
প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ
যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল শহরের কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগর সংলগ্ন পিজিট সাউন্ড নামে পরিচিত এক জলভাগে আছে হাতে গোনা কয়েকটি ছোট্ট ছোট্ট দ্বীপ। এগুলোর মধ্যে আকার আয়তনে সামান্য বড় ভ্যাসন দ্বীপে আমি ও হলেণ আমাদের ছোট্ট মেয়ে কাজরিকে নিয়ে এসে পৌঁছেছি দিন দুয়েক আগে। এখানে আসার আগে আমরা বছর পাঁচেক কাটিয়েছি লাওস নামে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার একটি সল্প পরিচিত দেশে। ভ্যসন দ্বীপে হলেণের পরিচিত কয়েকজন বন্ধুবান্ধব আছেন। আমরা তাদের সহবতে দ্বীপটিতে ঘোরাফেরা করে সময় কাটাচ্ছি। এ দ্বীপে পর্যটক নন্দিত দর্শনীয় স্থানের সংখ্যা খুবই কম, তবে জলে ভাসা ডাঙ্গাটিতে প্রাকৃতিক সম্পদ প্রচুর। আজ বেলা একটু পড়ে আসতেই আমরা কন্যা কাজরিকে নিয়ে সৈকতের দিকে রওয়ানা হই।
সমুদ্র সৈকতে বেশ কিছু সূর্যস্নানার্থীর আগমন হয়েছে। আমরা জুতা খুলে নুড়িপাথর ও বালুকা মাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলে আজকের সঙ্গী হলেণের বন্ধু ডেভিড জলে নাও ভাসানোর জন্য আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হন। আমরা ভেঙ্গে পড়া ঢেউ এর প্রান্ত ঘেঁষে হেঁটে যেতে যেতে নীলাভ নোনাজল স্পর্শ করি। সূর্যালোকে ছলকে যাওয়া সাগরের পানি এমন হিম হয়ে আছে যে, আন্দাজ করি এখানে ডুব দেয়া দুরূহ হবে। জলে ভাসে পাল তোলা নৌকা ও বেশ কটি কায়াক। ডেভিড এখন তার নাওখানা টেনে জলে নামিয়ে তাতে পাল জুড়ে দিতে চেষ্টা করছেন। আমরা সৈকতের বালুকায় আধশোয়া বা ইজিচেয়ারে বসা সূর্যস্নানরতদের দিকে তাকাই। চেষ্টা করি একটি স্পট্ খুঁজে বের করতে, যেখানে নিরিবিলিতে প্লাস্টিকের মাদুর বিছিয়ে বসে তরঙ্গের উতাল পাতাল দেখা যাবে। চারদিকে ইতিউতি তাকাতে হঠাৎ করে লক্ষ্য করি, গতকাল ফেরি জাহাজে দেখা হওয়া সাদা লাঠি হাতে মাঝ-বয়সী লোকটিকে। মানুষটি বালুতে মাদুর বিছিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে শুয়ে আছেন। আমি হলেণকে তাঁর উপস্থিতির কথা বলি। সে সাথে সাথে ওদিক পানে গিয়ে তাঁকে গ্রীট করতে চায় । কিন্তু সে বালুকায় মাদুরের উপর চাদর বিছিয়ে আয়েশ করে সূর্যস্নানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই, একটু হেঁটে গিয়ে আমিই তাকে ‘হ্যালো হাউ ইজ সান টুডে’ বলে সম্ভাষণ করি। ভদ্রলোক মনে হয় কানের কাছে ছোট্ট ট্রানজিসটার রেডিওটি রেখে নিউজ শুনছিলেন। আমাদের সাড়া পেয়ে তা বন্ধ করে উঠে আধশোয়া হয়ে বসে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিকে চেয়ে শূন্যতায় কিছু একটা শুঁকেন। তারপর হেসে বলেন, ‘হাই বাংলাদেশী, হোয়ার ইজ ইয়োর বিউটিফুল ওয়াইফ? ইজ সি হাইডিং বাহাইন্ড ইউ?’ হলেণ সত্যি সত্যিই আমার পেছন পেছন নিঃশব্দে এসে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়েছে। সে ওখান থেকে রিনঠিন করে হেসে ওঠে। আমরা বালুকায় শুয়ে থাকা মানুষটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে একটু আধটু কথাবার্তা বলি। আজকের আবহাওয়ার কথা উঠতেই তাঁর মুখখানা উজ্জ্বল হয়ে উঠে। তিনি আলগোছে রিমার্ক করেন, ‘ওয়ান মোর ভেরী প্রিটি ব্রাইট সানী ডে।’ তারপর অনুযোগ করেন, ‘এবারের সামার তো প্রায় মেঘে মেঘে কাটলো। উই ডিড নট হ্যাভ টু মেনী ব্রাইট সানী ডেইজ।’ হলেণ তাঁর কথা শুনতে শুনতে কপালে হাত রেখে দিগন্তের দিকে তাকায়। অতঃপর একটু বিষণ্ণ হয়ে সে বলে,‘ বাট আই ডোন্ট সী মাউন্ট রেঁনেয়ার ইন দি হোরাইজন।’ মানুষটি যেন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এমনভাবে বলেন, ‘হ্যাভ সাম পেসেন্স গার্ল। আরো ঘন্টা দেড়েক যাক। সূর্যালোক যখন তেরছা হয়ে জলে পড়বে, আই টেল ই- দিগন্তে তখন ঠিক ঠিকই মাউন্ট রেঁনেয়ার ভেসে উঠবে।’

সৈকতে বালির কেল্লা
আকাশ জুড়ে ক’টি হাঁস ক্রং ক্রং করে ধাতব আওয়াজ ছড়িয়ে চক্রাকারে উড়লে হলেণ বলে উঠে, ‘দে আর অ্যা বাঞ্চ অব ফাইন কানাডিয়ান গিজ।’ সাদা লাঠি মানুষটি এবার রীতিমত দাঁড়িয়ে পড়ে, কপালে হাত রেখে, খোলা দৃষ্টি মেলে আকাশের ভাসমান মেঘমালার পানে তাকান। তারপর বালির দিয়ে মুখ ফিরিয়ে মনযোগ দিয়ে শুনেন পাখির ডাক। তিনি মাদুরে বসতে বসতে বলেন, ‘এগুলো সব শিশু কানাডিয়ান গিজ। দে আর জাস্ট বেবীজ, এ বাচ্চা হাঁসগুলোর এ দ্বীপেই এদের জন্ম। এরা মাইগ্রেট করার মতো এখনো ম্যাচিত্তর হয়নি। এখন তারা লাগাতার উড়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।’ দেখতে দেখতে কানাডিয়ান গীজের কম-বয়সী বাচ্ছাগুলো এবার নীচু হয়ে আমাদের উপর দিয়ে উড়ে যায়। হলেণ এক্সাইটেড হয়ে বলে ওঠে, ‘লুক দু’টি এ্যাডাল্ট পাখি ইয়ংদের উড়া শেখাচ্ছে।’ আমি তার মন্তব্য অনুসরণ করে অবাক হয়ে দেখি,‘ সত্যি সত্যি এক জোড়া বড়-সড় মরালের পেছন পেছন উড়ছে পাঁচটি সংক্ষিপ্ত ডানা ছোট্ট শিশু মরাল।’ মাদুরে শুয়ে শুয়ে ভদ্রলোক চারদিকে হাতড়ান। সাদা লাঠিটি নেড়ে চেড়ে, তা দিয়ে স্পর্শ করে অবশেষে ট্রানজিসটার রেডিওটি খুঁজে পেয়ে তা অন করতে করতে তিনি আমাদের বলেন, ‘হোয়ার ইজ ইয়োর ডটার নাও? আই ক্যান্ট সী হার? তোমাদের মেয়েটি কোথায়? না, সে এখানে নেই, আমি তার উপস্থিতি অনুভব করতে পারছি না।’ আমার ও হলেণের ভেতরে এক সাথে কিছু হারিয়ে ফেলার অনুভূতিতে ধ্বক্ করে ওঠে। আমরা তাঁকে কোনরূপ বিদায় সম্ভাষণ না করেই উঠে পড়ি। চারদিকে নোনা নীল জল, সৈকতে ছড়ানো ছিটানো সূর্যস্নানরতদের শোয়া, বসা ও কথোপকতনরত প্রায় নগ্নদেহরাজি। আধভেজা বলিতে ছড়িয়ে আছে সবুজ শ্যাওলা এবং প্রচুর পরিমাণে জলজ গুল্ম। আমরা ভাঙ্গা ঝিনুক ও মৃত তারা-মাছ এসব এড়িয়ে জলের ধার ঘেঁষে হাঁটি। আমাদের উদ্বেগ বাড়তে থাকে। আপাত দৃষ্টিতে সীবিচের কোথাও আমাদের ছোট্ট মেয়ে কাজরিকে দেখতে পাই না।
বেশ কিছুক্ষণ উদ্বেগে ভারাক্রান্ত হয়ে খোঁজাখুঁজির পর আমাদের মেয়েকে অবশেষে পাওয়া যায়। সৈকতের এক প্রান্তে কোমরে হাত দিয়ে কাজরি দাঁড়িয়ে আরো তিনটি সমবয়সী ছেলে মেয়েদের সাথে কথাবার্তা বলছে। তার হাতে বেতের তৈরী লাওস দেশের বল। একটি ছোট্ট ছেলে তারস্বরে তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘হোয়াট কাইন্ড অব বল ইজ দিস?’ সে সমস্বরে গলা চড়িয়ে জবাব দেয়, ‘দিস ইজ ফ্রম দি কানট্রি অব লাওস। ডু ইউ ওয়ান্ট টু লার্ন হাউ টু প্লে লাও স্টাইল ফুটবল? ইউ হ্যাভ টু প্লে উইথ ইয়োর ফুটস এন্ড ল্যাগস অনলি।’ আরেকটি তার সমবয়সী ছোট্ট মেয়ে এবার জানতে চায় , ‘হোয়ার ইজ লাওস? ইজ দিস অ্যা কানট্রি? অর হোয়াট? অ্যা সিটি?’ কাজরি ঘুরে হলেণের দিকে চেয়ে বলে, ‘মামী, টেল দেম হোয়ার ইজ লাওস?’ বিষয়টি জমে উঠছে দেখে আমি তাদের ওখানে এখানে রেখে সৈকতে আরো খানিকটা হাঁটাচলা করতে মনস্থ করি। হলেণের সাথে চোখাচোখি হতেই সে ইশারায় আমার একাকী এক্সপ্লোরেসন অনুমোদন করে। সৈকতে বাচ্চারা বালু খুঁড়ে দেয়াল , অলিন্দ ও টাওয়ারের নক্সা এঁকে তাতে জলজ গুল্ম গোঁজে দিয়ে স্যান্ড-ক্যাসোল বা বালুকেল্লা তৈরী করছে। আমি বালির কেল্লাগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটি। বেইদিং স্যুট পরা এক তরুণী কেল্লাটির ভেতর মহলের মিনারে ঝিনুকের পাথর বসাতে বসাতে রোদচশমার ফাঁক দিয়ে আমাকে দেখে। তার বালুকেল্লার দোরগোড়ায় বসে আছে রক্ত মাংশের এক বুলডগ। আমি প্রকান্ড সারমেয়টির চোখে সংশয় দেখে অন্যদিকে চোখ ফেরাই। এদিকে সৈকত তরঙ্গে প্লাবিত হতে হতে সার্প বাঁক নিয়েছে। আমি পাথর খন্ডের উপর দিয়ে সাবধানে হেঁটে হাঁটু অব্দি জলে ডুবিয়ে অন্যদিকে চলে আসি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভিন্ন এক সৈকতে।

মাউন্ট রেঁনেয়ারের ধবল চূড়া
এদিকটা তুলনামূলকভাবে নির্জন। আমি একটি ভেসে আসা গাছের গুড়ির উপর দাঁড়িয়ে সমুদ্র্রের ঢেউয়ের তাড়নে থেকে থেকে দুলে ওঠা নোনাজলের দিকে তাকাই। তরঙ্গের প্রান্ত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অল্প-বয়সী এক দম্পতি। তারা দুজনে হাতে ধরে আছে খাঁচার মতো দেখতে একটি দোলনা। দম্পতি ধরাধরি করে দোলনাটি শুকনো বালিতে রাখে। এবার আমি দোলনার ভেতরে ছোট্ট এক শিশুকে ছটফট করতে দেখি। শিশুটি রেলিং ধরে উঠে বসে মা-বাপের দিকে চেয়ে হাসে। মা বাচ্চার হাতে ঝুনঝুনি জাতীয় খেলনা তুলে দেয়। বাচ্চাটি বার কতক জোরে ঝুনঝুনি বাজিয়ে তা আবার ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলে দিয়ে পিতামাতার দিকে চেয়ে হাসে। বাপ ঝুনঝুনি আবার বাচ্চাটির হাতে তুলে দিলে সে আগের মতো তা বাজিয়ে আবারও ফেলে দেয়। বাপ এবার মা-এর দিকে চেয়ে দু’হাত দিয়ে অঙ্গভঙ্গি করে কিছু বলে। তরুণী মা-টি পোশাক খুলতে খুলতে দু’হাত দিয়ে শূন্যে নানা রকমের আকার আকৃতি ও প্রতীক এঁকে জবাব দেয়। তারা দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে নিঃশব্দে হাসে। বাচ্চাকে ঝুনঝুনি আরেক বার তুলে দেয়া হয়নি, তাই শিশুটি সে সমস্ত শরীর ঝাঁকিয়ে বো বো শব্দ করে বাপ-মাকে আকৃষ্ট করতে চায়। বাপ আবারো ঝুনঝুনি তুলে দিয়ে তার স্ত্রীকে দু’হাতের ইশারায় কিছু বলে। তরুণী এখন সমুদ্রস্নানের উদ্যোগ নিচ্ছে। সে দেখতে আপাতদৃষ্টিতে তেমন একটা সুশ্রী না। খানিক পৃথলা গোছের শরীর দুলিয়ে এবার সে হেঁটে গিয়ে জলে নামে। তার চলিষ্ণুতায়, অথবা জলের ছোঁয়ায় মেয়েটির অঙ্গে ফুটে ফলন্ত কুমড়ো লতাটির মতো এক ধরণের ডুগডুগে তারুণ্য। সে এবার হিম-শীতল জলে সাঁতার কাটছে। সাঁতরাতে সাঁতরাতে সে তার স্বামী অথবা পুরুষ সঙ্গীর দিকে চেয়ে ক্রমাগত হাত ও আংগুলের ইশারায় কথা বলে চলছে। বেশ কিছুক্ষণ তাদের পর্যবেক্ষণ করতে করতে- আমি যেন তাদের সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ বা সাংকেতিক ভাষা বেশ বুঝতে পারি। মনে হয়, মেয়েটি তার পুরুষ সাথীকে জলে নামতে প্ররোচিত করছে। পুরুষ টিসার্ট খুলে ঘুরে দাঁড়ায়। আমি এবার পরিষ্কারভাবে তার মুখ ও প্রোফাইল দেখতে পাই। তীব্র সূর্যালোকে বালিতে তার দীর্ঘ ছায়া পড়ে। তার ছায়া-শরীরকে গ্রীক ভাস্করের গড়া মার্বেলের মূর্তির মতো ঋজু মনে হয়। পুরুষটি এবার আমার দিকে পেছন ফিরে সন্তরণরতা স্ত্রী অথবা তার বান্ধবীকে সাইন ল্যাঙ্গোয়েজের সংকেতে কিছু বলছে। আমি তার হাতের নড়াচড়ার ছায়ার দিকে তাকিয়ে তার বক্তব্য পড়তে চেষ্টা করি। মনে হয়, সে ঠান্ডার দোহাই দিয়ে জলে নামতে চাচ্ছে না। দোলনা থেকে বাচ্চাটি তারস্বরে বো বো করে তাদের নজর আকর্ষণ করতে চায়। শিশুর কন্ঠের আওয়াজ শুনে আমার মন কেন জানি খুশি হয়ে ওঠে।

দ্বীপের সমুদ্র সৈকত
সৈকতের এদিকে বালিতে বিস্তর ধারালো নুড়িপাথর। খালি পায়ে হাঁটতে বেশ কষ্ট হয়। তাই আমি বুড়ো আংগুলের উপর ভর দিয়ে ডিগি দিয়ে দিয়ে হাঁটি। এরকম খানিক চলতেই বালির আস্তরণ হয়ে আসে আবার মসৃণ ও সাদাটে। সৈকতটি এখানে শেষ হয়েছে। এদিকে তেমন কেউ নেই দেখে যেই ফিরে যাবো ভাবছি, হঠাৎ করে নজরে পড়ে, বেশ দূরে বালিতে অর্ধেক শরীর সেঁদিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে এক যুবতী। মেয়েটির বালিতে ঢাকা নিম্নাঙ্গের কাছে উবু হয়ে বসে কি যেন করছে কৃষ্ণাঙ্গ এক তরুণ। বিষয়টি আরেকটু কাছ থেকে না দেখে যেতে ইচ্ছা হয় না। তাই মৃদু পায়ে আগ বাড়ি। মেয়েটির বালিতে সেঁদানো কোমর ও নিম্নাঙ্গকে মৎস্যকন্যার শরীরের মতো মনে হয়। কদমছাঁট চুলের কালো ছেলেটি তার পায়ের কাছে বসে ভাঙ্গা ঝিনুকের টুকরা দিয়ে শিল্পীর নিষ্ঠায় বালুকায় এঁকে যাচ্ছে মাছের আঁশ। মেয়েটি আধ শোয়া হয়ে চেয়ে আছে দূরের নীল জল ছোঁয়া দিগন্তের দিকে। আমি তার দিকে তাকাতেই- সে হেসে বলে উঠে, ‘আর ইউ হেভিং ফান ইন দিস আয়ল্যান্ড?’ আমি মেয়েটির কাঁধ ছেয়ে নেমে আসা পার্পোল বর্ণের চুলের দিকে তাকিয়ে এবার আর তাকে চিনতে ভুল করি না। এ মেয়েটির নাম আবাগেইল। ভ্যাসন দ্বীপে আসার দিন ফেরিঘাট থেকে তার গাড়িতে সে আমাদের লিফ্ট দিয়েছিলো। তাই সৌজন্যবশত বলি, ‘হাই আবাগেইল। আই থট ইউ আর অ্যা রিয়েল মারমেইড। তোমাকে সত্যি সত্যিই মৎস্যকন্যার মতো দেখাচ্ছে।’ কালো ছেলেটি তার ঊরুর কাছে বালিতে মৎস্যকন্যার আঁশ আঁকতে আঁকতে বলে, ‘সি ইজ অ্যা মারমেইড। ইজ নট সী?’ বলেই ছেলেটি তার ঊরুর নীচের বালুকায় আঁকিবুকি করে মাছের পুচ্ছের শেইপ্ দেয়। আবাগেইল কাতুকুতুতে খিল খিল করে হেসে ওঠে। তার বুকে ভেজা বালি দিয়ে তৈরী কাঁচুলিটি ঝুর ঝুর করে ভাঙ্গে। আমি এবার সৈকতে শুয়ে থাকা অর্ধেক মাছ ও অর্ধেক নারী শরীরের দিকে প্রশংসাসূচক ভাবে তাকাই। ঈষৎ তেরছা হয়ে আসা সূর্যালোকে তার দুই ভুরুতে বেঁধানো রূপালি আংটি ঝক ঝক করে উঠে। আমি স্বগত ভাবে বলে ওঠি, ‘ইউ আর ভেরী প্রিটি আবেগেইল।’ আবাগেইল তার গ্রীবা ঈষৎ বাঁকা করে বলে, ‘ইয়েস আই অ্যাম। ডু ইউ হ্যাভ অ্যা ক্যামেরা? ইউ ওয়ানা টেক অ্যা পিকচার অব মি?’ কথোপকথনে ভেঙ্গে পড়ে আরেক চাকলা বালি। আমি ঈষৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্যামেরাহীনতার কথা জানাই। সে ঠোঁট গোল করে কৃত্রিম আফসোসের অস্ফুট ধ্বনি করে।
হেঁটে সৈকতের মাঝামাঝি কাজরি ও হলেণের কাছে ফিরে আসি অবশেষে। তাদের চারপাশে এখন গোটা পাঁচেক শিশু ও এক জোড়া বয়স্ক। মনে হয়, সকলে নীচু হয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখছে। হলেণ হাতে শামুকের ভাঙ্গা খোল নিয়ে বালিমাটিতে জানু বিড়িয়ে বসে। বালুকার মসৃণতা জুড়ে আঁকা অনেকটা বিশ্বম্যাপের আকৃতি। থাইল্যা›ড, চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মাঝামাঝি ছোট্ট ভূভাগে বেশ কতগুলো ঝিনুক বসিয়ে ইংরেজী হরফে লেখা লাওস। একটি মেয়ে-শিশু জানতে চায়, ‘ডু দে হ্যাভ এমিউজমেন্ট পার্ক অভার দেয়ার ইন লাওস?’ কাজরি জবাব দেয়, ‘নো, নট রিয়েলি, বাট দে হ্যাভ অ্যা লট অব টেম্পোলস্ দেয়ার। ইউ ক্যান প্লে, রান আরাউন্ড ইন দ্যা টেম্পোল গ্রাউন্ড। দে হ্যাভ গ্রীন রাইস ফিল্ডস্ এজওয়েল। কিডস্ রাইড ওয়াটার বাফেলো ওভার দেয়ার।’ শিশুদের মহিষের পিটে চড়ার বর্ণনা শুনে বাচ্চাদের মধ্যে আশ্চর্য্য বোধক ‘ওয়াও’ ধ্বনি উঠে। কাজরি হলেণকে বালিতে জাহাজ এঁকে দিতে বলে। শামুকের ভাঙ্গা খোল নিমিষে পটুয়ার তুলিতে রূপান্তরিত হয়। হলেণের হাতের আঁচড়ে ক্রমশ ফুটে উঠে সমুদ্রগামী জলযানের রূপরেখা। কাজরি বালুতে আঁকা জাহাজটি দেখিয়ে সকলকে বলে,‘ ইউ নো দিস শিপ ইজ ব্রিংগিং অল মাই টয়জ। মাই স্টাফড্ খরগোস, কাকাতুয়া, হরিণ, মাই পুতুল বর্বিজ, এন্ড এডভিথিং এ্যজ ইজ কামিং বাই দিজ শিপ। বাট উই ডুন্ট হ্যাভ অ্যা হাউস ইন আমেরিয়া টু কিপ অল দিজ স্টাফ।’ একটি শিশু এবার জানতে চায়, ‘ইজ দি ক্যাপটেন অব ইয়োর শিপ ভেরী কেয়ারফুল? দেয়ার ইজ অ্যা লট অব পাইরেটস আপ ইন দ্যা হাই-সি।’ সমুদ্রে পাইরেট বা জলদস্যুর উপদ্রবের কথা শুনে কাজরি সহসা কোন জবাব দিতে পারে না। সে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেÑ জাহাজের ক্যাপটেন সাবধানী কি না? সে কি জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে তার খেলনাগুলো? আমি তাকে আশ্বস্ত করি । শিশুটি আবার কমেন্ট করে, ‘ওয়াচ আউট ফর দ্যা পাইরেটস। দে আর ক্রেইজি। হুঁশিয়ার জলদস্যুরা বেজায় উদ্দাম।’
পড়ন্ত বেলার সূর্যালোক বাঁকা হয়ে আসতেই সৈকতে যেন হুড়াহুড়ি পড়ে যায়। অনেকে তাদের ইজিচেয়ার, ম্যাট ও মাদুর ইত্যাদি দিগন্তমুখি করে রিএডজাস্ট করে। আমরা বালিতে বসে ফেনায় ফেনায় নৃত্যরত সূর্যালোক দেখি। এক ঝাঁক মরাল পংক্তি বেঁধে উড়ে যায় দিগন্তের দিকে, যেখানে মেঘমালা নীলাভ হতে হতে পরিবর্তিত হয় গোলাপীতে। কিছু কিছু ভাসমান মেঘখন্ড এবার রূপান্তরিত হয় অরেঞ্জ ও ক্রিমসন বর্ণে। সাদা লাঠি হাতে মানুষটি বোধ করি ফিরে যাচ্ছেন ঘরে। তার মাদুর ভাঁজ করে বগলে গোঁজা। অন্য হাতে তিনি ধরে আছেন ছোট্ট ট্রানজিসটার রেডিওটি। লাঠি দিয়ে হাতড়াতে হাতড়াতে তিনি ধীরে ধীরে পথ চলেন। চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে, লাঠি দিয়ে বালুতে পড়ে থাকা মৃত তারামাছের দেহটিকে খোঁচান। তারপর কিসের যেন অপেক্ষায় চেয়ে থাকেন দিগন্তের দিকে। আমাদের কানের কাছে খিলখিল হাসির রিনিটিনি ঝংকার বাজে। আমি ঘাড় ফিরিয়ে তাকাই। কৃষ্ণাংগ ছেলেটি চামচে ভাজা মাছ তোলার মতো দু’হাতে বয়ে নিয়ে আসছে আবাগেইলের বালুকাময় দেহ। মেয়েটি বুঝি ঈষৎ কাতুকুতুতে ক্রমাগত খিলখিলিয়ে চলছে। কদমছাঁট চুলের ছেলেটি বর্তনে ফিশফ্রাই তুলে দেয়ার মত করে আবাগেইলের শরীর সৈকতে স্থাপন করে। আবাগেইল এবার বসে পড়ে জলে ভেজা কুকুর যেরকম শরীর ঝাঁকিয়ে জল ঝরায়, সেরকম ঝাঁকি দিয়ে দেহ থেকে বালি ঝরাচ্ছে। কাজরি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, ‘ডু ইউ নো হাউ টু সেইল অ্যা বোট?’ আমি নিজের অক্ষমতা তার কাছে গোপন করি না। সে আবার কথা বলে, ‘বাট মামী নোজ হাউ টু সেইল অ্যা বোট। উই ক্যান টেইক গ্র্যান্ড পা’জ বোট এন্ড সেইল অল দ্যা ওয়ে টু লাওস।’
আমি পাল তোলা নায়ে চড়ে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে, অবশেষে মেকং এর জলধারায় ভেসে লাওসে ফিরে যাওয়ার আইডিয়াটি নিয়ে ভাবি। আমাদের চোখে সামনে মেঘের রঙ দ্রুত বদলায়। জলে ভাসমান কায়াক ও ছোট নৌকাগুলো একে একে ফিরে আসছে জেটিতে। কেবলমাত্র একটি নৌকা দূরের জলে আনমনা ভাসে। নাওটির পাল গোটানো। হালে বসে ডেভিড স্মোক করে চলেছেন তার বাঁকানো পাইপ। রঙ্গমঞ্চের কার্টেনের মত দুপাশে মেঘের স্ক্রীন সরে যেতে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে মাউন্ট রেঁনেয়ারের তুষার-শুভ্র চূড়া। হলেণ ধবল গিরিটির দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ‘অ্যসম! দ্যাটস অ্যা প্যানোরমা আই মিসড ইন লাওস।’ সত্যিই লাওসে ধানের ক্ষেতে বাতাস বয়ে যায় বটে, তবে আমরা সেখানে আমরা কখনো তুষার ধবল পাহাড়ের শুভ্র চূড়া দেখিনি।