আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কবি আল মাহমুদ স্মরণে ৫ মার্চ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর প্রধান মিলনায়তনে নাগরিক শোকসভা পালিত হয়েছে। ড. মাহমুদ শাহ্ কোরেশির সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অন্যান্যদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুর রউফ, ড. মঈন খান, শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী, কবি আল মুজাহিদীসহ দেশ বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আল মাহমুদের লোক লোকান্তর, কালের কলস ও সোনালী কাবিন তিনটি কাব্যগ্রন্থ দিয়েই বাংলাসাহিত্যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। তার কাব্যপ্রতিভার ঔজ্জ্বল্যেই তিনি এই আসন করে নিয়েছিলেন। কবি আল মাহমুদ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। সোনালী কাবিনে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ যেভাবে কাব্যভাষায় রূপ লাভ করেছে তা যে কোনো ভাষার জন্য গৌরবের। আল মাহমুদ তার পানকৌড়ির রক্ত গল্পে বেদে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রাকে তীক্ষ্ণ ও সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। আল মাহমুদের স্মৃতিকথা ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্মৃতিকথা। ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ রচনাও শিশুসাহিত্যে তার লেখা স্থায়ী আসন দিয়েছে। আল মাহমুদ সাহিত্যের যে ক্ষেত্রেই হাত দিয়েছেন সেখানেই ঈর্ষণীয় সাফল্য লাভ করেছেন। তিনি নেই, কিন্তু তার রচনা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে।’
বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, ‘সাহিত্যে আমার পদচারণা কম থাকলেও কবি আল মাহমুদের সহচার্যে তাকে গভীরভাবে জানার সুযোগ হয়েছে। তিনি একজন মর্দে ঈমানদার কবি ছিলেন। তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।’ ড. মঈন খান বলেন, ‘স্কুল কলেজে আল মাহমুদকে তেমনভাবে আমার জানার সুযোগ না হলেও পরবর্তীতে আল মাহমুদের কালজয়ী লেখা আমাকে খুব সহজে আলোড়িত করেছে। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা কবি। সমকালীন সময়ে তিনি শুধু অন্যতম কবিই নন, প্রধান কবি।’ শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নাজড়িত স্বরে বলেন, ‘কবি আল মাহমুদ শুধু যে একজন কবিই তা নন, তিনি মানুষকে আপন করে নিতেও শিখিয়েছেন, মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। তিনি ভুলবার নয়, তাকে ভোলা যাবে না।’ কবি আল মুজাহিদী তার বক্তব্যে আল মাহমুদের লেখা ‘আমি আর আসবো না বলে’ শিরোনামের কবিতাটি দেখিয়ে বলেন, ‘আল মাহমুদ- আপনি আজ মৃত্তিকার গহ্বরে চলে গেলেও বার বার আপনি আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। আপনার সাহিত্যকর্ম আপনাকে বার বার ফিরিয়ে আনবে। আপনি আমাদের মাঝে থাকবেন।’
কবি আল মাহমুদ মুক্তিযোদ্ধা হয়েও রাষ্ট্রীয় সম্মান না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বক্তারা। তারা বলেন, কবি আল মাহমুদকে নিয়ে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে তা দূর হবে। তিনি মানুষের কাছে ভালোবাসার কবি হয়ে বেঁচে থাকবেন আগামীর দিনগুলোতে। সদ্য প্রয়াত কবি আল মাহমুদ স্মরণে নাগরিক শোকসভার আয়োজন করে কবি আল মাহমুদ পরিষদ। কবি আসাদ চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও কবি জাকির আবু জাফরকে সমন্বয়ক করে অনুষ্ঠানটি পর্যায়ক্রমে সঞ্চালনা করেন কাজী মোহিনী ইসলাম ও বাচিক শিল্পী শায়লা আহমেদ।
অনুষ্ঠানটিতে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য ও কবিতা পাঠ করেন কবি আবদুল হাই শিকদার, কবি জাফরুল আহসান, কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ, কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, বাচিক শিল্পী নাসিম আহমেদ, কবি হাসান হাফিজ, কবি শাহীন রেজা, কবি বকুল আশরাফ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শরীফ বায়জিদ মাহমুদ, বাচিক শিল্পী সীমা ইসলাম, কবির বড় ছেলে শরীফ মাহমুদসহ আরো অনেকে। কবির জীবন ও সাহিত্য নিয়ে কি-নোট পেশ করেন আল মাহমুদ গবেষক ড. ফজলুল হক তুহিন।
অনুষ্ঠানটিতে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন আবিদ আজম, জামসেদ ওয়াজেদ, মেজবাহ মুকুল, নূর মোহাম্মদ, সিমান্ত আকরাম, নাঈমুর রহমান দূর্জয়, আহমেদ ইউসুফ, সুফিয়ান রায়হান, শাহদাত সরকার, শাকিল আলম রবি, আমির সোহেল, রাসেল আব্দুর রহমান, শামিল আরাফাত, জাকারিয়া নূরী প্রমুখ।