‘অন বিং এ রাইটার’ প্রবন্ধে ভি এস নাইপল লিখেছিলেন ‘আমি সত্যি জানি না কী করে লেখক হয়েছি। আমি আমার জীবনের হয়তো নির্দিষ্ট তারিখ এবং বিষয়গুলো বলতে পারবো কিন্তু লেখক হওয়ার প্রক্রিয়াটা আসলে রহস্যময়। তবে এই রহস্যের মধ্যে উদাহরণ হিসেবে যা আসে তা হলো লেখক হওয়ার জন্য আমার ভেতরের উচ্চ আকাক্সক্ষা আর হলো স্বাতন্ত্র্যবোধ, খ্যাতিটাই হলো আকাক্সক্ষা আর কোনো কিছু সম্পর্কে লিখতে গেলে এই আকাক্সক্ষাটাই সবকিছুর আগে আসা দরকার।’ লেখক জীবনের প্রথম দিকটা হয়তো এলোমেলো বা হতাশায় জড়িয়ে থাকে; সুখকর বলে কিছু থাকে না। শুরুতে কিছুই হচ্ছে না অথবা কিছু একটা লিখতে লিখতে আসল লেখালেখিটা শুরু করে ফ্যালা, এমনি। কবি ডাব্লিউ এইচ অডেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত থাকাকালে, এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন- ‘কেন সে কবিতা লিখতে চায়? যদি সে বলে তার কিছু বলার আছে, এই কারণে সে লিখতে চায়, তাহলে আমি বলবো সে কিছুতেই কবি হওয়ার আশা করতে পারে না। কিন্তু সে যদি বলে, আমি শব্দের চারিপাশে থেকে শুনতে চাই তাদের কথন এবং অনুধাবন করতে করতে চাই তাদের রহস্য, তাহলে বলা যেতে পারে কাব্যকলার মৌলিকত্বে তার একান্ত উৎসাহ রয়েছে এবং কবি হওয়ার স্বপ্ন সে দেখতে পারে।’
বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল উচ্চ শিক্ষার জন্য অক্সফোর্ডে আসার পর অর্থাৎ ১৯৫০ সালের দিকে, দীর্ঘ সময়ের জন্য যখন বিকেলে হাঁটতে বের হতেন, তখন দেখতেন, শরতের রঙিন পাতা ঝরে যাচ্ছে বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা থেকে, সারি সারি গাড়ি পাশ ঘেঁষে হাঁকিয়ে চলে যাচ্ছে, রাস্তায় পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলো উড়ে এসে পড়ছে তাঁর শরীরে। আর সেসব অনুভূতির তীব্র তরঙ্গ, নাইপলের বুকের ঠিক মধ্যিখানে এসে হানা দিত। তখন হয়তো, কিছু একটা লেখার তাগিদ অনুভব করতেন। সুতরাং অক্সফোর্ডের দিনগুলোই নাইপলকে লেখার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে বলা যায়, তবুও প্রথম দিকে তিনি ভাবতেন, বই লিখতে বসে পড়া, মানে সেটা কৃত্রিমতা ছাড়া আর কিছু নয়। কোনো প্রকৃত ভাবনা বা কোনো অনিবার্য ঘটনা যদি লেখককে দিয়ে লিখিয়ে নেয় তাহলে সে লেখাই মৌলিক হয়ে ওঠে নিঃসন্দেহে; আর তা বেঁচে থাকে বহুকাল। সেই মৌলিক এবং সত্য ঘটনার উৎস-অন্বেষণে নিজেকে নিমজ্জিত করেন নাইপল। এভাবে আরও কিছু বছর তিনি পার করে দেন নিজেকে প্রস্তুত করতে। ভাবতে থাকেন কিছু কাল্পনিক বিষয় নিয়ে, কারন তাঁর কাছে তখন যথেষ্ট মূল্যবান কাহিনি বা গল্প কিছুই ছিলা না। হয়তো অনেক গল্প ছিল কিন্তু সেসব অজ্ঞাতে ঢাকা পড়ার মতো, অথবা স্মৃতিকে সেভাবে রোমন্থন করে দেখেনি তখনও। তিনি লিখছিলেন কৃত্রিম কিছু, আত্মসচেতন বোধ থেকে যা আসে। কিন্তু অপেক্ষা করছিলেন সত্যিকারের কোনো কিছুর জন্য যা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করবে, ভাবিয়ে তুলবে এবং লিখিয়ে নেবে অনবদ্য কিছু গল্প। সেই থেকে অকৃত্রিমবোধের পিছনে ছুটেছেন নাইপল; ন্যায় এবং অনিবার্যতাকে তিনি উল্টে পাল্টে দেখেছেন। ততদিনে লিখে ফেলেছেন ‘দ্যা মিস্টিক ম্যাসিওর’, তাঁর প্রথম উপন্যাস, প্রকাশ পায় ১৯৫৫ সালে। তিনি বলেছেন-‘All literary forms are artificial, and they are constantly changing, to mach the new tone and mood of the culture.’ তিনি আরও বলেছেন সাহিত্যের ফর্ম অবশ্যই জরুরি: জীবনের সবপ্রকারের অভিজ্ঞতাকে সঠিক এবং সমাধানের যে বিস্তীর্ণ পথ রয়েছে সে পথে চালনা করা। গত একশ’ বছরে আমাদের শিল্প-সাহিত্যে রুচিবোধের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে অর্থাৎ উনিশ শতকে যা লেখা হয়ছে, সিনেমা, নাটক সেগুলো থেকে আমাদেরকে দ্রুত পাল্টে যাবার সুযোগ করে দিয়েছে। বিশ শতকের ইংরেজি উপন্যাস থেকে তিনি পেয়েছেন মৌলিক পাঠের আসল আনন্দ। তিনি মনে করেছেন এই সব সাহিত্য মানুষের মনের জানালা খুলে দিয়েছে, উৎসাহিত করেছে এবং প্রভাবিত করেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন ইংল্যান্ডের কবি, উপন্যাসিক ও সমালোচক ফিলিপ লারকিনের কথা যার লেখার মধ্যে অকৃত্রিমতা এবং সতন্ত্রবোধ বিশেষভাবে জড়িত।
প্যাট্রিসিয়া হেইলের কথা না বললে নাইপলের পিছনের গল্পে কিছুটা অপূর্ণ রয়ে যায়। পরিচয় থেকে প্রণয় তারপর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন প্যাট্রিসিয়া হেইলের সাথে। হেইল ছিলেন নাইপলের জন্য আশীর্বাদ। অক্সফোর্ডের একাকী এবং হতাশার দিনগুলোতে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান হেইল। নাইপলের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশে নিজেকে আবদ্ধ করলেন। কেইম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে জেইন ওয়াইল্ড, মোটর নিউরন রোগে আক্রান্তের কথা জেনেও স্টিফেন হকিংকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। সেদিন জেইন ওয়াইল্ড জানতেন না এই অসুস্থ মানুষটি একদিন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহাকাশ বিজ্ঞানীদের একজন হবেন। তবু তিনি নিরলসভাবে হকিংয়ের পাশে থেকেছেন; তাঁর অস্বাভাবিক জীবন যাত্রার নিত্য দিনের সাথী হয়েছেন। তেমনি হেইলের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর সহযোগিতায় নাইপল যেন জীবনের মানে খুঁজে পেলেন। নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলেন নতুন উদ্যমে। ১৯৫৩ সালে গ্রাজুয়েশন শেষ করে অক্সফোর্ড থেকে চলে আসেন লন্ডনে। ১৯৫৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি যোগ দেন বিবিসি রেডিওতে এবং ‘ক্যারিবিয়ান ভয়েস’ নামে একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা শুরু করেন। সময়, পরিবেশ সবই তখন অনুকূলে। আর ঐ সময়ে বিবিসি অফিসের ফ্রীল্যান্সার রুমে বসে লিখলেন ‘মিগুয়েল স্ট্রিটে’র প্রথম গল্প ‘বোগার্ট’। এই গল্প লেখার পেছনে উৎসাহ হিসেবে কাজ করেছিল সেই ‘পোর্ট অফ স্পেন’র শিশুটি। তাঁর প্রথম গল্পেই পাওায় যায় সেই ফেলে আসা ত্রিনিদাদ; সেই শিশুটির ট্রাজিডির কথা। শৈশবের স্মৃতি তাড়িত দিনগুলো নাইপলকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ১৯৪০ সালে, যেখানে তাঁর পরিবার বসবাস করতে শুরু করেছিল। এই বইয়ের গল্পগুলো বর্ণনামূলক, কিছু চরিত্র বার বার উঠে এসেছে তাঁর ঐসব কাহিনিতে, তাই একে উপন্যাস বলেও আখ্যায়িত করা যায়। গল্পগ্রন্থটি ১৯৫৯ সালে প্রকাশ পায় আর ১৯৬১ সালে ‘সমারসেট মম অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করে; এটাই ছিল ইউরোপের বাইরে কোনো লেখকের প্রথম অর্জন। ‘মিগুয়েল স্ট্রিট’ সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমসের মন্তব্য- ‘The sketches are writing lightly, so that tragedy is understand and comedy is overstated, yet the ring of truth always prevails.’
তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে ‘এ হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস’ প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে, বহু সমালোচক এই উপন্যাসকে ক্ষমতাশালী কাজ বলে মনে করেন। উপন্যাসটি তাঁর বাবার যাপিত জীবনের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়। উত্তর ঔপনিবেশিকতার সমাজচিত্র নিয়ে রচিত এই উপন্যাসের মূলচরিত্রে রয়েছে মোহন বিশ্বাস, যে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সমস্ত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। মোহন বিশ্বাস ত্রিনিদাদ এবং টোবাগোর অজপাড়াগাঁয়ে এক হিন্দু-ভারতীয় পরবিবারে জন্ম গ্রহণ করে। হাতে একটি অতিরিক্ত আঙুল বেশি নিয়ে জন্মানো মোহন বিশ্বাস সবার নজরে চলে আসে। হিন্দু পন্ডিতের ভবিষ্যৎ বানী অনুযায়ী সে একজন মিথ্যাবাদী হবে এবং তার বাব মাকে খেয়ে ফেলবে, এছাড়া মোহনকে গাছ এবং জল থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দেন। একসময় পরিবার দ্বিখণ্ডিত হয়; বিশ্বাস তার দুই ভাই ও মা, অন্য আত্মিয়ের সাথে বসবাস করতে শুরু করে। পারিবারিক এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে বড় হতে থাকা মোহনকে, স্কুল থেকে ছড়িয়ে নিয়ে পন্ডিতের আশ্রয়ে রাখা হয়। মোহন একসময় আত্মবিশ্বাসী হওয়ার চেষ্টা করে এবং ব্যবসা শুরু করে। এক কাস্টমারের যুবতী কন্যার সাথে প্রণয়ে আবদ্ধ হয় এবং পরিনিয় ঘটে। লেখা পড়ার দৈন্যতার কারণে ছোটখাটো সাংবাদিকতায় যোগ দেয় মোহন, কিন্তু চার সন্তান নিয়ে নিজের একটি আত্মপরিচয় খুঁজতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে। সে চিন্তা করে নিজের একটা আলাদা বাড়ি থাকলে আর কোনো অস্তিত্বের সংকটে ভুগতে হবে না। ‘এ হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস’ ভিএস নাইপলের সবচেয়ে অর্থবহুল একটা কাজ। শ্রমের সার্থকতা হিসেবে তাকে আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত করা হয়। টাইম ম্যাগাজিনের জরিপ অনুযায়ী ১৯২৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত উপন্যাসটি, জনপ্রিয় একশত ইংরেজি বইয়ের তালিকায় স্থান দখল করেছিল।
‘The world is what it is; men who
are nothing, who allow themeselves
to become nothing have no place in it.’
নাইপল এভাবে ‘এ বেন্ড ইন দ্যা রিভার’ উপন্যাসটি সূচনা করেন। সেলিম একজন ভারতীয় মুসলমান, যে আফ্রিকার কেন্দ্রীয় শহর, ‘বেন্ড ইন দ্যা রিভার’ এর কাছে অবস্থিত একটি শহরে দোকানদারি করে। দোকানটি সে কিনেছে নজরুদ্দিনের কাছ থেকে। সেলিম প্রথম থেকে খেয়াল করে শহরটি ছোট হলেও উন্নয়নের একটি গতিশীল ধারা রয়েছে সেখানে। তবে সে যখন এই শহরে প্রথম আসে তখন সেটি ভুতুড়ে শহরের মতো। আর সেলিমের বেড়ে ওঠা পরিমণ্ডল ছিল ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত লোকালয়, যাদের অধিকাংশই ছিল ব্যবসা বানিজ্যের সাথে জড়িত। জাবেথ নামে একজন খরিদ্দার ছিল সেলিমের, যে ম্যাজিকও জানতো। একসময় জাবেথ তার ছেলেকে শিক্ষিত করার জন্য সেলিমের সাহায্য অনুভব করে। কোনো একসময়, এক বেলজিয়াম ধর্ম যাজকের সাথে সেলিমের পরিচয় ঘটে, যে নিজেকে আফ্রিকান লাভার বলে দাবী করত এবং আফ্রিকার বিভিন্ন ধরনের মুখোশ সংগ্রহ করত। আর্থ সামাজিক দিক দিয়ে শহরটির উন্নতি হলেও একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী হিসেবে সেলিম নিজেকে নিরাপদ মনে করত না কখনও। এভাবে ‘এ বেন্ড ইন দ্যা রিভার’ এর গল্প অবতরণ ঘটেছে।
১৯৭৯ সালে বুকার প্রাইজের জন্য শর্টলিস্টেড হয় তাঁর এই কাক্সিক্ষত উপন্যাস ‘এ বেন্ড ইন দ্যা রিভার’ এবং বিস্তর সুনাম অর্জন করে। মর্ডান লাইব্রেরির(অ্যামেরিকান পাবিশিং কোম্পানি) তালিকা অনুসারে বিংশ শতাব্দীর একশত ইংরেজি নোবেলের মধ্যে ‘এ বেন্ড ইন দ্যা রিভার’ অন্যতম। এই উপন্যাসের মূল পটভূমি আফ্রিকা মহাদেশের একটি কেন্দ্রিয় দেশ; সময়-কাল বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, যেখানে দেশের নাম তিনি প্রকাশ করেন নি। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিক ক্ষমতার বিলুপ্তির পর কিভাবে এক পোড় খাওয়া একটি জাতির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই উপন্যাসের জন্য নাইপলকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। যেহেতু একজন ভারতীয় খুন হয় কালোদের হাতে, তাই কিছুটা হলেও এই হত্যা তাদের বিরুদ্ধে চলে যায় অর্থাৎ কিছুটা বর্ণবাদের ছায়া অনুভব করে আফ্রিকানরা। অ্যামেরিকান সাহিত্য সমালোচক ইরভিং হাউয়ি মুগ্ধ প্রশংসা করেছেন তাঁর এই মূল্যবান আখ্যানের জন্য, বলেছেন উপন্যাসটিতে মানুষের দূর্দশাগ্রস্ত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। অন্যদিকে ওয়েলেসলি কলেজের আফ্রিকানা স্ট্যাডিজের প্রফেসর সেলউইন কুডজয়ে বলেছেন ভিন্ন কথা। নাইপলের উপন্যাসে আফ্রিকার অন্ধকারাচ্ছন্নতা উঠে এসেছে যেখানে পুরনো সেই রক্তক্ষয়ী সমাজ ব্যবস্থার যেন পুনরাবৃতি; তিনি দাবী করেছেন এখানেই উপন্যাসিক, আফ্রিকার ঔপনিবেসিক-পরবর্তী সমাজ ব্যবস্থার ভেতরে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন।
‘দ্যা ইনিগমা অফ অ্যারাইভল’ ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে। পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তি-সংস্কৃতির যে নির্মম চিত্র এবং তার নিশ্চুপ পতন, এবং ইউরোপিয়ান প্রতিবেশিদের উইলের মাধ্যমে সম্পত্তির হস্তান্তর, এসব বিষয় উঠে এসেছে তাঁর খ্যাতনামা উপন্যাস ‘দ্যা ইনিগমা অফ অ্যারাইভল’-এ। পাঁচটি ভাগে বিভক্ত বইটির প্রায় সবকিছুই আত্মজীবনীমূলক। উঠে এসেছে তাঁর শৈশব, তাঁর পারিবারিক সামাজিক টানপোড়নের কথা; ত্রিনিদাদ এবং টোব্যাগোর বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে জীবন যাপনের কথাও। নাইপল যখন ‘দ্যা ইনিগমা অফ অ্যারাইভল’ লেখেন তখন তিনি ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ারে, শহর থেকে একটু দূরে একটি কটেজ ভাড়া করে বাস করতে শুরু করেছেন। প্রথম দিনগুলোর সেই অম্লান স্মৃতি লিপিবদ্ধ করেছিলেন তাঁর এই বইতে। বাড়িতে প্রথম প্রবেশের দিন উপলব্ধি করলেন যে, এ বাড়ির মধ্যে যেন শত বছরে ইতিহাস লুকিয়ে আছে, ঠিক অপরিবর্তনশীল কঠিন শিলা খণ্ডের মতো ইতিহাস মণ্ডিত। নৈসর্গিকতার মাঝে তিনি হারিয়েছেন নিজেকে বারবার। খুঁজে পেয়েছেন লেখার অনুষঙ্গ। নাইপলের উইল্টশায়ারের কটেজের কথা লিখতে গেলে সলিটারি রিপারের কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের ডাব কটেজের গুঞ্জন এসে ভিড় করে অবলীলায়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ জীবনের বহু সময় কাটিয়েছেন লেইক ডিস্ট্রিক্টের সেই ডাব কটেজে কিন্তু নাইপল বোহেমিয়ান, উইল্টশায়ার থেকে উড়ে গেছেন নিউইয়র্কে, নিউইয়র্ক থেকে পাড়ি দিয়েছেন ত্রিনিদাদে, আবার ফিরে এসে বাসা বেঁধেছেন স্টিফেন টেন্যান্টের সাথে ইংল্যান্ডের স্যালিসবারিতে। তাঁর এই বোহেমিয়ান যাপন আর সাধারণ মানুষের অতি সাধারণ যাপনকে একত্রিত করে নিগুঢ় রহস্যকে পাঠকের সামনে হাজির করেছেন ‘দ্যা ইনিগমা অফ অ্যারাইভল’-এ। তাঁর চোখে দেখা ভিন্ন প্রকৃতি আর ভিন্ন মানুষ; সমাজ ও সংস্কৃতির পার্থক্য; গন্ডি পেরুলেই অন্য আকাশের নিচে আরেক বৈচিত্রতা, এসবই পাঠকের চোখের সামনে ছায়াছবির মত এক চিত্র তুলে ধরেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য আরেকটি উপন্যাসের মধ্যে ‘ইন এ ফ্রী স্টেইট’ একটি। এই উপন্যাসটি মূলত তিনটি ছোট গল্প নিয়ে তৈরি: ‘অন আউট অফ মেনি’, ‘টেল মে হু টু কিল’ এবং ‘ইন এ ফ্রী স্টেইট’। এই উপন্যাসের গল্পগুলো বিভিন্ন ধারার কিন্তু মোটেই অসঙ্গতিপূর্ণ নয়। ১৯৭১ সালে উপন্যাসটি বুকার প্রাইজ জিতে নেয়। নাইপাল তাঁর আলোচিত সাহিত্য কর্মের জন্য ১৯৯০ তে নাইট উপাধিতে (যুক্তরাজ্যের রানির দেয়া অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি) ভূষিত হন । ‘দ্যা কোহেন ব্রিটিশ লিটারেচার’ প্রাইজ পান ১৯৯৩ সালে।
চন্দ্রহাস চৌধুরী ২০০৭ সালে দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকায় লিখেছিলেন- ‘চমৎকার সৃজনশীলতা এবং অনুবৃত্তিতে ভরপুর নাইপলের লেখক জীবন’। তাঁর বই কখনও উপনিবেশিক শক্তি বা ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে আবার কখনও উগ্র রাজনীতির বিরুদ্ধে। প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যের ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য ছিল আপোষহীন। স্পষ্টভাষী এই লেখক, সালমান রুশদি থেকে শুরু করে ড্রেক ওয়ালকোটের লেখাকেও সমালোচনা করতে ছাড়েন নি। তিনি অকপটে বলেছেন সালমান রুশদি কিংবা অরুদ্ধতি রায়ের লেখা, পড়ার সময় তাঁর নেই। তবু নাইপলের মৃত্যুর পর সালমান রুশদি তাঁর এক টুইটার পোস্টে লিখেছিলেন-‘আমাদের জীবনযাত্রা, রাজনীতি, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও আজ আমি সত্যি বেদনাহত যে, প্রিয় এক অগ্রজ ভাইকে চিরদিনের জন্য হারালাম। তুমি শান্তিতে থেকো ভিদিয়া।’ এছাড়াও অ্যামেরিকার উপন্যাসিক এবং ভ্রমণ কাহিনি লেখক পল থেরাক্স ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন : ‘One of the greatest writers of our time. He never wrote falsely. He was a scourage of anyone who used a cliche or an unthought out sentence. He was very scrupulous about his writing, very severe, too’ সাম্প্রতিক সময়ে নাইপল হচ্ছেন বিখ্যাত লেখকদের একজন। তিনি কখনও মিথ্যা কিছু লেখেন নি। যারা সস্তা লেখক বা অচিন্তিতপূর্বক লেখক, তাদের জন্য নাইপল ছিলেন আতঙ্কের। তিনি তাঁর লেখার ব্যাপারে ছিলেন খুবই খুঁতখুঁতে স্বভাবের।
কেন বিদ্যাধর নাইপলকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় সে কথা খুঁজতে গেলে একটি ছোট্ট বক্তব্য সহসায় বেরিয়ে পড়ে। সেটা হলো, তাঁর লেখার মধ্যে আছে পরিপ্রেক্ষিত চিন্তার বর্ণনামূলক বহিঃপ্রকাশ, ন্যায়পরায়ণতা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ, যা পাঠককে বাধ্য করে, অতলে চাপা পড়া দমিত ইতিহাসকে নতুন করে অনুধাবন করার জন্য। ২০০১ সালে, নোবেল পুরস্কার দাতা কমিটি, তাঁর লেখা সম্পর্কে এমনই বক্তব্য পেশ করে।
নাইপল হচ্ছেন সমসাময়িক বিশ্বসাহিত্যের সর্বাধিক পঠিত এবং প্রশংসিত। ২০০০ সালে প্রকাশিত ‘রিডিং অ্যান্ড রাইটিং’ বইটি পড়লেই বোঝা যায় ভাঙনের গল্পগুলো তিনি কত সহজ ভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। তাঁর বক্তব্য সবসময় স্পষ্ট এবং জড়তাহীন। ১৯৯০ সালের পর দেখা যায় তিনি ফিকশন ছেড়ে ননফিকশন নিয়ে বেশি মাথা ঘামিয়েছেন। ‘এ ওয়ে ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড’(১৯৯৪) এবং ‘হাফ এ লাইফ’(২০০১) এই দুটো বই কিছুটা আত্মজীবনীমূলক এবং তারই প্রতিফলন। বোহেমিয়ান এই লেখকের ব্যাক্তগত জীবন ছিল আরও বোহেমিয়ান: ১৯৭১ সালে আর্জেন্টিনার এক রমণী, তিন সন্তানের জননী মার্গারেটের সাথে প্রণয় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, ১৯৯৬ সাল অর্থাৎ দীর্ঘ ৪১ বছরের সংসার জীবনকে বিদায় জানিয়ে তাঁর প্রথম স্ত্রীর প্যাট্রিসিয়া হেইল মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নেন, একই বছর মাত্র দুইমাস পর, তাঁর চেয়ে বিশ বছরের কম বয়সী পাকিস্তানী সাংবাদিক, নাদিরা আলভির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং নাদিরার মেয়ে মালীহাকে দত্তক নেন। যতদূর জানা যায় নাইপলের কোনো সন্তান সন্ততি ছিল না। উনিশ শতকের ফরাসী সাহিত্য সমালোচক ‘সেইন্তে বিউভে’ বিশ্বাস করেন যে একজন লেখককে বোঝার জন্য হলে যতদূর সম্ভব তাঁর বহিদৃশ্য, তাঁর যাপিত জীবনের বর্ণনাকে আমলে নেয়া হয়, কিন্তু এটা একটা বিভ্রান্তিকর প্রক্রিয়া। তাঁর কাজ ব্যাখা করতে গিয়ে মানুষকে ব্যবহার করা হয়, এগুলো দেখতে অস্বাভাবিক মনে হয়। নাইপল তাঁর এই বর্ণাঢ্য লেখক জীবনে যশ, খ্যাতি, সম্মান সবই পেয়েছেন, তেমনি পাঠক হৃদয়েও রেখে গেছেন অমূল্য লেখনি ভান্ডার।
সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল জন্ম গ্রহণ করেন ক্যারিবিয়ান দ্বীপের ত্রিনিদাদে(চাগুয়ানাস), ১৭ আগস্ট ১৯৩২ সালে। ১৯৪৮ সালে ত্রিনিদাদ গভর্নমেন্টের স্কলারশিপ নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হন। লিখেছেন প্রচুর উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণ কাহিনি এবং প্রবন্ধ। কখনও নন্দিত কখনও সমালোচিত হয়েছেন। দাপিয়ে বেড়িয়েছেন ত্রিনিদাদ থেকে ইংল্যান্ড, আফ্রিকা থেকে অ্যামেরিকা, মধ্যপ্রদেশ থেকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ। লেখনিতে বারবার এসেছে ঔপনিবেশিকতা, ডায়াস্পোরা, উগ্রসাম্প্রদায়িকতা, রাজনীতি এবং অর্থনীতি সহ বহু বিষয়। এই বরেণ্য-প্রথিতযশা কথা সাহিত্যিক এবং বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসিক, ১১ আগস্ট ২০১৮ অর্থাৎ ৮৬ বছর বয়েসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হ
পাঠসূত্র:
১. ‘One of the greatest writers of our time’ V.S Naipaul dies 85, Alexandra Richards, Evening Standard, 12 Aug 2018
২. Book of a Life Time: A Bend in the River by VS Naipaul, Neel Mukharjee, Independent, 15 April 2011
৩. On Being a Writer, V.S. Naipaul, The NewYork Review, 23 April 1987
৪. V.S Naipaul, Biography, literature.britishcouncil.org
৫. মার্জিনে মন্তব্য, সৈয়দ শামসুল হক, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা।