বাংলা সাহিত্যে সৃজনশীল তারুণ্যের অনিবার্য নাম লিটল ম্যাগাজিন। তবে যাকে প্রকৃত অর্থে লিটল ম্যাগাজিন বলে, যা কিছুই প্রাতিষ্ঠানিক নয়, যা এক প্রতীকী ও প্রতিবাদী চিন্তা ও চেতনা থেকে জাগ্রত হয়। কালের পরিক্রমায় নতুন স্বাখরের চিন্তায় যা স্পষ্ট গভীর ও সাময়িক স্বল্পায়ু হলেও সজীব ও দীপ্র চেতনায় অগ্রগামী। তারুণ্যের দ্রোহের স্বাক্ষর লিটল ম্যাগাজিন তাই একটি আন্দোলনের নাম।
বাংলাভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে চট্টগ্রামের সুদীর্ঘকালীন সৃজনশীল চর্চার স্বীকৃত অবদান রয়েছে। চট্টগ্রামে বাংলাসাহিত্যের আন্দোলন ও বিকাশের সংগ্রামী ইতিহাসও কারও অজানা নয়। স্বাধীনতা-পূর্ববতী ও পরবর্তীতে সমাজ, জীবন প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে দিয়ে তৎকালীন চট্টগ্রামের সাহিত্যকর্মীদের মধ্যে তারুণ্যের চেতনার পাশাপাশি জেগে উঠে জীবন সত্য অনুসন্ধ্যানের পথ।
লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে ১৭৭১ সালে প্রকাশিত ‘জেন্টলম্যান ম্যাগাজিন’ নামের পত্রিকাটি হচ্ছে বিশ্বের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন, যার সম্পাদক ছিলেন অ্যার্ডওয়াড কেভ। ১৮৪০ সালে র্যাফল ওয়াল্ডো ইমারসন ও র্ম্গারেট ফুলার সম্পাদিত ‘দি ডায়াল’ পত্রিকাটিও প্রথম লিটল ম্যাগাজিনের পথপ্রদর্শক বলে স্বীকৃত। বাংলা ভাষায় ১৮১৮ সালে ক্লার্ক ম্যাকম্যানের ‘দিকদর্শন’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলাভাষায় লিটল্ ম্যাগাজিন চর্চার শুরু হলেও প্রকৃত অর্থে দ্রোহ ও সৃজনশীল মেধা চর্চার চরিত্র নিয়ে বাংলাভাষায় প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘সবুজপত্র’ প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯১৪ সালে, যার সম্পাদক ছিলেন প্রমথনাথ চৌধুরী এবং যাকে আমরা সবাই চিনি প্রমথ চৌধুরী নামে। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিলো ২৫ বৈশাখ, ২০ কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতা থেকে। প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিলো “দিজেন্দ্রলাল রায় বাঙালি জাতিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন‘ একটা নতুন কিছু কর’ সেই পরামর্শ অনুসারেই যে আমরা একখানি নতুন মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতে উদ্যত হয়েছি। এ কথা বললে সম্পূর্ণ সত্য কথা বলা হবে না। এ পৃথিবীটি যথেষ্ট পুরনো, সুতরাং তাকে নিয়ে নতুন কিছু করা বড়ই কঠিন, বিশেষত এ দেশে। যদি বহু চেষ্টায় নতুন কিছু করে তোলা যায়, তা হয় জলবায়ুর গুণে দুদিনেই পুরনো হয়ে যায়, নয় তো পুরাতন এসে তাকে গ্রাস করে। তৎকালে বারুদভর্তি করে দ্রোহের নিশান উড়িয়ে সাহিত্য নতুন অর্থে, ভাবনায় লিটল ম্যাগাজিন চর্চাকে নতুন পথ নির্দেশনার পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিন্তা ও মেধার অনুধাবনে মননশীল সৃষ্টিতে নতুন সৃষ্টিতে লিটল ম্যাগাজিন এগিয়ে গেছে। সবুজপত্র বিদ্রোহ করেছিলো প্রচলিত সাধু বাংলায় লেখার বিরুদ্ধে। সাধুরীতি গদ্য পরিহার করে কথ্য বাংলায় প্রকাশ করেছিলো তারা তাদের নতুন চিন্তার কথামালা। এরপর বাংলাসাহিত্যে একে একে কল্লোল (১৯২৩), কালি-কলম (১৯২৬), প্রগতি (১৯২৭), পরিচয় (১৯৩১), পূর্বাশা (১৯৩২), কবিতা (১৯৩৫) ও ১৯৪০ সালে নিরক্ত প্রকাশের মধ্য দিয়ে লিটল ম্যাগাজিন একটা চরিত্র নিয়ে প্রকাশিত হতে থাকে। দর্শনগত দিক থেকে এগুলো ছিলো রবীন্দ্র বলয় ভাঙা ইউরোপীয় আধুনিকতাকে আত্মস্থ করার পক্ষপাতী। ১৯৪৭ সালের পূর্বে বাংলাদেশে লিটল ম্যাাগাজিন চর্চার প্রচলন ছিলো না বললেই চলে। ১৯২৭ সালে বুদ্ধদেব বসু ও অজিত দত্তের ‘প্রগতি’ ও ১৯২৯ সালে সঞ্জয় ভট্টাচার্যের পূর্বাশা প্রকাশের মধ্যে দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ দেশভাগের পরবর্তীতে চট্টগ্রাম থেকেই একুশের কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিলো এক অবিস্মরণীয় সংকলন ‘সীমান্ত’। এই পত্রিকার প্রথম প্রকাশ কার্তিক ১৩৫৪, নভেম্বর ১৯৪৭, এই সীমান্ত পত্রিকাই সৃজনশীল ও সমসাময়িক প্রতিভাবান লেখকদের গুরুত্ব অনুভব করে তাদের সৃজনশীল সাহিত্যচর্চায় এগিয়ে আসে। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় শুভেচ্ছাবাণী দিয়েছিলেন মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ বাহার ও অন্নদাশংকর রায়। প্রথম দুই বছর পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক ছিলেন কথাসাহিত্যিক সুচরিত চৌধুরী। সেই সূত্র ধরে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এই পত্রিকার ভূমিকা ছিলো নব প্রগতিশীল লেখক ধারা সৃষ্টির নব প্রয়াস। এই পত্রিকার দর্শন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার সৃষ্টির একাগ্রতা ছিলো, ছিলো লেখকদের প্রত্যয়, তাইতো প্রগতিশীল সাময়িকপত্রের নতুন ধারা সৃষ্টি করে সীমান্ত বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ পত্রিকার মর্যাদা লাভ করেছে। তৎকালীন এই পত্রিকায় লেখক হিসাবে যারা লিখেছিলেনÑ আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, আশুতোষ চৌধুরী, সাহিত্যিক মাহবুবুল আলম, জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, কবি ওহীদুল আলম, মঈনুদ্দীন, জীবন কুমার চক্রবর্তী, সায়ফুল আলম, সুধাংশু সরকার, রেবতী মোহন চৌধুরী, একুশের কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী, সাহিত্যিক আবুল ফজল, শুভাশীষ চৌধুরী, প্রভাত কুমার সেন প্রমুখ। এই ‘সীমান্ত’ পত্রিকার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে লিটলম্যাগ চর্চার নতুন পথ সৃষ্টি হয়। এই সীমান্ত পত্রিকার মূল আদর্শিক চেতনা ছিলো অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির চর্চা, জাতীয় প্রগতি, সাহিত্যিকদের সৃষ্টির ক্ষমতার কল্যাণকর প্রয়োগ, সাহিত্যের ঐতিহ্যকে মূলধারায় নিয়ে যাওয়া ছাড়ও সৃষ্টিশীল সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহিত করাই ছিলো সীমান্তের মূল উদ্দেশ্য। এরই পথ ধরে পঞ্চাশ দশকে রুহুল আমিন নিজামীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় উদয়ন, মফিজ উল হকের সম্পাদনায় পরিচিতি, সাহিত্যিক সুচরিত চৌধুরী ও ওয়ালী আহমদের সম্পাদনায় বরেণ্য শিল্পী পুর্ণেন্দু পত্রীর প্রচ্ছদে ‘প্রাচী’র প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছিল উনিশ’শ সাতান্ন সালের মে মাসে। এটি প্রকাশিত হলে সাহিত্যকর্মীরা নতুন স্বাদের সাহিত্যের স্বাদ গ্রহণে নিবেদিত হয়। প্রাচীতে যারা লিখেছিলেন তারা হলেন- সৈয়দ মুজতবা আলী, অন্নদাশঙ্কর রায়, রাম বসু, পুর্ণেন্দু পত্রী, কবি আবদুস সালাম, কবিয়াল রমেশ শীল, ওয়ালী আহমেদ, সৈয়দা হাবীবুন্নেছা, সাগরময় ঘোষ, সুলতানা রহমান, শংকর দাশ গুপ্ত, রমাপদ চৌধুরী, পুর্ণেন্দু দস্তিদার, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, মোতাহের হোসেন চৌধুরী প্রমুখ।
৫০ দশকে ফজল শাহাবুদ্দীনের ‘কবিকণ্ঠ’ আর সিকান্দার আবু জাফরের ‘সমকাল’ (১৯৫৭), ফজলে লোহানীর ‘অগত্যা’ (১৯৫৭) প্রভৃতি লিটল ম্যাগাজিনের অভাব পুরণে অতি উঁচুমানের সাহিত্যপত্রিকা হলেও পাঠককে লিটল ম্যাগাজিনের স্বাদ গ্রহণে আলোড়িত করে তোলে। সেই পথ ধরে ১৯৬০ সালে লেখক-গবেষক, শামসুল আলম সাঈদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিলো তারপর, শফিউল আলমের সম্পাদনায় পূর্বপত্র এবং লেখিকা বেগম মুশতারী শফীর সম্পাদনায় ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয় বান্ধবী, আহমদ রফিক ও আবুল মোমেনের অচিরা, রশীদ আল ফারুকীর বিবিধ, মাহবুবুল হকের কলরোল, চৌধুরী জহুরল হকের সাত-সতেরো, সেকান্দর হায়াতের ঐতিহ্য, খায়রুল বশরের নবদিগন্ত, শফিউল আলমের পূর্বপত্র, মুহাম্মদ নুরুল হুদার কলতান, সিকান্দার হায়াতের মেঘনা প্রমুখ। কিন্তু কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ লিটল ম্যাগ আলাচনায় বলেছেন- ‘সাক্ষর’ই এদেশের প্রথম প্রকৃত লিটল ম্যাগাজিন। কিন্তু ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত ‘কণ্ঠস্বর’ ষাটের প্রধানণ্ঠস্বর হয়ে উঠে। নব সাহিত্যের সূত্রধর এ পত্রিকা প্রেম, দ্রোহ ও ঘৃণার রূপায়ণে প্রকাশ করেছিলো তার সম্পাদকীয়। যেমন- ‘যারা সাহিত্যের সনিষ্ট প্রেমিক, যারা শিল্পে উন্মোচিত, সৎ, অকপট, রক্তাক্ত, শব্দতাড়িত, যন্ত্রণাকাতর, যারা অসšুÍষ্ট, বিবরবাসী, যারা তরুণ, প্রতিভাবান, অপ্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধাশীল, অনুপ্রাণিত, যারা পঙ্গু, অহংকারী, যৌনতাপুষ্ট, কণ্ঠস্বর তাদের পত্রিকা। তার সব স্খলন-পতন-ত্রুটি নিয়েও ৬০ দশকের শ্রেষ্ঠ লিটল ম্যাগাজিন কন্ঠস্বর। তার প্রভাবে অন্যান্য বহু লিটল ম্যাগাজিন উদ্বোধিত, বিলোড়িত ও চরিতার্থ হয়েছিলো।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর স্মৃতিময় দুঃসহ স্মৃতি বুকে ধারণ করে পঞ্চাশ ও ষাট দশকের লিটল ম্যাগ চর্চার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত যেসব লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছিলো সে সব ম্যাগগুলোতে এ দেশের স্বাধিকার আন্দোলনের দুঃসময়ের নির্যাতন, হত্যা, মুক্তি, বিজয়ের চেতনার অঙ্গীকার প্রকাশিত হয়েছিলো। ১৯৭১-১৯৭৫ সাল নাগাদ যে সকল লিটল ম্যাগ চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছিলো তা হলো ১৯৭১ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি জাফর আহমদ হানাফি সম্পাদিত চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, আহমেদ খালেদ কায়সারের অর্ঘ্য, কাজল কান্তি বড়ুয়ার উত্তরমেঘ, ম আ আওয়ালের ‘পদাতিক, সুরেশ রঞ্জন বসাকের ‘জন্মদিন’, নাসির উদ্দিন চৌধুরীর ‘প্রতিভাস’, দিলারা আলমের ‘ফুলেল’, নিতাই সেনের অঙ্কুর’, সাথী দাশের ‘কবিতা’, শিশির দত্তের ‘সম্পাদক’, আসাদ মান্নানের ‘দর্পণ’, বিমল গুহের ‘বিন্দুমাত্র’। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমিতির উদ্যোগে প্রকাশিত হয় আগুন, উক্ত পত্রিকায় ড. অনিসুজ্জামান লিখেছিলেন ‘কোন ফাল্গুনে’ ও মোহাম্মদ আবু জাফরের বাংলার মুক্তি সংগ্রামে শীর্ষক দু’টি প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়েছিলো মাহবুবুল আলম চৌধুরীর কবিতা ‘শপথ’ ও দিলওয়ার হোসেনের কবিতা ‘এখন প্রত্যহ একুশে ফেব্রুয়ারি’। ১৯৭২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিলো নীর রহমানের অভিষেক, মিনতি, পদাতিক, আতাউল হাকিমের ‘এক নদী রক্ত’, বাংলা তোমাকে, প্রচ্ছদ, উচ্ছ্বাস, কৃষ্ণচূড়া, সবুজ ডানার ছায়া, আলোক, তির্যক, সংস্কৃতি, বাংলা সংসদ পত্রিকা, অপেক্ষা, টেলিমেকাস, তোলপাড়, টইটম্বুর, আলোকসম্পাত, ইলিক ঝিলিক, পালকি, নান্দনিক, একজন প্রমুখ। সত্তর দশকের উল্লেখযোগ্য পত্রিকা মোহাম্মদ রফিক ও আবুল মোমেন সম্পাদিত ‘অচিরা‘র (১৯৭৪/১০) সম্পাদকীয়তে উচ্চারণ করা হয়েছে তীব্র সাহসী কথামালা। যেমন, হৃদয় ও হৃদয়ী উচ্ছ্বাস ক্রমশ পিছু হটছে। পরিপার্শ্বে অমোঘ হয়ে উঠছে অস্তিত্বের বিকট প্রশ্ন, প্রত্যক্ষতর হয়ে উঠছে জঠর ও জান্তব আর্তি, মানুষের অস্তিত্ব ভয়াবহ প্রশ্নের চাপে কম্পমান; কেউ জানি না আগামী দিন, অবসর নেই তাকে গড়বার। এভাবে যে মানুষ ন্যূনতম মানুষে পরিণত হচ্ছে ক্রমে ক্রমে। ভোগের অভীপ্সাই টিকে থাকছে অবশেষে। গতায়ু সৃষ্টির প্রাণ ও বীজ। শুধু মানুষের বসতি বাড়ছে, আহারজীবী লিপ্সু প্রকৃতির। কবিতার ক্ষমতা কতটুকু আর, কবিতা আহার দিতে পারে না, রুগ্নকে বাঁচাতে অক্ষম, শরীরী প্রয়োজনেও অসাড়। কিন্তু দিতে পারে বোধ মানুষের হৃদয়ের চাবি। যে জোছনাময়ী চাঁদের মত সস্নেহ, সরিয়ে দিতে সক্ষম কুয়াশা নেকাব।”
১৯৮০ দশকের শুরুতেই লিটল ম্যাগাজিন চর্চায় এক দুঃসহ বেদনার মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। স্বাধীনতাত্তোর দেশ যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিল ঠিক সে সময়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো তাদের নিজস্ব মুখপত্রগুলোও আত্মপ্রকাশ করে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও তাদের মধ্য একটা নতুন চেতনা কাজ করেছে অনায়াসেই্। কেউ কেউ তাদের তাদের তারুণ্যে, একক ও গোষ্ঠীগত চেতনাকে প্রকাশ করতে সচেষ্ট ছিলেন। সাময়িকীগুলো প্রকাশের একাগ্রতায় যে সঙ্কট তাদের মধ্য কাজ করেছে বিজ্ঞাপন ও অর্থনৈতিক সঙ্কট তাকে কাটিয়ে সে সময় একটা প্রকাশনা সত্যিই সহজসাধ্য কাজ ছিলো না। তবুও আশার কথা যে তারুণ্যের দীপ্ত চেতনায় তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছে আশার প্রদীপ জ্বেলে।
একাত্তরের পরবর্তীতে প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের সমাজের সর্বক্ষেত্রে বিচরণ তাদের মুখে লিটল ম্যাাগাজিন নামে প্রতিষ্ঠান বিরোধীদের শ্লোগান লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান বিরোধী মানসিকতার মুখে আঘাত। তবুও আশির দশকের উত্তাল রাজনৈতিক প্রবাহের মধ্যেও ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে ছড়া আন্দোলন যখন জোরদার লাভ করে সে সময় ছড়া ও কবিতা বিষয়ক বেশ কয়টি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। যেমন- রাইমাস্টার, পরস্পরা, কমব্যাট, সানাই, পদাতিক, রাইমার্স, জলসিঁড়ি, দ্রৌপদী, ভাস্বর, অব্যয়, অচিরা, দেশকাল, পদক্ষেপ, নবজাতক, কথন, প্রেরণা, অনোমা, চর্চা প্রভৃতি লিটল ম্যাগাজিন চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতি, অঙ্গনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এই দশকের উল্লেখ করার মতোন পত্রিকা কবি ওহীদুল আলম সম্পাদিত ‘দেশকাল’। এর সম্পাদকীয়তে যে সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে যে ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করা হয়েছিলো তা বর্তমান সমাজব্যবস্থায় নিত্য প্রতীয়মান হয়। যেমন- ‘শাসকদের কাছে জনগণের শুধু একটাই দাবি সেটা হচ্ছে আইনের শাসন। জনসমাজ সরকার থেকে শুধু একটাই দাবি তুলে ধরেছে, দেশের আইন মোতাবেক যেন তারা যা পাওয়ার তা পেয়ে থাকে। দুঃখের বিষয় আইনের শাসন দেশে প্রচলিত হচ্ছে এ অবস্থা আমরা দেখিনি। দেশে আইন রাখার জন্য যে পুলিশ ফোর্স আছে, সে পুলিশও ধর্ষণ, ডাকাতি ইত্যকার অপরাধে অভিযুক্ত হতে দেখা যাচ্ছে।
১৯৮৩-২০০০ সাল নাগাদ চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ইদানীং, লিরিক, পালকি, সমন্বয়, চারকৃৎ, ছড়ায় ছড়ায় একুশ, বহ্নি, সমস্বর, তরঙ্গ, ময়ূখ, মেঘ বলে চৈত্রে যাবো, মূল্যায়ন, চর্যা, তিমির হননের গান, সজাগ, কবিতা সমকালীন, অব্যয়, প্রেরণা, নান্দনিক, আইতারামা, ভাস্কর, নবজাতক, সমুজ্জ্বল সুবাতাস, অনোমা, আপাতত, শামা, পদক্ষেপ, পত্রিকা, হৃৎপিণ্ড, চর্যা, ক্ষয়িত্র, লৌকিক, কিশোর সমাবেশ, তৃতীয়া, পূর্বদিগন্ত, গবেষণা, চেতনা, নোঙর, ছাড়পত্র, পোস্টার, যুগান্তর, গল্প, সুদর্শন চক্র, অর্চি, উদ্ভাস, বিজয়, মধ্যাহ্ন, মধুমতি, চম্পককনগর, ক্রান্তিকালের কবিতা, কালধারা, বলাকা, ১৪০০,আফ্রোদিতি, কলতান, অর্কেস্ট্রা, পরমায়ু, নবকল্লোল, অরণ্য, সৃষ্টি, লুকথ্রু, স্পার্ক জেনারেশন, পায়রা, মূল্যায়ন, প্রসঙ্গ ইত্যাদি। উল্লেখযোগ্য পত্রিকা ‘কালধারা’ ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা (বিজয় দিবস সংখ্যা কার্তিক-পৌষ) সংখ্যায় সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টিতে স্বকীয় সৃষ্টিশীলতা প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, “বর্তমান জীবনের কঠিন প্রাত্যহিকতায় যখন আমরা আষাঢ়ের চাঁদ দেখিনা, পূর্ণিমা দেখিনা, শ্রাবণের পূর্ণিমা দেখিনা বা রাখালের বাঁশি আর শুনিনা তখন সাহিত্যের আর প্রয়োজন কতটুকু। এরূপ একটি ভাবনা কোন অবাস্তব বিষয় নয়। যে কোন সৃষ্টির পেছনে স্রষ্টার স্বরূপ উন্মোচনের প্রয়াস, তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, ইচ্ছা অনিচ্ছা বা স্বকীয় সৃষ্টিশীলতা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যটি বিরাজ করে। এ অবস্থাই কিন্তু তার সামাজিক সচেতনতা, সৃষ্টির প্রেক্ষাপট হিসাবে কাজ করে। সৃষ্টিশীলদের জন্য কালজ্ঞান সচেতন একটি সহজ পরিবেশ উপস্থাপন করার মানসে আমাদের এই প্রয়াস।
বর্তমানে চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশনায় সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের আগমন ও প্রজন্মের নব সৃজনশীলতার প্রকাশের অঙ্গীকার নিয়ে যে সকল লিটল ম্যাগ সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে তাদের মধ্য মনিরুল মনির সম্পাদিত খড়িমাটি, অরুণ সেন সম্পাদিত ঋতপত্র, নুরল আমিন সম্পাদিত কাঁচপাতা, অমিত চৌধুরী সম্পাদিত মূল্যায়ন, ওমর কায়সার সম্পাদিত মধ্যাহ্ন, হাফিজ রশীদ খানের পুষ্পকরথ, কমলেশ দাশ গুপ্তের অন্তরীপ অন্যতম। খড়িমাটির বিশেষ সংখ্যাগুলোতে আবদুল মান্নান সৈয়দ, বিষ্ণু দে ও সুচরিত চৌধুরীকে নিয়ে আলোচনা ও বেশ কয়েকটি লেখা তাদের মূল্যায়নে পাঠকদের বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে এবং খড়িমাটির নবম সংখ্যায় শূন্য দশকের পাঁচ কবির গুচছ কবিতা ও পরিচিতিমূলক সংখ্যায় কবি হিসেবে স্থান পেয়েছেন, সোহেল হোসেন গালিব, কাজী নাসির মামুন, তুষার কবির, চন্দন চৌধুরী, ফেরদৌস মাহমুদ। অন্যদিকে ঋতপত্রের কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ ও কবিতা নিয়ে বিশেষ সংখ্যাটি লিটল ম্যাগ কর্মীদের সৃজনশীলতার বিকাশে নতুন প্রেরণা জাগাবে। বর্তমানে মূল্যায়নের মুক্তচিন্তার সাধক পুরুষ প্রয়াত বিচারপতি মুহম্মদ হাবীবুর রহমানকে নিয়ে মূল্যায়নধর্মী লেখায় সমৃদ্ধ হয়ে মূল্যায়নের নতুন সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, কবিতায় জাগরণ ও নতুন সৃষ্টির প্রত্যয় নিয়ে কবিতাবিষয়ক ছোট কাগজ সাহিদা রহমান মুন্নির সম্পাদনায় কবিতায় জাগরণের তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। নবীন ও প্রবীণ কবিদের সমকালীন কবিতায় ঋদ্ধ হয়ে এ সংখ্যায় কবিতা লিখেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ, মুহাম্মদ নুরুল হুদা, মহাদেব সাহা, শাহাবুদ্দীন নাগরী, ফারুক মাহমুদ, রেজাউদ্দিন স্টালিন, লিলি হক, ড. সৈয়দ রানা, আল মুজাহিদী, আকতার হোসাইন, মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ, আনন্দ মোহন রক্ষিত, আরিফ চৌধুরী, নাজিমুদ্দিন শ্যামল, তহুরুন সবুর ডালিয়া, জসীম মেহবুব, নজরুল জাহান, ফারুক হাসান, সাঈদুল আরেফীন, মৃণালিনী চক্রবর্তী, সাহিদা রহমান মুন্নি প্রমুখ। শাহাবুদ্দীন নাগরীর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার একজন লেখকের সাহিত্যকর্ম সমন্ধে জানতে আগ্রহ সৃষ্টি করবে। সম্পাদকীয়তে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে সম্পাদক লিখেছেন- পথে নেমেছি, কোনো ভয়, কোনো বাধায় থামবো না। কালের বিবর্তনে যতই প্রতিকূলতা বাধা সৃষ্টি করুক না দমবোনা, এগিয়ে যাবো দীপ্ত পদক্ষেপে। জাগাবো- জাগরণ তুলবো নতুন যে কোনো সৃষ্টির।
চট্টগ্রামে লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশনা বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের আগমন নতুন আশার আলো দেখাবে। ছোট কাগজের অধিকাংশ কর্মীই তরুণ, অর্থহীন হলেও প্রাণ শক্তিসম্পন্ন। এই প্রকাশনায় আসছে নতুন কর্মী, প্রকাশনাও বেড়েছে, নতুন ভাবনায় নতুন সাহিত্য সৃষ্টিতে। তবুও একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করার দায়িত্ব যে শুধুমাত্র সম্পাদক-প্রকাশকের নয় এ সত্য বুঝতে হবে লিটল ম্যাগাজিন লেখকদের ও পাঠকদের। একটি লিটল ম্যাগাজিন পরিপূর্ণতা লাভ করে যদি লেখক, পাঠক ও সম্পাদক, প্রকাশক তাদের নিজের দায়িত্ব যথাসময়ে পালন করে ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের বড় ধরনের সমস্যা হলো সরকারিভাবে অসহযোগিতা। লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনা যতটা প্রসারিত তার চেয়ে আরও বেশি প্রসারিত হতে পারতো যদি সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা থাকতো। তবুও আশার কথা তরুণরা তাদের একাগ্রতায়, চেষ্টায় নতুন সাহিত্য সৃষ্টিতে নিবেদিত হয়ে আজও চলেছে নিজস্ব গতিতে, চিন্তা ও চেতনায়।