উনিশ শতকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত মেঘনাদবধ কাব্যের মধ্যে পল্লীর উপাদান ব্যবহার করেছেন। তবে চতুর্দশপদী কবিতাবলীতে বাংলার পল্লী, তার বিচিত্র রূপ এবং পল্লীজীবনের খণ্ডচিত্র তথা চিত্রের আভাস এমন সত্য হয়ে প্রকাশ পেয়েছে যাকে শুধু রোম্যান্টিক তৃষ্ণা হিসেবে মনে করা যায় না। স্মৃতির পথ দিয়েই হোক বা অন্যভাবে আসুক, চিরায়ত বাংলার পল্লী মধুসূদনের চতুর্দশপদীতে বড় বাস্তব, বড় প্রত্যক্ষ। কুটিল গতিতে কেউটে সাপ থেকে শ্যামা পাখি, বটগাছ, কপোতাক্ষ নদ, নদীর তীরের শিব মন্দিরের সারি তাঁর কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বাংলাভাষায় তথাকথিত এই সাহেব কবি যিনি পাশ্চাত্য বিশ্বের অনেকগুলো ভাষায় ছিলেন সুদক্ষ। এ ছাড়াও গ্রিক, ল্যাটিন, ফরাসি সাহিত্যে পারঙ্গম। তিনি স্বদেশের পল্লী প্রসঙ্গকে পরম প্রীতিভরে কাব্যে স্থান দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে মধুসূদনের চতুর্দশপদী কবিতাবলীতে বাংলার পল্লী বিষয়ে রোম্যান্টিক ব্যাকুলতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে এক করে দিয়েছে।
ক্লাসিক্যাল কাব্যের প্রাধান্যের স্থানে যখন রোম্যান্টিক গীতিকবিতার গুরুত্ব বেড়ে যেতে লাগল, তখন স্বভাবতই কবিতায় জাতীয়তা, ঐতিহ্য, গৌরব, অতীতের বীরত্ব ও মহিমার স্থানে প্রকৃতিপ্রীতি দেখা দিতে থাকে। এ দিক থেকে বাংলা কবিতায় বিহারীলাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। শহর জীবনের কৃত্রিমতা থেকে পল্লীজীবনের সরলতার জয়গান তিনি নানাভাবে করেছেন। শহরের প্রকৃতির উন্মুখ উদারতা নেই। অপরদিকে পল্লীপ্রকৃতির সাথে মানুষের নিত্য আত্মীয়তা। বিহারীলাল থেকে এই ভাবে শহরবাসী কবিদের মধ্যে এক ধরনের পল্লীতৃষ্ণা দেখা দিতে থাকে। এর মধ্যে অবশ্য রোম্যান্টিক কল্পনার প্রেরণাই বেশি। শহরের কবি শহর থেকে বেরিয়ে পল্লীর মধ্যে যেতে চাইছেন। ‘সমুদ্র পর্বতে মানস পরিক্রমা করছেন। পল্লীতেও তাঁর তৃষ্ণার্ত মন আশ্রয় খুঁজছে।’
রবীন্দ্রনাথে আবির্ভাবে বাংলাকাব্যে পল্লীপ্রীতির সুর ও গ্রামের প্রকৃতি এবং গ্রামের মানুষের সংস্পর্শের মাত্রা লাভ করে। গ্রামের প্রকৃতি এবং গ্রামের মানুষের সংস্পর্শের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে জীবন দীক্ষা লাভ করেন, তা পরবর্তীকালে নগরে বসবাস করেও তা ম্লান হয়নি। একদিকে পদ্মা অন্যদিকে কোপাই, একদিকে শিলাইদহ, কালিগ্রাম, পতিসর, শাহজাদপুর অন্যদিকে ভুবনডাঙ্গা, বল্লভপুর, সুরুল প্রভৃতি। বাংলার পল্লীর এই বাস্তবতার মধ্যে এই মহান রোম্যান্টিক কবির আজীবন অবস্থান। তার ফলে তাঁর কবিতা ছাড়াও অন্যান্য রচনায় প্রকৃতির ভূমিকা অতি বিস্তৃত।
গান্ধীজির আদর্শবাদী ধ্যান-ধারণা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি সাধারণ প্রভাব এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিল। আরও বেশি ছিল রবীন্দ্রনাথের উদার মানবতাবাদের প্রভাব। সেখানে জীবনকে অস্বীকার করা হয়নি। এই অবস্থায় বাঙালি মননে এবং সাহিত্যে প্রথম মহাযুদ্ধকালীন ইউরোপীয় ধ্যান-ধারণার ফল ফলেনি। কল্লোল পত্রিকাকে কেন্দ্র করে কয়েকজন লেখক বাংলা কবিতায় পশ্চিমের বিশেষকরে ইউরোপের ভাবধারাকে আনার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু তা কার্যকর হতে হতে ত্রিশের দশকের মাঝামঝি সময় লেগে যায়।
গান্ধীজির ভাবাদর্শের মধ্যে ‘গ্রামে ফিরে যাও’, ‘গ্রামের উন্নতি কর’- এ রকম একটা সুর ছিল, আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও পল্লীমুখিতার একটা ভাব ছিল। সে সময় কৃষক সংগঠন যথেষ্ট সবল ও ব্যাপক না হলেও কৃষকদের প্রতি ভদ্র সমাজের মনোভাবের উপরে সাম্যবাদী ভাবনার প্রভাব পড়ে। পল্লী কবিতার পেছনে এই মনোভাবের ভূমিকা কিছুটা লক্ষ করা যায়। বাংলা কবিতায় সবচেয়ে ভারসাম্য আছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়। সাধারণ মানুষকে ভালোবেসে এই কবি পল্লীকে ভালবেসেছেন। কোনও তত্ত্বকে গ্রহণ করেননি। তিনি পল্লী প্রেমকে ফ্যাশন হিসেবে নয় বরং কিছু কবিতায় ব্যক্তিগত গভীর অভিপ্রায়ের সঙ্গে পল্লী প্রকৃতিকে যুক্ত করেছেন। তবে পল্লী বিষয় নিয়ে কবি জসীম উদদীনের ভূমিকা যেমন স্বতন্ত্র তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তি জসীম উদদীনের শিক্ষা সংস্কৃতির নাগরিক পরিচয়টুকু খুলে ফেলে তার ভিতর থেকে এক গ্রামীণ কবির আত্মপ্রকাশ ঘটে। দূর থেকে পল্লীর জন্য ভালোবাসা নয় বরং পল্লী থেকে জাত এবং পল্লীর রূপ ধারণ করে তিনি পল্লীর সাথে একাত্ম। জসীম উদদীনের কাব্যে বাংলার চিরায়ত পল্লী সত্তার সফল উদ্ভাসন ঘটেছে বলা যায়। অনীক মাহমুদের ভাষায় : “নদীমাতৃক এই দেশে বাঙালির কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রার মধ্যে যে সুখ দুঃখের নিরন্তর স্রোত প্রবাহিত, সেই স্রোতধারায় স্নাত স্নেহ, প্রেম, বাৎসল্যে উৎসলীন যেন। নারীরা মূর্ত হয়েছে জসীম উদদীনের কাব্যে।” তা ছাড়া প্রমথনাথ রায় চৌধুরী, করুণা নিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, কালিদাস রায়, প্রমথ চৌধুরী, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, মোহিতলাল মজুমদার, বন্দে আলী মিয়া, ভূজঙ্গরায় চৌধুরী, গোলাম মোস্তফা, কাজী কাদের নেওয়াজ, সুফিয়া কামাল, রওশন ইজদানী, আবদুল হাই মাশরেকী প্রমুখ ছাড়াও আরও অনেক কবি পল্লীকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তবে এদের মধ্যে বন্দে আলী মিয়ার কবিতায় পল্লীর রূপায়ণ অনেক বেশি কার্যকর। অনেক সমালোচক তাঁকে পল্লী কবিতার দিক থেকে কবি জসীম উদদীনের কাতারেই ফেলতে চান। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এভাবে পল্লী কবিদের কাতারে শামিল না হতে পারলেও তাঁর রচনার মধ্যে পল্লী উপাদানের অভাব নেই।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ব্যক্তিজীবনে শহরে বসবাস করেন। চাকরির সুবাদে চিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত অত্যাধুনিক দেশে বসবাস করেন। কিন্তু তারপরেও তাঁর মনন তৈরি ছিল গ্রাম বাংলার প্রকৃতি দিয়ে। আমেরিকায় বসবাস করেও তিনি সেখানের চাকচিক্য বা আভিজাত্য নিয়ে কখনও কবিতা রচনা করেননি। তাঁর মনকে নাড়া দিতে পারেনি শহরের কৃত্রিম আলোর ঝলকানি। তিনি বারংবার ফিরে এসেছেন তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলা মায়ের কোলে। শুধু বাংলা মায়ের কাছে নয় বাংলার পল্লী প্রকৃতির কাছে। যেখানে রয়েছে তিতাস নদী, কুমড়ো গাছ আর তার ফুল, গ্রাম্য মা, শালিক পাখি, শজনে ডাঁটা, ডালের বড়ি, বিন্নি দানের খৈ, নারকেলের চিঁড়ে, উড়কি ধানের মুড়কি, বাঁশের ঝাড়, তালের পাখা, নদীর ওপর নৌকা, কোকিল টিয়ের কলকাকলি।
বাংলা কাব্যজগতে আধুনিকতা শুরুর পর থেকে বিশেষকরে তিরিশের দশকের কবিদের কাব্যজগতে পদচারণা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দেখা গিয়েছে যে তারা আধুনিক মানুষের যুগ যন্ত্রণা আর শহরের ব্যস্ত জীবন নিয়ে ব্যস্ত। চাকচিক্যময় শহর, আলোর ঝলকানি, চোখধাঁধানো চৌরাস্তা নিয়েই কাব্য রচনায় বেশি উৎসাহ বোধ করেন। তাতে আবার যদি কোনও কবি শহরে বসবাস বা আধুনিক পশ্চিমা দেশে বসবাস করেন তাহলে তো কথাই নেই; পুরোপুরি বিদেশি তথা আধুনিক কবি বনে যান। তাঁর লেখায় গ্রামবাংলার নদ নদী বা গ্রামীণ চিত্র খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর। কিন্তু নাড়ির টান যদি বাংলা মায়ের আর তার মাটির দিকে থাকে তাহলে আমেরিকা কেন আরও কোনও চাকচিক্যময় জগতে বসবাস করলেও তার মন বারবার ফিরে আসতে বাধ্য হয় সুজলা সুফলা এই দেশটির প্রতি। যেমন আমরা দেখেছি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে। প্যারিসের আলোর ঝলকানি তাঁর অতৃপ্ত আত্মাকে শান্তি দিতে পারেনি। তিনি সেখানে বসেও শান্তি খুঁজে পেয়েছেন তাঁর ফেলে আসা চাকচিক্যহীন কপোতাক্ষ নদে। ঠিক তেমনি কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আমেরিকার হাওয়াইয়ে থেকেও লিখেছেন বাংলা মায়ের কথা। লিখেছেন গ্রামের কথা। গ্রামের জীবন ছোট ছোট কথায় তাঁর কবিতায় রূপায়িত। এমনকি ভাষা আন্দোলনের কবিতা রচনা করতে গিয়েও তিনি শহরের যুবকের কথা বলেননি, বলেছেন যে অবুঝ মা তার ছেলের জন্য ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছে-
কুমড়ো ফুলে ফুলে/নুয়ে পড়েছে লতাটা/শজনে ডাঁটায়/ভরে গেছে গাছটা।/আর আমি/ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি।
কবি জসীম উদদীন বা বন্দে আলী মিয়া বাংলার প্রকৃতির সাথে তার মানুষের আচরণকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। গ্রামীণ নর-নারীর নিঃশব্দ প্রেমকে তাঁরা নিয়ে এসেছেন কবিতায়। আর কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ শুধু গ্রামীণ পটভূমি আর প্রকৃতির বিচিত্র রূপকেই তুলে ধরেছেন। তাঁর চোখে ধরা পড়েছে গ্রামের নিখাত চিত্র। যেখানে রয়েছে গ্রাম্য খুকুসহ শালিক পাখি প্রভৃতি, যেমন:
একটা শালিক/ঘুলঘুলিতে হঠাৎ এসে/ঘুম ভাঙালো/বোশেখ মাসের আকাশে।/একটু নেচে/জানালা দিয়ে যায় পালিয়ে/অবাক খুশির/গান ছড়িয়ে মন ভরিয়ে।
বৃষ্টির বন্দনা আছে কবির কাব্যে। বৃষ্টির সৌন্দর্যে কবিরা মুগ্ধ। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ গ্রাম্য নদীর উপরের বৃষ্টিকে তুলে এনেছেন তাঁর কবিতায়। গ্রামের নদীর চারপাশের সবুজ বনানী নদীর সৌন্দর্য দ্বিগুণ করে তোলে। শোভা আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। বৃষ্টির বিন্দুর ঝরে যাওয়াকে অনেক কবি তাদের বর্ণনায় হীরের সাথে তুলনা করেছেন। কবিরও কাছে শ্রাবণের বৃষ্টি হীরের কুঁচি মনে হয়েছে। যেন অঝোর ধারায় ঝরে ঝরে পড়ছে হীরের টুকরো। আর ঝরে পড়ার যে শব্দ তা ছড়া কাটার মত মনে হয়েছে লেখকের কাছে-
শ্রাবণে হীরের কুঁচি/ছড়া কাটে/জানালার কাছে।
গ্রামের চিত্র আঁকার ক্ষেত্রে কবি ব্যবহার করেছেন নিতান্ত গ্রাম্য পরিবেশ আর গ্রাম্য প্রচলন। এ ক্ষেত্রে অনেক কবিকে দেখা যায় গ্রামের চিত্র আঁকলেও ঠিক গ্রাম্য লোকজ বিশ্বাসকে তুলে ধরেন না বা এড়িয়ে যান। যার ফলে অনেক সময় কবিদের গ্রামের চিত্র ঠিক গ্রামের হয়ে ওঠে না বা কৃত্রিমতার আবরণ থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন বলা যায়। গ্রামের সাথে একাত্ম হয়েই তিনি গ্রামের চিত্র এঁকেছেন। এর মধ্যেই ঘটনার বাস্তবতা তুলে ধরতে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন গ্রাম্য লোকগাঁথা ও লোকজ বিশ্বাসের উপর-
আকাশে সানাই বাজে/শেয়ালের বিয়ের সাজে/খেয়ালী মেয়ের হাসি/বাঁধ কি মানে।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ মূলত ছড়াকার। ছড়ার মধ্য দিয়ে তাঁর মনের বিচিত্র রঙকে উপস্থাপন করেছেন। মাটির তৈরি গ্রামের বাড়ি কদিন পরে মলিন হয়ে যায়। তখন মাটি গলিয়ে তা লেপতে হয় চকচকে এবং সুন্দর করার জন্য। পরিপাটি বউয়েরা সাধারণত এ কাজ করে থাকে। গ্রামের অতি পরিচিত আরেকটি দৃশ্য শস্যক্ষেত। বিচিত্রভাবে এসব সাধারণ দৃশ্যকে উপস্থাপন করেছেন কবি-
অঘ্রাণ হলুদ পাখি/ক্ষেত্রে পাখা ঝাড়ে/বউ ঝি পরিপাটি/ভিটা লেপে মোছে।
ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ছয় ঋতুর সময় ছয় রকম গ্রাম বাংলার রূপ দেখা যায়। কত বিচিত্র রঙে প্রকৃতি তার নিজেকে সাজিয়ে রাখে। কখনও সে রুক্ষ, কখনও ভরাট, কখনও মন মনোহরী রঙ নিয়ে সেজে বসে থাকে। প্রকৃতির এসব রূপের পরিবর্তন গ্রাম বাংলায় সাধারণত চোখে পড়ে বেশি। প্রকৃতির রূপের এই ভিন্নতা কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর চোখ এড়িয়ে যায়নি। সাধারণত দেখা যায়, কোনও এক কবির বিশেষ কোনও এক ঋতুর প্রতি টান আছে। যেমন জীবনানন্দ দাশ জীবনের শূন্যতা, হতাশা, বেদনা আর যুগযন্ত্রণাকে অবলম্বন করে কবিতা লিখতে গিয়ে প্রকৃতির হেমন্ত আর শীত ঋতুকে বাছাই করে নিয়েছেন। তা ছাড়া কবি জীবনানন্দ দাশের প্রিয় ঋতু হেমন্ত। ধান কাটা শেষে মাঠের খড়, ধেড়ে ইঁদুর, নষ্ট শসা, পচা চালকুমড়া তিনি তাঁর কাব্যে এনেছেন। তবে অধিকাংশ কবির প্রিয় ঋতু থাকে বসন্ত। বসন্ত বন্দনায় তারা সাধারণত মুখর থাকে। কিন্তু কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর এ রকম বিশেষ কোনও এক ঋতু বা সময়ের প্রতি ঝোঁক ছিল না। তাই তো একবার দেখি বর্ষার বৃষ্টি ঝরে যাওয়া হীরে দেখেছেন। অঘ্রাণের হলুদ পাখি দেখেছেন। কার্তিকের নদীর সৌন্দর্যও তাঁকে টেনেছে। নদীকে সুন্দরী যুবতী মনে হয়েছে তাঁর। যুবতী যেমন দিতে পারে নদীও তেমনি দিতে পারে তার উজাড় করে জেলেকে। আবার নদীর উপর জেলেদের ডিঙ্গি নৌকা করে মাছ ধরার এক অপরূপ দৃশ্য তিনি অবলোকন করে বন্দনা করেছেন-
তিতাস সুন্দর নদী বিশেষ যখন/কার্তিকে চাঁদ তার মুখ দেখে জলে।/রূপসী যুবতী অঙ্গের সুবাস/ছড়ায়। জেলে ডিঙ্গি সুগন্ধী মাছ।
কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়গুলোতে গ্রাম্য সাধারণ মানুষের ছবি আঁকতে গিয়ে এঁকেছেন হতচ্ছাড়া এক দুরন্ত ছেলেকে। গ্রামের মেঠোপথে দৌড়াদৌড়ি, পুকুরে দাপাদাপি, বুনো ফল খেয়ে ভিরমি ওঠা; সবই এঁকেছেন তিনি। ছোটকাল থেকে শুরু করে আগাছার মত বেড়ে ওঠা পর্যন্ত তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে। কিন্তু এভাবে কোনও নির্দিষ্ট গ্রাম্য কোনও এক বালকের ছবি আঁকেননি কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তিনি এঁকেছেন গ্রামের সাধারণ সব বালককে। সাধারণ গ্রামের চিরায়ত বালক তাঁর কাব্যে দেখা যায়। তিনি এঁকেছেন গ্রামের মেঠোপথ, আর ডোবায় জন্মানো শাপলা শালুক নিয়ে মেতে ওঠা উদাম বালককে। আবার দেখা যায় নালা, ডোবা বা পুকুরে গামছা করে মাছ ধরার দৃশ্যÑ কবির কবিতায় এসব গ্রাম্য বালকের ছবির সাথে সাথে গ্রামের সাধারণ চিত্রও ফুটে উঠেছে। যেমন, পুকুরের পাড়ে জন্মানো কলমি শাক, বাড়ির পাশে মাচায় তাজা পুঁই ডাঁটা, কুমড়ো তাঁকে টেনেছে বারংবার। গ্রাম্য বালকের ছবি আঁকতে গিয়ে তিনি বারবার ফিরে গিয়েছেন এসব দৃশ্যের কাছে। গ্রামের মানুষের সাধারণ অনটন কবির অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি এড়ায়নি-
শালুক শাপলা ফুল/খাল বিল উদাম বালক/গামছায় পোনা মাছ/সুস্বাদ চিংড়ির কুঁচো/ডোবায় কলমী শাক,/কখনো সখনো/তাজা পুঁই ডাঁটা/কিংবা কুমড়ো মাচায়/চালা ঘরে উৎসব/কিছু যদি ভাত পাওয়া যেত।
নদীমাতৃক এ দেশে ষড়ঋতুর যে প্রবাহ তার ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া অতি স্পষ্ট। এ দেশের ঋতুগুলো চরমভাবাপন্ন না হলেও বর্ষাকালে এর প্রভাব অতি বিস্তীর্ণ। নদীর আশপাশের সমতলবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। হাজারো ঘর ভাঙে। ভাঙে সংসার। নদীর এ উন্মত্ততা বাংলার গ্রামীণজীবনে এক নিষ্ঠুর পরিণতি ডেকে নিয়ে আনে। নদীর এ লীলা খেলায় এ কূল ভাঙে আর গড়ে আরেক কূল। ছিনিমিনি খেলে তার তীরের মানুষদের নিয়ে। এ রকম ভেঙে যাওয়া সংসার দেখে কবির হৃদয়ে দারুণ ক্ষত সৃষ্টি করেছে। একটা সংসার বা বাড়ি ভেঙে যাওয়া মানে শুধু বাড়ি ভাঙা নয় তার সাথে সাথে ভাঙে হাজারো গল্প, হাজারো শ্রম, হাজারো স্বপ্ন। কবির ভাষায়-
এখানে সংসার ছিল/গাছ পাখি নদী/পচানো পাটের গোছা/সজিনার ডাঁটা,/ধান কুড়ানিয়া পাখি/লাউয়ের মাচান/নদীর আবেগে তাহা/ভাঙ্গিয়া গিয়াছে।
নদীর এ উত্তাল রূপ এঁকেছিলেন বিখ্যাত ইংরেজ কবি তাঁর বিখ্যাত কবিতা “ঞযব ঝধহফং ড়ভ উবব” কবিতায়। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ সম্ভবত এ কবিতাটি থেকে অনুপ্রাণিত। অথবা নাও হতে পারেন। কারণ তিনি নদী, খাল অঞ্চলের মানুষ। নদীভাঙন আর তার কবলে পতিত মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখে মর্মাহত হয়ে এ কবিতা লিখায় অনুপ্রাণিত। তবে এ দুটো কবিতার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও পরিণতি একই। অর্থাৎ উভয় কবিতার শেষে ধ্বংস এসেছে। যেমন কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতায় “নদীর আবেগে তাহা/ভাঙ্গিয়া গিয়াছে।” ঠিক তেমনি “The Sands of Dee” কবিতায়-
O Mary go and/called the cattle home, and called the cattle home/and called the cattle home, accross the sands of Dee.
নদীর তীরে গরু আনতে গিয়ে নদীর বানে মারা গেল গ্রাম্য মেয়ে ‘মেরি’। সুন্দর ভেসে ওঠা চুল দেখে জেলেরা চিনতে পেরেছিল মেরিকে। জীবন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে দেয়নি সর্বনাশা নদী উবব মেরিকে। সর্বনাশা নদীর জীবন কেড়ে নেয়ার চিত্র আরও দেখা যায়। যেমন “মেঘনার ঢল” কবিতায় আমিনারও ঠিক একই পরিণতি। তবে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ নির্দিষ্ট কাউকে এখানে নায়ক বানাননি। নদীর সার্বিক চিত্র তুলে ধরেছেন সাধারণ কথায়।
দেখা যায় গ্রামের প্রকৃতির অনেক কাছে চলে গিয়েছেন কবি। এক সময় প্রেমে পড়েছেন প্রকৃতির। হয়ে উঠেছেন প্রকৃতিপ্রেমী। গ্রামের পল্লীতে থেকে উপভোগ করেছেন রাতের তারা, হিমেল হাওয়া, দূর্বাঘাস আর তার উপর পড়ে থাকা শিশিরও আকর্ষণ করেছে কবিকে ঘাসের উপর, ধানের উপর পড়ে থাকা শিশির বহু কবিকেই আলোড়িত করেছে। কবিরা হয়ে উঠেছেন মুখর। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহও এ থেকে দূরে থাকেননি। আবার গ্রামবাংলার অতি চির পরিচিত রূপ- পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙা। এর পরেই পাখিরা উড়াল দেয় খাবারের সন্ধানে। গ্রামের রোদ ওঠা কবির ভিন্ন ভাষায় বাঙময়। কবির ভাষায়-
পাখিরা গান গাইছে/আকাশ জেগে উঠলে/ওরা উড়ে যাবে।/দূর্বাঘাসে স্ফটিক শিশির/কাজলি মাছের চোখ ফুটেছে/হিজলের শিকড়/আঁচলে রোদ বেঁধে/ওদের নদীর কাছে নিয়ে যাবে।
শিশিরকে কখনও তিনি তাঁর মানস প্রিয়া রূপে কল্পনা করেছেন। আবার কখনও শ্যাওলা রঙের গ্রাম্য কিশোরী তাঁর মনে ধরেছে- যার মনে অনেক দুঃখ। কিন্তু তাঁর সেই মনোবেদনা জাগানোর ভাষা জানা নেই; অথবা কেউ বোঝে না। শিশিরের সাথে গ্রাম্য কিশোরীকেও তুলনায় এনেছেন কবি। শিশির যেমন রোদ উঠলে শুকিয়ে যায়, কবি যাকে বলেছেন ‘মরে যায়’; ঠিক তেমনি গ্রাম্য কিশোরীও যেন না পাওয়ার বেদনায় অকালে ঝরে যায়। কবির ভাষায়-
শিশিরের চোখের কোণে/আটকে রাখা কান্না/শেফালির গাল বেয়ে/গড়িয়ে পড়ে।/রোদ উঠলে মরে যায়।
এভাবে পল্লী চেতনার কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ গ্রাম্য পল্লীর প্রেমে পড়ে প্রকৃতিপ্রেমী কবি হয়ে উঠেছেন। তাইতো প্রকৃতির বিচিত্র রূপ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন অত্যন্ত গভীর আবেগ দিয়ে। আবার প্রকৃতির খুবই কাছাকাছি গিয়েছেন কখনও। ধান কুড়ানিয়া শালিক, একলা থাকা ঘুঘু তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে; কারণ ঘুঘু কখনও একলা থাকে না। আবার জলেও ডাহুককেও তিনি তাঁর একান্ত সাঙ্গ করে নিয়েছেন যেন। সেখানেই কবির প্রকৃত স্বরূপের উন্মোচন। সেখানেই প্রকৃত শান্তি। এ শান্তির খোঁজ যেন পেয়েছেন কবি। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতা রচনার সবচেয়ে বড় এক বৈশিষ্ট্য তিনি খুব সহজভাবে সব কিছু বলেন। পল্লী যেমন সহজ সরল কবির কবিতাও তেমনি সহজ সরল। তিনি খুবই সাধারণভাবে একটা বিষয়ের অবতারণা করেন। এবং সাধারণভাবে বলে যান। এর মধ্যে থাকে না কোনও আলাদা কাব্যিক ভাষা, ভাষার জটিলতা বা দুর্বোধ্যতা। এখানেই কবির সফলতা এবং এখানেই কবি ব্যতিক্রমী।