জানুয়ারির ১৫ তারিখ হাতে পেলাম নান্দনিক প্রচ্ছদে আবৃত্ত ‘নতুন এক মাত্রা’র শীতসংখ্যা। সংখ্যাটি হাতে পাওয়া মাত্রই উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখতে লাগলাম। পত্রিকাটির ভেতরে প্রবেশ করে অভিভূত হলাম এবারের ক্রোড়পত্রের বিষয় দেখে। বাজারে প্রচলিত অন্যান্য পত্রিকার থেকে নতুন এক মাত্রা যে ব্যতিক্রম এবং প্রকৃতপক্ষে আমাদের সুবিন্যস্তভাবে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুনত্বের সমন্বয়ে সূক্ষ্ম বোধ-বুদ্ধি ও চিন্তার জাগরণ ঘটাতে চান, তার প্রমাণ হলো ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’কে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ। এর আগে আর কোনো সাহিত্য পত্রিকা এই ধরনের কাজ করেছে কিনা আমার জানা নেই। যদি না করে থাকে, তাহলে নতুন এক মাত্রা পরিবারকে অবশ্যই অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাতে হয় এমন একটি বিষয়কে বেছে নেয়ার জন্য।
ভারতবর্ষে যখন চলছে ব্রিটিশ শাসন। আর এই ব্রিটিশদের সহযোগী হয়ে হিন্দু সমাজ গিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা-দীক্ষায়, কর্মক্ষেত্রে। গ্রহণ করছেন আধুনিক শিক্ষা। প্রতিষ্ঠা করছেন হিন্দু কলেজ। তাতে হিন্দু যুবকরা হয়ে উঠছে আধুনিক মনস্ক। তখন মুসলমানরা অভিমান করে পরিত্যাগ করছে ইংরেজি শিক্ষাকে। ইংরেজি শিক্ষাকে বিধর্মীদের শিক্ষা বলে হয়ে উছে মাদ্রাসামুখী। প্রতিষ্ঠা করছেন কাওমি শিক্ষা। যেখান থেকে তৈরি হয়েছে অসংখ্য আলেমে দীন। তবে এই মাদ্রসামুখী শিক্ষা গ্রহণের ফলে সমাজ হয়ে ওঠে অনেকটাই পিছনমুখী। কারণ যখন ইউরোপীয় শিক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানচর্চার ঘটছে প্রসার। মানুষ দেখতে শুরু করেছে যুক্তির নিরিখে জীবনকে, সেই সময় ভারতীয় বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটে নানা কুসংস্কার। বাঙালি মুসলমানের আর্থসামাজিক জীবন হয়ে ওঠে ভঙ্গুর। এমনকি ১৯১৭ সালে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলে অনেক কলেজগামী মুসলমান ছেলেরা কলেজ ত্যাগ করে মাদ্রাসামুখী হয়। আধুনিক শিক্ষার সাথে একধরনের কৃত্রিম বৈরিতা তৈরি হয়। ক্রমান্বয়ে পীরবাদ, মদ্যপান দেখা দিতে থাকে। বিধবাবিবাহ প্রথাকে লজ্জাকর মনে করে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। এই যখন পরিস্থিতি, তখন কয়েজন সচেতন তরুণ এগিয়ে আসেন বাঙালি মুসলমানের চিন্তার বিকাশে আধুনিক শিক্ষার নিরিখে যুক্তি দিয়ে জীবনকে বিচার করতে। এই সকল তরুণ কলকাতামুখী না হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। এই সংগঠনটি ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি, মঙ্গলবার মুসলিম হলে ছাত্র-সংসদের অফিসকক্ষে এক বৈঠকের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র হিসাবে প্রকাশ হতে থাকে বার্ষিক ‘শিখা’। পত্রিকাটির মোটো ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে অড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব। এই পত্রিকাটির মাত্র পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। গোণাগুণতির হিসাবে খুবই কম মনে হলেও পত্রিকাটিতে ছড়িয়ে থাকা প্রবন্ধগুলোতে যে চিন্তা-চেতনার রসদ ছিল তা পরবর্তীকালে অনেক তরুণকে করে তুলে আধুনিকতামুখী। মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যক্রম চলেছিল মাত্র এক যুগ। তারপর আর তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। কিন্তু এই একযুগ সময়ে যে বীজ বপন করেছিলেন শিখার লেখকসমাজ তা এখন প্রবহমান। এই পত্রিকাটিতে গদ্যচর্চা করেছেন সেই সময়ের অনেক বুদ্ধিজীবী। শিখা পত্রিকার মাধ্যমে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয় বাঙালি মুসলিম সমাজে, তাকে অভিহিত করা হয় ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ বলে। বুদ্ধি মুক্তির আন্দোলনের সামগ্রিক চালচিত্র নিয়ে লিখেছেন এই আন্দোলনের উত্তসূরি আবুল কাসেম ফজলুল হক। তার রচিত প্রবন্ধের শিরোনাম ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও উত্তরকাল’। এই প্রবন্ধটিতে ফজলুল হক সবিস্তারে তুলে ধরেছেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের গতি-প্রকৃতি-প্রভাব। একটি দীর্ঘ নামের তালিকা তিনি উপস্থাপন করেছেন। যে তালিকা থেকে এটা অনুমান করা যায় যে মুসলিম সাহিত্য সমাজের যে চেতনা-বিশ্বাস তা ছিল সুদূরপ্রসারী। এমনকি সেই ধারা এখন বহমান।
শিখাগোষ্ঠীর অন্যতম ছিলেন কাজী আনোয়ারুল কাদীর। তিনি খুব বেশি পরিমাণে লেখেননি। তার সৃজিত একটি মাত্র গ্রন্থ-ই আমরা পাই। আমাদের দুঃখ নামে গ্রন্থটিতে স্থান লাভ করেছে আটটি প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধগুলোতে উঠে এসেছে সেই সময়ের হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক, সাম্প্রদায়িকতা, বাংলা ভাষার প্রসঙ্গ। তাকে নিয়ে স্ববিস্তারে আলোচনা করেছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক মোরশেদ শফিউল হাসান। কাজী আনোয়ারুল কাদীর : বিস্মৃতিপ্রায় এক চিন্তানায়ক শিরোনামে শফিউল হাসান কাদীরের চিন্তা জগতের সাথে পরিচয় ঘটান আমাদের। যেমন ভাষাকেন্দ্রিক কাদীরের যে চিন্তা তার সাথে শফিউল হাসান আমাদের পরিচিত করে দেন এই ভাবে:
‘প্রবন্ধটিতে লেখক বাঙলার মুসলমানদের প্রতি সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে বৃহত্তর দেশবাসীর কল্যাণ ভাবায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি, বাংলাই যে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা সে-সম্পর্কে দ্বিধামুক্ত অবস্থান থেকে জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন।’ (নতুন এক মাত্রা, পৃ. ২৭)
হাবিব আর রহমানের ‘বুদ্ধিও মুক্তি আন্দোলন : বিভিন্ন দৃষ্টির মূল্যায়ন’ প্রবন্ধটিতে উঠে এসেছে সমকালীন সকল শ্রেণির বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিভঙ্গি। মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রসঙ্গে এখানে আছে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ থেকে মৌলানা আকরম খাঁর পর্যালোচনা। এতে সেই সময়ে মুসলিম সাহিত্য সমাজকে কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় এবং তৎকালীন সমাজ তাদেরকে কিভাবে গ্রহণ করেছেন? তাদের যুক্তি অভিসারী মননকে কতটা সাদরে আহ্বান জানিয়েছেন তা সবিস্তারিত ভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে প্রবন্ধটিতে। বুদ্ধি মুক্তি আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়ে ছিলেন জাতীয় জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ঘোষণা করেছিলেন : “আজ আমি এই মজলিসে আমার আনন্দবার্তা ঘোষণা করছি। বহুকাল পরে কাল রাত্রে আমার ঘুম হয়েছে। আজ আমি দেখছি এখানে মুসলমানের নতুন অভিযান শুরু হয়েছে। আমি এই বার্তা চতুর্দিক ঘোষণা করে বেড়াব।” মুসলিম সাহিত্য সমাজ বিষয়ে নজরুলের যে চিন্তা তা এই উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায়। কবি নজরুল ইসলাম ও মুসলিম সাহিত্য সমাজের যে ধারাবাহিকতা সে প্রসঙ্গে জনাব নুরুল আমিনের সমৃদ্ধ অলোচনা পাঠে নতুন করে ভাবতে শেখাবে বলে মনে করি। মোহাম্মদ আজমের অসাধারণ বাণীভঙ্গিতে উঠে এসেছে কাজী মোতাহের হোসেনের সঞ্চরণ গ্রন্থের ব্যবচ্ছেদ। এই গ্রন্থটি সমকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আকৃষ্ট করেছিল। মোহাম্মদ আজম সঞ্চরণ গ্রন্থের প্রাসঙ্গিকতা বলতে গিয়ে বলেন :
‘বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশে ঠিকমতো এগোলে সঞ্চরণ গ্রন্থটিকে বহু আগেই ছড়িয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু তা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই বরং পিছিয়েছি। যেমন, বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার আকাঙ্ক্ষা কিংবা লিবারেল ডিসকোর্সে ধর্মের পর্যালোচনার ক্ষেত্রে। এ কারণেই সঞ্চরণ গ্রন্থটি তুলনামূলক বেশি প্রাসঙ্গিক থেকে গেছে।’
জনাব মোহাম্মদ আজমের এই মন্তব্যটি শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণীয়। এ ছাড়া আবুল ফজল, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরীসহ ‘শিখা গোষ্ঠীর’ সর্বকনিষ্ঠ সদস্য আবদুল কাদিরকে নিয়ে রয়েছে বিশিষ্ট্য গবেষকদের আলোচনা ও পর্যালোচনা। ক্রোড়পত্র বিভাগের বিশেষ আকর্ষণ মনে হয়েছে শাহাদাৎ সরকারের গ্রন্থনায় ‘নির্বাচিত শিখা : আলোকের আন্দোলন’ অংশটি। এতে তিনি খুব অল্প পরিসরে তুলে এনেছেন সে সময়ের চিন্তকদের চিন্তার নির্যাস। যারা শিখা পত্রিকাটি সংগ্রহ করে এখন পড়তে পারেননি, তারা কিছুটা হলেও যে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করবে, এখান থেকে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কিছুটা এককেন্দ্রিকতা রয়েছে বলেও আমার মনে হয়েছে।
ক্রোড়পত্রের সাথে নিয়মিত বিভাগে প্রচ্ছদ কবিতা হিসেবে আছে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কাল সে আসিবে কবিতাটি। বাংলা ভাষা ও বাংলা একাডেমি শিরেনামে জনাব ফজলে রাব্বির তুলে ধরেছেন ভাষার প্রাসঙ্গিকতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীতা। তার সাথে রয়েছে নতুন ভাবনার সংমিশ্রণ। কারণ তিনি বাংলা ভাষাকে শুধু সাহিত্যের ভাষা হিসেবে নয়, বরং পাশাপাশি দেখতে চান বিজ্ঞান ও অর্থনীতি চর্চারও প্রধান ভাষা রূপে। পাঠকের জন্য উপরি পাওনা হলো একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পব্যক্তিত্ব লিয়াকত আলী লাকীর সাক্ষাৎকার। আছে আলমগীর রেজা চৌধুরী, রেজাউল করিম খোকন ও দেওয়ান মোহাম্মদ শামসুজ্জামানের ছোটগল্প। দেওয়ান মোহাম্মদ শামসুজ্জামান মিডিয়ার যুগে খুব বেশি পরিচিত বলে মনে হচ্ছে না। কারণ পত্রিকায় তার নাম খুব একটা দেখা যায় না। পত্রপত্রিকায় তেমন উল্লেখিত নাম না হলেও, তার গল্পটির বিষয়বস্তু ও বর্ণনা কৌশল আমাকে মুগ্ধ করেছে। শিল্পকলা বিভাগে সীমান্ত আকরামের ঋদ্ধ আলোচনায় ফুটে উঠেছে শাহ আব্দুল করিমের সঙ্গীত ভুবনের মাধুর্যতা। তবে এই বিভাগে ব্যতিক্রম লেখা হলো নির্ঝর আহমেদ প্লাবনের আবৃত্তির শিল্পমূল্য। আমরা আবৃত্তি শুনি; কিন্তু আবৃত্তিকে নিয়ে এত বিশদভাবে চিন্তা-ভাবনা করে লেখা প্রবন্ধ খুব একটা চোখে পড়ে না। যারা আবৃত্তিশিল্পের সাথে জড়িত অছেন বা হতে চান তাদের জন্য খুব উপযোগী একটা লেখা তা বলতেই হয়। এ ছাড়া নাজিব ওয়াদুদের ধারাবাহিক উপন্যাস পদ্মাপাড়ের উপাখ্যান পাঠক মনের কৌতূহল সৃষ্টিতে সহায়ক হবে এর ঘটনা বিন্যাসে। পাঠক এই উপন্যাসটিতে পেতে পারেন কোন মহাকাব্যিক জীবনের আখ্যান। যা গড়ে উঠেছে পদ্মাতীরবর্তী এলাকাকে কেন্দ্র করে। ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলোতে রাজশাহী কলেজের অবদান নিয়ে তেমন কিছু নেই। যা আছে তা ইতিহাসে। ফলে নাজিব ওয়াদুদ প্রথম যে এই বিষয়টি নিয়ে এলেন উপন্যাসপ্রিয় পাঠকের দরবারে তা বললে অত্যুক্তি হবে না। এ ছাড়া ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিভাগে কাজী মোস্তাফিজুর রহমানের আলোচনার মধ্য দিয়ে এটা জানতে পার যায় যে, সুলতানি আমলে স্থাপত্য আকৃষ্টি করেছিল ব্রিটিশ শিল্পীদের। অনুবাদ, কবিতা ও ছড়াগুচ্ছ বিভাগ বিষয়ে পাঠক নিজে অবগত হবেন। বই আলোচনায় খুরশীদ আলম বাবুর প্রাণোচ্ছল গদ্য সরদার আবদুর রহমানের ইতিহাস গ্রন্থের ভেতর দেশে প্রবেশ করায়। আছে মাঈন উদ্দীন জাহেদের বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা। নোমান সাদিকের আলোচনায় ফুটে উঠেছে আশির দশকের অন্যতম কবি সোলায়মান আহসানের কবিতার নানা দিক। সব মিলিয়ে বলতে হয় ছোট ছোট কিছু ত্রুটি আছে। পত্রিকাটি হয়েছে পাঠকের সংগ্রহে রাখার মতো। বিশেষত ‘শিখা’ ও মুসলিম সাহিত্য সমাজকে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ পত্রিকাটিকে দিয়েছে আলোর মিছিলের সহযাত্রীর মর্যাদা।
মাহমুদ যুবায়ের
দূর্গাপুর, রাজশাহী