
শেখ-সেলিম-চিশতির-সমাধির-দেয়ালে-ফুলেল-নকশা,-রঙচিত্র
মুসলিম চিত্রকলার ইতিহাসে ভারতীয় উপমহাদেশের মুগল চিত্রকলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ অবস্থান দখল করে আছে। মুগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর থেকে শুরু করে জিন্দাপীর সম্রাটআওরঙ্গজের আলমগীর পর্যন্ত প্রত্যেক সফল শাসকই চিত্রকলার বিষয়ে আন্তরিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। শাসকগণ রাজকীয় গ্রন্থাগারে মূল্যবান ও প্রাচীন গ্রন্থাবলি সংগ্রহ করতেন। সম্রাটবাবর ও হুমায়ুন থেকে চিত্রকলার যে ধারার সূত্রপাত ঘটে সম্রাটআকবর এবং জাহাঙ্গীরের সময় এসে তা আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। সম্রাটশাহজাহান শিল্পকলার দিকে ঝুঁকে গেলেও শিল্প-সংস্কৃতির এ ধারাকে ভুলে যাননি। অন্যদিকে সম্রাটআওরঙ্গজেব ধর্মীয় চেতনায় বেশি উজ্জীবিত থাকলেও শিল্প-সংস্কৃতির পরিশুদ্ধ ধারা বিনির্মাণে তিনি ভীষণ আন্তরিক ছিলেন। মুগল সম্রাটগণ বিভিন্ন স্থান থেকে জ্ঞানীগুণি ও শিল্পীদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে তাদেরকে শিল্প-সংস্কৃতি চর্র্চায় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতেন। বিশেষকরে সম্রাটহুমায়ুন কর্তৃক পারস্য হতে চিত্রশিল্পী খওয়াজা আবদুস সামাদ এবং মির সৈয়দ আলীকে ভারতবর্ষে আনায়ন করে চিত্রকলার ইতিহাসে নতুনতরো অভিযাত্রা শুরু করান। পরবর্তীকালে সম্রাটআকবরের শিল্পপ্রীতি ও একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতায় মুগল চিত্রকলা পরিপূর্ণ অবয়বে বিকশিত হয়ে ওঠে। তাঁর রাজকীয় গ্রন্থাগার এবং আর্টগ্যালারী সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তত্ত্বাবধায়ক মাকতুব খানের আন্তরিক প্রচেষ্টায়। সম্রাটজাহাঙ্গীর ছিলেন আপাদমস্তক শিল্পমনা শাসক। তাঁকে পারস্য ও ভারতীয় চিত্ররীতির সুকৌশলী উদ্ভাবক বলা যায়। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় চিত্রকলার জয়জয়কার হয়ে ওঠে। এ সময়টিই ছিলো চিত্রকলার স্বর্ণযুগ। পরবর্তীকালে মুগল শাসকদের আমলে শিল্প-সংস্কৃতি ও চিত্রকলার চর্চা খানিকটা স্তিমিত হলেও তাদের শিল্পানুরাগ, দক্ষতা, পৃষ্ঠপোষকতা, বিভিন্ন অঞ্চলের চিত্রকরদের আকর্ষণীয় সুযোগ প্রদানের আহ্বান জানানো এবং খোদ চিত্রশিল্পীদের প্রেরণা দানের মাধ্যমে চিত্রকলার বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। এ সময়ে হেরাত, সিরাজ এবং তাবরিজ থেকে সংগ্রহীত অসংখ্য চিত্রিত পাণ্ডুলিপি মুগল চিত্রকলাকে সমৃদ্ধ করেছে। এ জন্য মুগল সম্রাটবাবরের উত্তরাধিকারী সম্রাটহুমায়ূনের আমল থেকে যে চিত্রকলার চর্চার উন্মেষ হয়ে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত চরম বিকাশ লাভ করেছিল তাকে ইতিহাসে মুগল চিত্রকলা বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। মূলত পারসিক শিল্পী, পারসিক শিল্পকলা, ভারতীয় চিত্রশিল্পী, ভারতীয় শিল্পকলা এবং পারসিক উপাদানকে ঘিরেই মুগল চিত্রকলার উৎসযাত্রা ও বিকাশ সাধিত হয়েছে।
ভারতে মুগল শাসনের সুত্রপাতকারী বাবর নিজে একাধারে একজন কবি, পণ্ডিত এবং শিল্পকলায় উৎসাহী ব্যক্তি ছিলেন। রাজধানী আগ্রায় ১৫২৮-২৯ সালে রচিত তুর্কী ভাষায় তার একটি দীওয়ান পাণ্ডুলিপি বর্তমানে রামপুর লাইব্রেরিতে রক্ষিত। তার জীবনস্মৃতি বাবরনামা সাহিত্য এবং ইতিহাসের দিক থেকে একটি অনন্যসাধারণ গ্রন্থ। বিশ্বসাহিত্য ও ইতিহাসের ভাণ্ডারে এটি একটি অমূল্য সম্পদ। মূল তুর্কী ভাষায় রচিত এই গ্রন্থটি তার পৌত্র সম্রাটআকবরের আমলে ফার্সী ভাষায় অনূদিত হয়ে সমগ্র বিশ্বে স্মৃতি সাহিত্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিরাজমান। শিল্পকলাতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন বাবর। তার দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয় আগ্রায় তার বাগান বাড়ির কয়েকটি প্যাভিলিয়নের বিদ্যমান অবশিষ্টাংশ থেকে। এগুলি পারসিক এবং ভারতয়ি ধারায় তৈরি। সাহিত্য এবং শিল্পানুরাগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি চিত্রকলাতেও উৎসাহী ছিলেন। কিন্তু তাঁর মাত্র চার বছরকাল রাজত্বে রাজ্যকে সুদৃঢ়করণ করার প্রয়াসের কারণে চিত্রশিল্পে মনোবিবেশ করতে পারেননি।
ফরগনার অধিপতি বাবর নিকটবর্তী উযবেকদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে ভাগ্যান্বেষণে আফগানিস্তানের মধ্যদিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। তিনি ১৫২৬ সালে দিল্পীর সুলতান ইব্রাহীম লোদীকে পাঞ্জাবের পানিপথ নামক স্থানে পরাজিত করে ভারতে ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। এতদিন যারা ভারতের ইতিহাসে অধিষ্ঠিত ছিলেন তারা ছিলেন আফগানিস্তান নির্ভর গোত্রীয় বংশদ্ভূত। কিন্তু বাবর সরাসরি মধ্য এশিয়ার ফরগনা থেকে আগত। তার পূর্ব পুরুষ পিতৃত্বের দিক থেকে চাগতাই তুর্কী এবং মাতৃত্বের দিক থেকে মোঙ্গল। এই মোঙ্গল এবং তুর্কী বংশীয় সুলতানগণ একদিকে যেমন সমগ্র পশ্চিম এশিয়ায় ত্রাসের মাধ্যমে রাজ্য স্থাপন এবং বিস্তার করেছিলেন ঠিক তেমনি সমগ্র মধ্য এশিয়ার পূর্ব সংস্কৃতির মাধ্যমে নিজেদেরকে আবার সংস্কৃতিমনা শাসক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মোঙ্গল এবং তুর্কী সংস্কৃতির বিকশিত এই ধারায় ভারতবর্ষে বাবর এই সংস্কৃতিকে নতুন আঙ্গিকে প্রবাহমান করেন।
ভারতবর্ষের জলবায়ু একটু ভিন্নরকম। মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার আবহাওয়ার চেয়ে যেমন ভিন্নতরো তেমনি মানুষের আচার-আচরণও খানিকটা ব্যতিক্রমী। বাবর প্রাথমিকভাবে এখানকার আবহাওয়া এবং মানুষের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পেরে এ অঞ্চল সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করতে পারেননি। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ভারতবর্ষকেই আপন ভূখণ্ডরূপে গড়ে তুলতে প্রথম থেকেই সচেষ্ট ছিলেন। তার মাত্র চার বছরকাল রাজত্বে রাজ্যকে সুদৃঢ়করণ করার সফল প্রয়াস চালিয়েছেন। তার সময়ে চিত্রকলার কোন উদাহরণ ফ্রেস্কো বা পাণ্ডুলিপিতে বর্তমান নেই। তাই ধরে নেয়া যায় যে, সময়ের অভাবে তিনি এই শিল্পে মনোবিবেশ করতে পারেননি। তবে তাঁর বিখ্যাত আত্মচরিত বাবরনামা’য় জীবজন্তু এবং পশুপাখির প্রতি তিনি যে অসাধারণ মমত্ববোধ প্রকাশ করেছেন এর মাধ্যমেও তাঁর সংস্কৃতিমনা হৃদয়ের উদাহরণ মেলে। সেইসাথে শিল্পী কামাল উদ্দিন বিহ্যাদ সম্পর্কে তাঁর একটি মন্তব্য থেকে চিত্রশিল্পে তাঁর সমঝদারীতা এবং আন্তরিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি মন্তব্য করেন, ‘চিত্রকরদের অন্যতম ছিলেন বিহ্যাদ। তাঁর শিল্পকর্ম ছিলো অত্যন্ত উন্নতমানের। কিন্তু তিনি দাড়িবিহীন মুখমণ্ডল উত্তমরূপে অঙ্কন করতে পারেননি। তিনি দুভাঁজবিশিষ্ট থুতনিকে খুব লম্বা করতেন। শ্মশ্রুযুক্ত মুখমণ্ডল তিনি চমৎকার অঙ্কন করতে পারতেন।’ তার পুত্র এবং পরবর্তী শাসক হুমায়ূনের চিত্রকলার প্রতি আকর্ষণ দেখে অনুমান করতে অনুবিধা হয় না যে পিতৃসূত্রেই তিনি এই জ্ঞান এবং আকর্ষণের অধিকারী হয়েছিলেন। তাই ইতিহাসবিদ এবিএম হোসেন মন্তব্য করেন, বাবর যেমন ভারতবর্ষে মুগল শাসনের প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ূন তেমনি মুগল চিত্রকলার সফল সংস্থাপক।
সম্রাটহুমায়ূন ও মুগল চিত্রকলার সূচনালগ্ন
সম্রাটবাবরের পুত্র হুমায়ুন। তাঁর আমলেই মূলত মুগল চিত্রকলাচর্চার সূচনা হয়। ১৫৩০ সালে স্বীয় পিতা বাবুরের মৃত্যুর পর তিনি মুগল সম্রাটহিসেবে মসনদে অধিষ্ঠিত হন। দশ বছর রাজত্ব পরিচালনা করার পর ১৫৪০ সালে চৌসার যুদ্ধে পাঠান বংশের শের শাহের কাছে পরাজিত হয়ে তিনি পারস্যের সাফাবী সুলতান তাহ্মাসপের দরবারে আশ্রয় গ্রহণ করেন। প্রায় পনেরো বছরকাল নির্বাসনে থেকে তিনি ১৫৫৫ সালে দিলঈর সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন। শের শাহের কাছে পরাজিত হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হলেও শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি নবতরো যুগের সূচনা করার পথ উন্মুক্ত হয়। শাহ তাহ্মাসপ ছিলেন পারস্য ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্র পৃষ্ঠপোষক। হুমায়ুন চিত্রামোদী শাহ তাহ্মাসপ এবং তার চিত্রশিল্পীদের সংস্পর্শে এসে কর্মবিহীন এই সংস্কৃতিসম্পন্ন অতিথি সান্নিধ্যের সুযোগ যথাযথ গ্রহণ করেছিলেন। শাহের দরবারে পথিতযশা চিত্রকর মীর মুসাব্বির এবং তদ্বীয় পুত্র মীর সাঈদ আলী তার পছন্দের শিল্পী ছিলেন। ১৫৪৫ সালে হুমায়ুন যখন শাহের অসহায়তায় কাবুলে তার শাসন প্রতিষ্ঠা করেন তখন তিনি মলি মুসাব্বিরকে ফুসলিয়ে কাবুলে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি আসেননি। তবে উক্ত বছরটি হুমায়ূনের চিত্রকলার স্বাধীন পৃষ্ঠপোষকতার একটি অনন্যসাধারণ বছর একটি বিশেষ কারণে। এই বছরেই শাহ তাহ্মাসপ তার মানসিক পরিবর্তনে চিত্রকলায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। আর তারই পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন ভবিষ্যত মুগল সম্রাট হুমায়ূন। চিত্রকলায় উৎসাহ হারানোর ফলে শাহ তাহ্মাসপের চিত্রশিল্পীদের মাঝে যে হতাশা এবং বেকারত্বের সৃষ্টি হয় তার ফলশ্রুতিতে শিল্পীদের মধ্যে এক অভিবাসন স্পৃহা জেগে উঠে। এই অভিবাসন প্রক্রিয়ায় অনেক শিল্পী প্রতিষ্ঠিত উসমানীয় কোর্টে আশ্রয় গ্রহণ করেন; কেউ চলে যান প্রাদেশিক শহর মাশ্হাদে, কেউ সদ্য প্রতিষ্ঠিত উযবেক রাজধানী বোখারায়। এ সময় অনেকেই এসেছিলেন হুমায়ূনের দরবার কাবুলে।

জামি মসজিদ, ১৬৬৮-৭২, ফতেহপুর সিক্রি,
খিলানগর্ভের অ্যারাবেক্স সজ্জা, রঙচিত্র
তাহ্মাসপের রাজধানী তাবরিজ থেকে কাবুলে যারা এসেছিলেন তাদের মধ্যে মীর মুসাব্বিরের পুত্র মীর সাঈদ আলী তাবরিজী অন্যতম। ‘তাবরিজী’ পদবীটা মর্যাদা বাড়ানোর যে উৎকৃষ্টতম একটি পন্থা ছিল তা অনুমান করা যায়। তার সাথে যোগ দেন সিরাজ থেকে আগত আর এক প্রখ্যাত শিল্পী খওয়াজা আবদুস সামাদ- পদবী সহযোগে আবদুস সামাদ সিরাজী। তাবরিজ এবং সিরাজ ঘরানার এই দুই চিত্র শিল্পীই মুগল চিত্রকলার প্রারম্ভিক শিল্পী। এমনকি মুগল ঘরানার রূপকারও বটে। শের শাহের আকস্মিক মৃত্যুর পর হুমায়ূন যখন ভারতবর্ষের সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন তখন এই দুই চিত্রশিল্পী তার সাথে ভারতে চলে আসেন। পরবর্তীতে সাঈদ আলীর পিতা মীর মুসাব্বিরও ভারতে চলে আসেন বলে জানা যায়। এই তিন চিত্রশিল্পীর আপ্রাণ প্রয়াসে এবং হুমায়ূনের পৃষ্ঠপোষকতাই যে মুগল চিত্রকলা আলাদা একটি ঘরানা হিসেবে বিকাশ লাভ করে।
হুমায়ূন ভারতে ফেরেন ১৫৫৫ সালে এবং রাজধানী স্থাপন করেন শের শাহ নির্মিত দিল্লীর পুরানো কিলায়। পুরানো কিলার দেয়াল এবং পুরানো কিছু ইমারত আজও শেরশাহ এবং হুমায়ূনের গোরব গাঁথার উজ্জ্বল সাক্ষর বহন করে। তবে হুমায়ূন দিল্লীতে বেশি দিন বেঁচে ছিলেন না। ফেরার বছরেরই শেষের দিকে তার নির্মিত লাইব্রেরির সিঁড়িতে হোচট খেয়ে পড়ে গিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হন। এই অল্প সময়ের মধ্যে চিত্রাঙ্কনে তিনি বিশেষ কোন উদাহরণ রেখে যেতে পেরেছিলেন এমন মনে হয় না। তার অবদান প্রকৃত অর্থে স্বপ্ন দর্শনে এবং ভিত্তি স্থাপনে। এই ভিত্তির উপর নির্ভর করেই মুগল চিত্রকলা পরবর্তীতে পূর্ণ বিকাশ লাভ করে এবং ইসলামী চিত্রকলায় তার নিজস্ব আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
সম্রাটআকবর ও মুগল চিত্রকলার বিকাশ
হুমায়ূনের মৃত্যুর পর ১৫৫৬ সালেই মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে ক্ষমতাবান সভাসদ বৈরাম খানের তত্ত্বাবধানে আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেন। হুমায়ূনের শিল্পপ্রীতির সাথে জীবনের প্রথম থেকেই পরিচিত ছিলেন আকবর। তিনি পিতার স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে চিত্রশিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন। ছোটবেলা থেকেই আকবর শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তিনি এ ধরনের শিল্পকলা চর্চাকে আনন্দ উপভোগের মাধ্যম মনে করতেন। শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি এ সুযোগকে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগান। তিনি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিল্প-সংস্কৃতির রসদ সংগ্রহ করেন। তবে তিনি তাঁর পূর্ব পুরুষের তুলনায় সমরখন্দ ও বুখারা হতে সীমিত উপাদানই সংগ্রহ করেন এবং ভারতীয় পরিবেশে ইন্দো-পারস্যরীতির সংমিশ্রণে হিন্দু-মুসলিম চিত্রকরদের দ্বারা শিল্পচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি নিজেও চিত্রশিল্পের সমঝদার ছিলেন। যৌবনে তিনি শিল্পী খাওয়াজা আবদুস সামাদের কাছে শিল্পবিষয়ে দীক্ষা লাভ করেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। ফতেহপুর সিক্রির দেয়াল অলঙ্করণে তিনি অনন্য নজীর স্থাপন করেন।
জামি মসজিদ এবং শেখ সেলিম চিশতীর সমাধির চিত্রসমূহ সাধারণভাবে অ্যারাবেস্ক ধর্মী। চিত্রকলাবিদ এবিএম হোসেন বলেন, ফতেহপুর সিক্রির দেয়াল চিত্র দর্শনে এ কথাই অনুমিত হয় যে, সম্রাটআকবর তার অন্যান্য রাজধানী- আগ্রা ও লাহোরেও অনুরূপ দেয়াল চিত্র সমন্বয়ে প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। তবে উক্ত দুর্গসমূহের প্রাসাদসমূহ পরবর্তীকালে সংস্কারকৃত হওয়ায় এবং বিশেষ করে সম্রাটশাহজাহানের আমলে মার্বেল আচ্চাদিত হওয়ায় তার অস্তিত্ব আর বর্তমান নেই। দেয়াল চিত্র অঙ্কন ইসলামী চিত্রকলার প্রথম থেকেই একটি গ্রহণীয় পদ্ধতি এবং তা পরবর্তীতে সবসময়ই অনুকৃত হয়েছে। নির্মিত প্রাসাদের পরিবর্তে তাবুতেও যে এই ধরনের ছবি অঙ্কিত হতো তা ফাতেমীয় আমলের এবং পরবর্তীতে তৈমূরীয় আমলের ইতিহাস সাহিত্যের তথ্য থেকে অনুধাবন করা যায়।
পাণ্ডুলিপি চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে আকবরের শাসনামল বিখ্যাত হয়ে আছে। তাঁর সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের নানা ধরনের পাণ্ডুলিপি চিত্রায়িত হয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-
দাস্তান ই আমীর হামযাহ
পাণ্ডুলিপি চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে সম্রাটআকবরের রাজত্বের প্রারম্ভিক সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি দাস্তান ই আমীর হামযাহ বা হামযাহ্ নামা’র চিত্রায়ণ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ’র (স.) বীরশ্রেষ্ঠ চাচা হযরত আমীর হামযাহ’র বীরত্বগাঁথার কাহিনী সম্বলিত পাণ্ডুলিপি এটি। এটি সম্ভবত ষোড়শ শতাব্দীর ষাটের দশকের প্রথম দিকে অথবা ১৫৬২ সালে আরম্ভ হয়ে ১৫৭৭ সালে মোট পনেরো বছর সময়ের মধ্যে সমাপ্ত হয়। ৩৬০টি গল্প সম্বলিত এ পাণ্ডুলিপিটির কাহিনীর ভীষণ ভক্ত ছিলেন সম্রাটআকবর। তিনি এ গল্পসমূহের প্রতি এতোই অনুরক্ত ছিলেন যে, জেনানামহলে গল্পকারের মতো তিনি সেগুলো বর্ণনা করতেন। আবুল ফজল এবং বদায়ূনীর তথ্যানুযায়ী পাণ্ডুলিপিটি পনেরো অথবা সতেরো ভলিউমে এবং প্রতি ভলিউমে ১০০টি করে চিত্রের সমন্বয়ে নির্মিত ছিল। পাণ্ডুলিপির এই চিত্রসমূহ প্রায় বিলুপ্ত। যে ১০০টি চিত্রের সন্ধান পাওয়া যায় সেগুলো আজ পৃথিবীর বিভিন্ন সংগ্রহশালায় ছড়িয়ে আছে। তবে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ভিক্টোরিয়া এ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়াম এবং ভিয়েনা শিল্প মিউজিয়ামে এর সংখ্যা সর্বাধিক। চিত্রসমূহ কাপড়ে চিত্রিত এবং ভলিউমের ডান পৃষ্ঠায় কাগজের উপর আঠা দিয়ে লাগানো। উল্টো পৃষ্ঠায় কাযউইনের খাওয়াজা আতাউল্লাহ মুন্সি কর্তৃক নাস্তালিক লিপিতে সুন্দরভাবে লিখিত বর্ণনা ছিল।

চিত্রিত মুগল পাণ্ডুলিপিসমূহের মধ্যে দাস্তান ই আমীর হামযাহ বা হামযাহ্ নামা’ নিঃসন্দেহে সর্বপ্রাচীন শিল্পকর্ম। সম্রাটহুমায়ুন কাবুলে অবস্থানকালেই ১৫৫০ সালে মির সৈয়দ আলীকে এটি চিত্রায়ণের নির্দেশ প্রদান করেন। দীর্ঘ পচিশ বছরের পরিশ্রম শেষে সম্রাটআকবরের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৫৭৫ সালে এর চিত্রায়ন সম্পন্ন হয়। এতে সৈয়দ আলীর পাশাপাশি খাওয়াজা আবদুস সামাদসহ ভারতীয় চিত্রকরদেরও অবদান রয়েছে। তাই বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে এর চিত্রসমূহকে দুইটি পৃথক সময়ে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগ পারসিক সাফাভীরীতিতে তৈরি এবং দ্বিতীয় ভাগ পারসিক এবং ভারতীয় মিশ্র পদ্ধতিতে নির্মিত। বিভাজনের এই সময়কালটা মৌলিকভাবে ১৫৭১ সাল বলে অনুমান করা যায়। কারণ উক্ত বছরে পাণ্ডুলিপির প্রধান চিত্রকর মীর সাঈদ আলী সম্রাটআকবরের উৎসাহী হস্তক্ষেপে অতিষ্ঠ হয়ে হজ্জ্বব্রত পালন করতে মক্কায় চলে যান। তিনি মক্কা থেকে ফিরেছিলেন কিনা জানা যায় না। আকবর চিত্রকলা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতাকে প্রতিফলিত করতে মীর সাঈদ আলীর কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করতেন। কিন্তু শিল্পী তা মেনে নিতে পারেননি বলেই উৎসাহ হারিয়ে মক্কায় চলে যান।
প্রথমভাগের চিত্রসমূহ সাফাভী রীতির সুসামঞ্জস্যতা এবং ধীরগতি বা অনেকটা নিশ্চল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। কিন্তু পরবর্তী চিত্রসমূহের গতিশীলতা, গাঢ় রঙের আধিক্য, বাস্তব ঘটনার প্রেক্ষাপট, স্থাপত্য নিদর্শন, পোশাক পরিচ্ছদের ধরন এবং ভারতীয় বৈশিষ্ট্যের শরীর অঙ্কন তাদেরকে মিশ্ররীতির অন্তর্ভুক্ত করে। সেইসাথে ছবিতে ব্যবহৃদ স্থাপত্যরীতি, নকশাবৃত তাঁবু, পুষ্পিত বৃক্ষাদি, মেঘের আড়ালে সূর্যচ্ছটার বিকিরণ এবং পাহাড়ীরীতিসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যে সাফাবীয় রীতি প্রতিফলিত হলেও মুখাবয়ব, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সর্বোপরি প্রকৃতি ও পরিবেশসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যে ভারতীয় ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ছবিকে উপরের দিক থেকে দর্শায়ণও দাস্তান ই আমীর হামযাহ বা হামযাহ্ নামা’ চিত্রের একটি বিশেষত্ব। এটি পুরানো পারসিক মোঙ্গল প্রথা। এই বৈশিষ্ট্যটি পরবর্তীকালে মুগল চিত্রকলার একটি বিশেষ রীতিতে পরিণত হয়।

দাস্তান ই আমীর হামযাহ বা হামযাহ্ নামা’র শেষের দিকের অপর একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র ‘মিনারের চূড়ায় ছোটবৃত্তে মিহরদুখ্তের শর নিক্ষেপ’। ছবিটি সুইজারল্যান্ডের আসকোনাস্থ মারিয়া সারে হারমানের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে ব্যাসিল গ্রে’র ইন্ডিয়ান পেইন্টিং গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন। ছবিটি মিশ্রণ রীতির একটি অসাধারণ চিত্র। চিত্রের বিবরণে চিত্রকলাবিদ এবিএম হোসেন উল্লেখ করেন, “ছবিটি একদিকে যেমন সাফাভী চিত্রকলার জাকজমকতা এবং শান্ত স্নিগ্ধতার পরিচায়ক, তেমনি অন্যদিকে ভারতীয় বৃক্ষ যেমন কলাগাছ, স্থাপত্য ইমারত এবং মিহরদুখ্ত ও সাথী অন্যান্য মহিলাদের গতিশীলতা ও তাদের সরু কোমর ও নিতম্বের ভারী চিত্রায়ণ তাকে ভারতীয় ঘরানার বলে সনাক্ত করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় বাজি রেখে শর নিক্ষেপে মিহরদুখ্তের ক্ষিপ্রতা এবং মিনারের চিত্রটি। বাজি রেখে শর নিক্ষেপ ভারতীয় একটি প্রাচীন পদ্ধতি যার উদাহরণ মহাভারতের অর্জুনের শর নিক্ষেপের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মিনারটি প্রায় হুবহুই দিল্লীর কুতুব মিনারের প্রতিকৃতি। ইমারতের স্তম্ভের শেভরণ অলঙ্করণ ফতেহপুর সিক্রির তুর্কী সুলতানার কক্ষের পিলার অলঙ্করণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই চিত্রটি সম্ভবত ফতেহপুর সিক্রির স্টুডিওতেই নির্মিত। নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত পৃষ্ঠার একটি ছবিতে যে দুর্গ অবরোধের বিবরণ দেখা যায় তাতে পারসিক এবং ভারতীয় রীতির সংমিশ্রণ স্পষ্টতর।”
মূলত দাস্তান ই আমীর হামযাহ বা হামযাহ্ নামা’র চিত্রাবলির একই চিত্রে পারস্য ও ভারতীয় উপাদানের অসংলগ্ন এবং অসংযত সহঅবস্থান সত্যিই অবাক করার মতো। চিত্রসমূহে হুমায়ুনের সময়ের পারস্য প্রভাব এবং আকবরের সময়ের ভারতীয় প্রভাব ব্যাপকভাবে ছিল। ছবিসমূহে একদিকে যেমন পারসিক স্নিগ্ধতা বর্তমান তেমনি ভারতীয় গতিশলীতাও লক্ষণীয়।
আনওয়ার-ই-সুহাইলী
হুসাইন ওয়াইজ কাশফী রচিত (মৃ. ১৫০৪-৫) অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি আনওয়ার-ই-সুহাইলী। পাণ্ডুলিপিটি স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ লাইব্রেরিতে রক্ষিত আছে। পাণ্ডুলিপিটির নির্মাণকাল সাধারণভাবে ১৫৬৭ থেকে ১৫৭১ সাল বলে অনুমান করা হয়। পাণ্ডুলিপির ছবিতে পাশুপাখির নমুনা, পশ্চাদপদ ও স্থাপত্য নিদর্শন উল্লেখ করার মতো। চিত্রের প্রাকৃতিক দৃশ্যের বৃক্ষ এবং আকাশে পাশ্চাত্য শিল্পরীতির প্রতিফলন দেখা যায়। পাহাড়-পর্বতের ছবিতে পারস্যরীতি ব্যবহৃত হয়েছে। বিষয়বস্তু অর্থাৎ ঝর্ণাধারা, বাঁদর এবং ভাল্লুকের ছবিতে সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় মুগলরীতি দৃশ্যমান। অপরাপর মিনিয়েচারের মধ্যে অন্যতম রাজা ও বিশ্বস্ত ভাল্লুক, উট, সিংহ, দম্পত্তি ও চোর প্রভৃতিতে উজ্জ্বল রঙের প্রয়োগ, সুষ্ঠু চিত্রবিন্যাস, উপাদানগুলোর ভারসাম্য, ত্রিমাত্রিক পদ্ধতিতে বিষয়বস্তুর বাস্তব চিত্রায়ণ মিনিয়েচারগুলোকে আকর্ষণীয় করেছে। একটি মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে একটি বানর ও ছয়টি কাশ্মীরি ভাল্লুককে অতিচাতুর্যের সাথে অঙ্কন করা হয়েছে। এ চিত্রে পারস্য ও ভারতীয় প্রভাবের মিশ্রণসহ পাশ্চাত্যের পটপ্রেক্ষিতের ব্যবহারও পরিলক্ষিত হয়। দাস্তান ই আমীর হামযাহ বা হামযাহ্ নামা’র ‘বানরকুলের খেলা’ চিত্রে যে মুখমণ্ডল দর্শানোর তিন-চতুর্থাংশ রীতি দৃশ্যায়ণ করা হয়েছে তা আনওয়ার-ই-সুহাইলী’র চিত্রেও সমভাবে লক্ষণীয়। আকবরের আমলের বিখ্যাত চিত্রকর দক্ষিণ ভারতীয় শিল্পী শাহ্ম আনওয়ার-ই-সুহাইলী পাণ্ডুলিপির কয়েকটি চিত্র অঙ্কন করেছিলেন ধারণা করা হয়।
গুলিস্তান
পারসিক অমর কবি সা’দীর গুলিস্তান’র একটি কপি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে রক্ষিত আছে। এ পাণ্ডুলিপির নির্মাণকাল ১৫৬৭ থেকে ১৫৭১ সালের মধ্যে বলে অনুমান করা হয়। পাণ্ডুলিপিটি সমসাময়িক বুখারা রীতিতে নির্মিত বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। ছবিসমূহে পারসিক স্নিগ্ধতা এবং ভারতীয় গতিশীলতার বৈশিষ্ট্যও লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে কবি সা’দীর গুলিস্তান’র অপর একটি কপি ১৫৮২ সালে লিপিকার মুহম্মদ হোসাইন আল-কাশ্মীরী যরীনকলম তৈরি করেছিলেন। লন্ডন রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটির লাইব্রেরিতে এটি রক্ষিত আছে। পাণ্ডুলিপিটি ফতেহপুর সিক্রিতে নির্মিত হয়েছিল বলে লিপিতে উল্লেখ আছে। এই পাণ্ডুলিপির উল্লেখযোগ্য চিত্রসমূহ বসবনের পুত্র মনোহর অঙ্কন করেছিলেন। মনোহরের এই চিত্রসমূহ পৃষ্ঠার প্রান্তদেশে হাশীয়া অর্থাৎ টীকা-টিপ্পুনি বা ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। চিত্রকর মনোহর এই হাশিয়ায় প্রায় দুই হাজার বিভিন্ন রকমের পাখি অঙ্কন করে আকবরী চিত্রশিল্পে এক নতুনমাত্রা সংযোজন করেছিলেন। পাখির সাথে সাথে মাঝে মাঝে খরগোশ, বনবিড়াল, চিতা, ছাগল ও কল্পিত সিমুর্গসহ বিভিন্ন পশুর ছবিও অঙ্কন করেছিলেন। মনোহরের পিতা বসবন মুগল চিত্রকলায় পশু-পাখি অঙ্কনের জন্য বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। পাণ্ডুলিপির শেষ পৃষ্ঠায় লিপিকার মুহম্মদ হোসাইন আল-কাশ্বীরীর প্রতিকৃতি অঙ্কনের সাথে সাথে বসবন তার নিজের প্রতিকৃতিও অঙ্কন করেন। এটি মুগল প্রতিকৃতি চিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল বৈকি।
তূতীনামা
একটি তোতাপাখির আত্মজীবনীমূলক পাণ্ডুলিপি তূতীনামা। এটি ১৩২৯-৩০ সালে জিয়া উদদীন নখ্শবী কর্তৃক রচিত হয়েছিল। সম্রাটআকবর ফতেহপুর সিক্রিতে থাকাকালীন গুরুত্বপূর্ণ এ পাণ্ডুলিপিটি চিত্রায়িত হয়। তূতীনামা প্রাচীন সংস্কৃত গল্প শুকসপ্ততি’র একটি পারসিক সংস্করণ। স্বামীর দূরে অবস্থানের কারণে বিরহকাতর একজন বধূকে গল্পচ্ছলে সান্তনার বাণী শোনানো তোতাপাখির সংলাপই এর মূল প্রতিবাদ্য বিষয়। পাণ্ডুলিপিটির দুটি কপির একটি বর্তমানে ওহাইয়োর ক্লিভল্যান্ড মিউজিয়াম অব আর্টে এবং অপরটি ডাবলিনের চেস্টার বেটি লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।
তূতীনামা পাণ্ডুলিপির চিত্রসমূহে দক্ষ শিল্পীর হাতের পরশ থাকলেও অধিকাংশ চিত্রেই অপরপিক্ক হাতের প্রমাণ মেলে। তবে এ কথাও সত্য যে, পাণ্ডুলিপির অঙ্কিত চিত্রসমূহে স্বকীয় ধারাক্রমে উন্নয়নের প্রয়াস দেখা যায়। বিশেষত চিত্রগুলোতে পারসিক ধারা থেকে ভারতীয় ধারায় রূপায়ণের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। এ সমস্ত চিত্রে বিস্তৃত পারসিক পটভূমিকে পাশ কাটিয়ে বর্ণিত বিষয়বস্তুর দিকেই বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়েছে। এখানে ভারতীয় নির্মাণশৈলীর প্রমাণ পাওয়া যায়। পশ্চাতের কিছু বৃক্ষ এবং আকাশের রূপে পারসিক ভাবধারা বর্তমান থাকলেও বিশেষত বধূর পোশাক পরিচ্ছদ, চুলের লম্বা বেনী, গলায় এবং কানে ভারী গয়না এবং ছাইচ সহকারে নির্মিত কক্ষের দৃশ্যাবলী ভারতীয়। সামগ্রিকভাবে উপর থেকে নিচের দিকে ছবির অভিক্ষেপ এটিকে মুগল চিত্র হিসেবে উপস্থাপন করে।
এছাড়াও দরবনামা, তৈমূরনামা, বাহারিস্তান, বাবরনামা, রজমনামা, রামায়ণ, নাফাহাত আল-উনস, আকবরনামা প্রভৃতি তাঁর সময়ের উল্লেখযোগ্য চিত্রায়িত পাণ্ডুলিপি। আকবরনামা’র দুটি কপিচিত্রের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য নির্ণয়ে চিত্রকলাবিদ এবিএম হোসেন উল্লেখ করেন, ভিক্টোরিয়া এ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামের কপির চিত্র বৈশিষ্ট্যে যে গতিশীলতা এবং নাটকীয়তা দৃষ্ট হয় তা পরবর্তী কপিতে অনুভূত হয় না। উদাহরণস্বরূপ ‘ঝিলাম নদীতে নৌকার সেতুর দিকে ধাবমান হস্তীকে আকবরের আয়ত্তে আনার প্রচেষ্টা’, বা ‘খাড়া পাহাড়ে আকবরের রণথম্ভোর দুর্গের অবরোধ’ ‘বেষ্টনীতে শিকারে রত আকবর’ চিত্রসমূহের কথা উল্লেখ করা যায়।
এই ছবিসমূহের ক্ষিপ্রতায় যে বাস্তবধর্মীতা ফুটে উঠেছে তা সমকালীন অন্যান্য পাণ্ডুলিপির চিত্রে দেখা যায় না। ‘আকবর হস্তী পৃষ্ঠে গঙ্গানদী পার হচ্ছেন’ ছবিটিও আকবরী চিত্রের গতিশীলতার আর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এই ছবিটির কাঠামো এখ্লাস তৈরি করেছিলেন এবং প্রতিকৃতিসমূহ উপরোক্ত মাধুর সৃষ্টি বলে উল্লেখ আছে। ইখ্লাসের নাম আকবরের সময়কালীন আর অন্যকোন পাণ্ডুলিপিতে দেখা যায় না।
পরিশেষে বলা যায়, শিল্প-সংস্কৃতি ও চিত্রকলার প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগ ছিলো সম্রাটআকবরের। তাঁর রাজত্বে পাণ্ডুলিপি চিত্রে অসংখ্য মিনিয়েচার যেমন চিত্রায়িত হয়েছিল তেমনি ফতেহপুর সিক্রির দেয়ালচিত্র নির্মাণেও তাঁর শিল্পরুচির প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে তাঁর শিল্পচর্চায় মিশ্ররীতির প্রভাব ছিল প্রকট। এক্ষেত্রে প্রথমত, রাজপুতনীতির কারণে তার দরবারে সনাতন ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। সেই প্রভাব থেকেই হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী বিশেষত রামায়ন ও মহাভারতের পারস্য ভাষায় অনুবাদ এবং চিত্রায়ণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন সম্রাটআকবর। দ্বিতীয়ত, খ্রিস্টান ধর্মযাযকগণ সম্রাটের দরবারে অনেক বেশি ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে। ১৫৬৯-৭২ সালের মধ্যে দরবারে এসে যীশুপন্থী ফাদারগণ সম্রাটকে প্লাটিনের একটি কপি এবং কয়েকটি উরোপীয় চিত্র উপহার দেন। অন্যদিকে ১৬০২ সালে খ্রিস্টান পাদ্রীগণ সেন্ট লুকের অঙ্কিত বেদীতে ভার্জিনের বিখ্যাত চিত্রটি আকবরকে দেখার জন্য প্রদান করেন। তাদের প্রভাবে আকবর প্রভাবিত হন। ফলে তাঁর প্রাসাদে অসংখ্য খ্রিস্টানচিত্র শোভাবর্ধন করে। তৃতীয়ত, আকবর ধর্মীয়ভাবে ফকির, সন্যাসী, দরবেশ এবং সংসারত্যাগী মরমী ব্যক্তিদের প্রতি ভীষণ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি পদব্রজে আজমীরে খাজা মঈনউদ্দিন চিশতির মাজার জিয়ারত করেন। চিত্রকরগণ এসব ঘটনাবলিকে চিত্রকলার বিষয়বস্তু হিসেবে চিত্রকর্ম সম্পাদনা করেন। অন্যান্য ধর্মের প্রভাব এবং ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মূল দর্শন থেকে অনেকাংশে বিচ্যুত হয়ে ফকিরী দর্শনে ঝুঁকে পড়েছিলেন বলে ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি যেমন তুর্কী, পারস্যবাসী, গুজরাটি, কাশ্মিরী, রাজস্থানী, পাঞ্জাবী প্রভৃতি চিত্রকরদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন তেমনি হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন স্তরের শিল্পীদেরও চিত্রকলার মূলকাজে নিয়োজিত করেছিলেন। ফলে একদিকে যেমন ‘রামায়ণ-মহাভারতে’র চিত্রকর্ম সম্পাদিত হয়েছে তেমনি ‘গুলিস্তা’ ‘বুস্তা’ ও ‘খামসা’র মতো পাণ্ডুলিপিগুলোও চিত্রায়িত হয়েছে। এটাকে একদিকে যেমন ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায় অন্যদিকে মিশ্রশিল্পকর্মের কারণে মুসলিম চিত্রকলার ইতিহাস খানিকটা ভিন্নধারায় প্রবাহিত হয়েছিল বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। এ ক্ষেত্রে শিল্পীদের সমন্বয়ের অভাবের কারণে চিত্রকলায় এক ধরনের সংমিশ্রণরীতিও লক্ষ্য করা যায়। বিশেষত কিছু চিত্রের ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁর সময়ের অধিকাংশ চিত্র দুজন বা একাধিক শিল্পী দ্বারা সম্পন্ন হতো। একজন স্কেচ অর্থাৎ রেখা দ্বারা ‘তারাহ’ অঙ্কন করতেন এবং মূলশিল্পী রঙ ও তুলির সাহায্যে ‘আমল’ অর্থাৎ চিত্রাঙ্কন করতেন। ইতিহাসবিদ এবিএম হোসেন বলেন, “বিশাল আকারের একটি পরিকল্পনায় আকবর শুধু পারস্য থেকে আগত শিল্পীদের উপরই নির্ভর করেননি। পাণ্ডুলিপির প্রান্তে শিল্পীদের নাম দৃষ্টে অনুভূত হয় যে অন্ততপক্ষে ৭০% শিল্পীই ভারতীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন। তাদের মূল বাসস্থান সম্পূর্ণরূপে জ্ঞাত হওয়া না গেলেও তাদের নামের পাশে গুজরাটী, কাশ্মীরী, লাহোরী ইত্যাদি পদবী থেকে অনুমান করা যায় যে, তারা ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত।” সম্রাটআকবর এটাকে শিল্পসৃষ্টির উৎকৃষ্ট পন্থা বলে মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে চারুশিল্পের মানোন্নয়নে তা উপযোগী হয়ে উঠেনি। ফলে সম্রাটজাহাঙ্গীরের সময় মিশ্রণরীতি বাতিল করেন।
(চলবে)