অভাবের ঘরে নানা রকম অশান্তি। এসব অশান্তি একটা জালের মতো জড়িয়ে ফেলেছে হাসিনা বানুর সংসারকে। সংসারে শান্তি এমনিতেই সে কোনোদিন চোখে দেখেনি। আর এখন অশান্তির এই জটাজালে জড়িয়ে তার সংসারের চাকা এখন একেবারেই থেমে গেছে। ঠেলে ঠেলেও এটাকে আর এগোনো যাচ্ছে না। চোখধাঁধানো উন্নতির আলোয় গোটা দেশ ভেসে যাচ্ছে। অথচ হাসিনা বানু চোখে মুখে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। প্রতিদিন চতুর্দিকে উন্নয়ন ও উন্নতির নানা কথা সে শুনতে পায়। টিভিতে শোনে, স্বামীর কাছে শোনে, স্বামীর সঙ্গী-সাথীদের কাছে শোনে, রাস্তা ঘাটে চলতে ফিরতে মাইকে ভেসে আসা বিভিন্ন মাপের নেতার মুখে শোনে। শুনতে শুনতে সে নিজের উন্নতির কথা কল্পনা করে। কল্পনায় নিজের সংসারের উন্নতি দেখে নিজেরই চোখ দু’টি ধাঁধিয়ে যায়। মুহূর্তেই তার জীর্ণ-শীর্ণ সংসারের হালচাল ভেসে ওঠে চোখের পর্দায়। চোখ দু’টি জ্বালা-পোড়া করতে শুরু করে। অশ্রুরা বের হওয়ার জন্য আকুলি বিকুলি করতে থাকে। হাসিনা বানু দুই হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ দু’টি রগড়াতে শুরু করে। অশ্রুরা তেমন সুযোগ পায় না বের হওয়ার। হাসিনা বানু হাত বাড়িয়ে চৌকির নিচ থেকে পানির জগটা টেনে নেয়। ঘরের মেঝেতে মাটির ওপর যেভাবে বসেছিল, সেভাবে বসে থেকেই চোখে মুখে পানি দেয়। কষ্ট-যন্ত্রণা আর হতাশা সবকিছুকেই যেন সে একসঙ্গে মুছে ফেলতে চায় চোখ থেকে, মুখ থেকে। বামা হাতে পানির জগটি উঁচু করে ধরে ডান হাতের কোষ ভরে পানি ঢেলে বারবার চোখে মুখে ছিটাতে থাকে হাসিনা বানু। প্রায় একজগ পানি পুরোটাই শেষ করেছে সে এভাবে। ঘরের মাটির মেঝে ভিজে কাদা হয়ে গেছে। হাসিনা বানুর পরনের শাড়ি ব্লাউজও অনেকখানি ভিজে গেছে। আলুথালু শাড়িটির বেশ কিছু অংশ কর্দমাক্ত হয়ে গেছে। হাসিনা বানু হাতের শূন্য জগটি ছুড়ে মারে চৌকির নিচের দিকে। কয়েকটা পল্টি খেয়ে প্লাস্টিকের জগটি চৌকির নিচে রাখা কোনো জিনিসের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ছোট্ট একটি শব্দ করে থেমে যায়। হাসিনা বানু মাটির সঙ্গে লেপ্টে চুপচাপ বসে থাকে। কিছুক্ষণ এভাবে বসে থাকার পর হঠাৎই সক্রিয় হয়ে ওঠে তার হাত দু’টি। থকথকে কাদামাটির ওপর দু’হাতের দশটি আঙুল চালাতে থাকে সে। দু’হাতে সেই কাদামাটি নিজের মুখে, বুকে, শরীরে, মাথায়… সর্বাঙ্গে মাখাতে শুরু করে। এক পর্যায়ে কাদামাটি শেষ হয়ে যায়। হাসিনা বানু চুপচাপ মাটিতে লেপ্টে বসে থাকে। তার শরীরটা একটা পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে থাকে। এভাবে কতক্ষণ কেটে যায়, তার হিসেব নেই হাসিনা বানুর কাছে।
হাসিনা বানুর মেয়ে আমেনা এতক্ষণ বোধ হয় নানীর ঘরে ছিল। ঘরটি বেশি দূরে নয়, তবে একটু ঘুরে যেতে হয়। হাসিনা বানুর বিধবা মা, একমাত্র ভাই ছাড়াও বেশ কয়েক ঘর আত্মীয়-স্বজন এই বস্তিতেই বসবাস করে। একজনের ঘরে আরেকজনের নিত্য আসা যাওয়া। আমেনা ঘরে বসে থাকার মেয়ে না। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়া-আসা আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে এখানে ওখানে আড্ডা জমানো ওর কাজ। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে দুই বছর আগেই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে মেয়েটা। সংসারের কাজে মাকে সাহায্য করার ধাত নেই ওর মধ্যে। ফলে টো টো করে ঘুরে বেড়াতেই মজা পায় বেশি। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেছে, পেটে ক্ষিধের আঁচ লেগেছে, ফলে ঘরে ফিরতেই হয় আমেনাকে। খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতরে হাসিনা বানুকে ওই অবস্থায় দেখে, ভয়ে, আতঙ্কে ‘ও মা…গো…’ বলে প্রচন্ড জোরে চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আমেনা। আমেনার এই আর্তচিৎকারে আশপাশের ঘর থেকে দৌড়ে ছুটে আসে অনেকেই।
আমেনাকে মাটির ওপর অচেতন পড়ে থাকতে দেখে দু’জন মহিলা ওকে তোলার চেষ্টা করে। এদের একজন কাজলের মা। তার চোখই প্রথম ঘরের ভেতরের দৃশ্যটি দেখতে পায়। সেও চিৎকার করে ওঠে- ‘ও মা…গো, ওইটা কী?’ তার সঙ্গী রানীর মা আমেনার মাথাটা মাত্র হাতের উপরে তুলে নিয়েছে। কাজলের মার ভয়ঙ্কর চিৎকারে রানীর মার হাত থেকে আমেনার মাথাটা মাটিতে পড়ে যায়। ছুটে আসা সবাই দরজায় ভিড় করে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে। রানীর মা অভিজ্ঞ ও বয়স্ক মহিলা। সে দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করে। কাজলের মাকে নির্দেশ দেয়- ‘এই তাড়াতাড়ি ওরে আগে ধর। ধইরা ঘরে ল, চৌকির উপরে শোয়া। ওইটা হাসিনা। ধর, আমি সব দেখতাছি।’ কাজলের মাকে নির্দেশ দিয়ে আমেনার দেহটা ওঠাতে ওঠাতে অন্যদেরও নির্দেশ দেয় মহিলা- ‘এই তোমরা সব সইরা দাঁড়াও, দরজায় কেউ ভিড় কইরো না। বাতাস আইতে দাও।’ অনেকেই সরে দাঁড়ায়। ছোট্ট বাচ্চারা উঁকি-ঝুঁকি দেয়ার চেষ্টা করে। আমেনাকে চৌকির ওপর শোয়ানো হয়। আমেনার চোখে মুখে পানির ছিটা দেয়ার নির্দেশ দেয় রানীর মা। কাজলের মা ঘরে পানি খুঁজে পায় না। সে হাঁক দেয়- ‘এই পানি নিয়া আয়, পানি নিয়া আয় আগে, গ্লাসে-জগে করে পানি নিয়া আয়।’ অন্যঘর থেকে এক মহিলা দ্রুত পানি নিয়ে আসে। রানীর মা মটিতে লেপ্টে বসে থাকা হাসিনা বানুর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। হাসিনা বানু মাথা নিচু করে নিশ্চল বসে আছে। রানীর মা তার মুখোমুখি বসে পড়ে।
নিজের মেয়ের আর্তচিৎকার শুনে চমকে উঠেছিল হাসিনা বানু। মেয়ে যে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে তাও সে বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তারপর সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেছে যে, ওভাবে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না হাসিনা বানুর। নিজের কাছে নিজেকে বেশ লজ্জিত মনে হচ্ছে তার। এরকম একটা কাণ্ড করার জন্য লজ্জা ও অনুশোচনার অনুভূতি নিয়ে বসে আছে সে। রানীর মা মুখোমুখি বসে একটুখানি ঝুঁকে হাসিনা বানুর দুই বাহু ধরে ঝাঁকুনি দেয়- ‘কি রে হাসিনা, কি অইছে তর, এরম পাগলি অইয়া বইসা আছত কা। তোর কি মাতা খারাপ অইছে নাকি। তুই এরম করলে পোলাপাইনগুলার কি অইব’।
রানীর মার মুখে সহানুভূতিপূর্ণ কথা আর ঝাঁকুনি খেয়ে স্থির হয়ে বসে থাকা সম্ভব হয় না হাসিনা বানুর পক্ষে। প্রাণফাটা আর্তনাদ করে এবার সে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। ছোট ঘরটির ভেতরে দুপাশে দুটি চৌকি পাতা আছে। মাঝখানের জায়গাটি খুবই সংকীর্ণ। তার ওপর ঘরটির মাঝামাঝি জায়গায় আছে একটা বাঁশের খুঁটি। এই খুঁটিটি ঘরের ভিতরে চলাচল করতে বেশ অসুবিধার সৃষ্টি করে। রানীর মা স্বাস্থ্যবান মানুষ। লুটিয়ে পড়া হাসিনা বানুকে ধরতে গিয়ে তার শরীরটা একপাশের চৌকি আর মাঝখানের খুঁটির মাঝে আটকে যায়। ঘরের ভিতর গড়াগড়ি দেয়ার জায়গা নেই। হাসিনা বানু কাত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে পা দু’টি মেলে দেয়। শরীরটাকে ওই সংকীর্ণ জায়গাটুকুতে এপাশ ওপাশ করতে করতে বিলাপ বকতে থাকে। রানীর মা নিজেকে কসরত করে ছাড়িয়ে নেয়। বাঁশের খুঁটি আর চৌকির মাঝখান দিয়ে নিজের শরীরটাকে গলিয়ে এনে এবার জোরেশোরে একটা ধমক লাগায় সে। খুব বাজে রকম একটা গালির সঙ্গে প্রচন্ড জোরে একটা ধমক খেয়ে বিলাপ থামায় হাসিনা বানু। কাঁদতে থাকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।
কাজলের মার চেষ্টায় এরই মধ্যে হুঁশ ফিরে আসে আমেনার। চৌকির ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা আমেনার কানে ভেসে আসে মায়ের ফোঁপানির শব্দ। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে আমেনাও। রানীর মা আরেকটা ধমক লাগায়, মা মেয়ে দুজনকেই- ‘ওই তগো কান্নাকাটি থামা এবার। কাইন্দা কী ফায়দা অইবো। ওঠ কইলাম… উইঠা পড়।’ কথা বলতে বলতে রানীর মা হাসিনা বানুর হাত ধরে টান দেয়। উঠে পড়ে হাসিনা বানু। রানীর মা আবারও ধমক লাগায়- ‘একদম কোনো নাটক করবি না কইলাম। সোজা গোসলখানায় যাইয়া গোসল কইরা ফালা।’ হাসিনা বানু এবার ফোঁপানি থামায়। এগিয়ে গিয়ে পাশের বেড়ার সঙ্গে ঝুলানো একটি রশি থেকে নিজের কাপড়-চোপড় টেনে বের করে নেয়। হাসিনা বানুর ফোঁপানি থামলেও আমেনার ফোঁপানি কিন্তু থামে না। আমেনা নিজের শরীরটাকে উল্টে নিয়ে বিছানায় মুখ গুঁজে ফোঁপাতে থাকে। হাসিনা বানু একবার নিজের মেয়ের ওপর চোখ বুঝিয়ে নেয়। তারপর এগিয়ে যায় ঘরটির খোলা দরজার দিকে। তার পিছু নেয় রানীর মা। কাজলের মা চুপচাপ বসে থাকে আমেনার পাশে।
এতক্ষণ যারা ভিড় করেছিল দরজার মুখে, কাজলের মার ধমকে তারা দরজার মুখ থেকে সরে গেলেও পাশেই ভিড় করে নানান কথা বলাবলি করছিল। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটে হাসিনা বানুর ঘরে। আশপাশে সবাই জানে। এখানে শতকরা দুচারটা ঘর বাদ দিয়ে সব ঘরেই ঝগড়া-ঝাটি, মারামারি, হাঙ্গামা একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিছু ঘটলে অন্যরা দৌড়ে আসে, নানান কথা বলে, জটলা পাকায়। কারণ একটাই আর তা হচ্ছে- এটাই নিয়ম। হাসিনা বানুকে এখন এই জটলা পার হয়েই গোসলখানায় যেতে হবে। তার এই কাদামাখা কদাকার চেহারাটা আর পাগলিনী বেশ নিয়ে এদের সামনে দিয়ে গোসলখানায় যেতে তার দ্বিধা হচ্ছিল। রানীর মা ব্যাপারটা আঁচ করতে পারে। সে তৎক্ষণাৎ হাসিনা বানুকে জড়িয়ে ধরে তার শুকিয়ে যাওয়া কাদামাখা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখটা ঢেকে দেয়। তারপর দ্রুত হাসিনা বানুকে একরকম ধাক্কাতে ধাক্কাতে সবার সামনে দিয়ে গোসলখানায় নিয়ে হাজির করে। এনজিওদের বানিয়ে দেয়া এই গোসলখানটির ভোক্তা আরো দশ পরিবার। এখানে দুটি চেম্বার। নিচের হাউজে পানির সাপ্লাই থাকলে সব সময়ই এখানে গোসলের জন্য ভিড় লেগে থাকে। এ সময় সেরকম ভিড় থাকার কথা থাকলেও একটা চেম্বার খালিই ছিল ঘটনাক্রমে। হাসিনা বানুকে নিয়ে ওই চেম্বারের ভিতর ঢুকিয়ে দেয় রানীর মা। তারপর হাঁক ছাড়ে- ‘হাসিনার গোসলের বালতিটা নিয়া আয়। কেউ একজন দৌড়ে গিয়ে বালতিটা নিয়ে আসে। রানীর মা নিজেই হাউজ থেকে পানি তোলে। বালতিটা ভরে যাওয়ার পর সেটা নিয়ে ঢুকে পড়ে চেম্বারে। উৎসুক নারী-পুরুষেরা আস্তে আস্তে সরে পড়ে।
দুই.
হাসিনা বানুর এটা দ্বিতীয় সংসার। আগের সংসারে তার একটা মেয়ে আছে। মেয়েটা বাপের সংসারেই থাকে, সৎমার সঙ্গে। থাকে মানে থাকতো। কিছুদিন আগে একটা ছেলের সঙ্গে প্রেম করে পালিয়ে গেছে। বিয়ে করেছে। এখন আলাদা থাকে। মেয়েটা আগে থেকেই একটা পোশাক কারখানায় চাকরি করে। ছেলেটা বেকার। মেয়ের রোজগারেই সংসার চলে। হাসিনা বানুর বর্তমান সংসারে দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়েটা সেই আমেনা। তারপরেরটাও মেয়ে। নাম সেলিনা। আর ছেলেটার নাম আল আমিন। হাসিনা বানুর বর্তমান স্বামীও দুই সংসারের মালিক। অতি সম্প্রতি সে তৃতীয় বারের মতো বিয়ে করেছে। তার প্রথম স্ত্রী বিগত হয়েছে অনেক দিন। ওই সংসারে একটা ছেলে আছে। ছেলেটা মামাদের কাছে মানুষ হয়েছে। ওদের সঙ্গেই থাকে। ওদেরই অনুগত। বাপের কোনো কাজে আসে না। দ্বিতীয় সংসার হাসিনা বানুর সঙ্গে। আর তৃতীয় সংসার পেতেছে সম্প্রতি। প্রথম সংসার না থাকায় বর্তমানে সে দুই সংসারের মালিক। নতুন স্ত্রীর সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের গোপন সম্পর্কের কথা সম্প্রতি প্রকাশ হয়ে পড়েছে। জানাজানি হয়েছে যে, তারা বিয়ে করেছে। হাসিনা বানু যখন এ খবর পেয়েছিল তখনই তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। নছর আলীর সঙ্গে তার চৌদ্দ-পনেরো বছরের সংসার। এই লোকটার বিচিত্র রূপের সঙ্গে পরিচিত হাসিনা বানু। নানারকম কাজে ভাড়া খাটা লোক নছর আলী। এসব কাজের ভালো-মন্দ সম্পর্কে কোনো বাছ-বিচার নাই তার। যে ধরনের কাজে সে অভিজ্ঞ সে ধরনের কাজেই সে ভাড়া খাটে। আর অভিজ্ঞতা হচ্ছে যত বিচিত্র কাজের। সেসব কাজের কোনো কোনোটার কথা শুনলে অনেকের গাও শিউরে উঠতে পারে। হাসিনা বানু মনের ভুলেও কোথাও কোনোদিন এসব কথা বলেনি। দিনের পর দিন নছর আলী যখন ঘরে থাকে না, তখন সবাইকে জানাতে হয়- নছর আলী কাজে গেছে। কী কাজ করে নছর আলী? প্রকাশ্যে তাকে অনেক কাজই করতেই দেখা যায়। কখনো বাচ্চাদের খেলনার বস্তা নিয়ে সে চলে যায় দেশের সে সব স্থানে, যেখানে বিশেষ বিশেষ সময়ে মেলার আয়োজন করা হয়। কখনো রাজমিস্ত্রি, কখনো কাঠমিস্ত্রি, কখনো বাবুর্চিদের যুগালি হিসেবে কাজ করে। কখনো ফেরিওয়ালা হিসেবে এ পাড়ায় সে পাড়ায় এ জিনিস সে জিনিস ফেরি করে। তার নানান বেশ, নানান ভূষা। এসবের আড়ালেই তার আসল কাজ। পেশাগত গোপনীয়তা রক্ষা করে চলতে হয় তাকে।
হাসিনা বানুকে পটিয়ে পাটিয়ে প্রথম সংসার থেকে যখন বিচ্ছিন্ন করে, নছর আলীর তখন রমরমা কাজ কারবার। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর নছর আলী ছন্নছাড়া হয়ে পড়লেও পকেট ছিল ভরা। ভোগ-বিলাসে যথেষ্ট ব্যয় করতো সে। বন্ধু-বান্ধবও ছিলো যথেষ্ট। পাঁচদিন কাজ করতো আর পাঁচ মাস টাকা ওড়াতো। ওই বন্ধু-বান্ধবদেরই একজন ছিল হাসিনা বানুর প্রথম স্বামী। সেই সূত্রে হাসিনা বানুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল নছর আলীর। প্রথম দর্শনেই নছর আলী হাসিনা বানুর প্রেমে পাগল হয়ে পড়ে। অনেক কায়দা-কানুন করে, অনেক অর্থ খরচ করে হাসিনা বানুকে রাজি করিয়েছিল নছর আলী। লোভে পড়েছিল হাসিনা বানু। নিজের চার বছর বয়সী মেয়েটাকে প্রথম স্বামীর কাছে রেখে ভেগে যায় নছর আলীর সঙ্গে। নছর আলী টাকা খরচ করে। আইন মোতাবেক হাসিনা বানুকে শাদি করে। অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় হয়ে যায় নছর আলীর। হাসিনা বানুর প্রেমে মজে গিয়ে অনেক কাজও হাত ছাড়া হয়ে যায় তার। হাসিনা বানুকে বিয়ে করার পর কাজ-কর্মে ভাটা দেখা দেয় নছর আলীর। বেশ কিছুদিন কেটে যায়, কোনো কাজেরই অফার আসে না। সংসার চালাতে কষ্ট হয়ে যায়। এক পর্যায়ে নছর আলী নিজেই কাজে নেমে পড়ে। একাজ সেকাজ করে হাসিনা বানুর মন-প্রাণ ভরানোর চেষ্টা করে। হাসিনা বানু প্রথম স্বামীর ঘর ছেড়েছে, প্রথম সংসার ছেড়েছে কেবল অভাবের কারণে, নছর আলীর পকেটে চকচকে নোট দেখে। ভেবেছিল, নিজের মেয়েরও কোনো অসুবিধা হবে না। নছর আলী ওর পিছনেও টাকা ঢালবে। অতএব চিন্তার কিছু পায়নি হাসিনা বানু। সে নছর আলীকে বিয়ে করার পর তার স্বামীও আরেকটা বিয়ে করেছে। সৎমাটা মেয়েটার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে না। নছর আলীরও অভাব লেগে যায়, হাসিনা বানুরও চমক ভেঙে যায়। নিজেই এখন কখনো স্বামীর সঙ্গে, কখনো অন্যদের সঙ্গে একাজ সেকাজ করে উপার্জন করার চেষ্টা করে। নিজের প্রথম সন্তান মেয়েটার জন্য টাকা জমা করে। মাস শেষে মেয়ের বাপের কাছে পাঠিয়ে দেয়। মেয়ের যেন কোনো সমস্যা না হয়। কিন্তু সৎ মায়ের সংসারে মেয়েটার দুর্ভোগ দিন দিন বাড়তেই থাকে।
এ দিকে নছর আলী মাঝে মাঝে দু’একটা গোপন কাজ পেয়ে যায়। কাজ হয়ে গেলে নছর আলীর কয়েক মাস আর ভাবনা চিন্তা থাকে না। নানারকম আমোদ ফুর্তিতে অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। হাসিনা বানুর দিকেও অনেক সময় নজর দেয় না নছর আলী। তার অর্থ ব্যয় সব খাতেই হয়। নেশা, নারী, জুয়া কোনটাই বাদ যায় না। এসব নিয়ে বাদানুবাদ করতে গিয়ে, নছর আলীর কাছ থেকে টাকা খসাতে গিয়ে হাসিনা বানু উত্তম-মধ্যম খেতে শুরু করে। মাঝে মাঝে উল্টো হাসিনা বানুর কাছেই টাকা পয়সা চায় নছর আলী- ‘তোর আয় রোজগারের টাকা আমার সংসারে না দিয়া, আগের লাঙরে দেছ কেন? হের লগে কি গোপন পিরিত আছে নাকি তর। তুই ইনকাম কইরা আমারে খাওয়াবি, আমি তর স্বামী। হেই বেডা কে?’ এভাবেই শুরু হয়ে যায় তিক্ততা। সময় চলতে থাকে নিজের গতিতে। হাসিনা বানু গর্ভধারণ করে। আমেনার জন্ম হয়। সময় চলতে থাকে, তিক্ততা বাড়তে থাকে। উত্তম-মধ্যম এক সময় চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। হাসিনা বানুর গর্ভধারণ থেমে থাকে না। পরপর আরো দু’বার সে গর্ভধারণ করে। হাসিনা বানুর গর্ভে নছর আলীর আরও দুটি সন্তান জন্ম দেয়। সময় চলতে থাকে। নছর আলীর বয়স বাড়তে থাকে। বিশেষ কাজের জন্য তার আর ডাক পড়ে না। আরও চালাক, আরও চতুর নতুন প্রজন্ম সেসব কাজের দখল নিয়ে নিয়েছে। নছর আলীকে এখন এটা সেটা করেই চলতে হয়। ছেলেমেয়েদের জন্য দুবেলা দুমুঠো অন্নের ব্যবস্থা না করলে তার আর চলে না। তবে শুধু নিজের আয়ে সে সংসার চালাতে চায় না। হাসিনা বানুর আয়টা পুরোটাই এ সংসারে চায় সে। নছর আলী হাসিনা বানুকে বিয়ে করে প্রথমে একটা ভালো ঘরেই উঠেছিল। ক’বছর যেতেই বস্তিতে এসে উঠতে হলো। ভাগ্যিস প্রায় দেড় শ বর্গফুটের এক টুকরো জায়গার মধ্যে একটা ঘর তুলতে পেরেছিল। না হলে এ বস্তিতেও ভাড়া দিয়েই থাকতে হতো নছর আলীকে।
সময় চলতে থাকে আর অভাব গ্রাস করতে থাকে হাসিনা বানুর সংসারকে। এই অভাবেও নছর আলীর স্বভাব বদলায় না। প্রাচীন স্বভাব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বারবার। হাসিনা বানুর ওপর বাড়তে থাকে টর্চার। হাসিনা বানু তার সব আয় রোজগার দিয়ে সংসারটাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। নছর আলীর মন ভরে না। তার কেবলই অভিযোগ-‘আগের সংসারের মেয়ের জন্য টাকা পাঠায় হাসিনা বানু।’ এটা মেনে নিতে পারে না নছর আলী। হাসিনা বানু স্বামীর নির্যাতন সইতে থাকে, সংসারের ঘানিও টানতে থাকে। তার পরীর মতো চেহারাটা দেখে পাগল হয়ে গেছিল নছর আলী। আদর সোহাগ করে বলতো তুমি আমার ফুলপরী। সেই ফুলপরীর চেহারাটা এখন একটা পেত্নীর মতো দেখায়। শরীর স্বাস্থ্যের কিছুই আর নেই। তবুও লড়াই চালিয়ে যায় হাসিনা বানু। ভুলেও নিজের চেহারাটা আয়নায় দেখার চেষ্টা করে না। আমেনা মেয়েটা বড় হয়েছে। ওর আবদারে নছর আলী নকশা করা, বাঁধানো একটা আয়না এনে দিয়েছে। মেয়েটা ওই আয়নায় মুখ দেখে আর চুল বাঁধে। হাসিনা বানু তাই দেখে খুশি।
এতটুকু খুশিও হাসিনা বানুর কপালে সয় না। আগের ঘরের মেয়েটা একটা ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে নছর আলীর বেপরোয়া আচরণ সীমা ছাড়িয়ে যায়। কথায় কথায় হাসিনা বানুর ওপর শারীরিক নির্যাতন চলতে থাকে। একপর্যায়ে সংসারে বাজার সদাই করা একেবারে বন্ধ করে দেয় নছর আলী। সংসারের খরচপাতি পুরোটাই চাপিয়ে দেয় হাসিনা বানুর ওপর। নছর আলীর ধারালো যুক্তি- ‘তুই যদি আগের ঘরের মেয়ের খরচপাতি দিতে পারছ, তাইলে এই ঘরের পোলাপানের খরচপাতিও তুই দিবি।’ নছর আলী এসব কথা বলে আর মাঝে মাঝেই উধাও হয়ে যায়। আগের মতো কোনো কাজে সে যায় না। গেলে তো কাঁচা পয়সা চলে আসতো। আর বিষয়টি অজানা থাকতো না হাসিনা বানুর। নছর আলী যখন ফিরে আসে তখন খালি হাতেই ফিরে আসে। ছেলেমেয়েদের জন্যও কিছুই নিয়ে আসে না। ওরা চাইলে ৫ টাকা ১০ টাকা হাতে দেয়। এসেই একটা বোঝার মতো চেপে বসে হাসিনা বানুর ওপর। হাসিনা বানুকে নিরুপায় হয়ে সন্তানদের সঙ্গে নছর আলীকেও খাওয়াতে হয় তিনবেলা। এতেই খুশি হয় না নছর আলী। উল্টো টাকা চায় হাসিনা বানুর কাছে। হাসিনা বানু রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে- ‘তোমার সংসারে আমি আর এক মুহূর্তও থাকুম না। তোমার পোলাপাইন তুমি দেখবা। তুমি আমার জীবন যৌবন ধ্বংস কইরা দিছ, এখন পোলাপাইনের জীবনও ধ্বংস করবা। তুমি পোলাপাইন জন্ম দিছ, আমি খাওয়ামু ক্যান। খাওয়ামু খাওয়ামু, আবার তোমারেও খাওয়ামু। আমি কি তোমারে বিয়া কইরা তোমার গোলামি করার দাসখত লেইখ্যা দিছি নাকি? আমি আর থাকুম না।’ হাসিনা বানুর কথা শুনে ফুঁসে ওঠে নছর আলী- ‘আমার সংসারে থাকবা ক্যান, নতুন ভাতার পাইছ, হেই সংসারে যাইয়া উঠবা!…’ নছর আলী ভয়ঙ্কর নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে হাসিনা বানুকে। নিজের উদাহরণ দেয় নছর আলী- ‘আমার কাছে যখন পয়সা ছিল, তখন আরেক সংসার ছাইড়া আইছিলা। এখন আবার টাকা পয়সাঅলা ভাতার পাইছ, হের কাছে যাইবা তো বইসা আছ ক্যান। এখনই চইলা যাও ভাতারের কাছে।’ থামে না নছর আলী। মানুষের বাজারে যত রকম নোংরা কথার কারবার আছে সব চাপিয়ে দেয় হাসিনা বানুর ওপর। হাসিনা বানু নছর আলীর মতো কথার কারিগরি জানে না। সে অসহায় বোধ করে। তারপর হাউমাউ করে কান্নাকাটি, বিলাপ আর রোদনের তরঙ্গ খেলে যায় তার কণ্ঠে। তারপরও বন্ধ হয় না নছর আলীর কথার কল। এভাবেই চলতে থাকে হাসিনা বানুর সংসার। মুখের সঙ্গে সঙ্গে নছর আলী যখন হাত পায়ের ব্যায়াম শুরু করে তখন কমপক্ষে তিনটি ব্যথার ট্যাবলেট কেনার জন্য অতিরিক্ত অর্থের হিসাব করতে হয় হাসিনা বানুকে। ব্যথার ট্যাবলেট না খেলে সে কাজে যেতে পারবে না। ঘরেই শুয়ে থাকতে হবে, ছেলেমেয়েদের নিয়ে অভুক্ত।
এসবই এখন শরীরে ও মনে সয়ে নিয়েছে হাসিনা বানু। যখন সইতে পারছিল না, তখন বার কয়েক আত্মহত্যা করার চিন্তা করেছিল। ছেলেমেয়েগুলোর মুখগুলো ছবির মতো বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠায় সে চিন্তা টিকতে পারেনি মনে। হাসিনা বানু কপালের লিখন মনে করে এক পর্যায়ে সবকিছুই মেনে নিয়েছে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে বাচ্চাদের পেট ভরানোর চেষ্টা কিংবা নছর আলীর হাতে সপ্তাহে দু’একবার নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হওয়া। ভাগ্যিস হাসিনা বানুর বুড়ো মাটা এখনও বেঁচে আছে। এই বস্তিতেই নিজের একমাত্র ছেলের সঙ্গে থাকে। হাসিনা বানু যতক্ষণ বাইরের কাজে কর্মে থাকে ততক্ষণ ছেলেমেয়েগুলো ওদের নানীর কাছেই থাকে। বুড়ো মাটা যদি না থাকতো, তাহলে অবস্থা যে কী হতো ভাবতেই গা শিউরে ওঠে হাসিনা বানুর। ছেলেমেয়েগুলোকে স্কুলে পড়ানোর ইচ্ছে ছিল তার। এই ঘরের বড় মেয়েটা কিছুদিন স্কুলে পড়ালেখা করেছে। এখন আর যায় না। ছোটগুলোও না। এ ব্যাপারে কারুরই মাথাব্যথা নাই। ছেলেমেয়েগুলোরও আগ্রহ নাই। যদিও ওদের সবারই এখন স্কুলে যাওয়ার বয়স। ওদেরকে হাতে পায়ে বড় করে তোলাই এখন হাসিনা বানুর একমাত্র মাথাব্যথা। যেন ওরা করে কেটে খেতে পারে। এই একটাই তার অন্তিম চাওয়া পাওয়া। এ জন্যই সে বেঁচে আছে । এ ছাড়া তারা বেঁচে থাকার আর কোনো কারণই সে খুঁজে পায় না। চকচকে কালো মৃত্যু ছাড়া হাসিনা বানুর চোখে আর কোন স্বপ্নও খেলা করে না। অনুভূতিহীন জীবনে সন্তানদের মুখগুলোই তাকে কর্মচালিত রাখে। তাকে মনে রাখতে হয়, চার সন্তানের জননী সে, যারা বয়সে এখনো নাবালক শিশু।
তিন.
সবকিছু সেভাবেই চলছিল। সবকিছু এভাবেই স্বাভাবিক ছিল। তারপরও হাসিনা বানু কেন এমন একটা কাণ্ড করে বসল। এ প্রশ্নের উত্তর আশপাশের লোকেরা জেনেছিল খুব ধীরে-সুস্থে। হাসিনা বানু কষ্টের থলিটা খুলে ফেলেছিল রানীর মার কাছে। পরপর দুইটা আকাশ ভেঙে পড়েছিল তার ওপর। প্রথম আকাশটা ভেঙে পড়েছিল নছর আলীর নতুন বিয়ের কথা শুনে।
হাসিনা বানু একটা কমিউনিটি সেন্টারে বাবুর্চিদের কাজে সহযোগিতা করে। এটা সেটা কাটাকুটির কাজ করে সে একবেলা। সেদিনও এক বস্তা পেঁয়াজ কাটার ভার পড়েছিল তার ওপর। সঙ্গে ছিল আরেকজন মহিলা। সেই মহিলার কাছেই নছর আলীর বিয়ের খবর শুনেছে হাসিনা বানু। এ খবর শুনে প্রথমে সে চমকে উঠেছিল। সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিয়ে আবার কাজে মনোযোগ দিল। মনের ভেতরটা তার ক্রোধে, ঘৃণায় ভরে উঠেছিল। খবর দেয়া মহিলাটার দিকে একাবারও না তাকিয়ে পেঁয়াজ ছেলার ছুরিটা দিয়ে সে তার মন থেকে ওই ক্রোধ আর ঘৃণার অংশটা কেটে ছেটে ফেলে দিচ্ছিল। ঠিক এমন সময়ই তার মাথায় দ্বিতীয় আকাশটা ভেঙে পড়ে।
প্রথম ঘরের মেয়েটা নিজের স্বামীর হাতে মারধর খেয়ে মায়ের কর্মস্থলে এসে হাজির হয়। মেয়েটা উদভ্রান্তের মতো মায়ের কাছে আসে। তার মুখের এখানে ওখানে কাটাছেঁড়া আর ফোলা। জামা কাপড় এখানে ওখানে ছিঁড়ে গেছে। মেয়েকে দেখে আঁতকে ওঠে হাসিনা বানু। বিয়ে করেছে বছর ফুরায়নি। এখনই মেয়েটার ওপর অকথ্য নির্যাতন করতে শুরু করেছে ছেলেটা। মেয়ের কাছে সে যৌতুক দাবি করেছে। তাকে এক লাখ টাকা ক্যাশ দিতে হবে। সে ব্যবসা করবে। সঙ্গে দিতে হবে একটা টাচ মোবাইল। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই মেয়েটার সঙ্গে হাঙ্গামা করছে ছেলেটা। বিয়ে করেছে অবধি মেয়েরটাই খাচ্ছে। তারওপর প্রতি মাসে হাত খরচও নিচ্ছে মেয়েটার কাছ থেকে। এখন আবার যৌতুক। তা-ও ছোটোখাট দাবি না। এতো টাকা হাসিনা বানুর কাছে সাত সমুদ্র তেরো নদী ডিঙানোর মতো ব্যাপার। মেয়ের অবস্থা দেখে হাসিনা বানুর মাথায় দ্বিতীয় আকাশটা এমনভাবে ভেঙে পড়ে যেন রোজ কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। মেয়েটা তার মায়ের অবস্থাটা উপলব্ধি করতে পারে না। সে তাড়া দেয় হাসিনা বানুকে- ‘মা, তুমি আমার লগে থানায় চল। আমি মামলা করমু অর বিরুদ্ধে। দেশে এখন আইন আছে, নারী নির্যাতন মামলা দিয়া ওরে আমি জেলে ঢুকামু।’
হাসিনা বানুর মনের ভেতরে চলছে রোজ কেয়ামতের ধ্বংসলীলা। এই ধ্বংসলীলার ভেতর দিয়েই সে নিজের মেয়ের সঙ্গে থানায় হাজির হয়। থানায় কোনো মামলা হয় না, একটা সাধারণ ডায়েরি এন্ট্রি করে পুলিশ। তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় একজন এএসআইকে। সে থানায় উপস্থিত ছিল না। তার মোবাইল নাম্বারটা ডায়েরির কপির সঙ্গে লিখে দেয়া হয়। বিনিময় এক শ টাকা দাবি করে ডিউটি কর্মকর্তা। মেয়েটাই টাকাটা বের করে দেয়। থানা থেকে বের হয়ে মেয়েকে নিজের বাপের কাছে পাঠিয়ে দেয় হাসিনা বানু। নিজে ফিরে আসে নিজের ঘরে। ছেলেমেয়েগুলোকে হাতের কাছে না পেয়ে ঘরে ঢুকে একা একা এই কাণ্ড করে বসে সে।
রানীর মা হাসিনা বানুকে নিজ হাতে গোসল করিয়ে, কাপড় পরিয়ে ঘরে নিয়ে আসে। এর মধ্যেই সব কথা জেনে যায় সে। হাসিনা বানুর মাকে খবর দেয়া হয়। নাতি-নাতনি দু’টিকে হাতে নিয়ে সেও এসে হাজির হয়। সব কথা শুনে মহিলা নিজেই নিজের কপাল থাপড়াতে থাকে। ছেলেমেয়েগুলো ফ্যাল্যফ্যাল করে দেখে এসব।
দু’দিন পরে ফিরে আসে নছর আলী। হাসিনা বানু ঘরে ছিল না। ছেলেমেয়েগুলো ঘরেই ছিল। সঙ্গে ছিল ওদের নানীও। ঘরে ঢুকেই নছর আলী বুঝতে পারল কিছু একটা ঘটে গেছে। শাশুড়ি তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। ছেলেমেয়েগুলো দৌড়ে তার কাছে চলে আসতো। এখন ওরাও আসছে না। বড় বড় চোখ মেলে বাপের দিকে তাকাচ্ছে ওরা। নছর আলী অবাক হয়ে যায়। বাচ্চাদের জন্য তিনটা চিপসের প্যাকেট নিয়ে এসেছে নছর আলী। বাচ্চারা সেগুলোর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। কেমন গুমোট হয়ে উঠছে পরিবেশটা। কারো মুখে কোনো কথা নেই। ভিতরে ভিতরে তেতে ওঠে নছর আলী। উপরে প্রকাশ করে না। একটা খাকারি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নেয়। চিপসের প্যাকেট ছুঁড়ে ফেলে চৌকির ওপর। গায়ের জামাটা খুলতে খুলতে বাচ্চাদের দিক থেকে নিজের মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। গলায় জোর করে শান্ত ভাব আনার চেষ্টা করে নছর আলী- ‘কিরে, আমি কি চিড়িয়াখানার কোনো আজব জন্তু নাকি। তোরা আমারে এইভাবে দেখতাছস ক্যা। আমারে কি দেখছ নাই আগে আর! ওই, এভাবে হা কইরা আছত ক্যান তোরা।’ শেষ বাক্যটাতে উষ্ণতা ঝরে পড়ে নছর আলীর কণ্ঠে। এ সময় তার জামাটা খোলা হয়ে যায়। আর সেও ঘুরে দাঁড়ায়। আবার বাচ্চাদের মুখোমুখি। কিন্তু কেউ কোনো বলছে না। এভাবে কয়েকটি সেকেন্ড অতিবাহিত হয়ে যায়। নছর আলীর মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। ছেলেমেয়েদের দিকে গালির তীর ছুঁড়তে শুরু করে সে। দু-একটা তার শাশুড়িকেও বিদ্ধ করে। এ অবস্থায় নিজের বাপের প্রতি প্রতিরোধে ফুঁসে ওঠে আমেনা। সে মাঝে মাঝেই এমনটা করে। আর নির্ঘাত মায়ের মতোই বাপের হাতের মার থেকে সেও রেহাই পায় না। আজ সে দ্বিগুণ উৎসাহে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে- ‘তুমি এই ঘরে আইছ কেন, নতুন ঘর করছ, হেই ঘরে থাকবা। তুমি তো আমাগোরে খাওয়াও না, তুমি তো আমগো বাপ না। তোমার লগে আমরা আবার কিয়ের কতা কমু।’ আমেনার মারমুখী ভঙ্গি দেখে থমকে যায় নছর আলী। সে বুঝতে পারে, তার আসল খবর ফাঁস হয়ে গেছে। মনে মনে এমন কিছুই ভাবছিল সে। ঘটনা তাই ঘটেছে দেখে ভিতরে ভিতরে আরও তাপ লাগে নছর আলীর। তবু নিজেকে ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করে। আমেনার ঠাণ্ডা গলার মারমুখী সংলাপটি শেষ হওয়ার পর একটা নিস্তব্ধতা নেমে আসে ঘরে। এই নিস্তব্ধতার সুযোগ নিয়ে ফুঁসে ওঠে শাশুড়িও- ‘তোমার মুখে তো এখন কথা জোগাইবো না। এখন তো নিজের মাইয়ার কাছেই ধরা খাইয়া গেছ। তোমার মুখে যে চুনকালি পড়ছে, হেইটা তো দেখবা না। তোমার তো দেখবার চোখ নাই। আল্লায় তো তোমারে আন্ধা কইরা দিছে। আমার মাইয়াটার জীবনডা তুমি ধ্বংস কইরা দিছ। এখন নিজের পোলাপাইনের জীবনডা ধ্বংস করার লাইগা একটা দজ্জাল বিয়া করছ তুমি।…’ শাশুড়ি আরও কিছু বলতে চায়! হাত ইশারা করে মুখে ধমক দেয় নছর আলী- ‘আপনি চুপ কইরা থাকেন, আপনি কিয়ের লাইগ্যা কতা কন। নিজের পোলায় খাওয়ায় না ঠিকমতো, মাইয়াটটা আইস্যা খাইতাছেন আরামে। আবার বড় বড় কতা ছাড়তাছেন মুখে। মুরোদ থাকলে নিজের মাইয়ারে বহাইয়া বহাইয়া খাওয়ান না ক্যান। মুখে ফুতুর ফুতুর কতা ছাড়তে তো দেরি করেন না।’ নানীকে আক্রান্ত হতে দেখে আবারও প্রতিবাদ করে আমেনা- ‘তুমি নানীরে এত কতা কইতাছ কেন, নানী কি তোমার কামাই খায় নাকি। নানীই তো উল্টা আমাগোরে খাওয়ায়।’ আমেনার কথা শুনে হাততালি দিয়ে নেচে ওঠে নছর আলী, সঙ্গে অট্টহাসি। ছোট বাচ্চা দুটি চমকে উঠে বুকে থুথু দেয়। নাচতে নাচতে নছর আলী জানতে চায়- ‘তোর নানীর কত টাকা আছে ব্যাংকে। চেক ভাঙাইয়া ভাঙাইয়া তোমাগোরে খাওয়ায় কেবল। তয় তোমার মায় কামে যায় ক্যান। তোমাগো মতো বইয়া বইয়া ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ কইরা খাইতে পারে না।’ বলতে বলতে রাগে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে নছর আলী- ‘তোগরে তো মায় আর নানীয়ে খাওয়াইয়া খাওয়াইয়া এত বড় করছে।…’ নিজের মেয়েকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করে সে। রাগকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে মেয়ের দিকে তেড়ে যায় নছর আলী। মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় শাশুড়ি। এক ধাক্কায় তাকে ফেলে দেয় নছর আলী। শাশুড়ির মাথাটা চৌকির একটা কোনায় আঘাত খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মহিলা। নছর আলী এগিয়ে যায় আমেনার দিকে। কষে কয়েকটা থাপ্পড় মারে মেয়েটাকে। মেয়েটা দু’হাতে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে- ‘মাইরো না কইছি আব্বা, বালা অইব না করছি।’ ততক্ষণে নছর আলীর হাতের কাজ শেষ। গায়ের খুলে রাখা জামাটা টেনে নিয়ে দ্রুত বের হয়ে যায় ঘর থেকে। আমেনা চিৎকার করে ওঠে- ‘ও নানী গো…আমার নানীরে মাইরা ফালাইছে গো…’ ভাই-বোন দুটিও আমেনার সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেছি জুড়ে দেয়। আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। ততক্ষণে নছর আলী এলাকা থেকে উধাও হয়ে যায়।
চার.
প্রথম সংসারের মেয়েটার কোনো উপায় করতে পারে না হাসিনা বানু। দুশ্চিন্তা তাকে সর্বক্ষণ কুরে কুরে খাচ্ছে। নছর আলীর ব্যাপারটা নিয়ে সে অত ভাবে না। তারপরও হঠাৎ হঠাৎ ব্যাপারটা যখন মনে পড়ে, বুকের ভিতর কলিজা তখন একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে মনে সে একসময় এটুকু সান্ত্বনা বয়ে বেড়াত যে, মাথার উপরে তার একটা স্বামী আছে, যার আর কোনো সংসার নাই। এই সান্ত্বনাটুকু শেষ হয়ে যাওয়ার পর স্বামী সম্পর্কে আরও উদাসীন হয়ে পড়ে হাসিনা বানু। তার মাথায় ঘুরে ফিরে প্রথম সংসারের মেয়েটার জন্যই যত চিন্তা। মেয়েটার বাপ মেয়েটাকে কোনো সাহায্যই করতে পারছে না। যতই দিন যাচ্ছে বিষয়টা ততই জটিল হয়ে উঠেছে। মেয়েটার সৎ মায়ের ঘরে আরও তিনটা ভাইবোন। বাপটাকেই গোটা সংসার চালাতে হয়। সে নিজেই হিমশিম খায়। মেয়েকে কিভাবে সাহায্য করবে? হাসিনা বানু দিশেহারা হয়ে পড়ে। নিজেকে তার মানুষ মনে হয় না। মনে হয় নিরেট একটা যন্ত্র, যে যন্ত্রটাকে চালিয়ে দেয়া হয়েছে তিনটি মানব শিশুর খাবার উৎপাদনে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতোই সে তার কাক্সিক্ষত কাজটি করে যায়। মা আর মেয়ে আমেনার সঙ্গে নছর আলী যে কাণ্ড ঘটিয়েছে, ঘরে ফিরেই সে ঘটনা জানতে পারে হাসিনা বানু। তার মধ্যে এর কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না।
পরদিন সকালেই ঘটে সেই চমকপ্রদ ঘটনাটি। নছর আলী বেশ একটা হাসি-খুশি ভাব নিয়ে শাশুড়ির ঘরে এসে হাজির হয়। ঘরের দরজার মুখে একটা পিঁড়ির ওপর বসেছিল বুড়ি। মুখোমুখি হতেই নছর আলী লম্বা করে সালাম দেয়- ‘আসসালামো আলাইকুম আম্মা।’ সালাম হেঁকেই নছর আলী বসে পড়ে মহিলার পায়ের কাছে। তারপর শুরু করে নাকি সুরে কান্না। সেই কান্নার সঙ্গে বেরিয়ে আসে অনেক কথা। বুড়ি নির্বিকার হয়ে শোনা ছাড়া কোনো উপায় খুঁজে পায় না। নছর আলী বলে- ‘আমার মা নাই। মায়েরে হারাইছি কোন বেলায় কইতে পারুম না। আপনের মেয়েরে বিবাহ করার পর থেইক্যা আমি আপনেরে আমার মায়ের আসন দিছি। হেইদিন আমার মাতা ঠিক আছিল না। মাইয়াটায় আরও সব তালগোল পাকাইয়া দিল। আপনার লগে আমার বেদপি হইয়া গেছে আম্মা। আমারে ক্ষমা কইরা দেন মা। আপনে ক্ষমা না করলে আল্লায়ও ক্ষমা করবো না মা।’ একটু বিরতি দিয়ে আবার শুরু করে নছর আলী- ‘ওই জংলিটারে কি আমি সাধে বিয়া করছি। আমারে ফাঁসায়া দিছে আম্মা। আপনে এসব বুঝবেন না। এসব হইছে রাজনীতি। আমারে রাজনীতির চক্করে ফালায়া দিছে। এই চক্কর থেইক্কা বাহির হইবার লাইগা চেষ্টা করতেছি আমি। এইসব কতা তো সবাই বুঝবো না আম্মা। আপনি মুরুব্বি মানুষ, অভিজ্ঞ মানুষ। আপনেরে বুঝাইয়া কইলে আপনি বুঝবেন। আমি যদি ওই মাইয়ারে বিয়া না করতাম তাইলে আমার ঘরবাড়ি ওরা দখল কইরা লইয়া যাইতো। একবার চিন্তা কইরা দেখেন। হাসিনা তো কিছু বুঝতে চায় না। পোলাপাইনগুলারও মাথা খারাপ কইরা দেয়। ওরা আমারে চক্করে ফালায়া দিছে। ওরা যদি এই ঘরবাড়ি দখল কইরা লইতো, তাইলে আপনার মাইয়ারে লইয়া, নাতি নাতনীগো লইয়া আমি কই যাইয়া উঠতাম।’ আবার একটু বিরতি দিয়ে শুরু করে নছর আলী- ‘অখন আমি সিদ্ধান্ত নিছি আম্মা। ওই জংলিটারে আমি ছাড়ায়া ফালামু।’ আপনে হাসিনার লগে আমারে মিলায়া দেন। কিছু টাকা পয়সা অইলেই জংলিটারে আমি ছাড়ায়া ফালাইতে পারুম। আপনের মেয়ে আর নাতি নাতনিগো কথা চিন্তা কইরা এতদিন ধৈর্য ধইরা আছি। কাউরে কিছু কই নাই। এখন যখন সবাই জাইন্যা ফলাইছে, আমারও সুবিধা হইছে। টাকা পয়সা দিয়া আমি ওরে ঝাইরা ফালামু। আপনে শুধু আমারে হাসিনার লগে মিলায়া দেন, আমার সংসারটা রক্ষা করেন আম্মা।’ আবারও দম নেয় নছর আলী। এবার সে তার আসল চমকটা তুলে ধরে শাশুড়ির কাছে- ‘আমি একটা সুযোগ পাইছি আম্মা। হাসিনারে আমি বিদাশে পাঠামু। এতো অল্প টাকায় বিদেশ যাওনের সুযোগ থাকলে আমিই চইলা যাইতাম। হাসিনারে পাডাইতাম না। সুযোগটা দিছে মহিলাগো। দেশে অয় কাম করতেছে। বিদেশে যাইয়া করলে এর চাইতে দশগুণ কামাইতে পারবো। বছর বছর দেশে আইতে পাবো। আমি সব সিস্টেম কইরা ফালামু। আপনে শুধু হাসিনারে সব বুঝায়া কন।’ এবার বিরতি দেয় নছর আলী। এতক্ষণ নিজেই বকবক করে গেছে। শাশুড়ি কথা বলারই সুযোগ পায়নি। এবার তারে সুযোগ দেয়া দরকার। হাসিনা বানুর বিধবা মা সহজ সরল সেকেলে মহিলা। ধূর্ত নছর আলী তাকে পটানোর সব পরিকল্পনা পাকাপোক্ত করে এসেছে। শাশুড়ির হাব-ভাব দেখেই সে সিদ্ধান্ত নিবে, কখন কী করতে হবে।
এতক্ষণ একভাবে বসে বসে নছর আলীর কথা শুনছিল বুড়ি। এখন নছর আলী একেবারে থেমে যাওয়ায় পিঁড়িটাকে একটু পিছনে সরিয়ে নড়চড়ে বসে। মুখে কোনো কথা সরে না। মনে মনে ভাবে বিদেশের কথা- ‘হাসিনা ক্যামনে বিদেশ যাইবো, টাকা পয়সা পাইবো কই?’ নছর আলী শাশুড়িকে চুপ করে থাকতে দেখে আবারও মুখ খোলে- ‘আপনে একটা কিছু কন আম্মা। আপনের হাতেই সব। টাকা পয়সা নিয়া আপনার চিন্তা করণ লাগবো না। সমিতি ঘর থেইক্যা একটা কিস্তা তুইলা লমু। পরথম কয়টা কিস্তি না হয় আমি কষ্টেমষ্টে চালায়া নিমু। হাসিনা ওইখানে যায়া পোছাইলে তো আর সমস্যা থাকবো না।’ নছর আলীর পীড়াপীড়িতে গলে যায় বুড়ি। কথা না বলে আর থাকা যায় না। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যাবার পর তার মুখ থেকে কথা বের হয়- ‘হ, অখন আমি কি কমু। হাসিনার লগে কতাবাত্তা কওন ছাড়াতো কিছু কওন যায় না। হাসিনা আহক, আমি কতা কমুনি। সেন্টারে কাম বেশি। অয়তো আইজকা রাইতে আইবো। আমি ওরে জিগাইয়া লই।’ শাশুড়ির কথা নছর আলীর মনোপূত হয় না। তার যেনো খুব তাড়া আছে। সে অনুরোধের সুরে শাশুড়িকে বলে- ‘আপনে হাসিনারে ডাইকা পাডান। আমেনারে পাডাইয়া দেন, ওর মায়েরে লইয়া আয়ুক। রাইত পর্যন্ত অপেক্ষা করণের দরকার নাই। ডিসিশান তাড়াতাড়ি নেয়নের দরকার আছে। এমন সুযোগটা আতচাড়া করণ ঠিক অইবো না। আমি একটু ঘুইরা আসি। আপনে আমেনারে ডাইকা পাডাইয়া দেন।’ নছর আলী কথাগুলো অনুরোদের সুরে শুরু করলেও শেষ করে আদেশের সুরে। তারপর হনহন করে হেঁটে চলে যায়।
বুড়ি নছর আলীর নাকি সুরে কান্না আর সুন্দর সুন্দর বুলি শুনে গলে গেলেও তার কথার ওপর আস্থা রাখতে পারে না। সে কারণে আমেনাকে খোঁজার জন্যও তাড়াহুড়া করে না। আমেনা তার ভাইবোনদের নিয়ে কোথাও খেলাধুলা করছে। হয়তো বুড়ির বোনঝির ঘরেই আছে। কাছেই বোনঝির ঘর। তবুও আমেনাকে ডাকার কোনো আগ্রহবোধ করে না বুড়ি। মেয়েটা একটু আগেই কাজে গেছে। এখনই ডেকে পাঠালে আজকের দিনের মজুরি পাবে না। সে কারণেও বুড়ির আগ্রহ নাই মেয়েকে ডেকে আনার।
ঘন্টাখানেক না যেতেই নছর আলী এসে হাজির হয়। বুড়ির কাছে জানতে চায়- ‘হাসিনা কই? আমেনা কই?’ বুড়ি এককথায় জবাব দেয়-‘খবর পাডাই নাই এখনও।’ মেজাজ খারাপ হয়ে যায় নছর আলীর। সে আবারও হনহন করে হেঁটে চলে যায়। বুড়ি তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। নছর আলী নিজেই হাজির হয়ে যায় হাসিনা বানুর কাছে। তাকে এখানে দেখে অবাক হয় হাসিনা বানু। মুখে কিছুই বলে না। একবার দেখে নিয়ে নিজের কাজ করতে থাকে। নছর আলীই কথা শুরু করে- ‘কাম বন্ধ কর হাসিনা। আমি তোরে নিতে আইছি। আম্মার লগে দেখা কইরা, কতা কইয়া আছি। জরুরি কাম আছে, তুই এখনই চল। ঘরে যাইয়া সব বুজাইয়া কইতাছি।’ কাজ ছেড়ে উঠতে চায় না হাসিনা। নছর আলীও ছাড়ার পাত্র না। রীতিমতো জোর করে হাসিনাকে কাজ থেকে তুলে নিয়ে আসে নছর আলী। সোজা চলে যায় বুড়ির কাছে। আবারও সব কথা খুলে বলে নছর আলী। তার কথা মেনে নেয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না। না হাসিনা বানুর, না বুড়ির। বরং নছর আলীর দেখানো শান্তিপূর্ণ সমাধান আর বিদেশ যাওয়ার সুযোগের কথা শুনে যন্ত্র হয়ে যাওয়া হাসিনা বানুর মনেও আশার লতা-পাতা অঙ্কুরিত হতে শুরু করে। বড় মেয়েটার কথা মনে পড়ে। থানায় ডিজি করে কোনো লাভই হয়নি। পুলিশ কিছুই করছে না। একদিন মাত্র এসেছিল ছেলেটাকে পাকড়াও করতে। মুহূর্তের মধ্যেই ছেলেটা দলবল পাকিয়ে ফেলেছিল। এলাকার নেতা শ্রেণির কয়েকজন পুলিশের কাছে এসে বিষয়টা নিজেরাই সুরাহা করে দিবে বলে জানায়। ওইসব নেতাদের হাতে ক্ষমতা থাকায় পুলিশও তাদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। ছেলেটা ওইসব নেতাদের কাজে লাগে বলেই ওরা নিজেরা বিষয়টা মীমাংসা করার দায়িত্ব নেয়। সে দায়িত্ব তারা পালনও করে। হাসিনা বানুকে ডেকে নিয়ে মা, মেয়ে দু’জনকেই শাসায় ওরা- ‘একবার গেছত পুলিশের কাছে, আর যাবি না। এলাকায় আমরা থাকতে পুলিশ কোন্ চেটের বাল। এসব কাম অইল আমগো ব্যাপার। পুলিশের কাম অইল খুন-খারাবি অইলে তদন্ত করা। তোমাগো তো আর খুন খারাবি অয় নাই। তাও পুলিশ ডাইকা নিয়া আইছ। এই কাম আবার করবা তো খুন খারাবি অইয়া যাইবো কইয়া দিলাম। যেমনে আছ সেমনে চুপচাপ থাক। মাইয়া বিয়া দিছ, জামাইরে যা দিওনের দরকার দিয়া দিবা। এই অইল আমাগো শেষ কতা।’
নেতারা হাসিনা বানুর কোনো অনুনয় বিনয় শুনতে রাজি হয় না। অসহায় অবস্থায় মেয়েটাকে রেখে ফিরে আসতে হয় হাসিনা বানুকে। বিদেশ যাওয়া যাবে আর সেখানে বেশি টাকা কামাই করা যাবে, তাহলে তো মেয়েটারও একটা উদ্ধার হবে। এই চিন্তা মাথায় আসতেই হাসিনা বানু বিদেশ যেতে রাজি হয়ে যায়। মহা খুশি হয় নছর আলী। সেদিন সারাদিন এবং রাতটাও সে হাসিনা বানু আর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কাটায়। হাসিনা বানুর মনের কোথাও যেন একটা সুখ সুখ অনুভূতি তৈরি হয়। পরদিন সকাল থেকে হাসিনা বানুকে বিদেশ পাঠানোর যাবতীয় প্রস্তুতিতে লেগে যায় নছর আলী। দু’মাসের মাথায় সব ঠিকঠাক হয়ে যায়। বিদেশ চলে যায় হাসিনা বানু। আশায় বুক বেঁধে থাকে সবাই।
পাঁচ.
হাসিনা বানুর বিদেশ যাত্রার আগেই নিজ নামে ব্যাংকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলেছে নছর আলী। সেই হিসেব নাম্বারটা দেয়া আছে হাসিনা বানুর কাছে। প্রথম মাসের বেতন পেলেই টাকা পাঠাবে নছর আলীর অ্যাকাউন্টে। সমিতির কিস্তি দিতে হবে, সংসার চালাতে হবে। টাকার জন্য হাঁ করে থাকে নছর আলী। মাস শেষে কোন টাকা আসে না নছর আলীর নামে । ব্যাংক থেকে পর পর কয়েকদিন শূন্য হাতে ফিরে আসে নছর আলী। হাসিনা বানু বিদেশ পৌঁছানোর পর ফোন করেছিল নছর আলীকে। সে ঠিকঠাক মতো পৌঁছাইছে। ব্যস, এটুকুই। তারপর থেকে হাসিনা বানুর আর কোনো খবর নাই। দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় নছর আলী। একে ওকে ধরে জানতে চায়, কিভাবে হাসিনা বানুর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। কেউ তাকে উপায় বাতলাতে পারে না। দুশ্চিন্তা করতে করতে নছর আলীর হঠাৎ মনে পড়ে তার কাছে থাকা একটা কাগজের কথা। হাসিনা বিদেশে যাদের কাজে যাওয়ার কথা তাদের ঠিকানা ওই কাগজে আছে। ফোন নাম্বারও থাকতে পারে। আশায় বুক বেঁধে নছর আলী ওই কাগজটা নিয়ে একজন স্কুল শিক্ষকের কাছে যায়। ওই শিক্ষক পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে ইংরেজি লেখা ওই কাগজটা থেকে একটা নাম্বার বের করে দেয় নছর আলীকে। সেই নাম্বারে বারবার ফোন করতে থাকে নছর আলী। রিং বাজে, কেউ ধরে না। আবারও হতাশ হয়ে পড়ে সে। এমন সময় পাল্টা ফোন আসে ওই নাম্বার থেকে। ওই প্রান্তের লোকটা কী সব কথাবার্তা বলতে থাকে, তার কিছুই বুঝতে পারে না নছর আলী। সে শুধু বলে- ‘আমি বাংলাদেশ থেকে কইতাছি। হাসিনা আমার স্ত্রী, আমার ওয়াইফ, আপনাদের ওইখানে কাম করে। হের লগে আমি কতা কইতে চাই। হেরে একটু দেন।’ নছর আলীর কথা শেষ হওয়ার আগেই লাইনটি কেটে যায়। নছর আলী আবারও ওই নাম্বারে ফোন করার চেষ্টা করে কিন্তু এবার আর লাইনই পাওয়া যায় না। হতাশার গর্তে পড়ে হাবুডুবু খেতে থাকে নছর আলী। এভাবে সপ্তাখানেক যাওয়ার পর হাসিনা বানু সরাসরি ফোন করে নছর আলীকে। স্ত্রীর কণ্ঠস্বর শুনেই প্রাণটা জুড়িয়ে যায় নছর আলীর। ভালোবাসার জন্য নয়, বরং হতাশা থেকে উদ্ধার পাওয়ায়। নিজের মনের খুশিটা গোপন রেখে এতোদিন যোগাযোগ না করার জন্য নছর আলী ঝগড়া বাধিয়ে দেয় হাসিনা বানুর সঙ্গে।
বেশি সময় কথা বলার সুযোগ নেই হাসিনা বানুর। নিজের ছেলেমেয়েদের খোঁজ নেয়, মায়ের খোঁজ নেয়। আগের সংসারের মেয়েটার খোঁজ নেয়। সবার ভালো থাকার খবর দেয় নছর আলী। হাসিনা বানু জানায় আগামী আরও দুই মাস সে কোনো টাকা পয়সা পাঠাতে পারবে না। তিন মাস কাজ না করলে এরা টাকা পয়সা কিছুই দিবে না। ধৈর্য ধরতে বলে নছর আলীকে। ধৈর্য ধারণ করা ছাড়া নছর আলীও নিরুপায় হয়ে পড়ে। হাসিনা বানুকে অবিশ্বাস করতে পারে না সে, আবার বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। মনে মনে প্রশ্ন করে নছর আলী- ‘হাসিনা কি আমার লগে শেয়ানামি করলো নাকি?’ কিন্তু মন থেকে তেমন সায় পায় না। এমন শেয়ানামি করার মতো বুদ্ধি হাসিনার মাথায় থাকবে বলে তার মনে হয় না।
তিন মাস পর টাকা পাঠায় হাসিনা বানু। সমিতি ঘরের কিস্তি আর মানুষের পাওনা পরিশোধ করতেই শেষ হয়ে যায় সব টাকা। আবার তিন মাস পর টাকা আসে। এ টাকাও কিস্তি আর সংসারের পিছনে চলে যায়। হাসিনা বানুর পক্ষে প্রতিদিন দেশের খবর নেয়া সম্ভব হয় না। মাসে একবার ফোন করার সুযোগ পায় সে। তাও নছর আলীর মোবাইল নাম্বার ছাড়া আর কোন নাম্বার তার সঙ্গে নেই। ফলে তার সব যোগাযোগ নছর আলীর সঙ্গেই হয়। কয়েক মাস পর নছর আলীর দয়া হলে ছেলেমেয়ে আর মায়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায় হাসিনা বানু। বিদেশে আসার পর আট মাসের মাথায় বড় মেয়েটার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। তাও নছর আলীর দয়ায়। বিদেশ যাওয়ার সময় হাসিনা একটা শর্ত দিয়েছিল নছর আলীকে। এই বড় মেয়েটির দেখাশোনা করা আর বিদেশে সে যা আয় করবে তার একটা অংশ মেয়েটার স্বামীকে যৌতুক বাবদ পৌঁছে দেয়া। সেই শর্তের দোহাই দিয়ে অনেক অনুনয়-বিনয় করে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে হাসিনা বানু। তারপর মন গলেছে নছর আলীর। এরই মধ্যে তিন দফা টাকা পাঠিয়েছে হাসিনা বানু। তৃতীয় দফার টাকাটা পাঠিয়েছে মেয়েকে দেয়ার জন্য। আপাতত যেন জামাইকে সন্তুষ্ট করা যায়। নছর আলী নানা টালবাহানা করে। টাকাটার এককানা অংশও মেয়ের হাতে দেয় না সে। ব্যাপারটা জানতে পারে না হাসিনা বানু। দেড় বছর ধরে এভাবেই সে টাকা পাঠায় নছর আলীর নামে। নছর আলী টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করে। বড় মেয়েটার স্বামীকে এ পর্যন্ত আশি হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে বলেও জানায় সে। কিন্তু নছর আলীর হাবভাব, তার কথা বিশ্বাস হতে চায় না হাসিনা বানুর। তবুও সে পরবর্তী কিস্তিতে টাকা পাঠালে জামাইকে বাদ বাকি টাকা বুঝিয়ে দেয়ার অনুরোধ করে নছর আলীকে। নছর আলী আস্বস্ত করে হাসিনা বানুকে।
একবারও নছর আলীর নতুন বউটার কথা জানতে চায় না হাসিনা বানু। আগে নিজের মেয়ের সমস্যার সমাধান করতে চায় সে। নছর আলী নিজে থেকেও এ ব্যাপারে আর কোন কথা তোলে না। হাসিনা বানুও তুলতে চায় না। যদি নছর আলীর সমস্যা সমাধানের কথা বলে টাকা পয়সাগুলো ওই দিকে খরচ করতে চায়, তাহলে তো মেয়েটা বিপদেই পড়ে থাকে। আগে মেয়েটার সংসার ঠিক হোক, পরে নিজেরটা। হাসিনা বানু ভাবে- ‘আমিই মাইয়াটার জীবনটা তছনছ কইরা দিছি। আর আমার জীবনটা তছনছ কইরা দিছে নছর আলী।’
হাসিনা বানুর প্রথম সংসারের মেয়েটার ওপর নির্যাতন ইদানীং অনেক বেড়ে গেছে। ঘটনা জানতে পারে নছর আলী। বিষয়টি নিয়ে তার একটুও মাথাব্যথা হয় না। প্রতারণা ধরার পড়ার ভয়ে হাসিনা বানুকেও বিষয়টি জানায় না সে। হাসিনা বানু মেয়ের জামাইকে যৌতুকের এক লাখ টাকা পূরণ করার জন্য আবারও টাকা পাঠায়। এ টাকাও মেরে দেয় নছর আলী। হাসিনা বানু মেয়ে আর জামাইর সঙ্গে কথা বলার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। নছর আলী নানা অজুহাত দেখায়। হাসিনা বানুর সন্দেহ পোক্ত হতে থাকে। আমেনা আর ওর নানীও হাসিনা বানুর সঙ্গে কথা বলতে চায়। বারবার নছর আলীকে অনুরোধ করে। নছর আলী ওদের সঙ্গেও নানা টালবাহানা করতে থাকে।
মেয়ে আমেনা এরই মধ্যে কিশোরী হয়ে উঠেছে। বুদ্ধি-সুদ্ধিও গজাচ্ছে মাথায়। বাপের টালবাহানা দেখে সে নিজে নিজেই বুদ্ধি আঁটে। একদিন বাপের মোবাইল থেকে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার নাম্বারটা নিজেই একটা কাগজে লিখে ফেলে। এটা যে বিদেশের নাম্বার এবং তার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার নাম্বার, এটাও সে বুঝে ফেলে। বেশ কয়েক মাস আগে এই নাম্বারটা দিয়েই মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিল আমেনা। নছর আলীই ধরিয়ে দিয়েছিল ফোনটা। নাম্বারটা চিনতে কষ্ট হয় না। দুরুদুরু বুকে ঠিকঠাকভাবে নাম্বারটা টুকে নেয় সে। নানীর সঙ্গে যুক্তি পরামর্শ করে। শেষ পর্যন্ত বুড়ির এক বোনঝিকে দিয়ে ফোন করা হয় হাসিনা বানুকে। টানা কয়েকদিন বারবার ফোন করার পর পাওয়া যায় তাকে। সব শুনে যন্ত্রমানবী হাসিনা বানু পাথর হয়ে যায়।
আত্মহত্যার চিন্তা বহু আগেই পরিত্যাগ করেছে সে। এবারও এ চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। এমনিতেই নিজেকে সে পাপী মনে করে। আত্মহত্যা করে সেই পাপের বোঝা আরও বড় করতে চায় না। কষ্ট সহ্য করে পাপের প্রায়শ্চিত্য করতে চায়। আর এক মুহূর্তও বিদেশে থাকতে ইচ্ছে করে না তার। ইচ্ছা না করলেও উপায় নাই। আরও কমপক্ষে ছয় মাস তাকে কাজ করতে হবে। এখানে ক্রীতদাসের চেয়েও কঠিন জীবন। নিরুপায় হয়ে এ জীবন শুরু করেছিল আরও দেড় বছর আগে, এখনও সে নিরুপায়। তারপরও একটা উপায় চিন্তা করে সে। দুই মাসের বেতনের টাকা তার হাতে আছে, সামনে আরও ছয় মাস। দেশে গিয়ে জামাই ছেলেটার হাতে একসঙ্গে দেয়া যাবে। হাসিনা বানুর মাথায় আর কোন চিন্তাই কাজ করে না। ছয় মাস, কেবলমাত্র ছয় মাসের অপেক্ষা তার।
ছয় মাস অনেক সময়। এর মধ্যেই ঘটে যায় অনেকগুলো ঘটনা। হাসিনা বানুর বড় মেয়েটা গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে। সবাই বলে সাজানো ঘটনা। ওকে পাশবিক অত্যাচার করে মারা হয়েছে। পুলিশ বলছে আত্মহত্যা। নছর আলী তার নতুন বউকে নিয়ে নিজের ঘরে উঠে আসে। আমেনা আর তার ভাই বোনোরা সৎ মায়ের দেখা পায়। ঘরের পরিবেশ অন্যরকম হয়ে যায়। ক’দিন পরেই আমেনাকে একটা ছেলের সঙ্গে জোরপূর্বক বিয়ে দেয় নছর আলী। কেউই এ বিয়ে বন্ধ করতে পারে না। এভাবেই একের পর এক হাসিনা বানুর সকালগুলো গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকে।