনিকে উপজীব্য করে লেখা গল্পগুলো হচ্ছে- কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়, সিংহের মামা ও চিতাবাঘ, ভুতুম ও বাদুড়ের সাধ, বুনোহাঁস ও পোষাহাঁস এবং লোভী বকের পরিণাম। বইয়ের গল্পগুলোকে প্রচলিত লোকগল্পের পুনর্লিখন বা সরলীকরণ বলা যায়। অতএব, বইটি কোনো মৌলিক গল্পের বই নয়।
‘খোকন ফেরেনি’ (২০১১) লেখকের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ। ‘ছোটদের মেলা’ প্রকাশিত এই বইটি ৬টি মাত্র গল্পের সমাহার। শিরোনামযুক্ত গল্পটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক। গল্পটির সারসংক্ষেপ হলো- একাত্তরের মার্চ মাসে কাউকে কিছু না বলে স্কুলশিক্ষক হামিদ সাহেবের স্কুলপড়ুয়া ছাত্র খোকন মুক্তিযুদ্ধে যায়। সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিকে এক রাতে খোকন নিজ গ্রাম হাড়দহে আসে। খোকনকে পেয়ে মা জড়িয়ে ধরে কাঁদেন, বাবার চোখেও পানি। সে রাতেই গুড় দিয়ে পানি মেশানো ভাত খেয়ে খোকন বিদায় নেয়। সীমান্তবর্তী ভাতশালা যুদ্ধে পাক-সেনাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে খোকন শহিদ হয়। দেশ স্বাধীনের পর ডিসেম্বর মাস এলেই শহিদ পিতার মনে পড়ে যায় পুত্র খোকনের কথা, আর ভারাক্রান্ত হৃদয়েও গর্বে তাঁর বুকটা ফুলে ওঠে।
‘খোকন ফেরেনি’ একটি জীবন্ত গল্প, যাকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পের তালিকায় একটি শ্রেষ্ঠ গল্প বলা যায়। বইয়ের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অন্য গল্পটি হলো ‘মুক্তিযোদ্ধা সবুজ’। আর ‘এলো খুশির ঈদ’ গল্পটি লেখকের মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ভাবনায় বিনির্মিত। এ ছাড়া- মমতা, দোয়েল, টুনটুনির বাসা- গল্পগুলোয় প্রাণিকুলের প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা ফুটে উঠেছে। সব মিলিয়ে বইখানি সুপাঠ্য, শিক্ষণীয় এবং আদর্শ শিশুতোষ গল্পের বই হয়ে উঠেছে।
পাঁচ.
আবুল হোসেন আজাদ একজন প্রতিভাবান শিশুসাহিত্যিক। বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদ সাতক্ষীরা থেকে তিনি রাজধানী তথা ঢাকা-কেন্দ্র্রের গুরুত্বপূর্ণ শিশুতোষ পত্রিকায় লিখে চলেছেন নিরন্তর। গল্প ও কিশোর কবিতায় তিনি সিদ্ধহস্ত। তদুপরি উপন্যাস, জীবনী , নাটক, ইতিহাস-ঐতিহ্য ইত্যাদি শিশুসাহিত্যের অন্যান্য শাখায় যদি তিনি লিখতেন তবে আমাদের শিশুসাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হতো। যাইহোক, বাংলাভাষা ও সাহিত্যের গবেষক ও প্রাবন্ধিকগণ তাদের আলোচনায় যদিও সচেতনভাবে শিশুসাহিত্য ও শিশুসাহিত্যিকদের এড়িয়ে যান তথাপি আবুল হোসেন আজাদের মতো শিশুসাহিত্যিকগণ বাংলাসাহিত্যের সম্পদ, আমাদের গর্বের ধন।