কথাশিল্পী শওকত ওসমান বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে একজন সমাজসচেতন ও রাজনীতিসচেতন ঔপন্যাসিক হিসেবে জায়গা দখল করে নিয়েছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা কলেজের খ্যাতিমান অধ্যাপক শওকত ওসমান স্বদেশ ছেড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নেন। অতঃপর তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন এবং নিয়মিত কথিকা পাঠ শুরু করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর পঠিত কথিকাগুলোর মধ্যে ‘ইয়াহিয়া জবাব দাও, প্রথম সওয়াল, ইয়াহিয়া জবাব দাও, দ্বিতীয় সওয়াল, দেশবাসী সমীপে নিবেদন’Ñ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান চারটি উপন্যাস রচনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তার উপন্যাস চারটি হচ্ছে যথাক্রমে- ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’, ‘নেকড়ে অরণ্য’, ‘দুই সৈনিক’ ও ‘জলাংগী’।
শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম উপন্যাস ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগরে বসে লেখক এই উপন্যাসটি রচনা করেন। পশ্চিমবঙ্গের ‘দেশ’ পত্রিকার পূজা সংখ্যায় সেই বছরই এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। লেখক তাঁর উপন্যাসটি “দুঃখিনী জননী বাংলাদেশ ও তার বীর সন্তান মুক্তিফৌজদের উদ্দেশ্যে”- উৎসর্গ করেছেন।
কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ উপন্যাসে প্রধান চরিত্র গাজী রহমানের মানসলোক উন্মোচিত হতে দেখি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী যখন সারা দেশে অকথ্য নির্যাতন শুরু করে তখন লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র গাজী রহমান একজন স্কুলশিক্ষক। তিনি কোনো রাজনীতি করেন না, শিক্ষকতা করেন। কিন্তু তাকেও সেই ভয়াবহ দিনে আত্মগোপন করতে হয়েছে। কারণ সকলের মুখে এক কথা “তোমার প্রাণ সংশয়াপন্ন, অতএব নিরাপদ কোথাও চলে যাও।”
“অস্তিত্ব রক্ষার আদিম একটা তাগিদ”- গাজী রহমান মনেপ্রাণে অনুভব করেছে। জীবনের নিরাপত্তার জন্য তিনি তার পুরনো ছাত্র ইউসুফের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সে বাড়িতেও শোকের ছায়া। কারণ- “ইউসুফের বৌ সখিনার ভাই খালেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। দেড় মাস তার কোনো খোঁজ নেই।” গত দেড় মাসে বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে আর্তনাদ আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সখিনাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য গাজী রহমান মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন- “সখিনা মা, খালেদ মুক্তিফৌজে যোগ দিয়েছে।” ইউসুফ চাকরি করত এক সওদাগরি অফিসে। কিন্তু তার অফিস দেড় মাস ধরে খুলছে না। আর কোনোদিন খোলার সম্ভাবনা আছে কিনা কে জানে। ঔপন্যাসিকের ভাষায়- “শহরের রোজগার আর গ্রামে জমিজিরাতের আয় মিলিয়ে ইউসুফ এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তা ভোগ করত। আজ সেখানে চিড় ধরেছে। তার ওপর খালেদের মৃত্যু তাকে স্পর্শ করেছে বৈকি। অতিশ্রদ্ধেয় শিক্ষক কিছু মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে যদি তাদের পরিবারিক জীবনে সামান্য সহজভাব এনে দিতে পারেন, অপরাধ কোথায়।” কিন্তু গাজী রহমানের মনে প্রশ্ন জাগেÑ “একদিন তো দিনের আলোর মত সব প্রকাশ হয়ে পড়বে, তখন আঘাত সইতে পারবে স্নেহার্দ্র এই কচি প্রাণ?”
প্রায়ই গাজী রহমান নিসঙ্গতায় ভোগে। নিসঙ্গ মুহূর্তে তার মনে পড়ে উত্তরষাটের এক বৃদ্ধের কথা। গাজী রহমান “শুনতে পেত সেই বৃদ্ধের কান্না, যাকে বালকের মত এক পক্ষ কাল আগে নৌকার ওপর দশ বারো জন কচিকিশোর এবং বৃদ্ধ যাত্রীর সামনে সে কাঁদতে দেখেছে।” সেই বৃদ্ধের জবানিতে শোনা যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে বাংলাদেশের কিছু খণ্ড চিত্র-
আট দশ জন মিলিটারি হইব। হগ্গলের হাতে মেশিন গান। আমরা বিশ-তিরিশ জন। আমাদের কইল, চলো। হাঁটতে থাকি। … হাঁইটা আইলাম নরসিংদী বাজার। একডা মানুষ নাই বাজারে। হব পালাইছে। ক্যামতে থাকবো এই জল্লাদগো সামনে? এগুলা মানুষের আওলাদ না। রাস্তার ধারে দেখছি দুই বছরের ছাওয়াল পইডা আছে গ্যা। কাউয়া ঠোকর দিতাছে লাশের চোখে।…
পাকিস্তানি মিলিটারিদের অস্ত্রের মুখে ভীত সন্ত্রস্ত লোকগুলো বাজারের দোকানগুলো থেকে লুট করতে বাধ্য হয়-
লুট শুরু করলাম। হালারা টাকাকাড়ি সোনাচাঁদি হব লইল। আমাগো কয়-মাল লে যাও। – – – হেরা টাকাকাড়ি সোনাচাঁদি লয়, আমরা মাল। – – – আমাগো মুজিবর রহমান যে কইছে, পশ্চিম পাকিস্তান গোস্ত খায় আমরা তার হাড় চুষি। একদম হাঁচা কথা। . . . আমরা লুড করি, হেরা হেরা আবার ফডো তোলো। ফডো তোলে ক্যান?” বৃদ্ধের এই প্রশ্নের জবাবে বিশ^বিদ্যালয়ের এক ছেলে বলেছেÑ “কারণ, দুনিয়াকে দেখাবে বাঙালিরা লুট করে আর পাঞ্জাবিরা শান্তি বজায় রাখে।
এই বৃদ্ধের জবানীতে ফুটে উঠেছে পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য ট্রাজিক হাহাকার-
জোয়ান কালে কতো খোওয়াব দ্যাখছি, পাকিস্তান হইব, মানুষ হইতা পারব হগ্গলে। কত খাড্ছি, ভোট দিছি। পাকিস্তান হইল। কতো রিফিউজি আইল। তাগোর জায়গা দিছি, খাওয়াইছি . . . হেরাও শুনি অহন মিলিটারিগো লগে।
আজীবন রবীন্দ্রভক্ত গাজী রহমান বিপন্ন অস্তিত্বের কথা ভেবে সর্বদা উদ্বিগ্ন, দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জর্জরিত। তার অন্তর থেকে উৎসারিত হয় রবীন্দ্রনাথের বাণী- “হেথা নয় হেথা নয় অন্য কোনখানে।”Ñ নিরাপত্তা কোথায় আছে, পাঞ্জাবি পশুর দল যেখানে সারা বাংলাদেশে হায়েনার মত ছুটে বেড়াচ্ছে সেখানে নিরাপত্তার আশা করা যেন এক ধরনের বাতুলতা। গাজী রহমানের হৃদয় দ্বিধাদ্বন্দ্বে জর্জরিত-
পরিত্রাণের আশায় হন্যে হওয়া তার কাছে এক ধরনের কাপুরুষতা। কোটি কোটি নর-নারী, শিশু কিশোর বৃদ্ধ আছে না বাংলাদেশে? সকলে যদি নিরাপত্তার খোঁজে বিবাগী হয়, জালেমের মুখোমুখি কে রুখে উঠবে? অবশ্যি সংসারে আবার সকলে যোদ্ধা নয়। তা হওয়াও অনুচিত। চাষি লাঙল ছেড়ে দিলে বিনা আহারে কী দিয়ে গেরিলারা লড়বে?
উৎকণ্ঠায় আর অস্থিরতায় গাজী রহমান দীর্ঘদিন অনিদ্রায় ভুগছেন। নিজের বিপন্ন অস্তিত্বের পাশাপাশি হাজার হাজার বাঙালি নর-নারীর অস্তিত্বের কথা- তাকে ভাবিয়ে তোলে। চারপাশে পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচার নিপীড়ন তাকে দংশন করে। কী করে তার চোখে নিদ্রা আসবে- “মানুষের খণ্ড খণ্ড কুঁচি যেন জ্যোতিরিঙ্গন- বাহিনীর যাযাবরপনার মত বাংলাদেশের চারিদিকে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। চোখের অংশ হাত-পায়ের খণ্ড, স্তন-ঊরুর ভাগ, বুকের টুকরো…। তাই চোখের রেহাই নেই।” গাজী রহমান এক সময় ইউসুফের আশ্রয় ছেড়ে দিয়ে রেজা আলীর বাড়িতে আশ্রয় নেয়। রেজা আলী প্রবীণ উকিলÑ তারও নিদ্রাহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে- “বাইরে থেকে শব্দ এল উৎকর্ণ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কারণ শব্দভেদী বাণের প্রাচুর্য এখন বাংলাদেশ পৌরাণিক যুগকে ছাড়িয়ে গেছে।” রেজা আলীর বাড়িতে কমিউনিস্ট নেতা কিরণ রায়ের সাথে গাজী রহমানের দেখা হয়। কিরণ রায় কৈশোরে-যৌবনে ছিলেন সন্ত্রাসবাদী, জেলখানায় সাম্যবাদের হাতেখড়ি, পরে তিনি যোগ দেন ন্যাশনাল আওয়ামী লীগে।
শওকত ওসমানের ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ উপন্যাসে মূলত মুক্তিযুদ্ধের আবেগ ও চেতনা সঞ্চারিত হয়েছেÑ মুক্তিযুদ্ধের কয়েকটি খণ্ডচিত্রের মাধ্যমে। সরাসরি বা সামনাসামনি কোনো যুদ্ধের বিবরণ এই গ্রন্থে আমরা পাই না। তবে আলম নামক এক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার চরিত্র এই উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে। তার জবানিতে আমরা জানতে পারি দলছুট কিছু হানাদার সৈনিককে গ্রামবাসী দেখে ফেলে এবং পরে তাদেরকে মেরে ফেলে। একজন মৃত সৈনিকের পকেট থেকে প্রাপ্ত চিঠির ভিত্তিতে যুদ্ধ সম্পর্কে সাধারণ সৈনিকের ধারণা বা মনোভাব উপলব্ধি করা যায়। সৈনিকের চিঠিতে লেখা আছে- “এখানে আসার আগে শুনেছিলাম, বাঙালিরা মুসলমান নয়। তাহারা হিন্দুদের সহিত বসবাস করিয়া হিন্দু হইয়া গিয়েছে। তাই পাকিস্তান চায় না। কিন্তু এখানেও দেখিতেছি মসজিদ আছে। আজান দেয়। লোকে নামাজ পড়ে। তাই বড় তাজ্জব লাগে।” মূলত সাধারণ সৈনিকদেরকে যে ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়েছে তা এই চিঠি থেকে উপলব্ধি করা যায়। গাজী রহমান মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে- বাংলাদেশ এখন এক যমালয়- হানাদার বাহিনীর সৃষ্ট জাহান্নাম। এই জাহান্নাম থেকে কবে তার পরিত্রাণ ঘটবে- কবে মুক্তি পাবে বাংলাদেশ জল্লাদদের হাত থেকেÑ এইসব তার ভাবনার বিষয়। স্বদেশে বাস করা নিরাপদ নয় বলেই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়- স্বদেশ ত্যাগের। সীমান্ত পার হয়ে ওপারে গেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া সম্ভব। সৈয়দ আলীর সহায়তায় গাজী রহমানের স্বদেশ ত্যাগের মাধ্যমে এই উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে। জন্মভূমি ত্যাগের আগে গাজী রহমান সখিনার কাছে যে চিঠি দিয়েছেন তাতে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে তার চিন্তাচেতনার বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়-
অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারে শুধু বীর পুরুষেরা। মুক্তিফৌজের ব্রত তাই কঠিন। এমন কঠিন সাধনা গ্রহণ করিয়াছে আমাদের নয়নমণি মুক্তিফৌজবৃন্দ। এই বীরদল সমানুষ হওয়ার পথ সৃষ্টি করিতেছে … মুক্তিফৌজের কীর্তি যুগ যুগ ইতিহাসের বুকে ধ্বনিত হইবে। তুমি কথাটা বুঝিতে পারিবে কিনা জানি না, তবু লিখিলাম। মুক্তিফৌজ বাংলাদেশের বুকের নিশান, মানুষকে চিরদিন সঠিক পথের ইশারা জানাইবে …।
মূলত এই উপন্যাসে হানাদার বাহিনীর খণ্ড খণ্ড অত্যাচার-নিপীড়নের চিত্র থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের চিত্র এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনা নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সাধারণ বাঙালির ও বিভিন্ন পেশাজীবীর মানসিকতা, পাকিস্তানি সৈনিকদের প্রতি ঘৃণা এবং সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার স্পৃহা শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে।
কথাশিল্পী শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দ্বিতীয় উপন্যাস ‘নেকড়ে অরণ্য’ (১৯৭৩)। ‘নেকড়ে অরণ্য’ উপন্যাসটি ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান “শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সৈনিকদের আত্মার উদ্দেশ্যে, যাদের আত্মত্যাগ ছাড়া ‘নেকড়ে অরণ্য’ থেকে মুক্তি সুদূর পরাহত ছিল।”- তাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এদেশের অসংখ্য মা বোনের ওপর হানাদার বাহিনী যে অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছিল তারই বিবরণ রয়েছে এ উপন্যাসে।
লেখক প্রথমেই একটি গুদাম ঘরের বিবরণ দিয়েছেন। এই গুদাম ঘরের আলো-আঁধারিতে বন্দি নারীরা এক দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। এই অন্ধকার ঘরে বন্দি তানিমা, জায়েদা, সখিনা, রাশিদা, আমোদিনী প্রমুখ নারীদের পরিচয় লেখক তুলে ধরেছেন। বাইরের কোনো শব্দ হলেই বন্দিনারীরা সচকিত হয়ে ওঠে। কখনো আবার অন্ধকারে নিমজ্জিত এই নারীরা আশায় বুক বাঁধে এই ভেবে যে, এই শব্দ হয়তো বা কোনো মুক্তিযোদ্ধার রাইফেলের গুলির শব্দ। লেখকের ভাষায়Ñ ‘এই শব্দের জন্যেই তো বেঁচে আছি। তখনই মাথা ঠিক হয়। পরশু দিন যে চাষি বৌ এসেছে, সেই বললে মুক্তিবাহিনী চারদিকে প্রতিরোধ শুরু করেছে। তাদেরও মেশিনগান আরো অন্য অস্ত্রশস্ত্র আছে।’ এই অন্ধকার গুদাম ঘরের ভেতর বন্দি মুক্তিযোদ্ধা উজির আলীকে প্রেরণ করা হয়। বন্দি নারীরা প্রথমে উজির আলীকে মেনে নিতে পারে না। কারণ হানাদার বাহিনীর নির্যাতনে তারা সমস্ত পুরুষ জাতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু যখন তারা বুঝতে পারে যে, উজির আলী এদেশকে স্বাধীন করার জন্য লড়াই করছে এবং তাদের মত শত শত মা বোনকে জালিমদের হাত থেকে রক্ষার জন্য লড়াই করছে; তখন তারা আশায় বুক বাঁধে। উজির আলী যে একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা তা তার বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়-
আমি স্টেনগান দিয়ে তিনটে পশ্চিম পাকিস্তানি জানওয়ার এ পর্যন্ত মেরেছি। আমার কোনো আফশোস নেই। আফশোস খামাখা ভুল করে ধরা পড়ে গেলাম। আফশোস আমি জানতাম না, মা-বোনদের ওরা পশুর মতো বেইজ্জত করে। তবে খবর চাপা থাকবে না। আমাদের প্রতিজ্ঞা আরো শক্ত হবে।
মূলত ‘নেকড়ে অরণ্য’ উপন্যাসে বাঙালি নারীদের ওপর পাকিস্তানি হানাদারদের পাশবিক অত্যাচারের চিত্র ফুটে উঠেছে এবং সেই সাথে বাঙালি নারীদের ভেতর দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্পৃহা জাগ্রত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধনির্ভর অধিকাংশ বাংলা উপন্যাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধের খণ্ড খণ্ড চিত্র পাই। কথাশিল্পী শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। মুক্তিযুদ্ধনির্ভির তার তৃতীয় উপন্যাস ‘দুই সৈনিক’ (১৯৭৩)। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মখদুম মৃধা। তাকে কেন্দ্র করেই কাহিনি এগিয়ে গেছে। মখদুম মৃধাকে ঔপন্যাসিক সুবিধাবাদী শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে অঙ্কন করেছেন। তিনি আইয়ুব খানের আমলে মৌলিক গণতন্ত্রী চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি পাকিস্তানের সমর্থক, আইয়ুব সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। কিন্তু যখন দেখলেন আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সত্তরের নির্বাচনে জয় লাভ করেছে তখন নিজের চেহারা বদলে ফেলেন। লেখকের ভাষায়-
হুঁশিয়ার ব্যক্তি মখদুদ মৃধা। সত্তর সনের নির্বাচনের সময় সে কোন পক্ষে ভোট দিয়েছিল জানা যায় না। তবে আওয়ামী লীগ নিরংকুশ মেজরিটি পাওয়ার পর সে স্থান বুঝে উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠত। হ্যাঁ মুজিব একজন বাপের ব্যাটা, এবার মিলিটারিদের দেখিয়ে দিল বটে।
২৫ শে মার্চের পূর্ব পর্যন্ত বাঙালিদের আন্দোলনের জোয়ার দেখে আতঙ্কিত ছিলো মখদুম মৃধা। কিন্তু ২৫ শে মার্চের রাত্রিতে হানাদার বাহিনী যখন নিরীহ বাঙালিদের ওপর গুলি চালিয়েছে, তখন তার বক্তব্য হচ্ছে-
এই আওয়ামী লীগারগুলো কি কুদোকুদি না শুরু করেছিল। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ এখন দ্যাখো ভালোবাসা মার্গে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ঠ্যালার নাম কয় বাবাজি। আর যে সে গুঁতো নয়, একদম পাঞ্জাবি মিলিটারি। পঁচিশে মার্চ। ও আল্লারে আল্লা। তুমি ঠিক কইরা দিছলে, মাবুদ। অহন আর ‘জয়বাংলা, জয়বাংলা’ কোন খানকির পুতের মুখে শুনি না।
এই হচ্ছে পাকিস্তানের দালাল মখদুম মৃধার আসল রূপ। হানাদার বাহিনী যখন নিরীহ বাঙালি নিধনে লিপ্ত, তখন সেই বাহিনীর প্রতি ঘৃণা দূরে থাকুক, একেবারে ভালোবাসা উপচে পড়েছে। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী সম্পর্কে তার ধারণা হলো- “আল্লাহ্র ইচ্ছা তিনি পাকিস্তান রক্ষা করবেন। তাই তিনি ফেরেশতা পাঠিয়েছেন। এই মিলিটারিরা সাধারণ সিপাই নয়। ওরা আল্লার ফেরেশতা।” মখদুম মৃধার সহযোগী আরেকটি চরিত্র হচ্ছে সয়ীদ মাতব্বর। গ্রামের সাধারণ মানুষ যখন হানাদার বাহিনীকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন মখদুম মৃধা জেলাবোর্ডের রাস্তা দিয়ে গমনরত দুইজন সামরিক অফিসার ও একদল সৈন্যকে আমন্ত্রণ করে বাড়িতে নিয়ে আসে। রাতে মেজর হাকিম ও ক্যাপ্টেন ফৈয়াজ মদ্যপান করে এবং মৃধার দুইকন্যা চামেলী ও সাহেলীকে বিয়ে করতে চায়। চামেলী ও সাহেলী শহরে থেকে লেখাপড়া শিখছে। তারা আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সম্পর্কে সচেতন। সামরিক অফিসারদ্বয়ের এই প্রস্তাব মখদুম মৃধার মতো পাকিস্তানের সমর্থকও প্রত্যাখ্যান করে। ফলে মখদুম মৃধাকে অস্ত্রের মুখে গ্রেফতার করে সৈনিকেরা তার বাড়িতে লুটপাট চালায়। মৃধা যখন এমন বিপদের মধ্যে পড়ে তখন তার সহযোগী সয়ীদ মাতব্বর সেখান থেকে পালিয়ে যায়। তার পালিয়ে যাবার দৃশ্যটির সাথে তার চরিত্রের চমৎকার সাদৃশ্য রয়েছে।
সে সুড় সুড় করে অন্ধকারে এগিয়ে যেতে লাগল। হঠাৎ একটা বেড়া পড়লো সামনে। বেড়া থাকার কথা নয়। সেটা পার হতে গিয়ে তার এক পাটি চটি আটকে কোথায় যেন পড়ে গেল। মাতব্বর কান খাড়া করে শোনে মৃধার অন্দরে গোলমাল হচ্ছে। সে আর চটির মায়া করার বান্দা নয়। সে এক পায়ে চটিসহ দৌড়াতে লাগল। বৌ পেছনে পড়ে রইলো। তা থাক। বুড়ি বৌ। তার ভয় থাকার কথা নয়।
পাকিস্তানের সামরিক অফিসারদ্বয় শেষ পর্যন্ত মৃধার কন্যাদ্বয়কে তুলে নিয়ে সম্ভ্রম হরণ করে। মৃধা অপমানে-লজ্জায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। মূলত কথাশিল্পী শওকত ওসমান পাকিস্তানের এদেশীয় দালাল এবং হানাদার বাহিনীর চরিত্র ‘দুই সৈনিক’ উপন্যাসে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর হাতে পাকিস্তানের সমর্থক কিংবা দালালের এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও যে অত্যাচারিত হয়েছে- তারই চিত্র এ উপন্যাসে ফুটে উঠেছে।
এই উপন্যাসে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের কোনো ঘটনা না থাকলেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা একটি বাঙালি পরিবার নিগৃহীত হওয়ার চিত্র রয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানি সৈন্যদের বাঙালি নারী ধর্ষণ, বাঙালিদের বাড়িঘর লুটপাট ইত্যাদির চিত্র মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র যা এই উপন্যাসে ফুটে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের সামাজিক অপতৎপরতা ও হীনমানসিকতার পরিচয়ও এই উপন্যাসে পাওয়া যায়।
কথাশিল্পী শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধনির্ভর চতুর্থ উপন্যাস ‘জলাঙ্গী’ (১৯৭৬)। লেখকের অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের মতো এ উপন্যাসেও আমরা মুক্তিযুদ্ধের খণ্ড চিত্র পাই। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জামিরালি। সে বাঁকাজোল গ্রামের ছেলে, শহরের কলেজে লেখাপড়া করে। একাত্তরের সেই আন্দোলনের দিনগুলোতে, যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর শাসন আর শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালি সোচ্চার এবং স্বাধীনতার ডাক যখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে তখন জামিরালি শহর ছেড়ে গ্রামে চলে আসে। জামিরালির বাবা ফয়েজ মৃধা ছেলের কাছে জানতে পারে- পাকিস্তানের শাসকচক্রের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছে। স্কুল, কলেজ, অফিস আদালত, কলকারখানা সব বন্ধ রয়েছে। জামিরালির বাবার মনেও রয়েছে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। লেখকের ভাষায়Ñ “চব্বিশ বছর আগে পাকিস্তান হবার সময় সে কত আশা করেছিল। আরো স্বচ্ছন্দ নিশ্চিত জীবন। কিছুই সহজে মেলেনি। যেটুকু পেয়েছে স্রেফ গতরের জোরে। তার একটা বিহিত হওয়া দরকার।” জামিরালির মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা পায়। জামিরালি জানে, যুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধে যোগ দেয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। তার প্রেমিকা হাজেরা। তাকেও সে মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা দেয়। সাধারণ মানুষই যে মুক্তিযুদ্ধের জন্য লড়েছে- তারই একটা নমুনাচিত্র কথাশিল্পী শওকত ওসমান তার ‘জলাংগী’ উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। বাঁকাজোল গ্রামের জামিরালি সকল বাধা, উৎকণ্ঠা অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। যদিও গোপনে সে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল কিন্তু বাঁকাজোল গ্রামে সে খবর পৌঁছতে বেশি দেরি হয়নি। বাংলাদেশের অসংখ্য গ্রামের মত বাঁকাজোল গ্রামও হানাদার বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হলো। তাদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হলো অনেকেই। জামিরের বাবা মাও নিহত হলেন। একদিন যখন জামিরালি গ্রামে ফিরে এলো তখন অনেকই প্রথমে চিনতে পারল না। কিন্তু যখন চিনতে পারলো, তখন-
বুক থেকে আর এক বুকে, যেন জামিরালিকে নিয়ে লুফালুফি চলছে। নাসির মুনশী এক সময় হাক ফুঁকার কেঁদে উঠল, বাজান বুড়া বয়সে এসব দ্যাহনের লাইগা পাকিস্তান হৈছিল? তোমার বাজান। বৃদ্ধ তখন জামিরালির গলা জড়িয়ে ধরে আর ছাড়তে চায় না, কিন্তু জামিরালির চোখ মরুভূমি। স্তব্ধ দাঁড়িয়ে দুই হাত বৃদ্ধের গলায় রেখে বললে, কাঁদেন না, চাচা। কাঁদার সময় না। অহন দাদ নেয়ার সময়। চলেন একটু বাড়িটা দেইখ্যা আসি। এরা আমার সাথী। হগ্গলে মুক্তিফৌজ। মাঝি দুজনও মুক্তিফৌজ। বৈঠা ছাইড়া বন্দুক ধরছে।
জামিরালির বুকে ছিল একদিকে দেশপ্রেম, অন্যদিকে হাজেরার প্রতি ভালোবাসা। সে ছুটে গিয়েছিল হাজেরার সাথে দেখা করার জন্য কাজির চরে। কিন্তু হাজেরার লেখা একটি চিরকুটসহ সে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে। অতঃপর মেজর হাশেমের নির্দেশে জামিরালি ও হাজেরাকে বেঁধে মেঘনার জলে ফেলে দেয়া হয়Ñ
চারজন জওয়ান আসামিদের গলায় যথারীতি পাথর দুটি ঝুলিয়ে দিলো। হাজেরা জামিরালি দুইজনে নীরব। হাত চোখ বাঁধা। পাথরের প্রতিমা উভয়ে। পাটাতনের কিনারায় দাঁড় করানো হলো। মাথার উপরে গোধূলির আকাশ। জল কল্লোল অব্যাহত রয়েছে দিকে দিকে। মেজর হাশেম ইঙ্গিত দিল, শেষ ইঙ্গিত। এক ধাক্কায় দুই আসামি পাটাতনের কিনারায় চ্যুত হলো। তখনই সমস্বরে হাজেরা জামিরালি চিৎকার দিয়ে উঠল, জয়বাংলা। জয় …। অসম্পূর্ণ কথা। কয়েক সেকেন্ড মাত্র। তারপর প্রতিধ্বনি মিলিয়ে গেল রাক্ষুসী মেঘনার গর্জন ক্ষুব্ধ অতলে।
মূলত এভাবেই অগণিত মুক্তিযোদ্ধার আত্মদানের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও মহিমাদীপ্ত। বাঙালির আত্মদান এবং সংগ্রামের সহস্রাব্দ শ্রেষ্ঠ ঘটনা তার মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালির সাহসীচেতনার স্ফুরণ ঘটেছে। বাঙালির আত্মদান, সংগ্রাম, বীরত্ব ও সাহসীচেতনার ফসল তার মুক্তিযুদ্ধ। শওকত ওসমানের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি ঘটনার চেয়ে মুক্তিযুদ্ধের উত্তাপ ও পরিবেশ-পরিস্থিতি বেশি ফুটে উঠেছে।