
হেনরি ক্রেইটন চিত্রিত বড়সোনা মসজিদ (১৭৮৬-১৮০৭)
স্কটল্যান্ডের অধিবাসী হেনরি ক্রেইটন ছিলেন বর্তমান ভারতের মালদা জেলার গোয়ামালতির ইংরেজ নীলকর চার্লস গ্র্যান্ট এর নীল কারখানার সুপারিনটেন্ডেন্ট। তার পিতার নাম ছিল হেনরি ক্রেইটন এবং মাতা নাম জ্যানি। ১৭৬৭ সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৭৮৬ সনে যুবক বয়সে চাকরির সুবাদে তিনি ভারতে আসেন এবং ১৮০৭ সনে তার মৃত্যু পর্যন্ত এখানেই অবস্থান করেন। ফলে পেশাগত কারণেই বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ে তার জীবনের এক সুদীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়। তিনি ছিলেন একজন উঁচু মাপের চিত্রশিল্পী। ধ্বংসপ্রাপ্ত গৌড় নগরীর প্রতিটি ভগ্ন ইমারত তাকে আকৃষ্ট করে। তাই অবসর সময়ে তিনি গৌড়ের ধ্বংসপ্রায় ইমারতগুলো চিত্রাংকনের মাধ্যমে তার শিল্পীমনের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটান। ১৭৮৬ সন থেকে ১৮০৭ সনের মধ্যে গৌড় দুর্গনগরীর ভগ্নদশাগ্রস্ত মুসলিম স্থাপত্যের ১৮টি চিত্র তিনি অঙ্কন করেন। The Ruins of Gaur শিরোনামে তার আঁকা এই ১৮টি চিত্রের একটি অ্যালবাম (থমাস মিটল্যান্ড কর্তৃক এনগ্রেভিংকৃত) তার মৃত্যুর পর ১৮১৭ সনে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। এখন পর্যন্ত গৌড়ের স্থাপত্যকীর্তির আদিরূপের নির্ভরযোগ্য উপস্থাপনা হিসেবে তার এই চিত্রসমূহ বিবেচিত হয়ে থাকে। একজন পেশাদার শিল্পী হিসেবে তার প্রতিটি চিত্রের তুলির আঁচড়ে অত্যন্ত দক্ষতার ছাপ দৃশ্যমান। জলরঙে চিত্রিত তার প্রতিটি চিত্রই অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ও প্রাণবন্ত। চিত্রিত ইমারতগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে স্ত্রী ও সাত সন্তান রেখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার চিত্রিত চিত্রগুলোর মধ্যে বড়সোনা ও ছোটসোনা মসজিদ অন্যতম।

বর্তমানে বড়সোনা মসজিদ
বড়সোনা মসজিদ
গৌড়ে বিদ্যমান ইমারতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও বৃহত্তর মসজিদ হলো বড়সোনা মসজিদ। মসজিদটি দাখিল দরওয়াজা থেকে অর্ধ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। এটি নির্মাণে ইট, চুনসুরকি ও কিছু প্রস্তর ব্যবহৃত হয়েছে। মূলত প্রস্তরসমূহ খিলানস্তম্ভ ও দেয়াল আবৃতকরণে স্লাব (পাথর, কাঠ ইত্যাদির দ্বারা সৃষ্ট পুরু মসৃণ আবরণ) আকারে সংযোজিত রয়েছে। আয়তাকার বিশিষ্ট এই মসজিদটির সম্মুখভাগ বারান্দা সংবলিত। মসজিদের অভ্যন্তরভাগ বারান্দাসহ চারটি আইল ও এগারটি বে বা ৪৪টি বর্গাকার ইউনিটে (খোপে) বিভক্ত। প্রতিটি বর্গাকার ইউনিট, খিলানের ওপরে পান্দানতিফ পদ্ধতিতে নির্মিত একটি করে উল্টানো বাটি বা চাড়ির ন্যায় গম্বুজে আচ্ছাদিত। সেই হিসেবে মসজিদটিতে মোট গম্বুজের সংখ্যা ৪৪টি। মসজিদটির সম্মুখ দেয়াল বা ফাসাদে প্রতিটি বে বরাবার একটি করে মোট ১১টি, উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আইল বরাবর একটি করে মোট ৮টি (৪+৪) কৌনিক খিলান বিশিষ্ট প্রবেশপথ এবং পশ্চিম দেয়ালে দরজা বরাবর একটি করে মোট ১১টি অলংকৃত মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি বহির্ভাগে সামান্য উদ্গত করে নির্মিত। এ ছাড়া মসজিদের বহির্ভাগে চার কোনা ও বারান্দার সংযোগস্থলে দু’টি, মোট ছয়টি অষ্টকোনাকৃতির বুরুজ সংযোজিত রয়েছে যা ছাদ কিনারা পর্যন্ত উত্থিত। নামাজগৃহের উত্তর-পশ্চিম কর্নারে বাদশাহ কি তাখত্ বা রাজকীয় গ্যালারি বা মহিলা গ্যালারি নামে অভিহিত একটি উঁচু মঞ্চ রয়েছে। ইমারতটির কার্নিশ ইষৎ বক্রাকারে রচিত এবং দেয়াল ও মিহরাবগাত্র কালো প্রস্তরে আচ্ছাদিত। বহির্দেয়াল ও মিহরাবগাত্র একসময় প্রস্তর কারুকার্যে সজ্জিত ছিল যা ক্রেইটনের চিত্রে পরিলক্ষিত হয়। মসজিদটির সম্মুখে একটি উন্মুক্ত অঙ্গন রয়েছে যা প্রস্তর নির্মিত প্রাচীর বেষ্টিত এবং তিন দিকে তিনটি তোরণপথ সংযোজিত। বিগত শতকে প্রাপ্ত তুঘরা রীতিতে উৎকীর্ণ এক শিলালিপি অনুসারে এই মসজিদটি ১৫২৬ সনে (হিজরি ৯৩৩) সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের পুত্র সুলতান নসরত শাহ কর্তৃক নির্মিত বলে জানা গেলেও সাম্প্রতিককালে প্রাপ্ত এক শিলালিপি অনুসারে তা ভুল প্রমাণিত হয় এবং মসজিদটি সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের রাজত্বকালের (১৪৯৩-১৫১৯) শেষের দিকে নির্মিত হয়েছিল বলে অনুমিত হয়। বর্তমানে মসজিদটি অর্ধভগ্নাবস্থায় বিদ্যমান। কেবল বারান্দার গম্বুজসমূহ ও পার্শ্ববর্তী দেয়াল দণ্ডায়মান রয়েছে। মসজিদটির গম্বুজগুলো একসময় সোনালি রঙে অলংকৃত ছিল বিধায় এটি সোনামসজিদ নামে অভিহিত হয়েছে। স্থানীয়দের নিকট এটি বারোদুয়ারি নামেও পরিচিত।
জলরঙ দিয়ে হেনরি ক্রেইটন বড়সোনা মসজিদের একটি বাস্তবধর্মী চিত্র অঙ্কন করছেন। তার চিত্রে মসজিদের দক্ষিণ ও পূর্ব ফাসাদের বাস্তব রূপ ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলিও চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। মসজিদের কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের ওপর বিশাল ভগ্নরূপ, গম্বুজের ওপরের পলিশ উঠে গিয়ে বের হওয়াইটের লালচে সুরকি, দেয়ালগাত্রে কালো প্রস্তরের আচ্ছাদনে প্রস্তর কারুকার্যের নকশা, কোণস্থিত অষ্টতল বিশিষ্ট বুরুজ, কৌণিক খিলানপথ প্রভৃতি অত্যন্ত দক্ষতা ও নিপুণতার সাথে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। মসজিদ সম্মুখে গাছপালা, ঝোপঝাড়, পশ্চাৎ দিকে উঁচু গাছপালা, মাথা উঁচু করে দণ্ডায়মান পলাশ ফুলের গাছ, দূর আকাশে ভাসমান সাদা মেঘের আনাগোনা, বেষ্টনী প্রাচীরের উত্তর দিকের তোরণপথ ইত্যাদি সত্যিই অতুলনীয় যা প্রতিটি দর্শকের হৃদয়কে স্পর্শ করে। চিত্রে ত্রিমাত্রিকতা, গভীরতা, প্রেক্ষিত প্রদান, যথাযথ রঙের প্রয়োগ ও সূক্ষ্মতার বিন্দুমাত্র ঘাটতি পরিলক্ষিত হয় না। খিলানপথের উভয়পাশের স্প্যানন্ড্রালে প্রতিটি উল্লম্ব প্যানেলের মধ্যে প্রস্তর কারুকার্যে ঝুলন্ত নকশা ও ফুল নকশা, কোণস্থিত বুরুজে বন্ধনী নকশা অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মসজিদটি যে বেহাল অবস্থায় ধ্বংসের দিকে ধাবিত তা চিত্রটি দর্শনে উপলব্ধি করা যায়। সুতরাং বর্তমানে ভগ্নাবস্থায় বিদ্যমান এই মসজিদটির প্রকৃত রূপরেখা কেবল আমরা ক্রেইটনের এই চিত্রের মাধ্যমেই অবলোকন করতে পারি। চিত্রটি বর্তমানের ডিজিটাল ক্যামেরার ছবির চেয়ে কোনো অংশে কম মনে হয় না। তবে শিল্পী ইমারতটির কার্নিশ চিত্রাঙ্কনে ইষৎ বক্রাকারের পরিবর্তে সমান্তরাল রূপ প্রদান করেছেন যা মসজিদটির নির্মাণশৈলীর সাথে কিছুটা অসঙ্গতিপূর্ণ হয়েছে।

হেনরি ক্রেইটনের চিত্রিত ছোটসোনা মসজিদ (১৭৮৬-১৮০৭)
ছোটসোনা মসজিদ
মসজিদটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কোতোয়ালি দরওয়াজা থেকে সরাসরি তিন কিলোমিটার দক্ষিণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকা সড়কের পূর্বপারে অবস্থিত। বড়সোনা মসজিদের ন্যায় এই মসজিদেরও উপরিস্থিত গম্বুজসমূহ একসময় সোনালি রঙে মণ্ডিত ছিল বিধায় এটিকে ছোটসোনা মসজিদ নামে অভিহিত করা হয়। মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে মোটামুটি সুরক্ষিত অবস্থায় বিদ্যমান। পূর্ববর্তী মসজিদের ন্যায় এই মসজিদের ভূমি নকশাও আয়তাকার তবে বড়সোনা মসজিদের ন্যায় বৃহদাকারের নয়। সম্মুখে উন্মুক্ত অঙ্গনসহ চারিদিক প্রাচীর বেষ্টিত। পূর্ব প্রাচীরে একটি তোরণপথ বিদ্যমান। ইট, চুনসুরকি ও প্রস্তর সমন্বয়ে নির্মিত এই মসজিদটির অভ্যন্তরভাগ দুই সারি প্রস্তরস্তম্ভ দ্বারা তিনটি আইল এবং পাঁচটি বে বা পনেরটি ইউনিটে বিভক্ত। কেন্দ্রীয় প্রশস্ত গলিপথের তিনটি ইউনিট আয়তাকৃতির যার উপরিভাগ তিনটি চৌচালা ছাদে এবং বাকি বারোটি (৬+৬) বর্গাকার ইউনিটের উপরিভাগ উল্টানো বাটি বা চাড়ির ন্যায় গম্বুজে আচ্ছাদিত। গম্বুজসমূহ খিলান ও পান্দানতিফ এর ওপর স্থাপিত। মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কর্নারে রাজকীয় গ্যালারির উঁচু মঞ্চটি ভগ্নদশাবস্থায় বিদ্যমান। এই মঞ্চে আরোহণের জন্য মসজিদ সংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম কর্নারে বহির্দিকে একটি সিঁড়ি বিশিষ্ট উঁচু মঞ্চ ও মঞ্চের সাথে দেয়ালে একটি প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদটির পূর্ব দেয়াল অর্থাৎ ফাসাদে পাঁচটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে তিনটি করে মোট এগারটি কৌণিক খিলানবিশিষ্ট প্রবেশপথ বিদ্যমান। সম্মুখের পাঁচটি প্রবেশপথ বরাবর পশ্চিম দেয়ালে পাঁচটি অবতল বিশিষ্ট মিহরাব রয়েছে। এ ছাড়া ইমারতটির চার কোণায় রয়েছে বহুকোণ বিশিষ্ট চারটি সুদৃঢ় বুরুজ। মসজিদের দেয়ালগাত্র বাইরে সম্পূর্ণটা এবং ভেতরে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা পর্যন্ত গ্রানাইট প্রস্তর ফলকে আচ্ছাদিত (যদিও বাইরে পশ্চিম দেয়ালের দক্ষিণাংশের প্রস্তর ফলকসমূহ খুলে পড়েছে)। মসজিদটির কার্নিশ ঈষৎ বক্রাকারে রচিত। মসজিদের বহির্দেয়ালগাত্র এবং ভেতরের মিহরাবগাত্র প্রস্তর কারুকার্যে সজ্জিত। অলংকরণ বিষয়বস্তু হিসেবে প্যাঁচানো লতাপাতা, শিকল ঘণ্টার অনুকরণে বিভিন্ন ধরনের ঝুলন্ত নকশা, গোলাপ নকশা ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের উপরে স্থাপিত এক শিলালিপি অনুসারে মসজিদটি আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে (১৪৯৩-১৫১৯) মজলিস-ই-মাজালিস মনসুর ওয়ালী মুহাম্মদ বিন আলী নামক জনৈক ব্যক্তি কর্তৃক নির্মিত। মসজিদের উন্মুক্ত অঙ্গনের সম্মুখে প্রস্তর নির্মিত মঞ্চাকারে দু’টি বড় ও উঁচু সমাধি ফলক পরিলক্ষিত হয় (ছোট ছোট আরো রয়েছে)। কানিংহামের মতে, দু’টি ফলকের একটি মসজিদ নির্মাতা এবং অন্যটি তার পিতার কবর হতে পারে বলে অনুমান করা হয়।

মসজিদের অভ্যন্তরভাগের গম্বুজ নির্মাণ দৃশ্য (১৭৮৬-১৮০৭)
গৌড়-লখনৌতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইমারত ছিল ছোটসোনা মসজিদ। যদিও বর্তমানে মসজিদটির অলংকরণ সজ্জার পূর্বজৌলুস অনেকাংশেই বিলুপ্ত। তথাপি যেটুকু বিদ্যমান তাতেও এর নান্দনিক আবেদন অনেকটাই অক্ষুণ্ণ রয়েছে। শিল্পী হেনরি ক্রেইটন এই মসজিদের একটি আকর্ষণীয় চিত্র অঙ্কন করে আমাদের সম্মুখে আজ থেকে দু’শ বছর পূর্বে অবহেলিত অবস্থাতেও এর সৌন্দর্য কেমন ছিল তা তুলে ধরেছেন। তিনি এই মসজিদের সম্মুখদৃশ্য, ভেতরের গম্বুজ নির্মাণ দৃশ্য, সম্মুখের কবর ফলকের দৃশ্য ও প্রস্তর ফলকে কতিপয় হিন্দু দেবদেবীর চিত্র উপস্থাপন করেছেন। তার চিত্রিত মসজিদের সাধারণ দৃশ্যটি অতীব চমৎকার। তিনি বড়সোনা মসজিদের ন্যায় একই পদ্ধতি অনুসরণ করে জলরঙে এটি চিত্রায়িত করেছেন। চিত্রে মসজিদটির পূর্ব ও উত্তর ফাসাদ প্রাকৃতিক দৃশ্যবলিসহ উপস্থাপিত হয়েছে। মসজিদগাত্রে কালচে প্রস্তরে অলংকরণ কারুকার্য চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। মসজিদের পাশ দিয়ে বেড়ে ওঠা উঁচু সবুজ গাছপালা, পেছনে দূরে পলাশ ফুলের গাছ, ছাদে জন্মানো আগাছা, লতাপাতা, অর্ধগোলায়িত গম্বুজের পলিশ উঠে ইটের লাল সুরকি বের হওয়া, আলো-ছায়া, দূরের দিগন্ত রেখা, সাদ-কালো মেঘসহ হালকা নীলাকাশে সূর্যের আলোকচ্ছটা, সম্মুখে ও উত্তর পাশের সিঁড়িমঞ্চের আশপাশে বেড়ে ওঠা সবুজ ঝোপঝাড় ইত্যাদি অংকনে শিল্পীর দক্ষ হাতের ছোঁয়া স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। মসজিদ সম্মুখে কিছু দূরে দণ্ডায়মান একটি ঘোড়া ও তিনজন মানব প্রতিকৃতিও বিদ্যমান। মানুষগুলোর দু’জন সাদা ধুতি পরিহিত খালি গায়ে এবং অন্যজন সাদা মোগল পোশাকে সজ্জিত। খুব সম্ভব মুখোমুখি বসা দু’জন মানুষ আলাপরত কিংবা ধুতি পরিহিত ব্যক্তিটি মোগল পোশাকে সজ্জিত ব্যক্তির ক্ষৌর কার্যেরত এবং অন্যজন চুলায় (স্থানীয় আলোক চুলা) আগুন দিয়ে কিছু কর্মরত, যার উপরে সাদা ধোঁয়া উত্থিত। ঢিলেঢালা মোগল পোশাকে সজ্জিত ব্যক্তিটিই যে ঘোড়ায় চড়ে এখানে আগমন করেছেন তা সহজেই ধারণা করা যায়। এ ছাড়া মসজিদের সম্মুখ দেয়ালে কৌণিক খিলানপথ এবং খিলানপথের উভয়পাশের খিলান পার্শ্বস্থ ত্রিকোনাকার ভূমি (স্প্যান্ড্রেলে) উল্লম্বভাবে উপস্থাপিত প্যানেলসমূহে ঝুলন্ত নকশা ও উপরের গোলাপ নকশা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাপজোখসহ চিত্রায়িত হয়েছে যা সত্যিই অপূর্ব। মোটকথা ছবিটিতে যথার্থ প্রেক্ষিত প্রদান, প্রতিটি উপকরণে যথার্থ রঙের প্রয়োগ, ইউরোপীয় রীতির আলোছায়ার সঞ্চালন প্রভৃতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তবে বড়সোনা মসজিদের ন্যায় এই চিত্রটিতেও শিল্পী ইমারতের কার্নিশ ঈষৎ বক্রাকার না করে সমান্তরাল করেছেন যা এর স্থাপত্যশৈলীর সাথে সামান্য অসঙ্গতিপূর্ণ হয়েছে। কিন্তু চিত্রটি যে বাস্তবধর্মী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যদিকে শিল্পী মসজিদ অভ্যন্তরের দৃশ্যটিতে মসজিদটির প্রস্তরস্তম্ভ, খিলান ও পানদান্তিফের ওপর কিভাবে গম্বুজ নির্মিত হয়েছে তা চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। চিত্রটিতে মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে মিহরাব সারি ও তার অলংকরণও প্রতিভাত। তা ছাড়া দু’টি কবরফলকের দৃশ্যও অপরূপভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। প্রস্তর নির্মিত কবরফলক মঞ্চের প্রতিটি ধাপ, গাত্র রঙ এবং উপরিস্থিত ফলক সুস্পষ্ট। কবর দু’টির দুই পাশে দন্ডায়মান নারিকেল গাছ এবং পেছনের গাছপালাসহ জলপূর্ণ পুকুর, নিচের অসমান মাটিতে সবুজ ঘাস ও পড়ে থাকা এক সারি ইট অপূর্বভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। উপরের আকাশে ভাসমান সাদা-কালো মেঘের উপস্থিতিও চিত্তাকর্ষক। হেনরি ক্রেইটন যে একজন প্রতিভাবান দক্ষ শিল্পী ছিলেন মসজিদ দু’টির চিত্রায়ণে তার ছাপ সুস্পষ্ট। (চলমান)
[হেনরি ক্রেইটনের চিত্রগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন, কাজী মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান, শিল্পীর তুলিতে বাংলার মুসলিম স্থাপত্য, ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮। ক্রেইটনের চিত্রগুলো ব্রিটিশ লাইব্রেরি ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত।]