‘তাঁর ধী যেমন ছিল তীক্ষ্ণ তেমনি পাঠের ক্ষেত্র ছিল বিস্তৃত। অল্প বয়সেই বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নির্মাতাদের অনেকের বহু রচনাই তিনি পড়ে ফেলেছিলেন। তিরিশের ও তিরিশোত্তর বাংলা কবিতা তিনি পাঠ করেছিলেন সযত্নে’
সৃজনশীল ও মননশীল এই দুই ধারায় স্মরণীয় ব্যক্তি হলেন কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল। বাংলা সাহিত্যে কবি আবু হেনা মোস্তফা কামালের আগমন পঞ্চাশের দশকে, লিখেছেন আমৃত্যু। আবু হেনা মোস্তফা কামাল কবি হিসাবে সমাধিক পরিচিত হলেও গীতিকার, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচকের মর্যাদায় স্বপ্রতিভায় অধিষ্ঠিত। মাত্র ৫৩ বছর বেঁচে ছিলেন এই মহৎ সাহিত্যিক। গোণাগুণতিতে খুবই অল্প সময়, লিখেছেন একেবারেই কম। মাত্র তিনটি কাব্যগ্রন্থ ও দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পূর্বে। আর পিএইডি অভিসন্দর্ভ ধরে সর্বমোট ছয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয় গানের সংকলন আমি সাগরের নীল। বই প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি যে খুব সচেতন ছিলেন, তাঁর এই অল্প সংখ্যক বইয়ের উচ্চমার্গীয় রচনায়ই তা প্রমাণ করে।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল তার সাহিত্যিক পরিচয়ের বাইরে ছিলেন যশস্বী অধ্যাপক, নিপুণ বক্তা, সুকণ্ঠ গায়ক ও টেলিভিশনের সফল অনুষ্ঠান উপস্থাপক। তিনি তৎকালীন পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ) উল্লাপাড়ার অন্তর্গত গোবিন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৬ সালের মার্চের ১২ তারিখে। পিতা স্কুল শিক্ষক শাহজাহান আলী ও মাতা খালেকুননেসার দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। পাবনার নির্মল সংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কাটে তার স্কুল জীবন। স্কুলে পড়াকালেই তাঁর মধ্যে জন্ম নেয় সংগীত ও চিত্রকলার প্রতি আগ্রহ। তবে চিত্রাঙ্কনের পথে তিনি হাঁটেননি, বরং নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে হাজির হয়েছেন সাহিত্য ও সংগীতের ধারায়। খুব কম বয়সেই পিতাকে হারিয়ে মায়ের যত্ন ও প্রচেষ্টায় শিক্ষাসম্পন্ন করেন। কৃতীত্বের সাথে ম্যাট্রিক ও আই.এ. পাশের পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। এখানে এসেই তিনি ছাত্র থাকালীন সময়ে কবি ও গীতিকাররূপে আবির্ভূত হন এবং খ্যাতি অর্জন করেন। এই সময়েই বন্ধু মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর সহযোগে সম্পাদনা করেন কবিতা সংকলন পূর্ব বাংলার কবিতা (ঢাকা, ১৯৫৪)। ১৯৫৮ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করে অর্নাস পাশ করেন এবং এম.এ.তেও সেই অবস্থান ধরে রাখেন।
তাঁর কর্ম জীবনের সূচনা ঘটে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে। পর্যাক্রমে তিনি চাঁপাই নবাবগঞ্জ ও রাজশাহী সরকারী কলেজেও শিক্ষা দান করেন। পরবর্তীতে রাজশাহী সরকারী কলেজ থেকে চলে আসেন প্রাদেশিক সরকারের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক হিসাবে ঢাকায়। তবে সেই চাকুরিতে তিনি বেশি দিন থাকেননি। আবারও ফিরে আসেন অধ্যাপনায়। এবার যোগদেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অস্থায়ী লেকচারার হিসাবে। তার দুই বছর পরে ১৯৬৫ সালে স্থায়ী লেকচারার পদে যোগদান করে চলে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৬ সালে তিনি পি.এইচ.ডি পর্যায়ে গবেষণার জন্য পাড়ি জমান লন্ডন বিশ^বিদ্যালয়ে। অধ্যাপক টি.ডব্লিউ ক্লার্কের তত্ত্বাবধানে ‘দি বেঙ্গলি প্রেস অ্যান্ড লিটারারি রাইটিং’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনা করে ডিগ্রি লাভ করে। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে ফিরে এসে তিনি রিডার পদে উন্নতি লাভ করেন।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাক হানাদার বাহিনী আবু হেনা মোস্তফা কামালকে ধরে নিয়ে যায় এবং রাজশাহী বেতার কেন্দ্র থেকে তাদের পক্ষে কথিকা লিখতে ও পাঠ করতে বাধ্য করে। এই সূত্রে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর ভাগ্যে জুটে কয়েক দিনের কারাবাস। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ তাঁর মুক্তিলাভের বিষয়ে বিশেষভাবে চেষ্টা করেছিলেন। তারপরে সাহিত্যিক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য জনাব আবুল ফজলের বিশেষ আগ্রহের কারণে তিনি চলে আসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে ১৯৭৬ সালে প্রফেসর পদে উন্নীত হন। তার জীবনে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে দেখা দেয়। চট্টগ্রামে থাকাকালীন সময়ে ক্রমান্বয়ে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ, প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ ও পি.এইচ.ডি অভিসন্দর্ভটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। তিনি নগর চট্টগ্রামের সংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এবং বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। ১৯৭৮ সালে সেখান থেকে আবার চলে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কয়েক বছর চাকুরি করার পর ছুটি নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যু বরণ করেন। এই স্বল্প জীবনে লেখার ক্ষেত্রে যেমন ছিলেন পরিশীলিত, তেমনি পড়ার ক্ষেত্রে ছিলেন খুবই আগ্রহী সচেতন পাঠক। সে প্রসঙ্গে জানতে পারি প্রফেসর ইমেরিটাম ড. আনিসুজ্জামানের নিমোক্ত উদ্ধৃতি থেকে :
তাঁর ধী যেমন ছিল তীক্ষè, তেমনি পাঠের ক্ষেত্র ছিল বিস্তৃত। অল্প বয়সেই বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নির্মাতাদের অনেকের বহু রচনাই তিনি পড়ে ফেলেছিলেন। তিরিশের ও তিরিশোত্তর বাংলা কবিতা তিনি পাঠ করেছিলেন সযত্নে;
(আনিসুজ্জামান ও বিশ^জিৎ ঘোষ সম্পাদিত আবু হেনা মোস্তফা কামাল রচনাবলীর ভূমিকা অংশ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, মে ২০০১)
আবু হেনা মোস্তফা কামালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ আপন যৌবন বৈরী, প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ যেহেতু জন্মন্ধ বের করতে সময় নেন দশ বছর, আর তার চার বছর পরেই বের হয় তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ আক্রান্ত গজল। তাঁর কাব্যের বৈশিষ্ট সম্পর্কে প্রফেসর ইমারেটাস ড. আনিসুজ্জামান বলেন:
“কাব্য তিনটিতে যেসব ভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে , তা হলো : প্রবল ইন্দ্রিয়চেতনা; প্রকৃতি ও নারীর সৌন্দর্যের প্রতি অকর্ষণ; ভালোবাসার জন্যেÑএমন কি, যাকে তিনি স্বৈরিণী বলে জানেন, তারও ভালোবাসার জন্যে-কাতরতা এবং প্রেমিকার প্রত্যাখানের আশঙ্কা; নিংসঙ্গতা, দুঃখ ও তিক্ততার বোধ; বৈরী পরিবেশ পেরিয়ে যাওয়ার আকাক্সক্ষা; যৌবন হারানোর বা হারানোর কল্পনায় বেদনাবোধ; মৃত্যুচিন্তা; নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া কিংবা আত্মানুসন্ধান; আপন কবিসত্তাকে সর্বোপরি স্থানদান এবং কষ্টস্বীকারই যে শিল্পীর নিয়তি, তা মেনে নেওয়া বা ঘোষণা করা; শব্দের শক্তি সম্পর্কে গভীর আস্থা; কদচিৎ স্বদেশ ও সমাজ সম্পর্কে উৎকণ্ঠা; এবং কোনো কবি যা পণ্ডিতকে স্মরণ করে।” (আনিসুজ্জামান ও বিশ^জিৎ ঘোষ সম্পাদিত আবু হেনা মোস্তফা কামাল রচনাবলীর ভূমিকা অংশ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, মে ২০০১)
তাঁর কবিতা পাঠে বুঝা যায় তিনি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে কবিতা লিখতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। তবে গদ্যছন্দেও লিখেছেন প্রচুর পরিমাণে; বাদ যায়নি স্বরবৃত্ত ছন্দের সুনিপুণ ব্যবহার। আঠারো মাত্রার সমিল ও মিলহীন চতুর্দশপদী কবিতায় দেখিয়েছেন আপন মুন্সিয়ানা। তবে সনেটকে নিয়ে খুব বেশি কাজ তিনি করেননি। যা করেছেন তাঁর শিল্পমাধুর্যতা পাঠকের নজরে আনার জন্য নিম্নে একটি চতুর্দশপদী কবিতা তুলে ধরছি :
এখন সবুজ ঘাস পাড় বুনে গেছে চারপাশে;
সারাদিন রোদ ঝরে, ঝরে ফুল প্রতি জন্মদিনে
শিয়রে, শরীরে; গাঢ় মমতায় অভিভূত হাত
বাতাস বুলিয়ে যায় যখন ললাটে-মনে পড়ে
ছাব্বিশের উতরোল ঢাকা? উন্মাতাল উত্তরঙ্গ
গানের আসর? গজলের দমকা হাওয়া এলোমেলো
পুরানা পল্টনে, কিংবা অন্তহীন করতালি জন-
সভাশেষে? ছয়াচ্ছন্ন রমনার পথে পথে ঢল
নেমেছিল যৌবনের, সেইদিন রুদ্ধদ্বার ভেঙে
এসেছিলো কল্লোলিত বঙ্গোপসাগর আমাদের
জলাশয়ে; এখন সেসব স্মৃতি কিংবদন্তী; তবু
যৌবন মানেই তুমি, বিদ্রোহের ভিন্ন প্রতিশব্দ
আমাদের অভিধানে নেই, এখনো নবীন পর্যটক
জানে, তুমি যৌবনের মধ্যবর্তী অনন্ত যৌবন॥
(যৌবন মানেই তুমি, আক্রান্ত গজল)
তাঁর সংগীত চর্চার শুরু বাল্যকালে হলেও জীবিত অবস্থায় কোন গানের বই প্রকাশ করে যেতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পর শিল্পকলা একাডেমি তাঁর দুইশতাধিক গান নিয়ে সংকলন প্রকাশ করে আমি সাগরের নীল (১৯৯৫) নামে। তিনি রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সমকালীন গীতিকবিদের থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসেননি, তবে ভাব ও ভাষার দিকে তাঁর গানগুলো স্বতন্ত্র রক্ষা করে চলেছে। তাঁর এই গানগুলা চিরন্তন হয়ে থাকবে বাংলা সাহিত্যে।
শিল্পীর রূপান্তর (১৯৭৫) এবং কথা ও কবিতা (১৯৮১) শিরোনামে লিখেছেন দুইটি সমৃদ্ধ প্রবন্ধগ্রন্থ। গ্রন্থদুটিতে ঋদ্ধ মননশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রন্থদুটিতে উনিশ শতকের সাহিত্য ও তাঁর প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একজন শিল্পী যে জীবন সংলগ্ন এবং সে সমাজ ও জীবন থেকে উপাদান নিয়ে সাহিত্য চর্চা করে। আর সেই সাহিত্যের ভিত্তিভূমি হলো তার সমকাল। আর এই সমকালের জীবনকেই শিল্পী তার মনের রঙে তুলে ধরেন। তিনি নিষ্ঠার সাথে সেই সময়ের আলোচনা করেছেন। তবে বাংলাদেশের সাহিত্য বিষয়েও ছিল তার সচেতন দৃষ্টি। তার সমকালীন সাহিত্যকেও বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন নিজস্ব দৃষ্টিতে। এ প্রসঙ্গে নিমোক্ত দৃষ্টান্ত প্রনিধানযোগ্য :
প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির অভাবই ছিলো নতুন মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক বিক্ষোভের উৎস। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবিতায় সেই অসন্তোষের পরিচয় মেলে। ক্রমাগত বিপর্যয়ের আঘাতে মধ্যবিত্ত মানসের স্বপ্নাবলি কেবল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। এই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ও অভিব্যক্তি বিশ বছরের বাংলাদেশের কবিতার সাধারণ লক্ষণ।
(‘বাংলাদেশের কবিতা : দুই’; কথা ও কবিতা)
আবু হেনার ছিল অসাধারণ বিশ্লেষণ শক্তি। এবং তিনি শিল্পীর বিচারে শিল্পকে বেছে নেয়ার পক্ষে কাজ করেছেন। শিল্পীর ব্যক্তি আদর্শকে নয়। তার সৃজনশীলতা ও মননশীলতা বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে করেছে ঋদ্ধ ও প্রগতিশীল। আর এই কারণেই তিনি হয়ে থাকবেন স্মরণীয়।