ঘনকুয়াশা ছিলো। শেষরাতের দিকে চাঁদ মরে গেছে। কুয়াশার ঠাস বুনন ভেদ করে সামনে কিছু দেখার উপায় নেই। নিরাকার অন্ধকার আর কন্কনে শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে রোকন। ওপাশে শীতের মৃত নদী। রোকনের সামনে উঁচু মাটির ঢিবি। না’হলে এ রকম উন্মুক্ত জায়গায় নির্ঘাত আত্মাহুতি ছাড়া উপায় নেই। ছোট নদী তবু কিছু সময়ের জন্য হলেও ওদের গতিরোধ করে দাঁড়াবে এই যা আশা। কে কোথায় পজিশন নিয়েছে কেউ জানে না। পাশের আলে তোফাজ্জল হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে রাইফেল তাক করে। তোফাজ্জলকে দেখা যায় না হঠাৎ হঠাৎ ওর অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে। এখন রোকনের খুব সিগারেটের তৃষ্ণা পেয়েছে। রাতে ঘুমানোর আগে তিন শলা থেকে এক শলা খেয়েছিলো, অবশিষ্ট দুটো এখনো পকেটে অবস্থান করছে। কিন্তু উপায় নেই। দিয়াশলাই বালিশের নিচে ছিলো তেমনি রয়েছে হয়তো! জোছনাটা যখন আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে তখন সমীর সংবাদ নিয়ে পৌঁছে। ঘুম থেকে তড়িঘড়ি করে উঠে মোনায়েমকে অনুসরণ করে এই ঢিবির আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে রোকন। কমান্ডার বলেছিলো কতক্ষণের মধ্যে আক্রমণ হতে পারে! সমীরকে রোকনের বিশ্বাস নেই। গত তিনদিন ধরে একই সংবাদ নিয়ে কমান্ডার বেশ বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। রোকনের রাগ বাড়তে থাকে। হেড কোয়ার্টার থেকে তিনদিন আগে এখানে এসে অপেক্ষা করতে হচ্ছে দশজনের এই দলটির। রোকন জানে, কমান্ডারের কোনো যুদ্ধ প্ল্যান নেই। নির্ঘাত গাড়ল একটা। সারাক্ষণ হুস্ হুস্ করে সিগারেট টানবে, বেড়ালের মতো পিট পিট করে তাকায়। এই রকম মানুষগুলোর আইকিউ তীক্ষ্ণ হয় কিন্তু ওর বেলায় হয়েছে বিপরীত। আবার বেঙ্গল রেজিমেন্টের সুবেদার ছিলো। পোঁদে লাত্থি মেরে বের করে দেয়নি এই বেশি। কথা বলার সময় মনে হয় জেনারেল পদটি না দিয়ে ভুল করেছিলো পাক সরকার। প্রথম থেকেই এই লোকটি রোকনের এলার্জির মতো। কমান্ডার কি জানে রোকন ওকে সহ্য করতে পারে না? মনে হয় না। সেই মনোভাব রোকন কোনো সময় প্রকাশ করেনি তার চেয়ে বরং অন্যান্যের তুলনায় তার প্রতি আস্থা পোষণ করে বেশি।
এইতো এই ঢিবির আড়ালে পজিশন নেয়ার পর মান্ডার দু’বার এসে দেখে গেছে। হাতে সিগারেট। তা দেখে রোকনের তৃষ্ণা আরো বেড়ে যায়। একবার বলতে ইচ্ছে করে জব্বর ভাই সিগারেট খাবো আগুনের দরকার। এই রকম চূড়ান্ত মুহূর্তে সিগারেট খাবার নিয়ম নেই। হেড কোয়ার্টারে রিপোর্ট করলে বকাঝকা শোনতে হয়। শালা গাড়ল কেমনে হুস্স-হুস্স করে সিগারেট টানছে।
কমান্ডার চলে যেতেই তোফাজ্জল ডাকলো, ‘রোকন দিয়াশলাই আছে? ফ্যাস-ফ্যাসে কণ্ঠে খুব অপরিচিত লাগলো।
‘না নেই; আমারও খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। ভাবছি তোর কাছে আছে বোধ হয়?’ একটু উচ্চস্বরে বলল রোকন।
ওদের কণ্ঠের আওয়াজ পেয়ে কমান্ডার ছুটে এলো।
‘বোকামি করো না রোকন, আমাদের অবস্থান জেনে গেলে ভীষণ খারাবি হবে। কমান্ডারের কণ্ঠ বেয়ে ঝরে পড়ে শ্লেষের অগ্নিবাণ। রোকন কথা না বলে ক্রোধান্বিত হয়ে একবার ভাবলো- নদীর ওপারেই ওরা আসে নাই, নদীর পাড়ে আমাদের লোক বসে আছে, কমান্ডারের ব্যস্ততা দেখে মনে হচ্ছে ওরা ঘাড়ের কাছে রাইফেল উঁচিয়ে বসে আছে।
দূরে কোথাও হুক্কা-হুয়া রবে শেয়াল ডাকলো। এখন রাতের শেষ প্রহর। আর এক ঘণ্টা পর সূর্য উঠবে। কন্্কনে শীত সুচের মতোন বিদ্ধ করছে লোমকূপে। সোয়েটার শীত মানতে চায় না। রাইফেলে হাত রাখলে হিম হয়ে আছে। শির শির করে। এইভাবে আরো দশ মিনিট চুপচাপ বসে রইলো রোকন। দীর্ঘ হাই শেষে তোফাজ্জলকে ডাকতে যায় ঠিক এই সময় এক ঝাঁক গুলি ভেসে এলো মেশিনগান থেকে। বুকের ভেতরটা একবার নড়ে উঠলো রোকনের। পরক্ষণেই রাইফেলটা আঁকড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। চারদিকে একনাগাড়ে গুলির শব্দ। রোকন একবার গুলি থামিয়ে তোফাজ্জলকে ডাকলো। কিন্তু সাড়াশব্দ পেলো না। অন্ধকারে উভয়পক্ষের গুলির শব্দ শুনতে শুনতে রোকনের মন খারাপ হয়ে যায়। তোফাজ্জল কি গুলবিদ্ধ অথবা পালিয়েছে? হয়তো মরে গেছে তোফাজ্জল। আহা অজান্তে মমতার কাতরোক্তি বেরিয়ে গেলো রোকনের কণ্ঠ গলিয়ে। দস্যুদের গুলিগুলো অনেক দূরে গিয়ে পড়ছে। হয়তো ওরা ধারণা করতে পারেনি মুক্তিবাহিনী এতো কাছে পজিশন নেবে। সাঁই-সাঁই করে মাথার উপর দিয়ে গুলি চলে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে রোকন। কার্তুজ এখন শেষের দিকে। কমান্ডার শালা এখনো আসছে না কেন? আর মাত্র তিনটে কার্তুজ আছে। শেষ সম্বল হারাতে চায় না রোকন। বসে আছে এই ভেবে যদি কেউ সাপ্লাই নিয়ে আসে! তা ছাড়া যেভাবে গুলি যাচ্ছে মাথার উপর দিয়ে সরতে গেলে নির্ঘাত মরতে হবে। আস্তে আস্তে ভোর হচ্ছে। আবছা দেখা যায় তোফাজ্জল ওর পজিশনে নেই। ওরা কি সব পালিয়েছে? নিজেকে অসহায় ভাবতে শুরু করলো রোকন। এই সময় অবশিষ্ট তিনটে কার্তুজ আর কোনো ভরসা জোগাবে না। তারচেয়ে বরং নিরাপদ দূরত্বে সরে সাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। গোলাগুলি এখন কমে আসছে। হঠাৎ হঠাৎ ঠাস করে উঠে রাইফেলের গুলি। কতোক্ষণের মধ্যে ওরা নদী পার হয়ে এদিকে মার্চ করবে। এখন উপায়? খুব দ্রুত ভাবতে থাকে রোকন। খুব নিঃশব্দে রাইফেল কাঁধে তুলে নেয়। সামনের দিকে পা বাড়াতেই বুকটা কেঁপে উঠলো। জোরে সামনের দিকে দৌড় দিলো। কিছুদূর যেতেই অস্পষ্ট কথাবার্তা কানে আসতে থাকে। রোকন ভাবলো ওরা ইতোমধ্যে নদী পার হয়ে গেছে। একটু পরিষ্কার হলেই ধরা পড়ে যাবে রোকন! আবছা দেখলো সামনে মৌডালের ঝোপ। তার আড়ালে আশ্রয় নিতেই বাংকারের মতো এক গর্তে অদৃশ্য হয়ে যায় রোকন। মাথার ওপর ঘাসের আচ্ছন্ন। বেশ নিরাপদ বোধ করতে থাকে রোকন।
ঝলমল করে রোদ্দুর উঠলো। গাছের পাতায় রঙের নাচন। এই গর্ত থেকে রোকন একবার মাথা বের করে দেখেছিলো, অস্পষ্ট কুয়াশা, পাকবাহিনী নদীর এপারে উঠে এসেছে। প্রচণ্ড শীতে জমে যাচ্ছিলো হাত-পা। রোকন শব্দ শুনলো ধপ্্-ধপ্্ করে পা ফেলে গ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। এখন মাথা বের করলে দেখে ফেলবে ওরা। রাইফেল তাক করবে। টেন-হিঁচড়ে বের করবে। টর্চার করবে। টন টন করে উঠলো রোকনের মাথা। নিজেকে আরো গুটিয়ে নিলো। শব্দগুলো এখন মিলিয়ে গেছে। গর্তটায় এতোক্ষণ ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিলো। এখন আলো ঢুকছে। রাইফেল একপাশে সরিয়ে রেখেছিলো অনেক আগে। হঠাৎ করে রাইফেলের ব্যারেল বরাবর নিচের দিকে তাকালো রোকন। এক মুহূর্তের জন্য আঁতকে উঠলো। একটা মাথার খুলি, তার পাশে একগুচ্ছ দীর্ঘ চুল পড়ে আছে। এতোক্ষণ পর ভয় শুরু হলো রোকনের। কিন্তু উপায় নেই, এখান থেকে বের হলেই নির্ঘাত মৃত্যু। ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। হার্টবিট বেড়ে গেছে ওর। এতোক্ষণ একটা কংকালের পাশে বসেছিলো তাও আবার কবরের ভেতর। আবার হিম হয়ে আসলো রক্ত। একনজর তাকালো খুলি এবং চুলগুলোর দিকে। বেশ লম্বা চুল। দেখে মনে হয় কোনো সদ্য যৌবনে পা দেয়া রমণীর চুল। মিশমিশে কালো। টক্্ টক্্ করে দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাচ্ছে। একবার মাথা বের করে দেখলো শেষ দলটি গ্রামের দিকে যাচ্ছে। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। একপলক তাকিয়ে থেকে কাছিমের মতো মাথা কবরে গুটিয়ে নিলো।
চুলগুলোর দিকে আবার তাকিয়ে থাকে নির্মেষ। অন্তহীন নিস্তব্ধতা কবরের ভেতর। ভয়ে চোখে জল এসে যায় ওর। ডুকরে কেঁদে ওঠে একসময়। অনেক কিছু মনে করতে গিয়ে মনে করতে পারে না। রোদ এতক্ষণে তেঁতিয়ে উঠেছে। আবার কবর থেকে মাথা বের করলো রোকন। গ্রামের দিকে তাকাইতেই চোখ স্থির হয়ে যায় ওর। গ্রাম জ্বলছে। অসংখ্য বাড়ি-ঘরে একেবারে আগুন দিয়েছে ওরা। কুয়াশা কেটে যাওয়াতে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে রোকন। পাকবাহিনী গিজ গিজ করছে এলাকাটা। অক্ষম চোখ দুটো আবার ফিরে এলো সেই চুলগুলোর কাছে। হতাশায় নুয়ে পরে ও। আকস্মিক চুলগুলোর খুব চেনা মনে হতে থাকে। অবিকল মিকির মতো। এতোটুকু তফাৎ নেই। আশ্চর্য। কলেজে একসাথে পড়েছে। ও কতো যে বিলি কেটেছে মিকির চুলে। মিকিকে রোকন সত্যি কি ভালোবাসে?
ঠা’-ঠা’ করে লাইট মেশিনগানের গুলি হচ্ছে। বিজয়োল্লাসে দস্যুরা গুলি করছে হয়তো! আবার মাথা বের করে দেখতে চেষ্টা করে রোকন। বাড়ি-ঘরগুলো পুড়ে গেছে অনেক আগে। শুধু নিভন্ত আগুনের ধোঁয়া উড়ছে সারা গ্রাম। দেখতে দেখতে সারা গ্রামের আগুন নিভে গেলো। পোড়া ধ্বংসস্তূপ এখন সারা গ্রাম। মাঝে মাঝে আগুনের হাল্কা বাতাসে উড়ছে। হানাদাররা এখন গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। রোকন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে নিলো সব। আর কতোক্ষণ নিজের অক্ষমতাকে পুষে রাখবে? রাগে দুঃখে আবার কাঁদতে ইচ্ছে করলো। হাত বাড়িয়ে রাইফেলের অস্তিত্ব অনুভব করে। শক্ত করে আঁকড়িয়ে ধরে কার্তুজগুলো। এক একক করে খুলে নেয় সব। মাত্র তিনটে কার্তুজ। আবার রাইফেল লোডেড করে চুলগুলোর দিকে তাকালো। অবাক রোকন। চুলগুলো দেখে রোকনের ভুল হবার কথা নয়। ওগুলো বীথির চুল। ওর একমাত্র বোন। এক সাথে বড় হয়েছে। চোখ জলে ঝাপসা হয়ে আসে। মাথার রগগুলো দাপাদাপি করতে থাকে। আকাশের দিকে তাকায়। নিঃসঙ্গ চিল উড়ছে অনেক উপরে ওর সোনালি ডানায় রোদের ঝিকিমিকি। এতোক্ষণে কবরের মুখে রোদ্দুর। রোকনের খুব তৃষ্ণা পায়। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। হামাগুড়ি দিয়ে কবর থেকে বের হয়। রোদ গায় করে চিৎপাত শুয়ে থাকে কতোক্ষণ। মা’র কথা মনে পড়ে, বীথির কথা, মিকির কথা। যা ভুলে যায় একসময়।
দূরে অনেক দূরে রাইফেল গর্জে ওঠে। হানাদাররা ফিরে যাচ্ছে রাইফেল কাঁধে করে। মৌডাল ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসে রোকন। অজান্তে বলে ওঠে জয় বাংলা। আবার মনে পড়ে আগামীকাল সোমবার, সতেরো তারিখ। তারাবহ ক্যাম্প আক্রমণ করতে হবে। সব প্লাটুন একত্রিত হতে আজ। হানাদারদের নিস্তার নেই। সামনের দিকে পা বাড়িয়ে দিতেই চোখে পড়লো নিভন্ত আগুনের স্তূপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে।