[ভার্জিনিয়া ওল্ফ (১৮৮২- ১৯৪১) স্বনামধন্য ইংরেজি ভাষার লেখিকা। চেতনাবোধে উজ্জীবিত হয়ে নারীবাদী অনুষঙ্গে অসাধারণ সব লেখা লিখে বিশ্বসাহিত্যে খ্যাতি অর্জন করেন। মার্সেল প্রুস্ত, জেমস জয়েসের মতো আধুনিক উপন্যাসের স্রষ্টা হিসেবে তিনি খ্যাত। তিনি তার লেখায় প্রতীকধর্মী ও কাব্যিক অনুষঙ্গে তুলে ধরেছেন। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘টু দি লাইট হাউস’। এ ছাড়াও তিনি মিসেস ড্যালোওয়ে, দিওয়েভস আর ল্যান্ডোর মতো বিখ্যাত উপন্যাসের স্রষ্টা। তিনি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবন্ধ রচনা করেন। তার লেখা হাউ শুড ওয়ান রিড এ বুক? প্রবন্ধের বঙ্গানুবাদ পত্রস্থ করা হলো।]
প্রথমত আমি আমার এই শিরোনামের শেষের জিজ্ঞাসা চিহ্নের ওপর জোর দিতে চাই। যদি আমি নিজের মতো করে এ প্রশ্নের জবাব দেই, তবে জবাবটা শুধুমাত্র আমারই মনঃপূত হতো, আপনাদের মনঃপূত হতো না। একজন ব্যক্তি পঠনপাঠন সম্বন্ধে অন্যের মতো করে নাও বলতে পারেন। সহজাত প্রবৃত্তি ও নিজস্ববোধ থেকে আপনাকে ‘কিভাবে বই পড়া উচিত?’ বিষয়ে উপসংহারে পৌঁছাতে হবে।
বই সম্বন্ধে কী বিধিবিধান আছে? ওয়াটার লুয়ের যুদ্ধ নিশ্চিতভাবেই একটা নির্দিষ্ট দিনে ঘটেছিল। কিন্তু হেমলেট কি লিয়ারের চেয়ে অধিকতর ভালো নাটক? কেউই বলতে পারে না। প্রত্যেকেই নিজে নিজেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। আমাদের লাইব্রেরিগুলোই আমাদের বলবে কিভাবে কোন কোন বই পড়তে হবে, যা আমরা পড়ি তার মূল্যায়নই বা কী, স্বাধীনতাবোধটাই বা কী। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আমরা বিধিবিধানের গণ্ডিতে আবদ্ধ- আমরা কেউই বিধিবিধানের গণ্ডির বাইরে নই।
বৈচিত্র্যহীনতা ক্ষমার যোগ্য হলে কিন্তু স্বাধীনতা ভোগ করা যায় না। অবশ্যই আমাদের নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আমরা আমাদের শক্তিমত্তাকে অপব্যয় করতে পারি না। অসহায়ভাবে, অবজ্ঞাভরে আমরা বাড়ির অর্ধেকটাকে একটা গোলাপের ঝোপ কিংবা পানিতে পূর্ণ করতে পারি না। প্রথম সমস্যা আসতে পারে একটা লাইব্রেরি থেকে। শুধুমাত্র লাইব্রেরি কি গুরুত্বপূর্ণ স্থান নয়? এ বিষয়ে বিভ্রান্তি ঘটতে পারে। কবিতা, উপন্যাস, ইতিহাস, আত্মজীবনী, অভিধান, ব্লু বুক ভিন্ন ভিন্ন জাতি, ভিন্ন ভিন্ন নারী-পুরুষদের ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় লেখা বইগুলো একই সঙ্গে লাইব্রেরির শেলফে থাকে। মাঠ পেরিয়ে মহিলারা খোশগল্পে মশগুল। কোথা থেকে আমরা শুরু করি? কেমন করে আমরা পঠনপাঠন থেকে সর্বাধিক আনন্দ পেতে পারি?
এখানে বলে রাখা ভালো, বইগুলোর গল্প, উপন্যাস, আত্মজীবনী, কবিতা ইত্যাদি বিভাগে বিভক্ত, এসব বিভাগের বইগুলোকে আলাদা আলাদা করে দেখার দায়িত্ব আমাদের। কিছু কিছু মানুষ বইগুলো সম্বন্ধে জানতে যায়, তারা প্রশ্ন করে কোন বইগুলো তাদের পড়া উচিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা বই নিয়ে অস্পষ্টতার মধ্যে থাকি, মানসিকভাবে দোটানায়ও পড়ি। গল্প উপন্যাসের ক্ষেত্রে এটা সত্যি হয়ে দাঁড়ায়, কবিতার ক্ষেত্রে এটা খাটে না, আত্মজীবনীর ক্ষেত্রে তা তৃপ্তিকর হয় না, ইতিহাসের ক্ষেত্রে আমরা পূর্র্ব সংস্কারের দ্বারা চালিত হই। পুস্তক পাঠের সময় আমরা যদি পূর্ব সংস্কারগুলো মুছে ফেলতে পারি তবে পুস্তক পাঠের শুরুটা হবে প্রশংসনীয়। আপনি আপনার গ্রন্থকারকে সাদামাটা দৃষ্টিতে না দেখে তাকে বুঝবার চেষ্টা করবেন। আপনি গ্রন্থকারের সহকর্মী ও সহচর হোন। আপনি যদি গ্রন্থকারের সমালোচনায় মুখর হন তবে আপনার পঠনপাঠন সার্থক হবে না। যদি আপনি আপনার চোখ কান ও মন খোলা রাখেন তবে গ্রন্থকারের লেখা বইয়ের দু’একটা বাক্য থেকেই অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্যের সংকেত ও ইঙ্গিতের আভাস পাবেন, আর এ থেকে আপনি একজন অসাধারণ মানুষের সান্নিধ্য পাবেন ।
একটা উপন্যাস কিভাবে পাঠ করতে হয়, তা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। একটা পদ্ধতিতে একটা ইমারত তৈরি করতে হয়। শব্দাবলি কিন্তু ইটগুলোর চেয়েও কার্যকর। দর্শন করার চেয়ে পঠনপাঠন অপেক্ষাতর সময়সাপেক্ষ ও জটিলতর। উপন্যাস শুধুমাত্র পাঠ করলেই যথেষ্ট হয় না। ঔপন্যাসিক উপন্যাসে কী উপাদানগুলোকে তুলে ধরেছেন আর কী বলতে চেয়েছেন তা হৃদয়ঙ্গম করতে হয়, উপন্যাসের কঠিন ও দুরূহ শব্দগুলোকে পাঠককে নিজের মতো করে উপলব্ধি করতে হয়। স্মরণযোগ্য কিছু ঘটনা আপনার কাছে ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গে ধরা দিতে পারে। রাস্তার ধারের দু’জন লোক কিভাবে কথা বলছে, গাছ নড়ছে, বিদ্যুতের আলোর নাচন, কৌতুককর কথাবার্তা ও কণ্ঠস্বর, কিংবা বিয়োন্তক ঘটনা পাঠকের মনের কোণে ভেসে উঠছে। যখন আপনি শব্দগুলো দিয়ে পুনরায় বিনির্মাণ করার চেষ্টা করেন তখন আপনি দেখতে পাবেন আপনার মনে হাজারো রকমের বিভ্রান্তি, এক সময় আপনার মনের নানা অনুভূতি এক এক করে মিলিয়ে যাচ্ছে। তবে কতকগুলো অনুভূতি আপনার মনে রেখাপাত করবে, আর অন্যগুলোকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হবে না। ফলে আপনি বোধশক্তি হারিয়ে ফেলবেন। সম্ভবত সব কিছুই আপনাকে আবেগতাড়িত করে তুলবে।
আপনি প্রখ্যাত ঔপনাসিক ডিফো, জেনি এস্টিন, টমাস হার্ডির বইয়ের এলোমেলো পাতাগুলো উল্টান। আপনি এই সব প্রখ্যাত ঔপন্যাসিকের নিপুণতা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। শুধু তাই নয়, আমরা ঔপন্যাসিক ডিফো, জেনি এস্টিন, হার্ডিসহ বিভিন্ন লেখকের সান্নিধ্য লাভ করব, যাতে মনে হবে আমরা একটি ভিন্ন জগতে বসবাস করছি।
রবিনসন ক্রুসোর সঙ্গে আমরা একটা উঁচু রাস্তায় হাঁটছি; একটি ঘটনার পর আর একটি ঘটনা ঘটছে। ঘটনা এবং ঘটনাক্রমই যথেষ্ট। মুক্তবায়ু আর দুঃসাহসিকতা বুঝাতে ডিফোই যথেষ্ট, জেন অস্টিনে সেসব কিছু নেই। তার লেখায় ড্রয়িংরুম, লোকজনের আলাপচারিতা আর তাদের চরিত্রগুলোর প্রতিফলন দেখতে পাই। আমরা হার্ডির দিকে ফিরতে পারি। আমরা আর একবার ইনিয়ে বিনিয়ে গল্প বলার মাঝে নিমগ্ন হতে পারি।
বিস্তীর্ণ পতিতজমি, মাথার ওপরের তারকারাজি আমাদের মনের কোণে জেগে উঠছে, অন্ধকার পাশটা নির্জন। মানুষজনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে প্রকৃতি ও অদৃষ্টের সঙ্গে। তবুও এক সময় জগতের প্রত্যেকটা জিনিসের মধ্যে পার্থক্য বিরাজ করে। প্রত্যেকটি জিনিসের নির্মাতা তার নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিতের বিধিবিধান পর্যবেক্ষণ করতে সদাসতর্ক। যাইহোক, তারা আমাদেরকে বিভ্রান্ত করবে না কখনোই। অর্বাচীন লেখকরা বারবার যা করে থাকেন তা হচ্ছে একই পুস্তকে দুটো ভিন্ন ধরনের বাস্তব ঘটনাকে উপস্থাপন করা। একজন খ্যাতিমান ঔপন্যাসিকের সঙ্গে অন্যান্য ঔপন্যাসিকের পার্থক্য এভাবেই ঘটে। জেন অস্টিন থেকে হার্ডি, পিকক্ থেকে ট্রোল্লোপ, স্কট থেকে মেরেডিথÑ অসাধারণ কল্পনাশক্তি থাকতে হবে যদি আপনি একজন খ্যাতিমান ঔপন্যাসিককে বুঝতে চান। ঔপন্যাসিক হচ্ছেন একজন শিল্পী যিনি আপনাকে কল্পনার খোরাক জোগান।
আপনি একনজর বইয়ের শেলফে চোখ রাখলে দেখতে পাবেন ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যের উপস্থিতি। লেখকেরা কদাচিৎ মহান শিল্পী হিসাবে বিবেচিত হন। তারাও প্রায়শ্চ একখানা বইকে মোটেই শিল্পের কাজ বলে দাবি করেন না। আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থকে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে, যা বড় বড় মানুষের কথায় ভরপুর। কিন্তু মৃত্যুর পর তা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। উপন্যাস আর কবিতা স্বমহিমায় ভাস্বর। আমরা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ পড়তে অস্বীকার করি কারণ ওইগুলো শিল্প নয়। যদি আমরা ওইগুলো পড়ি, তবে তা পড়ি ভিন্ন আঙ্গিকে। আমরা কি আমাদের কৌতূহল মেটানোর জন্যে তা পড়ব? যখন সন্ধ্যা নামে আমি গৃহের সম্মুখে আলো জ্বালানোর অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ থাকি। অন্ধেরা এটা বুঝতে পারে না। প্রত্যেকটা ফ্লোর লোকজনের কাছে তা কি ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গে ধরা দেয় না? তারপর এক সময় লোকজন সম্বন্ধে কৌতূহলী হই। চাকরবাকররা খোশগল্পে মশগুল, ভদ্রলোকেরা ভোজন রত, বালিকাটি পার্টিতে যাওয়ার জন্যে ড্রেস করছে, বৃদ্ধ মহিলাটি জানালার পাশে বসে কী যেন বুনছে। তারা কারা, তারা কী করে, তাদের নাম কী, তাদের চিন্তাভাবনা ও দুঃসাহসিকতামূলক কাজই বা কী?
আত্মজীবনী আর স্মৃতিচারণায় এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দান করে। গৃহে অসংখ্য বাতি জ্বালা, তারা প্রদর্শন করে তাদের দৈনন্দিন কাজের ফিরিস্তি, জয় পরাজয়, দৈনন্দিন আহার বিহার, প্রেম ভালোবাসার কথা বলে যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয়। মাঝে মধ্যে আমরা লক্ষ করলে দেখতে পাই গৃহটি বিবর্ণ, লোহার রেলিংও তাই। আমরা সমুদ্রের বাইরে; আমরা শিকার করছি নৌকায় পাল তুলে চলেছি, লড়াই করছি, আমরা নিষ্ঠুর যোদ্ধা, আমরা বড় বড় ক্যাম্পেনে অংশ নিচ্ছি, কিংবা আমরা ইংল্যান্ডে অবস্থান করতে পছন্দ করি। তখন লন্ডনের দৃশ্যের পরিবর্তন হচ্ছে; রাস্তাগুলো সরু সরু, বাড়িগুলো ছোট ছোট।
আমরা ডোন নামে একজন কবিকে জানি, তিনি বাড়ি থেকে চলে যান বাড়ির ঘরের দেওয়ালগুলো পুরু না হওয়ায় আর বাইরের ছেলেমেয়েদের চিৎকারের শব্দ ভেতর থেকে শোনা যেত বলে। আমরা তার বইগুলোর পাতায় চোখ রেখে তাকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারি। লেডি বেডফোর্ডস পার্ক মহান ব্যক্তি ও কবিদের জন্য বিখ্যাত মিলনক্ষেত্র। তারপর আমরা নিচের দিকের উইলটন হাউসের দিকে পা বাড়াই, সিডনি আর্কাডিয়া থেকে তার বোনের কছে থেকে পড়া শুনছে।
বড় বড় জলাভূমির মাঝ দিয়ে বকেরা উদ্দেশহীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বকগুলো দেখতে খুব সুন্দর। তারপর আবার লেডি পেমব্রোক, আনি ক্লিফোার্ডের সাথে উত্তরে ভ্রমণ, তারপর বিস্তীর্ণ পতিত ভূমি পেরিয়ে শহরে ঢুকে পড়া আর স্পন্সরের কবিতা সম্বন্ধে কালো ভেলভেটের স্যুট পরিহিত গাব্রিয়েল হার্ভের দৃশ্য দেখে আনন্দোল্লাস নিয়ন্ত্রণ করা। এলিজাবেথান লন্ডনের আঁধার আর সৌন্দর্যের চেয়ে অন্য কিছুই অধিকতর আকর্ষণীয় নয়। সেখানে আর অপেক্ষা নয়। টেম্পলস, সুইফ্টস, হারলেস ও সেন্ট জনস বেকন আমাদের শিরোধার্য, তাদের বই পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিবাহিত করতে পারি।
আমরা স্যামুয়েল জনসন, গোল্ড স্মিথ ও গ্যারিককে ক্লান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখি। পছন্দ করলে চ্যানেল পার হয়ে আমরা ভোল্টিয়ার, ডিডরোট, আর ম্যাডাম দ্যু ডিফিএন্ডের সাথে মিলিত হতে পারি; তবে আমরা ফিরেও যেতে পারি ইংল্যান্ড ও টিউকেনহামে। নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে তারা বার বার কত না নামে হাজির। লেডি বেডফোর্ড একদা তার পার্কে ছিলেন। পোপ একদা স্ট্রবেরি হিলের ওয়ালপোলের বাড়িতে বসবাস করতেন। ওয়ালপোল একদল মানুষের সাথে আমাদের পরিচয় করে দেন। পরিদর্শন করার মতো সেখানে অনেকগুলো বাড়ি। কোন এক মুহূর্তে ঘণ্টাগুলো বেজে উঠলে আমরা ইতস্তত ভাব দেখাতে পারি। উদাহরণস্বরূপ মিস বেরিসের দোরগোড়ার হাজির হয়ে থ্যাকারের কাছে পৌঁছাতে পারি। তিনি মহিলাদের বন্ধু ছিলেন যাকে ওয়ালপোল ভালোবাসতেন, সেখানে বন্ধু থেকে বন্ধু, উদ্যান থেকে উদ্যান, বাড়ি থেকে বাড়িতে শুধুমাত্র যাতায়াত চলতো। আমরা সমসাময়িককালে নিজেদেরকে খুঁজে পেতে ইচ্ছে করি যদি সে মুহূর্তে পেছনে ফেলে আসা সব কিছুকে আলাদা করতে সক্ষম হই। এটাই হচ্ছে অন্যতম পন্থা, যাতে আমরা তাদের লেখাগুলো পঠনপাঠন করতে পারি। এটা করতে পারলে অতীতের অনেকগুলো জানালা দিয়ে তারা প্রকাশ্যমান হয়। অতীতের সেই সব মৃত লেখকের সুখদায়ক অভ্যাস ও চমৎকারিত্বের দ্বারা আমরা তাদের ঘনিষ্ঠ হতে পারি। তাদের অপ্রকাশ্যতা সম্বন্ধে জানতে পেরে আমরা বিস্মিত হই। তাদের লেখা একটা নাটক কিংবা একটা কবিতা পড়ে আমরা ভিন্নভাবে লেখকের উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারি, এতে কিন্তু আবার নানা প্রশ্নের উদ্ভব ঘটতে পারে।
একখানা বইকে আমরা অবশ্যই নিজেদের কাছে তুলে ধরতে পারি। যে বইখানা লেখকের জীবন দ্বারা প্রভাবিত, একজন মানুষ লেখকের লেখা বইয়ের মাঝে আপনি তাকে খুঁজে দেখবার অনেকটাই সুযোগ পেতে পারেন। মানুষটি কতটা লেখককে মূল্যায়ন করতে পারেন? বইখানা কতটা প্রতিরোধ কিংবা সহানুভূতি সম্পন্ন, আর বিরাগভাজন হওয়ার পথ দেখাতে পারে যাতে লোকটি নিজেই বইখানার দ্বারা প্রভাবিত হন।
গ্রন্থকারের চরিত্রের ধারণক্ষম শব্দাবলির কতটা স্পর্শকাতর? এটাই জিজ্ঞাস্য যে যখন আমরা পঠনপাঠন করি গ্রন্থকার তার বইয়ের মাধ্যমে আমাদের ওপর কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এই পঠনপাঠন থেকে যে প্রশ্নগুলো পাই তার উত্তর কিন্তু আমাদের নিজেদেরকেই দিতে হয়। অন্যের দ্বারা নির্দেশিত বিষয়ের চেয়ে আমাদের নিজেদের মূল্যায়ন খুব বেশি মারাত্মক হতে পারে না।
আমাদের কিন্তু অন্য লক্ষ্যেও এমন সব পুস্তক পাঠ করতে হবে যার মাঝে সাহিত্যের আলোবর্তিকা নেই, যা বিখ্যাত বিখ্যাত ব্যক্তি সুপরিচিত নয়। এ ধরনের বই পাঠ করে আমরা আমাদের নিজস্ব সৃজনশীল ক্ষমতাকে সতেজ ও অনুশীলন করতে পারি। বুক কেসের ডান হাতের দিকে কি খোলা জানালা আছে? পঠনপাঠন বন্ধ করে তাকিয়ে কী যে আনন্দ! কত না সঞ্জীবনীমূলক দৃশ্যাবলি, এতে চেতনাহীনতা, অপ্রাসঙ্গিতা, অবিরাম আন্দোলন! মাঠের চারদিকের অশ্বশাবকদের দৌড়াদৌড়ি, মহিলাটি কুয়ো থেকে জলপাত্র ভরছে, মাথাটি পেছনে ঘুরিয়ে গাধাটির চিৎকার করছে।
কোনো লাইব্রেরির বৃহত্তর অংশ কিছুই নয়, কিন্তু মানুষজন, মহিলা ও গাধাদের জীবনযাপনের দ্রুতসঞ্চারণশীল মুহূর্তগুলোর রেকর্ডই লাইব্রেরিতে রক্ষিত। প্রত্যেক সাহিত্যই প্রাচীন হতে পারে, হতে পারে আবর্জনার স্তূপ, জীবনের বিলুপ্ত আর ভুলে যাওয়া মুহূর্তগুলোর দ্বিধাগ্রস্ত ও ক্ষীণ উচ্চারণসমূহের রেকর্ড নষ্ট হয়েছিল। কিন্তু আপনি যদি নিজে অসার বইগুলো পাঠ করে আনন্দ পান তবে তা আপনাকে বিস্মিত করবে। বস্তুতপক্ষে, আপনি জ্ঞান লাভ করবেন, যার ফলে আপনার ভেতরে এক ধরনের পরিবর্তন দেখা দেবে। এটা হতে পারে একটা পত্র- যা আপনাকে বড় একটা রূপকল্প উপহার দেয়! তাতে কয়েকটা বাক্য থাকতে পারে- বাক্যগুলো কিন্তু আপনাকে বড় দিকদর্শনের পরামর্শ দেয়! মাঝে মধ্যে একটা পুরো গল্প সম্মিলিত ভাবে উপস্থাপন করে সুন্দর হাস্যরস, করুণ রস, পূর্ণাঙ্গতা যা থেকে আপনার মনে হবে এটা যেন একজন বড় ঔপন্যাসিকের কাজ। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ক্যাপ্টেন জোন্সের লেখা অদ্ভুত গল্পে শুধুমাত্র ট্যাটে উইলকিনসন নামের একজন পুরনো অভিনেতার গল্প উঠে এসেছে। এটা হচ্ছে আর্থার ওয়েলেসলি অধীনস্থ একজন নি¤œপদস্থ তরুণের লিসবনের একটা সুন্দরীর প্রেমে পড়ার কাহিনী; মারিয়া এলেন নামের মেয়েটি একটা শূন্য ড্রয়িংরুমে বসে সেলাই করছিল, আর সে বাসনা করছিল ডা. বার্নেনেসের ভালো উপদেশ পাওয়ার। সে কখনোই তার প্রেমিক রিশির সাথে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করেছিল না। এ সবের কোন মূল্য নেই; শেষ পর্যন্ত এটাকে তোয়াক্কা করার প্রয়োজন নেই; তবুও একে মাঝে মধ্যে আবর্জনার স্তূপের মাঝ দিয়েও অত্যন্ত চিত্তকর্ষক।
আমরা কিন্তু একপর্যায়ে অর্বাচীন লেখা পড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি অর্ধসত্য জানার প্রয়োজনে উইলকিনসনস, বানবারিস ও মারিয়া এলেন আমাদের জন্য লিখেছেন তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে। তাদের নিপুণতায় শিল্পগত গুণাবলি ছিল না, তারা বিশ্লেষণ করতে পারেননি, তারা পুরো সত্যটা তুলে ধরতে পারেননি, এমনকি তাদের নিজেদের জীবন সম্বন্ধেও না। তারা গল্পের কাঠামোকে ফুটিয়ে তুলতে পারেনি, অথচ তাদের উচিত ছিল পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে উপস্থাপন করার। তারা সত্যি ঘটনাগুলোকে উপহার দিতে পারতেন, তবে সেই সত্যি ঘটনাগুলো গল্প উপন্যাসের চেয়ে খুবই নিকৃষ্ট মানের ছিল। এ থেকেই আধাআধি ও আনুমানিক জ্ঞান লাভ করার আকাক্সক্ষা আমাদের মনে জন্মে। আর ইচ্ছে জাগে মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণ বিমূর্ততার অনুসন্ধান ও উপন্যাসের সত্যাসত্য বিচারের। এ থেকেই আমাদের মন মেজাজে বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয়। আবেগ কিন্তু কিছুটা নৈমিত্তিক আর পৌনপুনিক ব্যাপার, যার স্বাভাবিক অভিব্যক্তি কবিতা; আমরা যখন কবিতা লিখি তখন অবশ্যই আমাদের কবিতা পাঠ করা প্রয়োজন পড়ে।
পশ্চিমা বায়ু, কখন বইবে?
দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি নামতে পারে,
যিশু, যদি আমার ভালোবাসা আমার বাহুদ্বয়ে থাকে,
আর তখনই আমি পুনরায় আমার বিছানায় যাই!
কবিতার অর্থ যতই কঠিন হোক না কেন, কবিতা ছাড়া অন্য কিছুতে এতটা সংবেদনশীলতা নেই। যখন আমরা কবিতায় প্রগাঢ় গভীরতার সন্ধান পাই তখনই হঠাৎ আমরা অনেকটাই বিষাদমগ্ন হই। এখানে আঁকড়ে ধরার মতো কিছু নেই, নেই কোনো কিছু আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার মতো। উপন্যাসের মোহময়তা ক্রমে ক্রমে বিকাশমান হয়ে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু যখন এই চার লাইন পঠিত হয় তখন তারা বিরত থাকে এটা কে লিখেছেন জিজ্ঞাসা করতে। কিংবা ডোনের বাড়ি বা সিডনির সেক্রেটারির দোহাই দেয়ার ভাবনায় পড়তে হয় না। কবি কি সব সময়ই সমসাময়িক এবং অতীত থেকে ভবিষতের দিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রহণযোগ্য? ব্যক্তিগত আবেগ অনুভূতি তাড়িত হওয়ার কারণে কোন কোন মুহূর্তে আমরা আত্মকেন্দ্রিক ও সংকীর্ণমনা হই। তারপরেও এটা সত্য সংবেদনশীলতা বিস্তার লাভ করতে শুরু করে, যা বৃত্তাকার পথে আমাদের মনোজগতে মাঝে একটা বোধের জন্ম দেয়। এগুলোই শব্দ ও মন্তব্য করতে শুরু করে, আর তার ফলে আমাদের মধ্যে প্রতিধ্বনির ও প্রতিফলনের সচেতনা ঘটে। কবিতার প্রগাঢ়তায় আবেগের বিপুল গতি আছে। আমরা শুধুমাত্র শক্তি ও প্রত্যক্ষতাকে তুলনা করতে পারি।
আমি বৃক্ষের মতো পতিত হব, এবং আমার কবর খুঁজব
শুধুমাত্র আমি শোক স্মরণ করে,
সুরের নানা পরিবর্তনের আভাস কবিতায়:
মিনিটে মিনিটে বালুকারাশির পতন হয়
যেহেতু এক ঘণ্টায় একটা কাচ; সময়ের কিয়ৎকাল
আমাদের সমাধিক্ষেত্রে আমাদেরকে নষ্ট করা, আর তার দিকে চেয়ে থাকা;
আনন্দের একটা যুগ, মহোৎসব শেষ, বাড়ি এসো
অবশেষে, দুঃখের সমাপ্তি; কিন্তু জীবন,
দাঙ্গাহাঙ্গামার ক্লান্তি, বালির সংখ্যাগুলো,
দীর্ঘশ্বাসে বিলাপ, যে পর্যন্ত না শেষ বিন্দুর পতন,
সুতরাং উপসংহার দৈবদুর্বিপাকে শান্তিতে,
কিংবা ধ্যানরত শান্তির স্থান
যদি আমরা তরুণ কিংবা প্রবীণ হই,
আমাদের অদৃষ্ট, আমাদের হৃদয় ও আবাস,
শুধুমাত্র অসীমতার সাথে;
এটা আশার সাথে সম্পৃক্ত, আশা কখনো মরে না,
চেষ্টা, আর প্রত্যাশা, আর আকাক্সক্ষাও তাই,
আর কিছু সতত হতে থাকে,
তা ছাড়া সম্পূর্ণ আর অফুরন্ত সৌন্দর্যের প্রকাশ
ঘূর্ণায়মান চাঁদ আকাশের উপরে,
আর কুত্রাপি অপেক্ষা করেছিল:
কোমল ভাবে সে ওপরের দিকে চলছিল, পাশে একটা কিংবা দুটো তারকাÑ
কিংবা চমৎকার কল্পনার অভিব্যক্তি
আর বনভূমির শিকারি
অলস ভাবে ঘুরে বেড়ায় না
যখন অনেক নিচে বনের ভেতরের ফাঁকা স্থান,
বিশাল জগতের আগুন জ্বলা,
ম্লান অগ্নিশিখা উপরের দিকে
মনে হচ্ছে তার সূক্ষ্মদর্শী অবয়ব
ক্রোকাস পুষ্পের আচ্ছাদন,
কবির আর্ট আমাদেকে ভাবায় : তার শক্তি তাৎক্ষণিক ভাবে আমাদেরকে অভিনেতা ও দর্শক বানায়; তার শক্তি তার হাতে চরিত্রে রূপান্তর করে তা যেন সহায়তা একটা গ্লোব, আর হতে পারে ফলস্টাফ কিংবা লিয়ার; তার শক্তি ঘনীভূত হয়, বিস্তার ঘটায় বর্ণনায়, একবারের জন্য কিংবা চিরকালের লক্ষ্যে।
“আমরা শুধুমাত্র তুলনা করতে পারি।”- ওই সমস্ত শব্দাবলী থেকে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে, আর পঠনপাঠনের সত্যিকারের জটিলতা স্বীকৃত হয়।
প্রথম পদ্ধতি: আপ্রাণ উপলব্ধির মাধ্যমে আবেগ অনুভূতি গ্রহণ করা, পঠনপাঠন শুধুমাত্র আধাপদ্ধতি, যদি আমরা একটা পুস্তক পাঠ করে আনন্দ লাভ করতে চাই তবে একটা বই পাঠ করা উচিত, পরে অন্যটি। আমরা অবশ্যই আমাদের আবেগ অনুভূতির মাধ্যমে বইয়ের গুণাগুণ বিচার করতে পারব। আমরা অবশ্যই এগুলোর দ্রুত সঞ্চারী একটা অবয়ব দিতে পারব যা কঠিন হলেও স্থায়ী হবে, কিন্তু তা প্রত্যক্ষভাবে নয়।
পঠনপাঠনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্থায়িত্ব লাভের জন্য অপেক্ষা করুন। দ্বন্দ্বযুদ্ধ ও প্রশ্নের মৃত্যু ঘটবে; হাঁটুন, কথাবার্তা বলুন, একটা গোলাপের শুকনো পাপড়ি টেনে বের করুন নতুবা ঘুমিয়ে পড়–ন। তারপর আমাদের ইচ্ছে ছাড়াই হঠাৎ করে প্রকৃতি এই সব পরিবর্তন ঘটায়, বই ফিরে আসবে, কিন্তু ভিন্ন আঙ্গিকে। মনের মণিকোঠায় ইহা ভাসমান হবে পুরোমাত্রায়। আর বইটির পুরোটাই স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে ধরা দেবে ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গে। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে তারা নিজেরাই নিজেদের স্থানে যথাযোগ্য মর্যাদায় আসীন হবে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা এক একটা দৃশ্য দেখতে পাই। এটা হতে পারে একটা ধানের গোলা কিংবা একটা গির্জা।
মাঝেমধ্যে আমরা একটা বইয়ের সঙ্গে আর একটা বইয়ের তুলনা করতে পারি যেমন আমরা একটা অট্টালিকার সঙ্গে আর একটা অট্টালিকার তুলনা করে থাকি। কিন্তু তুলনা করার এই কাজের অর্থ হচ্ছে যে আমাদের আচরণ পরিবর্তন হয়েছে, আমরা কোনক্রমেই লেখকদের বন্ধু নই, কিন্তু তার বিচারে আমরা বন্ধু হিসেবে সহানুভূতিশীল হতে পারি না। সেই বিচারে আমরা তাদের থেকে ততটা বিচ্ছিন্ন হতেও পারি না। তারা কি অপরাধী নয়, যে বইগুলো আমাদের সময় ও সহানুভূতি নষ্ট করে; তারা কি সমাজের দুর্নীতিবাজ, অপবিত্রকারীর লেখকরা, যারা নকল বই লিখে বাতাসে ক্ষয় ও রোগব্যাধি ছড়ায়? আসুন আমরা আমাদের বিচার বিবেচনায় গুরুত্ব দেই, আসুন আমরা প্রত্যেকটা বইকে সবচেয়ে বিখ্যাত বইগুলোর সঙ্গে তুলনা করি। রবিনসন ক্রুসো, ইম্মা, দ্য রিটার্ন অব নেচার আমাদের মনে গেঁথে আছে। উপন্যাসগুলোকে এগুলোর সাথে তুলনা করুন। এমনকি সর্বাধুনিক এবং সর্বাপেক্ষা কম উপন্যাসগুলোর অধিকার আছে সবচেয়ে ভালো উপন্যাসগুলোর সাথে বিচার বিবেচনা করার। কবিতার ক্ষেত্রে যখন ছন্দের মোহময়তার পতন ঘটে আর শব্দাবলির সৌন্দর্য বিবর্ণ হয় তখন এক দৃশ্যমান অবয়ব আমাদের কাছে ফিরে আসে যা তুলনীয় হয় লিয়ার, ফেড্রে, দ্য প্রেলুদে এর সাথে; কিংবা যদি এগুলোর সাথে তুলনীয় না হয় তবে কোনটি উত্তম বলে আমাদের মনে হয়। আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে নতুন কবিতা ও উপন্যাসের নতুনত্ব হচ্ছে সেগুলোর সর্বোৎকৃষ্ট গুণাবলি, আর যাকে সামান্যই মাত্র পরিবর্তন ঘটাতে পারি, পারি না পুনর্গঠন করতে। পুরনোর মানদণ্ডে আমরা বিচার করেছি। তা একটা বোকামিই হবে, তারপর দ্বিতীয় অংশের পঠনপাঠন, বিচার বিশ্লেষণ, তুলনা করা ইত্যাদিও ভান করার সমতুল্য, প্রথমত অসংখ্য অনুভব সম্পর্কে মনটাকে খোলা রাখাই সহজ। আপনার সামনে বই ছাড়া পঠনপাঠন চালিয়ে যাওয়া, একজনের ছায়া-আকৃতি অপরের ওপর ধারণ করা, তারপর বিস্তারিত পঠনপাঠন মাধ্যমে প্রচুর প্রচুর বিচার বিশ্লেষণ করে জীবন্ত এবং মায়ার মধ্যে তুলনা- যা করা কঠিন; এটা আরো কষ্টকর পুনরায় বলা, এটা শুধু পুস্তকই নয়, এটার একটা মূল্যও আছে, আবার মূল্যহীনতাও আছে, সফলতাও আছে, যা মন্দ তা আবার উত্তমও বটে।” একজন পাঠকের কর্তব্য কল্পনা, অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা, আত্মবিশ্বাস অর্জন করা, যা খুবই কষ্টকর। নিজের মাঝে আত্মবিশ্বাসের বীজ বপন করা আরো কষ্টসাধ্য। এই অংশের পঠনপাঠন ও সমালোচনা বর্জন করা আর লাইব্রেরির কর্তৃপক্ষের বইয়ের মূল্য নিরূপণ করতে সিদ্ধান্ত নেয়া আমাদের জন্যে কি বিজ্ঞতর কাজ নয়? কী অসম্ভব ব্যাপার! আমরা সহানুভূতির মূল্যের ওপর জোর দিতে পারি, আমরা নিজেদেরকে নিমগ্ন করে পঠনপাঠনে চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু আমরা জানি, আমরা পুরোপুরিভাবে সহানুভূতিশীল কিংবা নিমগ্ন হতে পারি না। আমাদের মধ্যে থাকা শয়তানটা ফিস ফিস করে বলে, ‘আমি ঘৃণা করি, আমি ভালোবাসি’ আর আমরা তাকে নীরব করতে পারি না। প্রকৃতপক্ষে, এটা মূল্যবান কারণ আমরা ঘৃণা করি, আর আমরা ভালোবাসি যা আমাদের সম্পর্ক কবি ও ঔপন্যাসিকদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তারা আমাদের এতই আন্তরিক যে আমরা খুঁজে পাই অসহনীয় অন্য একজন ব্যক্তির উপস্থিতিকে। ফলাফল যদি ঘৃণ্য হয়, আর বিচার যদি ভুল হয়, তবে আমাদের সংবেদনশীলতায় তা আঘাত হানতে পারে। আমরা আবেগের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করি; উন্নতি সাধন ব্যতিরেকে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত মানসিক বৈশিষ্ট্যকে অবদমন করতে পারি না। সময় হলে আমরা কিন্তু আমাদের রুচি পরিশীলিত করতে পারি; হয়তো আমরা একে নিয়ন্ত্রণও করতে পারি। যখন তা লোলুপতা ও অপব্যয়িতায় বিবর্ণ হয়ে যায় সব ধরনের বই- কবিতা, উপন্যাস, ইতিহাস, আত্মজীবনী, যা আমরা পঠনপাঠন বন্ধ করেছি জীবন্ত শব্দের বিভিন্নতা, অসামঞ্জস্যতা বড় পরিসরে খোঁজার উদ্দেশ্যে। এ থেকে আমরা দেখতে পাব যে তার সামান্য পরিবর্তন হয়েছে; এটা ততটা লালসার নয়, এটা অধিকতর প্রতিফলকজনক। সুনির্দিষ্ট বইগুলোর ওপর সামান্যই বিচার বিশ্লেষণ করতে আমাদের আগ্রহী করবে, তবে তা আমাদেরকে বলবে যে নির্দিষ্ট বইয়ের একটা সাধারণ গুণ আছে। শুনুন, এটা বলবে, আমরা এতে কী আহ্বান জানাচ্ছি? হয়তো আমাদেরকে লিয়ার পড়তে বলবে, তারপর হয়তো সাধারণ গুণ সম্বেন্ধে জ্ঞাত হওয়ার জন্যে বলবে আগামেমনন পড়তে। এভাবে, আমাদের রুচি আমাদেরকে নির্দেশ দান করে। আমরা গুণ অন্বেষণের উদ্দেশ্যে এক গুচ্ছ বইয়ের ভেতর থেকে নির্দিষ্ট একটা বই পড়তে সাহস করব; আমরা আমাদের উপলব্ধি অনুসারে বইগুলোর নাম দেবো। আমরা বৈষম্যের ভেতর থেকে একটা অনাস্বাদিত আনন্দ পুনরায় লাভ করব। বিধান অনুসারে শুধুমাত্র জীবিতরাই প্রায়শ্চ নিজেরাই বইয়ের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে- সত্যঘটনার বাইরে গিয়ে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করা সহজতর নয়। অধিকতর বোকা বানিয়ে সত্যকে আড়াল করাও সাহিত্যের পর্যায়ে পড়ে না। খুব কম লেখকই আছেন যারা সাহিত্যকে শিল্প সৌন্দর্যে রূপদান করে আমাদেরকে আলোকিত করেছেন। কোলেরিজ, ড্রাইডেন এবং জনসন সাহিত্যে শিল্প সৌন্দর্যে বিকাশ সাধন করেন। তারা আমাদের মনের গহিনের কুয়াচ্ছন্ন অস্পষ্ট ধারণাগুলোকে দূর করে আমাদেরকে আলোকিত এবং মানসিক শক্তিকে সুদৃঢ় করেন। তারাই কিন্তু আমাদেরকে সাহায্য করতে পারেন, যদি আমরা নিজেদের পঠনপাঠনে সাহায্যে তাদের প্রশ্ন ও পরামর্শগুলোয় সততার সঙ্গে নিজেদেরকে পরিপূর্ণ করে তাদের জয় করতে পারি। তারা আমাদের জন্য কিছুই করতে পারেন না যদি তাদের ব্যক্তিগত প্রভাবকে আমরা নিজেরা লালনপালন না করে ঝোপঝাড়ের আচ্ছাদনের নিচে ভেড়ার মতো শুয়ে থাকি। আমরা শুধুমাত্র তাদের বিধিবিধানকে উপলব্ধি করতে পারি যখন আমরা নিজেরা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েও তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারি।
একখানা বই পড়ে উপসংহারে কল্পনা, অন্তর্দৃষ্টি ও বিচার বিবেচনার সর্বোত্তম গুণাবলি হয়তো আপনি অর্জন করতে পারেন। সাহিত্য খুবই জটিল আর্ট বা শিল্প। আমরা অবশ্যই পাঠক হবো। ওই সব দুর্লভ মানুষেরা সমালোচকও বটে। সারাজীবন পঠনপাঠনের পর সাহিত্যের সমালোচনা করে আমরা অসম্ভব ভাবে হলেও মূল্যবান অবদান রাখতে পারি। আদর্শগুলো আমরা তুলে ধরতে পারি বিচার বিবেচনা করে, আমরা চুপিসারে বাতাসকে অতিক্রম করে বায়ুমণ্ডলের একটা অংশ হয়ে যেতে পারি, লেখকরা যেখানে লেখালেখি করতে করতে শ্বাসপ্রশ্বাস নেন। লেখক এমন একটা প্রভাব সৃষ্টি করেন তা কখনো ছাপার পথ খুঁজে পেলেও এই প্রভাবে যদি তা ভালো ভাবে নির্দেশিত হয় তবে সতেজতা ও ব্যক্তিগত নিষ্ঠার বড় একটা মূল্য থাকে সমালোচনা জরুরি ভিত্তিতে মুলতবি থাকলেও; যখন বইগুলোর রিভিউ একটা সুটিং গ্যালারির জন্তু জানোয়ারের শোভাযাত্রার মতো হয়। সমালোচক মাত্র এক সেকেন্ডে গুলি ভরে লক্ষ্য স্থির করে গুলি ছোড়েন এবং যদি তিনি বাঘ মারতে গিয়ে খরগোশ, ঈগল মারতে গিয়ে গোলাবাড়ির মুরগি, অথবা মাঠে চরা কয়েকটা শান্ত নিরীহ গরুকে গুলি করে মারেন তবে তার ভুলের জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে হতে পারে। যদি সংবাদপত্রে যথেচ্ছাচারী ভাবে বন্দুকের গুলি ছোড়ার জন্যে গ্রন্থকার অনুভব করবেন যে তিনি অন্য ধরনের সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছেন। জনগণের মতামত পঠনপাঠনের জন্য পঠনপাঠনের ভালোবাসা, ধীরে ধীরে এবং অপেশাদার ভাবে, বড়সড় সহানুভূতির সঙ্গে বিচারবিবেচনা কি তার কাজের গুণাবলির উন্নতি ঘটায় না? আমাদের মতে বইগুলো শক্তিশালী ও ঋদ্ধ হলে তাদের কাজের উন্নতি ঘটে।
আমাদের কিন্তু পাঠক হিসেবে দায়দায়িত্ব ও গুরুত্ব আছে। যারা পঠনপাঠন করেন, তারা পরিশেষে কী প্রত্যাশা করেন। তারা কি পঠনপাঠনের মাধ্যমে আনন্দ লাভ করতে চান? তাদের মাঝে কি আনন্দের উপাদান থাকে না? মাঝে মধ্যে আমি স্বপ্ন দেখি। অবশেষে বিচারের প্রত্যুষে মহান বিজয়ীগণ, আইনজীবীরা আর সাংবাদিকরা তাদের পুরস্কার পাবেন। তাদের নাম মার্বেল পাথরে খোদাই করে লেখা হবে। সর্বশক্তিমান পিটারের দিকে ঘুরে তাকাবেন এবং তিনি আমাদেরকে বই হাতে আসতে দেখে বলবেন, ‘দেখ, এদেরকে পুরস্কার দেয়ার প্রয়োজন নেই। এখন তাদেরকে কিছুই দেয়ার নেই, কারণ তারা পঠনপাঠনকে ভালোবাসে।’