আবারও আমায় আসতে হলো। এই তো মাসখানেক আগে এসেছিলাম ২০নং ওয়ার্ডে আর এবার ২৬নং ওয়ার্ডে। তবে এ আকর্ষণ আমার নিজের জন্য কিংবা নিকট কোন আত্মীয়ের জন্য নয়। বাবার চাকরির কারণে সে গ্রামের দৃশ্যপটে আমি জন্মের পর থেকে অদৃশ্য হয়েছি সেই মাতৃভূমির কোন এক অসহায় লোকের অনুরোধে আমার এ আগমন। মোবাইল ফোনে সে রোগিণীর দেখভালের কথা বলা হয়েছে তাকে আমি কাস্মিনকালেও দেখি নাই এমনকি তার নামও শুনি নাই। সঙ্গত কারণেই আমাকে একটু সমস্যাই পড়তে হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজ হাস পাতালের বেডে মেঝেতে গিজগিজ রোগীদের মাঝে এখন তাকে খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। উপায় না পেয়ে একজন নার্সের শরণাপন্ন হলাম। তিনি আমার কথা যতটুকু শুনলেন তার থেকে বেশি প্ররখ করলেন। কিছুটা তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন, রোগীকে আপনি চেনেন না রোগীও আপনাকে চেনে না তাহলে আমরা কী করতে পারি? আমাকে থ মেরে থাকতে দেখে পরক্ষণে তিনি রেজিস্টারটা হাতে নিলেন। পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললেন, আপনার রোগী যদি বেড পেয়ে থাকে তাহলে আপনার কপাল ভালো। নইলে— নইলে আবার কী? সাগ্রহে প্রশ্ন করলাম। রেজিস্টার থেকে মুখ তুলে তিনি বললেন, এতো সোজা হিসেব! বেডও নেই নম্বরও নেই। আপনাকে মেঝের রোগীদের মাঝে নাম জিজ্ঞেস করে করে বের করতে হবে। পরক্ষণে আবার বললেন, বাই দি বাই আপনার রোগীর নাম কী? বললাম, সবুজ বানু দেখি সবুজ বানু কোথায় আছে, আবার রেজিস্টারে চোখ রাখলেন তিনি। তন্ন তন্ন করে কয়েক বার খুঁজলেন। এরপর চোখ থেকে চশমা খুলে হতাশ কণ্ঠে বললেন, দুঃখিত আপনার রোগীর কোন বেড নাই। মেঝেতে আছে। এবার খুঁজে বের করুন। সমস্যাটি এবার বুঝতে পারলাম। নার্সকে ধন্যবাদ জানিয়ে রোগী খুঁজতে বের হলাম। মেঝেতে জড় সড় হয়ে পড়ে থাকা রোগীদের মধ্যে বয়স হিসেব করে নাম ধাম জিজ্ঞেস করছি, কারণ রোগীর বয়স ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে হবে। উৎসুক ও চাই চাই দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে যখন এগোচ্ছি তখন সামনের বেড থেকে এক প্রৌঢ় জিজ্ঞেস করলেন, এই খোকা, তুমি কাকে খুঁজছো? থমকে দাঁড়ালাম। আমি আবার খোকা! বয়েস তো পঞ্চাশ পার হয়েছে। যখন খোকা বলে সম্বোধন করছে তখন প্রৌঢ়কে গভীর ভাবে প্ররখ করতে লাগলাম। আপাদমস্তক সাদা ফক ফকে এই প্রৌঢ়ের বয়স আশি ক্রম করেছে বলে মনে হয়। চোখের মণি কোঠারোগত হলেও দাঁতগুলো ঠিকই আছে। নকল দাঁত না আসল দাঁত কে জানে! তবে গায়ের ধবধবে রঙ দেখে অনুমান করা যায় যৌবনকালে তিনি অসামান্য সুন্দরী ছিলেন, কাছাকাছি হতেই তিনি বললেন, এই ভাবে কী রোগী খুঁজে পাওয়া যায়! তারপর ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা টেনে বললেন, তোমার ভাগ্য ভালোই। আমার পাশে মেঝেতে যে রোগী দেখছো ওই তোমার সবুজ বানু। আমি রোগিণীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম, রোগিণীও ফ্যাল ফ্যাল চোখে আমায় দেখছে। আর তার পাশে জড় সড় হয়ে আছে আট নয় বছরের এক ছেলে। জিজ্ঞাসু চোখে বললাম, এই তোমার নাম কী?
– সবুজ বানু।
– বাড়ি কোথায়।
– মান্দা থানায়।
নিজের নাম বলে বললাম, আমাকে কি চেন? আপনার নাম অনেক শুনেছি। তবে কোন দিন দেখিনি, সবুজ বানু সরাসরি উত্তর দিল। পরক্ষণে তার সমস্যা জানতে চাইলে সে আমাকে একটা প্রেসক্রিপশন ও অ্যালুমেনিয়ামের টিফিন বক্স হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, ডাক্তার সাহেব এ ঔষধগুলো কিনতে বলেছেন, আর গতকাল থেকে আমার ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া হয় নাই। যথা প্রস্তাব! আরও কিছু খোঁজ খবর নেয়ার পর ছেলেটাকে সাথে করে যখন বের হবার উদ্যোগ নিচ্ছি ঠিক তখনই পাশের প্রৌঢ় চেঁচিয়ে উঠলেন, এই যে খোকা কোথায় যাচ্ছো? আমি তোমার উপকার করলাম আর তুমি না বলে চলে যাচ্ছো যে? তার এই অপ্রত্যাশিত কথার বানে আমি কেমন অপ্রতিভ হয়ে গেলাম। উপায় খুঁজতে ঢোক গিলে বললাম, দুঃখিত খালাম্মা! বিষয়টা ওভাবে ভেবে দেখিনি যে।
– তা দেখবে কেন? তুমি কী আমার পেটের ছেলে? তবুও ভাল খালাম্মা শব্দটা উচ্চারণ করেছো। বিষয়টা হালকা করতে আমি আলগা ভঙ্গিতে বললাম, আপনি তো আমার মায়ের মতো। কেন আপনাকে খালাম্মা বলে ডাকবো না? ভদ্রমহিলা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। তার বুদ্ধিদীপ্ত চোখের মনি, কুঁচকে যাওয়া কপাল থেকে যেন একটা প্রশ্ন তীরের মত আমাকে বিদ্ধ করতে থাকে। তীরটা হাহাকার না ব্যর্থতার ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না। পরক্ষণে তিনি আঁচল দিয়ে চোখ ঢাকলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, বাবা তুমিই যখনই আসবে তখন এ বুড়ো মায়ের খোঁজ খবরটা রাখবে। ভদ্রমহিলার কথাগুলো শুনে মনে হলো আমি আরেক জনের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছি। এখন বোধ হয় আর তাকে উপেক্ষা করা যাবে না। প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে সবুজ বানুর সমস্যাগুলো দেখতে হলো আমায়। সেই সঙ্গে খালাম্মার অনেক দুঃখের বয়ানও শুনতে হলো। সবুজ বানুর কৃতজ্ঞতার সালাম জানিয়ে চলে গেল এক সময়। কিন্তু খালাম্মার অসহায়ের নাগপাশ হতে মুক্ত হতে পারলাম না। কয়েক দিনের আলাপচারিতায় জানলাম স্বামী ও এক ছেলে নিয়ে সংসার ছিল তার। সরকারি চাকরিজীবী স্বামী ত্রিশ বছর আগেই মারা গেছেন। অসহায় খালাম্মা শেষ পর্যন্ত ছেলেকে নিয়ে বাকি দিনগুলো কাটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সৌভাগ্য তার কপালে জোটেনি। বছর দশেক আগে ছেলে কামরান গ্রিনকার্ড নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে আমেরিকায়। সেখানেই এক বিদেশিনীকে বিয়ে করে স্থায়ী হয়েছে। কাজের ব্যস্ততার কারণে এদেশে আর আসা হয়ে ওঠে নাই। তবে কামরান অনেকবারই খালাম্মাকে আমেরিকায় নিয়ে যেতে জেদাজেদি করেছে। কিন্তু স্বামীর ঘর ভিটা ছেড়ে যেতে রাজি হননি তিনি। এই দশ বছর ধরেই বলতে গেলে তিনি একেবারে নিঃসঙ্গ নির্বান্ধব। শুধু মাত্র কেয়ারটেকার রহমত মাস মাহিনার লোভে আগলে রেখেছে তাকে। খালাম্মার সঙ্গে যতই আলাপচারিতা বাড়ছে ততই আমি উদ্ধগ্ন হচ্ছি। তবে উদ্বিগ্নতা তার একাকিত্ব জীবনের জন্য নয় কিংবা বিদেশে প্রবাসী তার সন্তানের জন্যও নয়। উদ্বিগ্নতার মূল কারণ খালাম্মা ক্যান্সারে আক্রান্ত। ডাক্তার সাহেব আড়ালে আমাকে বলেই দিয়েছেন উনি আর বাঁচবেন না। বড়জোর মাস খানেক। বিষয়টা আড়াল করে একদিন খালাম্মাকে বললাম, আপনার ছেলের একবার আসা দরকার। ওকে একবার ফোন করলে হয় না?
– কেন! বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
– না তেমন কিছু না। ছেলে যদি আপনার পাশে থাকে তা হলে আপনার মন ভালো থাকবে। সময়টাও কাটবে ভালো।
– তার মানে তুমি ছুটি চাইছো? পাল্টা প্রশ্ন করলেন তিনি।
– ছি ছি একি বলছেন! নিজেকে সামলে নিয়ে বলি, হাজার হোক আপন পর বলে একটা কথা আছে। আমার কথাগুলো শুনে তিনি মুখ বুজে মাথা নিচু করে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, তুমিই আমার ছেলে। যখন তোমার ভেতর এই আপন পরের বোধ জন্ম নিয়েছে তখন তুমিই একবার ফোন করো না কেন? এই নাও আমার মোবাইল ফোন। একটি মাত্রই নাম্বার আছে চাপ দিলেই দেখতে পাবে। মোবাইল ফোন সেট নাড়াচাড়া করলাম বটে কিন্তু এই মুহূর্তে কথা বললাম না। নাম্বারটা টুকে নিলাম। সেই দিন রাতে শোবার আগে কামরানের সেলফোনে রিং করলাম। রিসিভ করল একজন ইংরেজ মহিলা সম্ভবত কামরানের স্ত্রী। উনার ইংরেজি উচ্চারণ আমার কাছে দুর্বোধ্য মনে হলো। অনুরোধের সুরে বললাম, আপনি যদি কামরানের স্ত্রী হোন দয়া করে ফোনটি কামরানকে দিন। অথবা আস্তে আস্তে কথা বলুন। সেলফোনটি কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর আবারও কথায় আওয়াজ পাওয়া গেল। ভদ্রমহিলা থেমে থেমে কিছুটা আমাদের মতো বলার ঢং এ বলতে লাগলেন। জিজ্ঞেস করলেন আমি কে এবং কেন বা কামরানের সঙ্গে কথা বলতে চাইছি। বিষয়টা খোলাসা করলাম। এবার সেল ফোনের পুরুষের কণ্ঠ পরিবর্তন হলো। পুরুষের কণ্ঠ এবং শুদ্ধ বাংলায়। কুশল বিনিময়ের পর ব্যাখ্যা দেওয়াতে কামরান প্রতি-উত্তরে বলল, আমরা এখন মায়ামী সৈকতে সাপ্তাহিক ছুটির অবকাশ পালন করছি। বিষয়টা নিয়ে রাতে আপনার সাঙ্গে কথা বলবো। কথা বন্ধ হয়ে গেলে আমি থমকে থাকলাম কিছুক্ষণ। মা যখন মৃত্যুর কোলে সন্তান তখন বালিল সমুদ্রে সূর্যস্নানে ব্যস্ত। কবি গুরুর ভাষায় বলতে ইচ্ছে করছে, হে বঙ্গ জননী সব সন্তানকে তুমি মানুষ করতে পারোনি।
আমাদের আকাশে যখন সন্ধ্যে তারার দিশারি তখন মার্কিন মুল্লুকে মাথার ওপর সূর্যের আলো আবার ও দেশের আকাশে তারার মেলা তখন আমরা খরতাপে ক্লান্ত। পরদিন ক্লান্ত দুপুরে ফোন পেলাম। কামরানের ফোনে আরো যা জানতে পারলাম তাতে আমার আক্কেল গুড়ুম। সেকেলে একজন মানুষ নিজের পরিবারকে বাদ দিয়েও পাড়া-পড়শির প্রতি দয়া-মায়া করতো পথের ভিখারিকে দয়া করতো এমন কি বাড়ির কুকুর বিড়ালের ওপরও মায়া থাকত। একালে সেই দয়া মায়া বারো মিটার সে শূন্য ডিগ্রিতে নেমে গেছে, সে কথা আমার জানা ছিল না। কামরানের স্ত্রীর স্রেফ জানিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকায় যেমন হাসপাতাল ক্লিনিক গির্জা পাদ্রি আছে তেমনি বাংলাদেশেও হাসপাতার ডাক্তার মসজিদ মাওলানারা আছে। মা অসুস্থ টাকা পাঠাও যতদিন বেঁচে থাকবে। মৃত্যু হলে সিটি কর্পোরেশন অথবা সমাজের লোকজন তোমাদের ধর্মীয় রীতি অনুসারে কবর দেবে। এখানে কয়েক হাজার মাইল দূরে গিয়ে দেখার কী আছে। স্ত্রীর এই যুক্তির কাছে কামরান একবোরে পরাস্ত। সুতরাং চাকরি, স্ত্রী-সন্তান ফেলে তার পক্ষে মাকে দেখা সম্ভব নয়। যোগ্য মায়ের যোগ্য সন্তান বলে তর্কে না গিয়ে ফোন ছেড়ে দিলাম।
পরদিন গেলাম হাসপাতালে। খালাম্মার কাছে বিষয়টা উপস্থাপন করতেই তিনি ডান হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, থাম থাম। কামরানের কথা আর বলো না। অতো একটা জানোয়ার, অমানুষ। বউ ছাড়া তো আর কিছুই বুঝলো না। আমার পেট থেকে এরকম একটা জালেমের জন্ম নিবে ভাবতেই পারি নাই। এ প্রসঙ্গে কথা আর বাড়ালাম না। কথা বাড়ালে খালাম্মার ক্ষোভটা শুধু বাড়বেই। আত্মতুষ্টি খুঁজে পাবেন না। খালাম্মার দেখভালের লোক বলতে এখন আমরা দু’জনা। একজন মাস মাইনের সেবক রহমত আর আমি। কদিন থেকেই দেখছি খালাম্মা খুব বিষন্ন। ডাক্তার নার্সদের আচরণ, আমাদের উদ্বিগ্নতা দেখে তিনি স্পষ্ট বুঝে গেছেন তার দিন ফুরিয়ে আসছে। একদিন বললেন, খোকা আমি নির্ঝঞ্জাট হতে চাই। একটা ভালো উকিল ডেকে আনতো। হঠাৎ উকিলের প্রয়োজন কেন? বিস্ময়ের জিজ্ঞাসা করলাম তাকে। তিনি চোখের পানি মুছে বললেন, ছেলের উপর হয়তো আমার রাগ। অভিমান আছে। ওর আচরণে থাকাটাই স্বাভাবিক। তবুও মুদ্রার অপর পিঠের মতো তার প্রতি মায়া মমতাও আছে। আমি চলে গেলে এই ঘর বাড়ি জমিজমা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কী হবে? প্রাপ্য চুকিয়ে দিতে চাই। আমি নিশ্চুপ থাকলাম। কারণ এসব ভাগবাঁটোযারা উকিল মোক্তার তো দুরের কথা, বৈষয়িক কথাবার্তাও কখনও কারো সঙ্গে বলিনি। তবে কামরানকে দেশে ফিরে আনার মোক্ষম একটি সুযোগ পেয়ে গেলাম। প্রতি উত্তরে বললাম, আচ্ছা খালাম্মা আপনার কথা মতো সব হবে। রাতে কামরানকে বিষয়টা বললাম। এবার আরও বুঝালাম উকিল মোক্তারের প্যাঁচ, উপস্থিত না থাকলে পস্তাতে হবে। কামরান ভাগ বাঁটোয়ারা এতসব বুঝে না, এ নিয়ে কোন দিন মাথাও ঘামায়নি। ওর ধারণা বাপ মায়ের একমাত্র সন্তান সে। এতকাল যেভাবে চলে আসছে ভবিষ্যতেও সেভাবে চলে যাবে। কিন্তু মসজিদ মাদ্রাসা ও অন্যান্য দানের কথা বলায় কামরানের ভেতর বোধ হয় চিড়বিড় করে উঠেছিল। সে ভালো করে জানতো এসব ব্যাপারে তার মায়ের একজন ধরনের গোঁয়ার্তুমি আছে। তাকে আটকানো কঠিন ব্যাস পরক্ষণে গুমোট ভাবটা ফিকে হয়ে এলো। কামরান সিদ্ধান্ত নিলো সে অচিরেই বাংলাদেশে আসবে। খালাম্মার কথা মতো উকিল সাহেব ইতোমধ্যে ভাগবাঁটোযারা কাগজপত্র তৈরি করে ফেলেছেন। এখন শুধু স্বাক্ষরের পালা। মসজিদ মাদ্রাসা এতিম খানাসহ অনেকের নামই যুক্ত হয়েছে এ বন্টক নামায়। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের একটা ক্ষুদ্র অংশও ছেড়ে দেয়া হয়েছে আমার ও রহমতের নামে। কিন্তু তবুও তার স্বাক্ষর পর্ব ঠেকিয়ে রাখলাম। উকিল সাহেব তা মানতে নারাজ। তিনি মন থেকে এখন প্রাকাশ্য আমার উপর ক্ষিপ্ত। কারণ খালাম্মা শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছেন। কামরান আসার আগের তিনি যদি পরপারে পাড়ি জমান তাহলে তিনি বড় অংকের একটা ফি থেকে বঞ্চিত হবেন।
অবশেষে কামরান যখন এলো তখন খালাম্মা মাঝে মাঝে জ্ঞান হারাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরে পেয়ে কামরানকে দেখে খালাম্মা জোরে জোরে কেঁদে উঠলেন। তারপর আমাদের দেশে হাজার হাজার বছর ধরে হাজার হাজার মা সন্তানকে দেখলে যেমন তার অতীত কর্মকাণ্ড অন্যায়কে ভুলে যান তেমন খালাম্মা সব কিছু ভুলে কামরানকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন আদর করলেন, ফোকলা মুখে চুমু খেলেন। তারপর বণ্টননামা দেখতে বললেন। বণ্টননামা পড়ার পর অবাক ভাবটা কাঠিয়ে উঠতে বেশিক্ষণ সময় লাগলো না কামরানের। সে সব ধরনের দান খয়রাত কাটছাঁট করতে নির্দেশ দিলেন উকিল সাহেবকে। শুধু ব্যতিক্রম আমার অংশটুকু। ওঠা ঠিকই রাখতে বললো। খালাম্মার মন যেন মানতে রাজি নয়। তবুও শেষ পর্যন্ত পুত্রের উপস্থিতি তার কাছে বেশি মনে হলো। অখুশি সত্ত্বেও বণ্টননামার পরিবর্তন মেনে নিলেন। কিন্তু বাদ সাধলাম আমি। বললাম, বন্টননামা আরও পরিবর্তন করা দরকার। আমার কথায় প্রায় তিনজনই চমকে উঠলো। কামরান বললো, আর কী পরিবর্তন।
– আমার অংশ ঐটুকু কেটে আপনার নামে নিন।
– কী বললে? খালাম্মা বুকে যেন কথাটা খচ করে বিঁধে গেল। ক্ষীণ গলায় বললেন, আমি তো ইচ্ছে করে দিচ্ছি। কেন তুমি নেবে না? নিতান্তই নিরীহ সমাধান। এখানে বাধার দেয়ার কেউ নেই। তবুও বললাম, বণ্টননামার আপনার স্বাক্ষর আমাকে যে অধিকারই দিক না কেন, ওটা হবে আমার জন্য, আত্মসম্মান হীন। বরং নিজের উপার্জনে যে টাকা হাতে আসে তার ভেতরই আত্মসম্মান খুঁজে পাওয়া যায়। তা ছাড়া ….তা ছাড়া আবার কী? খালাম্মা প্রশ্ন করলেন।
– আপনার ছেলেতো সাত পাঁচ ভেবেই বাংলাদেশে এসেছে। তাকে বঞ্চিত করবেন কেন? আপনি যখন জীবিত তখন ওর পাওনাটা মিটিয়ে দিন।
– খোকা তুই ঠিকই বলেছিস কিন্তু আমি তোকে ভুলবো না। তোকে একটা কিছু নিতেই হবে। হ্যাঁ অবশ্যই নিব। তবে নগদ কিছু না একটু দোয়া। রোগী শয্যার রোগী দোয়া আলাহ্ দরবারে পৌঁছে। নিশ্চয়, নিশ্চয়, খালাম্মা হাত তুলে দোয়া করতে লাগলেন। ঐদিকে উকিল সাহেব কাগজ তৈরি করে ফেললেন। পরক্ষণে স্বাক্ষর টিপসই দুটোই মেলে ধরলেন খালাম্মার কাছে। স্বাক্ষর পর্বের পর খালাম্মা আরও কিছু সময় সজ্ঞানে ছিলেন। দেখছিলেন তাঁর পুত্র ও আমাকে। তার পর আবার জ্ঞান হারালেন। এরপর আবার তিনি জ্ঞান ফিরে পাবেন কি না একমাত্র আলাহ্ পাক ভালো জানেন। তবে আমরাও কামরানের মাঝে কোন কথাবার্তা ছিল না।