ঢাকার খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়ায় আমার একখণ্ড জমি আছে। সে জমির ধার ঘেঁষে অভিজাত বনশ্রী। অবশ্য কাগজপত্রে বনশ্রী এখনো মেরাদিয়ার অংশ। উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম এখনকার চারদিকের বনশ্রীই ওই এক নামেই খ্যাত ছিলো, মেরাদিয়ার বিল!
আর তা শুধু আমি কেন, বর্ষাকালে আমার ছেলেমেয়েরাও ওই বিল ডুবে থাকতে দেখেছে। সাবধানে কত বিকেলে সেখানে কোষা নৌকা ডেকে তাদেরকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে এক-আধটু ভ্রমণও করেছি। একটু ঝড় উঠলে সে বিলের ঢেউ এসে খুবলে নিয়ে যেতো আশপাশের বাড়ির যত কাঁচা ডোয়া। শুধু পরিকল্পিত রাস্তার সুবাদে সেই বর্ষার বিল আর হেমন্তকালে ফসলের ধূ ধূ মাঠ আজ অভিজাত আবাসিক এলাকা! প্রতি বুধবার যেখানে অতিসস্তায় নানান গ্রাম্য সামগ্রীতে সয়লাব থাকতো, সেখানে স্থায়ী বাজার বসে এখন আশপাশের এলাকার থেকে এই বাজারেই সবকিছু দাম বেশি। আর সেখানে বুধবারের সে হাটটি শুধু বাঁশের জন্য বিখ্যাত ছিলো, এখন সেখানে সারাবছরই বাঁশের বহু আড়ৎ। প্রতিদিনই বাঁশ কেনার যে কোনো একটি টংঘরে ঢুকে দরদামে বনলেই হলো।
একদিন কবি অঞ্জনা সাহাকে ধরে নিয়ে গলাগলি করে সব ঘুরিয়ে দেখানোতে আমিও নতুন করে বনশ্রী দেখেছিলাম। অঞ্জনাকে নিয়ে মরা নদীর রেখাটি ঘেঁষে বসে শরতের মেঘে মেঘে চোখ রেখে বর্ণনা করেছিলাম এর অতীত স্মৃতি। তারপর এক নৌকাওয়ালাকে পছন্দ হলে তাকে ডেকে বলেছিলাম, আমাদের নিয়ে চলো, আমরা এমনিই বেড়াবো! মানে কোথাও যাবো না শুধু পানিতে ভাসবো!
নৌকোওয়ালা বললো, ‘বেইল যতক্ষুণ আছে ঘুরতে পারবেন। সন্ধ্যার পর আমরাও সাবধানে থাকি, নেশাকরা পোলাপান টাকা-পয়সা কাইড়া লইয়া যায়।’ মাঝির কথায় রাজি হয়ে বললাম, ঠিক আছে, আজ খালি হাতে বাবাজিদের সাথে দেখা না হোক, আজ সন্ধ্যা পর্যন্তই ঘোরাও।
আগে বাঁশের এই হাটের সাথে দূর-দূরান্তের মানুষের যোগাযোগের পথ তরতরে সে মরা নদীটি এখন বনশ্রীর বর্জ্য নির্গত করে দুর্গন্ধযুক্ত কালসিঁটে এক কাঁচা ড্রেনে পরিণত হয়ে আছে।
আমার জমিখণ্ডের ধারে-কাছে প্রতিবেশী যারা স্থানীয়, তারা রাস্তার জন্য কিছুটা জমি ছেড়ে বাড়ি করা দূরে থাক, নিজেদের দেয়ালের আস্তরটুকুর আধইঞ্চি জায়গা রাস্তার ওপর থেকে নিতে পারলে বর্তে যায়। তাদের মোটেই বোঝানো যায় না, রাস্তা চওড়া হলে জমির দামও বাড়ে!
জমি এমনি ফেলে রাখলে রাস্তার টোকাই থেকে প্রভাবশালী কে কখন তার ওপর ঘরবাড়ি তুলে দখল করে ফেলবে। তাই বড় পরিকল্পনা সুদূর পরাহত থাকায়, কিছু ছোট ঘর তুলে ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করি। বাড়িতে শুরু থেকে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সবই আছে। তবু সে ভাড়া তুলতে নিজের জান-মান দুটোতেই টানাটানি পড়ে। একের পর এক ভাড়াটিয়াদের থেকে বেছে আগ্রহী কাউকে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে দেখেছি। সন্দেহের বীজ চারা হয়ে, শেষে সে চারা জীবনঘাতী মহীরুহ হতে সময় লাগে না। অতঃপর সে গাছ উপড়াতে আরেক ঝক্কি। এই ঝক্কির টান সামলাতে না পেরে অনেকে বাড়িই বিক্রি করে দেন। আর দেখে যাদের শিক্ষা হয়, তারা শুরুর আগে জমিই বিক্রি করে দেন।
কিন্তু আমি ওই দুই দলের কোনো দলে পড়ি না। নাকানিচুবানির ভেতরে যে রসদ থাকে সেইটুকু জমা রাখি ফসল বা অর্থের অধিক করে। নাগরিক অধিকার রক্ষায় বুক চিতিয়ে চ্যালেঞ্জে নামি। সবকিছুতে এক-আধটু ঝুঁকি আমার মন্দ লাগে না।
আমার একরকম এক খাবিখাওয়া দশার ভেতর বহুদিনের ফিসফিসানো মমতাজ এবার জোর গলায় এসে কাছে ভিড়লো। সে আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করলো সে-ই পারবে মাসের যে কোনো এক নির্দিষ্ট দিনে পুরো মাসের ভাড়ার টাকা আমার বাসায় গিয়ে একমুঠোয় পৌঁছে দিতে। এর আগে অন্যসব ম্যানেজারের বিশ্বাসের গলদটুকু এই মমতাজই ঠারেঠোরে ধরিয়ে নিজে প্রবেশের পথ করতে চাইতো। যা আমি স্পষ্ট বুঝেও এড়িয়ে যেতে চাইতাম। কারণ টায়টায় সততা কারো থেকে আশা করে মরণ ত্বরান্বিত করার আগ্রহ আমার ছিলো না।
শেষমেশ মমতাজের তুকতাকে নিজেই ধরা দিলাম। কৌশলী মমতাজকে অবলম্বন পেয়ে শেষেরজন ম্যানেজার সিদ্দিককে প্রায় ঝেঁটিয়ে নামালাম পদ থেকে।
সিদ্দিক আগে চালাতো রিকশা। সে ম্যানেজার হওয়ার আগেই দেখতাম, বাড়িতে কোথাও কোনো কাজের দরকার হলে, কারো কোনো অনুমতির ধার না ধেরে একথাবায় সে তা করে ফেলতো। তার জন্য কোনো বখশিসের মুখাপেক্ষী হতে তাকে দেখিনি। আর এতেই মুগ্ধ হয়ে সব ভাড়াটিয়াকে ডেকে এক মাহেন্দ্রক্ষণে বলেছিলাম, এখন থেকে মাকসুদা বাদ। সিদ্দিককেই তোমরা ম্যানেজার হিসেবে মানবে। যেখানে থাকি, ম্যানেজার সিদ্দিক ভাড়ার টাকা দিতে আসা ছাড়াও হরহামেশা এসে এসে একাজ সেকাজে হাত লাগায়। বাড়ির দীর্ঘদিনের অগোছালো কোনাটা ফকফকে হয়ে গেলে কার না ভালো লাগে! আমার বাসায় এসে এসে নতুন যারই সাথে সিদ্দিকের দেখা হয়, প্রতিটি মানুষের সাথে ভাব জমিয়ে তাদের বাসার ঠিকানা নিয়ে বাসায় যায়। আর বাসায় আসা মানুষেরও কেউ কেউ সিদ্দিকের হঠাৎ এসে হামলে পড়ে নিপুণহাতে করা কাজগুলো দেখে খুশি শুধু নয়, যাকে বলে অভিভূতও হয়। অনেকে তারা ওকে নিজের থেকেও ঠিকানা দিয়ে যেতো। আর ও তাদের সব বাসায় গিয়ে গিয়ে অগোছালো জিনিসপত্র এমনভাবে গোছাতে শুরু করে দিতো, যে অল্পদিনেই তাদের সবার জরুরি হয়ে উঠেছিলো। সামান্য পরিচয়ের অনেকেও সিদ্দিকের মাহাত্ম্যে আমার খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো।
অভিনেতা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় তো কতবার বলেছেন, ‘দীলতাজকে অশেষ ধন্যবাদ সিদ্দিককে উপহার দেওয়ার জন্য’! শান্তিনগর পোস্ট অফিসের কাছে ফ্ল্যাট কিনে দাদা যখন ইস্কাটন থেকে সেখানে শিফট করেন, ইস্কাটন থেকে সব গুছিয়ে বেঁধেছেঁধে নিয়ে আবার শান্তিনগরের বাসায় সব গুছিয়ে মেলে রাখার কাজ একাই সিদ্দিক করেছিলো। সিদ্দিকের কাছে দাদার বাসার একটি চাবিই রাখা থাকতো পরম নির্ভরতায়।
গোছগাছ শেষ হলে কিছু জিনিসপত্রে টান পড়ে দাদা মৃদু অভিযোগ করলেন আমার কাছে। আমি তাঁকে বলেছিলাম, চুপ করেন তো দাদা! সবার ভেতর একজন সিদ্দিক থাকে। যাকে যে কাজ করতে দেবেন, সে-ই সেখান থেকে কিছু তছরুপ করবে। তারচেয়ে ও যে আপনাকে এভাবে গুছিয়ে রাখছে, সেটা অন্য কেউ পারবে না। তবে দামি জিনিসপত্র নিয়ে সতর্ক থাকবেন।
দাদা বেশ ক’বার বলেছেন, দীলতাজ, আপনার কথাটা আমি অনেক জায়গায় কোট করেছি। ওই যে, ‘সবার ভেতরেই একজন সিদ্দিক আছে!’ কিন্তু দাদাকে আমি উল্টো সেদিনই অভিযোগ করলাম, কিন্তু আপনি আপনার পুরনো শার্ট প্যান্ট ওকে দিয়েছেন কেন? ও তো আপনার বাসা থেকেই ইস্ত্রি করে ওগুলো পরেই এখন ঘুরে বেড়ায়!
দাদা শুধু বললেন, ‘তাই নাকি? অনেকদিন তো ওর সাথে দেখা হয় না, কখন কাজকর্ম সেরে যায়, নাকি আমার কাপড়চোপড় পরে থাকে বলে আমার সাথে যেন দেখা না হয়, সেভাবেই আসে!’
আমার বাড়িটা তো সেমিপাকা। বাড়ির ভেতর বাথরুমের পানি নির্গত হওয়ার পাইপ জ্যাম হয়ে বাড়ির ভেতরই উপচে পানি পড়ছে। সিদ্দিক এখন আমার এধরনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। অল্প বয়সে বিয়ে করেছে বলে ওর ছেলে মাথায় মাথায় ওর সমান। পিঠেপিঠি ছেলেমেয়ে মোট চারটে। সংসারের টানাপোড়েন সামাল দিতে বউ বয়সের থেকে বেশিই ক্লিষ্ট। আপনার দেওয়া শার্ট-প্যান্ট পরে ও এখন বাড়িতে ঢুকেই নাকি তার বউয়ের দিকে চরম হেয় দৃষ্টিতে তাকায়। যেন তার ভাটাপড়া যৌবনের জন্য সে নিজেই দায়ী। আর তার নিজেকে নিয়ে যে ভাব, তা আল্লাহ আমারে জোয়ানকি দিছে, আমি কিয়ারুম!
দাদা আমার দিকে আশ্চর্য চোখে চেয়ে থাকে, আর আমি বলতে থাকি, আর বাড়ির ভাড়াটিয়া সব সিদ্দিককে এখন কোনো কাজের কথা বলা দূরে থাক, তার দিকে আড়ে আড়ে চায়। মানে ওই পোশাকপরা মানুষের কাছে কি পায়খানা উপচেপড়ার অভিযোগ করা যায়? গ্যাসের চুলা জ্যামের কথা বলা যায়? বহু ব্যবহারে জীর্ণ হওয়া কল দিয়ে পানি গড়াচ্ছেই…।
একটানে বলা আমার কথাগুলো শুনে দাদা শুধু বললেন, ‘তাই নাকি? এত কাণ্ড? ও, ওর থেকে চাবিটা নিয়ে নিতে হবে। আমার ঘরের আরো অনেক কিছুই খোয়া গেছে বলে মনে হচ্ছে। আপনি যখন ওকে সৎ মনে করেছিলেন, ও আগে সুযোগ পায়নি তাই চুরি করেনি।’
চামেলীবাগে একসাথে থাকা আমার প্রাক্তন প্রতিবেশী কৃষ্ণা বৌদি বেইলি রোড থেকে একদিন ফোনে হাউমাউ করে কেঁদে বললো, দীলতাজ আপা, সিদ্দিক প্রায়ই এসে, ঘরে ঢুকেই ‘ঘরদুয়ার পরিষ্কার করে দিয়া যাই’ বলে জিনিসপত্র সব টেনেটুনে নিজেই ঝাড়াপোছা শুরু করে আবার ফলস ছাদগুলোতেও আগ্রহভরে উঠে পরিষ্কার করে যায়। কেউ তাকে বলে না, সে নিজেই এসব কাজ করে। কিন্তু আজ একটা দরকারে একজনকে উপরে উঠিয়ে দেখি, বিভিন্ন গার্মেন্টস থেকে আপনার দাদাকে দেওয়া যত কাপড়ের স্যাম্পল ছিলো, তার কিচ্ছু নাই। গার্মেন্টস থেকে কাস্টমস অফিসারদের জন্য স্পেশাল করে কাপড় বানায়। ফ্যাক্টরিগুলো বোঝায় যে এই কোয়ালিটি আমরা বাজারে ছাড়ছি! কিন্তু আসলে তো আরো নিম্ন কোয়ালিটি তারা বাজারে ছাড়ে। আপনার দাদা যে রাগী, যদি সে টের পায়, সে বাসায় না থাকা অবস্থায় সিদ্দিকের মতো তাগড়া জোয়ান পুরুষ খালি বাসায় আসা-যাওয়া করে, তাহলে নির্ঘাত সে আমাকে কঠিন বকা দেবে। বলে কৃষ্ণা বৌদি কান্নার গতি বাড়িয়ে দিলো।
বৌদির কথা শুনে আমার আট্টাস লাগার দশা। কিন্তু ততদিনে তো সিদ্দিককে বাড়ির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সে এখন সাধারণ ভাড়াটিয়া। বরং এখন সেও দেরিতে ভাড়া দিলে মমতাজের প্যাঁদানি খায়!
বৌদির বর্ণনানুযায়ী কাপড়ের বিষয়ে ফোন করে মমতাজকে বললাম সিদ্দিকের ঘরে চুপিসারে একটু খোঁজ নিতে। অল্পক্ষণের ভেতরই মমতাজ জানালো, সিদ্দিক কোথায় কোন কাজ করছিলো, সে কাজে স্পিরিট না এসিড লেগে তার দুইহাত কব্জি পর্যন্ত মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে। সে আপাতত হাসপাতালে। তবে মমতাজ ও-ধরনের কাপড়ের কোনো আলামত সিদ্দিকের ঘরে পায়নি।
আশ্বস্ত করতে মমতাজের বলা খবরটা কৃষ্ণা বৌদিকে পৌঁছে দিতেই, বৌদি বললো, ‘দীলতাজ আপা, সিদ্দিক কি অতো কাঁচা চোর যে ঘরে এমনভাবে চোরা কাপড়গুলো রাখবে, আর আপনার মমতাজ গিয়ে তা দেখে, আপনাকে, আমাকে খবরটা দেবে? তবে আমার জবাব আমি পেয়ে গেছি! আপনার কাছে নালিশ করার পর আমি আপনার দাদার ভয়ে আর টিকতে পারছিলাম না। আমার ছটফটানি উঠে গেছিলো। শেষে পুজোর ঘরে ঢুকে ভগবানের কাছে কান্নাকাটি করেছি। ভগবান তার ফল দিয়েছে। ওই যে ওর হাত পুড়েছে, সেজন্যই। ইদানীং ওর কত বাড় বেড়েছে, দেখেছেন? নায়কের কাপড়চোপড় পরে নায়কের মতো সটান হয়ে চলে! এখন তার কথা বলার ঢংও তো স্বয়ং পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বলা নাটকের সংলাপের মতো।’
মাত্র বছর দুয়েক এইসব কাণ্ডকারখানা সয়ে আমার কেবলি মনে হতে থাকে, এই সেদিন যে সিদ্দিক ধরমার করে আলগা হয়ে আসা টিনের বিশাল বেড়া একাই বাঁধছে। ড্রেনের মাটি কোদাল না পেয়ে দু’হাত দিয়ে কাচিয়েছে, সেই কিনা এমন সব মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছাতে পারে!
মমতাজের বিয়ে হয়েছিলো আমার ওই বাড়িতেই। ওর বাপ ট্যাক্সি চালাতো। রুগ্ণ চেহারার এক অতিগ্রাম্য তরুণ ওর বাপের কাছে ট্যাক্সি চালানো শিখতে এলে, ওর বাপ সে শিষ্যকে জামাই করে ফেলে। তবু সে তরুণ ইঞ্জিনচালিত কোনো গাড়ির ড্রাইভার হতে পারেনি। মারমুখী মমতাজের পাশে বরাবরই সে এক নিরীহ প্রজা।
বাড়িতে ভাড়াটিয়া, ম্যানেজার যতই থাকুক, উঠতি বয়সী স্থানীয় ছেলেদের রোখা যায় না। তারা সাতসকালেরও আগে, পাঁচসকালে ঢুকে বাড়ির এককোনায় জটলা পাকিয়ে গাঁজা খায়, আর দিনভরই শুধু নয়, অর্ধেক রাত পর্যন্ত জুয়া খেলে। আমি হঠাৎ কখনো গিয়ে উঠলে দুরদার করে সব এদিক-সেদিক আর দেয়াল টপকে বের হয়ে যায়। চলে আসার সাথে সাথে আবার যে সেই! আগে ভাবতাম, থানায় নালিশ করি। কিন্তু পুলিশের ভূমিকা কে না জানে! ফলস্বরূপ এরাই মানে এইসব উঠতি মাস্তান আবার পাটকেল মেরে এলাকা ছাড়া করবে। জমি বিক্রি করতে গেলেও যারা কেনার জন্য যাচাই করতে আসবে, তাদেরকে ঠ্যাং ভাঙার হুমকি দিয়ে বিদায় করবে। শেষে ভাবি, আমি ঢুকলে যে দুরদার করে সবগুলো বেরিয়ে যায়, এই যাওয়াটাই বা না গেলে কী করতাম? অতএব আপাতত ওটুকুকেই স্বস্তি মানি।
এদিক ওদিক আসা-যাওয়ার পথে বিনা দরকারেও আমি আমার ও-বাড়িটিতে নেমে পড়াটাকে একটা দরকার মনে করি। কারণ হিসাবে মনে হয়, যে জমিতে যার পা না পড়ে, সে জমিও তার হয় না। তাই সংসারজীবনের শুরুতে অতিকষ্টে কেনা আধাখাস্তা এই জমিটুকু প্রাণের সাথে বেঁধে রাখতে আমার প্রয়াসের কোনো ঘাটতি থাকে না। একদিন তাই এমনিই বাড়িটিতে ঢুকে পড়েছি। ঢুকে দেখি একটু ভিড়। এর-ওর গালে রঙের প্রলেপ। ভালোমন্দ রান্নার ঘ্রাণ। হাসিখুশি প্রাণে মমতাজকে ডেকে বললাম, কার কী ঘটছে, যে এই জীর্ণ বাড়িতে এত বনেদি রান্নাবান্নার ঘ্রাণ?
মমতাজ আকর্ণ হেসে বললো, খাদিজারে বিয়ে দিলাম, সেন্টুর লগে!
: মানে, যে ক’টা এখানে গাঁজা খায়, জুয়া খেলে সেন্টুই তো পালের গোদা?
: হয়, কইছে, খাদিজারে ওর লগে বিয়া দিলে অয় বালো অইয়া যাইবো!
: ওর মা-বাপ, আত্মীয়রা কেউ জানে?
: না। জামাই কইছে, এহন জানাইলে বিয়া অইতে দিবো না। অইয়া গেলে আর ফেলতে পারবো না।
: তা ত্ইু একাই এই বিয়ে দিলি? তোর স্বামী নান্নু কই?
: হ্যায় দিবো এইহানে মাইয়ার বিয়া? সে মাইর খাওয়ার ভয়ে পলানোর দশা। দুই কেজি চালের টাকা উঠলে রিকশা নিয়া বাড়ি ফিইরা মসজিদঘরে গিয়া আল্লাহর নাম জপতে বইয়া যায়…।
পৃথিবীতে এরকম দু’চারটে বিয়ে ভালো হলেও, সে খবর আমার জানা নেই। কিন্তু পাত্র যত আধাখাস্তাই হোক, তবু স্থানীয় মানুষের ছেলে বলে কথা। তাদের কৌলিন্য অতিক্রম করে মমতাজের মতো চালচুলোহীন মানুষের মেয়ে বিয়ে করাবে, তার ওপর মেয়ের বাপ রিকশা চালায়। বেকার হলেও একটা কথা ছিলো। না। এটা ভাবাও যায় না।
মমতাজের মেয়ের এই বিয়ে টিকে যাক, মনে মনে সেই কামনা করে, এমন এক দ্বান্দ্বিক সময়ে মমতাজের অন্তরের সুকোমল প্রান্তটি নাগাল পাইয়ে দিতে তাকে বললাম, এই সেদিন তোর বিয়ে হলো! এই তো সেদিন! এখনো আমার চোখের সামনে ভাসছে। এগারো, বারো বছরের একফোটা মেয়ে তুই, সেই মমতাজ তুই আজ শাশুড়ি হয়ে গেলি! বুঝে-শুনে চলিস। তবে তোর যে বশীকরণ ক্ষমতা আছে, তা আমার আগেই বোঝা উচিত ছিলো। না হলে আমিই বা কেন এত মমতাজ মমতাজ করি! এখন সবখানে যেতেও তুই মমতাজই আমার অগ্রপথিক! যেন তুই-ই আমাকে আগলে রাখছিস।
আমার কথায় মমতাজ খুশি হয়। আর সে খুশির রেশ যেন ওর মেয়ের বিয়ের সে ভয়ার্ত-আনন্দের সাথে গিয়ে মেশে।
আরেকদিন আমার এক বান্ধবী হঠাৎ এসে আমাকে বললো, চল তো কোথাও। বললাম, এতদিন পর তুই কি আমার কাছে এলি, নাকি আমাকে নিয়ে বেরোতে এলি?
: দুটোই! তোর ভেতর একটা বোহেমিয়ান শক্তি আছে…।
: মানে ভবঘুরে? আমার সম্পর্কে এই তোর অ্যাসেসমেন্ট? তবে আমি মনে মনে ভবঘুরে!
: আমিও তো তাই বলি!
: কিন্তু তোকে কেন এত উদাস লাগছে?
: তাহলে আমিও সবসময়ই মনে মনে উদাস।
সায়রাকে বললাম, হাতিরঝিলে যাবি?
: না! ওখানে ভিড়। আমার কোনো ভিড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। কোথায় গেলে মানুষ চোখে পড়বে না, সেখানে চল।
আমি হেসে বাঁচি না।
বলি, তুই সবাইকে মানুষ ভাবলে তো আর সন্ধ্যা হলেও তোর এই রূপ নিয়ে ঘরে ফেরার জন্য উদ্বিগ্ন হবি না! ধীরে-সুস্থে ফিরলে হবে!
আসলে সেদিন বিকেলে বাংলাদেশ টেলিভিশনে কবিতা পড়া ছিলো। সায়রাকে নিয়েই বেরোলাম। প্রথমদিকেই ডাক পড়ায় আগেই রেকর্ডিং হয়ে গেলো। বসে থেকে বাকি কবিদের কবিতা পড়া শোনা যেতো। কিন্তু মনে হলো আমার ওই বাড়িটি একটু ঘুরে যাই। সায়রাকে বললাম, চলো টেলিভিশন থেকে বেরিয়ে পড়ি।
সায়রাকে আগে বলা হয়নি কোথায় যাচ্ছি। বাড়িটিতে ঢুকে সায়রা সাথে থাকায় মমতাজের চেঁচামেচি আমাকে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে দিলো। তাকে পরাস্ত করতে তাড়াতাড়ি বাড়ির মাঝখানে তার সামনে গিয়ে হাজির হলাম। সেখান থেকে টের পেলাম, আরেক দিকে পাশের কোনো একঘরে কয়েকটি ছেলেমেয়ে একসাথে কাঁদছে।
সাথে ভিন্ন মানুষ থাকায় রয়েসয়ে তার চেঁচামেচির কারণ জানতে চাইলে মমতাজ যা বললো, দশ তারিখ পার অইয়া যাইতেছে, এরা কয়ঘর ভাড়া দিতে বাকি! আমাকে পেয়ে বাকিওয়ালারা যেন নিধি পেয়ে গেলো। বাড়ির দুদিক থেকে দুখানা প্লাস্টিকের পাতলা টুল এগিয়ে আসতেই আমি একটা প্রায় কেড়ে নিয়ে বসে পড়লাম। সায়রা দোনামনা করছিলো, বসবে কিনা। আমি বললাম, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবি? এসে যখন পড়েছি, বাড়ির মালিক হয়ে ঝামেলা দেখে তো ল্যাজ গুটিয়ে চলে যেতে পারি না।
সায়রা তবু দাঁড়িয়ে থেকে বললো, ‘তোর এই জমির দাম কত?’
বললাম, পাঁচ কোটি পর্যন্ত দাম উঠেছে।
: তুমি এটা বিক্রি করে টাকাটা ব্যাংকে রাখ তো!
: জমি আর নগদ একথোক টাকা তো এক নয়!
: এই হ্যাপা তোর ভালো লাগে?
: খ্যাতি থাকলে তারও যেমন একটা বিড়ম্বনা থাকে, এটাও তেমনি। জমিদারি রক্ষা করতে চাইলে প্রজা পেটানোর তাকদ থাকতে হয়।
আমাকে প্রশ্ন করে সায়রা বুঝি ক্লান্ত হলো। এতক্ষণ শূন্য থাকা টুলটায় সেও বসে পড়লো।
আমাদের ঘিরে থাকা মানুষের ভেতর নারীই বেশি। পুরুষ দু’চারজন। তাদের ভেতর যারা এ মাসে মোটেও ভাড়ার টাকা দেয়নি, বা যারা কিছুটা দিয়েছে, যার যার না দেওয়ার ফিরিস্তি বলে যাচ্ছে। প্রায় সবারই এই ক’টা করে টাকা না দিতে পারার যে কৈফিয়ৎ, অনেকের বর্ণনা এত মনোজ্ঞ, প্রাঞ্জল মনে মনে ভাবলাম, আমি কি শিখে গেলাম, মমতাজকে তার মূল্য কখনোই বোঝানো যাবে না।
সায়রা ওঠার জন্য উসখুস করলে আমি মনে মনে তার প্রতি রাগ হই। ঘায়েল করতে বলি, আসলে সবসময় তো আসা হয় না। ঢুকে যখন পড়েছি, আমারই তো বাড়ি।
: মমতাজ সামলে নেবে। চল আমরা চলে যাই।
সায়রার এই একটুতে অসহিষ্ণুতায় আমার মেজাজ চিড়িক করে ওঠে। তাকে ঘায়েল করতে বললাম, তোকে এদের কেউ একটি রিকশায় তুলে দিয়ে আসুক। জ্যাম না হলে গাড়িতে দিয়ে আসা যেতো।
সায়রা মিনমিন করে বলে, না থাক, তোর সাথেই যাই।
আমি রুষ্টভাব গোপনের চেষ্টা বজায় রেখেই সায়রার উদ্দেশ্যে বললাম, খালি বহুতল ভবনের খুপরিতে থাকলে চলে? জীবন তো একটাই। তোর সামর্থ্য আছে, তুই ভালো জায়গায় থাকতে পারিস। অন্যের দুর্দশা না দেখলে বুঝবি কী করে, যে তুই কত ভালো আছিস?
আমার কথায় সায়রা একটু ঝামটা মেরেই বলে ওঠে, তুমি যেন এদের দুর্দশা দেখতে আসো!
সায়রার কথা সত্যি। তাই আমারও আর তাকে বলার তেমন কিছু থাকে না। আমাকে ঘিরে প্রায় সবাইকে একত্রে গোল অবস্থায় পেয়ে মমতাজ বাকি ভাড়ার পুরনো জের আবার টেনে সবার প্রায় নাকের কাছে তর্জনি নিয়ে জোরে জোরে বলতে লাগলো, এই যে বাড়িওয়ালি আইছে, তার কাছে একমুঠে টাকাগুলি দিয়া দিই। যান। যার যার ভাড়া আনেন, কইতাছি!
আমি মমতাজকে কষে একটা ধমক দিলাম, এদের কাছে এই কয়টা টাকার জন্য এত বাড়াবাড়ি করছিস কেন?
অন্যের দিকে তাক করা ধারালো তলোয়ারের মতো মমতাজ তার কণ্ঠ এবার আমার দিকে তাক করলো। বললো, খালাম্মা কী যে কন, এই কয়ডা কয়ডা টাকা মিলাইয়াই তো আপনের আশি হাজার টেকা অয়!
মমতাজকে আমার খুব অমানবিক মনে হতে লাগলো। আমি সবার সামনে তাকে কষে ধমক দিতে লাগলাম এই বলে, যে, তোর এই কয়টা করে টাকা পাওনা। আর ওদের তারচে’ কত বড় বড় অসুবিধা! থাক, আর খেচরমেচর করিস না! যার যার সুবিধামতো সবাই দেবে!
মমতাজ তখনো নেভে নাই। সে তার সেই অগ্নিদাহ আমার দিকে তাক রেখেই বলতে লাগলো, দিলেন তো মাথায় তুইল্লা। এহন থেইকা দেইখেন, ভাড়া চাইলে আপনের কাছে বিচার নিয়া যাইবো এরা। দয়া দেহানোর জায়গা এইডা না খালাম্মা!
আমার একটু ছাড় দেওয়া বাণীতে বাড়িটা শান্তিতে কুলুকলু হয়ে গেলো। আহা, এতগুলো মানুষ দরদমাখা হৃদয় নিয়ে আমাদের ঘিরে আছে। আগে বাড়িতে গেলে মা-চাচিরা অনেকক্ষণ এভাবে ঘন হয়ে থাকতো চারপাশে। ভরা সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকার তখন। মমতাজ বোধ হয় একটি বাল্বও কিনতে কার্পণ্য করে বাইরের জন্য। চারপাশের ঘর থেকে সোজা, তির্যক আলোয় ঝাপসা যেটুকু দেখতে পাই তাতে মা-চাচি আম্মাদের ভাবনার রেশ কাটে না। কিন্তু মশা মশা করে সায়রা নিজেই আমার মশার অধিক অস্বস্তি ঘটাচ্ছে। তার ভেতর দূরের একঘরে কোরাসে কান্নার মিহিসুরটা কানে এসে পিনের মতো লাগছে। মমতাজের কাছে জানতে চাই, এতক্ষণ ধরে কাঁদে কারা? আর কেনই বা কাঁদে?
বাড়ির সবাই অতি উৎসাহে একসাথে বলতে শুরু করলে আমি কিছু বুঝি না। কিন্তু সারাবাড়ি ঝাড়ু দিয়ে যদি কয়েক টুকরো কাচ পাওয়া যায়, তাতেই বোঝা যায়, টুকরোগুলো কাপ, গ্লাস, পিরিচ নাকি প্লেটের। বুঝে নিলাম চার ছেলেমেয়ে নিয়ে এক কমবয়সী মহিলা ঘরভাড়া নিয়েছিলো। সাথে তার মা-ও থাকে ছেলেমেয়েগুলোকে দেখে রাখতে। আর মহিলা গার্মেন্টসে চাকরি করে। কিন্তু কিছুদিন আগে কোনো এক গ্রাম থেকে মাঝে মাঝে ঢাকাতে আসা এক মেম্বারের সাথে মহিলার বিয়ে হয়। বিয়ের পর সে মেম্বার ঢাকায় এলে এইখানে মহিলার ছেলেমেয়ে, মায়ের সাথে এই একঘরের ভেতরে একটানা ক’দিন করে থেকে যেতো। কিন্তু অনেকদিন হলো, সে মেম্বার ঢাকায় এলে অন্য কোথাও ওঠে। আর অন্য মেয়েমানুষ জোগাড় করে রাত কাটায়। শেষে আমার বাড়ির এই ক্রন্দনরত চার ছেলেমেয়ের মা সেধে সেই মেম্বারকে তার জোগাড় করা অবৈধ মেয়েমানুষসহ বাড়িতে নিয়ে আসে।
এই পর্যন্ত বোঝার পরে আমি গনগনে মমতাজকে জিজ্ঞেস করলাম, তা কেন করে? অই যে অন্য মেয়েমানুষসহ কেন নিজের ঘরে জায়গা দেয় মহিলা?
ভিড়ের সবাই প্রায় একসাথে যা উত্তর দিলো, তা আমার মগজে না সেন্ধে পারে নাই! সবার উত্তরটা হলো, আলগা মাইয়া মানুষসহ জায়গা দিলে তবু তো বেডি বেডার এট্টু ভাগ পায়! তারপর প্রশ্ন করি, কিন্তু ছেলেমেয়েরা কাঁদছে কেন? ওদের অসুবিধা কী? এবারও সেই একসাথে উত্তর। কিন্তু প্রত্যেকটি শব্দ তো তারা মিলিয়ে বলছে না, তাই ধমক দিয়ে থামাতে হলো। মমতাজকে সামনে আনলাম। বললাম, এবার তুই-ই বল।
মমতাজ যা বললো তা এইÑ মেম্বার এবারও আইছিলো। থাকলোও কয়দিন। কিন্তু অগো মা কয়দিন অইলো, মেম্বারের লগে বাইর অইয়া আর ফেরত আসে নাই।
বললাম, স্বামীর সাথে স্ত্রী যাবে, তাতে চিন্তা কী? হয়তো মেম্বার ওকে বাড়িতে নিয়ে গেছে।
: কান্দইন্না এই পোলাপাইনের মায় অনেক কষ্ট কইরা ছয়আনা সোনার একজোড়া দুল বানাইছিলো। সেই দুলজোড়া ওগো মার কানে আছিলো। এহন অগো ভয়, এহন ওই দুলজোড়ার লাইগ্গা মেম্বার ওগো মায়েরে খুন কইরা ফালাইলো নাকি!
মেম্বার প্রসঙ্গ শেষ না হতেই মমতাজ ভিড়ের সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, এর ভেতর বেডির হগলডি টাকা বাকি! আইজ দশ তারিখ যায়। এহনো একশোডা টাকাও ভাড়া দেয় নাই।
আমি মমতাজকে ধমক দিয়ে বললাম, তুই এইরকম মানুষকে ঘরভাড়া কেন দিয়েছিস?
মমতাজ তুষ্ট স্বরে বললো, বেডি যা-ই করুক না করুক, ঘরভাড়ার টাকাডা একমুঠে দেয়।
মমতাজের এই কথায় সায়রা আমার দিকে পলকহীন চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। গা-গোলানোভাব নিয়ে আমি মমতাজকে বললাম, তাই বলে তুই এমন মানুষকে ভাড়া দিবি? এই টাকা তুই আমাকে খাওয়াস?
একজন পৌঢ়া সাহস পেয়ে আমার কাছাকাছি আসে, ইশারায় সবার গুঞ্জন থামাতে বলে আমার পায়ের কাছে বসে পড়ে কিছু শোনাবে বলে।
পৌঢ়া আবার কী ভয়ঙ্কর গল্প শুরু করে, তাকে দেরি করাতে এবং গল্পের মোড় ঘোরাতে প্রশ্ন করলাম, তুমি কী করো?
‘আমি ইট ভাঙি’ বলেই সে ধীরে-সুস্থে আমার কাছে বসে। আয়োজন দেখে মুহূর্তে সবাই নীরব হয়ে গেলো, অজানা কিছু শোনার আশায়। পৌঢ়া বলতে শুরু করে, ‘ও আফা চিন্তা কইরা দেহেন, কোনখানকার ঘইড়াল এক বেডার লগে বেডি বিয়া বইছে, যে বেডা কুনোদিন তারে ঘরে তোলা দূরি থাক, তার গেরামেও নিতি পারবো না! হেই বেডার লগে বিয়া অইয়া, কইদিন থাইক্কা-খাইয়া বেডার যহন তারে দিয়া খাউজ মরছে, তহন আবার নতুন নতুন বেডি ধরা শুরু হরছে। আর অয়, সেই বেডার পিছনে লাইগ্গা থাইকা সেই বাজাইরা মাইয়ামানুষসহ বেডারে ঘরে তুইল্লা আনে..।’
আরেকজন পাশ থেকে ফোঁড়ন দিলো, ‘আর বেডাও আহে, অন্যহানে তো জায়গার ভাড়া লাগবো! এইহানে বিনা ভাড়ায় আবার বেডিরটা খাইয়া নষ্টামিডার ভাগ নিতে পারে! আউ, আউ…। এগুলা বেজন্মা না অইলে কেমনে কি একঘরের মইদ্দে পোলাপান-মা’রে রাইহা এগুন করে আর করায় আমি বুজি না!’
আরো একজন মোক্ষম কথাটি বলে দিলো, ‘আর ওয় টাইন্না টুইন্না আনে, পাশ দিয়া ওয় বেডারে এট্টু ভাগে পাইবো হেই আশায়। কিন্তুক, পায় বইলা তো মনে অয় না। বেডার কত্ত কুলায়। আর এই বেডি তো কুত্তার মতো ক্ষুধা লআয়াই ঘোরে বুজা যায়।’
এটুকুর পর আর কাউকে থামিয়ে রাখা গেলো না। সবাই সমস্বরে অই মহিলাকে বকতে লাগলো। আমি কেন যেন রাগ করতে পারছিলাম না। চিনেজোঁকে নুনের ছিটার মতো তখন আমার দশা! এদিকে সায়রা আমার গা-ঘেঁষে বসা।
ছোটবেলায় যত ইন্দারা দেখেছি, মনে হচ্ছে তার কোনো একটাতে পড়ে গেছি। অনেক কষ্ট করে বলতে পারলাম, মহিলার নাম কী?
কয়েকজন একসাথে বলে উঠলো, পোলাপাইনের নাম, বিল্লাল, আলাল, জামাল, মাইয়ার নাম মৌসুমি। হগলতে বিল্লালের মা-ই কয় হ্যারে!
এবার আবার বিক্ষিপ্তভাবে সবাই মুখর হয়ে উঠলো বিল্লালের মাকে নিয়ে। তাদের বক্তব্য, ‘মাগির চাইর চাইরডা পুলাপান। ঘরে মা থাহে।’
আবার জিজ্ঞেস করলাম, বড় ছেলের বয়স কত?
সমস্বরে অনেকে বলে উঠলো, অইবো বারো, তেরো!
আমার কণ্ঠ যেন আমিই শুনতে পাচ্ছিলাম না, তেমন নিচুস্বরে বললাম, ধরে নিলাম, বিল্লালের বয়স তেরো। একটা মেয়ের চারটে ছেলেমেয়ে হতে ক’দিন লাগে। যদি তার পনেরো বছরেও বিয়ে হয়ে থাকে, তো পনেরো আর তেরো কত বছর?
অভ্যস্ত কণ্ঠে সায়রা বলে উঠলো ‘আটাশ’।
মনে হলো সায়রা আমার পক্ষই নেবে, তাই সেই সাহসে ভর দিয়ে আবার বললাম, এই বয়সে তো শহুরে মেয়েদের মধ্যে অনেকের বিয়েও হয় না।
আর বিল্লালের মা তার স্বামীকে যখন ঘরে আনে, আর তোমরা যখন টের পাও, তাকে দুর্বৃত্ত জেনেও যে এইরকম একটা জঘন্য নির্লজ্জ কাজ পাশাপাশি ঘরে ঘটতে যাচ্ছে, তোমরা কেন ইঁদুরের মতো ছেঁচে দাও না? মানে ওই পুরুষটাকে ধরে ছেঁচবে!
কেউ কেউ বলে উঠলো, আমাগো কি ঠেকা? বললাম, ঠেকা শুধু একটা অসহায় মেয়েমানুষকে চিপড়াতে? তাকে ছেঁচতে? কিন্তু এই মহিলা তার কোনটা করছে?
আমার অনর্গল এইসব কথায় মমতাজের বিব্রত ঠেকে। সে পারলে আমার মুখ চেপে ধরে। কানের কাছে মুখ এনে বললো, ‘খালাম্মা, বেডির পক্ষ লইতাছেন, ওয়ার ভাড়া কিন্তু তুলতে পারুম না।’
এবার আমার গলায় জোর এলো। বললাম, তুই নিজের ক্রেডিট দেখাতে জেনেশুনে দিনের পর দিন এসব ভাড়াটিয়া রাখিস? এই মাসেই এদেরকে বিদায় করবি। আমার তো বমিই আসতেছে, যে তুই আমাকে এসব টাকা দিস!
মমতাজ থতমত খায় আমার কথায়। তবু আমি বলি, এই মাসের ভাড়া তাকে মাফ করে বাসা ছেড়ে দিতে বলবি। আর আমি যেন আর কোনো ঝামেলার ভাড়াটিয়া না দেখি। তাতে ঘর যদি খালি থাকে থাকবে।
অনেকক্ষণ বসে থাকার পর উঠতে গিয়ে টের পেলাম, পা ঝিমঝিম করছে। ওঠার জন্য টেনে ঠিক করতে করতে স্লিম ফিগার, স্মার্ট সায়রা স্বাস্থ্যকর্মীর মতো করে সমবেত সবার উদ্দেশে বলতে শুরু করলো, কারো কারো রাগ বেশি থাকে। থাকে না?
সমবেত সবাই বলে ওঠে, হঅ!
‘কারো ঘেন্না বেশি থাকে। থাকে না?’
সমবেত সবাই বললো, হঅ।
‘কোনো কোনো ঘটনায় কেউ কেউ অনেক কষ্ট পায়। আবার কেউ কেউ সে ঘটনায় একটু ঘামেও না। তোমরা দেখছো দুইরকম মানুষই?’
সমবেত সবাই বললো, হঅ।
‘এই যে নারী পুরুষের অবস্থা দেখছ। যদি বিল্লালের মার স্বামী থাকতো, তাহলে তো তার কোনো অসুবিধা হইতো না! চারিদিকে দেখো, বউ মরার সাথে সাথে পুরুষগুলো একটা ছুঁতা দিয়া বিয়া করে আনে। একসময়ের কত আদরের ছেলেমেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়। মা কিন্তু ছেলেমেয়ে রেখে কোথাও যায় না। তোমরা ভেবে দেখো, বিল্লালের মা কিন্তু চলে যায়নি কারো সাথে! আটাশ বছরের একটি মেয়ে যে কোনো কাজ করে সে মোটামুটি একটা বিয়ে করে আলাদা থাকতেই পারে। কিন্তু এতগুলো ছেলেমেয়ের মাকে কে বিয়ে করবে? সে কিন্তু ছেলেমেয়ে বুকে করেই আছে। তাকে তোমাদের সবাইকে মা হিসেবে দেখতে হবে! অন্তত এইটুক দরদ তোমরা তার প্রতি দেখাবে, কেমন?’
ভিড় থেকে সায়রার উদ্দেশ্যে একজন বলে উঠলো, আফায় কি উকিল?
: না! এইসব কথা বলতে উকিল হতে হবে কেন? এর নাম মানবিক সহমর্মিতা। এইরকম সব ঘটনায় মনে করতে চেষ্টা করবে, এই অবস্থায় আমি হলে কী করতাম। তাহলে অন্যের দুরবস্থায় নিজের নিজের ভূমিকাটা তোমরা কাজে লাগাতে পারবে।
সায়রার ভাষণে সবাই আবার একসাথে বলে ওঠে, হঅ আপা!
এতে সায়রা উৎসাহিত হয়ে আবার বলে, প্রতিদিন তোমরা বাজার থেকে যে চাল কেনো, তা কি সব রান্না করে ফেলো, না কি একটু হলেও কালকের জন্য রেখে দাও?
এবার শুধু নারীগণই বললো, কাইলকার জন্যিও রাখি।
সায়রা শুধু তর্জনী নয়, হাতের পাঞ্জা তাক করে, সবার উদ্দেশ্যে বলতে গিয়ে তাকে একপাক ঘুরে বলতে হলো, ওই যে কালকের জন্য রেখে দেওয়া চালের মতো আমাদের শুধু নিজের জন্য কাজ করলে চলবে না। মানুষের জন্যও কিছু করে পুণ্য সঞ্চয় করে নিতে হবে! যাদের টাকা-পয়সা আছে, তারা নিজেদের জান-মালের ছদগা দিতে পারবে। দান করে পুণ্য অর্জন করতে পারবে। কিন্তু আমাদের যাদের টাকা-পয়সা বিলানোর সামর্থ্য নেই, আমরা যেন ভালো কাজটুকু করি। সৎ পরামর্শ দিই। বিপদে পাশে থাকি।
কোরাসে ‘হঅ আপা’ বলা শেষ না হতে আমরা গেটের দিকে রওনা হই। পিছে পিছে আসা মমতাজ কিছুটা দাঁত কিড়িমিড়ি করে বলতে লাগলো, বেডি দিয়া গেলো আমার বাড়াইট্টা গো বারোটা বাজাইয়া!
আমি মমতাজকে বললাম, ‘সায়রা আপা যা বলছে, তাতে তোর ভাড়া দেওয়া না দেওয়ার সম্পর্ক নেই। আর আমাকে পাহারা দিয়ে তোকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে হবে না। তোর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলে আমাকে ভাঙানি লাগাতে পারবে না। তুই আমার ম্যানেজারি করতেই জন্মাইছিস।’ বলে বড় রাস্তায় এসে আমরা গাড়িতে উঠে পড়লাম।
গাড়ি চলতে শুরু করলে সায়রা করেÑ
‘মনটা খুব খারাপ ছিলো। ঘরে টিকতে না পেরে বলে তোর কাছে চলে এসেছিলাম। তুই মনে করেছিস, এগুলো খালি তোমার বস্তিবাড়িতে হয়?’
আমি কিছু বলি না। মনে হচ্ছে, সায়রার জায়গায় আমি হলে কী করতাম।
সায়রাকে তার বাসায় নামাতে হবে দেখে, হাতিরঝিল হয়ে এসে মগবাজার মোড় দিয়ে ইস্কাটনে ঢুকলো গাড়ি। দিলু রোডের মাথায় নামতে নামতে বললো, ‘প্রেমহীন বসবাস যারা করতে পারে তাদেরকে আমি কখনো মানুষ মনে করি না। অথচ সেই অমানুষের সাথে একঘরে, একবিছানায় থাকতে হয়। সেই হিসাবে তোমার বিল্লালের মার দোষ তো সামান্য। সে তার বৈধ পুরুষের পিছে ছোটে।’
ওর এমন ঘটনা আরো দু’একবার শুনেছি। তাই এমন ভয়ঙ্কর জটিল সময়ে ওকে হালকা করতে বলি, শোন আমাদের দেশের একজন বিখ্যাত কবিও কিন্তু এসব ঘোষণা দিয়ে বেড়ান। তাই বলে কিন্তু সুধীসমাজ তাকে বা তার কবিতাকেও বয়কট করেন না। তুই বরং তোর স্বামীকে এখন থেকে কবি ভাবতে শুরু কর!
: আমার এমন একটা মানসিক সংকটের সময় এমন তামাশা করলি?
: এতদিন যখন ফিরে যাসনি, তখন কী করবি? ভালো একটা চাকরি করেও যখন আলাদা থাকতে পারিস না, সেটা কেন? আগে তাই বল! আমি বলি না, কেউ খারাপ কাজ করলে, তুই ওইভাবে শোধ নিবি! তুই মেয়েকে নিয়ে সরে যা। আমি হলে নির্ঘাত তাই করতাম। দেখ, তুই সরে গেলে উনি সামাজিকভাবে কোণঠাসা হবেন। আর তোর গৌরব বাড়বে। আরে তুই বাঁচতে তো পারবি!
: তুই বলছিস?
: বলছি। আমি আছি তোর সাথে। এখন বাসায় যা। আমি কাল আসবো। ফোন করিস।
সায়রা বাধ্য মেয়ের মতো চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। মমতাজ, সিদ্দিক, বিল্লালের মাÑ সবাই আমার মাথা থেকে নেমে যায়, বুকজুড়ে থাকে শুধু সায়রা একা…।