প্রথমে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এই ম্যাগাজিনের সস্পাদকসহ সবাইকে যারা সুন্দর একটি শিল্প সাহিত্যের কাগজ প্রকাশ করে যাচ্ছেন।
বাঙালি হিসেবে আমরা বেড়ে উঠি বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে। শৈশব থেকে শুরু করে শেষ জীবন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রমের মধ্যে দিয়ে আমাদের জ্ঞান লাভ করতে হয়। সেক্ষেত্রে কাগজ কলম থেকে বেশিরভাগই আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন তথ্য আহরণ করছি। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় তথ্যসমৃদ্ধ লেখা সবসময় হাতের কাছে পাওয়া বা সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু আজ একান্তই ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে একটি ম্যাগাজিন সম্পর্কে মন্তব্য করছি। সেটি হচ্ছে শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাগজ ‘নতুন এক মাত্রা’। অনেকদিন আগে থেকেই এটি নিয়মিতভাবে পড়ছি। সাধারণত প্রতি দু-মাস অন্তর অন্তর এটি প্রকাশিত হয়।
একজন পাঠক হিসেবে আমার মূল্যায়ন হচ্ছে, ‘নতুন এক মাত্রা’কে বলা যায় একের মধ্যে অনেক কিছু। কাগজটিতে ঝরঝরে লেখা, লেখার উপস্থাপন, কাগজের মান, বিষয়বস্তু ও বিন্যাস খুব ভাল লাগে। এটিতে যে বিষয়বস্তুগুলো রয়েছে তার মাঝে কয়েকটি ভাল লাগার বিষয় হচ্ছে, প্রবন্ধ, পাঠ প্রতিক্রিয়া, অনুবাদ, ভ্রমণ কাহিনী, কবিতাগুচ্ছ, উপন্যাস, শিল্পকলা, রম্যরচনা ।
আলাদা করে বলতে গেলে প্রথমত, ‘নতুন এক মাত্রা’তে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো অনেক ভাল, তথ্যনির্ভর ও যুক্তিযুক্ত। প্রতিটা সংখ্যায় ৫-৭টি প্রবন্ধ ছাপা হয় যা অনেক গভীরভাবে চিন্তার জগৎ প্রসারিত করে। যেমন, হেমন্ত সংখ্যায় ৬টি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে, যার মাঝে একটি হচ্ছে ‘সত্তর বছরের বাংলাদেশের ছোটগল্প’, লিখেছেন শহীদ ইকবাল। এই প্রবন্ধে গুণী লেখক শাহেদ আলী, আবুল মনসুর আহমদ, শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, আবু ইসহাক, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আল মাহমুদ, হুমায়ন আহমেদ, শাহাদুজ্জামান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, নাজিব ওয়াদুদসহ অন্যান্য লেখকের এবং তাদের রচিত গ্রন্থসমূহের গভীর বিশ্লেষণ করা হয়েছে যা সত্যিই বলা যায় অসাধারণ। এই লেখার মাধ্যমে সত্তর বছরের বাংলাদেশের ছোটগল্পের গ্রাফ নিমেষেই অনুমান করা যায়। আমার কাছে এই প্রবন্ধটিকে সেরা মনে হয়েছে। প্রতিটা পৃষ্ঠায় বিভিন্ন তথ্যে ঠাসা।
এছাড়াও, প্রবন্ধ ‘বিশ শতকের কবিতার বাঁক-বদল’ লেখায় কবিতার বিভিন্ন যুগের কথা উঠে এসেছে। বিশ শতকের কবিতার বাঁক-বদল এবং আজকের কবিতার বিভিন্ন ফারাক এই লেখার মাধ্যমে কিছুটা আঁচ করা যায়। তারপর ‘কালের কষ্টিপাথরে বাংলাদেশের সমালোচনা সাহিত্য’, বাংলাদেশের ছড়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শামসদুদ্দীন আবুল কালামের ‘কাশবনের কন্যা’, আহমদ ছফা: মানবিক ও কল্যাণমুখী সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নসারথি প্রবন্ধে খুঁজে পেয়েছি অনেক অজানা তথ্য। তাই বলতে হয় এই ম্যাগাজিনের প্রবন্ধ বিভাগটি সত্যিই অসাধারণ।
দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টি চমৎকার লেগেছে তা হল, সাক্ষাৎকার। ‘লোকসংস্কৃতিহীন বাংলাদেশ অনেকখানিই মৃত’ এই শিরোনামে বরেণ্য ব্যক্তিত্ব জনাব মুস্তাফা জামান আব্বাসী এর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে যা অনেক তথ্যবহুল। পুরো সাক্ষাৎকার জুড়ে জনাব মুস্তাফা জামান আব্বাসী তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত চিন্তা ভাবনা, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির আর্বিভাবসহ বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার কথা অকপটে বলেছেন যা ছিল প্রাণবন্ত। তৃতীয়ত, যে বিষয়টি ভাল লেগেছে তা হলো, পাঠ প্রতিক্রিয়া বিভাগ। বরেণ্য লেখক আহমদ ছফা ও বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘আহমদ ছফার বঙ্কিমবিচার সাম্প্রদায়িকতা এবং কিছু কথা’। বাংলা সাহিত্যের স¤্রাট বঙ্কিম সম্পর্কে গভীরভাবে লিখেছেন আহমদ ছফা তার বিভিন্ন বইতে। তবে এই প্রবন্ধে তার বিশ্লেষণ পড়ার পর দুই লেখকের জ্ঞানের পরিধি কত সুবিশাল ছিল তার ধারণা পাওয়া যায়।
এছাড়াও আফ্রিকী সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের প্রাণপুরুষ ‘সেমবেন উসমান’ সম্পর্কে একটি ফিচার বিশ্বসাহিত্যও ভাল লেগেছে। অল্প সময়ে বিদেশী সাহিত্যের কথাও বেশ মজার লেগেছে। চতুর্থত, ভাল লাগার আরেকটি বিভাগ হচ্ছে, ‘কবিতাগুচ্ছ’। নানারকম কবিতার সমাচার এই বিভাগে। এখানে ‘চেনামুখ অচেনা সুখ’, ‘পায়ে পায়ে পঞ্চাশ’, ‘স্বর্ণপ্রভা’, ‘ক্যান্সার ওয়ার্ড’, ‘বৃষ্টির কোলাহল’ কবিতাগুলো দারুণ উপভোগ্য। কবিতাগুলো যখন পড়ছি তখন খুব আনন্দ পেয়েছি। নানারকম মজার কবিতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে সেটি নিঃসন্দেহে বলা যায়।
পঞ্চমত, আমার কাছে এই ম্যাগাজিনের আর্কষণীয় যে বিভাগ সেটি হচ্ছে, ‘ভ্রমণ’। এবারের সংখ্যায় রয়েছে ‘বরফের রাজ্যে শুভ্রতার সীমানায়’ শিরোনামে দারুণ মনোমুগ্ধকর একটি ভ্রমণ কাহিনী। লিখেছেন কামরুল হাসান। কনকনে শীতে বরফের শহর কেমন হয়, সেখানকার পরিবেশ, প্রকৃতি, স্থাপত্যসহ বিভিন্ন অজানা খবর পেয়েছি এই লেখায়। এক কথায় অসাধারণ কাহিনী।
এছাড়াও, নাজিব ওয়াদুদের ধারাবাহিক উপন্যাস ‘পদ্মাপাড়ের উপখ্যান’, অনুবাদ ‘নারীর মন’, রম্যরচনা ‘ভেজাল’সহ বিভিন্ন ছোট ছোট উপন্যাস, গল্প, বইপত্রের রিভিউ সহ অনেক ফিচার রয়েছে যা সত্যিই নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একজন পাঠক হিসেবে যদি এই ম্যাগাজিন মূল্যায়ন করি তাহলে আমার কাছে এটি উপরের সারিতে থাকবে। লেখার মান থেকে শুরু করে প্রতিটা বিভাগে দক্ষতার ছাপ পেয়েছি। ম্যাগাজিনের লেখকগন তাদের কঠোর পরিশ্রম দিয়ে এত সুন্দর করে প্রতিনিয়ত সাজিয়ে যাচ্ছেন তাই তাদের প্রতি আমি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এবং আগামিতে আরো ভাল লেখনী দিয়ে এটি অব্যাহত রাখবেন বলে আশা করছি। তাই পরিশেষে বলতে চাই, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির খবরে সীমাবদ্ধ না থেকে আরো বিভিন্ন তথ্যনির্ভর লেখা নতুন এক মাত্রায় প্রকাশ হোক। ছড়িয়ে যাক সমগ্র বাংলাদেশ। লেখার মান, বিষয়বস্তু, এভাবে অটুট থাকুক। সামনে আরো নতুন ফিচারসহ তরুণদের লেখা আমরা এই কাগজে পড়তে চাই এবং সবসময় যেন নতুন এক মাত্রা সবার কাছে পৌছায় সেদিকে লক্ষ্য রাখার জন্য অনুরোধ জানাই। আবারো সামনে কোন বিষয় নিয়ে কথা হবে। সে পর্যন্ত ভাল থাকুন।
মাহমুদুল হাসান মিঠু
পাঠশালা-CBS, বগুড়া