এবড়ো খেবড়ো মোরামের ওপর দিয়ে মাতালের মতো টলতে টলতে এসে ট্রেকারটা থামল শিবতলায়। পিছন পিছন ছুটে আসা লাল-ধূলোর কুন্ডলী নিমেষে ঢেকে দিল ট্রেকারের আপাদ-মস্তক। কুয়াশা কাটা আকাশের মতো ধূলোর চাদরটা ক্রমশ পাতলা হতেই স্পষ্ট হল ট্রেকার, আরোহী, কন্ডাক্টর, ড্রাইভার।
একটু দূরেই শেতল বাউরির চায়ের দোকান। দোকানের সামনে বাঁশের বেঞ্চি। ছ-টা খুঁটির ওপরে খানকয়েক বাখারি পেরেক দিয়ে গাঁথা বেঞ্চিটার কাছে অপেক্ষায় থাকা তিন জোড়া চোখ তন্ন-তন্ন করছে ট্রেকার। ওদের শরীরী ভাষায় একটা হতাশার ছাপও স্পষ্ট। সম্ভবত শহর থেকে আসা একের পর এক ট্রেকারে ইঙ্গিত আপনজনকে দেখতে না পাওয়ারই পরিণাম।
হাড়গিলগিলে বেঞ্চিটা সামান্য বাঁশের তৈরি হলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের এক শ্রেণির মানুষ যেখানে মন্দির-মসজিদ এর ঠুনকো সেন্টিমেন্ট নিয়ে লাঠালাঠি-ফাটাফাটিতে মত্ত, সেখানে এই বেঞ্চি হিন্দু-মুসলমান দুই বিপরীত মেরুর জাতিকে পাশাপাশি বসিয়ে সমন্বয়ের কাজ করে চলেছে নিরলস। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে গ্রাম থেকে শহরগামী মানুষ যেমন ট্রেকারের অপেক্ষায় বসে থাকে বেঞ্চিতে, তেমন শহর থেকে গ্রামে আসা আত্মীয়-স্বজনদের পথ চেয়েও বসে থাকে তারা। এই বেঞ্চিতে বসেই শেতল বাউরির হাতে তৈরি চায়ের লোভে দু-বেলা মুখিয়ে থাকে মুখুজ্জে, চাটুজ্জে, শেখ, সৈয়দরা। তাই শেতল বাউরির চায়ের দোকানের কাছে শিবতলাকে শিবের উপাসক বা বিশেষ শ্রেণির সংরক্ষিত এলাকা না বলে গ্রামের হিন্দু-মুসলমানের মিলনক্ষেত্র বলা যায় অনায়াসেই।
ট্রেকার থেকে এক এক করে নেমে আসা আরোহীর দিকে নির্নিমেষ চেয়ে আছে জরিনা, সেরিনা ও সাহিলা। মরিচ-মশলা, কাপড়ের গাঁটরির ফাঁক দিয়ে হঠাৎ ট্রেকারের মাথায় চক্চক্ করে উঠল দুটো ঢাউস ভিআইপি। ওরা এগিয়ে গেল আরো।
এমন সময় ট্রেকার থেকে বেরিয়ে এল নাসিম, নাতাসা। দুই মেয়ে টুইংকেল, বিউটি। ভিআইপি দুটো নামানো মাত্র ট্রেকারটা একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে হুঁশ করে শিবতলাকে পিছনে রেখে ছুটে গেল গন্তব্যের দিকে।
ট্রেকার চলে যেতেই ওদের তিন জোড়া চোখের সাথে যুক্ত হল আরো এক জোড়া চোখ। যার চাহনি আরো তীক্ষè, অন্তর্ভেদী। ধনু নাপিতের সেলুন থেকে বেরিয়ে আসা চোখ দু’টি আব্বা কেরামত সেখের। গেঞ্জি-লুঙ্গি পরা সদ্য কামানো দুধসাদা সুন্নত দাড়িতে কেরামতের মুখ যেন ঝক্ঝক্ করছে। শহর থেকে ছেলে-বউ আসছে বলেই ওর এই সুন্দর করে দাড়ি কামানো। নইলে খোঁচা-খোঁচা দাড়িতে ভরে গেলেও তাগিদ থাকে না কাটার।
নাসিম নাতাশাকে দেখেই কেরামতের দুচোখের কোণে এক ঝলক খুশি চিকচিক করে উঠল। ‘ওরে আমার দিদুরে’- বলেই আদর করে কোলে তুলে নিলো ছোট্ট বিউটিকে।
জরিনা, সেরিনা, সাহিলা আর আব্বার মাঝে মা নুহুরাকে দেখতে না পেয়ে অবাক হলো নাসিম। অন্যবার কেউ না থাকলেও শিবতলার মোড়ে ওদের অপেক্ষায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতো মা। আজ কেন আসেনি মা? তবে কি ট্রেকারের অপেক্ষায় থেকে থেকে আরো দেরি হবে ভেবে গাই বাছুর নিয়ে মাঠে গেছে মা? হতেও পারে। গত মাসেই সাহিলা চিঠিতে জানিয়েছিল গাইটার একটা বক্না বাছুর হয়েছে। এ সময়ে গাইটাকে শুধু খোল ভূষি খাওয়ালেই হবে না, সবুজ ঘাসও খাওয়াতে হবে। সবুজ ঘাস খেলে দুধ বাড়ে। তা ছাড়া মায়ের আগাগোড়াই পশু-পাখির ওপর একটা আলাদা টান। তাই ছাগল, গরু, হাঁস-মুরগির কোনো কষ্টই মায়ের সহ্য হয় না। বিশেষ করে ক্ষুধার্ত ছাগলের ব্যা-ব্যা আর গরুর হাম্বা-হাম্বা একেবারেই না পছন্দ মায়ের। ওই গাইটাকে নিয়ে কি মায়ের কম ঝক্কি! খাওয়ানো, গা-ধোয়ানো, সন্ধ্যায় গোয়ালে ঘুঁটের ধোঁয়া দেয়া। আরো কত কী! সেবার তো মাঠে নিয়ে যাবার সময় গাইটা হঠাৎ ফুর্তিতে চারপা তুলে মায়ের হাত ফসকে দে ছুট। মা ও বাব্বা, এমন হবে জানলে কি আর আসতুম? এ তো দেখছি নানীকে দেখতে বেরিয়ে শেষে নিজের জানই কবজ হবার যোগাড়! বলে ওঠে নাতাশা।
আর এতো গেল দামোদর, এরপর আছে মুন্ডেশ্বরী। জানি না ওখানে আবার কী অবস্থা। আতঙ্কিত নাতাশার কথায় হাসতে হাসতে বলে ওঠে নাসিম।
ওরে বাব্বা, আরো একটা নদী পার হতে হবে এভাবে! আচ্ছা, তুমি তাহলে ছোটবেলায় একা একা নানীর বাড়ি যাতায়াত করতে কিভাবে?
আরে তখন তো সারা বছর দুটো নদীতে পানি থাকত বলে নৌকো চলত। এখনকার মতো চরা পড়েনি।
আচ্ছা, একটা কথা ভাব তো; গ্রামের মানুষগুলো কি মানুষ নয়? অ্যাত কষ্ট করে তারা এই নড়বড়ে বাঁশের মাচানের ওপর দিয়ে, প্রাণ হাতে নিয়ে যাতায়াত করতে পারে? তাহলে চৌত্রিশ বছর ধরে দরদি সরকার করলেটা কী! একটা পাকা ব্রিজ এখানে তৈরি করে দিতে পারল না? শহরের সভা-সমিতিতে শুধু বড়-বড় বুক্নি! যত্তসব!
কথাগুলো বলতে বলতেই মাচান পেরিয়ে ঢাল বেয়ে পারে ওঠে নাসিম, নাতাশা। দামোদরের এই পার লাগোয়া খুশিগঞ্জের হাট। হাটের মাঝখান দিয়ে সাপের মতো আঁকাবাঁকা রাস্তার দু’পাশে তেলেভাজা, কাঠিভাজা, গুড়ছোলা, কাপড়, মিষ্টি, মুদির দোকান ছাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে ওরা। এমন সময় নাতাসা নাসিমকে বললে-হ্যাঁগো এখান থেকে কিছু মিষ্টি কিনে নিলে হতো না?
কি যে বলো নাতা, যেখানে একজন মানুষের জীবন নিয়ে টানাটানি, সেখানে এসব ফর্মালিটির কোনো মানে হয়! তা হয় না ঠিকই, তবু কতদিন বাদে আমরা যাচ্ছি। নানীর জন্য না হয় নিলেই না, মামাদের ছেলেমেয়েগুলো তো রয়েছে?
ঠিক আছে নাও, বলে একটা একশ টাকার নোট নাতাশার দিকে বাড়িয়ে দেয় নাসিম।
খুশিগঞ্জের পরেই সাপুর। সাপুরের পর মাঠশিয়ালি। মাঠ-শিয়ালির মাঠ পেরোলেই মুণ্ডেশ্বরী। বিশাল চওড়া নদী। আগে বর্ষাকালে ভরা মুন্ডেশ্বরীকে দেখলে ভয়ে বুক শুকিয়ে যেত। একবার খেয়া পারাপার করতে সময় লাগত প্রায় একঘণ্টা। এই মুন্ডেশ্বরীর পাড়ে ছিল ঘন বৈঁচি- সেকুলের বন। প্রকৃতির বাগিচায় আপনা থেকে বেড়ে ওঠা আগাছা বলা যায় এদের। বালকবেলায় মায়ের সঙ্গে মামার বাড়ি যাতায়াতের সময় কাঁটার ভয়কে তুচ্ছ করে থোকা-থোকা বৈঁচি-সেকুল তুলে ওর পিছু পিছু খানিকটা দৌড়ে গিয়ে দড়িতে পা-দিয়ে চেপে ধরতেই আছড়ে পড়েছিল মাটিতে। আর তাতেই ডান হাতের কব্জিটা ভেঙে গিয়েছিল মায়ের। তবুও গাইটার মায়া ছাড়তে পারেনি। আসলে গেরস্ত ঘরে একটা দুধেল গরু থাকা যে কত জরুরি তা ভালো করেই জানে মা।
শিবতলা থেকে পুবদিকে খানিকটা হাঁটলেই সেখপাড়া। পাড়ায় ঢোকার মুখেই ওদের বাড়ি। জরিনা, সেরিনা, সাহিলা আর আব্বা কেরামতের ঘেরাটোপের মধ্যে দিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে-হাঁটতে মায়ের কথা ভাবছে নাসিম।
বাড়ির সদর দরজার কাছে পৌঁছেই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে নাসিম, এখান থেকে গরুর চালা স্পষ্ট দেখতে পায় ও। দেখে দুধেল গাইটগা ডাবায় মুখ ডুবিয়ে জাব খাচ্ছে। কইলে বাছুরটা মায়ের পুষ্টলো মোড়ে মুখ ঢুকিয়ে দুধ খাচ্ছে আরামসে। ওরা যদি এখনো চালায়, তাহলে মা কোথায়? মায়ের কি তবে শরীর খারাপ? সে হলে তো ওরা এতক্ষণ বলেই দিত। অবশ্য এখন পর্যন্ত ওদেরকে মায়ের কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি। নাতাসাও জিজ্ঞেস করেনি। যদিও মায়ের মেজর শরীর খারাপ বলতে ছিল বুকের ব্যথা। বাত থেকে হতো। ডাক্তার দেখিয়ে বছর খানেক হলো ভালো হয়ে গেছে। এছাড়া ছোটখাটো জ্বরজ্বালা মাকে কোনোদিন কাবু করতে পেরেছে বলেও তো শুনিনি। তাহলে কারণটা কী? কথাগুলো ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা-ফাঁকা মনে হলো নাসিমের।
নাতাশা, ট্যুইংকল, বিউটিকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢোকে জরিনা, সেরিনা, আব্বা। বড় ভিআইপিটা নিয়ে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিল সাহিলা। কোনো রকমে হাঁপাতে হাঁপাতে ভিআইপিটা চাগিয়ে দরজা পেরিয়ে ভেতরে যাবে এমন সময় ওকে জিজ্ঞেস করে নাসিম।
হ্যাঁরে মাকে দেখছি না কেন, কোথায়?
মা মায়ের বাড়ি।
মানে?
মানে মা নানীদের ওখানে গেছে।
আমরা আসবো জেনেও মা- গেলো?
নানীর অবস্থা ভালো নয় তাই গেছে।
কী হয়েছে নানীর?
মারাত্মক অসুখ, আজ মরে কি কাল মরে। তিন দিন শুধু পানি খেয়েই আছে। বোধ হয় তোমার হাতের পানির জন্যই দমটা ফুরোয়নি নানীর।
বলিস কিরে, তাহলে তো আজই যেতে হয় নানীকে দেখতে!
দাদা, আজ তুমি কেমন করে যাবে। দুদিনের ট্রেনের ধকল তো আর কম নয়। তার চেয়ে আজকের দিনটা জিরিয়ে নিয়ে কাল সকাল সকাল চলে যেও ভাবীকে নিয়ে।
মুমূর্ষু নানীর জন্য নাসিমের বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। ভাবে, আহা এসময়ে আত্মীয় পরিজনদের একবার চোখের দেখা দেখবার জন্য কত না আকুলি-বিকুলি নানীর! জানি না শেষ দেখাটা হবে কি না! বছর দশেক আগে এন্তেকালের আগ মুহূর্তে পর্যন্ত নানাও কতো না ছটফট করেছিল একবার দেখার জন্য। বেঘোর অবস্থায় বারেবারেই ওর নাম করে বলেছে-‘কইরে আমার নাসা এলি, আয় ভাই কাছে আয়’ বলতে বলতে হাত দু’খানা বাড়িয়ে দিত নানা। সুতরাং রাতটা যাহোক করে কাটলেই খুব সকালে বেরিয়ে পড়তে হবে। নইলে ওদিকে যদি নানীর সময় ফুরিয়ে যায়!
সদর দরজার বাইরের মুহূর্ত খানেক দাঁড়িয়ে নানীর জন্য কথাগুলি ভেবেই নাসিম বাড়ির ভেতরে যায়।
২.
পরের দিন সকালে চা-পানি খেয়ে নানীর বাড়ি যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিল নাসিম, নাতাশা। হঠাৎ নাসিমকে জিজ্ঞেস করে নাতাশা-হ্যাঁগো নানীকে দেখতে তো যাবো, কিন্তু কিভাবে যাওয়া যাবে ভেবেছ একবার। রাস্তাতো কম নয়, প্রায় চার মাইল।
সেটাই তো ভাবছি, এক তো অতটা রাস্তা তার ওপর দু-দুটো নদী পেরোতে হবে। হেঁটে কি যাওয়া যাবে? জুতোর ফিতেয় ফাঁস দিতে-দিতে বলে নাসিম।
আমি তো পারবো না। তা ছাড়া তুমিও কি আর পারবে? শুনেছি ছোটবেলায় তুমি নাকি হুঁ করতেই চলে যেতে নানীর বাড়ি। এখন নিশ্চয় সেই এনার্জি আর তোমার নেই। শাড়ির ভাঁজ ঠিক করতে করতে বললে নাতাশা।
দেখ, ওসব ভাবার এখন সময় নয়। যেতে যখন হবে তো হবেই। হেঁটে যদি সম্ভব না হয় তো সাইকেলে যেতে হবে।
কী-ই সাইকেলে! অতটা রাস্তা টানতে পারবে আমায়। পারবো না মানে? হোল লাইফ যখন টানার দায়িত্ব নিয়েছি ঘাড়ে, তখন ওই সামান্যটুকু রাস্তা টানতে পারবো না? কী যে বলো নাতা? সাইকেলে নিয়ে বিস্মিত নাতাসার কথায় নাসিম রসিকতা করে কথাগুলো বললে নাতাশা আবার হাল্কা ছুঁড়ে দেয়। দেখা যাক্ কেমন পারো? আমার তো করার কিছু নাই, পড়েছি মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে। তবে সাইকেলের পেছনে বসে যেতে দেখে পাড়ার লোকে হাসাহাসি করলে আমি জানি না!
এবার নাসিম মৃদু ক্ষোভ প্রকাশ করে বললে-দেখ নাতা তোমায় দেখে কেউ হাসবেই না তো জানাজানির কি আছে। তা ছাড়া এটা শহর নয় গ্রাম, এখানে বউ-ঝি সবাই সাইকেলের পেছনে বসে দূর-দূরান্তে যায়। বুঝেছো?
সাইকেল চালানোর পুরনো অভ্যেসটা এখনো যায়নি নাসিমের। আগের মতো ধান-চাল, আলু বোঝাই করে নিয়ে যাওয়ার অভ্যেসটা না থাকলেও ট্যুইংকেল বিউটিকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া এবং নিয়ে আসা তো আছেই। সেইসঙ্গে ডেইলি বাজার-ঘাটও। সুতরাং নাতাসার বাল্কি চেহারাটাকে কোনো রকমে নানীর ঘর পর্যন্ত একটু কষ্ট করে হলেও সাইকেলে নিয়ে যেতে পারবে।
পাড়া থেকে বেরিয়ে মোরাম বিছানো মাইল দুয়েক পরেই গ্রাম চৈতন্যবাটি। চৈতন্যবাটি পৌঁছেই নাসিমের মনে হলো- কেন যে গ্রামটার এই নাম! চৈতন্যদেবের স্মৃতিবিজড়িত কোনো মঠ বা মন্দির এখানে নেই। এমনকি এখানকার মানুষরা যে কেবল শ্রীচৈতন্যের উপাসক, তাও না। যারা আছে তাদের অধিকাংশই তো জেলে, পুকুর-নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে জীবিকা অর্জন করে। দামোদরের বিশাল চরকে ঘিরেই গড়ে ওঠা গ্রাম। কোনো কোনো বছর বর্ষায় দামোদরের পানিতে তলিয়ে যায় গ্রামটা। তবুও গ্রামটার নাম চৈতন্যবাটি কী করে যে হলো…? এটা না হয়ে গ্রামটার নাম বন্দিপুর, ধাপধাড়া- গোবিন্দপুরও হতে পারতো!
বিস্তীর্ণ বাঁশবাগানে ঘেরা চৈতন্যবাটি থেকে বেরিয়েই ধূ-ধূ বালির দামোদর। বালুচরেই বেশ খানিকটা জায়গা জুড়েই ফুটবল মাঠ। মাঠের বুক চিরে চিককাটা হাঁটাপথে খানিকটা এগিয়েই দামোদরের সোঁতা। সোঁতাটা পার হয়েও ওপারে যাবার জন্য নৌকার কোনো বালাই নাই। একটা ফুট তিনেক চওড়া, লম্বা বাঁশের মাচান সোঁতার এ মাথা থেকে ও মাথা বিছানো। দুদিকে ধরার জন্য খুঁটিতে বাঁধা লম্বা বাঁশের হাতল।
নাসিম সাইকেলটা ঠেলে নিয়ে ভয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মাচানের ওপর দিয়ে। নাতাশা বাঁশের হাতলে ভর দিয়ে পা-পা হাঁটছে ওর পিছন-পিছন। এমন সময় ওর গা ঘেঁষে কয়েকটা সাইকেল ঝন্ঝন্ শব্দ তুলে দিব্যি চলে গেল। একটা মোটরসাইকেলও ভট্ভট্ করে সমস্ত মাচান কাঁপিয়ে চলে গেল ঝড়ের বেগে। হাঁটা থামিয়ে ভয়ে শিক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে নাতাশা। ভাবছে এখুনি বুঝি মাচানটা ওকে নিয়ে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে পানিতে।
বাব্বা, এমন হবে জানলে কি আর আসতুম! এতো দেখছি নানাকে দেখতে বেরিয়ে শেষে নিজের জানই কবজ হবার যোগাড়! বলে ওঠে নাতাশা।
আর এতো গেল দামোদর, এরপর আছে মুন্ডেশ্বরী। জানি না ওখানে আবার কী অবস্থা। আতঙ্কিত নাতাশার কথায় হাসতে-হাসতে বলে ওঠে নাসিম।
ওরে বাব্বা, আরো একটা নদী পার হতে হবে এভাবে! আচ্ছা, তুমি তাহলে ছোটবেলায় একা একা নানীর বাড়ি যাতায়াত করতে কিভাবে?
আরে তখন তো সারা বছর দুটো নদীতে পানি থাকত বলে নৌকো চলত। এখনকার মতো চরা পড়েনি।
আচ্ছা, একটা কথা ভাব তো; গ্রামের মানুষগুলো কি মানুষ নয়? অ্যাত কষ্ট করে তারা এই নড়বড়ে বাঁশের মাচানেপর ওপর দিয়ে, প্রাণ হাতে নিয়ে যাতায়াত করতে পারে? তাহলে চৌত্রিশ বছর ধরে দরদি সরকার করলেটা কী! একটা পাকা ব্রিজ এখানে তৈরি করে দিতে পারল না? শহরের সভা-সমিতিতে শুধু বড়-বড় বুক্নি! যত্তসব!
কথাগুলো বলতে বলতেই মাচান পেরিয়ে ঢাল বেয়ে পারে ওঠে নাসিম, নাতাসা। দামোদরের এই পার লাগোয়া খুশিগঞ্জের হাট। হাটের মাঝখান দিয়ে সাপের মতো আঁকাবাঁকা রাস্তার দুপাশে তেলেভাজা, কাঠিভাজা, গুড়চোলা, কাপড়, মিষ্টি, মুদির দোকান ছাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে ওরা। এমন সময় নাতাসা নাসিমকে বললে- হ্যাঁগো এখান থেকে কিছু মিষ্টি কিনে নিলে হতো না।?
কী যে বলো নাতা, যেখানে একজন মানুষের জীবন নিয়ে টানাটানি, সেখানে এসব ফর্মালিটির কোনো মানে হয়!
তা হয় না ঠিকই, তবু কতদিন বাদে আমরা যাচ্ছি। নানীর জন্যে না হয় নিলেই না, মামাদের ছেলেমেয়েগুলো তো রয়েছে?
ঠিক আছে নাও, বলে একটা একশ টাকার নোট নাতাশার দিকে বাড়িয়ে দেয় নাসিম।
খুশিগঞ্জের পরেই সাপুর। সাপুরের পর মাঠশিয়ালি। মাঠ-শিয়ালির মাঠ পেরোলেই মুণ্ডেশ্বরী। বিশাল চওড়া নদী। আগে বর্ষাকালে ভরা মুন্ডেশ্বরীকে দেখলে ভয়ে বুক শুকিয়ে যেত। একবার খেয়া পারাপার করতে সময় লাগত প্রায় একঘণ্টা। এই মুন্ডেশ্বরীর পারে ছিল ঘন বৈঁচি-সেকুলের বন। প্রকৃতির বাগিচায় আপনা থেকে বেড়ে ওঠা আগাছা বলা যায় এদের। বালকবেলায় মায়ের সঙ্গে মামার বাড়ি যাতায়াতের সময় কাঁটার ভয়কে তুচ্ছ করে থোকা-থোকা বৈঁচি-সেকুল তুলে খেতে খুউব ভালো লাগত নাসিমের। ও দেখতো, মাও বালিকার মতো ওগুলো তুলে কোঁচড়ে রাখছে। তখন ওর মনে হত, মা যেন নদীর পাড়ে বৈঁচি বনের বৈঁচি বালিকা।
হায়, নদীর পারের সেই বৈঁচি-সেকুলের চিহ্নমাত্র নেই। ভাঙনের মুখে সবই চলে গেছে মুন্ডেশ্বরীর বুকে! সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে পাড়ে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত ভাবছে নাসিম। সম্বিত ফেরে নাতাসার ডাকে।
হ্যাঁ গো, এখানে দাঁড়িয়ে ভাবছোটা কী, তাড়াতাড়ি চলো।
নাতাশার কথায় নাসিম ঘাড় তুলেই দেখে আজও পারাপারের ঘাটটা হদিলপুর। নদীর পার বরাবর চিক্কাটা রাস্তা ধরে খানিকটা সাইকেল চালিয়ে গিয়েই ঢালুপথে নেমে যায় নদীতে। নেমেই বালির ওপর দিয়ে আরো কিছুটা হেঁটে ওরা পৌঁছায় পানির কাছাকাছি, যেখানে নৌকা বাঁধা রয়েছে।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই নৌকোয় ওপারে পৌঁছায় ওরা। নৌকা থেকে নেমে সাইকেল নিয়ে পারে উঠতেই একজন পয়সা চায় নাসিমের কাছে। মরহুম নানার নাম বলতেই আর পয়সা নেই না। তখনি নাসিম বুঝাতে পারে বার্ষিক চাঁদার রেওয়াজটা তাহলে আজও চালু আছে। যার ফলে সম্বৎসর আত্মীয়-পরিজনরা যাতায়াত করতে পারে পারানি ছাড়াই।
হদিলপুরের ঘাট থেকে নদীর পার লাগোয়া বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা গ্রাম কোটশিমুল। গাছ-গাছালিতে পূর্ণ। যেন ছায়া সুনিবিড় শাস্তির নীড়ে ভরা নানীর বাড়ির ছোট্ট গ্রাম কোটশিমূল। যার একেবারে দক্ষিণে মুসলমান পাড়া। পাড়ার ঢোকার মুখেই ষোলো আনার কবরস্থান। কবরস্থানের পাশের রাস্তা দিয়ে কিছুটা গিয়েই সেখ কাসেম ওরফে মরহুম নানার বাড়ি।
নাসিম নাতাশাকে নিয়ে নানার বাড়ি পৌঁছেই সাইকেলটা পাঁচিলের গায়ে হেলান দিয়ে পা পা করে বাকুলে ঢোকে। পেছনে অনভ্যস্ত ঘোমটা মাথায় নাতাশা। পা কয়েক গিয়েই নাসিম দেখতে পায় ছিটে বেড়ার ঘরের দাওয়ায় লম্বা হয়ে শুয়ে রয়েছে নানী। নানীকে ঘিরে মা, মেজখালা, ছোটখালা, আর পাড়ার বৌঝিদের ভিড়। একটু দূরেই কোরআন পড়ছে ইমাম।
অনেক বছর বাদে নাসিমের এখানে আসা। নানা বেঁচে থাকতে শেষ এসেছিল ও। নানার ইন্তেকালের পর এত পরিবর্তন। বড় ঘরের জায়গায় কিনা মুমূর্ষু নানীর ঠাঁই এই ছিটেবেড়া ঘরের দাওয়ায়।
ওদের পা-পা আসতে দেখে প্রথমে মা নুহুরাই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
মৃত্যু পথিক নানীর অসহনীয় কষ্টটাই যেন মায়ের কান্না হয়ে ঝরে পড়ছে মনে হল নাসিমের।
বড় মামি একগ্লাস ঠাণ্ডা পানি এনে পরম ¯েœহে ওদের ঘর্মাক্ত চোখে-মুখে দিয়ে আঁচল দিয়ে মুছে দিলে। এর আগে নাসিম যখনই এসেছে, তখনই অনাবিল আদরে নানী ওর চোখে মুখে পানি দিয়ে মুছে দিয়েছে আঁচলের খোঁটে। মুছিয়ে দিতে-দিতে দু’গালে দুটো চুমো খেয়ে জিজ্ঞেস করেছে ভালো মন্দ কথা।
এই মুহূর্তে বড় মামি নানীর ভূমিকা নিলেও কোথাও একটা ফাঁক থেকে গেছে বলে মনে হলো নাসিমের। কিন্তু কী সেই ফাঁক? হঠাৎ একটা ফাঁক থেকে গেছে বলে মনে হল নাসিমের। কিন্তু কী সেই ফাঁক? হঠাৎ একটা ঝাঁঝালো গন্ধ যে কোথা থেকে উড়ে এসে মাতাল করে দিলে ওকে। গন্ধটা যেন ঠিক নানীর আঁচলে বাঁধা দোক্তার মৌতাতের মতোই। চুমু খাবার সময় নানীর মুখের পান-দোক্তার মৌতাতের উগ্র গন্ধটা ভালো না লাগলেও কখনো নিজের গাল সরিয়ে নিতে পারেনি নাসিম। এবার নানীর মুখের সেই ঝাঁঝালো গন্ধের সুরভির জন্য উন্মনা হয়ে উঠল ওর মন।
নানী এখন হা-মুখে শুয়ে রয়েছে, তবু ওই গন্ধের লেশমাত্র নেই। দু-চোখ বন্ধ। যেন শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া হাত-পাগুলো লাঠির মতো সরল, সোজা। কেবল পেটের কাছে ওঠা নামা করা কাপড় জানান দিচ্ছে প্রাণ আছে বলে। হা-মুখ থেকে বেরিয়ে আসা একটা ঘড়ঘড় শব্দ অনবরত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে নৈঃশব্দের ভারি বাতাসে। মাঝে মাঝে এক চামচ করে মিছরি ভেজা পানি কেউ কেউ আলতো করে ঢেলে দিচ্ছে নানীর হা-মুখে। জিভ বেয়ে পানি গলায় পৌঁছানো মাত্র ঢক্ করে গিলে ফেলেছে নানী।
শুধু পানি খেয়ে টানা পাঁচ দিন ওইভাবে শুয়ে থাকলেও নানীর মুখটা এখনো বেশ উজ্জ্বল বলে মনে হলো নাসিমের। জীবনের ছন্দ যেন এখনো ছড়িয়ে রয়েছে মুখমন্ডলে। মুত্যুর আগে বুঝি সব মানুষকে এমনই দেখতে লাগে! দাদিরও মৃত্যুযন্ত্রণায় পাগল হওয়া ভাবটা কদিন আগেই একেবারে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। ঠিক যেন শান্ত সরোবর। মনেই হয়নি দাদি চারদিনের মধ্যে ইন্তেকাল করবে বলে।
নানীর মুখের পানে অপলকে চেয়ে থাকতে থাকতে নাসিমের যেন মনে হলো, ডাক্তার এনে সেলাইন দিলে বোধহয় নানী আবার সুস্থ হয়ে উঠবে। ওর মনের কথাটা বাইরে প্রকাশ করা মাত্রই নানীর মাথার কাছে বসা এক মহিলা ওদিকে বাধা দিয়ে বলে ওঠে,- না বাবা না, উৎসবের আর কোনো দরকার নাই, চাচি আমার মরণে বসেছে। তার চাইতে খুদার কাছে মুনাজোত করো চাচিকে যেন তাড়াতাড়ি তুলে নেয়। চাচির কষ্ট যে আর আমরা সইতে পারছিনে বাপ।
আশ্চর্য, সবাই যেখানে চায় মুমূর্ষু মানুষ যতক্ষণ বেঁচে থাকে ততক্ষণই ভালো। সেখানে এই মহিলা বলে কী! তাহলে কি সত্যিই নানীর আর বেঁচে থাকার দরকার নেই? দিনের পর দিন এভাবে নানীর পড়ে থাকার জন্য অন্যদের খুব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে?
নানীর মাথার কাছে বসা মহিলার কথায় নাসিম বেশ বিচলিত। হঠাৎ সম্বিত ফেরে মা নুহূরার ডাকে। বাবা নাসা, এবার নানীর মুখে এক চামুচ পানি দাও।
নাসিম এক চামচ মিছরি-পানি নানীর হা-মুখে আলতো করে ঢেলে দিবে, এমন সময় পাশে দাঁড়ানোর অন্য একজন মহিলা খিল খিল হেসে বললে- ‘ওলো, বুড়ি বোধহয় এই লাতির হাতের পানির জন্যেই এখনো বেঁচে রয়েছে।’
কথাগুলো কানে পৌঁছতেই নানীর হা-মুখের দিকে এগিয়ে যাওয়া নাসিমের ডান হাতটা কেঁপে ওঠে। আর ভাবে সত্যিই যদি ওর হাতের পানি খেয়ে নানী ইন্তেকাল করে; তাহলে? তার চেয়ে-
পানির চামচটা হাতে নিয়ে এক মুহূর্ত ভাবছে নাসিম। মা নুহূরা ফের বললে- কি ভাবছো তুমি, পানিটা ঢেলে দাও।
মা, মৃত্যুশয্যায় শায়িত তার মায়ের মুখে পানি দিতে বলছে। অথচ পানিটা খেয়েই যদি নানীর দমটা ফুরিয়ে যায়, তখন? আরে ধুর, কী আবোল তাবোল ভাবছি! মৃত্যু কী মানুষের হাতে, সে তো ওপরওয়ালার! যখন হবার তা হবে। তাই মায়ের কথামতো নানীর মুখে পানিটা ঢেলে দেয়াই ভালো।
মনে মনে কথাগুলো আওড়েই নাসিম চামচের মিছরি-পানি ঢেলে দেয় নানীর মুখে। ঢক্ করে পানিটা গিলতেই মা নানীর মুখের কাছে মুখ নিচু করে বললে- ‘মা, ওমা, একবার চোখ চেয়ে দেখতো কে এসেছে। তোমার নাতি নাশা এসেছে, নাতবউ এসেছে।’
মায়ের ডাকে এক লহমায় নানীর চোখ দুটো খুলে আবার বন্ধ হয়ে যায় আপনা-আপনি সঙ্গে সঙ্গে ক-ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল দু’গাল বেয়ে। অমনি মা/ নুহূরা ছোট্ট শিশুর কান্নাভেজা চোখ মুছিয়ে দেয়ার মতোই আঁচলের খোঁটে নানীর গাল দুটো মুছে দিলে সযতেœ।
মাঝে মাঝে নানীকে ঘিরে থাকা লোকজনের মধ্যে দু-একটা টুকরো কথার আলাপন ছাড়া একটা নিগূঢ় স্তব্ধতায় যেন ছেয়ে আছে সারা বাড়ি। সেই সঙ্গে নানীর বুকের হাপোরের ধুক্ধুক্ আর শ্বাস-প্রশ্বাস ছাড়া-নেয়ার পেটের কাপড়ের ওঠা-নামার স্পন্দনে নিবিষ্ট সবার দৃষ্টি। একট পরপর নানীর বুকের ভেতরের মৃত্যু-যন্ত্রণা কণ্ঠনালী বেয়ে ঘড়ঘড় শব্দে বেরিয়ে এসে যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বাতাসে।
অন্য সবার মতো সংজ্ঞাহীন নানীর হা-মুখের পানে থ হয়ে চেয়ে আছে নাসিম, নাতাসা। নানীর দিকে আফলকে চেয়ে থাকতে থাকতে নাসিমের মনে পড়ে বালকবেলায় মামার বাড়ির টুকরো টুকরো স্মৃতি। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় একবার বেড়াতে এসেছিলেন এখানে। তখন ছিল শীতকাল। এই শীতকালে মামার বাড়ির মজাই ছিল আলাদা। জমি থেকে তরতাজা মুলো তুলে এনে চুলোসালে নানীর ভাজা গরম-গরম মুড়ি দিয়ে খাবার স্বাদটা আজও লেগে আছে জিবে।
সেবার গরম গরম মুড়ি গামছার খোঁটে বাঁধা থলিতে দিয়ে গামছাটা ওর গলায় জড়িয়ে নানী বলেছিল- যা ভাই তুই জমি থেকে মুলো তুলে খেগে যা। অমনি ছোটখালা আমিলার সাথে দে ছুট জমিতে। খালা হলেও ওদের দুজনের মধ্যে বয়সের তেমন ফারাক ছিল না। জমি থেকে তরতাজা মুলো তুলে এনে দুজনে মুড়ি খেতে খেতে খেয়ালই ছিল না দক্ষিণমাঠে লাঙল চষতে যাওয়া নানার জন্য পানিখাবার নিয়ে যেতে হবে বলে। সকাল থেকে গোরুর পেছন-পেছন ঘুরে হেট হেট করে লাঙল করতে করতে চন্চনে খিদে পেয়েছিল নানার। তাই দুপুরে মাঠ থেকে ঘরে ফিরেই অগ্নিশর্মা নানা পাচনবাড়ি নিয়ে তেড়ে যায় খালার দিকে। জানের ভয়ে খালা ছুটে পালায় বাইরে। আর সামনে পড়ে যায় ও। ব্যস, অমনি পাচনবাড়ি নিয়ে নানা মারতে উদ্যত হয় ওকে। তখন চুলোসাল থেকে রণমূর্তি নানাকে দেখেই নানী রে রে করে ছুটে এসে দুহাতে ওকে আগলে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে ওঠে- ‘অ্যাই ওলাউটো করা ছেলে পাবে যে মারবে, ইটা যে নহুরার বেটা, খিয়াল আচে?’ নানীর ঝাঁঝালো কথায় নিমেষেই পানি হয়ে গিয়েছিল নানার চন্ডাল রাগ। নানীর মাথার কাছে বসে বালকবেলার স্মৃতি রোমস্থনের সুরটা কেটে যায় হঠাৎ বড়গ মামির ডাকে। ‘চল্ বাবা হাত-পা ধুয়ে তুরা একটু ভাত খেয়ে লিবি। কুন সকালে তুরা ঘর থেকে বেরিয়েছিস্ তার ঠিক লাই।’
টিন ছাওড়া বড় ঘরের দাওয়ায় বসে ভাত খাচ্ছে নাসিম, নাতাশা। সামনা-সামনি বসে বড় মামা টুকটাক কথা বলছে ওদের সাথে। এমন সময় মা নুহুরার একটা বুকফাটা কান্নার রোল আছড়ে পড়ল নাসিমের কানে। ‘ওরে বাবা নাসা তুই কুতায় গেলিরে। তোর নানী যে আর নাইরে বাপ্। তোর হাতের পানি খেয়েই যে আমার মা চলে গেলরে…।
অমনি খাওয়া ফেলে নানীর কাছে ছুটে গেল নাসিম, নাতাসা। সঙ্গে বড় মামা, বড় মামীও। কান্নার আওয়াজে আশপাশের বাড়ি থেকে দলে-দলে বেরিয়ে এল বউ-ঝিরা। মুহূর্তেই নানীকে ঘিরে একটা সমবেত কান্নার ধ্বনি-ভারি করে তোলে সারা পাড়া।
একটু আগে যে মহিলা নাসিমকে ঠাট্টা করে বলছিল- ‘বুড়ি বুধায় লাতির পানির জন্যে বেঁচে রয়েচে।’ সেই মহিলাও নানীর লাশের পাশে বসে আকুলি-বিকুলি করছে।
শোকার্ত মহিলার পানে চেয়ে নাসিমের নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হল। ভাবে সত্যি সত্যিই নানী ওর হাতের পানি খেয়ে এন্তেকাল করল! অথচ এই আশংকাতেই প্রথমে ওর হাত কেঁপে উঠেছিল। শেষে মায়ের কথাতেই তো নানীর হামুখে এক চামচ মিছরি-পানি ঢেলে দিয়েছিল। সুতরাং ওর হাতের পানির সাথে নানীর এন্তেকালের কি কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে? না, পারে না। আসলে আল্লাহর মর্জিতেই নানীর দমটা ফুরিয়ে গেছে।
এদিকে নানী এন্তেকাল করামাত্র ছোটমামার ছেলে পটল মোবাইলে দুর-দূরান্তের আত্মীয়দের খবর পৌঁছে দিয়েছে। পাড়ার একজন গোতানের বাজারে গেছে কাফোন কিনতে। অন্য ক’জন পাশের বাঁশবাগান থেকে বাঁশ কেটে খাটিয়া তৈরি করছে।
নানীর পায়ের দিকে মাথায় হাত দিয়ে বসা বড় মামা শওকত, ছোট মামা-সহবতকে একজন বয়স্ক ব্যক্তি এসে বললে- এবার তোমরা এখান থেকে উঠে পড় বাবা, মেয়েরা লাশের লাওন-ধোয়ান করাবে তো। নাসিমকে উদ্দেশ্য করেও বললে- লাতি তুমিও উঠে পড়।
নানীর লাশের কাছ থেকে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে নাসিমের মনে হলো- মা নুহুরাকে কি ওইভাবে আর কাঁদতে দেওয়া ঠিক? এরপর কাঁদলে মা ফিট হয়ে যেতে পারে। কারণ গোরুর দড়ি জড়িয়ে পড়ে গিয়ে হাত ভাঙার পর থেকে মায়ের ফিটের অসুখটার সূত্রপাত। ডাক্তার বলে দিয়েছিল মা যদি কখনো মানসিক কষ্ট পায় তাহলে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। অতএব মাকে এখন নানীর কাছ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়াই উচিত।
কথাগুলো ভেবেই নারী-পুরুষে ঘেরা নানীর লাশের পাশে মা মুহুরাকে টেনে তুলবে বলে হাত দুটো বাড়িয়েও গুটিয়ে নেয় নাসিম। ওর ভেতরের নাসিম ওকে বাধা দিয়ে বলে ওঠে- নাহ্, মা যেমন কাঁদছে কাঁদুক, আর কোনোদিন তো মায়ের জন্যে প্রাণভরে কাঁদতে পারবে না। কাঁদতে না পেরে যদি মায়ের বুকের ভেতরে শব্দহীন কান্নাটা পাথর হয়ে যায়। তার চেয়ে…। অগত্যা দ্বিধাগ্রস্ত নাসিম নানীর নিথর দেহের কাছ থেকে উঠে বাইরে চলে যায়।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েক পা হেঁটেই ষোলোআনার কবরস্থান। এই কবরস্থান লাগোয়া ঘন বাঁশবাগান। নাসিম দেখতে পায় ক’জন লোক বাঁশবাগান থেকে বাঁশ কেটে নানীর খাটিয়া তৈরি করছে। এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে বন-বাদাড়ের ভেতরে দু’জন শক্ত-সামর্থ্য লোক কবর খোঁড়ায় ব্যস্ত। আরো দু’জন কম বয়সী ছেলে ধারালো হেঁসো দিয়ে ঝোপ-ঝাড় কেটে রাস্তা তৈরি করছে। যাতে চার কাঁধে নানীর লাশ কবর পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে সুবিধে না হয়।
বাইরে বেরিয়ে নাসিম যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখান থেকে বাাড়ির ভেতরটাও দেখা যাচ্ছে। নাসিম পেছন দিকে ঘাড় ঘোরাতেই দেখতে পায় ক’জন বয়স্কা মহিলা নানীর লাশকে গোসল করিয়ে দুধ-সাদা কাফোন পরাচ্ছে সযতেœ।
কিছুক্ষণের মধ্যে কাঁচা বাঁশ ফালা-ফালা করে, খড়ের দড়ি পাকিয়ে খাটিয়া বাঁধা শেষ হতেই লোক দুজন খাটিয়াটা এনে রাখে উঠোনে। সঙ্গে-সঙ্গে অন্য দুজন মাঝ বয়সী লোক ধবধবে কাফন ঢাকা নানীর লাশটা তুলে এনে ধীরে ধীরে শুইয়ে দিলে খাটিয়ায়। এরপর সামনে ছিনে দু’জন করে চারজন লোক ধরাধরি করে খাটিয়া কাঁধে তুলতেই নারী-পুরুষের কান্নার রোল আছড়ে পড়ল বাকুলে।
মা, খালা, মামা-মামি, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাইকে ছেড়ে দরূদ দোয়া শুনতে শুনতে চার কাঁধে চেপে নানী ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে বাকুল থেকে। নানীর চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকতে ক- ফোঁটা পানি নাসিমের দু-গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। সবার অলক্ষ্যে দু-হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে ও-ও পা-পা হাঁটতে লাগল খাটিয়ার পিছন পিছন।
কিছুদূর গিয়েই কবরস্থানের পুবদিকে ফাঁকা জমিতে নামানো হলো নানীর খাটিয়া এখানেই পড়া হবে জানাজা। খাটিয়ার পিছন-পিছন আসা শ-তিনেশ লোক মুহূর্তেই কাবামুখ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল কাতার করে। সবার সামনে ইমাম। ইমামের সামনে খাটিয়ার শোয়া কাফন ঢাকা নানীর লাশ।
নানীর কাফন ঢাকা লাশের দিকে অপলকে চেয়ে রয়েছে নাসিম। মাটিতে গোঁজা প্রজ্বলিত আগরবাতির সুগন্ধে মোঁ- মোঁ চরাচর। অস্তগামী সূর্যের মলিন আভা যেন নানীর জানাজায় শামিল হতে আসমান থেকে নেমে এসেছে নিচে। কবরস্থান লাগোয়া বাঁশবাগানে বাঁশের শাখায়-শাখায় বসা অগণিত পাখিরাও তাদের বৈকালিক কূজন ভুলে মৌন মুখর। একটু পরে জানাজা পড়া শেষ হলেই বেহেস্ত থেকে নেমে আসবে হুর-পরীর দল। যারা নানীকে হাত-ধরাধরি করে নিয়ে যাবে পুলশিরাতের গুলিস্তানে।
পাড়া-প্রতিবেশী সহ দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজনরা সবাই কাতার করে দাঁড়াতেই ইমাম বলে উঠলেন কারোর কাছে কোনো ধারদেনা বা গোনাহ থেকে যায়, তাহলে তা যেন মার্জনা করে দেয়া হয়।’ কথাগুলি বলেই ইমাম শুরু করলেন জানাজা।
কাতায় দাঁড়ানো কেউ কেউ মনে মনে, কেউ বা জোরে উচ্চারণ করতে লাগল জানাজার দোয়া-‘ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজ্জহিয়া লিল্লাজি ফাতারাচ্ছামা ওয়াতে ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আমা মিনাল মুশরিকিন। ’
জানাজার পর নানীকে চার কাঁধে আনা হলো কবরস্থানে, যেখানে খোঁড়া হয়েছে কবর। কবরের চারপাশ ঘিরে দাঁড়ানো কয়েকজন তন্ন-তন্ন করতে লাগল ভেতরটা। নাসিমও ঝুঁকে দেখতে লাগল। দ্যাখে কবরের নিচে তিন সারি কলাগাছ রাখা আছে আড়াআড়ি। যাতে কবর দিতে দিতে মাটির তলা থেকে চুঁইয়ে ওঠা পানিতে ভিজে না যায় নানীর কাফন। কবর থেকে হাত পাঁচেক দূরে রাখা নানীর খাটিয়া।
কবরের ভেতর থেকে চোখ সরিয়ে নানীর খাটিয়ার দিকে তাকাতেই নাসিম দেখতে পায় দুধ সাদা কাফনে ঢাকা লাশের মাথা ও পায়ের দিক শক্ত করে বাঁধা। এক মুহূর্ত কফিনটার দিয়ে চেয়ে থাকতে থাকতে নাসিমের হঠাৎ মনে হলো-এক্ষুনি বুঝি নানী কফিনের ভেতর থেকে মুখ বের করে হি-হি হেসে উঠবে। আর পান-দোক্তার কষলাগা কুচকুচে কালো ঝিঙেদানা দাঁতগুলো বের করে হাসতে হাসতে বলবে- কেমন ছেলিস ভাই নাসা, কেমুন আচে তোর বাপ-মা’। কথাগুলো বলতে বলতেই দু- গালে চট্-চট্ করে চুমু খাবে। অমনি নানীর মুখ থেকে চলকে উঠবে পান-দোক্তার ঝাঁঝালো গন্ধ।
সরো সরো লাশ নামাতে হবে গোরে।
সম্বিত ফেরে নাসিমের। দেখে তিনজন লোক নানীকে চাগিয়ে ধীরে ধীরে নামাচ্ছে কবরের ভেতর। দু’জন দু’দিকের শক্ত বাঁধন, অন্যজন কোমরের নিচে হাত দিয়ে আলতো করে ধরেছে। আরো দুজন কবরের ভেতরে দু-মাথায় দাঁড়িয়ে নানীকে আস্তে আস্তে শুইয়ে দিলো কলার ভেলায়।
নানীকে কবরের ভেতর শুইয়ে দিয়ে লোক দু’জন উপরে উঠে এলেই অন্য ক’জন খাটিয়ার বাঁশগুলো খুলে সারি সারি বিছিয়ে দিলো পরিপাটি করে। বাঁশ বিছানোর সাথে সাথে মাচানের ওপর বিছানো হলো খড়। যাতে বাঁশের ফাঁক গলে, একবিন্দু মাটিও না গড়িয়ে পড়ে নানীর ওপর।
নিচে নানী ওপরে মাচান। মাচানে পাতা খড়ের সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে এখনো দেখা যাচ্ছে নানীর ধবধবে কাফন।
পাশের পুকুর থেকে বয়ে আনা পানি ঢেলে কবরখোঁড়া মাটি ভিজিয়ে কাদা মাখাচ্ছে দু’জন। এই কাদা দিয়ে খড়ের ওপর লেপন দিলেই নানী চোখের আড়ালে চলে যাবে চিরতরে। আর দেখা যাবে না কোনোদিন।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই নাসিমের বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু-হু করে উঠল। সহসা মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থাকা নানীর প্রতিচ্ছবিটা যেন মূর্ত হয়ে উঠল ওর চোখের সামনে। দেখতে পেলো-মা নুহুরার মা-মা ডাকে নানী যেন তার কোটরাগত চোখ দুটো একবার মেলেই বন্ধ করে নিলে।
খড় বিছানো চাদরে কাদার লেপন শেষ হওয়া মাত্রই কজন কোদাল আর হাত দিয়ে মাটি টেনে ডাঁই করে দিলে কবরের ওপর। তারই ফাঁকে দূরে লাইন দিয়ে দাঁড়ানো কজন এগিয়ে এসে দোয়া পড়ে তিন মুঠো করে মাটি দিয়ে গেল কবরে। ওদের দেখাদেখি নাসিমও তিন মুঠো মাটি নানীর কবরে চেপে দিলে সযতেœ।
মাটি দিয়ে পিছন ঘুরে চলে যেতে যেতেই নাসিমের দুচোখ থেকে ক- ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল নানীর কবরে। এমন সময় ও যেন শুনতে পেল নানীর ডাক্- ‘ভাই নাশা, আমায় একলা রেখে চলে যাচ্ছিস্!
থমকে দাঁড়ায় নাসিম। ঘাড় ঘুরিয়ে নানীর কবরের দিকে অপলকে চেয়ে স্বগতোক্তি করে বলে ওঠে- ‘তুমি একলা কোথা নানী, আজ থেকে তো তোমার অনেক নতুন সঙ্গী-সাথী। ভোরের আজান, পাখিদের গান, বেহেস্তের যত ফেরেস্তা, হুর পরীর দল, সবাইকে নিয়ে তোমার আরেক দুনিয়া। আর জানো নানী, তুমি আমাদের থেকে দূরে চলে গেলে কী হবে? তোমাকে কিন্তু আমি রোজ সন্ধ্যাকাশে সন্ধ্যা তারার মধ্যে দেখতে পাবো। রাত বাড়ার সাথে সাথে সারা আকাশ যত তারার ফুলকিতে ভরে যাবে, ততই তুমি হেসে উঠবে খিলখিল করে। তখন খুব ভালো লাগবে।
হ্যাঁ রে, তুই এখানে দেঁড়িয়ে কী করছিস্ বাপ্, মাটি দিয়েছিস?
বড় মামা শওকতের কথায় চমকে ওঠে নাসিম। দ্যাখে মামার দু-হাতে চারটে খেজুর ডাল। সব শেষে এই ডালগুলোই কবরের চারকোণে পোঁতা হবে। এটাই নাকি চিরন্তন নিয়ম।
এক মুহূর্ত ভেবেই মামার প্রশ্নের জবাবে দীর্ঘশ্বাসভরা শুধু ‘হ্যাঁ’ বলেই নাসিম পা-পা এগিয়ে গেল সামনে।