লেখক হিসাবে আত্মপ্রতিষ্ঠা পেতে মোহাম্মদ বরকতুল্লাহকে খুব বেশি লিখতে হয়নি। প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ পারস্য প্রতিভা প্রকাশের সাথে সাথেই তার সাহিত্যিক খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে তৎকালীন বাংলাদেশের সাহিত্যিক মহলে, এমনকি সাধারণ পাঠকও তাকে গ্রহণ করেন আগ্রহ ভরে। আর আজ যখন তাকে নিয়ে লিখছি তখন তিনি আর আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। ইতোমধ্যে চলে গেছে তার জন্মশতবর্ষ। তার প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থটির প্রকাশকাল প্রায় ১০০ ছুঁয়ছুঁয় করছে। তিনি এই গ্রন্থটি রচনার মধ্য দিয়ে নিজেকে বিশিষ্ট গদ্যশিল্পী হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। আর তার গদ্যচর্চার সূচনা এমন একটি সময়ে যখন বাঙালি মুসলমান শিক্ষা ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছেন। এমনকি মীর মশাররফ হোসেন ব্যতীত তেমন উল্লেখযোগ্য আর কোন গদ্যশিল্পী আমরা পাই না। সুতরাং তার যে গদ্যচর্চার পথ সে পথ নিজেকেই আবিষ্কার করতে হয়েছিল। তবে বরকতুল্লাহ বিষয় নির্বাচনে এবং ভাষা নির্মাণে ছিলেন ব্যতিক্রম। এ প্রসঙ্গে মানুষের ধর্ম্ম গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ শ্রীযুক্ত হরিদাস ভট্টাচার্যের ভূমিকা অংশ থেকে কিছুটা দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করলাম :
“মাত্র দুইশত পৃষ্ঠায় এত পঠিতব্য বিষয়ের একত্র সমাবেশ প্রায়ই দেখা যায় না। যাহারা মনে করেন সংস্কৃত-বহুল বাঙ্গলা ভাষায় অসংস্কৃতজ্ঞের পক্ষে লেখা বা বোঝা দুষ্কর তাঁহাদিগকে আমি এই পুস্তিকা পাঠ করিতে অনুরোধ করি। ভারতীয় ভাবে অনুপ্রাণিত ও অনুপ্রবিষ্ট দার্শনিক লেখকের ভাবসম্পদ সুধীবৃন্দকে মোহিত করিবে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। বিষয়ের জটিলতাকে ভাষার সরলতা অনেক পরিমাণে অপসারিত করিয়াছে। ভাষা ও ভাবের এইরূপ সাহচর্য সচরাচর দৃষ্ট হয় না।”
তিনি ভাষার মাধুর্যতার সাথে দর্শনিক চিন্তাকে মিশ্রিত করলেন। তার হাত দিয়ে বলা যায় মূলত দর্শনভিত্তিক অসংস্কৃত বহুল গদ্যের চর্চার প্রারম্ভ ঘটে এবং তা বেগবান হয়। দার্শনিক গদ্যের এই মহান স্রষ্টা জন্মছিলেন অবিভক্ত বাংলায়। অবিভক্ত বাংলার যে অংশটি এখন স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে বিশ্ব-দরবারে পরিচিত, তার অন্তর্গত সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার ঘোড়াশাল গ্রামে ১৮৯৮ সালের ২ মার্চ। পিতা হাজী আজম আলী পুত্র-কন্যাদের শিক্ষার বিষয়ে খুবই যত্নবান ছিলেন। বরকতুল্লাহর জ্যেষ্ঠ ভাই মোহম্মদ রহমতুল্লাহ লেখাপড়া শেষ করে গ্রামে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা করতেন। অবসর সময় পেলে কিছু কিছু সাহিত্যচর্চাও করতেন বলে জানা যায়। শৈশব থেকেই বরকতুল্লার মেধার পরিচয় পাওয়া যেতে থাকে। পার্শ্ববর্তী বেলতৈল মিডল ইংলিশ স্কুলে তিনি নি¤œ প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক ও এমই পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি প্রথম হয়ে বৃত্তি লাভ করেন। শুধু বৃত্তিপ্রাপ্তিতেই তার অ্যাকাডেমিক শিক্ষার পরিসর থেমে থাকেনি, তিনি ১৯০৯ সালে এমই পরীক্ষায় রাজশাহী বিভাগে বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন। আর তার এই সাফল্যের জন্য বিভাগীয় ইন্সপেক্টর কর্তৃক পুরস্কৃত হন। ১৯১০ সালে শাহজাদপুর হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে বিভাগীয় বৃত্তি লাভ করেন। তারপর রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন। ১৯১৬ সালে সেখান থেকে এফএ পাস করেন। এখানেও প্রথম বিভাগ অর্জন করেন এবং বিভাগীয় বৃত্তি লাভ করেন। একই কলেজ থেকে ১৯১৮ সালে দর্শন বিভাগ থেকে বিএ পাস করেন।
পিতার মৃত্যু ঘটেছিল অনেক আগেই। একমাত্র অভিভাবক বড় ভাইয়ের অকাল মৃত্যু ঘটলে পড়াশোনা চালানো সম্ভব হবে না ভেবে বাড়ির কাছে একটি হাইস্কুলে হেডমাস্টারি নিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যানুরাগী শ্বশুর ও ভগ্নিপতির সহযোগিতায় ১৯১৮ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনে এমএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। আর সেই সময়কার ট্র্যাডিশন হিসেবে তিনি দর্শনের পাশাপাশি আইন বিষয়েও অধ্যয়ন করতে থাকেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাসের পর তদবিরের লোক না থাকায় তাকে আইন পেশাকে বেছে নিতে হয়। তবে পেশাতে তার থাকতে হয়নি। এর মধ্যে ১৯২২ সালে বিসিএস (বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষার প্রবর্তন হয়, এবং তিনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেন। প্রথম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিত মেধা তালিকায় তিনি পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। পরিবারের চাপে নিজের পছন্দের পেশা অধ্যাপনাকে বাদ রেখে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি গ্রহণ করেন। তার এই চাকরির কারণে অনেক জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। সুযোগ পেয়েছেন নানা জায়গার মানুষকে কাছে থেকে দেখার।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে তিনি ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নিযুক্ত হন। পরে জেলা প্রশাসক হিসেবে বদলি হন কুষ্টিয়ায়, এরপর ময়মনসিংহে এবং সেখান থেকে ১৯৫১ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে সরাসরি পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি নিযুক্ত করা হয়। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে তিনি এই পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। আমলা হিসেবে অবসর গ্রহণ করলেও বিদ্বান ও বিজ্ঞ লেখক হিসেবে তার দায়িত্ব শেষ হয়নি। ১৯৫৫ সালে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে বিশেষ কর্মকর্তার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, যা বর্তমানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদের স্থলাভিষিক্ত। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের একুশ দফার অন্তর্ভুক্ত বাংলা ভাষার গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার দায়িত্বভার তার ওপর অর্পিত হয়। এমনকি বর্ধমান হাউজকে বাংলা ভাষার গবেষণাগারে পরিণত করার জন্য যে কমিটি গঠিত হয়েছিল তার অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। আমৃত্যু তিনি জড়িত ছিলেন বাংলা একাডেমির সঙ্গে। সাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন উল্লেখযোগ্য প্রায় সকল পুরস্কার। ১৯৭৪ সালের ২ নভেম্বর ৭৬ বছর বয়সে তিনি জান্নাতবাসী হন।
মোহম্মদ বরকতুল্লাহর প্রথম গ্রন্থটি হলো পারস্য প্রতিভা। পারস্য প্রতিভা প্রথমখণ্ড প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালে। তাতে মূল ফারসি কবিতা ছিল না। ছিল শুধুমাত্র অনুবাদ। পরবর্তীতে তিনি একত্রে দু’টি খণ্ড প্রকাশ করেন এবং ফারসি কবিতাও সংযোজিত করেন। এই গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় রচিত পারস্যের সাহিত্যবিষয়ক প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। গ্রন্থটি তিনটি ভাগে বিভক্ত : প্রথম ভাগে আছে পারস্যের প্রাচীন কবিদের বিষয়ে আলোচনা। দ্বিতীয় ভাগে সাধক কবি বা সুফিবাদী কবিদের আলোচনা এবং সর্বশেষ ভাগে আছে দার্শনিক লেখকগণ বিষয়ক আলোচনা। গ্রন্থটিতে স্থান লাভ করেছেন মহাকবি ফেরদৌসী, ওমর খৈয়াম, শেখ সা’দী, নাসির খসরু, নেযামী, ফরিউদ্দীন আত্তার, মৌলানা রুমী, কবি হাফিয, মোল্লা জামী, ইবনে সিনা ও আল্ গায্যালী। এতে যেমন ফুটে উঠেছে পারস্যের কবিদের মানসলোক, তেমনি আছে আধ্যাত্মিকতার পরিচয় এবং দার্শনিক ভাবনার বিশদ বিশ্লেষণ।
তার দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো মানুষের ধর্ম্ম (১৯৩৩)। গ্রন্থটিতে তার দর্শনভাবনার প্রকাশ ঘটেছে সুস্পষ্ট ও সূক্ষ্মতর সংবেদনায়। তার দর্শনের ভাবনার স্বরূপ উপলব্ধি করা যায় গ্রন্থটির প্রথম প্রবন্ধ ‘অনন্ত তৃষা’ পাঠে। এই প্রবন্ধটিতে লেখক বলেন, জীবজগতে আত্মপ্রতিষ্ঠা ও আত্মপ্রসারের যে-ধর্ম সক্রিয় তা মানুষের মধ্যেও সমান ভাবে ক্রিয়াশীল। শুধু তাই নয়, মানুষের মধ্যে আছে আরেকটি নতুন শক্তির বিকাশ, যার নাম আত্মা। অনন্তকাল ধরে মানুষের বেঁচে থাকার যে-ইচ্ছা মানুষ তা পূরণ করতে চায় আত্মার মাধ্যমে। তাই আত্মা কল্পিত হয়েছে অবিনশ^ররূপে।
প্রকৃতি ও মানবের স্বরূপ বিশ্লেষণের পর লেখক আত্মপ্রতিষ্ঠা ও আত্মপ্রসারণকেই মানবের ‘আদিম প্রেরণা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন তার দ্বিতীয় প্রবন্ধে। আর এই আদিম প্রেরণা আর কিছু নয়, অসীমের সাথে সসীমের মিলন। লেখকের ভাষায় : “পানির ধর্ম যেমন নিষিক্ত রূপে করা, অগ্নির ধর্ম যেমন দাহন করা, মানুষের ধর্ম তেমনি আপনার সত্যকার রূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সসীমের গণ্ডি পার হইয়া অসীমের সহিত একাকার হওয়া।”
তাঁর যে দর্শনচর্চা তার মূলে রয়েছে এই ধ্রুবসত্য বা অসীমের সাথে মানবের মিলন আকাঙ্ক্ষা বা সত্যের আত্মস্বরূপের সন্ধান। তবে তিনি এই সত্যের আবিষ্কারে কখন হয়ে পড়েননি ধর্মান্ধ বা বিজ্ঞানবিরোধী। বরং তিনি বিজ্ঞান ও ধর্মকে গ্রহণ করেছেন উদারনৈতিক দৃষ্টিতে। বাঙালি মুসলমানের রেনেসাঁসের প্রবাদ পুরুষ যদি কাউকে বলতে হয় তাহলে সে আসন যে মোহম্মদ বরকতুল্লাহ্ তা নিশ্চিন্তে বলা যায়। তবে তিনি ধর্মকে আক্রমণ করেননি তার রচনার শৈলীর মধ্য দিয়ে। বরং গদ্যকে করেছেন শিল্পিত শিবমূর্তি, যা তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে এবং বাংলা সাহিত্যে গদ্যশিল্পী হিসেবে তার যে উচ্চতম স্থান তা নির্ধারণ করে।