শ্রেষ্ঠ কবিতা
সোলায়মান আহসান
প্রকাশক : মাতৃভাষা
প্রকাশকাল : ২০১৭
প্রচ্ছদ : মোমিন উদ্দীন খালেদ
মূল্য : ৪৫০ টাকা
প্রতিকূল এক সময়ে জন্ম কবি সোলায়মান আহসানের। সময়ের রূপ যার ভেতর রূঢ়ভাবে প্রতিধ্বনিত হওয়ার কথা। প্রত্যেক কবিতায়ই হতাশা, দুঃখ, এবং মানুষের প্রতি অনাস্থা প্রকাশিত হওয়ার কথা ।
অথচ তিনি বলছেন অজস্র সম্ভাবনা এবং প্রতিবাদ। যেন কোন আসন্ন একটা কিছু যেটা শুভকর, তা তিনি প্রত্যক্ষ করছেন। সে সম্ভাবনার কথা বলেন তিনি। সোলায়মান আহসানের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সংকলনে ‘বিরুদ্ধকামিতা’ কবিতাটি পাঠ করে তাই মনে হলো-
বৈরিতা বরং ভালো ক্রিয়াহীন মিত্রতার চেয়ে।
কিংবা মিছিল আসে কবিতায়
মিছিল আসে দূর দূরান্তের গুমঘর হতে।
এমন সাহসী উচ্চারণ কেবল একজন কবিই উচ্চারণ করতে পারেন।
সোলায়মান আহসান আশির দশকর কবি। (আমি যদিও দশকের হিসেব মানি না। তবু বাজারচাহিদা হিসেবে বলি) আশির দশকের অন্যতম প্রতিভা। উনিশশো আটষট্টি সালে ‘স্কাউট মাসিক অগ্রদূত’ পত্রিকায় লেখালেখির মাধমে সাহিত্যে তার অভিষেক। কিশোর বয়সেই মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেন। লেখাপড়া বাধাগ্রস্ত হয়। স্বাধীনতার পর আবার লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করেন। তারপর একটানা সাহিত্য ও সাংবাদিকতা। তারপর শিক্ষকতা। তারপর আবার সাংবাদিকতা। ২০১১ সালে একটি বীমা কোম্পানির উচ্চপদে থাকাবস্থায় তিনি অবসর নেন। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দাঁড়াও সকাল বিরূপতা’ দিয়েই কাব্যজগতে প্রতিষ্ঠা পান। তারপর ‘ভয় নেই জেগে আছি (২০১৬)’ দিয়ে তার পরিপূর্ণতা। এর মধ্যখানে ‘কৃষ্ণস্বর প্রত্যুষের (১৯৯১)’, ‘নক্ষত্রের বিলাসিতা (২০০৩)’, ‘শূন্য ও শূন্যতা (২০০৫)’ ‘যুদ্ধের বিপক্ষে জিঘাংসা (২০০৯)’ এ ছাড়া চারটি উপন্যাস ও দু’টি কিশোর উপন্যাস, দু’টি গল্প ও চারটি কিশোর গল্পগ্রন্থ একটি জীবনী এবং ছোটদের জন্য একটি গদ্যগ্রন্থ যা কবি ও পাঠক মহলে আলোচিত হয়েছে। এমন একজন কবি সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। যা বলবো ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ কেন্দ্রিক। প্রকাশিত সাতটি কাব্যগ্রন্থের নির্বাচিত কবিতাগুলোই এ সঙ্কলনে আছে।বইটি পড়েছি। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছি। কবির লেখালেখির শুরু যেহেতু গদ্য দিয়ে তাই গদ্যের সাবলীলতা কবিতায় লক্ষণীয়।
আমাকে যেতে হবে
উচ্চারিত শপথের শাণিত শব্দের ঝুড়ি রেখে।
(আজন্ম যাত্রা)
সুখের ব্যাপার হলো গদ্যের সাবলীলতা থাকলেও কবি তার ভাব প্রকাশে ছন্দের শক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। ছন্দে প্রকাশ করেছেন, ছন্দের সাথে থেকেছেন। বিশেষ করে প্রথম দিকে।
আমার পড়ে যেতে ভালো লেগেছে। পড়েছি এবং পড়ছি।
সমস্ত পৃথিবী জুড়ে মানবতা বড় অসহায়
বিশ্বাসী আত্মারা ম্রিয়মাণ বিরুদ্ধতায়
(একজন সৈনিকের আহবানে )
ঠিকঠাক আছে সব প্রথাবদ্ধ নিয়ম মাফিক
বঙ্গোপসাগরে ঢেউ, সাইক্লোন বিপদ সংকেত।
(উনিশশো পঁচাশি)
তৃতীয় বিশ্বের আমি এক সোলায়মান আহসান
কাটাই জীবন বড় অনিশ্চিত সার্কাসী খোঁয়াড়ে
(তৃতীয় বিশ্বের আমি এক)।
কবিতাগুলো প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দাঁড়াও সকাল বিরূপতা’ থেকে নেয়া। এখানে একই কাব্যগ্রন্থে কবি সমগ্র পৃথিবীব্যাপী তার আশা-নিরাশার বয়ান করেছেন। কিন্তু ঘুরেফিরে তার দেশ তার মাটিই তার বিশ্ব দর্শনের দর্পণ। আর এই চিন্তা ভাবনা যে আঙ্গিকে করেছেন, সেটা একজন বিশ্বাসী হিসেবে। গ্লোবালাইজেশনের যুগে একজন সচেতন মানবতাপ্রেমী তথা মুসলিম হিসেবে।
ঠিক তার শেষ কাব্যগ্রন্থে যদি আমরা দেখি-
১০ ডিসেম্বর ১৯৭১। সেদিনের ভোর ছিল ভিন্ন।
সারারাত মেশিনের মর্টারের কানে তালামারা শব্দ।
(স্বাধীনতা তোমাকে পেলাম)
আরেকটি কবিতা-
প্রিয় ভাৎসারোভ! পৃথিবীতে চলছে আজ মাৎসন্যায়।
পুঁঁজির লড়াই চলছে। …
বন্দুকের নলের ভেতর থেকে বের হওয়া অশ্রাব্য বুলেটের শব্দ
থেমে থেমে গোটা বিশ্বের শান্তিকে করেছে বিনষ্ট।
(বিপ্লবী কবি ভাৎসারোভকে স্মরণ করে)
এখানেও দেশ, দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ধারণ করেছেন, তথাপি সমগ্র বিশ্বের ভালোমন্দ, যুদ্ধ আগ্রাসন, পুঁজিবাদ, মুসলিমদের প্রতিনিয়ত পরাজয় কবিচিত্তকে ব্যথিত করছে।
আমরা যদি কবি ইকবালের কবিতা পাঠ করি তবে দেখি তার কবিতায় একটি বাণীই বিভিন্ন ভাবে উচ্চারিত হয়েছে। আর তা হলো মুসলিমদের আত্মজাগরণ। কিন্তু তিনি তার কথাগুলো কখনো অভিযোগ, কখনো উত্তর, কখনো প্রাচ্য কখনো দেশ কখনো সফর আবার কখনো নসিহতের সুরে বলেছেন। আর প্রত্যেকটা কাব্যগ্রন্থই একেকটা ধরনের আলোকে সংকলিত ও প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে একই কথা ফররুখ আহমেদের ক্ষেত্রেও। আশির দশকের কবি সোলায়মান আহসানের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য নয়। কারণ আমরা দেখলাম তার শুরু থেকে অদ্যাবধি প্রতিটি কাব্যগ্রন্থই একটি ভূগোলের সংবাদের মতো। প্রথম বইতে যেমন দেশ ও বিশ্ব শেষ বইটিতেও তার বিচরণ ক্ষেত্র একই। অর্থাৎ গোটা পৃথিবীটাই যেন তার একই সময়ের বিচরণ ক্ষেত্র। আধুনিক বিশ্বে মিডিয়ার যে অতিমাত্রায় প্রসার, তার প্রতিফলন সমাজে পড়েছে। একজন কবি এটা এড়িয়ে যেতে পারেন না। সোলায়মান আহসান তার চিন্তা চেতনায় একই রেখায় ছিলেন, আছেন; বিচ্ছিন্ন হননি।
তবে পার্থক্য হলো প্রথমদিকের কবিতাগুলোয় সোলায়মান আহসান নিষ্ঠার সাথে ছন্দের বৃত্তে বসত করেছিলেন। কিন্তু শেষ দিকে এসে তিনি ছন্দের বেড়া টপকে পুরোদস্তুর গদ্য কবিতায় এসে যান। এটাও সত্য যে তিনি তার গল্প উপন্যাসগুলোর বেশিরভাগ শেষ দিকে লিখেছিলেন।
তবে মোটের ওপর সোলায়মান আহসানকে পাঠ করে আমার যা বোধগম্য হয়েছে, তা হলো- সোলায়মান আহসানের কবিতায় তিনটি বিষয় ঘুরে-ফিরে এসেছে। বা তিনটি বিষয় তার কবিতায় প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছে।
এক. দ্রোহ/ প্রতিবাদ
মিছিল আসে দূর দূরান্ত হতে
মেকি সভ্যতার মুখে পেচ্ছাব ঢেলে
(মিছিল আসে)
আপাতত কিছু রসদ জোগাড় করো
সমূহ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে পারো তো নিজেকে স্থিতদি করো
(একটা খসড়া ইসতেহার)
কি লেখা যাবে কি লেখা যাবেনা
তার একটা তালিকা আমাকে দেবেন?…
কি লিখলে আপনাদের পত্রিকার মেশিন বন্ধ হবে না
কি লিখলে কারো বাড়া ভাতে ছাই ছিটানো হবে না
(লেখার তালিকা চাই)
দুই. বিশ্বাস/ আশাবাদ
এখন চেঁচাও সবে, নারা দাও আত্ তাকবির
পৌঁছে যাক মর্মাবধি রয়েছে যে সর্বশেষ ঘুমে।
হয়নি কাতারবন্দি গৌরবের এই রণভূমে
কালের দোলক দেয় ঘণ্টাধ্বনি- দাঁড়াও হে বীর।
(ডাক দিয়ে যায়।)
কি হবে সন্ধিতে বলো আল্লাহদ্রোহীদের সাথে
বরং স্মরণ করো বদর, তাবুক, হুনায়েন
(ফিলিস্তিনিদের প্রতি)
আমরা হয়েছি যুথবদ্ধ কতিপয় ঘোড়সওয়ার
সভ্যতার পাদপীঠে শিরস্ত্রাণ মস্তকে উড্ডীন
পূর্বসুরিদের পথে সিঁড়ি বেয়ে উঁচিয়ে সঙ্গিন
মৃত্যু হিম তাড়নায় যাইনি কুঁকড়ে বারবার
(আশির দশক)
তিন. এবং গৌণ প্রেম
তোমাকে দেখিনি কভু-হয়নি বিমুগ্ধ আলাপন
তবু মনে হয় যেন প্রিয়চেনা পরিচিত খুব;
হৃদয় সেতারে যায় আঙুলের স্পর্শ চুপচুপ
(নক্ষত্রের বিলাসিতা-৭)
নিজেকে আমি লুকিয়ে কেবল রাখি
ভুল করে তবু তোমার কাছেই যাই
হয় না বলা সেই সে কথাটাই
করি না শব্দ আত্মমগ্ন থাকি।’
(প্রিয় কথা)
গৌণ প্রেম বলার কারণ হলো- কবির প্রেম কোথাও ‘দেহের দেউড়িতে বেড়াতে আসিয়া আর নেহি বো ওয়াপাস গেয়ি’ কিংবা ‘দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা উপশিরা’ হয়নি। বরং ‘সিতারার মতো লাইলী তোমার নাম’ এ মুগ্ধ ফররুখের মতোই নিভৃতে গেয়েছেন। কেন এভাবে গাইলেন? কৈফিয়ত নিজেই দিয়েছেন-
প্রিয়তমা,
রাস্তার পারে ক্রলিং করে করে
আমি বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছি,…
অন্ধকার ঘিরে ধরছে আমাকে
অক্ষরগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসছে…
প্রিয়া আমার
কাল সোনালি ভোরে জয়ের নিশান হাতে
আমি আসছি প্রিয়তমা, আমি আসছি…
‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বলতে মূলত নির্বাচিত কবিতা। আল মাহমুদের ভাষায়- একজন কবি তার কিছু কবিতাকে শ্রেষ্ঠ বলে অন্যগুলোকে চলতি পদ্যের পর্যায়ে নামিয়ে দিতে পারেন না।’
সোলায়মান আহসানও একই কথা ভূমিকায় তার নিজের মতো পুনরাবৃত্তি করেছেন- ‘শ্রেষ্ঠ বা নির্বাচিত অভিধায় কবিতাকে শনাক্ত করা এক দুরূহ কাজ।’ তবু শ্রেষ্ঠ কবিতার মাধ্যমে সহজেই একজন কবিকে পূর্ণাঙ্গ না হলেও অনেকটা পাঠকরে ফেলতে পারেন। সমগ্র পাঠ করা ও আবিষ্কার করা ততো সহজ নয়। যান্ত্রিক সভ্যতা। ব্যস্ততা বেড়েই চলছে। সুতরাং এটা মহৎ প্রয়াস। তবু শ্রেষ্ঠ কবিতা বা নিবাচিত কবিতার প্রসঙ্গ যখন তখন পাঠক হিসেবে কিছু প্রশ্ন আমার থেকে গেল। ‘ইনিদ্রয়াতীত’ কবিতাটি কবি ফররুখ আহমেদকে নিয়ে রচিত-
কালো শেরোয়ানী পরা মাথায় কিস্তি টুপি…
আগন্তুককে আমি কোথায় যেনো দেখেছি
ঊনসত্তরের বক্তৃতা মঞ্চে?
চুয়াত্তরের ফুটপাতে?
পঁচাত্তরের বিজয় মিছিলে?
কবিতাটি আল মাহমুদ রচিত ‘ফররুখের কবরে কালো-শেয়াল’ কবিতাটির অনুকরণ বলে মনে হয়েছে।
মনে হলো শেয়ালটাকে আমি চিনি, আগে কোথাও দেখে থাকব।
একবার বিদ্যাপতির স্মৃতিমন্দিরে অনেকগুলো শেয়াল দেখেছিলাম
এ শেয়ালটা সেখানে ছিল না
(ফররুখের কবরে কালো শেয়াল : মায়াবী পর্দা দুলে ওঠে)
এবং আমার মনে হয়েছে- সোলায়মান আহসানের কবিতায় স্যাটায়ার শেষ পর্যন্ত স্যাটায়ারের ধারালো ভাব ধরে রাখতে পারেনি। এটা দুর্বলতা নয়, সম্ভবত এটা তার নিভৃতচারী-মৃদুভাষিতার প্রভাব। তবু সব কিছুর শেষে কথা এই যে তার কবিতায় স্বাতন্ত্র্যতা রয়েছে। তিনি আশির দশকের অন্যতম প্রধান ও স্বতন্ত্র কবি। কণ্ঠস্বর।