একটি বছর শেষে আমরা নতুন আর একটি বছরে পদার্পণ করেছি। নতুন আশা ও স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও জাতীয় জীবনে সার্বিক সংকট আরো বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি সংকটের সঙ্গে আছে সম্ভাবনা; হতাশার মূলেই মুক্তির বীজতলা। বছরের শুরুতে আমরা প্রকাশ করছি ‘শীত সংখ্যা’।
আমরা মনে করি ‘প্রগতি ও পরিবর্তন এক নয়। পরিবর্তন আপনিতেই ঘটে এবং তা মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা নিরপেক্ষ। পৃথিবীতে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। অপরদিকে প্রগতি মানবীয় ব্যাপার- মানুষের ইচ্ছাসাপেক্ষ, অর্জনসাপেক্ষ, প্রয়াসসাধ্য। গতি ও প্রগতি সম্পর্কেও একই কথা। সবকিছুই গতিশীল, কিন্তু সবকিছুু প্রগতিশীল নয়। প্রগতিতে সর্বাধিক সংখ্যক লোকের সম্ভবপর সবচেয়ে বেশি কল্যাণ বাঞ্ছনীয়। অগ্রগতি না থাকলে, বিকাশ না থাকলে, উৎপাদন সৃষ্টি ও বৃদ্ধি না থাকলে প্রগতি হয় না। আবার যে কোনো অগ্রগতি, যে কোন বিকাশ প্রগতি নয়; প্রগতির মর্মে থাকে মূল্যবোধ, নৈতিক চেতনা, আদর্শবোধ এবং আদর্শ অভিমুখী বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন সম্ভব কর্মসূচি ও কর্মনীতি।’ প্রগতির এই ধর্ম নিয়ে ঢাকাকেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমানের জাতীয় মুক্তির জন্য প্রাণান্ত প্রয়াস চালায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে একটি পিছিয়ে পড়া সংস্কারাছন্ন সমাজের চিন্তা ও কাজের পরিবর্তনের জন্য এই সংগঠন অসাধারণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে।
মানব কল্যাণ ও প্রগতির আদর্শে উজ্জীবিত একদল মননশীল ও মুক্তিপ্রয়াসী লেখক প্রচলিত চিন্তাধারা ও কর্মসূচি থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজকে মুক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন; সেই সঙ্গে যুক্তি-বুদ্ধি-কাণ্ডজ্ঞানের মাধ্যমে সবকিছু বিচার ও গ্রহণ করতেও উদ্বুদ্ধ করেছেন। ফলে ব্যাপক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয়েছে তৎকালীন চিন্তা ও সমাজ কাঠামোয়। আমরা বিশ্বাস করি সমকালে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বা ‘শিখাগোষ্ঠী’ তথা ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে’র সবকিছু গ্রহণযোগ্য অথবা পরিত্যাজ্য নয়। এখন যুক্তি ও মঙ্গলের আলোকে বিচার করা প্রয়োজন তাদের চিন্তা ও কাজ। তবে সবচেয়ে বড় বিবেচ্য হলো এই আন্দোলনের মহৎ চিন্তা-ভাবনা-সৃজন-মনন-কর্ম-উদ্যোগ। ঢাকাকেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমানের মুক্তি আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল অবদান থেকে প্রেরণা নেয়া এখন সময়ের দাবি। সেই প্রেরণায় আমরা এই সাহিত্য-সমাজকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে একটি ক্রোড়পত্র করেছি। ক্রোড়পত্রে এই সমাজকে নানা দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করেছেন আবুল কাসেম ফজলুল হক, মোরশেদ শফিউল হাসান, হাবিব আর রহমান, নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আজম, আহমেদ মাওলা, বেনজিন খান, সাইফুল আলম, মোজাফফর হোসেন ও ইমরান মাহফুজ। আশা করি এইসব লেখা থেকে পাঠক মহল নতুন আলোয় সন্দীপিত হবেন এবং রেনেসাঁর স্প্রিট ধারণ করবেন।
এই সংখ্যায় ফজলে রাব্বির লেখা এবং নাট্য ব্যক্তিত্ব লিয়াকত আলী লাকীর সাক্ষাৎকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া নিয়মিত বিভাগের বৈচিত্র্যপূর্ণ লেখাগুলো পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে আশা করি। সামনে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি, ভাষা নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা জাগ্রত হোক সমাজে- এই প্রত্যাশা করি।