বাঙালির, বিশেষভাবে বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ইতিহাসে ঢাকার বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন একটি গুরুত্ববহ ঘটনা। বাংলার পূর্বাঞ্চলের প্রায়-প্রান্তিক একটি শহরে অপর প্রধান ধর্মসম্প্রদায় থেকে সবদিক দিয়ে পিছিয়ে- পড়া একটি ধর্মার্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘটিত এ জাতীয় আন্দোলন স্বভাতই ঐতিহাসিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে (১৯২১) কেন্দ্র করেই মূলত এ আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ নামক একটি সংগঠনের দ্বারা। ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজের কতিপয় অধ্যাপক ও ছাত্রের মিলিত প্রয়াসে সাহিত্য-সমাজের প্রতিষ্ঠা। সংগঠনের নামের সঙ্গে ‘সাহিত্য’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি গতানুগতিক ও মামুলি কোনো সাহিত্য সংগঠন ছিল না। সাহিত্য শব্দটিকে সমাজের সংগঠকরা একটি বৃহত্তর অর্থে গ্রহণ করেছিলেন। বস্তুত সাহিত্যচর্চা তাঁদের কাছে ছিল জীবনচর্চার নামান্তর। আসলে তাঁদের মৌল উদ্দেশ্য ছিল বুদ্ধির মুক্তি। এ জন্য তাঁদের কর্মকাণ্ডকে তাঁরা অভিহিত করেছিলেন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন নামে। সমাজের মুখপত্র ‘শিখা’র টাইটেল পৃষ্ঠায় মুখবাণী হিসেবে যে- কথাটি ছাপা হতো- ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট মুক্তি সেখানে অসম্ভব’– তাতেই নিহিত রয়েছে তাঁদের লক্ষ্যের মর্মসার। বস্তুত এটিই ছিল তাঁদের জীবন-দর্শন। এই দর্শননির্ভর নিজেদের চিন্ত-উপলব্ধিকে তাঁরা আন্দোলনের রূপ দিয়ে সমাজ-মানসে প্রবিষ্ট করাতে চেয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত মুসলিম সাহিত্য-সমাজের সঙ্গে ‘মুসলিম’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি কোনো সাম্প্রদায়িক সংগঠন ছিল না। মূলত যুগের প্রয়োজনে বাস্তবতার দিকে লক্ষ রেখে ‘মুসলিম’ শব্দটি গ্রহণ করা হয়েছিল। কেননা উদারচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা সে-সময়ে মুসলমান সমাজের কাছে তুলে ধরা বিশেষভাবে দরকার ছিল। সাহিত্য-সমাজের ভাবযোগী বলে অভিহিত কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০) তাঁর ডায়েরিধর্মী লেখায় বলেছেন যে, তিনি যে কেবল মুসলমানের মঙ্গল চান তা নয়, মোটের ওপর সমস্ত মানুষের মঙ্গল চান। হিন্দু সেই কল্যাণের পথে কিছুদূর হলেও এগিয়েছে, কিন্তু মুসলমান এক পা-ও এগোয়নি। তাই মুসলমানের জন্য তাঁর অতখানি দরদ। তারা বড় দুস্থ।
বস্তুত এ কারণেই সাহিত্য-সমাজের লেখকেরা বিশেষভাবে বাঙালি মুসলমানের সমস্যাদি নিয়ে ভেবেছেন ও সেগুলি সমাধানের পথনির্দেশনা দিতে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সাধারণভাবে তাঁরা স্বদেশের ও সমগ্র মানব-সমাজের কল্যাণচিন্তাও করেছেন। মুসলমান সমাজের বিশেষ কোনো সমস্যা নয়, এর সর্বব্যাপী সমস্যা সম্বন্ধেই সাহিত্য-সমাজের লেখকেরা বক্তব্য রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে আবদুল হক (১৯১৮-৯৭) লিখেছেন,
“এর অন্তর্জীবন ও বহির্জীবন, এর মনন ও আচরণ, এর কুসংস্কার, পরিবার জীবন, সামাজিক প্রথা, গোঁড়ামি, অতীতমুখীনতা, পশ্চাতমুখীনতা, ললিতকলাবিমুখতা, শিক্ষাসমস্যা, কোনো কিছুকেই ‘সাহিত্য-সমাজ’ এড়িয়ে যেতে চাননি, সব কিছু সম্বন্ধে সমকালীন চিন্তাধারার গলদ তাঁরা উন্মোচন করেছেন…।”
‘শিখা’র প্রথম সংখ্যায় (চৈত্র ১৩৩৩) ‘প্রকাশকের নিবেদন’- এ বলা হয় “শিখা’র প্রধান উদ্দেশ্য বর্তমান মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্তন সাধন। ‘শিখা’র প্রথম সংখ্যায় আমরা যে প্রবন্ধগুলি সন্নিবেশ করেছি তার প্রত্যেকটি সমাজের দারুণ অভাবের এক একটি দিক লক্ষ করে লিখিত হয়েছে।”
এসব বক্তব্য থেকে বোঝা যায় মুসলিম সাহিত্য-সমাজের লেখকদের জীবন-দর্শনে ছিল যুক্তিবাদ এবং চিন্তাসংস্কার ও সমাজসংস্কারের দৃষ্টি। চিন্তার গতানুগতিকতা ও ঐতিহ্যের অন্ধঅনুবর্তিতা থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজকে তাঁরা মুক্ত করতে চেয়েছিলেন সঙ্কীর্ণতামুক্ত সুস্থ উদার বিশ্বমানবতার আকাশতলে, যেখানে বাঙালি মুসলমান বিশ্বজনীন চিন্তার অংশীদার এবং আধুনিক জগতের প্রাগ্রসর সমাজ ও জাতিসমূহের সমপর্যায়ে সৃষ্টিচঞ্চল।” এ প্রসঙ্গে এস. এম. আলীর একটি মন্তব্যও উদ্ধৃতিযোগ্য:
The main problem before the Muslim intellectuals was how to become a part of the modern world while remaining Muslims? They fully accepted the need of a change in the outlook of the Bengali Muslims.
মুসলিম সাহিত্য-সমাজের লেখকেরা ইতিহাসের তাৎপর্য বুঝতেন। তাই তাঁরা জানতেন যে, ইতিহাসের মুখ্য গতিধারা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্নতার অর্থ দুর্ভাগ্যকে বরণ করা। সে জন্য সমকালীন ইতিহাসের সঙ্গে মুসলিম সমাজকে শামিল করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। এজন্য প্রয়োজন ছিল জ্ঞান, যুক্তি ও বুদ্ধিচর্চার এবং তারই আলোকে সমাজ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্ম, মূল্যবোধ ইত্যাদির বিচার-বিশ্লেষণ করা। এই রেনেসাঁসি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁরা ইসলাম ও মুসলমান সমাজের যে-সব বিধি-বিশ্বাস-প্রথা-সংস্কার তাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের এবং একই সাথে সমাজ ও দেশের উন্নতি-প্রগতির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেগুলিকে বিচার-বিশ্লেষণ করে দূর করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, এ না হলে মুসলাম সমাজের কোনো উন্নতি তো হবেই না, উপরন্তু ইসলামের মতো একটি বিপ্লবমূলক ধর্ম নির্দিষ্ট ঘেরাটোপের মধ্যে গতিহীন হয়ে পড়ে থাকবে।
মুসলিম সাহিত্য-সমাজের লেখকেরা ধর্মে বিশ্বাস স্থাপন করেই ধর্মসংস্কার করতে চেয়েছিলেন। ইসলাম ধর্মে তাদের যথেষ্ট বিশ্বাস ছিল এবং হযরত মুহম্মদ (সা:)-এর প্রতি ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা। কিন্তু সাধারণ বিশ্বাসীদের সঙ্গে তাঁদের মৌল পার্থক্য ছিল এখানে যে, ধর্মকে তাঁর জ্ঞান ও বুদ্ধির সাহায্যে বুঝতে চেয়েছিলেন। বস্তুত জ্ঞান ও বুদ্ধিকেই তাঁরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাহিত্য-সমাজ প্রতিষ্ঠার কিছুকাল আগে ঢাকায় ‘তরুণ পত্র’ নামে একটি প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার সাথে সাহিত্য-সমাজের কর্মযোগী বলে অভিহিত আবুল হুসেন (১৮৯৬-১৯৩৮) ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ‘তরুণ পত্র’- এর প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয় নিবন্ধে লেখা হয়, “মানুষের যথার্থ কল্যাণ হয় জ্ঞানে। কেহ কেহ বলিবেন ধর্মে। কিন্তু জ্ঞানহীন ধর্ম অর্থবিহীন। সুতরাং বলিব, মানুষের মুক্তি হয় জ্ঞানে।”
মোতাজেলা দার্শনিক সম্প্রদায়ের উদ্ভবের পর থেকে অদ্যাবধি যেসব বুদ্ধিনির্ভর চিন্তাবিদ ইসলাম ও মুসলমানের কল্যাণচিন্তা করেছেন, তাঁদের অনেকের ভাবনা মূলত এই একই ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। প্রসিদ্ধ দার্শনিক আল-রাজি (৮৬৫-৯২৫), জামাল উদ্দীন আফগানী (১৮৩৯-১৮৯৭), মুফতি মুহম্মদ আবদুহ (১৮৪৯-১৯০৫), ভারতবর্ষের স্যার সৈয়দ আহমদ (১৮১৭-১৮৯৮), সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮), মুহম্মদ ইকবাল (১৮৭৩-১৯৩৮), মওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮-১৯৫৮) প্রমুখ চিন্তাবিদ যুক্তি ও বুদ্ধির সাহায্যে ইসলামকে বুঝতে চেয়েছেন এবং সেই আলোকে তাকে যুগানুগ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের উন্নতির সম্ভাবনা দেখেছেন। ঢাকার মুসলিম সাহিত্য-সমাজের কর্ণধার ও প্রধান লেখক যাঁরা ছিলেন তাঁদের চিন্তাও প্রায় ওই একই খাতে প্রবাহিত ছিল।
তবে অন্তত দু’টি ক্ষেত্রে ঢাকার চিন্তাবিদদের স্বাতন্ত্র্য ছিল। প্রথমত তাঁরা কেবল শাস্ত্রকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা করেন নি, বরং “… শাস্ত্রের কথা ও শাস্ত নিরপেক্ষ বাণী উভয়কেই তাঁরা মর্যাদা দিয়েছিলেন মানববাদের মাপকাঠিতে বিচার করে।” দ্বিতীয়ত যে-চিন্তা তাঁরা করেছিলেন, তার দ্বারা সমাজ রূপান্তরের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে তাঁরা বাংলার বাইরে আর কোথাও ইসলামের মূল ভিত্তি আল্লাহর একত্ব, রাসূলের প্রেরিতত্ব ও কোরানের ঐশিতার ওপর বিশ্বাস বজায় রেখে মুসলিম সমাজের যুগোপযোগী রূপান্তর সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা হয়নি।
তবে সাহিত্য-সমাজের লেখকেরা ইসলামের মূল ভিত্তিসমূহের তাত্ত্বিক বা দার্শনিক আলোচনায় কেউ যাননি। সে-উদ্দেশ্যও তাঁদের ছিল না। তাঁরা কেউই ধর্মতাত্ত্বিক বা দার্শনিক ছিলেন না। তাঁরা যা ছিলেন তা আবুল হুসেনের একটি উক্তিতে যথার্থরূপে চিহ্নিত হয়েছে। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, “আমার position ঠিক দার্শনিকের নয়, আমার position কতটা কল্যাণপিপাসু সামান্য কর্ম্মীর। কর্ম্মের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করাই আমার সর্বপ্রথম কর্ত্তব্য। সে জন্যই আমার চিন্তাচর্চা করা।” তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা ধর্মের তাত্ত্বিক দিক নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজনবোধ করেননি, প্রয়োজনবোধ করেছেন তার মানবহিতের দিক নিয়ে ভাবতে। এ ব্যাপারে তাঁদের মতমত তাঁরা স্পষ্ট করে ব্যক্ত-ও করেছেন। সাহিত্য-সমাজের পঞ্চম বর্ষের প্রথম সাধারণ অধিবেশনে কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১) ‘মানুষ মোহাম্মদ’ নামে একটি প্রবন্ধ ও মোক্তার আহমদ সিদ্দিকী মুহম্মদ বিষয়ে আরেকটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। মোতাহার হোসেন তাঁর প্রবন্ধে মুহম্মদকে মানুষ হিসেবে ও মোক্তার আহমদ তাঁর লেখায় মুহম্মদকে অতিমানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেন। আলোচনাপর্বে কাজী আবদুল ওদুদ বলেন,
হযরত মোহাম্মদ শেষ পয়গম্বর কি না, কোরান ফেরেস্তার মারফৎ অহিরূপে নাজেল হয়েছিল কি না, আজিকার দিনে এসব আমাদের বড় সমস্যা নয় – আমাদের সমস্যা হচ্ছে এই যুগে এই আবহাওয়া ও পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে দাঁড়িয়ে হজরত মোহাম্মদের জীবন ও কোরান থেকে আমরা আমাদের জীবনে কতখানি পাথেয় সংগ্রহ করতে পারি। হজরত মোহাম্মদের বিরাট ব্যক্তিত্ব যেন আমাদের চোখ ঝলসে না দেয়। হজরত মোহাম্মদের জীবনের কোন সাধনা যদি আমরা আমাদের জীবনে না নিতে পারি – তাহা পরিহার করতে যেন আমাদের এতটুকু দ্বিধা না হয়।
আবুল হুসেনও এই আলোচনায় অংশ নেন। তাঁর আলোচনাটিও বর্তমান প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বলে উদ্ধৃত করা জরুরি বিবেচনা করি। তিনি বলেন-
হজরতের জীবনের প্রত্যেক ব্যাপাকে justify করে মুসলমানদের আর কোন লাভ নেই, তাঁকে বিচার করতে হবে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসাবে – ইতিহাসে এক অতীত যুগে ভিন্ন আবেষ্টনে তিনি জন্মেছিলেন, সেখানে বসে তিনি যে জীবন যাপন করেছেন, যে শিক্ষা দিয়েছেন, তার থেকে এই যুগে এই দেশে বসে আমরা কতটুকু আলো পাই আমাদের জীবন চলার পথে আমরা তাই শুধু নেবো। তা না করে যদি আমরা পদে পদে তাঁকে justify করতে যাই তাহলে তাকেও বুঝা হবে না, আমরা নিজেরাও শুধু বিড়ম্বিত হব।
এসব উক্তি থেকে বোঝা যায় মুহম্মদের জীবনের প্রেরিতত্বের উপর তাঁরা গুরুত্ব আরোপ করেননি, গুরুত্ব আরোপ করেছেন তাঁর মানব-মহিমার ওপর। এদিক থেকে তিনি যে একজন অসাধারণ ও অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব তা তাঁরা অতীব শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করেছেন এবং মুসলিম মনোভাব হচ্ছে হযরত মুহম্মদের ব্যক্তিত্ব ও কর্মকাণ্ডকে এমন অলৌকিকতামণ্ডিত করে দেখা যে, কোনো মানুষের পক্ষেই তাঁর মনোভাবকেই সম্মোহন বলেছিলেন। এই মনোভাব যে মুসলমানের জীবনের সকল উন্নতি-প্রগতির প্রতিবন্ধক সে- ব্যাপারে তিনি নিঃসংশয় ছিলেন।
মুসলিম সাহিত্য-সমাজের লেখকদের, বিশেষত সমাজের দুই প্রধান ভাবুক আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেনের ধর্মপালনসংক্রান্ত মতামতে দেখা যায় তাঁরা ধর্মের বাহ্যিক আচরণের চাইতে তার অন্তর্নিহিত লক্ষ্যের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। আবুল হুসেনের ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’ প্রবন্ধটি যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল ও তাঁকে বিপদগ্রস্ত করেছিল তার মূল কারণ ছিল এখানে। ঐ প্রবন্ধে তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করেন যে, ইসলামে যেসব ধর্মীয় আচার রয়েছে তা পালন করে মুসলমানরা যদি সৎ, সুন্দর ও মহৎ হতে না পারে তবে ঐ সব আচার পালনের প্রয়োজন ও সার্থকতা কোথায়? এ ব্যাপারে আবদুল ওদুদের মতও অনুরূপ। যেমন নামাজ সম্পর্কে তিনি বলেছেন যে, নামাজ অর্থাৎ আল্লাহর উদ্দেশ্যে পূর্ণাঙ্গ নতি তখনই সার্থক হয় যখন তা জ্ঞান ও মনুষ্যত্ব সাধনের সহায় হয়। না হলে তা আচার পালনের চাইতে বেশি কিছু নয়।
বুঝতে অসুবিধা হয় না যে মুসলিম সাহিত্য-সমাজ মানব জীবনের যে-বিষয়টির প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন সেটি হলো মনুষ্যত্ব সাধনা। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই সমাজের লেখক- চিন্তকরা মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবনের সবকিছুকে – তাঁর জীবনদৃষ্টি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, শিক্ষা, আচার, আচরণ, প্রথা ইত্যাদি সম্পর্কে বিচারমূলক দৃষ্টিতে যাচাই-বাছাই করতে চেয়েছিলেন এবং যেটুকু তাঁদের জীবনের জন্য কল্যাণদায়ক কেবল সেটুকুকেই গ্রহণীয় ভেবেছিলেন।
দুই.
ইতিহাস এই সাক্ষ্য বহন করে যে প্রচলিত মত-বিশ্বাস-মূল্যবোধের পরিবর্তন প্রচেষ্টা তথা নতুন চিন্তার অভিঘাত কোনো সমাজেই অবিমিশ্র হয় না। দেখা যায়, নতুন ধ্যান-ধারণা-চিন্তা-দর্শন প্রকাশের সমকালে সমাজের একটি ক্ষুদ্র দল তার সমর্থনে এগিয়ে আসে, আর বড় অংশটি রয়ে যায় বিরোধী ভূমিকায়। মুসলিম সাহিত্য-সমাজ কিঞ্চিদধিক যে দশ বছর (১৯২৬-৩৬) টিকে ছিল সেই সময়-পর্বেও এর সত্যতা লক্ষ করা গেছে। যে-লক্ষ্য নিয়ে সাহিত্য-সমাজের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তাকে শিক্ষিত ও উদার দৃষ্টিসম্পন্ন হিন্দু-মুসলমানের অনেকে স্বাগত জানান, কিন্তু বৃহত্তর রক্ষণশীল মুসলিম সম্প্রদায়, বিশেষ করে তাদের প্রতিনিধিরা বিরোধিতা করেন। সে-বিরোধিতায় এমনকি জবরদস্তিও ঘটে।
সাহিত্য-সমাজের প্রতিষ্ঠাসভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯)। বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত ও ধার্মিক ব্যক্তি হিসেবে ঢাকায় তখনই তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বছরেই তিনি ঢাকা এসেছিলেন। তাঁকে সঙ্গে পাওয়া সাহিত্য-সমাজের পক্ষে প্রয়োজন ছিল। সাহিত্য-সমাজ প্রতিষ্ঠার মাসেই তিনি উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে প্যারিস গমন করেন, ফিরে আসেন ১৯২৮ সালে। এর পরের বছর মার্চে অনুষ্ঠিত সাহিত্য-সমাজের তৃতীয় বার্ষিক অধিবেশনে তিনি অভ্যর্থনা-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এর পর আরো দু-একটি সাধারণ সভায় তিনি উপস্থিত ছিলেন। অবশ্য তাঁর বক্তৃতার কোথাও তিনি সাহিত্য-সমাজ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য মুক্তবুদ্ধিচর্চা সম্পর্কে কিছু বলেননি। তবে সমাজের কারো কারো লেখা সম্পর্কে ঢাকার রক্ষণশীল মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে-বিরূপ প্রতিক্রিয়াজাত বিক্ষোভ দেখা দেয় সে-ব্যাপারে আপস-মীমাংসার ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন বলে জানা যায়। ধারণা করা যায়, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহিত্য-সমাজের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। মুসলিম সাহিত্য-সমাজের কর্মী ও লেখকশ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না এমন অনেকেই এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও চিন্তা-দর্শনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ১৯২৭ সালের ২৭ ও ২৮ শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রথম বার্ষিক অধিবেশনের অভ্যর্থনা-সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের প্রভোস্ট এ. এফ. রহমান (১৮৮৯-১৯৪৫) সাহিত্য-সমাজকে বাঙালি মুসলমান সমাজের নব জাগরণের একটি নতুন উদ্যম বলে অভিহিত করে বলেন, “এই ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ একটা অসীম অভাব দূর করবার জন্যই হয়েছে। এ আমাদের জাতীয় জীবনে একটি নতুন স্পন্দনের চিহ্ন। এই ক্ষীণ প্রবাহটুকু কালে একটা ¯্রােতে পরিণত হয় এই প্রার্থনা করি।” অধিবেশনের সভাপতি খান বাহাদুর তসদ্দক আহমদ মুসলমান সমাজে বিরাজিত নানাবিধ সমস্যার উল্লেখ ও সমাধানের পথনির্দেশ দিয়ে আশা প্রকাশ করেন যে, “আমাদের আজিকার এই অনুষ্ঠান দেখিয়ে মনে হয় রোগ নির্ণীত হইয়াছে। প্রতিকারের ব্যবস্থাও অচিরেই হইবে।” দু’দিনব্যাপী অধিবেশনের শেষে তিনি মন্তব্য করেন, “আজ দুই দিন ধরে আমরা বস্তা বস্তা ময়লা কাপড় ধুয়েছি। মাঝে মাঝে এরূপ করে ময়লা না পরিষ্কার করলে সমাজের মন রুদ্ধ হয়ে যায়।” বিদ্রোহমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমাজের আবর্জনা দূর করার এই প্রয়াসকে তিনি শুভ লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে তিনি বলেন যে শুধু ভাঙলে হবে না, গড়তেও হবে।
১৯২৯ সালে অনুষ্ঠিত সাহিত্য-সমাজের তৃতীয় বার্ষিক অধিবেশনের সভাপত রংপুরের জেলা ও সেশন জজ আবুল মজফফর আহমদ তাঁর বক্তৃতার শুরুতে সাহিত্য-সমাজ জন্মলগ্ন থেকে যে- সব বাধার সম্মুখীন হচ্ছিল সেগুলো থেকে সাফল্য লাভের কামনা করে সকলকে এই সত্য স্মরণ রাখতে বলেন যে, কোনো ভাবধারা, আচার-ব্যবহার, গতিবিধি ইত্যাদি কোনো কিছুই বিচার-বুদ্ধি দ্বারা পরীক্ষা না করে গ্রহণ করা উচিত নয়। কেননা কোনো একটি ভাবধারা একটি বিশেষ দেশে বা আবহাওয়ায় কার্যকরী হলেই তা অন্য দেশে অন্য আবহাওয়ায় অনুরূপ কার্যকরী নাও হতে পারে। বস্তুত এ বক্তব্য ছিল সাহিত্য-সমাজের জীবন-দর্শনের একটি অন্যতম দিক। তিনি তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই এই আশাবাদ তিনি ব্যক্ত করেন যে, যদি সাহিত্য সমাজের “….তরুণ স্বার্থত্যাগী সারথিগণ তাঁহাদের এই কঠিন ব্রতে আরও কিছুদিন ধরিয়া টিকিয়া থাকিতে পারেন তবে আমি নির্ভয়ে বলিতে পারি তাঁহারা অদূর ভবিষ্যতে আমাদের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজের জন্য এক অতি সুন্দর, সুখদায়ক ও উজ্জ্বল প্রভাতের আগমন অনিবার্য করিয়া তুলিবেন।”
তৃতীয় বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানের আমন্ত্রণপত্র পেয়ে কবি জসীমউদ্দীন সাহিত্য-সমাজের সম্পাদককে একটি চিঠি লেখেন। সমাজের কর্ম-প্রয়াসকে স্বাগত জানিয়ে চিঠিতে তিনি বলেন:
আপনাদের সাহিত্য সমাজকে আমি সাহিত্য সমাজ হিসেবেই ধরি নে। মানুষের দুর্দিনের ইতিহাসের পশ্চাতে মানুষের মুক্তির দেবতা শবসাধনা করেন। আজ বঙ্গ মুসলিমের সমাজ আঙিনায় শ্মশানের প্রেতযোগিনীর তাণ্ডবনৃত্য আরম্ভ হয়েছে। কোন দেবতা আজ এই ঘোর অমানিশার অন্ধকারের কুহেলি কুহরে জাতির মুক্তিমন্ত্র রচনা করেছেন তাকে দেখিনি। তবু মনে হয় আপনাদের আহ্বানে সেই দেবতা এসে আমাদের মধ্যে আবির্ভূত হবেন। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় পীড়নের, দুঃখের, বেদনার মন্দির সাজিয়ে বসে থাকি।
চতুর্থ বার্ষিক অধিবেশনের (মার্চ ১৯৩০) অভ্যর্থনা-সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যক্ষ সৈয়দ মোয়াজ্জম হোসেন সাহিত্য-সমাজ প্রতিষ্ঠার পর উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশ গমন করেন। কিন্তু তখনই তিনি নবপ্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন। কিঞ্চিদধিক চার বছর পর দেশে ফিরে তিনি দেখেন যে তার আশা ব্যর্থ হয়নি, সময়ের সঙ্গে পা ফেলে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলেছে। মোয়াজ্জম হোসেন তার ইউরোপবাসের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন যে চিন্তার দৈন্য মানুষের সবচেয়ে বড় দৈন্য। এই দৈন্য যাদের নেই তারাই আজ পৃথিবীতে বর্ধিষ্ণু, জীবন্ত, উন্নতিশীল ও সচল বলে বিখ্যাত। বাঙালি মুসলিম তরুণরাও যে চিন্তার ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে তা দেখে তিনি খুব খুশি হন এবং আশা প্রকাশ করেন সাহিত্য-সমাজের প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে এর কর্মসাধনার ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত ও বহুধা করতে পারবে।
এই অধিবেশনের সভাপতি কলকাতার অ্যাডিশনাল চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর নাসির উদ্দীন আহমদের বক্তৃতায়ও মুসলিম সাহিত্য-সমাজকে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। তাঁর দীর্ঘ ভাষণটি আদ্যন্ত উদার, মুক্ত ও যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা। ভাষণটিতে সাহিত্য-সমাজের দুই প্রধান কর্ণধার আবুল হুসেন ও আবদুল ওদুদের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। নাসির উদ্দীনের মতে ইসলাম যুক্তিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দুর্দমনীয় জ্ঞানস্পৃহা ও ব্যাকুল সত্যানুসন্ধান ইসলামের একটি বড় বৈশিষ্ট্য বলে তিনি মনে করেন। একে পরিত্যাগের ফলেই মুসলমানের দুর্গতির শুরু। আজ সে নিতান্ত দুর্দশাগ্রস্ত। তবে তিনি লক্ষ করেছেন তুরস্ক, মিসর প্রভৃতি মুসলিম দেশে নবজাগরণের হাওয়া লেগেছে। ভারতবর্ষের মুসলমানদের মধ্যেও যুক্তিবাদের প্রসার লক্ষিত হচ্ছে। আর সর্বাঙ্গীণ দুর্দশাপ্রাপ্ত বাঙালি মুসলমানের জীবনেও যে স্বাধীন চিন্তার হাওয়া লেগেছে তার পরিচয় বহন করছে ঢাকার এই মুসলিম সাহিত্য-সমাজ।
অষ্টম বার্ষিক অধিবেশনের (মার্চ ১৯৩৪) সভাপতি মোহম্মদ বরকতুল্লাহ (১৮৯৮-১৯৭৪) সাহিত্য-সমাজের আট বছর পূর্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করে তাঁর ভাষণে বলেন যে, এর মূলে একটি সত্যিকার সাধনা আছে। সমাজের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই তিনি এর প্রগতির দিকে উৎসুক নেত্রে চেয়ে ছিলেন। তিনি জানেন এর চলার পথ নিষ্কণ্টক হতে পারেনি, নানা দুর্যোগ এর উপর দিয়ে বয়ে গেছে। তবু এ বাঁচার প্রবল আকাঙ্ক্ষাতেই বেঁচে আছে। তাই এর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে তিনি বলেন, “সমাজের সভাপতি ও সভ্যগণের এই অপরাজেয় ধৈর্যকে যদি আমরা শ্রদ্ধার চক্ষে না দেখিতে পারি তবে আমাদের নিজেদেরই উপলব্ধির দৈন্য ও অনুদারতা প্রকাশ পাইবে।”
নবম বার্ষিক অধিবেশনের (এপ্রিল ১৯৩৫) অভ্যর্থনা-সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক (পরে জাস্টিস ও উপাচার্য) মোহাম্মদ ইব্রাহিম সাহিত্য-সমাজের কর্ম-প্রয়াসকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “পঙ্গু শ্রীহীন সমাজকে আজ মুক্তবুদ্ধি ও সুস্থ মনের অধিকারী করিতে হইলে তাহাকে আঘাত করা অপরিহার্য হইয়া পড়িয়াছে। এই সাহিত্য-সমাজ যদি সেই অপরিহার্য কর্তব্য পালনে তৎপর হইয়া থাকে, তবে তাহা কোন ব্যক্তিবিশেষ, শ্রেণীবিশেষ বা কোন বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অশ্রদ্ধা বা অবজ্ঞা করিবার উদ্দেশ্যে নহে, সমাজকে উন্ন তকরিবার উদ্দেশ্যে।”
এই অধিবেশনের সভাপতি মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর (১৮৯৬-১৯৫৪) ভাষণটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত সাহিত্য-সমাজের স্পিরিটিকে জাজ্বল্যমানরূপে সামনে রেখে এমন বিজ্ঞানমনস্ক, সাহসী ও সত্যভাষণ এই সংগঠনের বহির্ভূত আর কোনো ব্যক্তি করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। ভাষা ও রচনাভঙ্গি বাদ দিলে ভাষণটিকে আবুল হুসেন বা আবদুল ওদুদেরই তারুণ্য ও মুক্তবুদ্ধিবিষয়ক রচনা বলে মনে হবে। ওয়াজেদ আলী সাহিত্য-সমাজকে দেখেছেন কালের পরিপ্রেক্ষিতে। তাই সঙ্গতভাবে একে চিহ্নিত করেন ‘কালের সৃষ্টি’ বলে। বক্তৃতার একেবারে শুরুতে ভাষায় কাব্যময়তার আমেজ দিয়ে যে-গৌরচন্দ্রিকা তিনি করেন তা থেকে সাহিত্য-সমাজ সম্পর্কে তাঁর মনোভাব স্পষ্টরূপে বোঝা যায়-
সাহিত্য সমাজের পক্ষ থেকে প্রথম যেদিন নিমন্ত্রণ গেলো, সেদিন একটি কথা বিশেষভাবে আমার মনে এসেছিলো। বুড়িগঙ্গার কূলে ঐতিহাসিকের যে-ঢাকা তার আহ্বান আমার কাছে খুব বেশি সত্যি হতে পারে না। কিন্তু পুরাতন ঢাকার জীর্ণতাকে ভেদ করে এক নতুন ঢাকা জন্মলাভ কচ্ছে। আলোকপন্থী তরুণ বন্ধুদের চিত্তসুন্দর সাধনা এর প্রথম মাল-মসলা জুগিয়েছে। এর পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে যে-নদী সে বুড়িগঙ্গা নয়, সে এক নবগঙ্গা, যার আসন্ন যৌবনসম্ভাবনার রূপের ছোঁয়ায়, রসের প্রাচুর্যে নতুন ঢাকা ধীরে ধীরে স্ফূর্ত হয়ে উঠেছে আমাদের চোখের সামনে জীবনশ্রীমণ্ডিত এক অপূর্ব মূর্তিতে।
মুসলিম সাহিত্য-সমাজের মূলমন্ত্র যেহেতু ছিল বুদ্ধির সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই এটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ (ঝবপঁষধৎ) একটি সংগঠন। সে-কারণে অনেক হিন্দুও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং এর কর্ম-প্রয়াসকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তৃতীয় বার্ষিক অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবি-সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২) ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ নামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। প্রবন্ধের শুরুতে তিনি বলেন, “আজিকার এই বিদ্বজ্জন-সমাজে কোনও নতুন কথা শুনাইবার মত পাণ্ডিত্য আমার নাই- এই রূপ অনুষ্ঠানে প্রাণে যে আনন্দ সঞ্চার হয়, সেই আনন্দের আবেগে কিছু প্রাণের কথাই নিবেদন করিব। ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ এই নামটির মধ্যেই এমন কিছু আছে যাহা চিরদিন আমার অন্তরের গোপন আশাকে সঞ্জীবিত করিয়া, একটি স্বপ্নকে সত্য করিয়া তোল। মোহিতলালের সেই স্বপ্ন হচ্ছে বাঙালি মুসলমান একদিন আপন জাতিসত্তা সচেতন হয়ে বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চায় ব্রতী হবে, যা হবে একই সঙ্গে তাদের নিজেদের এবং সমগ্র বাঙালির।
সাহিত্য-সমাজের দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সাধারণ অধিবেশনে (২৪ জুলাই, ১৯২৭) আবুল হুসেনের বিস্ফোরণমূলক প্রবন্ধ ‘আদেশের নিগ্রহ’ পাঠ করা হলে সেদিন এবং পরেও যথেষ্ট ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। পাঠের দিনই মোট বারো জন আলোচক প্রবন্ধটি সম্পর্কে আলোচনা করেন। অষ্টম আলোচন অধ্যাপক নলিনীকান্ত ভট্টশালী লেখকের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলেন,
অনেকে তাঁহাকে ভুল বুঝিয়াছেন- হয়ত অনেকে তাঁহার প্রকাশভঙ্গিতে ব্যথা পাইয়াছেন। বাস্তবিক পক্ষে তাঁহার লেখা শুনিয়া মনে হয়, তিনি সমাজকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। আবার ভালোবাসিলেই আঘাত করিবার অধিকার জন্মে। … লেখকের মতবাদ অনেকটা বুদ্ধের মতবাদের ন্যায় – আমরা যাহা বুঝিতে পারি না, তাহা লইয়া বেশি মাথা না ঘামাইয়া নিজের চেষ্টায় কাজ করিয়া যাওয়া উচিত, তাহাতেই উন্নতি, তাহাতেই মুক্তি।
সর্বশেষ বক্তা অধ্যাপক চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় সত্যোচ্চারণে লেখকের স্পষ্টবাদিতা ও নির্ভীকতাকে বিশেষভাবে প্রশংসা করে বলেন, “… লেখক ঐহিকতাকেই বড় বলেন নাই – তিনি বলিয়াছেন, ধর্ম-পিতাকে পাবার জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নাই। জ্ঞানই জগতেই (জগতের) আশ্রয় – সেই বেহেশত, আর অজ্ঞানই দোজখ।”
সাহিত্য-সমাজের তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় অধিবেশনে (২২ জুলাই, ১৯২৮) খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ বিপিনচন্দ্র পাল (১৮৫৮-১৯৩২) উপস্থিত ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি সেদিনকার অধিবেশনের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলে কার্যবিবরণীতে মন্তব্য করা হয়েছে। মুসলিম সাহিত্য-সমাজের মতো ‘এত বড়’ প্রতিষ্ঠান যে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে তাতে তিনি যেমন বিস্ময় প্রকাশ করেন, তেমনি আনন্দ ও গৌরববোধ করেন।
তিন.
আগেই বলা হয়েছে, মুসলিম সাহিত্য-সমাজের উদার, মুক্ত, যৌক্তিক ও বিচারশীল চিন্তা-দর্শন সম্পর্কে এই মনোভাব অবিমিশ্র হয়নি। আপত্তি ও বাধা এসেছিল রক্ষণশীল ও সামন্তবাদী মুসলমানদের পক্ষ থেকে। এতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল সাপ্তাহিক ও মাসিক ‘মোহাম্মাদী’ এবং দৈনিক ‘ছোলতান’ পত্রিকা, আর ঢাকার সামন্ততন্ত্রের দুর্গ নবাব-বাড়ি। সাহিত্য-সমাজের অধিবেশনে উপস্থিত থেকেছেন এমন কেউ কেউও সমাজের সকল মতামত মানেননি।
সাহিত্য-সমাজের প্রথম বর্ষের পঞ্চম সাধারণ অধিবেশনে (৮ জুলাই, ১৯২৬) কাজী আবদুল ওদুদ তাঁর বিতর্ক সৃষ্টিকারী প্রবন্ধ ‘সম্মোহিত মুসলমান’ পাঠ করেন। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। প্রবন্ধটি পঠিত হওয়ার পর সভাপতি এর উপর আলোচনার জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু কেউ আলোচনায় উৎসাহ দেখাননি। তখন সভাপতি নিজেই তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। কার্যবিবরণীর বর্ণনা থেকে বোঝা যায় সভাপতি প্রবন্ধকারের বক্তব্যে তেমন খুশি হননি। আবদুল ওদুদ তাঁর প্রবন্ধে ইসলাম ও মুহম্মদের প্রতি মুসলমানদের অন্ধ অনুবর্তিতার যে-সমালোচনা করেন, তা স্বীকার করেও সভাপতি বলেন যে, এক শ্রেণীর মানুষের জন্য এর বিস্তর প্রয়োজন রয়েছে। তিনি লেখককে স্মরণ রাখতে অনুরোধ করেন যে এই সত্যই একমাত্র সত্য নয়।
‘সম্মোহিত মুসলমান’ পঠিত হওয়ার পর এটি প্রথম প্রকাশিত হয় মাসিক ‘অভিযান’ পত্রিকায়, ভাদ্র ১৩৩৩- এ। একই বছরে এটি লেখকের ‘নব পর্য্যায়’ (১ম খণ্ড) গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। মাসিক ‘মোহাম্মদী’র চারটি সংখ্যায় (ফাল্গুন, চৈত্র ১৩৩৪ ও বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৫) ধারাবাহিকভাবে ‘নব পর্য্যায় না নব পর্য্যয়’ নামে গ্রন্থটির বিরূপ সমালোচনা লেখেন মৌলানা আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮)। তাতে লেখকের কিছু কিছু অভিমতকে যুক্তির হিসেবে অপ্রামাণ্য, ইতিহাসের হিসেবে ভিত্তিহীন ও ধর্মের হিসেবে মারাত্মক বলে মত প্রকাশ করা হয়। বিশেষভাবে ‘সম্মোহিত মুসলামন’ সম্পর্কে বলা হয়, “…. প্রবন্ধটি বিশেষ মনোযোগ সহকারে পড়িয়াছি এবং পড়িয়া এই স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছি যে, কাজী ছাহেব নব-পর্যায়ের নামে বস্তুত এছলামের বিপর্যয় সাধন করারই চেষ্টা করিয়াছেন।”
মাসিক ‘অভিযান’ -এর পূর্বোক্ত সংখ্যায় আবুল হুসেনের ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এটিও বিতর্কের সৃষ্টি করে। সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’ এবং দৈনিক ‘ছোলতান’ পত্রিকায় এর বিরূপ আলোচনা হয়। ঢাকার ‘জাগরণ’ নামক মাসিক পত্রিকায় লেখক দুই কিস্তিতে (বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৫) ‘সব জনতা’ নামে বিরুদ্ধবাদীদের বক্তব্যের জবাব দেন। ধর্ম নিয়ে পত্র-পত্রিকায় এসব বিতর্ক ও বাদ-প্রতিবাদের ফলে ঢাকার রক্ষণশীল মুসলিম সম্প্রদায় অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। তাঁদের পক্ষ থেকে নানা রকম জোরজবরদস্তিরও সূচনা হয়। এমতাবস্থায় ঢাকার বলিয়াদীর জমিদার খান বাহাদুর কাজেম উদ্দীন আহমদ সিদ্দিকীর উদ্যোগে তার বাসভবনে আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেনের সঙ্গে এক আলোচনার ব্যবস্থা হয়। উত্তর-প্রত্যুত্তরমূলক এই আলোচনা একাধিক দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়। শেষে ‘তিক্ত-বিরক্ত’ হয়ে অভিযুক্ত আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেন ১৯২৮ সালের ২০ আগস্ট দুখান ‘ঘোষণাপত্র’ লিখে দেন। কোরান ও রসূলের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসের কথা ব্যক্ত করে ঘোষণাপত্রে তাঁরা বলেন যে, তাঁদের ভাষা যদি মুসলিম সমাজের মনে আঘাত দিয়ে থাকে তবে সে জন্য তাঁরা দুঃখিত এবং খোদার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আবুল হুসেন মুসলিম সমাজের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
এই স্বীকারোক্তি ও ক্ষমাপ্রার্থনায় মাসিক ‘মোহাম্মদী’ স্বভাবতই সন্তোষ প্রকাশ করে এবং লেখে যে, এই শুভদিনের আশায় তারা ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক অনেক লেখা তাদের পত্রিকায় ছাপেনি। এখন থেকে আবুল হুসেনের সঙ্গে তাঁদের আর কোনো বিরোধ নেই।
কিন্তু ‘মোহাম্মদী’র সন্তুষ্টি বেশিদিন বজায় থাকেনি। বজায় থাকেনি। সাহিত্য-সমাজের দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সাধারণ অধিবেশনে (২৪ জুলাই ১৯২৭) আবুল হুসেন ‘আদেশের নিগ্রহ’ নামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। এটি ‘শান্তি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ সালের আশ্বিন সংখ্যায়। পরে ঢাকার সাপ্তাহিক ‘বাংলার বাণী’তে লেখাটির কিয়দংশ ‘শান্তি’ থেকে সংকলিত হয়। সংকলিত লেখাটুকু পড়েই ‘মোহাম্মদী’ আবার কূপিত হয়ে ওঠে। আবুল হুসেনের আগে কৈফিয়ত বা ‘তওবার’ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লেখা হয় যে, এত অল্প সময়ের মধ্যে লেখক আগের কথা কি ভুলে গেছেন, না আবার স্বরূপ প্রকাশ করেছেন অথবা নিজের অগোচরে ইসলামবিরুদ্ধ বক্তব্য প্রকাশ করেছেন তা তাদের জানা নেই। তবে এতে ইসলামকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে তাতে আর্যসমাজী ও খ্রিস্টান মিশনারিরাও তাঁর কাছে হার মানবে। এসব বক্তব্যকে বিবেচনা করা হয় হিন্দু নবজাগরণবাদীদের প্রভাবের ফল হিসেবে।
‘আদেশের নিগ্রহ’ যেদিন পাঠ করা হয় সেদিন এর আলোচনা করতে গিয়েও কেউ কেউ নিজেদের ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট মনোভাব প্রকাশ করেন। কিন্তু এ প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়া কেবল মৌখিক আলোচনা ও লেখালেখির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা জবরদস্তির পর্যায়ে গড়ায়। উল্লিখিত ঘটনার ক’মাস পর ১৯২৯ সালের ৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় আহসান মঞ্জিলের আঞ্জুমান অফিসে আবুল হুসেনের বিচারসভা বসে। তিনি তখন ঢাকার জজকোর্টের উকিল। তাঁর লেখার বক্তব্য বিকৃত করে উর্দুভাষীদের মধ্যেও প্রচার করা হয়। ফলে তারাও ক্ষেপে ওঠে।
ঢাকা জীবনের নানা ব্যাপারে নবাব-বাড়ির তখনো যথেষ্ট প্রভাব ছিল। অনেকগুলো পঞ্চায়েতে বিভক্ত ঢাকা শহর মূলত তাঁদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতো। “মহল্লা সরদার থেকে পুলিশের বড়কর্তা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট, ভাইস-চ্যান্সেলর পর্যন্ত তাঁদের কথায় ওঠা-বসা করত।” ফলে তাঁদের আহূত সভায় আবুল হুসেন হুমকির মুখে এই বলে ‘ক্ষমাপত্র’ লিখে বাধ্য হন যে, “ঐ প্রবন্ধের ভাষা দ্বারা মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দের মনে যে বিশেষ আঘাত দিয়াছি সেজন্য আমি অপরাধী।”
আবুল হুসেন সে-বছর সাহিত্য-সমাজের সম্পাদক ছিলেন। এই অপমানকর ও বেদনাদায়ক ঘটনার পরদিনই (৯ ডিসেম্বর) তিনি ঐ পদত্যাগ করেন। তাহলেও সাহিত্য-সমাজের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। তবে আগে দুঃসাহসিক ভূমিকা অনেকখানি পরিহার করে তিনি সমাজ-সংস্কারের কিছু গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
সাহিত্য-সমাজের দুই প্রধান ভাবুক কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেন দু’জনেই ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন। ইসলামে তাঁদের আস্থা ছিল। অথচ তাঁদের বিরুদ্ধে ইসলামদ্রোহের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল, তাঁরা অভিহিত হয়েছিলেন ইসলামের শত্রুরূপে। আসলে তাঁরা এবং সামগ্রিকভাবে সাহিত্য-সমাজ যা ভেবেছিলেন ও করতে চেয়েছিলেন তা হলো বাঙালি মুসলমানের মতো একটি অনুন্নত সমাজের চিন্তার মুক্তি ও পরিধির বিস্তার ঘটিয়ে তাঁদের জাগতিক জীবনকে উন্নত ও ধর্মীয় উপলব্ধিকে গভীরতর করা।
চার.
মুসলিম সাহিত্য-সমাজ বাঙালি মুসলমান সমাজে যে একটি রেনেসাঁস বা নবজাগরণ ঘটাতে চেয়েছিলেন সে- ব্যাপারে তাঁরা সংগঠনের অস্তিত্বকালে (১৮২৬-১৯৩৬) যেমন, তেমনি পরেও সচেতন ছিলেন। তাঁরা ছাড়া পরবর্তীকালে আরও কেউ কেউ তাঁদের চিন্তাÑচেতনা কর্মকাণ্ডকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেয়েছে। মনীষী অন্নদাশঙ্কর রায় একে অভিহিত করেছেন বাংলার দ্বিতীয় রেনেসাঁস বলে। বাঙালি মুসলমানের জীবনে আধুনিকতা-সন্ধানী একজন গবেষক মন্তব্য করেছেন,
…the ‘Emancipation of the intellect movement’ of the muslims sahity samaj can be termed as a collective endeavour for an extention of the nineteenth century renaissance among the Bengali Muslim in the 20th century.
আর সাম্প্রতিককালে কথা সাহিত্যিক আবুল বাশার সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর (১৯২২-৭১) ‘লাল সালু’ উপন্যাস সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, “এ ছিল স্বল্পায়ু, সীমাবদ্ধগতি এবং কাল-বিঘ্নিত, তবু একেই বলতে হবে পিছিয়ে থাকা বাঙালি মুসলমানের যুগ-আনুকূল্যহীন রেনেসাঁস।”
বাংলাদেশের বিশিষ্ট প্রবন্ধকার আবদুল হক মুসলিম সাহিত্য-সমাজকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। তিনি লিখেছেন,
“মুসলিম সাহিত্য-সমাজের লেখকদের দৃষ্টি ছিল যুক্তিবাদীর দৃষ্টি, চিন্তাসংস্কারের দৃষ্টি, এবং সমাজ-সংস্কারের। তাঁদের দৃষ্টি ছিল রেনেসাঁর দৃষ্টি; চিন্তার গতানুগতিকতা থেকে এবং ঐতিহ্যের অন্ধ-অনুবর্তিতা থেকে তাঁরা বাঙ্গালী মুসলিম-সমাজকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন; অতীতের, ইসলামের এবং বর্তমানের যা-কিছু ভালো তা আত্মসাৎ করে তাকে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন সঙ্কীর্ণতামুক্ত সুস্থ-উদার বিশ্বমানবতার আকাশতলে, যেখানে বাঙ্গালী মুসলমান বিশ্বজনীন চিন্তার অংশীদার এবং আধুনিক জগতের প্রাগ্রসর সমাজ ও জাতিসমূহের সমপর্যায়ে সৃষ্টিচঞ্চল।”
এ প্রসঙ্গে আবদুল হক আরো লিখেছেন,
“রেনেসাঁর কয়েকটি বড় লক্ষণ ‘সাহিত্য-সমাজের’ মধ্যে বর্তমান ছিল; অন্ধানুবর্তিতা বর্জন, জ্ঞান-পিপাসা ও যুক্তিবাদিতা, পৃথিবীর মানস-সম্পদ আহরণ করে জাতির জীবনকে সমৃদ্ধ করা, ললিতকলার চর্চা করে জীবনকে সুন্দর করা, এসবেরই প্রেরণা পাই তাঁদের মধ্যে।”
মুসলিম সাহিত্য-সমাজ সম্পর্কে প্রথম বিস্তারিত গবেষণা করেছেন খোন্দকার সিরাজুল হক। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ : সমাজচিন্তা ও সাহিত্যকর্ম’ শীর্ষক তাঁর শ্রমসাধ্য গবেষণা সন্দর্ভে তিনি আদ্যন্ত চালিত হয়েছেন উদার ও যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা। রেনেসাঁসি মন-মনন ও দৃষ্টিভঙ্গি যে সাহিত্য-সমাজের কর্ম-প্রয়াসে প্রেরণা-উদ্দীপক শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল সে- কথা স্বীকার করে তিনি লিখেছেন, “বাংলার মুসলমানদের মধ্যে নবজাগরণের আদর্শকে জীবন্ত করে তোলাই ছিল এঁদের প্রধান উদ্দেশ্য। তাই তাঁরা সংকীর্ণ রাজনীতির পথ পরিহার করে আধুনিক শিক্ষাদীক্ষার প্রসার এবং শিল্প-সাহিত্যের চর্চার মধ্যেই তাঁদের প্রয়াসকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন।”
এ ছাড়া সাহিত্য-সমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আবদুল কাদির (১৯০৬-৮৪) এর চারিত্র্যকে তুলনা করেছেন হিন্দু কলেজের তরুণ শিক্ষক হেনরি লুই ডিরোজিও (১৮০৯-৩১) প্রতিষ্ঠিত ‘একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’- এর সঙ্গে। এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত তরুণরাই ‘ইয়ং বেঙ্গল’ নামে ইতিহাসে কীর্তিত হয়েছেন। আবদুল কাদির বলেছেন “ইয়ং বেঙ্গল দলের চিন্তা-চেতনায় প্রাধান্য পেয়েছিল পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ; আর মুসলিম সাহিত্য সমাজের অধিকাংশ সদস্যের আদর্শ ছিল নবমানবতা বা উদার মানবিকতা এবং কোনো কোনো সদস্যের মনে ছায়া ফেলেছিল সমাজতান্ত্রিক মানবিকতা।”
রেনেসাঁস-বিশেষজ্ঞ বাঙালি পণ্ডিত অন্নদাশঙ্কর রায়, শিবনারায়ণ রায় প্রমুখ আরো অনেকেই এ তুলনা করেছেন। শিবনারায়ণ রায় তাঁর ‘The Sikha (1927-32) Movemen’ প্রবন্ধে লিখেছেন,
During its brief life sikha became the center of a unique intellectual movement which both in the scope and vigour of its inquiry and in the intensity of opposition which it generated among powerful sections of the community in Bengal was reminiscent of another movement which had taken place in calcutta exactly a hundred years earlier.
পাঁচ.
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের চিন্তা-দর্শনকে অবশ্য ভিন্ন যুক্তির আলোকেও দেখা হয়েছে। চিন্তাবিদ অধ্যাপক আহমদ শরীফ (১৯২১-৯৯) অভিমত প্রকাশ করেছেন যে সাহিত্য-সমাজের প্রধান লেখকেরা যে-কথা বলতে চেয়েছিলেন তাতে ধর্মের ‘জারকরস’ মেশানো উচিত হয়নি, “কেননা তাদের আবেদন ছিল বাস্তব সমস্যার ভিত্তিতে মানুষের বুদ্ধি, শ্রেয় চেতনা, বিচারশক্তি তথা যুক্তিবোধের কাছে। এরূপ ক্ষেত্রে ধর্মীয় মোড়কে পরিবেশিত তত্ত্ব প্রায়ই লক্ষ্যভ্রষ্ট করে এবং কেবল নতুন গোঁড়ামির জন্ম দেয়, যা আরো ক্ষতিকর হয়, অগ্রাহ্যও হয়।” এ বক্তব্যের প্রথমাংশের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নেই, কিন্তু শেষাংশে তা আছে বলে আমাদের মনে হয়। আবুল হুসেন বা আবদুল ওদুদের এতদসংক্রান্ত লেখা পড়লে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ধার্মিকতা বলতে তারা বুঝেছেন নীতিবান, বিবেকবান, হৃদয়বান, চরিত্রবান, বিচারপ্রবণ, প্রভৃতি মানবীয় গুণে গুণান্বিত হওয়া। আল্লাহর গুণে বিভূষিত হও– এই হাদিসটিকে তাঁরা অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিলেন এবং মুসলমান সমাজকে আহ্বান জানিয়েছিলেন সে-সব গুণ অর্জন করার জন্য। তাঁদের ধারণা, তা করতে না পারলে ধর্মের বাহ্যিক ক্রিয়ানুষ্ঠান অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।
এসব কথা সহিত্য-সমাজ যাঁদেরকে বোঝাতে চেয়েছিলেন তাঁরা ছিলেন বিশেষভাবে ধর্মকাতর, কিন্তু প্রকৃত ধর্মবোধশূন্য, অথবা সেই বোধের কম-বেশি অভাব তাঁদের মধ্যে ছিল। ফলে তাঁদের কল্যাণ চাইতে গিয়ে সাহিত্য সমাজের লেখকদের ধর্ম নামক ব্যাপারটিকে সম্পূর্ণরূপে অন্তরালে রেখে কিছু বলা বা করা সম্ভব ছিল বলে মনে হয় না। এ প্রসঙ্গে রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (১৮২০-৯১) ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। সতীদাহ প্রথা নিবারণ ও বিধবা বিবাহ প্রচলনেরও আবেদন ছিল মূলত মানুষের মানবিকতা, শ্রেয়:চেতনা ও বিচারবোধের কাছে। কিন্তু তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন ধর্মার্ত হিন্দু সমাজের শুধু এসব বোধের কাছে আবেদন জানালে কাজ হবে না। তাই শাস্ত্র থেকে তাঁদের আহরণ করতে হয়েছিল যুক্তির আয়ুধ। কেননা এসব সমস্যা একান্তভাবে মানবীয় হলেও এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিল ধর্মবিশ্বাস। মুসলমান সমাজেরও অনেকগুলি সমস্যা ছিল ধর্মবিশ্বাসসম্পৃক্ত। তাই কেবল শ্রেয়:চেতনা আর যুক্তিবোধের কাছে – যা অধিকাংশ বাঙালি মুসলমানের ছিল না – আবেদন পেশ করলেই তাঁদের উদ্দেশ্য সফল হতো এমন কথা নিশ্চয় করে বলা সম্ভব নয়। কেননা মুসলিম-মানস তার উপযোগী ছিল না। সাহিত্য-সমাজ প্রথমে সে-কাজটিই করতে চেয়েছিলেন। তাঁদের আন্দোলন কেন বিশেষ সফলতা ছাড়াই বন্ধ হয়ে যায় সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ, কিন্তু সমস্যাকে তাঁরা যে অনেকখানি সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।