ভাষা ও সাহিত্য সাধনা (ভাষা খণ্ড)
মনিরুজ্জামান
প্রকাশক : বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোর পাবলিশিং লিমিটেড (বিপিএল)
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৮
মূল্য : ৯৫০ টাকা
ড. মনিরুজ্জামান, জন্ম ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০। কোন পরিচয়ে তাকে চিহ্নিত করবো? কবি, ছোটগল্পকার, গীতিকার, সমালোচক, লোকসাহিত্য বিশারদ, সম্পাদক, সর্বোপরি তিনি অনন্য ভাষাবিজ্ঞানী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ৫৭-এ। সাথী হিসেবে পান আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, মনজুরে মওলা, আতাউল হককে। এদেরকে নিয়ে একটা গ্রুপ ছিলো ‘নীরব সঙ্ঘ’ নামে। মাঠের এক কোনায় সেই ‘নীরব সঙ্ঘে’র সভা বসত। ঐ কোনা থেকে আবার মেয়েদের কমন রুম দেখা যেত। মেয়েরা ঠাট্টা করে ঐ কর্নারের নাম দিয়েছিল ‘ইডিয়টস কর্নার’। তখন ডাকসু ও অন্যান্য সাহিত্য সংগঠনের উদ্যোগে সাহিত্যসভা হতো। সেখানে বড় বড় সাহিত্যিক আসতেন। সুফিয়া কামাল, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা। কবিতা প্রতিযোগিতায় পরপর দু’বছর প্রথম পুরস্কার পান। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, শওকত আলী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মমতাজউদ্দীন আহমদ এরা তাদের সিনিয়র গ্রুপে ছিলেন। মাঝে মাঝে সিনিয়রদের সঙ্গেও আড্ডা হতো। সওগাত, উত্তরণ, সমকাল, কাফেলা- প্রায় সব পত্রিকাতেই তখন মনিরুজ্জামানের লেখা ছাপা হতো।
সহপাঠিনী হিসেবে পান নাজমা জেসমিন চৌধুরী, রফিকুন্নেসা পারুল, অল্পবয়স থেকেই খুব ভালো ছড়া লিখত।
সাহিত্য থেকে ভাষাবিজ্ঞানের দিকে কিভাবে ঝুঁকলেন, সে সম্পর্কে মনিরুজ্জামান বলেন: এটা পুরোপুরিই ধ্বনিবিজ্ঞানী আবদুল হাই সাহেবের কারণে। তখন তো ভাষাবিজ্ঞানের তেমন কোনো বই-ই ছিল না। কিন্তু হাই সাহেবের ক্লাস করার পর আর বইয়ের দরকার হতো না। চট্টগ্রাম কলেজে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেয়ার পরে তখনকার প্রিন্সিপাল আবদার রশীদ সাহেব আমাকে বললেন ভাষাবিজ্ঞান অংশটা পড়াতে। তখনই আমি ভাষাবিজ্ঞানের নানান বিষয়ে ভাবতে ও লিখতে শুরু করি। পরে লেখাগুলো জড়ো করে ভাষা সমস্যা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ বইটা বের করলাম। এ-বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন আবুল ফজল। ভাষাবিজ্ঞানে আমার পড়াশোনা তখনও তেমন বিস্তৃত হয়নি। আসল পড়াশোনাটা হলো যখন আমি পিএইচডি করতে যাই মহীশূরে।
এ ভাষাবিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৬০ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর পান করেন। ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি করেন ভারতের মাইশুর বিশ্ববিদ্যালয় হতে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। কর্মজীবনের নানা সময়ে নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি এবং কলা অনুষদের ডিন ছিলেন।
তিনি ‘লিঙ্গুইস্টিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’,
‘দ্রাবিড়িয়ান লিঙ্গুইস্টিক অ্যাসোসিয়েশন’, ‘ফিলোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব গ্রেট ব্রিটেন’ সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সংস্থা ও সংঘের জীবনসদস্য। ভাষা, সাহিত্য ও ফোকলোর বিষয়ে এযাবৎ তাঁর ২৮টি বই এবং শতাধিক গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। একাধিক সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
সম্প্রতি (ফেব্রুয়ারি ২০১৮) বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোর পাবলিশিং লিমিটেড (বিপিএল) প্রকাশ করেছে তার ভাষা নিয়ে গবেষণার নির্বাচিত প্রবন্ধ সঙ্কলন ‘ভাষা ও সাহিত্য সাধনা’র-ভাষা খণ্ডটি।
এ সঙ্কলনে সূচিবদ্ধ হয়েছে ড. মনিরুজ্জামানের নিম্ন শিরোনামাঙ্কিত ভাবনাগুলো :
ক. বিভাগ
ভাষা: ঐতিহাসিক, বৈয়াকরণিক এবং বানান ও অভিধান প্রসঙ্গ ১ ও ঐতিহাসিক তুলনামূলক পুনর্গঠন তত্ত্ব, উত্তর কথন ও কারকবাদীদের প্রসঙ্গ ২ ও বাংলা, সংস্কৃত ও ইন্দো ইউরোপীয় সম্প্রসারিত ঐতিহাসিক পুনর্গঠনতত্ত্বের ব্যবহার প্রসঙ্গ ৩ ও বাঙালির ব্যাকরণ চিন্তা: ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ৪ ও বাংলা বানান রহস্য ও বাংলা ধ্বনির প্রতিবর্ণীকরণ
৪.১ বাংলা বানান রহস্য, ভ্রান্তি না ত্রুটি
৮.২ বানান: বাংলা বর্ণমালা পরিচয় ও প্রতিবর্ণীকরণ প্রসঙ্গে
দু’টি কথা
৫. অভিধানে সঙ্কট
খ. বিভাগ
ভাষাসাধনা : প্রসঙ্গ ভাষা, ধ্বনি ও প্রাচীনপাঠ
৬. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র জীবনতথ্য এবং অবহেলিত আবিষ্কার
৬.১ ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
৬.২ ভাষাগুরু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
৬.৩ আধুনিক ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের দৃষ্টিতে বাংলাভাষা গবেষণার স্মরণীয় পুরুষ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
৬.৮ নব্যভারতীয় ভাষার নবশাখায়ন ও স্তরক্রম পুনর্গঠনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অবদান
৭. ভাষা শ্রেষ্ঠী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়
৮. ধ্বনিবিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল হাই
৯. ভাষামুণি পদ্মশ্রী ড. দেবী প্রসন্ন পট্টনায়ক
১০. শরৎনাথ ভট্টাচার্য ওরফে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
১১. হরিচরণ, তাঁর সার্ধশত জন্মবর্ষ এবং ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’
গ. বিভাগ : বিবিধ
সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঔপভাষিক
১২. চন্দরা কহিল : ভাষা বিকাশে নারী
১৩. দাফতরিক ভাষা : আলোচনা
১৪. বাংলাভাষার মান ও মর্যাদা
১৫. একুশের ভাষাচিন্তা
১৬. ভাষার সমাজবিরোধী রূপ ও আমাদের ভবিষ্যৎ সমাজ
ঘ. বিভাগ
উপভাষা প্রসঙ্গ
১৭. উপভাষা ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি
১৮. বাংলাদেশের প্রান্তীয় ভাষা বৈশিষ্ট্য
১৮.১ উত্তরবঙ্গের ভাষা তথ্যের সমাহার
১৮.২ সাতক্ষীরার উপভাষা প্রসঙ্গ
১৮.৩ সিলেটের উপভাষা ১
১৮.৪ সিলেটের উপভাষা ২
১৯. পূর্ব বঙ্গীয় কথ্যভাষা ও তার বৈশিষ্ট্য;
২০. বাংলাদেশের উপভাষা চর্চার ধারা
২১. গোপাল হালদার : বাংলা উপভাষা চর্চার অন্যতম পূর্বসূরি
২২. ঢাকাইয়া ভাষা ও পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি ২২.১. ঢাকার ভাষা পরিস্থিতি; পূর্বকথা
২২.২ পরিবর্তনশীল ঢাকার উপভাষা
ড. মনিরুজ্জামান এর ভাষাকেন্দ্রিক এ ভাবনাগুলো নিয়ে অনন্য ভাষাবিজ্ঞানী, তার বন্ধু প্রফেসর ড. উদয় নারায়ণ সিংহ একটি চমৎকার রেখাচিত্র এঁকেছেন। তিনি গেল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২১ ফেব্রুয়ারি-২০১৮ তে এ বই নিয়ে চমৎকার এ লেখাভাষ্যে লিখেছেন:
‘ভাষাতাত্ত্বিক প্রফেসর মনিরুজ্জামানের সাথে আমার পরিচয় দীর্ঘ দিনের ও তাঁর গবেষণার বিষয় ভাষার ঐতিহাসিক তুলনামূলক পুনর্গঠন ও আরও স্পষ্ট করে বললে, ‘নিয়ন্ত্রিত ঐতিহাসিক পুনর্গঠন’ (Controlled Historical Reconstruction) ও ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বে এটি একটি নব শাখা যা ঘবি ঞরিম. ভাষার উৎস সন্ধানের একটি নব প্রকরণ। এই তত্ত্বের উদ্ভাবন ও পদ্ধতি বিস্তারে অবদান আছে হোয়েনিগসওয়ার্ল্ড, রবার্ট হল, ফাপুঁসন, পল থিম, ডেল হাইম, সাউথওয়ার্থ প্রমুখের ও ভারতেও ঘাটগে, কাত্রে, মহেণ্ডলে প্রমুখের তাত্ত্বিক দিকের প্রশংসনীয় কাজ আছে এক্ষেত্রে ও এতদ বিষয়ে মনিরুজ্জামানের গুরু পদ্মশ্রী ড.ডি.পি পট্টনায়ক ফার্গুসনী মডেলটিকে ভারতীয় ভাষায় প্রথম প্রয়োগ করেন ও বিস্তার ঘটান ও এই মডেলটিতে প্রতিষ্ঠিত ধারণার বাইরে গিয়ে মনিরুজ্জামান উপভাষায় ক্ষেত্রে প্রথম প্রয়োগ করেন এবং পশ্চিম বাংলার উদাহরণ নিয়ে কাজ করেন। বর্তমান গ্রন্থের প্রথম ভাগে এই বিষয়ের ওপর কিছু নতুন আলোকপাত করে সমস্যাটি বিশদ করার চেষ্টা আছে ও সেই সাথে সংশিষ্ট কিছু প্রসঙ্গ অর্থাৎ ব্যাকরণ চিন্তার ঐতিহ্য, ভাষা সংপঠনে বানানের কালিক সংলগ্নতা, অভিধানী রূপ এবং ট্রান্সলিটারেশনের ভূমিকার কথাও যুক্ত করা হয়েছে।
বহুভাষাবিদ জ্ঞানতাপস মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অবদানও এই ধারায় অসামান্য ও তিনি ইন্দো ইউরোপীয় মহাভাষার ভারতীয় রূপের পূর্বী শাখার স্বাতন্ত্র্য লক্ষ্য করে ভারতীয় আর্যভাষার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন ও তাঁর কর্মকৃতি নিয়ে আলোচনাগুলি স্বতন্ত্র ভাগে [(খ) অংশে] রাখা হয়েছে এখানেও তাঁর বিষয়ে মনিরুজ্জামানের মূল্যায়ন আরও খননী আলোচনার দাবিদার। একই সাথে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধ্বনিবিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল হাই এর প্রসঙ্গও রাখা হয়েছে কিছুটা স্মৃতি মিশ্রিত ভঙ্গিতে। ধ্বনিতত্ত্বের আলোচনায় ‘প্রসডি তত্ত্বে’ তাঁর অবদান এবং বাংলাদেশে ধ্বনিবিজ্ঞানের প্রসার ও সেই সাথে উপভাষায় বৈজ্ঞানিক আলোচনার সূত্রপাত ঘটানোর আভা গার্দিয় ভূমিকার কারণে বাংলাদেশে ভাষা গবেষণার ইতিহাসে তাঁর খ্যাতি ও যশ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও সম্পাদিত ‘সাহিত্য পত্রিকা’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও এক বিস্ময়কর কীর্তি।
তৃতীয় ভাগের আলোচনাগুলি সমাজভাষা বিষয়ক। তবে ‘উপভাষা’র আলোচনাগুলিকে স্বতন্ত্র রাখা হয়েছে। উপভাষা যেমন সমাজভাষার, তেমনি সাংগঠনিক ভাষাতত্ত্বেরও বিষয়। উপভাষা বিষয়ে মনিরুজ্জামানই প্রথম বাংলায় গ্রন্থ রচনা করেন (দেখুন, ‘উপভাষা চর্চার ভূমিকা’, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৪)। তবে এখানকার আলোচনার বিষয় কিছুটা ভিন্ন। তার প্রথম ৫টি আলোচনা বিদেশে এবং শেষ গবেষণাটি এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকায় পঠিত ও প্রকাশিত। প্রত্যেক প্রবন্ধ শেষে প্রকাশ তথ্য দেওয়া হয়েছে। ভাষাতত্ত্বে মনিরুজ্জামানের অবদান তাঁর থিসিস এবং ‘উপভাষা’ বিষয়ক গ্রন্থটির ন্যায় এখানেও সমান পরিস্ফুট। গ্রন্থটি গবেষকদের কাছে মূল্যবান বলেই বিবেচিত হবে আশা করি।
বহুভাষী ঋদ্ধ লেখক, কবি, নাট্যকার, ভাষাবিদ, সংগঠক ও সম্পাদক প্রফেসর ড. উদয় নারায়ণ সিংহের এ মন্তব্যধর্মী মূল্যায়ন ভাষাপ্রেমী পাঠকদের এ বই পাঠে প্রাণিত করবে। বাংলাদেশে জন্ম নেয়া এ ক্ষণাজন্মা বহুমাত্রিক মনীষার ভাষা নিয়ে নিরন্তর ভাব ও ভাবনার লেখালেখ্যগুলো পথ দেখাবে আগামীর পথ চলার। ভাষাপ্রেমী জাতি হিসেবে আমরা সেদিনই গৌরবান্বিত হবো যখন আমরা এসব মনীষার মানস সম্পদগুলো নিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে শিখবো। নয়তো আমাদের ভাষাপ্রেম, একুশের নানা উদযাপন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ঘোষণা নিয়ে আমাদের আদিখ্যেতা সব কিছু বুদবুদের মতো মিশে যাবে কালের করাতে। জয় হোক, বাঙলা ভাষার, জয় হোক এমন মনীষার।
সূত্র :
১. মনিরুজ্জামান সংবর্ধনা স্মারক
২. ভাষা ও সাহিত্য সাধনা ভাষা খণ্ড
৩. https://arts.bdnews24.com/?p=2021