পূর্বসূত্র : সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার সময় ঢিল মারার বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে আজিম মণ্ডলকে। তাকে মারার ষড়যন্ত্র হচ্ছে তার মেয়ের
দেওয়া এ তথ্যের সঙ্গে ঢিল মারার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা ভাবেন তিনি। তার আরো কয়েকটি ঘটনার কথা মনে পড়ে।
তিনি বুঝতে পারেন তার মামা আসলাম মৌলবির ছেলে তোজাম্মেল তাকে সহ্য করতে পারছে না। সে নেতা হতে চায়।
আজিম মণ্ডলকে সে তার পথের কাঁটা মনে করছে। তাই সে তাকে সব সময় অপদস্থ করতে চায়।
তবুও কিছু করতে পারছে না দেখে সে হয়তো তাকে ভয় দেখাতে চাচ্ছে।
এগারো
যত দিন যায় উদ্বেগ বাড়ে আব্দুল মমিনের। বাড়ি থেকে টাকা আসছে না। কোনো খবরও পাচ্ছে না। তার আশা ছিল খুব দ্রুত মেজ ভায়ের চিঠি পাবে। পোস্ট অফিস এই গ্রামেই, প্রায় প্রত্যেকদিনই সে খোঁজ নিতে যায়। কিন্তু ফিরতে হয় খালি হাতে, হতাশ মনে। কলেজে ভর্তি হতে, বই-পত্র কিনতে অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। বড় জোর আর মাসখানেক চলবে তার টেনেটুনে। খাতা-কলম টেনে নিয়ে বসে সে, চিঠি লিখবে আবার। কথায় বলে শিশু না কাঁদলে মা-ও দুধ দেয় না। আর এটা তো তার জানা যে মেজ ভায়ের হাত খুব ঢিলা। সুতরাং তাগাদা দিতে হবে, উপায় নেই।
চিঠি লেখে সে-
২৪-১২-১৯৫১ ইং
মুহতারাম মেজভাই,
আস্ সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আশা করি খোদার ফজলে আপনারা ভাল আছেন। আমিও এখানে একরূপ ভালই আছি। খেজমত ভাই-এর মারফত আমি আপনাকে একখানা চিঠি পাঠাইয়াছিলাম। সেটা নিশ্চয়ই আপনার হস্তগত হইয়াছে। কিন্তু আপনার দিক হইতে কোনো জবাব না পাইয়া আমি ভীষণ উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িয়াছি।
আমি ইতোমধ্যে কলেজে ভর্তি হইয়াছি। বেশ কিছু বই-পত্র ও পোশাক কিনিতে হইয়াছে। আমার হাত এখন প্রায় শূন্য। আপনি দ্রুত টাকা না পাঠাইলে এই বিদেশ-বিভূঁয়ে আমি বিপদে পড়িয়া যাইব। তাই আপনার নিকট সনির্বন্ধ অনুরোধ, আমার ভাগের পাট বিক্রয় করিয়া দ্রুত টাকা পাঠাইবার ব্যবস্থা করিবেন। আপনি নিজে আসিলে সবচেয়ে ভাল হয়। রাজশাহী অঞ্চল একেবারেই আমাদের মতো। জমি-জমা, চাষ-বাস, আবহাওয়া, মানুষের চলাফেরা, সামাজিকতা প্রায় একই রকম। এখানে বিনিময় করিয়া আসিতে পারিলে ভাল হইবে। আপনি আসিয়া বিনিময় দেখিয়া যান।
আর একটি কথা। আহসান ও জুলফিকারের পড়াশোনার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখিবেন। উহারা দুইজনই মেধাবী ছাত্র। অন্য ছেলেমেয়েরাও যেন লেখাপড়া করে। লেখাপড়া ছাড়া উন্নতি করা সম্ভব নয়। এই দেশে মুসলমানদের জন্য বিপুল সম্ভাবনা দেখা যাইতেছে। লেখাপড়া শিখিলে এখানে অনেককিছু করা যাইবে। সবচাইতে ভাল হইবে এই দেশে চলিয়া আসিলে। ল ভাইকেও বুঝাইবেন। তাহার ছেলেরাও যেন পড়াশোনা করে। আমার মাথায় অনেক পরিকল্পনা, আপনি আসিলে সেসব লইয়া বিস্তারিত আলোচনা করিব। আপনি উদ্যোগী না হইলে কিছুই করা সম্ভব হইবে না। আপনি অবশ্যই আসিবেন। ইতি-
আপনার স্নেহের ছোটভাই
আব্দুল মমিন মোল্লা
চিঠি লেখা শেষ করে হাঁফ ছাড়ে মমিন। মনে হয় বুকটা হালকা হলো। কলেজের পড়াশোনা শুরু হয়ে গিয়েছে। নিয়মিত ক্লাসে যাচ্ছে সে। রাজশাহী কলেজের শিক্ষকরা কত জানে! তার সবচেয়ে ভাল লাগে এটা দেখে যে এখানকার প্রায় সব শিক্ষকই মুসলমান। আর তার অর্ধেকই প্রায় ভারত থেকে আসা। তারা খুব দরদ দিয়ে পড়ান। নতুন দেশ গড়ার জন্য লেখাপড়া জানা যোগ্য ও দক্ষ মানুষ দরকার। তারা ছাত্রদের সে রকম মানুষ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা দেন।
একেবারে সকাল সকাল আলেক মুনশী হাজির। -চলেন মাস্টার ভাই, রেডি?
কোনাপাড়ার মুনশী বাড়ির ছেলে এই আলেক। বয়স তার সমানই। কিন্তু পড়ছে এখনো ক্লাস এইটে। শৈশবে কিছুকাল জামিরার মাদ্রাসায় পড়েছে সে। তারপর এসে ভর্তি হয়েছে শহরের মুসলিম হাইস্কুলে। এতে তার বছর নষ্ট হয়েছে। ছেলেটা বন্ধুবৎসল। হাসি-খুশি। সৎ আর ধার্মিক। আচরণে বিনয়ী। তার সঙ্গে মিলেছে ভাল।
-আজ তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, নাকি বুলেন? আপনে পারবেন তো?
আগামীকাল কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্মদিন। গ্রামের তরুণরা এ উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। আলোচনা সভা তো হবেই, তার সঙ্গে কবিতা আবৃত্তি, কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামী গান, বক্তৃতা, ধারাবাহিক গল্প বলা, এইসব প্রতিযোগিতা হবে। শিশু-কিশোর আর তরুণদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেছে। রীতিমত উৎসবের আমেজ। অনুষ্ঠান হবে নতুনপাড়ায় মুনশীদের আমবাগানে। সব মিলিয়ে ছ’সাত বিঘা জমি। বটগাছের মতো বিশাল বিশাল ফজলি আমের গাছ এই বাগানে। আকাশটা গাছের ডালপালা আর ঘন পাতায় ছাওয়া, আর নিচটা ফাঁকা। কিছু আটাশরির জঙ্গল এখানে-ওখানে। দু’দিন ধরে সেসব সাফ-সুতরো চলছে। আয়োজন গোটা গ্রামের, কিন্তু উদ্যোক্তা মধ্যপাড়া আর উত্তরপাড়ার ছেলেরা। মমিনও যোগ দিয়েছে তাদের সঙ্গে। এই গ্রামে তার মাস চারেক হয়ে গেল। কলেজে আসা-যাওয়ার পথে অনেক লোকের দেখা-সাক্ষাৎ মেলে। গ্রামে নতুন মানুষ দেখলে কৌতূহল হয়, বিশেষ তাকে যদি প্রায়ই দেখা যায়। তখন লোকেরা ডেকে জিজ্ঞেস করে কোথায় বাড়ি, থাকো কোথায়, ইত্যাদি। উত্তরপাড়ায় জুমআর নামাজ পড়তে গিয়েও অনেক লোকের এইসব প্রশ্নের মুখোমখি হয়েছে সে। এভাবে ধীরে ধীরে পরিচয় হচ্ছে নানারকম লোকের সঙ্গে। বর্ষার কারণে প্রথম দিকে মাস দুই গ্রামে ঘোরাঘুরি হয়েছে একেবারেই কম। তারপর শুরু হয়েছে কলেজ। বাইওে ঘোরাঘুরির সময় কম। তাই তার জানাশোনার গণ্ডি মূলত পাহাড়ি পাড়া, আর কিছুটা উত্তরপাড়া। কায়েদে আজমের জন্মদিবসের অনুষ্ঠান আয়োজনে জড়িত হয়ে তার ঘনিষ্ঠতা হলো গ্রামের আরো অনেক অনেক তরুণের সঙ্গে। তার মধ্যে কয়েকজনকে তার ভালও লেগেছে। আলেক তাদের একজন।
কাল সকালে অনুষ্ঠান। আজই শেষ করতে হবে সকল আয়োজন। তাদের ওপর দায়িত্ব পড়েছে কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতার বিষয়টি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ করাতে হচ্ছে। বড়রা যে যেমন পারে করবে।
তারা একসঙ্গে বেরয়। রাজশাহী কলেজের উত্তরে হাতেমখাঁ মহল্লায় মুসলিম হাইস্কুল। কলেজ পর্যন্ত একসঙ্গে যাওয়া যায়।
শ্যামপুরের মাঠ পাড়ি দেয় ওরা। বর্ষার পানি সেই কবে নেমে গিয়েছে, কিন্তু রাস্তার পাশের নালায় এখনো কোথাও কোথাও ছিকছিকে পানি জমে রয়েছে। পাকা আমন ধান এখনো মাঠ জুড়ে। কোনো কোনো জমির ধান কাটা হয়ে গেছে, সার বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে কাটা ধান, একটু শুকোলে তুলে নিয়ে যাবে বাড়িতে বা খইলানে। কেউ কেউ শুকনো ধানের আটি বেঁধে মাথায় করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ধানের জমিতে রস থাকতে থাকতে খেসারি ছিটিয়ে রেখেছিল কৃষকরা, খেসারির হলদেটে চারা মাটি লেপ্টে পড়ে রয়েছে। এখন রোদ পেয়ে লক-লক করে বেড়ে উঠবে, ঢেকে নিবে পুরো জমি।
মাঠ পেরিয়ে মির্জাপুরের মধ্যে দিয়ে বিনোদপুর, সেখানে টমটম বা ঘোড়াগাড়ি ধরে সাহেববাজার। গোলচত্ত্বরের পাশে বাসস্ট্যান্ড আর টমটম স্ট্যান্ড পাশাপাশি। এটাই রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দ্র। এটাকে ঘিরেই শহরের তামাম দোকান-পাট, বাজার, সরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ।
সেখানে নেমে সোনাদীঘি মোড় এক মিনিটের পথ। সোনাদীঘির দক্ষিণপাশে সড়ক ঘেঁষে কলেজিয়েট স্কুল, আর স্কুলের পশ্চিমে রাজশাহী কলেজ। সেখান থেকে মুসলিম হাইস্কুল উত্তর-পশ্চিমে মিনিট দশেকের হাঁটা পথ।
ঘোরা পথে দেওয়ানপাড়া বা কাটাখালি গিয়েও টমটম ধরা যায়। তাতে হাঁটা কম পড়ে, কিন্তু পথ দূর হয়, ভাড়া লাগে বেশি। বর্ষা কালে মাঠের রাস্তায় কাদা-পানি থাকে বলে তখন ঘোরা পথেই যেতে হয়। অন্য সময় মাঠ পাড়ি দিয়েই যায় সবাই।
রাজশাহী কলেজের গেটে পৌঁছার একটু আগে পৌরসভা অফিসের পশ্চিম পাশ ঘেঁষে একটা গলি বেরিয়ে গেছে উত্তরে। লোকনাথ হাইস্কুলের সামনে দিয়ে সেটা গিয়ে মিশেছে আরেক বড় রাস্তায়। আলেককে সেই গলির মাথায় ছেড়ে দিয়ে কলেজে ঢোকে মমিন।
ইংরেজি ও অংক ক্লাসের পর আধা ঘণ্টার বিরতি। তারপর বাংলা ক্লাস। এই সময়টুকু সে কোনো কোনো দিন ক্লাসরুমেই বসে থাকে। কোনোদিন লাইব্রেরিতে কাটায়। আজও ভাবছিল কী করবে। আর তখনই, অংকের শিক্ষক বেরনোর আগেই, বাইরে শোরগোল উঠল। -রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, বাংলা চাই, বাংলা চাই। ছাত্ররা সব বাইরে বেরিয়ে এল। কুড়ি-পঁচিশ জন ছাত্র মিছিল বের করেছে। তাদের কাছে পৌঁছে দাঁড়াল ওরা। একজন নেতা ওদের মিছিলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাল। -আসেন ভাই, আপনারাও মিছিলে আসেন। ওরা আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চায়। আসুন, আমরা রুখে দাঁড়াই।
ওদের আহ্বানে কেউ সাড়া দেয় না। তাতে ওরা হতোদ্যম হয় না। আরেকজন এগিয়ে এসে বক্তৃতা শুরু করে দেয়। বাকিরা মিছিল ভেঙ্গে দিয়ে আমাদের সামনে এসে দর্শক-শ্রোতার সারি তৈরি করে দাঁড়ায়। লম্বাপানা ফরশা ছেলেটা হাত উঁচিয়ে বক্তৃতা করতে লাগল- ভাইসব, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষাতে আমরা কথা বলি, এই ভাষাতেই কল্পনা করি, স্বপ্ন দেখি। এই ভাষা শেষ হয়ে গেলে আমরা কথা বলব কী করে? কল্পনা করব কী করে? স্বপ্ন দেখব কী করে? আমাদের অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। এই বাঙালি জাতি বলে আর কিছু থাকবে না।
কোত্থেকে একজন ষণ্ডামার্কা ছেলে এসে হঠাৎ তাকে থামিয়ে দিল। -এই যে ছুটু ভাই, কী আবোলতাবোল বইক্ছো আঁ! বাংলা ভাষা থাকপে না তে কুন্ঠে যাবে? বিটিশ আমলে দু’শ’ বছর যে ইংরাজি রাষ্ট্রভাষা ছিল তাথে কি বাংলা ভাষা ধ্বংশ হয়ে গেল্ছে? আমরা বাংলা ভাষাতে কথা বুলিনি?
তার পেছন থেকে আরেকজন বেরিয়ে এসে বলল, উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। অফিস-আদালতে ইংরাজির বদলে উর্দু চালু হবে। বাংলা আমারে মুখের ভাষা আগের মুতোনই থাকপে। অসুবিধা কী?
-না, না, ব্যাপারটা অতটা সরল নয়। ওরা ধীরে ধীরে আমাদের সংস্কৃতিটাই বদলে দিবে। এটা একটা সা¤্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র। ওরা আমাদের বাঙালি পরিচয় নষ্ট করে দিতে চায়।
-এই ব্যাটা বাঙালির বাচ্চা বাঙালি, থাম্। প্রথম আগন্তুক ধমকে উঠল।
দ্বিতীয় আগন্তুক বক্তৃতা শুরু করল- ভাইসব, অরা ভারতের দালাল, অরা আমারে সাধের পাকিস্তানেক ধ্বংশ করতে চায়। তাই অরা ভাষার নামে আমারে ভিতর ভাঙন ধরাতে চাচ্ছে। উর্দু আমারে মাতৃভাষা না এডি ঠিক, কিন্তুক্ আমরা কি উর্দু জানিনি? বুঝিনি? বাংলা আর উর্দু দুইডিই আমারে ভাষা- একটা মাতৃভাষা, মুখের ভাষা, আরেকটা রাষ্ট্রভাষা। অসুবিধা কী?
-ঠিক। ঠিক। আরো কয়েকজন যোগ দিল ওদের সঙ্গে। ওরা আশেপাশেই কোথাও দাঁড়িয়ে ছিল। এখন এসে জড়ো হচ্ছে।
-না ভাইসব, প্রতিবাদ করল মিছিলকারীদের নেতা- না, এরা ঠিক বলছে না। উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে আস্তে আস্তে উর্দু মুখের ভাষাও হয়ে যাবে, বাংলা ভাষা বিলীন হয়ে যাবে। স্কুল-কলেজে উর্দুতে পড়তে হবে, বই-পত্র সব উর্দুতে লেখা হবে, বাংলা সাহিত্য বলে আর কিছু থাকবে না।
-এই মামুর ব্যাটা, কী বুলছিছ তুই? ব্রিটিশ আমলে ইংরাজি রাষ্ট্রভাষা ছিল বুলে কি বাংলা সাহিত্য হয়নি? আমারে বিদ্রোহী কবি কি বাংলা ভাষাতে কবিতা লেখেনি? বল বীর, বল উন্নত শির… তারপরে কী যেন্? হ্যাঁ, আমি বিদ্রোহী রণক্লান্ত, আমি সেইদিন হব শান্ত…। এডি কি বাংলা না? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তো বাংলাতেই লেখিছে তাই না? তখুন কি বাংলা রাষ্ট্রভাষা ছিল?
-দেখুন, আপনারা বুঝতে পারছেন না ষড়যন্ত্রটা। একটা স্বাধীন দেশে মাতৃভাষাই হবে রাষ্ট্রভাষা, এটাই হওয়া উচিত। মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা হলে সবদিক থেকে লাভ। কেন শুধু শুধু আমাদের ওপর উর্দু চাপিয়ে দিবে?
-মামুর ব্যাটা বুলে কী রে? মার শালাক্। শালা ভারতের দালাল।
হইহই রইরই মারপিট শুরু হয়ে গেল।
হামলাকারীরা প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল। মারামারি শুরু হতেই ছোট ছোট লাঠি হাতে ছুটে এল বেশ কিছু তরুণ। তারার আশপাশেই ঘাপটি মেরে ছিল কোথাও। বেদম পেটাতে লাগল তারা মিছিলকারীদের। সাধারণ ছাত্ররা যে-যেদিক পারে পালাল। মমিনও পালাল ওদের সঙ্গে।
মিছিলকারীরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।
খুব মন খারাপ হয়ে গেল মমিনের। কেবল দেশটা স্বাধীন হয়েছে। এখনই যদি এরকম মারামারি কাটাকাটি শুরু হয়ে যায় তাহলে তার ভবিষ্যত তো ভাল নয়।
সে আর ক্লাস করবে না বলে মনস্থ করল। হয়তো এমনিতেও ক্লাস হবে না। এ রকম অশান্ত অরাজক পরিস্থিতিতে ক্লাস হয়? সে ভাবে হলেও কিছু করার নেই। এই মারামারি যে এখানেই শেষ তা কি বলা যায়? হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই দলই শক্তি বৃদ্ধি করে ময়দানে এসে হাজির হবে। বিদেশ-বিভুঁয়ে এসব তাণ্ডবের মধ্যে থাকা উচিত হবে না তার। কখন কোন বিপদ এসে ঘাড়ে পড়ে কে জানে। তখন কে তাকে দেখবে!
গেট থেকে বেরতেই মজেমের সঙ্গে দেখা। সে একপ্রকার ছুটতে ছুটতে আসছে। -কী ব্যাপার, ভাল আছেন?
-আরে, আপনে! ভাল আছেন তো? পরে কথা ব্যুলবোনি, অ্যাখুন তাড়া আছে। মিছিলে যাব।
-আরে দাঁড়ান, দাঁড়ান। ওদিকে যায়েন না। মারামারি হচ্ছে।
-মারামারি? কিসের মারামারি।
-ওই তো মিছিলে হামলা করেছে। রক্তারক্তি অবস্থা। মিছিল ভেঙ্গে গেছে। ওদিকে এখন যায়েন না। সবাই পালাচ্ছে।
ইতঃস্তত করতে লাগল মজেম। তার হাত ধরে একরকম টানতে টানতে মমিন তাকে সোনাদীঘির মোড়ের দিকে নিয়ে চলল। ওরা সোজা গিয়ে ঢুকল মাজিদিয়া হোটেলে।
হোটেল তখন প্রায় ফাঁকা। তারা আলুর সিঙ্গাড়া নিল। একেবারে গরম গরম টাটকা সিঙ্গাড়া। মজা করে খেতে লাগল।
-কিন্তু আমার যাওয়া উচিত ছিল ব্যুঝলেন? অরা ভাববে আমি ভয়ে পালায়ছি।
-আপনি তো মিছিলেই যাননি তো পালানোর প্রশ্ন আসবে কেন?
-হ্যাঁ, ভাববে আমি ভয়ে যাইনি।
-তা যা ভাবে ভাবুক। ওসব মারামারির ভিতর গিয়ে লাভ নাই। এখন আমাদের ছাত্রজীবন। এ সময় লেখাপড়া করাই আমাদের আসল কাজ। ওসব মিটিং-মিছিল করুক বড় মানুষেরা যাদের লেখাপড়া নেই।
মজেম কিছু বলে না। চিন্তিত মুখে সিঙ্গাড়ায় কামড় বসায়।
-খুব মারামারি হয়ছে নাকি?
সব বর্ণনা করল মমিন।
-আমি অরখে বুইলেছুনু মারপিট হবে কিন্তুক। তৈয়েরি হয় যায়েন।
-খুব মাইরেছে?
-হ্যাঁ। দু’তিন জন খাম-খুঁত হয়েছে।
-নাহ, আমি যাই। আপনে থাকেন।
মমিন কোনো কথা বলার সুযোগই পেল না, ছুটে বেরিয়ে গেল মজেম।
মমিনের কৌতূহল হলো। কলেজে গিয়ে কী করে মজেম দেখতে মন চাইছে। সে-ও এগুল দ্রুত পায়ে।
মিছিলকারীরা জড়ো হয়েছে কলেজ অফিসের সামনে। দু’তিন জনের শরীর রক্তে মাখামাখি। ইতোমধ্যে তাদের দলও ভারি হয়েছে। মজেম গিয়ে হইচই শুরু করে দেয়। -কুণ্ঠে শালারা! কুন্ দিক্ গেছে। তার মতো আরো দুয়েকজন, যারা খবর পেয়ে ছুটে এসেছে তারাও তারই মতো চীৎকার-চেঁচামেচি করছে। কিন্তু যারা মেরেছে তারা আগেই চম্পট দিয়েছে। তাদের নাগাল পাওয়া যায় না বলে শেষ পর্যন্ত ক্ষোভ গিয়ে পড়ে কলেজ প্রশাসনের ওপর। বহিরাগত গুণ্ডারা এসে কলেজের ছাত্রদের পিটিয়ে গেল অথচ কলেজ প্রশাসনের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা দোতলায় প্রিন্সিপ্যালের কাছে কৈফিয়ত চাইতে গেল।
মমিন আর এগুল না। পরে শোনা যাবে সবকিছু। অন্তত মজেম তো আছেই। সে বাড়ির পথ ধরল।
বারো
মুনশীদের বাগানটা রঙিন সাজে সেজেছে। রঙ-বেরেেঙর কাগজ কেটে নানা রকম ফুল-ফল-পাতা বানিয়ে আঠা দিয়ে সরু সুতলিতে লাগিয়ে টাঙিয়েছে। এভাবে গোটা প্রাঙ্গণটা ঘিরে ফেলা হয়েছে। মঞ্চ বানানো হয়েছে উত্তর পাশে বড় সড়ক ঘেঁষে। মঞ্চ ও তার সামনে বেশ খানিকটা জায়গায় সামিয়ানা টাঙ্গানো। একেবারে মঞ্চের সামনে ত্রিপল পাতা। তার পেছনে কয়েক সারি চেয়ার আর বেঞ্চ। বিভিন্ন জনের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা এগুলো, একেকটা একেক রকম। মঞ্চে কোনো চেয়ার টেবিল নেই, তার বদলে ত্রিপলের ওপর রঙিন ফুলওয়ালা চাদর বিছানো হয়েছে, অতিথিরা তার ওপরে বসবেন। ঠেস দেওয়ার জন্য গোটা কয় বালিশেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মাঠ ঘিরে যেন মেলা বসে গিয়েছে। জিলাপি, ঝুরি, সন্দেশ, পিঁয়াজু, সিঙ্গাড়া, বিস্কুট, ফল, খেলনা, বেলুন, আরো কত কত পসরা সাজিয়ে বসে গেছে দোকানীরা। ভিড় জমে গেছে ছেলেমেয়েদের। বড়রাও কম যায় না।
এর আগে ১৪ই আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়েছে। সেটার আয়োজক ছিল স্কুল। শ্যামপুর সরকারি প্রাইমারি স্কুল। তাতে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরাই মূল অংশগ্রহণকারী ছিল। এতটা জাঁকজমক হয়নি সেটা। কিন্তু আজকের অনুষ্ঠান গ্রামবাসীদের। সেজন্যে হইচই রমরমা ভাব বেশি। শ্যামপুর গ্রামের অনুষ্ঠান হলেও আশপাশের গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দাওয়াত করা হয়েছে। তারাও আসছেন এক-এক করে।
অনুষ্ঠান শুরু হতে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেল। তার কারণ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হামিদ মিয়া আসতে দেরি করলেন। তিনি মুসলিম লীগের নেতা, এই এলাকার এমএলএ। তার মতো বড় মাপের মানুষকে অনুষ্ঠানে পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ছেলেদের অনুরোধে আজিম মণ্ডল ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। হামিদ মিয়া ভাষণ দিলেন। নবজাতক পাকিস্তান রাষ্ট্রের যাতে কেউ কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানালেন তিনি। বললেন, আমাদের প্রাণপ্রিয় পাকিস্তানকে ধ্বংশ করার জন্য ভারত দালাল ছেড়ে দিয়েছে। তারা নানান উছিলায় আমাদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। যে মুসলিম লীগ আমাদের জন্য স্বাধীন আবাসভূমি পাকিস্তান এনে দিয়েছে সেই মুসলিম লীগকে দুর্বল করার জন্য ওরা নতুন পার্টি খুলেছে। এদেরকে সবার চিনে রাখা দরকার। তারা যেন মানুষকে বিভ্রান্ত করতে না পারে। পাকিস্তানের ঐক্য অটুট রাখার জন্য উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়েছে। কিন্তু তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে যে সরকার নাকি বাংলা ভাষাকে ধ্বংশ করে ফেলবে। এসব ডাঁহা মিথ্যা কথা আপনারা বিশ্বাস করবেন না। এরা ভারতের চর। এদের প্রতিহত করতে হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মঞ্চে বসা নিয়ে একটু মনোমালিন্য হয়। শ্যামপুরসহ আশপাশের গ্রামের কয়েকজন মুরুব্বি ও গণ্যমান্য লোককে মঞ্চে বসার জন্য ডাকা হয়। তার মধ্যে আজিম মণ্ডলও রয়েছেন। এ নিয়ে বাধ সাধেন তোজাম্মেল। -আজু আবার মুরুব্বি হলো কবে থেকি! অর নাম ডাকার দরকার নাই। হামিদ মিয়া স্বয়ং হাত তুলে বারণ করলেন তাকে- তোজু, তুমি থাম, ওদের কাজ ওদেরকে করতে দাও। অনুষ্ঠান ঘোষণা করছিল যে ছেলেটি তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি বলো বাবা, বলো।
ছেলেটা শহর থেকে এসেছে। তাকে ডেকে আনা হয়েছে বিশেষভাবে এই অনুষ্ঠান ঘোষণার জন্যই। তার কণ্ঠ মধুর, উচ্চারণ স্পষ্ট, বলার ভঙি সুন্দর। ছেলেটি ঘাবড়ে গিয়েছিল কিছুটা। প্রধান অতিথির হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলে সে আবার ঘোষণা শুরু করে পরিকল্পনা মাফিক।
এই অনুষ্ঠানের বিষয়সূচী পছন্দ হয় মমিনের। হুগলিতে থাকতে অনেক অনুষ্ঠান দেখেছে সে। সেসব বেশির ভাগই ওয়াজ মাহফিল। আর পাকিস্তানের দাবিতে মিছিল-মিটিং। এরকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিন্দুরা করে বলে শুনেছে সে, কিন্তু তেমন একটা দেখেনি। এটা তার নতুন অভিজ্ঞতা। সারাদিন উপভোগ করে সে পুরো অনুষ্ঠানমালা। সে নিজেও এতে অংশগ্রহণ করে। কুরআন তিলাওয়াত আর কবিতা আবৃত্তি করে পুরস্কারও জিতে নেয়। পুরো বিষয়টাই তার ভাল লাগে।
অবশ্য একটা বিষয় তার খারাপ লাগে। এ অনুষ্ঠানের মূল পৃষ্ঠপোষক আজিম মণ্ডল। আর কাজ করেছে কয়েকজন তরুণ। অথচ অনুষ্ঠানের সময় কর্তৃত্ব নেওয়ার জন্য নির্লজ্জের মতো ঠেলাঠেলি শুরু করেন তোজাম্মেল। লেলিয়ে দেন তার কয়েকজন চেলাকে। হামিদ মিয়া প্রথম ধাক্কাটা সামলে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পর যাচ্ছেতাই নোংরামি শুরু করেন তোজাম্মেল। এটা করো, ওটা করা যাবে না, একে ডাকো, ওকে বাদ দাও, এসব করে-করে ছেলেদের অতিষ্ঠ করে তোলেন তিনি।
রাতে এশার নামাজের পর মসজিদে বসে ইবরাহিম মণ্ডলের সামনে কথাটা তোলে মমিন। -লোকটা আজিম মণ্ডলকে হিংসা করে নাকি?
মাথা নাড়েন ইবরাহিম মণ্ডল। -ঠিক ধইরিছো বাবা, তোজু সমাজের মুণ্ডল হতে চায়।
-কেন, উনার বাবাই তো সমাজের প্রধান। এখন উনি প্রধান হবেন কী করে?
-সেডিই তো কথা। আজু যে দিনদিন আগায় যায়ছে এডি অর সহ্য হোছে না। খালি ঝঞ্ঝাট পাকায়।
পৌষের শীত বেশ জেঁকে বসেছে। হালকা কুয়াশা ক্রমেই ঘন হয়ে উঠছে। মমিন একটা কাশ্মিরী পশমী শাল কিনেছিল বছর দুই আগে, সেটাই গায়ে দিয়ে পড়তে বসে। একটা হারিকেন কিনে নিয়েছে সে। তেলটাও নিজে কেনে। একটু জোরে বাতাস উঠল কিনা নিভে গেল বাতি। আর তেল নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাই সে নিজেই এর ব্যবস্থা করে নিয়েছে।
কিন্তু আজ পড়তে ভাল লাগছে না মমিনের। সারাদিন যা খাটাখাটুনি গিয়েছে। আর একটা জিনিস তার মনে কাঁটার মতো বিঁধেছে। দেশ স্বাধীন হতে না হতেই ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ির বিষয়টা তার ভাল লাগে না। ভাষা নিয়ে দলাদলিটাও বাড়াবাড়ি উভয় দিক থেকেই। শিশু দেশটা কি সামাল দিতে পারবে এসব? বাংলার তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলা যেমন সবদিক সামাল দিতে পারেননি, তেমনটা হবে না তো? আজ হামিদ মিয়ার ভাষণে সে রীতিমতো বিব্রত হয়েছে। সে লক্ষ্য করেছে তার কথায় অনেকেই বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট হয়েছে। কথাগুলো তো অন্যভাবেও বলা যেত। এটা ঠিক যে পাকিস্তান টিকে থাকুক তা ভারত কোনোদিনও চায় না। না চাক, তাকে সুযোগ না দিলেই তো হয়। কিন্তু নিজেদের মধ্যে যা শুরু হয়েছে, সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, তাতে ভারতকে কষ্ট করে সুযোগ সন্ধান করতে হবে না। -আল্লাহ, আল্লাহ, পাকিস্তানকে তুমি হেফাজত করো আল্লাহ। সকলের সুমতি দাও।
আরেকটা বিষয় তার মনে হচ্ছে- এই গ্রামেও দুটো শক্তিশালী পক্ষ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এই চার মাসের ওঠাবসায় সে বুঝে ফেলেছে পাহাড়িপাড়া বা বিশেষভাবে আজিম মণ্ডলকে উত্তরপাড়ার লোকেরা ভাল চোখে দেখে না। তারা প্রায় সবাই-ই পরস্পরের আত্মীয়, তবু একটা চাপা হিংসা সব সময় এ দুটো পাড়ার লোকেদের মধ্যে কাজ করে। সাবধানে চলতে হবে তাকে, মনে মনে বলে মমিন।
বাইরে ঘোরাঘুরি করে সে খানিকক্ষণ। মৃদু বাতাস বইছে মাঝে মাঝে। পশ্চিমের জঙ্গল থেকে বুনোফুলের সুবাস ভেসে আসছে। আকাশ ভরে ঝকমক করছে লালচে নীলচে আর শাদাটে তারারা। যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে কে কতটা চকমক করতে পারে! কিন্তু কুয়াশায় সেগুলো ফ্যাকাশে দেখায়। তবু ভাবে সে, আল্লাহর কী কুদরত! এইসব তারারা নাকি একেকটা সূর্যের চেয়েও শত শত গুণ বড়। অথচ কত ছোট দেখায়। ভাবতার ক্লাসে একদিন এক শিক্ষক বলেছিলেন, বস্তুবাদীরা বলে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে যা অনুভব করা বা দেখা যায় না তাকে বিশ্বাস করি না। কিন্তু তারা বোঝে না ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যা দেখে বা অনুভব করে তা সব সময় সত্যি না-ও হতে পারে। যেমন এই নক্ষত্রগুলো। আমরা আমাদের চোখ দিয়ে দেখছি সেগুলো একেকটা চাঁদির পয়সার মতো ছোট। অথচ এই দেখাটা কত বড় ভুল! ইমাম গাজ্জালির উদাহরণ এটা, শিক্ষক বলেছিলেন। মমিন ভাবে, মানুষের জ্ঞান কতই না সীমাবদ্ধ! অথচ তাই নিয়ে কতই না বড়াই!
-মাস্টার ভাই, কী কর্ইছেন গো?
চমকে ওঠে আব্দুল মমিন। সে ছিল ভাবনার ঘোরে। আচমকা ঘাড়ের ওপর তফেজের প্রশ্ন তাকে সচকিত করে।
-ও আপনি!
-হ্যাঁ, কী ভাবছেলেন আকাশের দিক তাকায়?
-না, তেমন কিছু না। এই যে দেখেন কী বিশাল শূন্য আকাশ- তার মধ্যে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ অগুনতি নক্ষত্র ও তারকা! ভাবতে পারেন!
-সত্যি গো মাস্টার ভাই। তে থাকেন, ভাবেন আপনে আরো, আমি পরে শুইন্বোনি।
-এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন এমন হন্তদন্ত হয়ে?
-আচ্ছা পরে বুইলবোনি। অ্যাখুন যাই।
মমিনও ঘরে ঢোকে। শীতের রাতে বাইরে কুয়াশার মধ্যে ঘোরা ঠিক নয়। তার আবার সর্দি-কাশির ধাত আছে। ঘরের জানালা-দরোজা লাগিয়ে দিয়ে পড়তে বসে সে।
ঘরটা বড্ড ঠাণ্ডা। বাতাস ঢোকে চালের নিচ দিয়ে। দরোজা-জানালাগুলোও লাগে না খাপে খাপে, একটু ফাঁক থেকে যায়। সেই ফাঁক দিয়ে সুঁচের মতো ধারালো হিম বাতাস ঢোকে ঘরে। এরকম অভ্যাস অবশ্য তার আছে। আট-ন বছর হয়ে গেল সে বাড়ির বাইরে, মানে লজিংবাড়িতে থাকা। সব সময় ভাল বাড়ি পেয়েছে এমন তো নয়। বিশেষ করে থাকার সমস্যা প্রায় সবখানেই ছিল। বেশির ভাগ মানুষ নিজেদের জন্যেই ভাল বাড়ি-ঘর বানাতে পারে না। সেখানে অন্যের জন্যে বানাবে সেটা আশা করা উচিত নয়। এই কুটিরই যে পাওয়া গেছে সেটাই তার ভাগ্যি, তার পূর্বপুরুষের পুণ্যের ফল।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল টের পায়নি মমিন। হঠাৎ তার ঘুম ভাঙল দরোজায় করাঘাতের শব্দে। -মাস্টার ভাই, ও মাস্টার ভাই, দরোজা খুলেন তো। এই মাস্টার ভাই!
তফেজ। তার কণ্ঠ চাপা, কিন্তু অসহিষ্ণু। অবাক হয় মমিন। এত রাতে তার কাছে কেন? তার একটু ভয় লাগে।
ভয় লাগারই কথা বটে। এই কুঁড়েঘরটা মূল বাড়ি থেকে আলাদা, বেশ খানিকটা দূরে। রাতে তার ভাল-মন্দ কিছু হয়ে গেলে গলা ছিঁড়ে ডাকলেও এই শীতের রাতে কেউ টের পাবে না। কিন্তু তফেজ কেন.? এত রাতে?
তফেজের পীড়াপীড়িতে দরোজা খুলতে হয় তাকে। হারিকেনের আলোয় দেখে তফেজ ভিজে একশা। -কী ব্যাপার, ভিজলেন কেমন করে?
থরথর করে কাঁপছে সে। দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাচ্ছে। তাড়াতাড়ি গামছা আর লুঙ্গি এগিয়ে দেয় মমিন। কাপড় ছেড়ে একেবারে লেপের মধ্যে ঢুকে পড়ে তফেজ। তার ভিজে লুঙ্গি, জামা আর চাদর বাইরে নিয়ে গিয়ে চিপে মমিন। ঘরের মধ্যে কাপড় শোকানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া রাতে ভিজে কাপড় শুকাতে দিলে ঘর আরো ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। সেজন্যে সে কাপড়গুলোকে বাইরে টাঙানো দড়িতে মেলে দিয়ে আসে।
এখন বিপদ হলো, তার লেপটা ছোট, একজনের গায়ে দেওয়ার মতো। তফেজ একেবারে চাদর মুড়ি দেওয়ার মতো করে লেপটাকে পেঁচিয়ে মুড়িয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। বেচারি শীতে কাবু হয়ে গেছে। এখন সে কী করবে তাই ভাবছে সে। এই লেপে দুজন শোয়া যাবে না কোনো মতেই। অন্য কোনো ব্যবস্থাও এখন করা সম্ভব নয়।
-তফেজ ভাই, এই লেপে তো দুজন শোয়া যাবে না।
-আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি চইলি যাবো। আপনে ভাইবেন না।
তার গলা তখনো কাঁপছে। মমিন কিছুটা আশ্বস্ত হয়। এই দীর্ঘ শীতের রাত নির্ঘুম বসে বসে কাটানো সম্ভব নয়। কিন্তু তফেজ নিজে থেকে না গেলে তাকে তাড়াবে কী করে!
সে চাদরটা টেনে নিয়ে গায়ে জড়ায়। তারপর চৌকির ওপর বসে। তফেজ একটু সরে গিয়ে জায়গা করে দেয় তার জন্য। -শোন্ মাস্টার ভাই। আপনের খুব অসুবিধা কইরি দিনু।
আরেকটু সরে সে। কিন্তু শোয় না মমিন। -আপনি ভিজলেন কী করে?
-আর বুইলেন না, খাদের ভিতর পইড়ি গেছুনু।
-এই রাতের বেলা খাদের মধ্যে গেলেন কী করে? কী কঠিন শীত! তার মধ্যে…
-আর বুইলেন না। ভাগ্য, বুইঝ্লেন, ভাগ্য। শালা আমার ভাগ্যডাই খারাপ।
-আপনি বাড়ি যান। ভাল করে, আরাম করে নিজের ঘরে শোন গা।
-হ্যাঁ, তা-ই করি। আপনের অসুবিধা হোছে।
কথাটা ধরল মমিন। -তা একটু অসুবিধা হচ্ছে আমার। কিন্তু তার চেয়েও আপনার বেশি অসুবিধা। এ রকম কুঁড়েঘরে আপনাদের শোয়ার অভ্যেস নেই।
ক্লান্ত, ঘোরলাগা অসহায় মানুষের মতো শূন্য চোখে মমিনের দিকে তাকাল তফেজ।
-কী ভাবছেন? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?
এবার গাঝাড়া দেওয়ার মতো করে নড়ে-চড়ে বসে তফেজ। -আচ্ছা, আমি উঠি। একটা কথা মাস্টার ভাই, আপনে একথা কাউক্ বুইলেন্ না কিন্তুক্।
মাথা নাড়ে মমিন। -আপনি না বললে কাউকে বলব না। কিন্তু আপনি তো বললেনই না কী করে এমন হলো। আপনি তখন গেলেনই বা কোথায়?
-বুইল্বো পরে। আপনে আমার উপকার কর্ইলেন, আপনেক্ বুইল্বো। তে কাউক্ বুইলেন্ না কিন্তুক্, মাস্টার ভাই। দুহাই আপনের।
-আপনি ভাববেন না। আমি কাউকে বলব না।
চলে গেল তফেজ। এ এক ধাঁধা। ভাবনার বিষয়। মনে মনে ভাবে মমিন। ভাবতে ভাবতে শুয়ে পড়ে। তারপর ভাবনার ঘোরেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে বুঝতে পারে না।
ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের দেশে চলে যায় সে। দেখে তার মা বারান্দায় বসে জাঁতায় গম পিশছে। ইদানীং এসব কাজ তাকে করতে হচ্ছে। মা কামচোর নন কোনোদিন। কিন্তু বাড়িতে দু-দুটো বউ থাকতে বৃদ্ধা মাকে জাঁতা ঠেলতে হচ্ছে দেখে তার কষ্ট লাগে। সে গিয়ে মাকে সাহায্য করতে চায়। কিন্তু কী আশ্চর্য সে যতই চেষ্টা করে ততই যেন আরো পিছিয়ে পড়ে, পৌঁছতে পারে না মায়ের কাছে। কিন্তু হতোদ্যম হয় না সে। আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। তারপর এক সময় সে মায়ের কাছে গিয়ে পৌঁছে। মা তাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। তারপর কীভাবে যেন দৃশ্যপট বদলে যায়। সে দেখে ঘরের ভেতর মায়ের চৌকিতে মা তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে। মায়ের বুকের ওমে কী প্রশান্তি! মা তার মাথায় পিঠে হাত বুলায়। আর গুনগুন করে কী যে গায় গানের মতো করে সে বুঝতে পারে না। কিন্তু সেই মধুর সুর তার কানে মধু ঢেলে দেয়। তার মিষ্টি আমেজ তার বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে পড়ে। তার চোখে মায়ার অঞ্জন লেপে দেয় সেই সুর। সে ঘুমিয়ে পড়ে।
(চলবে)