
পূর্বসূত্র :
টাকা ফুরিয়ে আসছে। মেজ ভাই টাকা পাঠাচ্ছেন না। দুশ্চিন্তা বাড়ছে মমিনের। চিঠি লেখে সে ভাইকে। নিজের অংশের পাট বিক্রি করে টাকা পাঠানোর অনুরোধ করে। এদিকে রাজশাহী কলেজে রাষ্টভাষা আন্দোলন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। শ্যামপুরে কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহর জন্মদিন উপলক্ষে অনুষ্ঠানেও রাষ্টভাষার প্রশ্ন ওঠে। এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে গ্রামের লোকজনদের সঙ্গে মমিনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। রাতে তফেজ তাকে ডেকে তোলে। তার সারা শরীর ভেজা, কাঁপছে সে। তাকে শুকনো কাপড়-চোপড় দেয় সে। শীতের এই গভীর রাতে তার এই হাল কেন জানতে চায় মমিন। কিন্তু খুলে বলে না তফেজ। বরং তাকে অনুরোধ করে সে যেন কাউকে এ ব্যাপারে কিছু না বলে। কথা দেয় মমিন। রাতে সে স্বপ্ন দেখে তার মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়ে সে।
তের
ভোর বেলা রোজকার মতো মাঠ বেড়িয়ে এসে পুকুরে হাত-মুখ ধুয়ে উঠছিলেন আজিম মন্ডল। তখন জহির মন্ডল এসে দাঁড়ালেন সেখানে। ঘাড়ের গামছায় মুখ মুছতে মুছতে আজিম মন্ডল বললেন, -কিছু ব্যুইলবে, ভাই?
-হ্যাঁ, আজ তো বিহায়ের বাড়িত্ দাওয়াত। তুমি না গেলে ক্যামুন হয়? ম্যার শ্বশুরবাড়ি বুইলি কথা।
তারা পুকুরপাড়ের মাচানটায় বসলেন। পুকুরটা তখনও শাদা কুয়াশায় ছেয়ে আছে। গাছের মাথায় লালচে আলোর আভা।
-না ভাই, আজিম মন্ডল বলেন, সমাজে ঝামেলা হবে। তুমরাই যাও। আর কাউর যাওয়ার দরকার নাই। সামনে জুম্মার দিন ওই লিই কী হয় দেখোনি।
প্রত্যেক শুক্রবার জুমআর নামাজের পর মসজিদে কিছুক্ষণের জন্য বসেন সমাজের মুরুব্বিরা। সমাজের নানান সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয় সেখানে। নামাজের পর খাওয়ার সময়। তাছাড়া এ অঞ্চলের একমাত্র সাপ্তাহিক হাটটি কাটাখালিতে বসে সেদিনই বিকেলে। সন্ধ্যার মধ্যেই হাট ভেঙ্গে যায়। সেজন্যে সময় বেশি থাকে না মুরুব্বিদের হাতে। ওই সময়ের মধ্যে কোনো বিষয়ের সমাধান না হলে অন্য কোনোদিন অন্য কোনো সময় বসার সিদ্ধান্ত হয়। সেটা হয় অনেকটা সালিশের মতো। সেখানে লোকজন থাকে অনেক।
শ্যামপুরের এই আহলে হাদিস সমাজের লোকেরা কখনো থানা-পুলিশ কিংবা আদালত-কাচারিতে যায় না। যত বড় সমস্যাই হোক, সমাজই তার সমাধান করে দেয়, মেনেও নেয় সবাই। এতদিন এরকমই হয়ে এসেছে। ইদানীং কিছু-কিছুব্যতিক্রম ঘটছে। প্রায়ই কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে তজা মানে তোজাম্মেল ঝামেলা বাধাচ্ছে।
-এই তজা সমাজটাক্ লষ্ট কইরি দিলো। কী যে মুন অর। মলবি স্যাব তো অরকুম না!
-মামুরও দোষ আছে, ছেলিক্শাসন কর্ইতে পারে না।
-হুঁ! ছেলি ইট্টুক্ল্যাখাপড়া কইরিছে, ব্যবসা করে, কিছুট্যাকা-পাইসাও হয়ছে, মলবি সাইব কিছু ব্যুইলতে পারে না।
কথাটা সত্যি, আজিম মন্ডল ভাবেন। সমাজের ঐক্য ও শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব করে কী লাভ তোজাম্মেলের ভেবে পান না তিনি। গাঁয়ে না মানলে কি আপনি মোড়ল হওয়া যায়! তাছাড়া তার পিতাই তো মোড়ল। তাঁকে অসম্মান বা অমান্য করার মতো কোনো কিছুতো ঘটেনি কখনো। তাহলে তার এই দল পাকানোর কারণ কী!
বাড়িতে ফিরে দেখেন সাকিরউদ্দিনের স্ত্রী জরিনা বিবি বসে আছে রান্নাঘরে। তার স্বামী মারা গেছেন কয়েক বছর হলো। তারপর থেকে ছেলেমেয়েদের নিয়ে দুর্ভোগের শেষ নেই মেয়েটার। তার এক দেবর তাকে বিয়ে করার জন্যে কী-ই না করেছে। ভাবির অপূর্বসৌন্দর্যআর ভায়ের জমির লোভ হয়তো তাকে পাগল করে তুলেছিল। তার ভায়েরাও তার পক্ষ নিয়েছিল। তাদের যুক্তি, যদিও চারটে সন্তান রয়েছে ভাবির, তবুতার বয়স তো বেশি নয়, এভাবে জীবন কাটানো কঠিন। কাউকে না কাউকে বিয়ে তাকে করতেই হবে। তা-ই যদি হয়, তাহলে বাড়ির বউ বাড়িতে থাকেলেই তো সবচেয়ে ভাল। যুক্তি একেবারে ফেলনা নয়, অধিকাংশ লোকেরই এই মত। তোজাম্মেলের মতো উত্তরপাড়ার অনেককেই দলে ভিড়িয়েছিল তারা। কিন্তুরাজি হননি ভাবি, ছেলেমেয়েদের নিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন স্বামীর ভিটেয়। সে সময় তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আজিম মন্ডল। কেউ কাউকে জোর করে বিয়ে করবে তা কি মেনে নেওয়া যায়? মানেননি তিনি। আসলাম মৌলবিও তার সঙ্গে একমত ছিলেন। তাই শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়নি। কিন্তু তারপর থেকে তার দেবর-ভাশুররা তাকে একরকম একঘরে করে রেখেছে। কোনো ব্যাপারে কেউ সাহায্য করে না তাকে। দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদের ভয়ে অন্যরাও হাত গুটিয়ে থাকে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মেয়েটি আসে এ পাড়ায়, আজিম মন্ডলের কাছে। এ নিয়েও তাকে কম কথা শুনতে হয় না।
-ভাল খবর ভাবি? জিজ্ঞেস করলেন আজিম মন্ডল।
সাকিরউদ্দিন তার চেয়ে বছর তিনেকের বড় ছিলেন। তাই ভাবি বলেই ডাকেন জরিনা বিবিকে।
-বিপদে পইড়্লেই তো তুমার কাছে আসতে হয় ভাই। আমার আর কে আছে বুলো?
অবশ্য পরিস্থিতি এখন আর আগের মতো নেই। মেয়েটির বিয়ে দিয়েছেন, সেটা এ পাড়াতেই, সে ভাল আছে। বড় ছেলে জামিরউদ্দিন আর মেজ ছেলে আসিরউদ্দিন গায়ে-গতরে বড় হয়েছে, চাষবাস দেখছে। ছোট ছেলে মঈনউদ্দিন পড়াশোনা করছে। রাজশাহী কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট পাশ করেছে, ভর্তি হয়েছে ডিগ্রি ক্লাসে। জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর অনেকের সঙ্গেই তাদের বেশ সদ্ভাব হয়েছে ইদানীং।
মঈনউদ্দিনের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় জরিনা বিবিকে। মাঝে-মধ্যেই হাত পাততে হয় তাকে। তখন তিনি সোজা চলে আসেন আজিম মন্ডলের কাছে। -আল্লার পর এই দুনিয়াত্তুমিই আমার একমাত্র সহায় ভাই।
লজ্জা পান আজিম মন্ডল। -ক্যান ভাবি, অ্যাখুন তো তুমার ছেলিরা লায়েক হয়ছে। জ্ঞাতি-গুষ্ঠির লোকেরে সাথ্ ভালই তো সম্পর্ক।
কথাটা সত্যি, কিন্তুএর ভেতর একটু খোঁচা আছে বলে মনে হয় জরিনা বিবির। তোজাম্মেলের সঙ্গে তার ছেলেদের ভারি ভাব ইদানীং। একবার তার পক্ষ নিয়ে আজিম মন্ডলের বিরোধিতায় যোগ দিয়েছিল তারা। কথাটা শুনে কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি, ভীষণ বকেছিলেন ছেলেদের। তার মনে হলো আজিম মন্ডল বোধ হয় সেই খোঁচা দিতেই কথাটা বললেন। মনে মনে নিজেকে খুব ছোট বোধ হলো তার। তিনি বললেন, আমাক্ তুমি নাফরমান ভাইবো না ভাই। আমার ছেলিরা তুমাক্ আর কুনুদিন অসম্মান কর্ইবে না।
লজ্জা পেলেন আজিম মন্ডল। -না ভাবি, ছিঃ ছিঃ! আমি কুনুদিনই সেরকুম ভাবিনি।
এ কথা সত্যি যে তার ছেলেদের আচরণে তিনি সে সময় বিস্মিত হয়েছিলেন, খারাপও লেগেছিল একটু, কিন্তুএ নিয়ে সত্যিই তেমনটা ভাবেননি তিনি। বরং তার ভাল লাগে। মানুষের উপকার করতে তার ভাল লাগে, সে যে-ই হোক না কেন। কোনো প্রতিদানের আশায় এসব করেন না তিনি, তার ভাল লাগে, মন চায়, তাই করেন। একবার এক ওয়াজ মাহফিলে বয়ান শুনেছিলেন তিনি, মওলানা বলেছিলেন, ভাল কাজ আর মন্দ কাজ কোনটা তা নিজেই বোঝা যায়। দেখবেন ভাল কাজ করতে পারলে মনে আনন্দ জাগে, তৃপ্তি বোধ হয়। আর খারাপ কাজ করলে মনটা খুঁতখুঁত করে, পাপবোধ হয়। মানুষকে সাহায্য করতে পারলে তার আনন্দ হয়।
যা ভেবেছিলেন আজিম মন্ডল তা-ই, জরিনা বিবির টাকা দরকার। জরিনা বিবি চাইলে তিনি কখনো না করেননি। এমন কখনো কখনো হয়েছে যে সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারেননি, পরে দিয়েছেন, কিন্তু না বলেননি। টাকা কেন দরকার সেকথাও তিনি কখনো জিজ্ঞেস করেননি। জরিনা বিবি নিজে থেকেই কোনো না কোনো কারণ বলেছেন। আজও বললেন। -মঈনুদ্দিনের জাড়ের কাপুড় কিনতে হবে। ঠাণ্ডাত্ ছেলিডার খুব কষ্ট হোইছে।
কষ্ট হওয়ারই কথা। এবার শীত একেবারে জেঁকে বসেছে। প্রায় দিনই অনেক বেলাভর কুয়াশায় ঢেকে থাকছে চরাচর। আবার দুপুর গড়াতে না গড়াতেই ফিকে হয়ে আসছে সূর্যের আলো। এরকম দিনে ঘরে বসে থাকাই কষ্টের, ভাল গরম পোশাক না থাকলে বাইরে চলাচল করা তো আরো দুর্ভোগের ব্যাপার।
ছেলেটাকে বড্ড ভালবাসেন জরিনা বিবি। মায়ের মতই সুন্দর হয়েছে দেখতে, যেমন রং শরীরের, তেমনি চেহারা। একটু খাট এই যা। এই ছেলেকে নিয়ে তার অনেক প্রত্যাশা। জজ-ব্যারিস্টার না হোক, সে যে বড়-সড় চাকরি-বাকরি করবে সেটা অনেকটাই নিশ্চিত। ছেলেটাও পড়াশোনায় খুব মনোযোগী। এই গাঁয়ের একটা এতিম ছেলে বড় হবে সে তো আনন্দের কথা। সেজন্যে আজিম মন্ডল তাকে সহযোগিতা করতে কসুর করেন না।
জরিনা বিবিকে নিয়ে এই বাড়িতেও কম ঝঞ্ঝাট হয়নি প্রথম প্রথম। আজিম মন্ডলের কাছে তার আসা-যাওয়া ও ঘনিষ্ঠতাকে গাঁয়ের অনেকের মতো এই বাড়ির লোকেরাও ভাল চোখে দেখেননি। কিন্তু কালের কষ্টিপাথরে সব ধোঁয়াশা কেটে গিয়েছে একসময়। এ বাড়িতে তার যাতায়াত এখন বাড়ির লোকের মতন। তবু তিনি সময় বুঝেই আসেন। এই সকাল বেলায়, যখন আজিম মন্ডলকে পাওয়া যায়, বাড়ির লোকেরাও মওজুদ থাকেন। একটা ব্যাপারই তার খারাপ লাগে যে এটা সকালের খাওয়ার সময়। খাওয়ার সময় কারো বাড়ি যাওয়া ভাল দেখায় না। সবচেয়ে বিব্রতকর ব্যাপার হলো তাকে খেতেই হয়। যত অজুহাতই দেখান না কেন শোনেন না বাড়ির লোকেরা। আবার বিদায় নেওয়ার সময় এটা-ওটা হাতে ধরিয়ে দেন মেয়েরা। মনে মনে তাকে খুব লজ্জিত হতে হয়।
এবারও যথারীতি তা-ই ঘটল। আগে খেতে হলো, তারপর টাকা পেলেন হাতে। সঙ্গে বেগুনের একটা ঝোলা। আজিম মন্ডলের জমির বেগুন। আগের দিন তোলা। এখনো টাটকা দেখাচ্ছে।
-আমাক্ আর কত শরম দিবেন চাচি? এগ্লি না দিলে কি হয় না?
-কিসের শরম রে মা? এগ্লি কী অ্যামুন জিনিস যে শরম লাইগ্বে? লিই যাও। বলেন আজিম মন্ডলের মা।
এ বাড়িতে জিনিস-পত্রের যেমন ছড়াছড়ি, বাড়ির মানুষের মনও সেরকম উদার। তারা কাউকেই না দিয়ে কিছু খান না। গ্রামের গরিব-দুঃখীদের জন্যে এ বাড়ির দুয়ার সব সময় খোলা।
অতিথি বিদায় হলো। খাওয়া-দাওয়াও হলো সবার। তবু আজিম মন্ডল বেরোচ্ছেন না দেখে একটু অবাক বাড়ির মানুষ। এমনটা তো হয় না সচরাচর। একান্তই অসুখ-বিসুখ ছাড়া কখনো দিনের আগা বেলা বাড়িতে কাটে না তার।
-কী ব্যাপার, শরীল খারাপ নাকি? বিছ্নি কইরি দিবো?
স্ত্রীর কথায় কিছুটা বিদ্রƒপ আছে বলে মনে হলো আজিম মন্ডলের। -না, না, শরীল খারাপ হোইতে যাবে ক্যান? ভাবছি দুদিন থেকি ইফ্ফাত আরা আসছে না, তুমি খিয়াল কইরিছো?
-হুঁ, লাতনির লেগি জি পুইড়ছে।
-না, ঠাট্টার কথা না। অসুখ-বিসুখ হলো না তো!
-না, না। কাইল্ দুফোরেই তো আইসিছোল্। আপ্নে বাড়িতে থাকেন না। দেখ্ফেন কী কইরি!
-হুঁম্। ঠিক আছে।
কাপড় পরতে শুরু করলেন মন্ডল।
তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পর হন্তদন্ত হয়ে আব্দুল্লাহ ঢুকলো বাড়িতে। -মা, খাইতে দে। তাড়াতাড়ি দে মা, দেরি হয় গ্যালো।
-কুণ্ঠে ছিলে অ্যাতোক্ষুন? খাওয়ার যে ঠাণ্ডা হয় গ্যালো।
-আচ্ছা, ঠাণ্ডা হোইক। দে।
এই এক ছেলে এই বাড়ির। সকলের আদরের পাত্র। আদব-কায়দাও খারাপ নয়, কিন্তু পিতার মতই উড়নচণ্ডী। -ল্যাখা নাই, পড়া নাই, খালি টইটই কইরি ঘুইরি বেড়াবে। ম্যাট্রিক ফেল করে লেখাপড়া ছেড়ে দিলো। অথচ ঘর-সংসারের দিকে কোনো আগ্রহ নেই। ঘাড়ে বউয়ের জোয়াল না পড়লে জব্দ হবে না ভেবে তার জন্য পাত্রী দেখা চলছে।
খাওয়াতে খাওয়াতে ছেলেকে বলেন খোদেজা বিবি, তুমার বাপ যে খালি মাথা ঠুইকি মর্ইছে। ল্যাখাপড়া না কইরলে বি-শাদি কইরি ঘর-সংসারে মুন দ্যাও।
কোনো প্রত্যুত্তর করে না ছেলে। সামান্য কিছু খায় কি খায় না উঠে পড়ে। -কী হোইলো, কিছুই খাইলে না যে! আস্পেন তো সেই রাইতে।
পিতার মতো স্বভাব পেয়েছে ছেলেও, সেই যে সকালে বেরোবে, একেবারে ফিরবে সন্ধ্যায়, বা তারও পরে। -সারাদিন কুণ্ঠে কী কইরি যে বেড়ায় কে জানে। কোনো দুর্নাম শোনা যায় না বটে, তবুজোয়ান বয়স বলে কথা, ভয়ে ভয়ে থাকেন খোদেজা বিবি।
খলিল বেরিয়ে এলো তার ঘর থেকে, হয়তো আব্দুল্লাহর কথা শুনেই। মলিন মুখে হাসি ছড়িয়ে সে ভায়ের পাশে গিয়ে বসল। তাকে দেখে আব্দুল্লাহ বলল, কী রে, তোর খবর কী?
-আমার কুনু খবর নাই বড় ভাই।
তার কণ্ঠে হয়তো মিশে ছিল বিষাদের সুর, কানে বাজে আব্দুল্লাহর। মুখ তুলে তার দিকে তাকাল সে। -অসুখ আবার বাইড়িছে নাকি?
-ওই! কখুনো ইট্টুক্ বাড়ে, কখুনো ইট্টুক্ কমে, আবার বাড়ে, ভাল হয় না।
তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে খোদেজা বিবি বলেন, ভাল হবে ব্যাটা, ভাল হবে।
-আর ভাল হবে না বড় মা।
-ক্যান, ডাক্তার দেখছে না? জিজ্ঞেস করল আব্দুল্লাহ।
-দেখছে, দেখছে বুইলিই তো অ্যাখুনো চইলি-ফিইরি বেড়্যাছে। তা নাহিলে যে হাগা হাগে, হাইগি-হাইগি ছেইলিডা শ্যাষ হয় গ্যালো অ্যাক্খিবারে।
-কী আশ্চর্যঅসুখ। ভাল হোছে না।
-হ্যাঁ, কী যে অসুখ, কুনু ওষুদই ধরে না।
ওঠে আব্দুল্লাহ। তার তাড়া আছে। হেনা ভাই ডেকে পাঠিয়েছে। হামিদ মিয়ার ছেলে। মুসলিম লীগের ভবিষ্যত কর্ণধার। তার সঙ্গে তার ভাল সম্পর্ক। কী জন্যে ডেকেছে জানে না সে। তবে নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।
চৌদ্দ
রাজশাহী কলেজে আজ চরম উত্তেজনা। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে গোটা কলেজচত্ত্বর মুখরিত। আজকের মিছিলটিও বিশাল। বোঝাই যাচ্ছে গতদিনের হামলা ও মারধরের প্রেক্ষিতে জোট বেঁধে নেমেছে আজ। অন্যান্য স্কুল-কলেজ থেকেও ছাত্ররা এসেছে। কিছু অছাত্রও আছে, বাইরে থেকে আনা হয়েছে তাদের। বিরোধীদের খবর নেই আজ। তারা হয়তো বুঝতে পারেনি এতটা সংগঠিত হয়ে নামবে আন্দোলনকারীরা। কলেজে আগে থেকেই আতঙ্কাবস্থা চলছিল, তা সত্ত্বেও সকালের দিকে দুটো ক্লাস হয়েছে। তারপর মিছিল দেখে সাধারণ নিরপেক্ষ ছাত্র-ছাত্রীরা একে একে কেটে পড়েছে। ক্লাস হওয়ার মতো পরিবেশ নেই বুঝতে পেরে মমিনও বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সময় নষ্ট করে কী লাভ। তাছাড়া কখন আবার তাড়াহুড়ো শুরু হয়ে যায় কে জানে। সে যখন প্রশাসন ভবনের সামনে, তখন মিছিল থামিয়ে বক্তৃতা চলছে। হঠাৎ তার নজরে পড়ল, যে ছেলেটা ভাষণ দিচ্ছে তার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে আজিম মন্ডলের ছেলে। সে ভাল করে দেখল। হ্যাঁ, সে-ই।
আব্দুল্লাহর সঙ্গে তার এখনো তেমন একটা পরিচয় হয়ে ওঠেনি। তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতই ঘটে না। কিন্তু যে দু-তিন দিন একটু দেখেছে তাতেই তার চেহারা তার মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছে। কারণ, প্রথমত, সে তার জায়গীর-মালিকের ছেলে। দ্বিতীয়ত, দেখতে রাজপুত্রের মতো। তার চেহারায়, চলনে-বলনে একটা রাজকীয় ভাব আছে। তাকে দেখে মমিনের মনে পড়ে তাদের পাশের গ্রাম সাদিয়াড়ের জমিদার খালেক মোল্লার কথা। তাদের চলায়-ফেরায় একটা আলাদা রকম ভঙি ছিল, কথার মধ্যে প্রভুত্বসূচক জোর ছিল, সব মিলিয়ে যাকে আভিজাত্য বলে। আজিম মন্ডল জমিদার নন, তাকে এমনকি জোতদারও বলা যায় না, খুব জোর একজন বড় কৃষক। অবশ্য তারা নিজেরা জমিতে কাজ করেন না, পাইট-জন-মুনিশরাই আসলে চাষ-বাস করে। তারা দেখভাল করেন মাত্র। তবু তারা গৃহস্থ মানুষই বটে। এ অঞ্চলে ত্রিশ-চল্লিশ বিঘা জমি থাকলেই সে বড়লোক। আজিম মন্ডলদের জমির পরিমাণ শ’ বিঘা ছাড়িয়ে যাবে। তাছাড়া আসল কথা হলো আচার-আচরণ। জমিদার-জোতদার না হলেও নিজ গুণেই সেই কর্তৃত্ব, প্রভাব ও আভিজাত্য অর্জন করেছেন আজিম মন্ডল। আব্দুল্লাহ তার সেই আভিজাত্যের উত্তরাধিকারী।
তাকে এখানে দেখে কৌতূহল হলো মমিনের। সে-ও বক্তৃতা করবে নাকি?
হতাশ হলো মমিন। ওই একজনই ভাষণ দিল, বেশ অনেকক্ষণ ধরে। কথা ওই একই- মাতৃভাষার গুরুত্ব, মর্যাদা ও প্রয়োজনীয়তা, বাংলা ভাষাকে নির্মূল করার ষড়যন্ত্র, ইত্যাদি। ছেলেটা অনেক কিছু জানে। অনেক উদাহরণ ও রেফারেন্স দিয়ে সে ছাত্রদের বুঝানোর চেষ্টা করল। ছেলেটা কম্যুনিস্ট না হয়ে যায় না। কম্যুনিস্টরা খুব পড়াশোনা করে, আর খালি প্রতিবাদ আর বিপ্লবের কথা বলে, সেই ভাবতায় থাকতেই শুনছে সে।
বক্তৃতা শেষ হলো, মিছিলও ভেঙ্গে গেল। মমিনের একবার মনে হলো ছুটে গিয়ে দেখা করে আব্দুল্লাহর সঙ্গে। তারপর আবার ভাবল, তেমন একটা ঘনিষ্ঠতা হয়নি এখনো, কী-না-কী মনে করে কে জানে। এইসব সাত-পাঁচ ভেবে ক্ষান্ত হলো সে।
মিছিল যখন শেষ হলো, আবার ক্লাস হতে পারে। একটু থেমে দেখা যাক ভেবে ফুলার হোস্টেলের দিকে এগুলো সে। কড়াইতলায় পৌঁছতেই পারল না, দেখল ওইদিক থেকেই হইহই করে ছুটে আসছে একদল লোক। তাদের প্রত্যেকের হাতে ছোট ছোট লাঠি। দ্রুত দূরে সরে গেল মমিন। এটাও একটা মিছিল, ঝটিকা মিছিল। তাদের স্লোগান- ‘রাষ্ট্রভাষা উর্দু চাই’, ‘ভারতের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান।’ তারা প্রশাসন ভবনের দিকে ছুটে চলেছে।
অবস্থা বেগতিক দেখে হিন্দু হোস্টেলের ভেতর দিয়ে পুবদিকে পালিয়ে গেল মমিন। দরগাপাড়াকে বামে রেখে সদর হাসপাতালের সামনে দিয়ে হাতেম খাঁর মোড়ে পৌঁছে একটুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর আস্তে আস্তে সাহেববাজারের দিকে এগুল। সোনাদীঘির মোড়ে গিয়েও কোনো মিছিল-মিটিং বা তাড়াহুড়োর কিছু না দেখে মমিন ভাবল, দুই পক্ষের সঙ্গে দেখা হয়নি তাহলে। সে কলেজের দিকে না গিয়ে বাসস্ট্যান্ড বরাবর হাঁটা ধরল।
বাসে বসে সে নিজের ভাবনায় মশগুল হয়ে পড়ে। মেজ ভাই কি টাকা পাঠাবেন না? তিনি কি তার সমস্যা বুঝতে পারছেন না? এটা তো অন্য একটা দেশ, অনেক দূর, কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই এখানে। কে তাকে সহায়তা করবে? কামালের কথা মনে পড়ল তার। সম্পর্কে সে ভাগনা হয়। তারা এখানকার জামিরা গ্রামের মানুষ। তার বাপ জামালউদ্দিন তাকে ও তার মাকে নিয়ে কলকাতায় থাকতেন। সেখানে এক মাড়োয়ারির গদিতে কাজ করতেন। বড় ভাল মানুষ ছিলেন তিনি। ম্যানেজার হয়েছিলেন এক সময়। কামালের বয়স যখন তিন বছর তখন তার মা সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা যান। সে সময় মোহাম্মদ মোল্লার বড় মেয়ে সায়রা বানুও ছোট ছোট দুই মেয়ে নিয়ে বিধবা হন। মাড়োয়ারির মধ্যস্থতায় সায়রা বানু ও জামালউদ্দিনের বিয়ে হয়। এর পরপরই মারা যান মোহাম্মদ মোল্লা। তার বছরখানেক পরে গাড়িচাপা পড়ে মৃত্যু হয় জামালউদ্দিনের। কামালকে জামিরায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় তার চাচারা। আর দুই মেয়েকে নিয়ে ভাইদের কাছে ফিরে আসেন সায়রা বানু। তারপর থেকে তাদের মধ্যে আর কোনো যোগাযোগ নেই। মমিন এসব গল্প শুনেছে তার বড় বোনের কাছে।
কামালকে খুঁজে পেতে জামিরা গ্রামে যায় মমিন।
শ্যামপুরের মতোই বেশ বড় বর্ধিষ্ণুগ্রাম জামিরা।
(চলবে)