বাংলার নবজাগরণের প্রাণপুুুরুষ রাজা রামমোহান রায়কে বলা হয়ে থাকে ভারতে Age of Reason বা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের জনক।১ উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের সেই কাণ্ডারি মনে করতেন, ‘জ্ঞানই মুক্তির শ্রেষ্ঠ উপায়।’২ আর জ্ঞান-সাধনা ও চিন্তাচর্চার ক্ষেত্রে তিনি লোকশ্রেয়ের আদর্শে যুক্তি ও মুক্ত বুদ্ধিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালের অপর এক মুক্তবুদ্ধির দিশারি কাজী আবদুল ওদুদের মতে, রামমোহন প্রাচীন শাস্ত্রকে একেবারে বাদ না দিয়ে- সে শাস্ত্রের ওপর বিচার-বুদ্ধির ও লোকশ্রেয়ের আদর্শের প্রাধান্য দিয়ে নব্য ভারতের এগিয়ে চলার শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশ করে গেছেন।৩ বলা বাহুল্য, বিশশতকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে কাজী আবদুল ওদুদরাও চিন্তাচর্চা এবং সাহিত্যক্ষেত্রে লোকশ্রেয়ের আদর্শে মুক্তবুদ্ধি চর্চার মাধ্যমে সমাজের এগিয়ে চলার শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশ করে গেছেন। ১৯২৬ সালের সূচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিমণ্ডলে গঠিত ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ নামক সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানই ছিল তাঁদের সংগঠন- যার মূলমন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’ (Emancipation of the intellect)। কাজী আবদুল ওদুদের ভাষায়, ‘বুদ্ধিরমুক্তি, অর্থাৎ বিচার বুদ্ধিকে অন্ধ সংস্কার ও শাস্ত্রানুগত্য থেকে মুক্তি দান বাংলার মুসলমান সমাজে (হয়ত বা ভারতের মুসলমান-সমাজে) এ ছিল এক অভূতপূর্ব ব্যাপার। কিন্তু সেদিনে বিস্ময়কর হয়েছিল বাংলার শিক্ষিত মুসলিম তরুণের ওপরে এর প্রভাব- একটি জিজ্ঞাসু ও সহৃদয়-গোষ্ঠীর সৃষ্টি সম্ভবপর হয়েছিল এর দ্বারা। দৃশ্যত এর প্রেরণা এসেছিল মুস্তফা কামালের উদ্যম থেকে, কিন্তু তারও চাইতে গূঢ়তর যোগ এর ছিল বাংলার বা ভারতের একালের জাগরণের সঙ্গে আর সেই সূত্রে মানুষের প্রায় সর্বকালের উদার জাগরণ-প্রয়াসের সঙ্গে।’৪ মুসলিম সাহিত্য-সমাজের মুখপাত্র ‘শিখা’র আপ্ত বাক্য বা motto ছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’৫ সুতরাং বলা যায়, শাস্ত্রানুগত্যের সীমায় আবদ্ধ না থেকে সকল জড়তা পরিহার করে অবারিত মুক্ত জ্ঞানের চর্চার ভেতর দিয়ে পশ্চাৎপদ বাঙালি মুসলমান সমাজকে মানব-প্রগতির পথে এগিয়ে নেয়াই ছিল এই আন্দোলনের কর্মীদের ব্রত।
বাংলার জাগরণ গ্রন্থে কাজী আবদুল ওদুদ বলেছেন, নজরুলের অভ্যুদয়ের পরে ঢাকায় একটি সাহিত্যিক গোষ্ঠীর অভ্যুদয় হয়; তাঁদের মন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’ Emancipation of the intellect. এই মন্ত্র তাঁরা পেয়েছিলেন বহু জায়গা থেকে- কামাল আতাতুর্কের কাছ থেকে, রামমোহন রবীন্দ্রনাথ ও জাঁ ক্রিস্তফের লেখক রোমাঁ রোলাঁর কাছ থেকে, পারসিক কবি সাদীর কাছ থেকে, আর হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর কাছ থেকে।৬ প্রসঙ্গত বলা যায়, নব্য তুরস্কের জনক মুস্তফা কামাল পাশার বীরত্ব ও আধুনিক ধ্যান-ধারণা, রামমোহনের উদার চিন্তা ও মুক্ত বিচার-বুদ্ধির আলোকে জ্ঞান-সাধনা, রবীন্দ্রনাথের মনুষ্যত্ব-সাধনার ঐতিহ্য, সাদীর মানবপ্রীতির আদর্শ ও মহত্ত্ববোধের চর্চা এবং মানুষ হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রত্যয়দীপ্ত উদার মানবতাবাদী আদর্শ বুদ্ধির মুক্তির অনুসারীদের প্রেরণার উৎস হয়েছিল। তবে এর কর্মীদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল, পতিত ও জড়তাগ্রস্ত বাঙালি মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্তন সাধন।৭ কিন্তু তাই বলে তাঁরা যে সেই সমাজের আমূল পরিবর্তন চেয়েছিলেন- তা নয়। তাঁরা মূলত আমেরিকার বিখ্যাত দার্শনিক প্রফেসর জেম্স-এর আদর্শে সমাজের ৎবহড়াধঃরড়হ বা নব-জীবন কামনা করেছিলেন। প্রথম বর্ষ শিখা পত্রিকার বার্ষিক বিবরণীতে অধ্যাপক আবুল হুসেন জেম্সকে উদ্ধৃত করে লেখেন, ‘The renovation of nations begins always at the top among the reflective members of the state and spreads outward and downward’৮ সে-সঙ্গে আরো লেখেন, এই সমাজের প্রধান উদ্দেশ্য চিন্তা-চর্চা ও জ্ঞানের জন্য আকাঙ্ক্ষা ও রুচি সৃষ্টি এবং তদুদ্দেশ্যে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে নতুন-পুরান সর্বপ্রকার চিন্তা ও জ্ঞানের সমন্বয় ও সংযোগ সাধন।৯ এ-ভাবে বাঙালি মুসলমানের চেতনার জগতে নাড়া দেয়ার মাধ্যমে ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজে’র কর্মীরা বুদ্ধির মুক্তি ঘটাতে চেয়েছিলেন।
আবুল ফজলের মতে, ‘বুদ্ধির মুক্তি কথাটি কাজী আবদুল ওদুদেরই অবদান।’১০ তবে ওয়াকিল আহমদ জানান, ১৬ ডিসেম্বর ১৯২৫এ নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় লাঙল পত্রিকা প্রকাশিত হলে ‘কবি আবদুল কাদির এবং আনোয়ার হোসেন লাঙল থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করে সামাজিক মুক্তির কথা প্রথম চিন্তা করেন। আনোয়ার হোসেন এই মর্মে নজরুল ইসলামকে পত্র লেখেন। তাঁর মতে, সাহিত্য সমাজের ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে’র এটি ছিল মূল উৎস।’১১ ওয়াকিল আহমদ আরো জানান, ‘খুব সম্ভব ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ কথাটি দি বেঙ্গলি পত্রিকার মন্তব্য থেকেই চালু হয়েছে।’১২ কেননা শিখা পত্রিকা পড়ে দি বেঙ্গলি লিখেছিল, ‘We offer our heartiest congratulation to this ‘Muslim Literary Society’ as the pioneer in a Neo-Muslim movement who have nothing but coverage and manliness as their watchword and emancipation of intellect as their literary ideal.’১৩
দুই.
উৎস যাই হোক, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি, কর্মপ্রয়াস এবং সে প্রসঙ্গে নজরুলের গুরুত্বই আমাদের প্রধান বিবেচ্য। এ-বিষয়ে সে ধারার অপর লেখক আবদুল হক জানান : তাঁদের দৃষ্টি ছিল রেনেসাঁর দৃষ্টি, চিন্তার গতানুগতিকতা থেকে, ঐতিহ্যের অন্ধ অনুবর্তিতা থেকে তাঁরা বাঙালি মুসলমান সমাজকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন; অতীতের, ইসলামের এবং বর্তমানের যা-কিছু ভালো তা আত্মসাৎ করে তাকে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন- সংকীর্ণতামুক্ত সুস্থ উদার বিশ্বমানবতার আকাশতলে, যেখানে বাঙালি মুসলমান বিশ্বজনীন চিন্তার অংশীদার এবং আধুনিক জগতের প্রাগ্রসর সমাজ ও জাতিসমূহের সমপর্যায়ে সৃষ্টি-চঞ্চল।১৪ তাঁদের কর্ম-প্রয়াসে লক্ষণীয়, বাঙালি মুসলমানের ‘অন্তর্জীবন ও বহির্জীবন, এর মনন ও আচরণ, এর কুসংস্কার, পরিবার-জীবন, সামাজিক প্রথা, গোঁড়ামি, অতীতমুখীনতা, পশ্চিমমুখীনতা, ললিতকলা-বিমুখতা, শিক্ষা-সমস্যা, কোনো কিছুকেই ‘সাহিত্য-সমাজ’ এড়িয়ে যেতে চাননি, সব কিছু সম্বন্ধে সমকালীন চিন্তাধারার গলদ তাঁরা উন্মোচন করেছেন এবং করেছেন বলেই তাঁরা বৃহত্তর সমাজের অপ্রীতিভাজন হয়েছেন।’১৫ এর পরেও বলা যায় তাঁদের সাফল্যের দিকটি কম নয়। চিন্তার জগতে যে-কাপুরুষতা তাঁরা দূর করতে ব্রতী হন- তাতে কিছুটা হলেও তাঁরা সফলকাম হয়েছিলেন। আবদুল হকের ভাষায়, ‘রেনেসাঁর কয়েকটি বড় লক্ষণ ‘সাহিত্য-সমাজে’র মধ্যে বর্তমান ছিল : অন্ধ-অনুবর্তিতা বর্জন, জ্ঞান-পিপাসা, যুক্তিবাদিতা, পৃথিবীর মানসসম্পদ আহরণ করে জাতির জীবনকে সমৃদ্ধ করা, ললিতকলার চর্চা করে জীবনকে সুন্দর করা, এ সবেরই প্রেরণা দেখতে পাই তাঁদের মধ্যে।’১৬
তবে তাঁরা সাংগঠনিকভাবে বেশি দিন সক্রিয় থাকতে পারেননি। রক্ষণশীলদের প্রবল চাপ, পারিপার্শ্বিক আর্থসামাজিক রাজনৈতিক অবস্থা ও জীবনের সীমাবদ্ধতা তাঁদের এই স্বল্পায়ুর কারণ। বিরতিসহ ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজে’র কর্মকাল ধরা গেলেও শিখা বের হয়েছিল মাত্র পাঁচটি সংখ্যা, ১৯২৭ থেকে ১৯৩১, তবে এর বার্ষিক অধিবেশন চলেছিল আরো সাত বছর। কাজী আবদুল ওদুদ বলেছেন, মুসলিম সাহিত্য-সমাজ পূর্ণোদ্যমে কাজ করতে পেরেছিল মাত্র ‘তিন বছর- এর প্রথম ও দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনে নজরুল যোগ দিয়েছিলেন এবং এর আদর্শ ও আবেদনের অর্থপূর্ণতা উপলব্ধি করে উলসিত হয়েছিলেন।’১৭ ১৯২৭ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিত ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজে’র প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে নজরুল তাঁর ‘খোশ আমদেদ’ গানটি পরিবেশন করেছিলেন, সেটি শিখা পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় উদ্বোধনী সঙ্গীতের মর্যাদা পায়। ২৮ ফেব্র“য়ারি দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে নজরুল তাঁর ‘খালেদ’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন। সে অধিবেশনে কাজী আনোয়ারুল কাদির ‘বাঙালী মুসলমানের সামাজিক গলদ’ শীর্ষক প্রবন্ধটি পাঠ করেছিলেন। এ সময় কবি নজরুল দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আজ আমি এই মজলিসে আমার আনন্দ-বার্তা ঘোষণা করছি। বহুকাল পরে কাল রাত্রে আমার ঘুম হয়েছে। আজ আমি দেখছি এখানে মুসলমানের নতুন অভিযান শুরু হয়েছে। আমি এই বার্তা চতুর্দিকে ঘোষণা করে বেড়াব। আর একটি কথা- এতদিন মনে করতাম আমি একাই কাফের, কিন্তু আজ দেখে আমি আশ্বস্ত হলাম যে, মৌলভী আনোয়ারুল কাদির প্রমুখ কতকগুলি গুণী ব্যক্তি দেখছি আস্ত কাফের। আমার দল বড় হয়েছে এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর আমি চাই না।’১৮ নজরুলের সংগীতালাপ১৯ ও গানের মাধ্যমে সে-বারের অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটেছিল।‘শিখা প্রথম বর্ষের পরিশিষ্টের বিবরণ থেকে জানা যায়, ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজে’র পক্ষ থেকে ‘কবি নজরুল ইসলামকে একটি অভিনন্দন দেওয়ার’ উদ্দেশ্যে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কবি ‘সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে’ একখানি সুন্দর পত্রও লিখেছিলেন। ‘সাহিত্য-সমাজে’র দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনের উদ্বোধনী সংগীত লিখেছিলেন নজরুল, ‘নতুনের গান’ শীর্ষক উক্ত লেখাটি দ্বিতীয় বর্ষ ‘শিখা’ (১৯২৮) পত্রিকার শুরুতেই ছাপা হয়। ‘শিখাগোষ্ঠী’র সঙ্গে কবি নজরুলের আর কোনো উলেখযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগের কথা জানা যায় না। তবে তাঁদের চেতনায় যে বুদ্ধির মুক্তি ঘটিয়ে সমাজকে জাগানোর লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল, তার কর্মসূচি থেকে নজরুল কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। বরং তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের বিপুল প্রাণঐশ্বর্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যে সে পথেই ধাবিত ছিল, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তাই লক্ষ করা গেছে, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ভাবযোগী কাজী আবদুল ওদুদ যখন ‘মুস্তফা কামাল সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ শীর্ষক প্রবন্ধ লিখে তরুণ মুসলিম সমাজে আলোড়ন তুলছেন, তার কাছাকাছি সময়ে নজরুল ‘কামাল পাশা’ শীর্ষক অভিনব কবিতা লিখে এবং ধূমকেতু পত্রিকায় ‘কামাল পাশা’ শীর্ষক জ্বালাময়ী প্রবন্ধ লিখে জাগরণ সৃষ্টির প্রয়াস পাচ্ছেন। অন্ধ শাস্ত্রানুগত্য ও জড়তার বুকে মুক্ত বুদ্ধির কশাঘাত হানার কারণে রক্ষণশীল সমাজের কতিপয় পুরোহিত দ্বারা কাজী ওদুদেরা যেমন আক্রান্ত হয়েছেন- ‘কাফের’ ‘নাস্তিক’ ইত্যাদি বলে গালি খেয়েছেন, তেমনি নজরুলও নিগৃহীত হয়েছেন- ‘কাফের’ অভিধা পেয়েছেন। নজরুল ‘আমার কৈফিয়ত‘ কবিতায় তা উলেখও করেছেন। তাঁর সম্পর্কে ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকায় ফতোয়াবাজ মোলাকির রায়ে বলা হয়েছিল, ‘খাঁটি ইসলামী আমলদারি থাকিলে এই ফেরাউন বা নমরুদকে শূলবিদ্ধ করা হইত বা উহার মুণ্ডুপাত করা হইত নিশ্চয়।’২০ আর মুক্ত স্বাধীন বীর্যবন্ত বাণীর জন্য নজরুল শুধু এদের কাছেই নন, বরং শোষক-শাসকদের কাছেও বারে বারে নিগৃহীত হয়েছেন- তা তো সবারই জানা।
উপরে আনোয়ারুল কাদিরের যে প্রবন্ধটির কথা বলা হয়েছে, তাতে তিনি বলেছিলেন, ‘বুদ্ধির মুক্তি না হলে ধর্ম-শিক্ষা হতে পারে না। ধর্মের আদেশ ও নিষেধ পালন করার জন্য বুদ্ধির দরকার। বুদ্ধির অভাবে আমাদের ভিতর প্রকৃত ধর্মভাব লোপ পেয়েছে। এখন গোঁড়ামিই অমাদের ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।’২১ তবে শুধু ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে নয়, বুদ্ধির মুক্তির প্রয়োজন জীবনের সার্বিক অগ্রগতিতে। কেননা, বুদ্ধির মুক্তি হলো জ্ঞানের ক্ষেত্রে মানুষের মনেরই মুক্তি। তাই বুদ্ধির মুক্তি (Emancipation of the intellect) হচ্ছে বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে বিবেচনা করতে শেখা, কল্যাণ-অকল্যাণের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারা, মানসিক জরা ও আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠে সৃষ্টিশীল হওয়া, নব-নির্মাণের ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেয়া, প্রেম ও মানব-কল্যাণের দৃষ্টিতে জীবন ও জগতের দিকে তাকাতে শেখা।২২ এই দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়ে মানুষ গুরুতর বিষয়ে কিংবা মনোজাগতিক বিষয়াদি অর্থাৎ শিল্পকলা, ভাব-চিন্তা ও সাহিত্য-ক্ষেত্রে স্বাধীন চিন্তাশক্তি-সম্পন্ন বলে বিবেচিত হয়ে ওঠে। বেড়ে যায় তাঁর আত্মপ্রত্যয় ও আত্মশক্তি, মানবাত্মার অপরিসীম বিকাশ-সম্ভাবনায় মানুষ হয়ে ওঠে বিশ্বাসী। সে সঙ্গে সে বিবেকের তাড়নায় হয়ে ওঠে যুক্তিপ্রবণ ও বিজ্ঞানমনস্ক। মানুষ তখন আশাহীন অদৃষ্টবাদের নিষ্কর্মা জীবন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির বলে নিজের চিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে অবস্থার উন্নতি সাধন করতে তৎপর হয়। মানব-প্রগতির গোড়ার কথাও এই আত্মবিশ্বাস, যা বুদ্ধির মুক্তির ভেতর দিয়ে অর্জন করতে হয়। হাইনে-কে উদ্ধৃত করে আবুল ফজল বলেছিলেন, ‘এ যুগের প্রধান দায়িত্বই মুক্তি- মানব মনের বন্ধন মুক্তি।’২৩ এবং ‘মানব মুক্তি মানে মানুষের বুদ্ধির মুক্তি, এ মুক্তির পথেই সম্ভব নির্ভেজাল মানবতার উপলব্ধি।’২৪ অপরদিকে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর মতে, মানব-মহিমা তথা বুদ্ধি ও কল্পনার পুনঃ প্রতিষ্ঠাই হলো নবজন্ম বা রেনেসাঁস।২৫ অতএব বলা যায়, বুদ্ধির মুক্তির পথ বেয়েই জাতির রেনেসাঁস বা নবজাগরণের পথ তৈরি হয়। আর তা ঘটে বিশিষ্ট চিন্তক ও সৃষ্টিশীল ধীমান ব্যক্তিত্বের মধ্য দিয়ে। Bertrand Russel বলেছেন, ‘The Renaissance was not a popular movement; it was a movement of a small number of scholar and artists, encouraged by liberal patrons…’২৬
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণে বাঙালি মুসলমানের তেমন সংশিষ্টতা নেই। বিশ শতকেই বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সেই জাগরণের কিছুটা আলামত পরিলক্ষিত হয়। এর প্রথম দশকে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, কাজী ইমদাদুল হক, মোহাম্মদ লুৎফর রহমান প্রমুখ মুষ্টিমেয় কয়েকজনের রচনায় সংস্কার-মুক্তি ও উদার মানবিকতার চেতনা লক্ষ করা যায়। পরবর্তীতে কলকাতাকেন্দ্রিক ‘সওগাত ক্লাব’ বা ‘সওগাত-গোষ্ঠী’ এবং ঢাকা-কেন্দ্রিক ‘শিখা-গোষ্ঠী’ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে সক্রিয় হন, আবুল মনসুর আহমদের ভাষায় ‘প্রগতিবাদী’ সাহিত্য ধারার সৃষ্টি করেন।২৭ এর মধ্যে ‘সওগাত ক্লাবে’ ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী, মোহাম্মদ বরকতুলাহ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদ, হবিবুলাহ বাহার, মঈনুদ্দীন, বেনজীর আহমদ, মহীউদ্দিন প্রমুখ। এবং ‘শিখা-গোষ্ঠী’তে উলেখযোগ্য ছিলেন আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবদুল কাদির, আবুল ফজল প্রমুখ; নজরুলকেও এঁদের সঙ্গে ধরা যায়। মূলত নজরুল ছিলেন বিশ শতকের বাঙলায় নবজাগরণের প্রধান কবিকণ্ঠ, প্রাণপুরুষও বলা যায়। অন্তত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ রূপকার তো বটে। চিন্তা-চেতনায় কর্মে জীবনে ও শিল্পে আগাগোড়াই তিনি বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পোষকতা করেছেন, পক্ষান্তরে বাঙালি মুসলমান সমাজে রেনেসাঁসের আলোক-বর্তিকা তুলে ধরেছেন। আনিসুজ্জামানের ভাষায়, জীবনে ও শিল্পে তিনি ‘সকলকে জাগাতে চেয়েছেন মঙ্গলের জন্যে, সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যে, মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রাণপণ বিদ্রোহ ঘোষণার জন্যে।’২৮ আর সে বিদ্রোহের লক্ষ্যে ছিল বাংলার নবজাগরণ।
বলা যায়, বুদ্ধির মুক্তি হলো রেনেসাঁস বা নবজাগরণের প্রধান ফটক। পনেরো শতকের ইতালির রেনেসাঁসের বৈশিষ্ট্য উলেখ করতে গিয়ে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের লেখক মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছিলেন :
১. নানা আপাত-বিরোধী ভাবকে একত্র করে সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে একটা উদার বহু-ভঙ্গিম সংস্কৃতি সৃষ্টির প্রয়াস এ যুগের বিশেষ কীর্তি।
২. পূর্বে গ্রিক-দেবতাদের প্রতি তাকানো হতো যে অপ্রসন্ন দৃষ্টিতে, গ্রিক সাহিত্য চর্চার ফলে তা ধীরে ধীরে তিরোহিত হলো এবং গ্রিক দেবতা তথা গ্রিক পুরাণ ধর্মের বিষয়বস্তু রূপে না হলেও শিল্প বা কাব্যের বিষয়বস্তু রূপে সমাদৃত হলো।
৩. উদারতার আবহাওয়া এবং মনুষ্যত্বে অপরিসীম শ্রদ্ধা পরিলক্ষিত হলো।
৪. Antinomianism বা প্রচলিত নীতি-বিরোধিতা এই রেনেসাঁসের একটি বিশেষ লক্ষণ। অর্থাৎ এই আলোকপন্থীরা হৃদয় ও বুদ্ধির মুক্তির তাগিদে নীতি ও ধর্মের বেড়া অতিক্রমণকে জীবনপ্রীতির নিদর্শন রূপে গ্রহণ করেন। ‘মানা নয়- জানা, বোঝা ও জয় করা’ই তাঁদের উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।
৫. রেনেসাঁসের যুগে শাস্ত্রের চেয়ে মনকে বড় স্থান দেয়া হয়। অর্থাৎ ‘দিল্-কেতাবই যে বড় কেতাব, তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেতাব নেই-’ রেনেসাঁস এই ঘোষণা করতে কুণ্ঠাবোধ করে না।
৬. চিত্তের বীর্যশীলতা রেনেসাঁসের বড় পরিচয়-চিহ্ন।
৭. রেনেসাঁস মূল্যবোধ ও মুক্ত বিচারের স্বাধীনতা।
৮. রেনেসাঁস সাধারণ মনুষ্যপ্রীতির নামান্তর।২৯
বলা বাহুল্য, নজরুলের সাহিত্যে বিশেষত তাঁর কবিতায় উর্পযুক্ত বিষয়াবলির প্রবল উপস্থিতি সচেতন পাঠকের দৃষ্টি এড়ায় না। নানা আপাত-বিরোধী ভাবকে একত্র করে সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে একটা উদার বহুভঙ্গিম সংস্কৃতি সৃষ্টির প্রয়াস তাঁর সাহিত্যে প্রবল। বেশি দূরে যেতে হয় না, এ প্রসঙ্গে তাঁর অগ্নিবীণা কাব্যের দৃষ্টান্তই যথেষ্ট- আরও সূক্ষ্মভাবে বললে এর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিই যথেষ্ট। নানা আপাত-বিরোধী ভাবের সম্মিলনে একটা উদার বহুভঙ্গিম পরিবেশ সৃষ্টির এ রকম দৃষ্টান্ত, সাহিত্যে আর আছে বলে আমার জানা নেই। নজরুলের কট্টর সমালোচকরা বরং তাঁর কবিতার এই বৈশিষ্ট্যটিকেই বৈগুণ্য ধরে নিয়ে সমালোচনার ঝড় তুলেছেন। দ্বিতীয়ত, নজরুলের কবিতার বদৌলতেই গ্রিক পুরাণের অনুরূপ বাংলা কবিতায় হিন্দু পুরাণ দেবদেবী ইত্যাদি এবং ইসলামের ঐতিহ্যাবলি জন-মনে ধর্মীয় সংকীর্ণতার বাইরে কাব্যের অন্তর্গত বিষয়বস্তু রূপে সমাদৃত হয়েছে। তৃতীয়ত, উদারতার আবহাওয়া ও মনুষ্যত্বে অপরিসীম শ্রদ্ধার অপর নামই হলো নজরুল-সাহিত্য। চতুর্থত, প্রচলিত নীতি-বিরোধিতার দৃষ্টান্ত নজরুলে সুপ্রচার। মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘আবে লার্ড, ইকো প্রমুখ যে বিরোধিতার ভেতর দিয়ে আত্মার ঐশ্বর্য প্রকাশ করেছিলেন, নজরুল ইসলামেও তা বর্তমান।’৩০ মূলত জীবন-প্রীতির টানে হৃদয় ও বুদ্ধির মুক্তির তাগিদে নীতি ও ধর্মের বেড়া অতিক্রমণে নজরুলের কোনো কুণ্ঠাবোধ ছিল না। তাই তিনি নির্দ্বিধায় বলতে পেরেছেন-
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল
আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানি নাকো কোনো আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
(বিদ্রোহী, অগ্নি-বীণা)
কিংবা,
আমি জানি জানি ঐ স্রষ্টার ফাঁকি, সৃষ্টির ঐ চাতুরী,
তাই বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে, ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি।
(ধূমকেতু, অগ্নি-বীণা)
কিংবা, ‘রক্তাম্বর ধারিণী মা’ কবিতায় বলেছেন :
নিদ্রিত শিবে লাথি মারো আজ,
ভাঙো মা ভোলার ভাঙ-নেশা,
… … …
ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর
সৃষ্টির নব পূর্ণিমা।
(অগ্নি-বীণা)
নজরুল আজীবন ‘শাস্ত্রের চেয়ে মনকে বড়’ বলে জেনেছেন। তাই ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় বলেছেন :
তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
… … …
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।
(সাম্যবাদী)
ষষ্ঠত, চিত্তের যে-বীর্যশীলতা রেনেসাঁসের বড় পরিচয়-চিহ্ন বহন করে- তার সাধনায় নজরুল আজীবন আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন। প্রচণ্ড আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত হওয়া ছাড়া ব্যক্তিতে কিংবা জাতিতে এই বীর্যশীলতা সৃষ্টি হয় না। আর তা ব্যতিরেকে বুদ্ধির মুক্তি- কিংবা জাতির মুক্তি- কোনোটাই সম্ভব নয়। এই অমোঘ দর্শনের দার্শনিক কবি নজরুল তাই চিত্তের বীর্যশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘বিদ্রোহী’, ‘ধূমকেতু’, ‘অভিশাপ’, ‘ঝড়’ ইত্যাদি কবিতায় মৃতসঞ্জীবনীর মতো বর্ষণ করলেন ‘আমিত্বে’র বারি। ‘বিদ্রোহী’তে বললেন :
বল বীর-
চির উন্নত মম শির!
আর জড়তার বুকে আঘাত হেনে এই ‘চির উন্নত শির’ তুলে ধরতে নজরুল ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ৭৫৪ শব্দের মধ্যে ১৪৫ বার ‘আমি’ শব্দের ঝাণ্ডা তুলে অনির্বচনীয় ব্যঞ্জনা সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছেন। নির্জীব ঘুমন্ত মানুষদের উন্নত বোধশক্তি জাগাতে এর বিকল্প ছিল বলে মনে হয় না। সত্যি, ‘বিদ্রোহী’ এক বিস্ময়কর কবিতা! বুদ্ধির মুক্তি ছাড়া শব্দ, ধ্বনি ও ভাবের এমন ইন্দ্রজাল সৃষ্টি কখনো সম্ভবপর নয়। হতাশাগ্রস্ত মৃতপ্রায় ঘুমন্ত ব্যক্তি ও জাতিকে জাগাতে এরই প্রয়োজন ছিল বৈকি। Bertrand Russel বলেছেন, মানুষের এই অবস্থায় তার উচ্চশির ও স্বাধীন চিন্তাকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন ‘a spirit of fiery revolt of fierce hatred of gods’৩১ নজরুলের মধ্যে ছিল সেই অগ্নিগর্ভ বিদ্রোহী মনোভাব ও বীর্যশীলতা। তাই ভাঙার গান কাব্যের ‘জাগরণী’ কবিতায় তিনি ‘নির্ভীক বীর’ ‘পুরুষ সিংহ’কে জাগতে বলেছেন- নতুবা ‘জড়’ ‘ক্লীব’র মৃত্যুই কামনা করেছেন।
মূলত রেনেসাঁস মূল্যবোধ ও মুক্ত-বিচারের অপর নাম। নজরুলে ছিল শিল্পে ও স্বভাবে মানবিক মূল্যবোধ ও মুক্ত-বিচারের প্রবল মনোবৃত্তি। অপর দিকে রেনেসাঁস সাধারণ মনুষ্য-প্রীতির নামান্তর। আর নজরুল ইসলামে সাধারণ মনুষ্যত্বের জাগরণই প্রাধান্য লাভ করেছে। কুলি-মজুর, কৃষক-শ্রমিক, ধীবর, ছাত্র, বারাঙ্গনা, নারী- সকল শ্রেণির মানুষ তাঁর কবিতার বিষয়বস্তুতে পর্যবসিত হয়েছে। সর্বোপরি মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নজরুল তাঁর সাহিত্যে সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়েছেন, যে-জন্যে তাঁকে ‘মানুষের কবি’ অভিধায়ও অভিষিক্ত করা হয়।৩২ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘নবযুগ’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘মানুষকে মানুষ বলে দেখতে না পারার মতো এতোবড়ো সর্বনেশে অন্ধতা আর নেই।’৩৩ এই অন্ধতা থেকে মুক্তিই মূলত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ব্রতীদের লক্ষ্য হয়েছে। নজরুলের কবিতায় সেই লক্ষ্যকেই তীব্রতর ও দৃশ্যমান করা হয়েছে। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অপর উৎস পারসিক কবি শেখ সাদী বলেছেন :
আদম-সন্তানরা একে অন্যের অঙ্গ স্বরূপ
কেননা তাদের উৎপত্তি একই মূল থেকে।
যদি এক অঙ্গে বেদনা বাজে
তাহলে অন্য অঙ্গও শান্তিতে থাকে না।
মানুষের দুঃখ যদি তুমি না বোঝ
তাহলে মানুষ নাম নেওয়া তোমার অন্যায় হয়েছে।৩৪
আর নজরুল তাঁর ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় লিখেছেন :
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশি।
একজনে দিলে ব্যথা
সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।
একের অসম্মান
নিখিল মানব-জাতির লজ্জা- সকলের অপমান!
মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,
ঊর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নিচে কাঁপিতেছে শয়তান!
(সাম্যবাদী)
রবীন্দ্র-চেতনা, সাদীর বিশ্বমানবতার সুর নজরুলের কবিতায় ভাবে ছন্দে প্রবলভাবে ধরা দিয়েছে বলা যায়। এটি যে বুদ্ধির মুক্তিরও চেতনা, তা বলাই বাহুল্য। সুতরাং বুদ্ধির মুক্তির চেতনার রূপকার হলেন নজরুল। ‘নারী’ কবিতায় তাই তিনি বলেছেন :
নরককুণ্ড বলিয়া কে তোমা করে নারী হেয়-জ্ঞান?
তারে বলো, আদি-পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান।
অথবা পাপ যে- শয়তান যে- নর নহে নারী নহে,
ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।
… … …
আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সে ব্যাকুলতা,
আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা!
চোখে চোখে আজ চাহিতে পারো না, হাতে রুলি, পায়ে মল,
মাথায় ঘোমটা, ছিঁড়ে ফেলো নারী, ভেঙে ফেলো ও-শিকল!
… … …
সে দিন সুদূর নয়-
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!
(সাম্যবাদী)
নারী-মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া কিংবা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের লেখকদের নারী-মুক্তি চেতনার ভাষ্য যেন নজরুলের কবিকণ্ঠেই কলোলিত।
বুদ্ধির মুক্তি যেমন, তেমনি রেনেসাঁসের প্রধান ধর্ম হলো কুসংস্কার, ভণ্ডামি, গোঁড়ামি ও শঠতাকে আঘাত করে তৎপরিবর্তে সত্য, ন্যায়, উদার মতবাদ ও চিন্তার স্বাধীনতার জয়গান করা।৩৫ নজরুল সে প্রয়াসেই ব্যাপৃত ছিলেন সারা জীবন। ভণ্ডামি ও স্বার্থান্ধ মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাই তিনি লিখেছেন :
হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি
ও কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি
ও মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে।
(মানুষ, সাম্যবাদী)
জিঞ্জীর কাব্যের ‘খালেদ’ কবিতায় তিনি আরো এগিয়ে বলেছেন :
বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখনো বসে
বিবি-তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফেকা ও হাদিস চষে!
হান্ফি ওহাবি লা-মজহাবির তখনো মেটেনি গোল,
এমন সময় আজাজিল এসে হাঁকিল ‘তলপি তোল!’
ভিতরের দিকে যত মরিয়াছি, বাহিরের দিকে তত
গুনতিতে মোরা বাড়িয়া চলেছি গরু-ছাগলের মতো!
জিঞ্জীর কাব্যের ‘চিরঞ্জীব জগলুল’ কবিতায় কবি বলেন :
মনুষ্যত্বহীন এই সব মানুষেরই মাঝে কবে
হে অতি-মানুষ, তুমি এসেছিলে জীবনের উৎসবে।
… … …
তবু এশিয়া আফ্রিকা গাহে তোমার মহিমা গান,
মনুষ্যত্ব থাকিলে মানুষ সর্ব শক্তিমান!
নজরুল শেষ সওগাত কাব্যের একটি কবিতার নাম দিয়েছিলেন ‘গোঁড়ামি ধর্ম নয়’; এর শুরু এ রকম-
শুধু গুণ্ডামি ভণ্ডামি আর গোঁড়ামি ধর্ম নয়,
এই গোঁড়াদেরে সর্বশাস্ত্রে শয়তানি চেলা কয়।
মানুষের শঠতা জোচ্চুরিকে নজরুল কখনো ক্ষমা করতে পারেননি। তাই সর্বহারা কাব্যের ‘চোর-ডাকাত’ কবিতায় তিনি সোজা বলে ফেলেছেন :
যারা যত বড় ডাকাত দুস্য জোচ্চোর দাগাবাজ,
তারা তত বড় সম্মানী গুণী জাতি-সংঘতে আজ।
বলা বাহুল্য, এটি শুধু জাতি-সংঘের নয়, আমাদের সমাজেরও নিষ্ঠুর বাস্তবতা! নজরুল তাঁর লেখায় এভাবে সকল কুসংস্কার, ভণ্ডামি, শঠতা ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন। আবার সাম্য ও উদার মানবতার উপাসক হিসেবে কুলি-মজুর চাষা শ্রমিক ধীবর বারাঙ্গনা অবলা প্রভৃতি পতিত-নির্যাতিতের বেদনা ও মহিমা প্রকাশ করেছেন। বুদ্ধির মুক্তি না ঘটলে নজরুলের পক্ষে কখনো এটি সম্ভব হতো না। তাই চেতনায় যেমন তিনি উদার মুক্ত ছিলেন, তেমনি চিন্তায়ও ছিলেন মুক্ত স্বাধীন। এই জন্য তিনি ১৯৪০-এর একটি অভিভাষণে অকপটে বলেছিলেন, ‘নিজের স্বাধীনতাকে কখনও বিসর্জন দেইনি।’৩৬ আবার নকীবের বেশে নব-জীবনের নব-উত্থান তিনি কামনা করেছিলেন :
নব-জীবনের নব-উত্থান আজান ফুকারি এস নকীব
জাগাও জড়! জাগাও জীব!
জাগে দুর্বল, জাগে ক্ষুধাক্ষীণ,
জাগিছে কৃষাণ ধুলায় মলিন,
জাগে গৃহহীন, জাগে পরাধীন
জাগে মজলুম বদ-নসিব!
মিনারে মিনারে বাজে আহ্বান-
‘আজ জীবনের নব উত্থান!’
শঙ্কাহরণ জাগিছে জোয়ান
জাগে বলহীন জাগিছে ক্লীব,
নব জীবনের নব উত্থান-
আজান ফুকারি এস নকীব!
(নকীব, জিঞ্জীর)
তিন.
বুদ্ধির মুক্তির চেতনা শুধু নজরুলের কবিতায় নয়, গদ্যেও লক্ষণীয়। যুগবাণী গ্রন্থের ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমান’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন, ‘সর্বপ্রথম আমাদের লেখায় জড়তা দূর করিয়া তাহাতে ঝর্ণার মতো ঢেউভরা চপলতা ও সহজ মুক্তি আনিতে হইবে। যে সাহিত্য জড়, যাহার প্রাণ নাই, সে নির্জীব-সাহিত্য দিয়া আমাদের কোনো উপকার হইবে না, আর তাহা স্থায়ী সাহিত্যও হইতে পারে না। … সাহিত্যের মুক্ত ধারায় থাকিবে চলার আনন্দ, স্রোতের বেগ এবং ঢেউয়ের কল-গান ও চঞ্চলতা।’৩৭ বলা বাহুল্য, বুদ্ধির মুক্তি না ঘটলে লেখকের লেখায় সেই চঞ্চলতা, সেই চলার আনন্দ ও স্রোতের বেগ সৃষ্টি হয় না। লেখা সম্পর্কে যেমন, তেমনি মানুষ সম্পর্কেও নজরুলের ধারণা অতি স্বচ্ছ ও প্রগতিশীল। ধর্মগত, সম্প্রদায়গত, বর্ণগত, পেশাগত সকল সীমাবদ্ধতার বেড়া ডিঙিয়ে মানুষকে তিনি সৃষ্টির সেরা ‘মানুষ ধর্ম’ ফুটাতে বলেছেন। তাঁর মতে, ‘মানুষের প্রথম জন্ম তাহার প্রকৃতিদত্ত চঞ্চলতা, স্বাধীনতা ও পবিত্র সরলতা লইয়া। সে চঞ্চলতা চির মুক্ত, সে স্বাধীনতা অবাধ-গতি, সে সরলতা উন্মুক্ত উদার। মানুষ ক্রমে যতই পরিবারের গণ্ডি, সমাজের সংকীর্ণতা, জাতির-দেশের ভ্রান্ত গোঁড়ামি প্রভৃতির মধ্য দিয়া বাড়িতে থাকে, ততই তাহার জন্মগত মুক্ত প্রবাহের ধারা সে হারাইতে থাকে।’৩৮ এই গতিহারা পঙ্কিলতা-ভরা মানুষকে নজরুল ভেতরে-বাইরে স্বাধীন চিত্ততায় উজ্জীবিত করে তুলতে চেয়েছেন। তাই বলেছেন, ‘স্পিরিট বা আত্মার শক্তিকে জাগাইয়া তোল, কিন্তু তাই বলিয়া কর্মকে হারাইও না। অন্ধের মতো কিছু না বুঝিয়া, না শুনিয়া ভেড়ার মতো পেছন ধরিয়া চলিও না। নিজের বুদ্ধি, নিজের কর্মশক্তিকে জাগাইয়া তোল। তোমার এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যই দেশকে উন্নতির দিকে, মুক্তির দিকে আগাইয়া লইয়া যাইবে। এসব জিনিস ভাব-আবিষ্ট হইয়া চক্ষু বুজিয়া হয় না।’৩৯ এর জন্য মানুষের আত্মশক্তির জাগরণ প্রয়োজন, প্রয়োজন দেশাত্মবোধ। তাই ‘সত্য শিক্ষা’ প্রবন্ধে নজরুল বলেছেন, ‘নিজের শক্তি, স্বজাতির বিশেষত্ব হারানো মনুষ্যত্বের মস্ত অবমাননা। স্বদেশের মাঝেই বিশ্বকে পাইতে হইবে, সীমার মাঝে অসীমের সুর বাজাইতে হইবে।’৪০ শাশ্বত বাঙালির সুষুপ্ত ঘুমে-ভরা অলস-প্রাণ জাগিয়ে তুলতে তিনি জাগরণের সোনার কাঠি কামনা করেছেন। আর সেটি হলো পরম আত্মবিশ্বাস। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’তে তিনি বলেছেন, ‘আমি পরম আত্মবিশ্বাসী। … আমি শুধু রাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করি নাই, সমাজের, জাতির, দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্য তরবারির তীব্র আক্রমণ সমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, …আমি অন্ধ-বিশ্বাসে, লাভের লোভে, রাজভয় বা লোকভয়ে মিথ্যাকে স্বীকার করতে পারি না। অত্যাচারকে মেনে নিতে পারি না।’৪১ পারেন না বলেই অসাম্য অত্যাচারের উলঙ্গ বাস্তবতা নজরুলের বুকে বড় বিষ-জ্বালা ধরায় :
বন্ধু গো আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে নাকো মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছো সুখে!
(আমার কৈফিয়ৎ, সর্বহারা)
মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেমন বলেছিলেন, ‘I shall put down on paper the thoughts as they spring up in me, and let the world say what it will’৪২ তেমনি নজরুলেরও সেই একই সুর- এই সুর মূলত বুদ্ধির মুক্তির কল-কলোলের সুর- রেনেসাঁর তো বটেই।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের যে-বিচারবুদ্ধি ও যুক্তিপ্রবণতা, তা নজরুলে কতটুকু? ‘রাজা-প্রজা’ কবিতায় কবি বলেছেন :
প্রজা হয় শুধু রাজ-বিদ্রোহী, কিন্তু কাহারে কহি,
অন্যায় করে কেন হয় নাকো রাজাও প্রজাদ্রোহী!
(সাম্যবাদী)
এ রকম যুক্তির অবতারণা নজরুলের এই কবিতায় যেমন আরো আছে, তেমনি তাঁর আরো বিবিধ রচনায়ও যুক্তি-বিচারের দৃষ্টান্ত রয়েছে। এরপরও বলা যায়, তাঁর লেখায় এটি প্রাধান্য পায়নি- হৃদয়-ধর্মই প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু এতে কবি নজরুলে বুদ্ধির মুক্তি ঘটতে কোনো বাধা তৈরি হয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। আমরা জানি, বুদ্ধি মস্তিষ্ক-জাত হলেও মস্তিষ্ক স্নায়ু-তাড়িত বলে তার সঙ্গে হৃদয়ের যোগ ছাড়া বুদ্ধির মুক্তি ঘটে না। যুক্তি ও বিচারবুদ্ধি অবশ্যই চাই- কিন্তু তার সঙ্গে হৃদয়ের উত্তাপ না ছড়ালে সেটি সাহিত্যের অঙ্গীভূত হতে পারে না। শুধু যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে কিংবা যুক্তির বৃক্ষ নির্মাণ করে যুক্তিবিদ্যারই সম্ভার হয়ত গড়ে তোলা যায়, কিন্তু সরস সাহিত্য কিংবা সৃষ্টিশীল সাহিত্যের ঐশ্বর্য গড়ে তোলা যায় না। কবি নজরুল ছিলেন শতভাগ সৃষ্টিশীল- জীবনবাদী সাহিত্যিক, কলাকৈবল্যবাদী মোটেই নন। তাঁর স্পষ্ট স্বীকারোক্তি, ‘আমার আবেগে যা এসেছিল তাই আমি সহজভাবে বলতে চেয়েছি। আমি যা অনুভব করেছি, তাই আমি বলেছি। ওতে আমার কৃত্রিমতা ছিল না।’৪৩ অথবা কবিতায় যে বলেছিলেন, ‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।’
জীবনকে জাগানোর প্রয়োজনে, জীবনের প্রয়োজনে, জীবনের মুক্তির প্রয়োজনেই নজরুলের সাহিত্য- তাঁর কবিতা। এতে সত্য প্রতিভাত, মানবতা প্রতিভাত, সাম্য ও স্বাধীনতা প্রতিভাত- মানব-মনের জড়তার মুক্তি প্রতিভাত হয়েছে। ১৯১৯ সালে রচিত ও স্বাক্ষরিত মহান মানবতাবাদী লেখক রোমাঁ রোলাঁ’র ‘Declaration of the Indepence of Mind’-এ বলা হয়েছিল, ‘Mind is no one’s servitor. It is we who are the servitors of mind. We have no other master. …’৪৪ নজরুলেও তা-ই লক্ষ করা যায়। এই জন্য তিনি অকপটে বলতে পেরেছেন, ‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ!’৪৫ অথবা ‘আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা।’৪৬ তবে হৃদয়-ধর্মকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে নজরুলের ক্ষেত্রে মনের মুক্তি ও বুদ্ধির মুক্তি যে অনেকটা এক হয়ে গেছে, তা বলা যায়। রেনেসাঁস ভাবনায় মোতাহের হোসেন চৌধুরী যেমন বলেছিলেন, হৃদয়-ধর্ম ও বুদ্ধির মুক্তির তাগিদে নীতি ও ধর্মের বেড়া অতিক্রমণ আলোকপন্থীরা জীবন-প্রীতির নিদর্শন রূপে গ্রহণ করেন;৪৭ তেমনি নজরুলেও ঘটেছে। বুদ্ধির মুক্তির ক্ষেত্রেও তিনি বরং হৃদয়-ধর্মকেই প্রাধান্য দিয়ে গেছেন।
বুদ্ধির মুক্তির প্রেরণার উৎস রূপে হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর কথা বলা হয়েছে। জানা যায়, ভারতে বুদ্ধির মুক্তির জনক রামমোহন রায় হযরত মোহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বিশেষ শ্রদ্ধা পোষণ করতেন এবং অ্যাডম সাহেবের মতে, ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে রামমোহন হযরতের একখানি জীবনী লেখার সংকল্প করেছিলেন।৪৮ বলা বাহুল্য, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অধিকাংশের প্রেরণারও উৎস হয়েছিলেন হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর বীর্যবন্ত একেশ্বরবাদ ও তাঁর উদার মানবতাবাদী আদর্শ। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে নব-চেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যেও তাই শিখা-গোষ্ঠীর লেখকেরা হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর উপর্যুক্ত আদর্শের পোষকতা করে গেছেন। তবে সম্মোহিত হয়ে নয়, মুক্ত মনে যুক্তি বিচারের দৃষ্টিতে। হযরতের উদার চিন্তার সপক্ষে, বুদ্ধি-বিবেচনা ও কাণ্ডজ্ঞানের সপক্ষে- তাঁরা দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা অন্ধ আনুগত্য এবং মোলাতন্ত্রেরও কঠোর সমালোচনা করে গেছেন। নজরুলের রচনা এর ব্যতিক্রম নয়। অধিকন্তু সে সব রচনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত চেতনার বীর্যবন্ত প্রকাশ লক্ষ করা গেলেও ভক্তি-আবেগ সে সবকে একেবারে ছেড়ে যায়নি। ঝড় কাব্যের ‘ক্ষমা করো হযরত’ কবিতায় নজরুল লিখেছেন :
তুমি চাহ নাই ধর্মের নামে গানিকর হানাহানি,
তলওয়ার তুমি দাও নাই হাতে, দিয়াছ অমর বাণী,
মোরা ভুলে গিয়ে তব উদারতা
সার করিয়াছি ধর্মান্ধতা,
বেহেশত হতে ঝরে নাকো আর তাই তব রহমত॥
ক্ষমা করো হযরত॥
হযরতের আবির্ভাবের স্মরণে কাজী আবদুল ওদুদ লিখেছিলেন ‘প্রশস্তি’ শীর্ষক কবিতা, কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন ‘ফাতেহা-ই দোয়াজ-দহম্’। আবার তিরোভাবেও লিখেছেন একই নামের কবিতা। হযরতের আবির্ভাবে নজরুলের চেতনায় ‘বাজে নব সৃষ্টির উলাসে ঘন ইসরাফিলের শিঙ্গা।’ (ফাতেহা-ই দোয়াজ-দহম্, বিষের বাঁশী), হযরতের জীবনী কাব্য রূপে নজরুল রচনা করেছেন মরুভাস্কর-এ। এতে কবির আহ্বান :
আঁধার ইহার কবে আবার জ্বলিবে শুভ্র আলো,
হে মানব, জাগো! মেঘময় পথে বজ্র-মশাল জ্বালো।
(নও কাবা, মরুভাস্কর)
তবে স্বীকার করতেই হয়, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের লেখকদের হযরতের জীবনী-পর্যালোচনায় যে-বিচার-গাম্ভীর্য লক্ষ করা যায়, তা নজরুলে খুব একটা দেখা যায় না। বলা যায়, মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরীর মানব-মুকুটের জাগরণধর্মী বক্তব্য কিংবা ওদুদের হযরত মোহাম্মদ ও ইসলাম গ্রন্থের কাণ্ডজ্ঞানধর্মী আলোচনার সমকক্ষ জীবনী নজরুলে নেই। তবে কাব্যে হযরতের জীবনী নির্মাণে নজরুলের অবশ্যই বিশিষ্টতা রয়েছে।
অতএব নিঃসন্দেহে সামগ্রিকতা বিচারে নজরুল বাঙালি মুসলমান সমাজে রেনেসাঁসের প্রধান পুরুষ- বুদ্ধির মুক্তি চেতনার শ্রেষ্ঠ কবিকণ্ঠ। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ভাবযোগী কাজী আবদুল ওদুদ শাশ্বত বঙ্গ গ্রন্থে ১৯৪১-এ ‘সংস্কৃতির কথা’ প্রবন্ধে সার্থক সংস্কৃতি-চিন্তার স্তরে উপনীত হতে কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন, যেমন-
১. দেশে অভুক্ত ও কর্মহীন কেউ থাকবে না।
২. একান্ত বীভৎস না হলে কোনো সমাজেরই ধর্মাচার অশ্রদ্ধেয় বিবেচিত হবে না, সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে হবে যে, যা প্রাচীন তা প্রাচীন বলেই বরণীয় নয়, বরণীয় তার বর্তমান কার্যকারিতার জন্যে।
৩. হিন্দু-মুসলমানের পোশাক ও নামের ব্যবধান থাকবে না অথবা অস্বীকার করা হবে।
৪. সামাজিক আদান-প্রদান- বিবাহ-আদি সমেত- সর্বত্র সহজ হবে।
৫. আইন সমস্ত দেশের জন্য এক হবে।৪৯
বলা যায়, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনেরই ফলশ্র“তি উপর্যুক্ত প্রস্তাবনা, পক্ষান্তরে এসব প্রস্তাবনা কবি নজরুলের জীবন ও সাহিত্যরই প্রতিধ্বনি করে। তাই বুদ্ধির মুক্তি ও কবি নজরুল- মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ বললে অত্যুক্তি হয় না।
তথ্যনির্দেশ
১. প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রামমোহন ও তৎকালীন সমাজ ও সাহিত্য (কলিকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থ বিভাগ, ১৯৭২), পৃ.১৫
২. উদ্ধৃত, কাজী আবদুল ওদুদ-রচনাবলী ২য় খণ্ড (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯০), পৃ. ১৮১
৩. কাজী আবদুল ওদুদ-রচনাবলী ১ম খণ্ড (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৮৮), পৃ. ৬০-৬১
৪. শাশ্বত বঙ্গ (কলিকাতা : কাজী খুরশীদ বখ্ত, ১৩৫৮) ‘নিবেদন’ দ্র.
৫. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, সংকলিত ও সম্পাদিত, শিখা সমগ্র (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ২০০৩), পৃ. ৭
৬. কাজী আবদুল ওদুদ-রচনাবলী ২য় খণ্ড, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩৮-১৩৯
৭. শিখা সমগ্র, পূর্বোক্ত, পৃ. ৪
৮. উদ্ধৃত, ঐ, পৃ.২৮
৯. ঐ, পৃ. ২৯
১০. আবুল ফজল, লেখকের রোজ-নামচা (ঢাকা : নওরোজ কিতাবিস্তান, ১৯৬৯), পৃ. ১৪০
১১. ওয়াকিল আহমদ, “মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন,” ওদুদ-চর্চা (ঢাকা : একাডেমিক পাবলিশার্স, ১৯৮২) পৃ. ১৯
১২. ঐ, পৃ. ৪৩
১৩. উদ্ধৃত, ঐ, পৃ. ৪৩
১৪. আবদুল হক “ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ”, ওদুদ-চর্চা, পৃ. ৪৮
১৫. ঐ, পৃ. ৫০
১৬. ঐ, পৃ. ৬২-৬৩
১৭. ‘বাংলার জাগরণ’ কাজী আবদুল ওদুদ-রচনাবলী ২য় খণ্ড, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩৯
১৮. শিখা ১৯২৭, দ্র. “বার্ষিক সম্মিলনের বিবরণ”, শিখা সমগ্র, পূর্বোক্ত, পৃ. ১২৭
১৯. “সঙ্গীতালাপ-কাজী নজরুল ইসলাম”- এভাবে লেখা ছিল বার্ষিক সম্মিলন, ১৯২৭-এর বিস্তৃত কর্মসূচির তালিকায়। দ্র. ঐ, পৃ. ১৩৬
২০. ঐ, পৃ. [আট]
২১. শিখা, ১ম বর্ষ, ১৯২৭, ঐ, পৃ. ৬৫
২২. তুলনীয়, মোহাম্মদ মাহফুজ উলাহ, বুদ্ধির মুক্তি ও রেনেসাঁ আন্দোলন (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৮০), পৃ. ১৮-১৯
২৩. উদ্ধৃত, আলী আনোয়ার, “আবুল ফজল, বুদ্ধির মুক্তি ও দেশকাল”, আবুল হাসনাত সম্পাদিত আবুল ফজল (ঢাকা : মুক্তধারা, ১৯৮৭) পৃ. ১৫৭
২৪. ঐ, পৃ. ১৫৭
২৫. মোতাহের হোসেন চৌধুরী, “নজরুল ইসলাম ও রিনেসাঁস”, হায়াৎ মামুদ ও জ্যোতি প্রকাশ দত্ত সম্পাদিত তোমার সাম্রাজ্যে যুবরাজ (ঢাকা : সাহিত্যিকা, ১৩৮০) পৃ. ১৯২
২৬. Bertrand Russel, History of Western Philosophy and its Connection with Political and Social Circumstances from the Earliest time to the Present day (New edn; London : George Allen & Unwin, 1961), p. 488
২৭. নুরুল আমিন, আবুল মনসুর আহমদ (পু-ম; ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ২০০১) পৃ. ৪৭
২৮. আনিসুজ্জামান, “তাঁর কাল ও কবিতা”, তোমার সাম্রাজ্যে যুবরাজ, পূর্বোক্ত, পৃ.১৯০
২৯. মোতাহের হোসেন চৌধুরী, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৯৩-১৯৮
৩০. ঐ, পৃ. ১৯৬
৩১. উদ্ধৃত, নাজিরুল ইসলাম, “মানব প্রগতি ও মুক্ত বুদ্ধি”, ‘শিখা’, ৩য় বর্ষ, ১৯২৯ শিখা সমগ্র পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৮৬
৩২. কাজী মোতাহার হোসেন, “মানুষের কবি নজরুল” দ্র. প্রণব চৌধুরী সম্পাদিত নজরুল কবি ও কাব্য (পু-মু; ঢাকা : বাংলাদেশ বই ঘর, ২০০১), পৃ. ২০৯
৩৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালান্তর (পু-মু; কলিকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থ বিভাগ, ১৩৮২) পৃ. ৩৯৬-৩৯৭
৩৪. উদ্ধৃত, নুরুল আমিন, ওদুদ-রচনা ও বাঙালি সমাজ (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ২০০৮), পৃ. ২৯৪
৩৫. তুলনীয়, কবীর চৌধুরী, “মুসলিম রেনেসাঁ ও কাজী নজরুল ইসলাম”, তোমার সাম্রাজ্যে যুবরাজ, পূর্বোক্ত, পৃ. ২০৯
৩৬. “স্বাধীনচিত্ততার জাগরণ”, নজরুল-রচনাবলী ৮ম খণ্ড (জন্মশত বর্ষ সংখ্যা; ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ২০০৮), পৃ. ৩৫
৩৭. নজরুল-রচনাবলী ১ম খণ্ড (জন্মশত বর্ষ সংখ্যা; ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ২০০৬), পৃ. ৩৮৮
৩৮. “আমাদের শক্তি স্থায়ী হয় না কেন?”, ‘যুগবাণী’, নজরুল-রচনাবলী, ঐ, পৃ. ৪০৮
৩৯. “ভাব ও কাজ”, ঐ, পৃ. ৪২০
৪০. ঐ, পৃ. ৪২১
৪১. ঐ, পৃ. ৪৩৩-৪৩৪
৪২. উদ্ধৃত, আনিসুজ্জামান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৮৭
৪৩. উদ্ধৃত, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, শিল্পীর রূপান্তর (ঢাকা : বর্ণমিছিল, ১৯৭৫), পৃ. ৯৮
৪৪. Romain Rolland, The Forerunners, translated by Enen and Cedar Paul, (London : George Allen & Unwin Ltd., 1920) p.210
৪৫. “বিদ্রোহী”, নজরুল-রচনাবলী ১ম খণ্ড, পূর্বোক্ত, পৃ.৯
৪৬. ঐ, পৃ.৮
৪৭. মোতাহের হোসেন চৌধুরী, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৯৪
৪৮. বাংলার জাগরণ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৪
৪৯. কাজী আবদুল ওদুদ, “সংস্কৃতির কথা”, শাশ্বত বঙ্গ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৬৯।