‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ (১৯২৬) এবং ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রতিবেশী প্রাগ্রসর হিন্দু সমাজের তুলনায় বিদ্যা ও বিত্তে পিছিয়ে পড়া মুসলমান সমাজকে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংস্কারাচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করা। তাদের মনে প্রাগ্রসর আধুনিক চেতনার বীজ বপণ করা, জ্ঞান-বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে জীবনকে সমৃদ্ধ ও উন্নত করা। তাই বলা যায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এবং তাদের মুখপত্র ‘শিখা’ (১৯২৭-৩১) পত্রিকার ভূমিকা ছিল মূলত সমাজসংস্কার। ‘শিখা’ পত্রিকার শীর্ষে মুদ্রিত ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’ এই শ্লোগানটির বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে সেটা পরিষ্কারভাব বোঝা যায়। এই আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে কাজ করেছিলেন তৎকালীন পূর্ববাংলার অনগ্রসর বাঙ্গালি মুসলমান সমাজ থেকে উঠে আসা একদল আলোকদীপ্ত মানুষ কাজী আনোয়ারুল কাদির (১৮৮৭-১৯৪৮), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), আবুল হুসেন (১৮৯৭-১৯৩৮), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), আবুল ফজল (১৯০৩১৯৮৭) প্রমূখ। ‘শিখা’ নামকরণের মধ্যেই সেই প্রত্যয়, দৃঢ় অভীপ্সা স্পষ্ট হয়। তাদের মধ্যে আবুল ফজল ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। এই আন্দোলনের অন্যতম রূপকার হিসেবে ‘শিখা’ পত্রিকা সম্পাদনা (১৯৩১) তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন আবুল ফজলের জীবনদৃষ্টি ও চিন্তা-চেতনা পরিবর্তনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। এবং শেষদিন পর্যন্ত আবুল ফজল উদার, মানবতাবাদী, বিবেক শাসিত চেতনার শিখাটি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন।
আবুল ফজল এবং তাঁর মননশীল ও সৃজনশীল সাহিত্যকর্মকে তাই মূল্যায়ন করতে হবে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের পটভূটিমতে। তাঁর লেখার বিষয় ও লক্ষ্যবস্তু ছিল বাঙ্গালি মুসলমান সমাজের মানস-চৈতন্যের স্বরূপ উন্মোচন। একাজে তাঁর নিরন্তর আন্তরিক প্রচেষ্টা, বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক দক্ষতা ছিল অবিস্মরণীয়। কারণ, তিনি ছিলেন একাধারে সৃষ্টিশীল এবং মননশীল লেখক। অন্যদিকে বাঙ্গালি মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরীণ চেহারা এবং মুসলমানদের মানস-চেতনার রূপটি তাঁর পরিষ্কারভাবে জানা ছিল। তিনি নিজেও ওই সমাজ থেকে উঠে আসা একজন ছিলেন, ফলে সমাজের দিকে তাঁর ফিরে তাকানো কেবল পেছন ফিরে দেখা ছিলনা। আন্তরিক দরদ দিয়ে বাঙ্গালি মুসলাম সমাজ মানসকে পরম যত্নে তিনি শৈল্পিক শুশ্রুষা দিযেছেন। ১৯২৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রচেষ্টায় পর্দাবিরোধী (Anti-purdah league) প্রতিষ্ঠা হলে আবুল ফজল এ সংঘের এক সভায় ‘পর্দা প্রথার সাহিত্যিক অসুবিধা’ নামে একটি প্রবন্ধ পড়েন। প্রবন্ধটি সেইসময় অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘চৌচির’ (১৯৩৪) পড়ে আবুল ফজলকে লেখা এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
‘আধুনিক মুসলমান সমাজের সমস্যা ওই সমাজের অন্তরের দিক থেকে জানতে হলে সাহিত্যের পথ দিয়ে জানতে হবে- এই প্রয়োজন আমি বিশেষভাবেই অনুভব করি। আপনাদের মতো লেখকদের হাত থেকেই এই অভাব যথেষ্টভাবে পূর্ণ হতে থাকবে এই আশা করে রইলুম।’
রবীন্দ্রনাথের এই আশাবাদ আবুল ফজলের গল্প-উপন্যাসে, উত্তরকালে অনুসৃত হতে দেখা যায়। দ্বিতয়ত উপন্যাসে ‘প্রদীপ ও পতঙ্গ’ (১৯৪০) এর উচ্চশিক্ষিত মুসলীম তরুণী জোহরার ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক জীবনের জটিল বাস্তবতা অঙ্কনে আবুল ফজল বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। উপন্যাসের কাহিনিতে দেখা যায়, নায়ক রশীদ জোহরার প্রেমে পড়লেও চাকরানী রাবেয়ার গর্ভে তার অবৈধ সন্তান এলে সে হঠাৎ নিরুদ্দিষ্ট হয়। এদিকে রুচিহীন হোসেনের সঙ্গে জোহরার বিয়ে হলেও একবছরের মাথায় বিয়ে ভেঙ্গে যায়। ঘটনাচক্রে জোহরা রশীদ-রাবেয়ার সন্তানটির লালন-পালনের দায়িত্ব নেয়। পুরুষের প্রতি প্রবল ঘৃণা সত্ত্বেও জোহরা পূর্বতন প্রেমিক রশীদকে বিয়ে করে এবং তার মনে এই আশা ছিল যে সন্তানটি তার আসল পিতাকে কাছে পাবে। কিন্তু রশীদ শিশুটিকে গ্রহণ করেনা এবং জোহরা ও তার মধ্যে সম্পর্কের অন্তরায় হিসেবে দেখে। জোহরার আত্মকথনে বিকাশমান মুসলমান নারীর জটিল মানস-সংকট উন্মোচনে আবুল ফজল যথেষ্ট শিল্প কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এবং ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে আবুল ফজলের শিল্প-মানসে গড়ে উঠে অসাম্প্রদায়িক, সংস্কারমুক্ত, যুক্তিবাদী জীবনদৃষ্টি। তাঁর উপন্যাস নিবিড়ভাবে পড়লে বোঝা যায়, নতুন মূল্যবোধ নিয়ে বাঙ্গালি মুসলাম মধ্যবিত্ত নারী তাদের দ্বন্দ্বজটিল চরিত্র নিয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। ‘জীবন পথের যাত্রী’ (১৯৪৬) উপন্যাসে হেনা ও মামুনের প্রেমকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও ব্যক্তির অন্তর্দ্বন্দ্ব, শ্রেণিদ্বন্দ্ব প্রধান হয়ে উঠেছে। আইনজীবী বাবার-ঐশ্বর্যে লালিত অহংকারী কন্যা হেনা, মেধাবী তরুণ মামুনের কাছে প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ হলে ক্ষুব্ধ অভিমানে জ্বলে উঠে। উপন্যাসের পরিণতিতে দেখা যায়, পিতার মৃত্যুর পর হেনার জীবনবোধ পরিবর্তিত হয়। মামুনের প্রতি তার আকর্ষণ প্রবলতর হলেও মামুনের নির্বিকারত্ব তাকে হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। হেনার ছোটভাই মহসীন বিলেত থেকে সাম্যবাদী আদর্শের দীক্ষা নিয়ে দেশে ফিরলে, মামুন সে আদর্শে প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়। সাম্যবাদী আদর্শ প্রচারের দায়ে পুলিশ মহসীনকে গ্রেপ্তার করলে হেনা সে আদর্শ প্রচারের কাজে এগিয়ে আসে। হেনা ও মামুনের আকস্মিকভাবে সম্মিলন ঘটে। সাম্যবাদী আদর্শই তাদেরকে ঐক্যসূত্রে গ্রথিত করে। চল্লিশের দশকে বাঙ্গালি মুসলমানদের সীমাবদ্ধ চিন্তা-চেতনার প্রেক্ষাপটে বিচার করলে আবুল ফজলের ‘জীবন পথের যাত্রী’ উপন্যাসের তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়।
আবুল ফজলের সাহিত্য-সাধনের দীর্ঘ পথের দিকে তাকালে চারটি দিক চিহ্নিত করা যায়। এক. ত্রিশ, চল্লিশ দশকে বাঙ্গালি মুসলমান সমাজ বাংলা ভাষাকে ‘হিন্দুর ভাষা’ বলে একধরনের অবজ্ঞা করতো এবং উর্দু ভাষাকে আপন ভাষা মনে করার এক অদ্ভূত মানসিকতা লালন করতো। আবুল ফজল বাঙ্গালি মুসলমাদের এ-মানসিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৬২ সালে ‘মাতৃভাষা ও বাঙ্গালি মুসলমান’ প্রবন্ধে বলেন- ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মাতৃভাষা কী? উর্দু না বাংলা? আমার মতে ইহাই সর্বাপেক্ষা অদ্ভূত কথা।’
দুই.
তৎকালীন বাঙ্গালি মুসলমান সমাজে সঙ্গীত এবং চিত্রশিল্প চর্চাকে নাজায়েজ, গুনাহের কাজ বলে গণ্য করা হতো। আবুল ফজল এই বিষয়টি উপন্যাসের কাহিনিতে শৈল্পিক পরিচর্যা করেছেন। ‘চৌচির’ উপন্যাসের নায়ক তসলিম বিদেশে জাদুঘরে চিত্রশিল্প দেখে আত্মবিশ্লেষণ করে-
‘মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ভাবধারা প্রকাশের একমাত্র বাহন যে চিত্রশিল্প, তা কি মানুষের ধর্ম ইসলাম হারাম করিতে পারে? এ আমাদের ইসলামকে বুঝিবার ও বুঝাইবার ভুল। এটা হারাম, ওটা নাজায়েজ, এই করিয়া বিশ্বের এই জ্ঞানের অভিযানে আধুনিক মুসলমান তাহার হক আদায় করিতেছে না। এই জন্য একদিন তাহাকে পস্তাইতে হইবে।’
এই কাজ চল্লিশের দশকে বসে আবুল ফজল করেছেন। আজকের প্রাগ্রসর মুসলমান সমাজে বসে সেই যুগের বাস্তবতা বোঝা খুবই কঠিন। আব্বাস উদ্দীন, আব্দুল আলীমের কণ্ঠে নজরুলের লেখা ইসলামী সঙ্গীত, হামদ, নাত কিংবা শিল্পচার্য জয়নুল, সুলতান, কামরুলের জন্ম হতো না, যদি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলনের ফলে আবুল ফজলের মতো উদার মানবতাবাদী লেখকের কলম সোচ্চার না হতো।
তিন.
পর্দার অন্তরালে নারীর বন্দিদশাকে আবুল ফজল মুসলমানদের জন্য একটি সাহিত্যিক বাধা হিসেবে দেখেছিলেন। ত্রিশ-চল্লিশের দশকে তৎকালীন পূর্ববাংলার মুসলামন নারীরা বাস্তবিক অর্থে বেগম রোকেয়া কথিত ‘অবরোধ বাসিনী’ ছিল। আবুল ফজল ‘পর্দা প্রথার সাহিত্যিক অসুবিধা’ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য ছিল, মুসলমান নারীসমাজ পর্দায় বন্দি বলে নারীর জীবনধারা সম্পর্কে মুসলমান লেখকরা জানতে পারছেনা। নারীর অন্তর্জীবন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার ফলে মুসলমানদের হাতে যে সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে নিছক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। চতুর্থ দিক হচ্ছে, যুক্তিবাদের বদলে অন্ধ বিশ্বাসাচ্ছন্নতা। মোল্লা-মৌলভীরা সীমিত শিক্ষা ও সংকীর্ণ চিন্তা দ্বারা ধর্মীয় নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে বাঙ্গালি মুসলমানদের চিন্তাজগতকে পশ্চাদ করে রেখেছে। আবুল ফজল এই অবস্থার অবসান এবং বাঙ্গালি মুসলমানদের চেতনার জাগরণে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। আবুল ফজলের সাহিত্য কর্মের তাৎপর্য অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জাগ্রত বিবেকের জায়গায় দাঁড়িয়ে সমকালীন সমাজকে দেখেছেন। বিকাশমান বাঙ্গালি মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজের সংকটকে চিহ্নিত করেছেন এবং সংকট উত্তরণের প্রয়াসে সৃষ্টিশীল ও মননশীল সাহিত্য রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁর গল্প-উপন্যাসে সমাজ-সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তার প্রয়োজনীয় শুশ্রুষা দিয়েছে। মুসলমান মধ্যবিত্তের জাগতিক ও মনস্তাত্ত্বিক রক্ষণশীলতার জায়গায় আলো ফেলেছেন। এজন্য তাঁর কথাসাহিত্যে শিল্পজিজ্ঞাসার চাইতে বড় হয়ে উঠেছে সামাজিক সংকটের প্রসঙ্গ। এই প্রচেষ্টার কারণেই সমকালীন অন্য লেখকদের থেকে আবুল ফজল স্বতন্ত্র হতে পেরেছিলেন।