আবুল হুসেনকে নিয়ে লিখতে বসার পেছনে প্রধান যে তাগিদ আমার মধ্যে ক্রিয়া করেছে তা হলো- গোটা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে অশান্ত, দুঃখময় বিশ্ব-অবস্থা। যখন দুনিয়াজুড়ে সুখের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দুঃখ। পুঁজির রক্তচক্ষু থেকে পুঁজ ঝরাতে প্রস্তুত বঞ্চিত শ্রম; তখন এই সত্যকে চিহ্নিত করা হচ্ছে প্রাচ্য বনাম পশ্চিম অথবা আরো এগিয়ে ইসলাম বনাম আধুনিক; তাতেও সুবিধা করতে না পেরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইসলাম বনাম ইহুদি-খ্রিস্টানের সংঘাতে। আর এতসব সম্ভবপর হচ্ছে সত্য কাজ ও জ্ঞান থেকে পরস্পর মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণে। আবুল হুসেন সেই ঊনিশ শতকের মধ্যকাল থেকেই ফিরিয়ে নেয়া মুখকে জ্ঞানমুখী করতে চেয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, গ্রন্থ পুজো করে দুঃখ মোকাবিলা করা যাবে না। বরং প্রয়োজন গ্রন্থের মধ্য থেকে শক্তিকে বের করে এনে। জীবন্ত রূপ দেয়া। মৃত গ্রন্থকে জীবিত করা। পুরনো দিনের সত্য যদি বর্তমান ও নতুনের জন্য বাধা হয়ে থাকে তবে সে পুরাতনকে মুছে ফেলা অথবা তা নতুনের সম্পূরক করে গড়ে তোলা।
আবুল হুসেনের মাথায় ছিল গোটা ভারতীয় সমাজ হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ হাজারও নৃ-জাতি ও জাতিসত্তাসমূহ। তাদের জীবন, দুঃখ, ব্যথা, বেদনা ও আনন্দ। শ্রেণি-পেশা, কৃষক-শ্রমিক, শিল্প-ইন্ডাস্ট্রি, প্রকৃতি, নদী-সমাজ-সংস্কৃতি সবকিছুই। কাজ করেছেন জীবনের সকল ক্ষেত্রেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক, হাইকোর্টের আইনজীবী, পত্রিকার সম্পাদক, সামাজিক সংগঠনের স্রষ্টা, প্রবন্ধকার, কথাসাহিত্যিক, গল্পকার, নাট্যকার, সর্বোপরি প্রত্যক্ষ রাজনীতিবিদ; এ সবই হুসেনের পরিচয়।
কোন কিছুই বাদ পড়েনি তাঁর জীবনের রুটিন থেকে। জন্ম যেহেতু মুসলিম পরিবারে আর বেড়ে ওঠা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনপদে সেহেতু তাঁর কাজের ক্ষেত্রও ছিল মুসলিম সমাজের মধ্যে। প্রধানত মুসলমানদের নিয়ে মুসলমানদের জন্য। আর এ কথাতো ঠিকই যে তাঁর সময়ে ভারতবর্ষে প্রধান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পিছিয়ে পড়া মানুষেরা ছিল মুসলমান। আবুল হুসেন এই পিছিয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধান করেন। নানাবিধ কারণের মধ্যে ছিল দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন। মুসলমানদের সাথে ফিরিঙ্গিদের বিমাতাসুলভ আচরণ। অন্যদিকে অপর সম্প্রদায়ের সাথে তাদের সখ্য। আর সেই সাথে শাসক শ্রেণির সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের সম্পর্ক না বুঝতে পারা। এবং এতসবেরও মূলে ছিল জ্ঞান বিমুখতা। প্রগতির বৈতরণীতে জেঁকে বসতে না পারা। সময়ের ইশারা-ইঙ্গিতে আত্মস্থ হতে না পারা। এবং এরও মূলে ছিল ফতোয়া; ইসলামের দোহাই। যার পুরো দায় নিতে হয় খোদ ইসলাম ও তার দর্শনকে।
অথচ ইসলামের নবী মোহাম্মদের নিকট তাঁর প্রভুর প্রথম বাক্য- ‘পড়’। আর নবী মোহাম্মদের বাণী হল-
‘জ্ঞান অন্বেষণ প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরজ’
‘জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন হলে সুদূর চীনে যাও।’
‘দোলনা হতে কবর পর্যন্ত শিক্ষাকাল।’
‘জ্ঞানের একটি বাক্য শত শত প্রার্থনার আবৃত্তির চেয়ে মহত্তর।’
‘জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্রতর।’
‘একটা বুদ্ধির কথা শেখা ও অন্য একজন মুসলমানকে শেখানো এক বছরের এবাদতের চেয়েও মূল্যবান।’
‘খোদা বুদ্ধির চেয়ে উৎকৃষ্টতর আর কিছু সৃষ্টি করেননি।’
‘যে জ্ঞানান্বেষণের জন্য গৃহ ত্যাগ করে সে খোদারই পথে চলে।’
‘এক ঘণ্টা জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপদেশ শ্রবণ করা, সহস্র শহীদের জানাজায় যোগ দেয়া বা সহস্র রজনী দাঁড়িয়ে উপাসনা করার চেয়েও বেশি পুণ্যের।’
‘জ্ঞানীকে যে সম্মান করে সে আমাকে সম্মান করে।’
‘যে শিক্ষার জন্য জীবন দান করে সে অমর।’
আশ্চর্য! সেই মোহাম্মদের উম্মত আজ চিহ্নিত নিরেট মূর্খ, অসভ্য, বর্বর, মানবতার দুশমন হিসেবে। আসলে মুসলমানদের এই পরিচয় অধিপতি গণমাধ্যমের নির্মাণ। পশ্চিম ও সাম্রাজ্যবাদের মহাপ্রকল্পের ফসল। বরং এটিই সত্য। কিন্তু কিভাবে সম্ভব হল এই নির্মাণ? এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের কারখানায় তৈরি মুখোশ মানুষ মেনেইবা নিলো কেন? আবুল হুসেনের কাছে এ সমস্তের উত্তর জানা ছিল। বিশেষত বাঙালি মুসলমানদের এতদ্বিষয়ে বুঝবান করে গড়ে তোলার জন্যই তিনি তাঁর ছাত্র ও বন্ধুদের নিয়ে ১৯২৬ সালে গড়ে তোলেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। যার মূলমন্ত্র ছিল- ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ এই সাহিত্য-সমাজ জন্ম দেয় একদল চিন্তাশীল লেখক-পাঠক সম্প্রদায়কে। কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল কাদির, কাজী আনোয়ারুল কাদির, আবুল ফজল, মোতাহের হোসেন চৌধুরী প্রমুখ বিদগ্ধ পণ্ডিতবর্গ ছিলেন এই সমাজেরই সদস্য। তৎকালীন সময়ে ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে তারা ‘শিখা’ গোষ্ঠী (সংগঠনের মুখপাত্র শিখার নামে), মোতাজেলাপন্থী, নাস্তিক্যবাদী, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কর্মী ইত্যাদি নানা নামে চিহ্নিত হয়। শিখাগোষ্ঠী বুঝেছিলেন- মোহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের আজ এত সহজে হেয় করা সম্ভব হচ্ছে তার কারণ নবী মোহাম্মদের ওফাতের পর দেহ দাফনের পূর্বেই ফয়সালা হয়ে গিয়েছিলÑ এই সিলসিলার মালিক কে হবে? মোহাম্মদ অনুসারীরা, নাকি আবু লাহাব, আবু জেহেলরা। আসলে দ্বিতীয়োক্তরাই জয় লাভ করেছিল। মোহাম্মদ ঢাকা পড়ে গেলেন শেষোক্তজনদের দক্ষতায়। আর সবকিছুই চলতে থাকলো মোহাম্মদের নামে। বহুধা ভাগে ছিন্ন-ভিন্ন হল মুসলিম। ইসলাম জড়িয়ে পড়ল কতগুলো সূত্রের জালে। একেবারে অনড়, অপরিবর্তনীয় সে সূত্রসমূহ। এভাবেই চলে বেশ কিছুকাল।
লড়াইটাও ঠিক তখন থেকেই শুরু হয়েছিল। সেই তথাকথিত অপরিবর্তনীয় সূত্রের শৃঙ্খল থেকে বের হয়ে আসার জন্য। কেননা প্রশ্ন এসে গেল- ইসলাম যদি গুটিকয়েক তথাকথিত অপরিবর্তনীয় সূত্রের সমষ্টি হয় তাহলে মানুষের মন কখনো পরিবর্তনশীল জগতের আঘাতে স্পন্দন করবে না এবং মুক্ত বা জীবন্ত হবে না, বরং ডগমার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে কতগুলো অর্থহীন শব্দ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকবে। সে-মন কখনও মুসলমানকে মানুষ হয়ে উঠতে দেবে না। কেননা মন চায় গতি, ডগমা সে গতিকে রুদ্ধ করে। এ লড়াই দানা বেঁধে ওঠে দ্বিতীয় হিজরিতে ওয়াসিল-বিন-আতার নেতৃত্বে। এবং এই অংশই পরবর্তীতে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ ‘মুতাযিলা’ নামে খ্যাত। এই মুতাজিলারা তখনকার দিনে সমাজে ধর্মসূত্রগুলোর যে ব্যাখ্যা প্রচলিত হয়েছিল সেগুলো কোরআন ও নবী মোহাম্মদের শিক্ষা এবং বিবেকসম্মত নয় বলে ঘোষণা করে :
যেমন প্রচলিত ধারণা-
১. প্রত্যেক কার্য পূর্ব হতেই স্থিরীকৃত;
২. কেয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষ সশরীরে জীবিত হবেন;
৩. আল্লাহ এই বাহ্য-চক্ষুর গোচরে আসবেন;
৪. আল্লাহর সেফাত (চেহারা) তাঁর প্রকৃতি হতে পৃথক;
৫. কোরআন আল্লাহর মতই অপৌরুষেয় ও মানুষের কোনো সংশ্রবই তাতে নাই।
পক্ষান্তরে, মুতাজিলারা ধারণা করত-
১. প্রত্যেক মানুষ আপন চেষ্টায় তার ভালো-মন্দ স্থির করতে সক্ষম;
২. কেয়ামতের দিন কোনো মানুষই সশরীরে উঠবে না;
৩. তাহলে আল্লাহর সম্পূর্ণ শরীর আছে বলে ধরে নিতে হবে;
৪. খোদার সেফাত ও প্রকৃতি একই;
৫. কোরআন একেবারেই নবী মোহাম্মদের সংশ্রবমুক্ত নয়।
তারা আরো বলেন যে, মানুষের জন্য পৃথক চিরস্থায়ী অপরিবর্তনীয় আইন নাই ও হতে পারে না। মানুষও সাধারণ, প্রকৃতির মতই পরিবর্তনশীল, সুতরাং তার পরিচালনার জন্য পরিবর্তনশীল আইন তো থাকা চাই। মানুষের বিকাশের জন্য যে বিধি-ব্যবস্থা আবশ্যক হয় তা আল্লাহর রহমত ও তারই ইঙ্গিতে প্রবর্তিত হয়- তার অনুগ্রহে বিকশিত-মন মানুষের দ্বারা।
জগতের অনন্ত কোটি সৃষ্টি যেমন পরিবর্তনশীল- মানুষও তেমনি পরিবর্তনশীল; কাজেই এক যুগের আইন তার জন্য অন্য যুগে প্রচলিত হতে পারে না এবং জোর-জবরদস্তি চালাতে গেলে তৎকালীন মানুষের বিকাশ সম্ভবপর হয় না।
ইসলামের এই ধারা হালে বারি গ্রহণ করে খলিফা আল-মামুনের সময় (জন্ম- ১৭০ হিজরি) সমাজজীবনে ইসলাম যে নৈরাশ্যের অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছিল মামুন সেখান থেকে উদ্ধার করেন। মামুন অবশ্য উত্তরাধিকার-সূত্রে পেয়েছিলেন পিতা খলিফা হারুনর রশীদ ও পিতামহ খলিফা মনসুরের গৌরবময় রাজত্বের অতীত। পিতা হারুনর রশীদের রাজত্বকালে তাঁর দরবারে জগতের বিভিন্ন দেশ হতে বিদ্বানমণ্ডলীর শুভাগমন হতো। তাঁদের সাহায্যে তিনি নান্দনিক চর্চা করতেন। ফলে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কলা তাঁর রাজত্বের অপরূপ দান মানব-ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তিনিই প্রথম সঙ্গীতকে বিজ্ঞানের দরজায় উন্নীত করেন। তাঁর আমলেই মুসলিম আইন সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত হয়।
পিতামহ খলিফা মনসুর বৈদেশিক ভাষায় লিখিত সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস প্রভৃতি অমূল্য রত্ন আরবি ভাষায় অনুবাদ শুরু করেছিলেন। হারুনর রশীদও সে কাজ ত্যাগ করেন নাই। তবে তাঁর আমলে অনুবাদ এত বেশি হয় নাই; কারণ স্বয়ং কবি হওয়ায় তিনি কবিদের প্রতি বেশি আসক্ত ছিলেন। পৃথিবীর বিস্ময়কর ক্লাসিক ‘আরব্য রজনী’ তো তাঁরই মহোত্তম সৃষ্টি। আল-মামুন মনসুরের আরব্ধ কাজ সম্পূর্ণ করেছিলেন।
তাঁর জাগতিক কীর্তির মধ্যে সবচেয়ে স্থায়ী কীর্তি মানসিক বিকাশের মাল-মসলা- যা তিনি তাঁর রাজত্বের দীর্ঘ কুড়ি বছর যাবৎ সংগ্রহ করতে নিরন্তর ব্যস্ত ছিলেন। ইতিহাস হলো : নানা ভাষার অনুবাদকদের তিনি কড়ি দিয়ে কিনে আনতেন। প্রয়োজনে দীর্ঘকালের রাজ্যের সীমানা নিয়ে চলমান যুদ্ধ মিটিয়ে ফেলতেন ভূখণ্ডের বিনিময়ে অনুবাদক সংগ্রহ করে। হারিয়ে যাওয়া গ্রিক ও ল্যাতিন জ্ঞান-বিজ্ঞান পুনরুদ্ধারের কৃতিত্ব তাঁরই।
যেখানেই এসব বিষয়ে জ্ঞানী-গুণীর সন্ধান পেতেন তিনি জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে তাঁদের আহ্বান করে রাজদরবারে এনে ওই সমস্ত বিষয়ের উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রভূত অর্থ ব্যয় করতে কুণ্ঠিত হতেন না।
সাহিত্য, বিজ্ঞান, কলা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, হাকিমিবিদ্যা তাঁর সময় দ্রুত বিকশিত হয়েছিল। এ সমস্তই পরবর্তীতে স্পেন ও খ্রিস্টান ইউরোপে প্রবেশ করে। আধুনিক জগতের জ্ঞান-গুণ ওই সমস্তের ওপরই প্রতিষ্ঠিত একথা আজ অস্বীকার করবে সে হিম্মত কার আছে? এমনকি রাজকার্য পরিচালনার যে ইতিহাস তারা রচনা করে গেছেন আজকের আধুনিক তথা পশ্চিমা সভ্যতা কি সে কথা কল্পনাও করতে পারে? যখন রাজকার্য পরিচালনার কাউন্সিলে নিযুক্ত থেকে মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান, সারিয়া ও অগ্নি উপাসক, জরথ্রোস্ট একত্রে বসে মুসলিম খলিফাকে রাজ্য শাসনের উপদেশ দিতেন। কী চমৎকার ঔদার্য! বিবেকের স্বাধীনতা ও উপাসনার সমস্ত সুবিধাই অমুসলিমগণ উপভোগ করার অধিকার লাভ করেছিল। এ আদর্শ জগতে অতীব বিরল।
ইবনে রুশদ, আল ফারাবি, ইবনে খলদুন, ইবনে সিনহা, জাবির ইবনে হাইয়ান, আল কেমি, আল জাবির, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ, আবু রাফি কাফিফ, আল কিন্দি এ সমস্তই কি মুসলমানদের ইতিহাস না? স্পেনের কর্দোভা কি ইসলামেরই ইতিহাস না? ইসলামের এই যুক্তিবাদী ধারায় অনুপ্রাণিত আবুল হুসেন তাঁর সময়ে এ-সমস্তই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন অন্ধকার পীরতন্ত্রে নিমজ্জিত সূত্র পূজারি কায়েমি স্বার্থান্বেষী ধর্মদোকানিদের সামনে।
কেননা বহুদিন মুসলমানরা তাদের সেই গৌরবময় সভ্যতা বজায় রাখতে পারল না। যে বুদ্ধি বা Reason-এর পরিচালনা ও অদম্য জ্ঞানস্পৃহা তাদের উন্নতির কারণ হয়েছিল তা পরিত্যাগ করাই তাদের দুর্গতির কারণ হল। ‘ইলম’ ও ‘ইমানের’ আদর্শ বিকৃত হয়ে গেল। শিয়া, সুন্নি, হাম্বলি, হানফি, আহম্মদি প্রভৃতি বহু সংখ্যক দল ও মতবাদের সৃষ্টি হয়ে ইসলাম শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। মোতাযেলাবাদ বিলুপ্ত হয়ে গেল। দেখা দিল গোঁড়ামি। যে ‘ইলম’কে কেবল ‘ইলম’র জন্যই আমল করা নারী-পুরুষের জন্য ফরজ করা হয়েছিল সেই ইলমের অর্থ সঙ্কীর্ণ করে শুধু ‘দ্বীনিয়াত’ আলোচনায় সীমাবদ্ধ করা হল। ফলে স্বাধীন চিন্তা হারিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দর্শন-বিজ্ঞান শিল্পকলার দিকে কিছু কন্ট্রিবিউট করতে না পারায় মুসলমানরা সমস্ত বিষয়ে অন্যান্য জাতি হতে নিচে পড়ে গেল। জীবন্ত ইসলামের পরিবর্তে আজ তাই দেখতে পাই আচার-পদ্ধতির ইসলামের কঙ্কাল, আর প্রাণবন্ত মুসলমানের স্থানে আজ দৃষ্ট হয় সংস্কারাচ্ছন্ন প্যারোট মুসলমান বা মোল্লা, যার চিন্তার উৎস রিচুয়ালস বা ডগমার পাথর-চাপে নিরুদ্ধ হয়ে গেছে। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে যে এই পরবর্তী যুগের ডগমেটিক ইসলামে মানবের কোনো কল্যাণ আসেনি; পরন্তু মুসলমান জাতিগুলোর মধ্যে এক অভিসম্পাতের মতো কাজ করেছে।
জাতীয় ক্ষেত্রেও আজ আমরা দেখতে পাই একই চিত্র! আটরশি, দেওয়ানবাগী, চরমোনাই, ফুরফুরা, শর্ষিনা ইত্যকার সব ইলম বিমুখ দ্বীনিয়াতধারী ভণ্ডের পদভারে ছিন্ন-ভিন্ন ইসলামি মূল্যবোধ।
দুনিয়াজুড়ে যেন সেই পঞ্চদশ শতাব্দীতে রিফর্মেশান এর প্রারম্ভে, খ্রিস্টীয় জগতের যে অবস্থা ছিল, মুসলিম জগতে আজ ঠিক সেই অবস্থা বিরাজ করছে। রিজনের ওপর ডগমার একই রকম প্রাধান্য ও একই রকমের অন্ধ গতানুগতিকতা এবং স্বাধীন চিন্তা ও বিজ্ঞান চর্চার প্রতি একই রকমের সন্দেহ ও বিরুদ্ধভাব। সন্দেহ নেই মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থাদি বিশেষত শরিয়ত পড়লে ও ঢাকার কিছু এলাকার বই পাড়ায় গেলে মনে হয় যে, ইসলাম বর্তমান উন্নতির এবং সভ্যতার পরিপন্থী ঠিক যেন পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে খ্রিস্টীয় জগতের অবস্থা। শরীয়তকে খ্রিস্টান Canon Law’র সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে দুটির একই উদ্দেশ্য। যেমন : সুদ নেয়ার নিষেধ বিধির উল্লেখ করা যেতে পারে, যা মানলে আধুনিক জগতের শিল্প বাণিজ্য অসম্ভব হয়ে পড়ে; ইসলাম যে বর্তমান সভ্যতার সম্পূর্ণ অনুপযোগী তার প্রমাণস্বরূপ এই সুদ নিষেধের বিধিকেই দেখানো হয়। খ্রিস্টান Canon Law ঠিক এইভাবেই সুদ নিষেধ করেছিল। এত কড়াকড়িভাবে এই নিষেধবিধি চালিয়েছিল যে কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপের সমস্ত কারবার ইহুদিদের একচেটিয়া ছিল। যেসব খ্রিস্টান সুদে টাকা খাটাতে সাহস করেছিল, তারা প্রায় ধর্মদ্রোহী বলে বিবেচিত হতো এবং সকলে তাদের ঘৃণা করত এবং অনেক সময় তারা অত্যাচারিতও হতো। যেমন ঘটেছিল আবুল হুসেনের জীবনে। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৯ নভেম্বর তারিখে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতির এক সাধারণ অধিবেশনে ‘সুদ বা রেবা ও ধনজ’ শিরোনামে প্রবন্ধ পাঠের সময়। তিনি বুঝেছিলেন, সুদের ওপরে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে মুষ্টিমেয় হিন্দু দাদন কারবারির একচেটিয়া ব্যবসায় শৃঙ্খলিত হচ্ছে হতদরিদ্র কৃষককুল। এ প্রবন্ধ পাঠের সময় অনুষ্ঠানের সভাপতি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্বয়ং প্রতিবাদ করে বের হয়ে যান, সেই সাথে অন্যরা। আবুল হুসেন পাঠ বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। এ পর্যন্তই শেষ না, এর জন্য খেসারত দিতে হয় আরো অনেক। অথচ আজ ইসলামি ব্যাংক চালু হয়েছে। সুদের পরিবর্তে লভ্যাংশ বলা হচ্ছে। কিন্তু এটিই বাস্তবতা।
ধর্মের এমনি বহু আইন যা সময়ের জন্য ছিল প্রযোজ্য। সুদকে হারাম রাখা এখনকার জন্য আর সম্ভবপর নয়। ‘চুরির শাস্তি হাত কেটে নেয়া’ কি এই দেশে কোনো মুসলমানের পক্ষে এখন সম্ভব? না। বরং তাকে যেতে হয় প্রচলিত আইনের আশ্রয়ে। এমনিভাবে আইন পরিবর্তন হয় এবং তা হতেই থাকবে। এটিই স্বাভাবিক। জ্ঞানী এর সমীকরণ টানেন। আবুল হুসেন জানতেন, জ্ঞান মানুষের সমাজ থেকে অর্জিত অধ্যবসায়ের উৎপাদন। আবুল হুসেন ইসলামের যুক্তিবাদী, স্বাধীন-মুক্তচিন্তার স্কুল মোতাযেলাপন্থা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বঙ্গীয় মুসলমান সম্প্রদায়কে সচল করতে চেয়েছিলেন। তাঁকে লিখতে হয়েছিল- ‘আদেশের নিগ্রহ’, ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’। কিন্তু সমাজদেহে জেঁকে বসা এই জগদ্দল পাথর সরাতে গিয়ে বহুবিধ অত্যাচার নির্যাতনেরও শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। তৎকালীন ঢাকার প্রভাবশালী মহল বলিয়াদির জমিদার কর্তৃক সালিশ বৈঠকে ৪০ হাত নাকে খত দিতে হয়েছে তাঁকে। পিস্তলের গুলির সম্মুখীন হতে হয়েছে। লিখিত মুচলেকা দিতে হয়েছে।
আত্মমর্যাদা বোধে উদ্বুদ্ধ আবুল হুসেন ফিরিঙ্গি শাসনের অনুকম্পা ‘পঁয়তাল্লিশ পার্সেন্ট’ কনসেশানের বিরুদ্ধে লিখলেন- ‘শতকরা পঁয়তাল্লিশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ। এ লেখা নিয়েও বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’তে কবি গোলাম মোস্তফা আবুল হুসেনকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে লিখলে তার সবিনয় প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ত্যাগ করেন। এবং পুনরায় লেখেন- ‘শতকরা পঁয়তাল্লিশের জের’। আলোচ্য গ্রন্থে লেখা দুটি অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছি কারণ এ লেখা দুটি এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না- সম্ভব হলে আগামীতে সংযোজিত হবে।
সমাজসচেতন আবুল হুসেন কাজ করেছেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। সাহিত্য ক্ষেত্রে নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি গবেষণা করেছেন- ‘বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা’ এমনকি সেই ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধেই তিনি উপস্থাপন করেছিলেন একটি সম্পূর্ণ শিক্ষানীতি। যা আজ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের ৩৫ বছরেও রচিত হয়নি। নারীমুক্তির চিন্তা থেকে সে সময় লিখেছিলেন- ‘নারীর অধিকার’। পানি ও নদী সমস্যা আজ পর্যন্ত যখন দেশের আপামর মানুষের কাছে জীবন্ত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। কিন্তু সেই ব্রিটিশ-ভারতেই আবুল হুসেন লিখেছিলেন বিশেষজ্ঞের মতামত দিয়ে- ‘The Problems of Rivers in Bengal’ দেশের মূল চালিকাশক্তি কৃষক ও কৃষি সমস্যা বিষয়ে তিনি হাজির করেন বিস্তারিত চিন্তা ‘বাংলার বলশী’ গ্রন্থে। এবং এই লেখা লিখেছিলেন ১৯১৭ সালের কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রেরণায়। এ থেকে বোঝা যায় সময়ের প্রগতি তাঁর মেধাকে পাশ কাটাতে পারেনি কখনোই।
অর্থনীতি, শিল্প-বাণিজ্য বিষয়ে সুচিন্তিত বক্তব্য রাখেন, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়ালিজম-যন্ত্রশিল্প প্রবাহ বা কলের কারখানা’ ও ‘শিল্প-বাণিজ্যে অভারতীয় মুসলমান’ শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধে। লিখেছেন, ‘ব্রিটিশ-ভারতে মুসলমান আইন’ নিয়ে। ওয়াক্ফ আইনের জনক তিনিই। এই ওয়াক্ফ বিলের খসড়া তাঁরই রচনা।
সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে তিনি ও তাঁর কতিপয় ছাত্র-শিক্ষক মিলে জন্ম দেন ঢাকার ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’, আল-মামুন ক্লাব, এন্টি পর্দা লীগ। প্রকাশ করেন একাধিক সাহিত্য পত্রিকা।
বহুমুখী প্রতিভাধর এই জ্ঞানতাপস এখন আমাদের সমাজে একেবারেই অবহেলিত ও বিস্মৃত। আজ ৮০ বছরেও তাঁর সমগ্র রচনা এদেশে প্রকাশ হলো না। অথচ তাঁর অন্য সমস্ত সহযোগীদের সমস্ত কৃতীই সংরক্ষিত হয়েছে মোটামুটি। শুধু কি তাই- ইতোমধ্যেই বিকৃত হতে চলেছে তার জীবন-কর্মের ইতিহাস। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর মূল রূপকার আবুল হুসেন এখন অনেক লেখায় স্থান পাচ্ছে শুধুই কর্মযোগী হিসেবে আর ভাবযোগী হচ্ছে অন্যে! বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এহেনো আচরণ কবে ঘুচবে? যে সাহিত্য সমাজ ছিল তাঁর স্বপ্ন, ধ্যান-জ্ঞান সেই সমাজের সদস্যরাই বা কী করেছেন একমাত্র আবদুল কাদির ছাড়া? কেননা ১৯৬৮ সালে আবদুল কাদিরের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় আবুল হুসেনের রচনাবলি প্রথম খণ্ড। ইতিহাসের নির্মমতা হলো এই আবদুল কাদিরও আমাদের সমাজে অবহেলিত। যিনি তাবৎ সহযোগীদের রচনাসম্ভার সম্পাদনায় দায় নিয়েছেন কিন্তু তাঁর কাজ সম্পাদনার দায় নেয়নি কেউই। সমাজ দায়িত্ব না নিলেও পিতার রচনাসমূহ সংগ্রহ করে আবুল হুসেনের সন্তানেরা দিয়েছিলেন পিতৃতুল্য কাজী আবদুল ওদুদের হাতে কিন্তু প্রকাশ হলো না নানা অজুহাতে। এক পর্যায়ে তা আগুনের খোরাকে পরিণত হয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়- হয়তো-বা আর কোনদিনও আবুল হুসেনের সমগ্র রচনা প্রকাশ সম্ভব হবে না। কত অপ্রয়োজনীয় কাজ আমাদের সমাজে হচ্ছে প্রতিদিন অথচ এই মহান মনীষীকে নিয়ে ৮০ বছরে একটি স্মারকগ্রন্থও প্রকাশ হতে পারেনি, এ দৈন্য আমাদের কবে ঘুচবে!