স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রধান দু’কবি : শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। ‘গর্ব করার মতো আমাদের পঞ্চাশ আমলের দু’জন ধীমান কবি আমাদের যা দিয়েছেন একদিনে, এক মাসে, এ বছরে কিংবা এক যুগে তা শেষ হবার নয়। সন্ধ্যাতারা বলি কিংবা শুকতারা বলি, আসলে দুটোই এক জিনিস।’ তা ছাড়া ‘শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ নদীর ভিন্ন স্রোতের নাম। উভয়েই স্বীকৃতি কবি পুরুষ এবং উভয়েই সমকালের কবিতায় বিদ্বান। সর্ব বিষয়ে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার মতো পাণ্ডিত্যে ভরপুর। অভিজ্ঞ এবং নিজের দেশের মানচিত্র, প্রকৃতি দর্শন বিষয়ে উভয়েই একমত না হলেও সময় সচেতন।’ তবে ‘কিছু কিছু কবির কবিতা কার্যত এমনিতেই মন-মগজে তীরবিদ্ধ হয়। কবিতা হয়ে ওঠে সমকাল পেরিয়ে মহাকালের যোগাযোগ সেতু।’ এ দু’জনও ঠিক তাই। তবে এ লেখায় কবি আল মাহমুদের স্বাধীনতা-বিষয়ক কবিতাকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকবে।
‘বর্তমান বাংলাদেশের বাংলা কবিতার জ্যামিতিক পরিমাপে যে দিক থেকেই আল মাহমুদের কবিতার দিকে রেখাঙ্কন করি না কেন তা কবিতার বৃত্তে সর্বদা নব্বই ডিগ্রি কোণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’ তাঁর কবিতায় সব সময় লোকজ ঐতিহ্যি উঁকি-ঝুঁকি দিবেই। তবে তা জীবনানন্দ দাশ ও জসীম উদ্দীনের চেয়ে ভিন্ন। এ ভিন্নতারও কারণ আছে। কেননা, ‘একজন কবির একটি দর্শন থাকা চাই তাঁর কাব্যে। কবিতার বিষয়ে যদি ভাবগাম্ভীর্যতা, দিক-নির্দেশনা না থাকে তাহলে একটি কবিতার গতিপথের আয়ু বড়জোর এক ঘণ্টা কিংবা বড়জোর একদিন। কবিতার মাঝে যখন সুস্পষ্ট দিক-দর্শন উপস্থাপিত হয় এবং কবি কি বোঝাতে চাচ্ছেন তা যখন পাঠকের ইন্দ্রীয় বুঝতে সক্ষম তখন কবি আর পাঠকের বোধের মাঝে কোনো তথাকথিত দেয়াল থাকে না।’ কবি আল মাহমুদের ক্ষেত্রে সে দর্শন হচ্ছে শিকড়ের সন্ধানে প্যান্ট পরে শহর থেকে গ্রামের শীতল মাটিতে প্রবেশ করা। আল মাহমুদের কবিতা প্রসঙ্গে কবি সৈয়দ আলী আহসান বলেছেন, ‘আধুনিক জীবনের কর্মকাণ্ডের মালটিপ্লিসিটি বা বাহুলীকৃত অস্ত্র অনেক কবিকে অস্থির করেছে, তাই তাদের কবিতার ভাষার অস্পষ্টতা এবং জটিলতা এসেছে। আল মাহমুদের কবিতা সঙ্কট থেকে মুক্ত। আন্তরিক সত্যের সামীপ্যে তাঁর কবিতা স্পষ্টবাক প্রকৃতির মতো উন্মুক্ত ও স্বাভাবিক। কোনও অঘটনে নয়, কিন্তু হৃদয়ের লোক-লোকান্তরে তাঁর বসতি; তাই তিনি উজ্জ্বল স্বতন্ত্র এবং একনিষ্ঠ, আল মাহমুদ তাঁর কবিতা দিয়ে বাংলা কাব্যমণ্ডলকে যে সেবা দিয়ে যাচ্ছে, তা অমরতা লাভ করুক এবং এ কথাও বলা যায়, বাংলাদেশের কবিতার মেজাজ ও মন বুঝতে হলে আল মাহমুদের কবিতার দরোজা নক করতেই হবে। আল মাহমুদই বাংলা কবিতাকে সাজিয়েছেন একান্ত আপনার করে। মাটির কাছাকাছি থেকে উঠে আসা আধুনিক এই কবির চেয়ে বাংলাদেশকে আর কে ভালো করে দেখেছেন? তাঁর কবিতায় প্রাণস্পন্দন পাওয়া যায় এ কারণেই।’
লেখক যেহেতু একটি সমাজে বসবাস করেন এবং সে সমাজে সমসাময়িক ও ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধারণ করেন। তাই তার কবিতায় সেগুলি উপেক্ষিত থাকতে পারে না। আর ইতিহাসের মধ্য দিয়ে কোনো জাতির জন্ম হলে ইতিহাসের প্রতিটি কণা কবিকে নাড়া দিতে বাধ্য। এ প্রসঙ্গে রাশিয়ান মার্কসবাদী সমালোচক জর্জি প্লেখানাভ যে উক্তি করেন তা স্মরণযোগ্য। তাঁর মতে, ‘একটি যুগের সামাজিক মানসিকতা সেই যুগের সামাজিক সম্পর্কসমূহের দ্বারা নির্ধারিত হয়। শিল্প ও সাহিত্যের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এ কথা যেমন স্পষ্ট, তেমন আর কোথাও নয়।’ ‘আর সবচেয়ে বড় কথা মানুষের চেতনা তাঁর সত্তাকে নির্ধারণ করে না, বরং তার সামাজিক সত্তাই চেতনাকে নির্ধারিত করে। প্রত্যেক লেখকই ব্যক্তিগতভাবে সমাজে অবস্থান করেন এবং তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসের ঘটনাবলী অবলোকন করেন এবং ব্যাখ্যা দেন।’ আর আল মাহমুদও এ পথকে অবলম্বন করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ঘটে যাওয়া নানা ঐতিহাসিক বিষয়সমূহ তোলে ধরেন তাঁর কবিতায় এবং একই সাথে তিনি পাকিস্তানি হানাদারদের নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞকে চিত্রিত করে সামাজিক চৈতন্যের সৃষ্টি করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জন্য আশীর্বাদ কেননা এর মধ্য দিয়েই হায়েনাদের বিতাড়িত করা সম্ভব হয়েছে। এর কোন বিকল্প ভাববার অবকাশ ছিল না। তাই এ কথাও নির্দ্বিধায় বলা যায় পাকিস্তানিদের বিতাড়নের যে ডাক এসেছিল তা সব বিবেকবান মানুষকে নাড়া দিতে বাধ্য। আর কবি বা সাহিত্যিকদের আরো প্রবলভাবে নাড়া দেয়। কারণ তারা মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে পড়ে নিতে পারে সমাজ কী চায়। যার কারণে কেউ কেউ বলে থাকেন ‘কবিরা বা সাহিত্যিকেরা বর্তমান সমাজে বসবাস করেও একশত বছর অগ্রগামী।’ আর এর ব্যতিক্রম নন আল মাহমুদ। তাঁকে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও যুদ্ধকালীন ঘটনাসমূহ ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছে। তবুও ’৭১ সালের যুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি সে স্বাধীনতার কথা এলেই শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি/ রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।/ স্বাধীনতা তুমি/ কাজী নজরুল, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো /মহান পুরুষ, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা-/…’ অবিনশ্বর কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়। এ কবিতাটি ছাড়াও শামসুর রাহমান অসংখ্য কবিতা লিখেছেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে নিয়ে। আল মাহমুদও তাই করেছেন। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় আল মাহমুদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কবিতাগুলির আবেদন অনেক বেশি বলেই প্রতীয়মান হয়। এখানে আল মাহমুদের কয়েকটি কবিতার আবেদন নিয়ে আলোচনা করবো।
জীবনানন্দকে ‘নারী, নিসর্গ ও নদীর’ কবি বলা হয়। তবে জীবনানন্দের এ বৈশিষ্ট্যটি ধারণ করেছেন আল মাহমুদও। তাই তাঁর কবিতাতেও এগুলি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। তবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে নিয়ে রচিত কবিতায় এগুলো বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। কেননা সে সময়ে নারীদের ওপর যে অমানবিক অত্যাচর হয়েছে এবং যুদ্ধের কারণে প্রকৃতির মধ্যে তীব্র ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা কবিকে আলোড়িত করেছে। তাঁর ‘কালচক্র ঘুরছে’ কবিতায় ‘স্বাধীনতা কি’ বলতে গিয়ে তিনি বলেন:
পৃথিবীর চেয়েও রহস্যময় আমার দেশ
এবং তার মধ্যে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছ তুমি
তুমি মানেই তো স্বাধীনতা।
একই কবিতায় তিনি স্বাধীনতাকে তুলনা করেছেন যৌন আকাঙ্ক্ষার উদ্দেশ্যে মিলনের সময়ে উন্মত্ত নর-নারীর যে অনুভূতি তার সাথে।
‘দিগ্বিজয়ের ধ্বনি’ কবিতায় তিনি স্বাধীনতার ডাককে তুলনা করেছেন আজানের ধ্বনির সাথে। আর নামাজের সেজদাকে তুলনা করেছেন যুদ্ধের সাথে। তিনি মনে করেন,
কলরবমুখর হয়ে উঠেছে এই নীলিমা, চন্দ্র তারকারাজি
আমাদের আযানই তো আমাদের স্বাধীনতা।
আমাদের সিজদাইতো প্রকৃতপক্ষে মনুষ্যত্বের জয়গান।
এ কবিতাতে ৭ই মার্চের বাঙালির যে জাগরণ ঘটেছে তাও ওঠে এসেছে। তিনি ৭ই মার্চে গর্জে ওঠা ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই আহবানকে অসাধারণ ব্যঞ্জনার মাধ্যমে তুলে ধরেন এভাবে :
এক অলৌকিক আযান ভেসে এলো আমাদের সত্তার ভেতর দিয়ে
আর খসে পড়ল সমস্ত শিকলের ঝংকার বন্ধন এবং বেদনা
তাহলে কি আকাশের দিকে মুখ তোলা ঐ মোয়াজ্জিনের আহ্বানের মধ্যেই মানুষের মুক্তি উচ্চারিত হচ্ছে না?
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি শয়তানদের আক্রমণে কেবল জীবনই ধ্বংস হয়নি। তারা সম্ভ্রম ছিনিয়ে নিয়েছে লক্ষ মা-বোনের। তাদের আর্তনাদ আজো আমাদের হতবিহ্বল করে তোলে। আল মাহমুদের ‘ক্যামোফ্লোজ’ কবিতায় সে বিভীষিকতার কথা বলেন এভাবে:
জেনো, শত্রুরাও পরে আছে সবুজ কামিজ
শিরস্ত্রাণে লতা পাতা কামানের উপরে পল্লব
ঢেকে রেখে
নখ
দাঁত
লিঙ্গ
হিংসা
বন্দুকের নল
হয়ে গেছে নিরাসক্ত বিষকাঁটালির ছোট ঝোপ।
বাঁচাও বাঁচাও বলে
এশিয়ার মানচিত্র কাতর
তোমার চিৎকার শুনে দোলে বৃক্ষ
নিসর্গ নিয়ম।
এখানে যে উপমা ব্যবহার হয়েছে সত্যি চমৎকার। পাকিস্তানি সৈন্যদের যে পোশাক তা দেখে আমরা হয়তো ভুল করি, সে জন্যই কবি ‘সবুজ কামিজে’র কথা উল্লেখ করেছেন।
‘আমি উচ্চারণ করি ঘৃণা’ কবিতায় হানাদাররা যেভাবে নারীর সম্ভ্রম হরণ করেছে তাকে কবি পশুত্বের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি তাদের এ কর্মকাণ্ডকে মানবতা বিপরীতে প্রবহমান কোনো জঞ্জালের সাথে তুলনা করে বলেন:
তারা মনুষ্যত্বকে রক্তে চুবিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল।
পুরুষ নারীকে প্রেম করে
নারী প্রসব করে
পুত্র।
তারা এই স্বাভাবিকতার চিরশত্রু
নিয়মের ব্যতিক্রম এবং স্রোতের উল্টো দিক থেকে প্রবাহিতকারী
রক্তস্রোত।
স্বাধীনতা নামক সোনার হরিণটির পিছনে আমাদের দীর্ঘদিন ধরেই হাঁটতে হয়েছে। ইংরেজ বেনিয়ারা যেভাবে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সৃষ্টি করেও পার পায়নি, পাকিস্তানিরাও পায়নি। আল মাহমুদের ‘কালচক্র ঘুরছে’ কবিতায়। তিনি বলেন :
ভাব একাত্তরের কথা
দেখ আমার রক্তের ছোপ লেগে আছে ঘাসে।
ভাব আমরা কতটা শতাব্দী অতিক্রম করে এসেছি
অতিক্রম করার নামতো অগ্রগতি নয়।
এ পঙ্ক্তিগুলির যে আহবান তা ঠিক স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছরেও সমানভাবে আমাদের নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।
আল মাহমুদের কবিতাতেও আমাদের দীর্ঘকালীন পরাধীনতার যে গ্লানি তা ফুটে উঠেছে। আমাদের এ দীর্ঘ পরাধীনতাকে নচিকেতার সে বিখ্যাত গানের কয়টি লাইনের সাথেও তুলনা করাও চলে। ‘জীবনের অর্থ কী’ বলতে গিয়ে নচিকেতা যেমন বলেন, যে মেয়েটা রোজ রাতে বদলায় হাতে, তার অভিশাপ নিয়ে চলাই জীবন।/ অন্তবিহীন পথ চলাই জীবন/ শুধু জীবনের কথা বলাই জীবন।’
আল মাহমুদ ‘দিগি¦জয়ের ধ্বনি’ কবিতায় বলেন :
বলো কত দিন ধরে আমরা হাঁটছি, কত কাল কত যুগ?
শিকলের ঝনাৎকার বয়ে নিয়ে আমরা সবগুলো নদী পার হয়ে এসেছি
সবগুলো স্রোতস্বিনী। কিন্তু পারাপারে তো আমাদের দাসত্ব ঘোচেনি
আমাদের অন্তরাত্মা না না করছে
কিন্তু দাসত্বের ঝনাৎকারকে আমরা কখনোই চমৎকার বলতে পারি না।
তিনি যুদ্ধের বিভীষিকার বর্ণনাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি। যুদ্ধের নারকীয়তা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়ও যে যুদ্ধ, তাও তিনি প্রায় সব কবিতাতেই বলেছেন। ‘কালচক্র ঘুরছে’ কবিতায় তিনি আহবান রেখে বলেন ‘মানুষ বলে শান্তি শান্তি কিন্তু আমি তোমাকে বলছি/ কবিতার দোহাই যুদ্ধ ছাড়া পৃথিবী সুস্থ হয় না।’ অন্যদিকে ‘দিগি¦জয়ের ধ্বনি’ কবিতায় তাঁর যে আহবান তা কাজী নজরুল ইসলামের মতই তীব্র ও ঝাঁঝালো। কবি নজরুল ইসলাম যেমন ব্রিটিশদের তাড়াতে হুঙ্কার ছেড়ে বলেন,
আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর।
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল
আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল।
আমি মানি নাকো কোনো আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভিম ভামসান আইন মাইন!
কবি আল মাহমুদও বলে উঠলেন:
আমরা আমাদের দৃষ্টি দিগন্তের দিকে মেলে ধরছি
দাঁড়ি নেই কমা নেই নেই কোনো সেমিকোলন
আমরা সমস্ত দৃশ্য পট অতিক্রম করে আমাদের গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছবো।
কে আমাদের মধ্যে ভয়ের গুঞ্জন তুলতে চায়?
কাপুরুষতা ও ভীরুতার চিহ্ন ছিল না।
‘আমি ইচ্ছে পূরণের মাটি নই’ কবিতায় আল মাহমুদের উপলব্ধি কবি র্ফরুখ আমাদের ‘লাশ’ কবিতার শেষ কয়টি পঙ্ক্তির মত। তিনি অভিশপ্ত ব্রিটিশের ধ্বংস কামনা করেছেন। এখানেও তার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। কবি র্ফরুখ আহমদ বলেন:
মানুষের প্রাপ্য অধিকার,
ক্ষুধিত মুখের গ্রাস কেড়ে নেয় রুধিয়া দুয়ার,
মানুষের হাড় দিয়ে তারা আজ গড়ে খেলাঘর।. . .
আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যুদীর্ণ নিখিলের অভিশাপ বও:
ধ্বংস হও
তুমি ধ্বংস হও।
আর আল মাহমুদ বলেন:
পালাও হারামজাদারা। কোথায় পালাবে?
এক একটি শতাব্দীতে এক একটি নামের
পৃষ্ঠা বাতাসে উল্টে যাবে। পালাও
হারামজাদারা। কোথায় পালাবে?
মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় যে ত্রুটি রয়েছে তা সর্বজন স্বীকৃত। প্রতিবারই রাজনৈতিক বিবেচনায় তালিকা প্রকাশ করে মূলত যোদ্ধাদের অপমান করা হচ্ছে। তালিকার বাহিরে থেকে গেছে হাজারো মুক্তিযোদ্ধা। যারা যুদ্ধকালীন সময়ে যোদ্ধাদের সহায়তা করেছে তাদেরকে কেউ স্মরণ করবার প্রয়োজন মনে করেনি। যে সব নারী সে সময়ে নরপশুদের যৌন আকাক্সক্ষার বস্তুতে পরিণত হয়ে জীবন সংসার সবই হারিয়েছে, তাদেরও কেউ ঠাঁই দেয়নি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়। এ তালিকাটি স্পষ্ট করেই বলা চলে জর্জ বার্নার্ড শ’য়ের ‘আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান’ নাটকে যে রোম্যান্টিক যুদ্ধের এবং যোদ্ধাদের কথা বলা হয়েছে তারই ফটোকপি। কেননা বাস্তবতা এ রোম্যান্টিকতার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘আমি ইচ্ছে পূরণের মাটি নই’ কবিতায় আল মাহমুদও সে তালিকাকে রোম্যান্টিক বলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়া যোদ্ধাদের জন্য আর্তনাদ করেছেন। তালিকাবিহীন যোদ্ধাদের সম্পর্কে তিনি বলেন:
যাদের নাম শহীদের তালিকায় নেই।
অথচ আমি তাদের নাম জানি।
কেউ জিজ্ঞাসা করুক? আমি তাদের নাম
একের পর এক বলে দিতে পারি। তোমরা
তাদের নামের পরে কোনো যতি চিহ্ন ব্যবহার করো না। না কমা, না দাঁড়ি।
তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চেয়ে তাদের রক্তই ওই পতাকায় জমাট বেঁধে আছে বেশি। অসহ্য
লালে রঞ্জিত। আমি কি উচ্চারণ করবো
তাদের নাম।
এখানে দলীয় বিবেচনায় যে তালিকা করা হয় তার বিরুদ্ধে তীব্র আঘাত করা হয়েছে। কেননা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমাদের সংবিধানে কি থাকবে কি থাকবে না তা নিয়ে মানুষ মাথা ঘামায়নি। তারা জীবনকে বিসর্জন দিয়েছে কেবল পরাধীনতা ও শকুনের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে।
‘আমি উচ্চারণ করি ঘৃণা’ কবিতায়ও তিনি নরপশুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়ার যে আহবান জানিয়েছেন তাও আমাদের সে সময়ের সাহসী অগ্রযাত্রার কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে এখানে সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে তিনি অভিশাপ দিয়েছেন। এখানে তিনি অভিশাপ দিয়ে বলেন:
মুক্তি প্রয়াসী নারীর ক্রোধ ঝরে পড়ুক
তাদের লোলুপ চোখের উপর
নারী ধর্ষণের জন্য যারা পৃথিবীর আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে
ঝাঁপিয়ে পড়েছে মানুষের মনুষ্যত্বের শুভ্রতা
চিহ্ন অঙ্কিত পাথর ও প্রত্নের উপর।
‘এই পতাকার সূর্য সাক্ষী’ কবিতায় তালিকা প্রসঙ্গে তার মনে লুকিয়ে থাকা বেদনাকে খোলাখুলি করে জানিয়ে দিলেন। স্বাধীন পতাকার মাঝে যে লাল বৃত্ত তার যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করা হাজারো তালিকাভুক্ত না হওয়া যোদ্ধাদের রক্ত। কুমিল্লার এক হিন্দু মেয়ে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও তালিকায় অন্তর্ভুক্তি না হওয়ায় তিনি আক্ষেপ করে বলেন:
তাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে আমি নিয়ে গিয়েছিলাম
মুক্তির উৎসবে। এই পতাকার লাল অংশে তার খানিকটা
রক্ত আছে। আমি সব সময়ে দেখি আর তার কথা ভাবি।
কী অবলীলায় তার নাম বাদ দিয়ে লেখা হয়ে যায়
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। সে ছিল কুমিল্লার একটি
হিন্দু পরিবারের মেয়ে।
একই কবিতার অন্য অংশে তিনি বলেন:
হাসিবুল ইসলাম
আল্লাহু আকবার বলে সে আক্রমণ করেছিল।
তার বুক থেকে কলজে উড়ে গিয়ে ওই
পতাকায় লেগে আছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার মাঝে কুষ্টিয়ার হাসিবুল ইসলামের রক্ত লেগে থাকলেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তার নাম কেন নেই?
পরিশেষে এ কথা বলা যায় অস্ত্র হাতে হানাদারদের বিরুদ্ধে কবি আল মাহমুদের লড়াইয়ের দৃঢ়তা যেমন ছিল, তেমনি তাঁর কলম হাতেও রয়েছে। ফলে তিনি আমাদের মুক্তির সংগ্রামকে যেভাবে দেখেছেন অন্য কেউ এভাবে দেখার সুযোগ পাননি। তাঁর এ অনুভূতিকে বলা যায় ‘দেশ কালের-দ্বন্দ্ব ও সংক্ষোভ, সভ্যতার সঙ্কট কবিকে বিচলিত করতে পারেনি, তাই রেবিক-স্বদেশ প্রেম ও প্রকৃতিলোক আল মাহমুদ নিশ্চিন্তে সাঁতার কেটে নির্মাণ করেছেন কবিতার পর কবিতা।’
গ্রন্থ সহায়ক:
কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৩।
আল মাহমুদের স্বাধীনতার কবিতা, সঙ্কলন- রফিব হারিরি, মিজান পাবলিশার্স, ২ শে বইমেলা ২০০৮।
তৌফিক জহুর, আল মাহমুদ ও অন্যান্য, স্বচ্ছন্দ প্রকাশন, ২১ শে বইমেলা ২০০৩।
সৈয়দ আলী আহসান, আধুনিক বাংলা কবিতা, গতিধারা, জানুয়ারি ২০০২।
হাসান আলীম, কুসুমে বসবাস, স্বচ্ছন্দ প্রকাশন, ২১ শে বইমেলা ২০০৩।
ফজলুল হক তুহিন, আল মাহমুদের কবিতা : বিষয় ও শিল্পরূপ, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৪।