বাঙালি মুসলমান গল্পকার বাংলা সাহিত্যের মূলধারায় গল্প রচনা শুরু করেন চল্লিশের দশকে। তখনও প্রথাগত সংস্কার-আচার-মূল্যবোধকে তারা অতিক্রম করতে পারেনি। ব্যক্তিমানুষ ও সমাজের আন্তর্দ্বন্দ্ব ক্রমশ বহুমাত্রিক; বিচিত্র হয়ে উঠেছে। শিল্পিআত্মার সঙ্গে সমাজনীতির দ্বন্দ্ব পরাভূত নয়। কিন্তু শামসুদ্দীন আবুল কালামের শাহেরবানু, আবুল ফজলের মাটির পৃথিবী, আবুল মনসুর আহমদের আয়না, মাহবুব্-উল আলমের মফিজন, শাহেদ আলীর জিবরাইলের ডানা, আবু ইসহাকের মহাপতঙ্গ একটা সীমাবদ্ধতার ভেতরেই চল্লিশের গল্পভিত্তি নির্মাণ হতে থাকে। বিশ্বযুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিজ্ঞতা, উদ্বাস্তু সমস্যা, বৈষম্য, দুর্নীতি গল্পসাহিত্যে উঠে আসতে থাকে। রাষ্ট্র, সামন্ত ব্যবস্থার প্রতিরোধের মুখেই গল্পকাররা আধুনিক জীবনদৃষ্টি তৈরি করতে সক্ষম হয়। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁদের গল্পের বিষয়-নির্মাণে মনোযোগী করে তোলে। প্রধানত চলমান বাস্তবতার দৃশ্যমান ছবিই উঠে আসে তাঁদের পটচিত্রে। তবে এ গল্পভিত্তিতেই পঞ্চাশের সৈয়দ শামসুল হক, শওকত ওসমান, শওকত আলী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হাসান হাফিজুর রহমান, আবু রুশদ, রশীদ করীম প্রমুখ লেখক শুদ্ধ গল্পভাষা নির্মাণে ব্রতী হন। বিভাগোত্তর সময়ে বাঙালি মুসলমানের অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শ সাহিত্যভূমিতে বিরাজমান থাকলেও মানবতার স্বপক্ষের আবেগ কিংবা চিরায়ত জীবনচেতনা অনিবার্যভাবেই পরিপূরক রূপ লাভ করে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যাভিসারী পূর্ব-বাংলা গ্রাম ও শহরের অসাম্প্রদায়িক এবং লোকায়ত ঐতিহ্যের ধারাটি যাবতীয় প্রতিরোধ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এগিয়ে নেয়। এবং সে বিষয়-আশয় নিয়েই রচিত হয় পূর্ব-বাংলার গল্প-ভূমি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ছাড়াও গল্পে যুক্ত হয়েছেন শওকত ওসমান, আবু ইসহাক, সরদার জয়েন উদদীন, জহির রায়হান, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ গল্পকার ষাটের গল্পসাহিত্যে যুক্ত করেছেন নতুন টেকনিক। বায়ান্নর চেতনা, স্বৈরশাসন, সামাজিক রূপান্তর ব্যক্তির জীবনে যা কিছু যুক্ত করে তার ভেতরে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক ফর্মবিন্যাস। সুররিয়্যালিজম, রিয়ালিজম, অস্তিত্ববাদ এসব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সৃষ্টি হয় ক্ষয়িষ্ণু চরিত্র।বাংলাদেশের ছোটগল্প বিবর্ধিত হয়েছে স্বাধীন দেশ অর্জনের পর। কিন্তু সত্তরের দশকে স্বপ্নভঙ্গেরপর বাংলা গল্পের মূলধারার অনুসারী গল্পকাররা স্বতন্ত্র ভিত্তিভূমি পেয়ে নিজেদের জন্মপরিচয়ে নতুন চাল ও রীতির অন্তর্ভুক্তি ঘটাতে সক্ষম হন। পূর্ব-বাংলার পূর্বোক্তদের সঙ্গে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মতো লেখকও সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। সেখানে ক্রমাগত বাঙালি মুসলিম চেতনার স্বরূপ বা নিরঙ্কুশ মানব-বীক্ষার ধারণাটি চিহ্নিত হতে থাকে। এরপর কয়েক দশকের বাংলাদেশের ছোটগল্পের যাত্রাপথ আরও বিপুল, বিশালায়তন। কারণ পাকিস্তানি শাসন থেকে গণমুক্তির প্রেক্ষাপট এবং মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ছোটগল্পে যুক্ত হয়েছে অনেক বিষয়-আশয়, গল্পকারের দৃষ্টিচেতনায় এসেছে বিচিত্র বর্ণের পেশার ব্যক্তি মানুষ। বিবরণে, কথনে, নির্মাণে কূলপ্লাবী নিরীক্ষা যুক্ত হয়েছে। অস্থিরতার বিশ্ব, ‘একগ্রামে’ বিশ্ব, একমুখি বিশ্ব এবং তার যুগযন্ত্রণা যুক্ত হয়েছে গল্পকারদের বীক্ষণে। কারণ, অবাধ তথ্যপ্রবাহ, মিডিয়া বিপ্লব, মুঠোফোন ব্যক্তিমানুষের স্বরূপকে দ্রুততর পাল্টিয়ে দিয়েছে। ভেতরের ক্ষত, ক্রোধ, পাপ বেড়েছে। বৈষম্য, ভোগবাদ, পর্ণগ্রাফির তৎপরতা বাংলাদেশের সদ্য স্বাধীনতার সুফলের পথে হয়ে উঠেছে বিরাট বাধা। বিজ্ঞানমনস্ক না হয়ে বৈজ্ঞানিক উপাদান ব্যবহারে ব্যক্তি যেন যান্ত্রিক। এ অবস্থায় সত্তর-আশি-নব্বুইয়ের গল্পকাররা লিখে গেছেন। আমাদের প্রায় অর্ধ-শতাব্দীর বাংলাদেশের গল্পের গল্পকারগণের গল্প ও প্রবণতা এখানে চকিত অবলোকন করা যেতে পারে।
২
আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৭-১৯৭৯) সাহিত্যিক, সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও বিদ্রƒপাত্মক গল্প রচনায় তাঁর কৃতিত্ব অসাধারণ। এ প্রক্রিয়ায় নির্মিত গল্পভাষায় তাঁর কৃতিত্ব অনবদ্য। আয়না (১৯৩৫)র অনেক গল্পে তাঁর সাহিত্যকীর্তি প্রসিদ্ধ। এ গ্রন্থের “হুযুর কেবলা”, “গো-দেওতা-কা দেশ”, “নায়েবে নবী”, “লীডারে কওম ”, “মুজাহেদিন”, “বিদ্রোহী সংঘ”, “ধর্মরাজ্য” এসব গল্পে বাঙালি মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ভণ্ডামী, প্রতারণা, কুসংস্কার শ্লেষাত্মক রূপশৈলিতে নির্মিত। বাংলাদেশের ছোটগল্পে এ প্রবণতার গল্পে আবুল মনসুর আহমদ কালজয়ী। তাঁর গল্পের চরিত্র এবং আবহ যেন সমকালের বাস্তব রূপ। যুগচিহ্নিত এ সমস্যাকে তিনি দেখেছেন একেবারে দিব্যচেতনায়। শিল্পীর দক্ষতায় তাঁর কাহিনিরেখায় সমাজশুদ্ধির বার্তা যেন নিপুণ এবং প্রাণস্পর্ধী। এ জায়গায় ‘সমাজের জন্য শিল্প’- এমন সত্যটি যেন তার সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রমাণ পেয়ে যায়। তাঁর অন্যান্য গল্পগ্রন্থ ফুড কনফারেন্স (১৯৪৪), আসমানী পর্দা (১৯৬৪)।
সাহিত্যের নানা অঙ্গনে শওকত ওসমানে (১৯১৭-১৯৯৮)-র সরব উপস্থিতি বিরাজমান। গল্পের চরিত্রের নানামুখি নিরীক্ষা আছে; আর্থ-সামাজিক পটে বর্ণিত কাহিনিতে ধর্মীয় ভণ্ডামী, গোঁড়ামী, কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতা বিদ্রƒপাত্মক স্বরে চিহ্নিত। বাঙালি মুসলিম পরিবার জীবনাগ্রহ; সেখানকার টানাপোড়েনের সংস্কৃতি গল্পের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পগ্রন্থ জন্ম যদি তব বঙ্গে (১৯৭৫)। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাগত পরিচর্যা এসব গল্পে যেমন আছে তেমনি বাস্তব অভিজ্ঞতার বিবরণও বর্ণিত। মুক্তিযুদ্ধকে জাতির সামগ্রিক মুক্তির পথ বলেই মনে করেন লেখক। এক্ষেত্রে গল্প উপস্থাপনে প্রতীক ও রূপকের কৌশল, সমাজভিত্তিক বর্ণনার মুন্সিয়ানা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে অনেক গল্প লিখে তিনি দৃঢ়ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। শওকত ওসমানের গল্পগ্রন্থ : পিঁজরাপোল (১৯৫১), জুনু আপা ও অন্যান্য গল্প (১৯৫১), সাবেক কাহিনী (১৯৫৩), প্রস্তরফলক (১৯৬৪), নেত্রপথ (১৯৬৮), উপলক্ষ্য (১৯৬৮), উভশৃঙ্গ (১৯৬৮) এবং তিন মির্জা (১৯৮৬), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৪), মনিব ও তাহার কুকুর (১৯৮৬), বিগত কালের গল্প (১৯৮৭), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৭৪), পুরাতন খঞ্জর (১৯৮৭), ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৯০), হন্তারক (১৯৯১), রাজপুরুষ (১৯৯৪)।
শাহেদ আলীর বর্ণনাত্মক সংহত টানের গল্প জিবরাইলের ডানা (১৯৫৩)। এই একটি গল্পগ্রন্থের জন্য তিনি সুবিদিত। এ গল্পগ্রন্থে ‘ওই যে নীল আকাশ’, ‘ফসল তোমার কাহিনী’, ‘নানীর ইন্তেকাল’, ‘জিবরাইলের ডানা’, ‘এলোমেলো’, ‘পোড়া মাটির গন্ধ’ গল্প বিরাজমান। বিভাগ পর্বে বাঙালি মুসলমান সমাজের পরিবার নিগ্রহ, যাপিত জীবন কিংবা ব্যক্তির পারস্পরিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধ শিল্পিত হয়ে উঠে আসে।
আবু রুশ্দ (১৯১৯-২০১০) ‘রাজধানীতে ঝড়’ লিখে সাড়া ফেলে দেন; বাঙালি মুসলিম গল্পকার হিসেবে নগর-মনস্কতার নিবিড় পর্যবেক্ষণ, গভীরে অন্বেষণ, সর্বোচ্চ অনুভবের মাত্রায় শিল্পিত কাঠামো তৈরি- ঐ চল্লিশে, প্রথম আধুনিক-আবর্তটি স্পর্শ করা সেটি অভিনব নয় তো কী? কখনও গ্রামীণ পটচিত্র আঁকেননি আবু রুশ্দ। নগরেই স্থিত, আগ্রহ মধ্যবিত্তকে কাঁটাছেঁড়ায়, ভেতরের বিমূঢ় বিস্ময়কে নিরঙ্কুশ প্রকাশে, কারণে-জিজ্ঞাসায় অকৃত্রিমতাকে উন্মোচনে বাংলাদেশের গল্পে প্রথম সমুপস্থিত আবু রুশ্দ। একটু ঝুঁকি থাকে নগরের পতিতা থেকে প্রাসাদ পর্যন্ত প্রবেশে, কিন্তু জীবনের নেশা শিল্পে তো পরাস্ত নয়। সেজন্য মানব মনের অন্ধিসন্ধিতে পৌঁছান গল্পকার। চিহ্নিত হয়ে যায় তাঁর স্বপ্ন, সবকিছুর ঊর্ধ্বে; একে একে। গল্পের চরিত্রকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষণ করেন আবু রুশ্দ। মধ্যবিত্তের রোম্যান্টিক সত্তা এবং সমাজ-মনস্কতা; কার্যকারণ সম্পর্কের ভেতর দিয়ে কাহিনিতে বুনতে থাকেন। এক্ষেত্রে মনস্তত্ত্ব, অন্তঃসারশূন্যতা, সংশয়, সন্দেহ, গ্লানি, শ্লাঘা সবই বিস্তৃত হয় গল্প-আবহে। তাঁর আঙ্গিক শক্তিশালী, ঋজু, সংহত; ভাষাভঙ্গি তীক্ষ্ণ এবং নাটকীয়তা জড়িত। এমন প্রস্তাবনায় আবু রুশ্দের গল্পগ্রন্থ রাজধানীতে ঝড় (১৯৩৮), প্রথম যৌবন (১৯৪৮), শাড়ী বাড়ী গাড়ী (১৯৬১), মহেন্দ্র মিষ্টান্ন ভাণ্ডার (১৯৮৫), স্বনির্বাচিত গল্প (১৯৭৯), দিন অমলিন (১৯৮৫), বিয়োগ ব্যথা (১৯৯৬), নির্বাচিত গল্প (১৯৯০), গল্পসমগ্র (২০০০)।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১৯২২-১৯৭১) বাংলাদেশের ক্রম-আধুনিক গল্পের গুরুস্থানীয়, বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি, ঘনিষ্ঠ জীবনবোধ তাঁর গল্পের আঙ্গিককে তৈরি করে। মানবীয় সূক্ষ্ম অনুভূতি গভীর ব্যঞ্জনা এনে দেয় ‘কেরায়া’, ‘স্তন’, ‘তুলসী গাছের আত্মকাহিনী’-এমনসব গল্পে। গল্পের পরিণতি দূরায়ত আমেজ আনে, দান করে দার্শনিক-বীক্ষা। তাঁর গল্পের শক্তি ঐতিহ্য-সমাজ-মাটি-মূল অনুষঙ্গি ভাষায়। ঔপনিবেশক শাসন পরবর্তী রাষ্ট্র কাঠামোতে শোষক-শক্তির আধিপত্যের চেতনার ভেতরে ব্যক্তিমানুষের ক্ষয়, বিনাশ, বিচ্ছিন্নতার স্বরূপটি নির্মাণ করেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। এজন্য তাঁর গল্পে নিম্ন-মধ্যবিত্তের অন্তর্মুখী জীবন বৈশিষ্ট্য ও তার মনস্তত্ত্বের নিখুঁত বিবরণটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটির চরিত্র-মনস্তত্ত্ব নির্মাণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর দক্ষতা লক্ষণীয়। জীবনের সূক্ষ্মতর দিকগুলো শক্তিশালী গদ্যে তাঁর গল্পে বাস্তবানুগ হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ অনেক ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যরীতিরও প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। চেতনার প্রবাহরীতি (stream of consciosness) কিংবা অস্তিত্ববাদী (existentialism) দর্শন তাঁর গল্পের পটে ভূমিকা রাখলেও প্রাচ্যরীতির প্রয়োগ ও স্ফূর্তি অনবদ্য। বাইরের কোনো তত্ত্ব বা দর্শন অহেতুক আরোপ করার তৎপরতা তাঁর গল্পে নেই। দর্শনকে জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে সূক্ষ্মতর সান্নিধ্য যেমন প্রেম-রোম্যান্স-রোম্যান্টিকতা ব্যক্তিচরিত্রের মধ্যে উঠে আসে। এক্ষেত্রে তাঁর ভাষা অনবদ্য। ভাষাই তাঁর চরিত্রকে তৈরি করে; চরিত্রের অন্তর্জগতের নির্মিতি দেয়। গল্পে উপস্থিত থাকে প্রচ্ছন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক কটাক্ষ আর ব্যক্তির প্রথাগত সংস্কার ও বিশ্বাসের মূলে আঘাত। এক্ষেত্রে ভাষা ও প্রকরণ উভয়ের মেলবন্ধনে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ভাষাও আধুনিক। তাঁর নয়নচারা (১৯৪৫) গল্পগ্রন্থে ‘নয়নচারা’, ‘জাহাজী’, ‘পরাজয়’, ‘মৃত্যু-যাত্রা’, ‘খুনী’, ‘রক্ত’, ‘খণ্ড চাঁদের বক্রতায়’, ‘সেই পৃথিবী’ সংকলিত। অপর গল্পগ্রন্থ দুই তীর ও অন্যান্য গল্প (১৯৬৫)-এ আছে ‘দুই তীর’, ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’, ‘পাগড়ী’, ‘কেরায়া’, ‘নিষ্ফল জীবন নিষ্ফল যাত্রা’, ‘গ্রীষ্মের ছুটিতে’, ‘মালেকা’, ‘স্তন’, ‘মতিনউদ্দিনের প্রেম’ গল্প।
শাহেদ আলী (১৯২৫-২০০১)-র বর্ণনাত্মক সংহত টানের গল্প জিরাইলের ডানা (১৯৫৩)। এই একটি গল্পগ্রন্থের জন্য তিনি সুবিদিত। এ গল্পগ্রন্থে “ওই যে নীল আকাশ”, “ফসল তোমার কাহিনী ”, “নানীর ইন্তেকাল ”, “জিবরাইলের ডানা”, “এলোমেলো”, “পোড়া মাটির গন্ধ” গল্প বিরাজমান। বিভাগ পর্বে বাঙালি মুসলমান সমাজের পরিবার নিগ্রহ, যাপিত জীবন কিংবা ব্যক্তির পারস্পরিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধ শিল্পিত হয়ে উঠে আসে।
যাবতীয় সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে ইহবাদী বিশ্বাসে প্রেম-অনুরাগ বা মুসলিম পারিবারিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রটি প্রস্তুত করেন লেখক। এজন্য বাঙালি মুসলিম সমাজ জীবনের ভাষাটি সামূহিক সচেতনতায় যেমন দৃঢ়তা পায় তেমনি সমকাল বিধৃত চিরায়ত সংস্কৃতির ধারাটিও নির্ভরতায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে শাহেদ আলী নিরঙ্কুশ মানবতাবাদই প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর লেখায়। তাঁর অন্য গল্পগ্রন্থ একই সমতলে (১৯৬৩), শা’নযর (১৯৮৬), অতীত রাতের কাহিনী (১৯৮৬), অমর কাহিনী (১৯৮৭)। দেশীয় চেতনায় ত্যাগী ও দায়বদ্ধ কথাকার শামসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬-১৯৯৭)। বিভাগ-পূর্ব সময়ে তাঁর বিখ্যাত গল্প শাহেরবানু (১৯৪৫) যেখানে বিত্তহীন মানুষকে তুলে আনা হয়েছে। বাংলাদেশের মুসলিম লেখকদের প্রারম্ভিক পর্বটি শামসুদ্দীন আবুল কালামের আঙ্গিকে বিরাজমান। লেখকের বিষয়ে দরিদ্র জীবনাগ্রহ এবং তাদের সংগ্রামই প্রাধান্য। বর্ণনার চিত্রে মেলে নদীবিধৌত বাংলার চিরায়ত প্রকৃতি। অনুপম প্রকৃতির সঙ্গে যেন মিলে আছে দুর্বহ ও সংগ্রামী মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রাম। লেখকের পথ জানা নেই (১৯৪৮) গ্রন্থের গল্পে দক্ষিণ বাংলার মানুষের সরল জীবনচিত্র অঙ্কিত। একদিকে মানুষ ও প্রকৃতির সমভিব্যহার অন্যদিকে তার বৈরিরূপ বস্তুনিষ্ঠ বিধৃত। তবে শামসুদ্দীন আবুল কালামের লেখায় শেষাবধি জীবনই জয়ী হয়। অনেক দিনের আশা (১৯৪৯), ঢেউ (১৯৫৩), দুই হৃদয়ের তীর (১৯৫৫), পুঁই ডালিমের কাব্য (১৯৫৩) তাঁর অন্যান্য গল্পগ্রন্থ।
আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০২) প্রবল শক্তিশালী গল্পকার। প্রধানত সামজিক-ধর্মীয় কুসংস্কার প্রচণ্ডতা পায় তাঁর গল্পে। গল্পভাষায় তীক্ষ্ণধী আবহ তৈরি হয়; প্রথাগত ধর্মের ভণ্ডামী, পীরপ্রথা, কষ্টসহিষ্ণু শ্রমী মানুষের শোষণ নিষ্পেষণ দোর্দণ্ড মাত্রা পায়। আবু ইসহাকের শিল্প-নন্দনে অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ আলোকিত হয়ে ওঠে জীবনবাদী চেতনাদর্শে। আঙ্গিক নির্মাণে কমিটেড, ভূ-সংলগ্ন মানুষের অন্তর্চিত্র অনুষঙ্গকে যাবতীয় দ্বন্দ্বে পরিশুদ্ধ সম্ভাবনার দিকে নিতে চান। গ্রামজীবনের পটভূমে তাঁর গল্পগ্রন্থ হারেম (১৯৬২), মহাপতঙ্গ (১৯৬৩)। আনিস চৌধুরী (১৯২৯-১৯৯০)-র গল্পসংগ্রহ বেরিয়েছে ২০০৭ সালে। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ লেখাই প্রকাশের সাল ষাটের বিভিন্ন পত্রিকা থেকে শুরু করে নানা সময়ে। মূলত গল্পেই তাঁর দস্তুর। গল্পের নিবিড়পাঠে সত্যাসত্য বিবেচনা; আধুনিকমনস্কতা, নৈর্ব্যক্তিক ও প্রাণস্পর্শী তুখোড় প্রাণবত্তাপূর্ণ এক গল্পকারকে পাওয়া যায়। তিনি সাড়া দেন আলোড়নে, চিত্তস্পর্শী স্নিগ্ধ মায়াতে, অনেকটা দূরস্থিত অভিপ্রায়ের আকুলতায়। শুধু বিশ্লেষণেই শেষ হয়ে যান না। শহীদ সাবের (১৯৩০-১৯৭১)-এর গল্প সংকলন এক টুকরো মেঘ (১৯৫৫)। এতে সন্নিবদ্ধ আছে “এক টুকরো মেঘ”, “প্রাণের চেয়ে প্রিয়”, “জসুভাবীর জন্য”, “দেয়াল”, “যে গল্প কেউ বলেনি”, “যৌবন”, “চালচুলো”, “ছেলেটা”, “শেষ সংবাদ”, “বিষকন্যা” গল্প। ছোটদের জন্য লিখিত গল্প সংকলন ক্ষুদে গোয়েন্দার অভিযান (১৯৫৮)। সাবের প্রগতিশীল ও বুদ্ধিমনস্ক লেখক-সাংবাদিক। তাঁর গল্পে মূলত পঞ্চাশের ছোটগল্পের ধারাটি বহমান। এক টুকরো মেঘ-এর মধ্যে পলায়নপর, দুঃখ-অভাবতাড়িত, নৈরাশ্যমুখর চরিত্রের ছবি এঁকেছেন। বস্তুত মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, নির্লিপ্ততা তাঁর গল্পের বিষয়। সাবেরের চরিত্ররা জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সংক্ষুব্ধতাকে মোকাবেলা করে। এক্ষেত্রে তাঁর ভাষাভঙ্গিও প্রচণ্ডরূপে বাস্তবানুগ। আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯) বিভাগোত্তর বাংলাদেশে, একেবারে গোড়ার লেখক। সমাজ সচেতন দৃষ্টি বিরাজমান থাকলেও সন্ধান করেছেন বিচিত্র মানুষের বৈচিত্র্যময় মনোজগৎ। এক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়েছেন- সেখানে ক্রম-উত্তরণ ঘটেছে তাঁর গল্পের প্রকরণের। পাল্টেছে ভাষারীতি; যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক মাত্রা। তবে প্রথম প্রবণতার গল্পেই তাঁর শিল্পসিদ্ধি ও প্রতিষ্ঠা বেশি। গল্পভুবনের প্রদর্শকের ভূমিকা হোক কিংবা শিল্পগুণের অনিবার্যতাই হোক আলাউদ্দিন আল আজাদ যে ভাষারীতি প্রথম কয়েকটি গল্পে যেভাবে কায়েম করেছেন- তা আর মুছে যায়নি। এখনকার অনেক গল্পেও গল্পকার একই কৌশলে পুণ্যাত্মা। “ধানকন্যা”য় নিছক মধ্যবিত্ত আবেগের গল্প হলেও প্রেমাত্মার শিহরণ, দায়বদ্ধতা, বিবেকদহন ধানকন্যার দোঁহে বিরাজমান। প্রথাবদ্ধতা একটা পর্যায়ে থাকলেও শিল্পশক্তিটা চেনা যায় ভাষার কারুকার্যে। গোষ্ঠীগত শব্দ, শ্রেণিগত চেতনা ও আচার, ধর্মানুষঙ্গ, প্রেম প্রভৃতি বিষয় সমাজ ক্ষেত্র পর্যবেক্ষণে চালিত। এর ভেতরেই গল্পশৈলিতে বাধা পড়ে যাবতীয় বাঞ্ছনা। তবে তাঁর এ শিল্পভাষানির্মাণ আমাদের সমাজ ও সময়কে করে তোলে বিশেষ অনিবার্যতায় আচ্ছন্ন। ‘-তুই খালি রক্ত বার করছিলে, খুন করতে পারস নাই। একটা মান্সেরে খুন করা কি খুবই শক্ত।’ ধানকন্যার মতো অন্যান্য গল্পেও এমন প্রণোদনা জড়িত। জেগে আছি (১৯৫০), ধানকন্যা (১৯৫১), মৃগনাভি (১৯৫৩), অন্ধকার সিঁড়ি (১৯৫৮), উজান তরঙ্গে (১৯৬২), যখন সৈকত (১৯৬৭), আমার রক্ত স্বপ্ন আমার (১৯৭৫), জীবন জমিন (১৯৮৮), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৫), মনোনীত গল্প (১৯৮৭), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৮৭), শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প (১৯৯৯) এসব গল্পের বিচিত্র শ্রমী মানুষ সমাজ-পরিসরকে বুঝতে যেমন সহায়তা করে তেমনি হয়ে ওঠে রিপুর নিন্দা-প্রশংসার কীর্তিতে পূর্ণাঙ্গ মানুষ। তবুও বলতে হয় দীর্ঘ জীবনে আলাউদ্দিন আল আজাদ আদ্যন্ত সাহিত্যে থাকলেও মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে খুব বেশি ভালো গল্প লেখেনননি। তবে প্রধানত গ্রামীণ পটের অনেক গল্পেই তিনি বিরাজমান। সে অনুষঙ্গি আঞ্চলিক ভাষাও তাঁর গল্পে দ্রুততা পায়।
সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) বাংলাদেশের দক্ষ ও স্থিতধী গল্পকার। তাঁর রয়েছে কয়েক দশকের গল্পচর্চার প্রবাদপ্রতীম অভিজ্ঞতা। রচনায় তিনি নির্মাণ করেছেন বিচিত্র বিষয়। পারিবারিক, আঞ্চলিক গল্প; আছে নাগরিক জীবনসম্ভূত গল্প, আছে প্রেম-মনস্তত্ত্বের জটিলতর গল্প। কবিভাষা তাঁর গল্পে কখনও পরিসর তৈরি করলেও প্রকরণে তা আঘাতপ্রাপ্ত বা আরোপিত হয় না। সৈয়দ হক সেরূপেই সব্যসাচী হিসেবে বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা পান। গার্হস্থ্য পরিমণ্ডলে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান পরিবেষ্টিত মায়ের শাশ্বত মূর্তি চিহ্নিত “তাস” গল্পে। একাধিক ভাষায় অনূদিত এ গল্পগ্রন্থের বৈচিত্র্যময় কাহিনি নানা ঘটনার প্রক্ষেপণে আধুনিক মাত্রা লাভ করে- বিশেষ করে বিধবা মার স্মৃতিকাতরতা, যন্ত্রণা, অন্তর্দহন এবং সন্তানদের স্নেহ-মমতা প্রখর অন্তর্দৃষ্টিতে তা প্রতীকী বার্তায় পর্যবসিত। যেখানে সবকিছুর সঙ্গে ‘তাস’ বাড়তি মাত্রা যোগ করে। “আনন্দের মৃত্যু” সৈয়দ হকের আরেকটি অনবদ্য গল্প। চমৎকার দৃশ্যপরিকল্পনে তিনি মূলত উঠতি নাগরিক মধ্যবিত্তের অসার, ভুঁইফোঁড় জীবনকে তুলে ধরেন এ গল্পে। প্রেম ও মনোবিকলনধর্মী গল্পেও সৈয়দ হক বেশ পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন। এছাড়া গ্রামীণ জীবনপট কিংবা মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করেও গল্প লিখেছেন তিনি। সমাজের শোষণ-কুসংস্কার-সংস্কার-ধর্মীয় বিশ্বাস-কিংবদন্তী নিয়ে গল্পকারের নিরীক্ষাধর্মী গল্প জলেশ্বরীর গল্পগুলো (১৯৯০)। এতে প্রধানত স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের গ্রামকেন্দ্রিক শ্রেণিচরিত্রের শোষণ-নির্যাতনের চালচিত্রটিই রচিত। গল্পপরিচর্যার দীর্ঘায়ত পথপরিক্রমায় সৈয়দ শামসুল হক এগিয়েছেন, তাগিদে এসেছে নিরপেক্ষ-নিশ্চয়তা আর একই সঙ্গে আঙ্গিকেও এসেছে প্রভূত পরিবর্তন। প্রতীক নির্মাণ, গদ্যভঙ্গির ঋজুতা, বাস্তবানুগ সময় সন্ধিৎসা, ইমেজে বর্ণিল আবেগের বিচ্ছুরণ- গল্পকে প্রখর জীবনবাদী করে তোলে। অদ্যাবধি তিনি এ পথে দ্যুতিময় এবং দূরগামী। সৈয়দ হকের গল্পগ্রন্থ : তাস (১৯৫৪), শীতবিকেল (১৯৫৯), আনন্দের মৃত্যু (১৯৬৭), প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান (১৯৮১), এক সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হক (গল্প সংকলন) (১৯৮৬), প্রেমের গল্প (১৯৯০), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯০), গল্প সমগ্র (২০০১) প্রভৃতি।
বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্যের যাত্রাপথে মোক্ষম সায়কক্ষেপণে লক্ষ্যভেদী গল্পকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭)। তপ্ত শব্দগুচ্ছে উইট হিউমারের ঝাঁঝালো বাণ তুলে দেন তিনি। নিজের উদ্ভাবিত, স্বদীক্ষিত চিত্রপ্রতীকে শ্রেণিচেতনায় সোচ্চার তাঁর উদ্গত আঙ্গিক। এছাড়া তাঁর গল্পবিষয়ে ত্রিশঙ্কু মধ্যবিত্তের নষ্টস্বপ্ন কিংবা নিশিজাগর জ্যোৎস্নাপ্রলাপও উৎসবমুখরিত। ষাটের দিকে ইলিয়াস অন্তর্বৃত, সত্তরের পরে একেবারে বহির্মুখি; কারণ সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতা।
হাসান আজিজুল হক (জ. ১৯৩৯)-এর গল্পে রাঢ়বঙ্গ-প্রকৃতি চমৎকার রেখাচিত্রে পরিবেশিত। প্রথম গ্রন্থ সমুদ্রের স্বপ্ন ও শীতের অরণ্য (১৯৬৪)র ‘গুণীন’, ‘মন তার শঙ্খিনী’, ‘শকুন’, ‘তৃষ্ণা’ এসবে রুক্ষ্ম রাঢ় ও প্রতিরোধী প্রকৃতি প্রতিফলিত। লেখকের প্রকৃতির বর্ণনায় নিহিতার্থ জীবন বড় বঞ্চিত, দুর্বিষহ। গ্রামীণ পটে বিধৃত আত্মজা ও একটি করবী গাছ (১৯৬৭), জীবন ঘষে আগুন (১৯৮৫)র গল্পগুলো। লেখকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পগ্রন্থ নামহীন গোত্রহীন (১৯৭৫), আমরা অপেক্ষা করছি (১৯৮৯), রোদে যাবো (১৯৯৫)। এছাড়া পাতালে হাসপাতালে (১৯৮১), মা মেয়ের সংসারে (১৯৯৭) গল্পগ্রন্থের মধ্যেও নির্মম জীবনভাষ্য অঙ্কিত। হাসান আজিজুল হকের গল্প হওয়ার পথটি নির্মিত হয় বিপুল জীবনের মাহাত্ম্যে, কার্যকারণ সম্পর্কের ভেতর দিয়ে। উঠে আসে যাবতীয় সংস্কার-কুসংস্কার-সংগ্রাম-প্রতিরোধের ছায়াচিত্র। তাঁর উপমা-নির্বাচন কর্কশ, মর্মচিহ্নিত, তীক্ষ্ণধী। বর্ণনায় সামূহিক বাস্তবতা শ্রেণিস্তর অবলম্বী হয়ে ওঠে। তাঁর সংলাপের দৃঢ়তা পরিলক্ষিত হয় শ্রেীণচেতনার মর্মে, রচিত পটরেখায় থাকে জীবনবাদী প্রণোদনা। অনুভূতির ছোঁয়ায় রাঢ় রক্তাম্বর অধ্যূষিত দিগন্তমেখলা সুন্দরের প্রতিমায় অঙ্কিত। মেধার সূচ্যগ্রে বন্দি ব্যক্তিচরিত্র। বঙ্গীয় সংস্কৃতির ভেতরের প্রাণভোমরাকে স্পর্শ করেন লেখক। সেখানে রাষ্ট্রের শোষণ ও শ্রেণিচরিত্রের ভূমিকা, প্রান্তিক মানুষের প্রথাগত বিশ্বাস-সংস্কারে আঘাত হানেন- সে পরিহাসপ্রিয়তায় বঞ্চিত মানুষের অস্তিত্বের উচ্চারণই বড় হয়ে ওঠে। প্রতীকায়নে ব্যক্তির সংগ্রাম ও দ্বন্দ্বের স্বরূপটি নির্বাচিত হয়। সাহিত্যে দেশ-সমাজ-ব্যক্তির দায়কে এভাবেই তুলে ধরেন তিনি। সেখানে গল্পের আবহটি ঘন রঙয়ের, কথকের কথোপকথন প্রয়াসে চরিত্রানুগ বস্তুনিষ্ঠতায় কার্যকারণ প্রয়াসভিত্তি নির্মিত হয়। গল্পের নন্দনভূমে স্বপ্নাবিষ্ট, ধর্মভীরু আচ্ছন্ন মানুষের জীবনচরিত উন্মোচিত হয়। তখন ভাষার প্রকোপে বিদ্ধ হয় চরিত্র; তার প্রতিরোধ আর প্রতিকূলতায় উঠে আসে প্রবহমান সমাজ, জীবন লাভ করে অবমুক্তি। গল্পকারের গল্প তখন বিস্তৃতি পায় পাঠক পরিসীমায়। সেজন্য নিছক গল্প নয় বা গল্পরসে আপ্লুত করা নয়- গল্প বলার ভেতর দিয়ে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ ও ব্যক্তির সংগ্রাম বা অবমুক্তির প্রক্ষেপণটি তুলে ধরেন। সেখানে হাসান আজিজুল হক আপসহীন। ভঙ্গিতেই গল্পের প্রায়শ্চিত্ত নিশ্চিত করেন তিনি। বাংলাদেশের সাহিত্যে অনবদ্য গল্পকার হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত। তবে দীর্ঘায়ত গল্পচর্চায় তাঁর ক্রম-বিবর্তন ঘটেছে। গল্পের ভেতর দিয়ে প্রতিরোধের প্রবর্তনাটি রচিত হয়েছে সমকালকে ঘিরে। সামাজিক দায়বোধে আধুনিকতার যাবতীয় গরল ও কূটৈষা ধারণ করে তাঁর গল্প। বাংলাদেশের গল্পধারায় তিনি এখনও সচল ও সক্রিয়। তাঁর নির্বাচিত গল্প (১৯৮৭), রাঢ়বঙ্গের গল্প (১৯৯১), হাসান আজিজুল হকের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯৫) বেরিয়েছে।
জ্যেতিপ্রকাশ দত্ত (জ. ১৯৩৯) দুর্বিনীত কাল (১৯৬৫), বহে না সুবাতাস (১৯৬৭), সীতাংশু তোর সমস্ত কথা (১৯৬৯), পুনরুদ্ধার, প্লাবনভূমি, উড়িয়ে নিয়ে যা কালো মেঘ (১৯৯২), ফিরে যাও জ্যোৎস্নায়, নির্বাচিত গল্প, গল্পকল্প ও বাঁচামরার জীবন (২০০৫) এসব গল্পগ্রন্থে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত স্বতন্ত্র ও মনোমুগ্ধকর। এক ধরনের অন্তর্গত পরিশুদ্ধতা বিনীত সেখানে, কিন্তু নৈঃসঙ্গ্য বা হতাশা বিরল নয়। দীর্ঘ কালবৃত্তে অনেক সময় নিয়ে তাঁর গল্পগ্রন্থ বেরিয়েছে। এটিতে ‘এখন দু’জন দিনমজুর এই দিন ফুরানোর ছায়ায় মাথার ঝুড়ি থেকে কালো মাটির রাশি ঐ পথে ফেলে যায়’ কিংবা ‘সন্ধ্যার পর চরাচর ভাসিয়ে দিয়ে শ্বেত জ্যোৎস্নার চাঁদ উঠেছিল আকাশে’। এভাবে ধ্বনিবন্ধ বানিয়ে এক ধরনের অন্তস্তল-সংবাদ কায়েম করতে চান তিনি। চিত্ররূপতা ঐ ষাটেও ছিল তাঁর রচনায়, আধুনিকতা অর্জনের পথ তাঁর অনেক আগের; সেজন্য এ সময়ে লেখা গল্পগ্রন্থটি প্রশংসনীয়, আকর্ষণীয়। তাঁর ভিন্নতা সংলাপহীনতায় কিংবা নাম না-ব্যবহারের দুর্বলতায়। তবুও স্নিগ্ধতা বা মাধুর্য তো কমে না; সেখানেই তাঁর বিরল সার্থকতা। আর্থ-সমাজ ব্যবস্থার গভীরে মাটিঘেষা মানুষ আছে, গল্পভাষাতেও তৈরি করেন ঐ দ্বিধাকাতর সংশয়ী মানুষ। বিপন্ন, উন্মূল বাস্তবতায় লেখা “কল্পলোকে”, “সুখবাস”, “অচেনা” ইত্যাদি গল্প। বাংলাদেশের ছোটগল্পে তিনি শক্তিশালী গল্পকার হিসেবে পরিগণিত। প্রথম দিকের গল্পে আত্মকূণ্ডলায়িত, ক্ষয়িষ্ণু মানুষের চিত্রপট অত্যন্ত শিল্পিতরূপে উপস্থাপন করেছেন লেখক। আমাদের গল্পধারার প্রান্তিক মানুষের প্রতীকী নির্মাণের বিষয়টিকে ঐতিহ্যি মাত্রিকতা দান করেছেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত।
আবুবকর সিদ্দিক (জ. ১৯৩৪) কবিস্বভাবে প্রান্তবর্তী মানুষের গল্প বলেছেন। কিন্তু কাহিনি গতানুগতিক নয়, প্রান্তস্পর্শী, অন্তর্বাস্তবতায় ঋজু, দৃঢ়প্রস্তাবনায় প্রদীপ্ত, রেপ্লিকা ঝলমলে। দুর্বিনীত তাঁর ভাষ্য। গল্পগ্রন্থের নামেও সে প্রকাশটি নিহিত। ‘কাহিনীর সূচনাপট বাদার গাঘেঁষা চর এলাকা। এই সব দুর্গম চর যেমন দুর্ভেদ্য বনে আকীর্ণ, তেমনি দুস্তর নদীখালে বিদীর্ণ। বনের স্তরে স্তরে আদিম রহস্যের জাল’- এভাবে শুরু হলে পটচিত্র যেমন অনুমেয় হয়ে ওঠে তেমনি প্রাপ্ত চরিত্র, তার উত্তরণ, কোমলে-কঠোরে আরূঢ় রূপ অস্পষ্ট থাকে না। অন্তর্মুখি প্রবণতায় ব্যক্তি- কিন্তু সে ব্যক্তি ভুঁইফোঁড় নয়, রাজনীতি পরিস্রুত, শ্রেণিচরিত্র সংজ্ঞার্থপ্রসূত। কিন্তু প্রবলরূপে জীবনবাদী, আনন্দ-আকাঙ্ক্ষায় জঙ্গমী। কিন্তু এক জায়গায় দাঁড়ান না আবুবকর সিদ্দিক, ‘ভূমিহীন দেশ’ বলার পর ছায়াপ্রধান আঘ্রান দুর্দান্তরূপে অতিক্রমী। একেবারে মেজাজে, প্রতীক্ষায়-পরিবর্তনে আলাদা। গল্প ইতিহাসে এর পর তাঁর স্পর্শ ‘হংসভাসীর তীর’ এবং ‘কালোকুম্ভীর’-এ। পরিষ্কার তাঁর এনিকডৌট সেটিই ভাষাকে ক্ষেপে তোলে। টেলিংও থাকে প্রস্তুত। গল্পকারের কবিকামনায় মানুষ নিছক দৃশ্যপটের বাতাবরণে থাকা নয়; তা একেবারে ভেতরের দুর্দান্ত, অনিরুদ্ধ-অনিমেষ বাস্তবতায় ইঙ্গিতবহ মাত্রা অর্জন করে। ফলে তার তাপানল নির্ধারিত থাকে- তির্যক ব্যঙ্গ, শ্লেষ, রঙ্গ কিংবা পরিহাসপ্রিয়তায়। আবুবকর সিদ্দিকের এ শুদ্ধ ও শালীন প্রবণতা সমাজ উপযোগিতা, পেশা ও উৎপাদন-সম্পর্কের নিরিখে। তাঁর মনস্তত্ত্ব রূপায়ণের পরিপ্রেক্ষিত সামগ্রিকতায়; উচ্চারণে দূরসঞ্চারী। তাঁর ভূমিহীন দেশ (১৯৮৫), মরে বাঁচার স্বাধীনতা (১৯৮৭), চরবিনাশকাল (১৯৮৭), কুয়ো থেকে বেরিয়ে (১৯৯৪), ছায়াপ্রধান আঘ্রান (২০০০), কান্নাদাসী (২০০৬), বামাবর্ত (২০০৭), মুক্তিলাল অভ্যুদয় (মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প) (২০০৮), কালোকুম্ভীর (২০০৮), হংসভাসীর তীরে (২০০৮), শ্রেষ্ঠ গল্প (২০০৭), গল্পসমগ্র ১ম খণ্ড (২০০৮)।
আল মাহমুদ (জ. ১৯৩৬)-এর প্রথম ছোটগল্প সংকলন পানকৌড়ির রক্ত (১৯৭৫)। ব্যক্তির ভেতরে প্রতীকী গল্পবয়ান, অসম্ভব মায়াবী এ গল্প। এরপর সৌরভের কাছে পরাজিত (১৯৮২), গন্ধবণিক (১৯৮৮), প্রেমের গল্প (১৯৯১), ময়ূরীর মুখ (১৯৯৪), নদীর সতীন(২০০৪), ছোট-বড় (২০০৫), চারপাতার প্রেম (২০০৯) প্রকাশিত হয়। এছাড়া আল মাহমুদের গল্প (১৯৯১) এবং গল্পসমগ্র (১৯৯৭), শ্রেষ্ঠ গল্প (২০০৩), বড়গল্প সমগ্র (২০০৩), প্রেমের গল্প (২০১৫) বেরিয়েছে। আমাদের জীবন ও সংস্কৃতির বিচিত্র রূপ যেমন অবলোকন করা যায় তাঁর গল্পে তেমনি অন্তঃস্রোতের বাস্তবতাও চিহ্নিত হয় সম্ভাব্য প্ররোচনায়। আল মাহমুদ পার্বত্য অঞ্চলের অভিজ্ঞতাকেও গল্পে বুনেছেন। “উত্তর পাহাড়ের ঝরনা” এরকম একটি গল্প। ‘আজ আমাদের বীজ বোনার রাত্রি। আজ থেকে পাহাড় পুড়িয়ে জুম বুনবো আমরা। তুমি বুনবে আমার শরীরে সন্তানের বীজ’ আমাদের গল্পসাহিত্যে আল মাহমুদ এভাবেই জীবনের বীজ বুনে চলেন। তাঁর ভাষা কাব্যিক, যৌনতাআশ্রিত, প্রেমপ্লাবিত। কবির ধারাভাষ্য যেন এক ধরনের সংকট ও শৃঙ্খলার পুনর্নির্মিতি দেয় তাঁর এ সময়ের গল্পে। অন্তহীন যাত্রা (১৯৭৫)-য় রাহাত খানে (জ. ১৯৩৯)-র সাতটি গল্প সংকলিত হয়েছে। এ গ্রন্থের “উদ্বেল পিপাসা” গল্পে অসুস্থ স্বামীকে রেখে স্ত্রী অন্যের নিকট সমর্পিত হয়েছে। নিজের যৌবন ও সময়কে সে অস্বীকার করেতে পারেনি। আর নামগল্পে কথকের বয়ানে জীবনের বিচিত্র বিষয় বর্ণিত হয়। সে যেন অন্তহীন যাত্রারই প্রবাহ। সাধারণ মানুষের বিচিত্র বিষয় নিয়ে রাহাত খানের গল্প। তাঁর অন্য গল্প : অনিশ্চিত লোকালয় (১৩৮০), ভালো মন্দের টাকা (১৯৮১), আপেল সংবাদ (১৯৮৩) প্রভৃতি।
মাহমুদুল হক (১৯৪০-২০০৮)-এর মাত্র দুটি গল্পগ্রন্থ প্রতিদিন একটি রুমাল (১৯৯৪), নির্বাচিত গল্প। বাংলাদেশের গল্পে সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রবাদপ্রতিম গল্পকার মাহমুদুল হক। মধ্যবিত্তের জীবন তাঁর গল্পে আরাধ্য। ভিন্ন বাকপ্রতিমায় তিনি সবশুদ্ধ শিল্পঋদ্ধ। ব্যক্তিচরিত্রের বিচিত্রমুখি কাঁটাছেঁড়া আর তা সম্ভাব্যতার সমগ্রে নিয়ে যাওয়াই তাঁর শিল্পরথ। তুচ্ছ জিনিসকে বিরাটে পৌঁছান, অনিকেত স্বভাব, পারস্পরিক স্বার্থান্ধ রূপ, দ্বিধা-দোলাচলতা অপূর্ব ভাষ্য পায়। এটি আমাদের সাহিত্যে বিরল বিষয়। তবে গল্পের চেয়ে উপন্যাসের ফর্মে তিনি বেশি আগ্রহ-উদ্দীপক। নির্বাচিত গল্পের প্রতিটিই বর্ণনাভাষ্যে উজ্জ্বল। মধ্যবিত্তের আত্মমুখি, আত্মলীন চরিত্র পরিচর্যার জন্য মাহমুদুল হকের যে আয়োজন তা প্রশংসনীয় এবং স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জল। লেখকের অগ্রন্থিত গল্প বেরয় ২০১০ সালে।
বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্যের যাত্রাপথে মোক্ষম সায়কক্ষেপণে লক্ষ্যভেদী গল্পকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭)। তপ্ত শব্দগুচ্ছে উইট হিউমারের ঝাঁঝালো বাণ তুলে দেন তিনি। নিজের উদ্ভাবিত, স্বদীক্ষিত চিত্রপ্রতীকে শ্রেণিচেতনায় সোচ্চার তাঁর উদ্গত আঙ্গিক। এছাড়া তাঁর গল্পবিষয়ে ত্রিশঙ্কু মধ্যবিত্তের নষ্টস্বপ্ন কিংবা নিশিজাগর জ্যোৎস্নাপ্রলাপও উৎসবমুখরিত। ষাটের দিকে ইলিয়াস অন্তর্বৃত, সত্তরের পরে একেবারে বহির্মুখি; কারণ সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতা। রূপান্তরিত রাজনীতির তাণ্ডব। গদ্যটি এরূপেই পরিবর্তিত : ‘বাঁধের পুবদিকে চাষের জমি, মাঝে মাঝে কলাগাছ ও ভেরেণ্ডাগাছ ঘেরা ছোটো ছোটো বাড়ি। এখানে ওখানে খাবলা খাবলা করে ফসলকাটা পাটখেত।… ওপারে মথুরাপাড়া ঘেঁষে নদীর গা একেবারেই এলিয়ে দেওয়া, কিন্তু এদিকে আসতে আসতে যমুনা তার কোঁকড়া কোঁকড়া ঢেউ ঝাঁকিয়ে নিজের সীমানাকে অস্বীকার করে।’ তাঁর গল্পে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ, সামরিক শাসন, শ্রেণিশোষণ, ব্যক্তিমানুষ সংকটে উঠে আসে। ভূমি-মাটি অনুবর্তী প্রান্তিক মানুষ চিত্রিত হয় শক্তিশালী প্রকরণে। এক্ষেত্রে তাঁর শব্দবন্ধ, বাক্যবিন্যাস, আবহ নির্মাণ পরিকল্পিত, নিবিড় অভিজ্ঞতার সত্যসূত্রে গ্রথিত। ক্ষাত্র শাসন, ধর্মতন্ত্র, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা জীবনচরিতের ভেতরে গেঁথে তুলে যুক্তিতে তা অস্বীকার, অযৌক্তিক করে তোলেন। এজন্য কখনো আঞ্চলিক সংলাপ-ভাষা বা পেশা-অনুবর্তী শব্দভাষ্য নির্মাণ করে প্রকৃত বিশ্বাসী রূপটি কায়েম করেন গল্পের প্লটে। মুক্তিযুদ্ধও তাঁর গল্পে ব্যাপক মাত্রা পায়। বুর্জোয়া সমাজ কাঠামোর প্রতিক্রিয়াশীল রূপ তাঁর মধ্যবিত্ত বা বিত্তবান চরিত্রের মাঝে তটস্থ বা বিস্রস্ত থাকে। অপবিকশিত মধ্যবিত্তের অন্তর্যন্ত্রণা রাষ্ট্র-কাঠামোর অপহারী পরিবৃত্তে বন্দি। গল্পচরিত্ররা সে কাঠামোতেই ভাষা পায়। সেখানেই জীবনেই যাবতীয় সংক্ষুব্ধতা চঞ্চল হয়ে ওঠে। মঞ্জু, আতমন্নেসা, সমরজিৎ প্রভৃতি অনেক তটস্থ চরিত্র। গল্পপরিসর বিস্তৃত। অনেক সমস্যায় জর্জরিত। আঞ্চলিক ভাষার ভেতরে রচিত তাঁর চরিত্র প্রভূত মাত্রায় বিশালতা পায়; সেখানে তাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শ্রেণিচেতনায় স্পর্শকাতর। তাঁর গল্পগ্রন্থ অন্য ঘরে অন্য স্বর (১৯৭৬), দুধভাতে উৎপাত (১৯৮৫), খোঁয়ারি (১৯৮৯), দোযখের ওম্ (১৯৮৯), জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল (১৯৯৭)।
জুলফিকার মতিন (জ. ১৯৪৬)র গল্পে প্রধানত দুটো দিক নজরে আসে, এক. সমাজের ভেতরের প্রথাগত ও প্রশ্নবিদ্ধ সংস্কার-মূল্যবোধকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক শিল্পমাত্রায় তুলে ধরার প্রসঙ্গটি, দুই. শিল্পকে যুগোপযোগী জীবনের অনিবার্য সত্যের আন্তঃসম্পর্ক যাচাইয়ের ক্ষেত্র নির্ধারণে। সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই জুলফিকার মতিনের গল্প-কাহিনির উৎস তৈরি করেছে। তাঁর গল্পের নন্দনমাত্রা সমাজ প্রগতির নিশানায়। স্বার্থবুদ্ধি ও ধর্মবুদ্ধির বাইরে তাঁর দৃঢ় শিল্পশক্তি। লেখকের নন্দনভূমি নিছক নয়; সমাজের কার্যকারিতায়। সেটা প্রগতিসাপেক্ষ এবং সমস্ত অন্ধকারের, অচলায়তনের বিরুদ্ধে। তাঁর গল্পের ‘spectrum of meanings’ তৈরি হতে দেখা যায়- বিরূপ সমাজ পরিকাঠামোতে। কাহিনিতে লক্ষণীয়, মধ্যবিত্তের দুর্মতির জীবনকে নিয়ে যেন কী-সব মত্ততা, পরিহসনীয় কর্মকাণ্ড; পরিশুদ্ধ মানুষের অসহায়ত্ব আর বিবিধরূপে অবলম্বী পদক্ষেপসমূহ। বৈজ্ঞানিক অশিক্ষায়, সংস্কার-কুসংস্কারে, অনর্থের আবদ্ধে, অচলায়তনের আবর্তে, পুরুষতন্ত্রের দাপটে, পণ্যে-প্রবৃত্তিতে, প্রতিহিংসা বা প্রতিক্রিয়াশীলতায়, প্রচলিত প্রথাগত মূল্যবোধে জুলফিকার মতিন বিংশ শতাব্দীর শেষপাদের কুৎসিত; স্ববিরোধী, বৈপরীত্যে ভরা ‘ব্যক্তি’কে খুঁজে পান। এতেই পাওয়া যায় নিজের লেখার সঙ্গে লেখক-মনের স্বতশ্চাঞ্চল্য। তবে নির্দিষ্ট ও কার্যকর প্রবণতাটি অস্বীকার নয় গল্পে : ‘রক্তের মধ্যে কি যেন চুলচুল করে ওঠে। কিন্তু রাত অন্ধকার, সব ঢেকে দেয়। বিলের পানি ছরছর করে কত লাল হয়ে যায়। যেন টুকরো টুকরো প্রতিকৃতি ব্যঙ্গ করতে থাকে। এখন লোকটির অসংখ্য ক্রোধ জেগেছে। অন্ধকার ক্রমশঃ ফ্যাকাসে। প্রতিকৃতি ভাসে বিলের জলে। … অন্তিম আকাঙ্ক্ষার মৃত্যুতে সে হাঁপায়। তথাগতের বাণী ভাসে, নিজেকে চেনো, -অন্যকে জানতে পারবে।’কয়েক দশকের গল্পচর্চায় জুলফিকার মতিন সমাজ দায়বোধের অঙ্গীকারে গল্পশরীরে যুক্ত করেন সমকালকে; সমকালের রাজনীতিকে। এক্ষেত্রে তাঁর গল্পে আছে বিদ্রুপের কষাঘাত; পরিহাসপ্রিয় জীবনের বিস্ময় ব্যাকুলতা আর জীবনরসিকের মগ্ন মূল্যায়ন। তবে তাঁর কথনে জীবনের দুর্মর আকুতি থেমে থাকে না কোথাও। মুক্তিযুদ্ধ, স্মৃতি-নস্ট্যালজিয়া, প্রেম চিরকালীন সম্পর্কসূত্রের মতো গেঁথে যায় গল্পের ছত্রে ছত্রে। দুরন্ত গতিময় কাহিনিভাষ্যে জীবনের যাবতীয় বাকবিতণ্ডায় এক রকমের উত্তেজনাতেই গল্পপাঠ শেষ হয়। সুনিপুণ এ ভাষ্যকারের লেখায় প্রান্তিক মানুষের পর্বটিও অনুচ্চ নয়। জানতে হয় প্রবৃত্তির খেলায়ও তিনি অকুণ্ঠ। সমাজজীবনের অন্ধকার দিকগুলোয় আলো পড়ে তাঁর গল্পে। অনেককিছু হয়ে ওঠে রহস্যময়, প্রশ্নবিদ্ধ। তবে শেষ পর্যন্ত জীবন একটা শ্রেয়োবোধেই উচ্চকিত তাঁর ভাষ্যে। জুলফিকার মতিনের গল্পগ্রন্থ : রাখ তোমার উদ্যত বাহু (১৯৯৯), পাগল হবার রূপকথা (১৯৯৯), আকাশ বাসর (১৯৯৯), অন্যরকম (২০০০), মুক্তিযুদ্ধের গল্প (২০০১), অন্ধকারের জন্তুরা (২০০৭)।
উৎস থেকে নিরন্তর (১৯৬৯), জলবতী মেঘের বাতাস (১৯৭৫), খোল করতাল (১৯৮২), পরজন্ম (১৯৮৬), মানুষটি (১৯৯৩), নির্বাচিত গল্প (১৯৯৩), মতিজানের মেয়েরা (১৯৯৫), মুক্তিযুদ্ধের গল্প (২০০০), অনূঢ়া পূর্ণিমা (২০০৮), সখিনার চন্দ্রকলা (২০০৮), একালের পান্তাবুড়ি (২০০৮), অবেলার দিনক্ষণ (২০০৯), নারীর রূপকথা (২০০৯), নুনপান্তার জড়াজড়ি (২০১৪), মৃত্যুর নীলপদ্ম (২০১৫) সেলিনা হোসেনে(জ. ১৯৪৭)র গল্পগ্রন্থ। “উৎস থেকে নিরন্তর” গল্পে ওজুফা অন্যের সন্তানের মা হতে বাধ্য হলেও মাতৃত্ব নষ্ট করে না। নারীর অধিকার মর্যাদার জন্য তারা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সমশক্তি অর্জন করতে চায়। মুক্তিযুদ্ধের গল্প-সংকলনের “আমিনা ও মদিনার গল্পে” পাক-হানাদার বাহিনী কর্তৃক নারীধর্ষণের মর্মন্তুদ চিত্র বর্ণিত হয়েছে। কয়েক দশকের কথাকার হিসেবে সেলিনা হোসেনের গল্পে এরূপ বিষয়ই বিচিত্ররূপে প্রতিষ্ঠিত। অনেক গল্প লিখেছেন তিনি কিন্তু গদ্য তাঁর সরলভাষ্য, বাস্তবতা নয় অনেকটা চালচিত্র রকমের। নারী অধিকার, মুক্তিযুদ্ধ, গ্রাম-কিংবা শহরের মধ্যবিত্ত, প্রচ্ছন্ন রাজনীতি, আর্থনীতিক ভাবনা চিন্তা তাঁর গল্পের বিষয়। কিন্তু বাস্তবতা তাঁর গল্পে তেমন খোলে না। ‘ইনার ওয়ার্ল্ড’ তেমন আকর্ষণীয় ছায়া ফেলে না পাঠকের মনে। তবুও গল্পে স্বতন্ত্র একটা পরিসর পেয়ে যান তিনি। নিশ্চয়ই এক্ষেত্রে তাঁর ভাষাটিও আয়ত্তে। নারী ইস্যুকে কেন্দ্র করে লেখা মতিজানের মেয়েরা। এটি দশটি গল্পের সংকলন। নামগল্পের মূল চরিত্র মতিজান। নারীর জৈবিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত দৃঢ়শক্তি অর্জন করে তাঁর চরিত্ররা। “লিপিকার বিয়ে এবং অতঃপর” গল্পে নারীর ব্যক্তিত্ব ও অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। স্বাধীনচেতা ও প্রকৃত মানুষ হওয়ার সংকল্পের কথা বিবৃত হয়েছে চরিত্রের লিপিকা ভেতর দিয়ে। “আকলির স্টেশনের জীবন”, “মেয়েলোকটা”, “পারুলের মা হওয়া”, “হৃদয় ও শ্রমের সংসার” ইত্যাদি গল্পে নারীর অধিকার, আত্মবোধ ও আত্মচেতনা, লৈঙ্গিক শোষণ মুক্তি ভাষ্য শিল্পিত মাত্রা পেয়েছে। এ গ্রন্থটিতে লেখক নারীকে প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেছেন। এবং ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ ও প্রথাগত ইমেজকে করে তুলেছেন প্রশ্নবিদ্ধ। সেক্ষেত্রে লেখক একটা মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেও দৃষ্টিভঙ্গির নিরঙ্কুশ সততায় কাক্সিক্ষত চরিত্রের মানবিক দিকগুলো উন্মোচন করতে সফল হয়েছেন, সন্দেহ নেই।
সাহিত্যের সমাজ-অন্বেষী ধারায় হরিপদ দত্ত (জ. ১৯৪৭) কৃতি লেখক। উপন্যাসের মতো গল্পেও শোষক প্রতীকরূপে ‘অজগর’, ‘বাজপাখি’র আবেশ পরিলক্ষিত। বুর্জোয়া রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র এবং তার ক্রিয়াশীল দাপট নিষ্পেষণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছায়। গ্রামের বুকভরা স্বপ্ন-সংসারের গল্প শুরু হলেও ক্রমশ হরিপদ দত্তের চরিত্ররা বিপন্নতার দিকে এগুতে থাকে। এরূপে অর্থ-সংকোচ ঘটতে ঘটতে একসময় অর্থহীন-বিত্তহীন-ভূমিহীনে পরিণত হয়। সেখানে কুচক্রী হিসেবে কর্মমুখর চেয়ারম্যান মেম্বার কিংবা ভুঁইফোঁড় পুঁজিপতি। তীব্র উপমায় গল্পভাষায় ব্যঞ্জিত হয় উভয়প্রকার শোষক ও শোষিত চরিত্র। গল্প-নির্মাণে হরিপদ ব্যক্তিচরিত্রের অতীত-বর্তমানকে ভবিষ্যতের মুখোমুখি করান। ভূমিলগ্ন মানুষের ভূমিছাড়ার ইতিহাস, বিত্তহীনের প্রতিভূ হবার কাহিনি তাঁর গল্প। কিন্তু লক্ষণীয় হরিপদ গল্প ছাড়েন না। গল্পে ঘ্রাণ থাকে বহমান তাঁর ভাষায়। নামকরণেও মেলে। তবে গল্পের পুনরাবৃত্তির প্রবণতা আছে। সেটি একেবারে ভেতর কাঠামোতে- যেটা উৎরে যেতে সক্ষম হন লেখক দারুণ স্ফূর্তিময়, আবেগরঞ্জিত কার্যকর ভাষার গুণে। হরিপদ দত্তের আবেগ গল্পভূমিকে উর্বর করে তোলে- সেখানে বিজ্ঞানচেতনার উদ্দীপনাময় তৎপরতার বিপরীতে যাবতীয় কুসংস্কার-ভীতিকে জলাঞ্জলি দিতে চান লেখক। কূটাভাষ কিংবা ব্যঙ্গ দ্রুত পৌঁছায় বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধরত মানুষগুলোর বিশ্বাস ও করুণার নির্মমতার সাক্ষী হিসেবে। তাঁর গল্পগ্রন্থ সূর্যের ঘ্রাণে ফেরা (১৯৮৫), একটি পুরাতন উর্দি (১৯৮৮), কালবেলার গল্প (২০০৫), গল্প সমগ্র (২০০৫) প্রভৃতি।
গদ্যকথক হুমায়ুন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২)। শক্তিশালী গল্পকার। নন্দিত নরকে (১৯৭৩) উপন্যাস হলেও স্বাধীন দেশে তিনি ধ্বনিময়, তরঙ্গময়, আবেগ-বিহ্বলতাকে তীক্ষ্ণধী করে প্রকাশ করেন এবং জননন্দিত হন। চমৎকার একটি গল্পভাষা আমরা পেয়ে যাই তাঁর শৈলীতে। বাংলাদেশের ছোটগল্পধারায় নিশ্চিতরূপে তিনি প্রভাবিত গল্পকার। অনেক গল্প লিখেছেন, প্রধানত মধ্যবিত্তই নির্মাণ করেছেন, বিচিত্রভাবে। তবে সমাজ-ভিত্তি তেমন জোরাল নয় তাঁর গল্পে। দীর্ঘদিন লিখলেও গল্পবৃত্ত তাঁর পাল্টায়নি, বৃত্তটি পৌনঃপুনিক, একঘেয়ে- এখন অপ্রস্তুতও বলা চলে। অনেক গল্পের মধ্যে চকিত স্বর আছে কিন্তু বৈচিত্র্য নেই। বাণিজ্যিক শুধু নন হুমায়ুন, অনভিজ্ঞও বটে। কারণ, গল্পের বাস্তবতায় যে সমাজ-অনিবার্যতা উদ্বোধিত সেটা আগাগোড়াই তাঁর কাছে অধরা রয়ে গেছে। তবুও গল্পধারায় প্রভাব সৃষ্টিকারী বেশকিছু গল্প লিখলেও উপন্যাসের আদলেই তা লক্ষণীয়রূপে পর্যবসিত। কায়েস আহমেদ (১৯৪৮-১৯৯২)র প্রথম গল্পগ্রন্থ অন্ধতীরন্দাজ (১৯৭৮)। এরপর আটটি গল্প নিয়ে লাশ কাটা ঘর (১৯৮৭)। প্রতিরোধী দিন ও শঙ্কুল জীবনের চিত্রাঙ্কন তাঁর গল্প। স্মৃতিকাতরতা বা নস্ট্যালজিয়ার ম্যাটমেটে জিনিস তাঁর অপছন্দ। ‘সমাজের জোড় না লাগা বিসদৃশ্য দিকগুলোকে জাজ্বল্যমান চোখের সামনে আনা’ তাঁর গল্পের কাজ। নিশ্চিতই তাঁর মেজাজ রাগী, অন্যাদের থেকে পৃথক-দৃপ্ত-ধারালো এবং প্রখর সংবেদনশীল। অন্ধ তীরন্দাজ গল্পগ্রন্থে মোট আটটি গল্প রয়েছে। এ গল্পগুলো ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে রচিত। এ দীর্ঘ সময়ের পালাবদল, বিপর্যস্ত জীবন, খুন, হত্যা, কালোবাজারি ইত্যাদি অন্ধকার জীবনের ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করেন তিনি। বাংলাদেশের ছোটগল্পের প্রকৃত পথটি তিনি চিনে নিতে পারেন- একটা সমাজমনকে আয়ত্তে এনে। উপন্যাস লিখলেও কায়েস আহমেদ গল্পেই স্বাবলম্বী এবং প্রখর জীবনদৃষ্টির প্রয়োগে পরিপূর্ণ।
শহীদুল জহির (১৯৫৩-২০০৮) অতীত-বর্তমান কিংবা বিবর্তন-আবর্তনের টানাপড়েনে ক্রমশ বিস্তৃত হয় ঘটনাপ্রবাহ; আর গল্পে যুক্ত হয় নানামুখি জটিলতা। প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিবাদ তথা রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র ব্যক্তিসর্বস্ব করে তোলে ‘আকালু-টেপি’র জীবনকে। তাদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয় সংস্কার-কুসংস্কার-বিশ্বাস-অবিশ্বাসসহ যাবতীয় আচ্ছন্নতা। তীক্ষ্ণ শ্লেষে-বিদ্রুপে পরিহাসময় হয়ে ওঠে ভূমিহীন, পরবাসী চরিত্রেরা। শহীদুল জহির চরিত্র-মনস্তত্ত্বের জটিলতার বাইরে প্রতিরোধী সমাজ-সংসার, আচার-অনিবার্যতায় এক রকমের যাদু-বাস্তবতাধর্মী প্রকরণ তৈরি করেন। গল্পশরীরে বহিরাশ্রয়ী কাহিনিতে রাষ্ট্র-কাঠামোর বিবিধ বিষয় যেমন আইন-আদালত-থানা কিংবা সমাজের প্রতিভূ-প্রতাপশালীরা শেকড়হীন-বাস্তুহীন মানুষদের যেন অদ্ভুদ নিয়তির নির্মম বৃত্তে আবদ্ধ করে- যেখানে ‘দাঁড়কাক’ বা ‘ডুমুর’, ‘ডলু নদী’ সাবলীল প্রতীক পেয়ে যায়। জীবনের যাবতীয় সুখ-স্বপ্ন-বাসনার সঙ্গে জড়িয়ে যায় অবাস্তব, অসাড় এসব প্রতীক। কিন্তু তারাই জীবনের জন্য হয়ে ওঠে অনিবার্য কখনও বিপুল মাপের ভয়ঙ্করেরও। দৃশ্যমান অবয়বে সেগুলো কখনো বিকৃত বা অসুন্দরের প্রতীকায়ন পেলেও হয়ে ওঠে সময় বাস্তবতার অনির্বাণ এক অনুপম শিল্প। সেখানে শহীদুল জহিরের ভাষা দ্যুতিময়; নির্মিত বিরাট কাহিনিভূমে বিশেষ কোনো কিছু তা ছাপিয়ে ওঠে না। হয়ে ওঠে সমাজ ও সময়ের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিচিত্র। তবে অনেক দূরসঞ্চারী তাঁর সে গল্প; ক্যানভাসে স্বচ্ছরীতির তুলির আঁচড়ে প্রান্তিক, নিম্নবর্গের মানুষ বজ্রগর্ভ ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে। কোনোকিছুই যেন শূন্যগর্ভে মিলায় না। তাঁর চরিত্ররা একই সঙ্গে বাস্তব-পরাবাস্তবের মধ্যিখানে এক অনিশ্চিত জগতে চলাফেরা করে। চরিত্ররা যেমন অনিশ্চিত তেমনি অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠে। শহীদুল জহিরের ভাষার বুননিতে বিমূর্ত স্তরটি সৃষ্টি করেন- যেখানে মানুষ ও প্রকৃতির বিমূর্ত সম্পর্ক গভীর দ্যোতনায় এক নিহিতার্থে পর্যবসিত। মানব চরিত্রের অন্তর্জগতের পরিবেশনায় ক্রমশ পূর্ণতর অধিষ্ঠিত তিনি তাঁর রচনায়। পারপার (১৯৮৫), ডুমুর খেকো মানুষ অন্যান্য গল্প (২০০০), ডলু নদী হাওয়া ও অন্যান্য গল্প (২০০৪) তাঁর গল্পগ্রন্থ।
মঞ্জু সরকার (জ. ১৯৫৩)প্রান্তিক মানুষই তাঁর গল্পে উপজীব্য। এ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গল্পকার। সমাজ দায়ে তাঁর গল্প পরিচালিত। ভাষা বাস্তবানুগ, সমাজঘনিষ্ঠ। গ্রামের মানুষের সংস্কৃতি, শোষণ-নির্যাতন, দাপট, অহংকার সবকিছু দুর্বার গতিতে শিল্পভাষ্য দান করেন মঞ্জু সরকার। অবিনাশী আয়োজন (১৯৮২), মৃত্যুবাণ (১৯৮৫), পুরাতন প্রেম ও অন্যান্য গল্প (১৯৮৬), উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা (১৯৯০), আনন্দ যাত্রা (১৯৯৫), অপারেশন জয় বাংলা (১৯৯৭), মঙ্গাকালের মানুষ গল্পগুলো একেবারে মাটিবর্তী। উপর-কাঠামো নয়, ভেতরের স্বস্তি-হাহাকারকে দ্বান্দ্বিক বাস্তবতায় উঠে আসে। গল্পের প্রকরণ শক্তিশালী। অভিজ্ঞতা বয়ান শুধু নয়, প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মর্যাদা ও বাঁচার প্রত্যয়টি অনিবার্য করে তোলেন। এজন্য এক ধরনের সমগ্রতা পরিব্যাপ্ত তাঁর লেখায়।
সত্তরের দশকের গল্প সম্পাদনা করে সুশান্ত মজুমদার (জ. ১৯৫৪) দক্ষতারই পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর নিজের গল্পের জমিন আরও পরিপক্ব, দূরবিস্তারী। ‘দুই বছরের শুকনো বাচ্চাকে কোলে নিয়ে এই প্রথম হাড্ডিসার সকিনা ঢাকায় অক্ষম বুড়ো শ্বশুর ইউসুফ আলী আকনের পিছন ধরে হাজির। স্বামী আনছার আলী আচমকা মরার আগে শহরের কত উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদ ঢালাই করল, বাড্ডার ওদিকে এক সস্তা মেসে মাথা গুঁজে দিন কাটাল একবারও সকিনাকে ঢাকায় আনেনি … ঢাকায় থাকার চোয়াল চাপা কষ্ট, গোঁজামিল সকিনা বোঝে কেমনে!’ গল্পের এমন এক্সপ্রেশানের পর “ফাটল” গল্পের সংবাদ কী হতে পারে- অনুমান করা যায়। কিন্তু সকিনার আশ্রয়-ভরসা-ভালোবাসা-সন্তান-নিরাপত্তা-অন্নসংস্থান তাঁরই বর্ণনা-উপমায় ‘আকাশে ঘোলা নজর ভাসিয়ে বিড়বিড় করে’, ‘অভিমান গলিয়ে বিস্ময় ঢলে পড়ে’ এসবে বাংলার প্রান্তিক, কঠোর মানুষের জীবনপ্রাণই ধরা পড়ে। আর বিপরীতে পরিহাস তৈরি হয় অট্টালিকাময়, বিভেদ-বৈষম্যের ভোগবাদের সিঁড়ি বেয়ে। এমন আঙ্গিক ও বিপুল নির্মাণ সুশান্ত মজুমদারের গল্পে। অসম্ভব সমাজ-ঘনিষ্ঠ এ গল্পকারের গল্প রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও (১৯৮৪), ছেঁড়াখোঁড়া জমি (১৯৮৫), শরীরে শীত ও টেবিলে গুণ্ডাপাণ্ডা (১৯৮৮), জন্ম-সাঁতার (১৯৯৮)। এসব গল্প গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থার ক্রম-পরিবর্তনের অঙ্কিত রূপ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ গল্পকার সুশান্ত মজুমদার। কারণ গল্পধারার চেতনাগত স্বরূপে তিনি সমাজ-আরাধ্য আর ঐ বাস্তবতার কেন্দ্রে তাঁর জীবনবাদ সেখানে প্রতিষ্ঠিত।
মঈনুল আহসান সাবের (জ. ১৯৫৮)র প্রথম গল্পগ্রন্থ পরাস্ত সহিস (১৯৮২)। এরকমই (১৯৯০), ভিড়ের মানুষ (১৩৯৬), অরক্ষিত জনপদ (১৯৮৩), আগমন সংবাদ (১৯৮৪), চারদিক খোলা (১৯৮৫), স্বপ্নযাত্রা (১৯৮৪) প্রভৃতি। “হন্তারক”, “গ্রাস”, “মুখোশ”, “দুই বোন”, “প্রাকৃতিক”, “বৃত্ত”, “জীবন যাপন” এসব গল্প নিয়ে পরাস্ত সহিস রচিত। নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজ ও সময় প্রতীকীরূপে গল্পে গ্রথিত থাকে। কিন্তু টানাপড়েন, নৈতিকতা, মানবীয় প্রবৃত্তি এমন এন্তার বিষয় চরিত্রকে ঘিরে জটিলতর পরিবেশ সৃষ্টি করে। সেখানে গল্পের নির্মাণও থাকে অত্যুচ্চ মাত্রার। নাগরিক জীবনের জটিল আবর্তের মুখসমূহ যেন গল্পে কুণ্ঠাহীন পরিকীর্ণ হয়ে ওঠে। তবে একরকমের চেনাজানা জগতই অন্যমাত্রা অর্জন করে কিন্তু সেখানে থাকে গভীর মূল্যবোধ। নির্বাচিত গল্প বের হয় ১৯৯৯ সালে। নাসরিন জাহান (জ. ১৯৬৪)আশির গল্পকার। তাঁর গদ্য বর্ণনার, আবেগের, প্রতীকী প্রাচুর্যের। নারীর স্বর বা লৈঙ্গিক প্রসঙ্গ আরোপিত নয়- পূর্ণায়ত নিরপেক্ষ ভঙ্গির এক নৈর্বক্তিক গল্পকার। গল্পকৌশলে মুন্সীয়ানা আছে, বর্ণনার ভেতরে ঝাপটায় প্রকৃতির ডানা, ঘটনার ভেতর দিয়ে নির্মাণ চলে জীবনের- কখনও ব্যক্তিমানুষের। নাসরিন গল্পগুলোতে নিজেকে প্রসারিত করেন; সেখানে সমাজ-রাষ্ট্র কিংবা কোনো সংঘাতের চেয়ে বেশি থাকে মধ্যবিত্তের মাখানো সেন্টিমেন্ট বা আবেগ। গদ্যবর্ণনায়ও বরাবরই এক্ষেত্রটিই পরীক্ষা-অবতীর্ণ তাঁর নিকট। জীবনের অন্ধি-সন্ধির নানাবিধ পর্যায়ের সম্ভাবনার চিত্রটি ধরার চেষ্টা আছে তবে একেবারে গভীর কিংবা অপাপবিদ্ধ হয়ে ওঠেন না তিনি। শক্তিশালী ভাষ্য হলেও সন্দিগ্ধতায় অনভিজ্ঞতা বা গভীরতা দুর্নিরীক্ষ নয়। সেজন্য বর্ণনার পুনরাবৃত্তি আসে কখনও মনে হয় কাঠামোটি পুনর্বার পরিচালিত। তবুও অনবদ্য এ লেখক অনেক সংস্কারমুক্ত ও আধুনিক। বিশেষত প্রতীক-নির্বাচনে কিংবা পরা-বাস্তব পরিস্থিতিতে আমাদের কথাসাহিত্যে তিনি প্রজ্বল বলা চলে। তাঁর গল্পগ্রন্থ : স্থবির যৌবন (১৯৮৫), বিচূর্ণ ছায়া (১৯৮৮), সূর্য তামসী (১৯৮৯), পথ, হে পথ (১৯৮৯), সারারাত বিড়ালের শব্দ (১৯৯১), আশ্চর্য দেবশিশু (১৯৯৫), পুরুষ রাজকুমারী (১৯৯৬), সম্ভ্রম যখন অশ্লীল হয়ে ওঠে (১৯৯৭), এলেন পোর বিড়াল (২০০৬) প্রভৃতি।
৩
বিপ্রদাশ বড়ুয়া (জ. ১৯৪২)র শুরু হয়েছিল আটটি গল্পের সমন্বয়ে রচিত সাদা কফিন (১৯৮৪) নামক গল্পগ্রন্থ দিয়ে। এছাড়া যুদ্ধজয়ের গল্প (১৯৮৫), গাঙচিল (১৯৮৭), নদীর নাম গণতন্ত্র (১৯৮৭), বীরাঙ্গনার প্রেম (১৯৮৭), উল্কি একটি প্রেমের গল্প (১৯৮৮), স্বপ্নমিছিল (১৯৮৯), আকাশে প্রেমের বাদল (১৯৮৯), স্বপ্ন সমুদ্রে বনদেবীরা আছে (১৯৯০), নির্বাচিত প্রেমের গল্প (১৯৯০), আমি মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করি (১৯৯১), স্বপ্নসুন্দরী (১৯৯৪), অলৌকিক চুম্বন (১৯৯৫), আমি একটি স্বপ্ন কিনেছিলাম (১৯৯৬), ফিরে তাকাতেই দেখি বঙ্গবন্ধু (১৯৯৭) প্রভৃতি গল্পগ্রন্থে দেশ-মাটি-মানুষ আর নিসর্গ চিরায়ত ব্যঞ্জনায় চিত্রিত। পাহাড়-পর্বত আশ্রিত মানুষের জীবন এক ধরনের মুগ্ধতায় প্রতিফলিত তাঁর গল্পে। স্বপ্ন-সংগ্রামের প্রতিরূপ আছে অরণ্যানীর আড়ালে। আমাদের ছোটগল্পে তিনি অন্যধরনের লেখক। মাহবুব তালুকদার (জ. ১৯৪১) অন্তর্মুখি মধ্যবিত্ত চরিত্রের ভাষ্যকার। তাঁর গল্প সুবর্ণ জয়ন্তী। জীবনের প্রতীকীরূপ অবলম্বিত হয় তাঁর গল্পে। উপন্যাসের দক্ষতায় তিনি শিল্পসাধিত। সে প্রকরণই স্বল্প সময়খণ্ডে নির্ণীত হয় তাঁর গল্পে। বিস্মৃত চেতনা, স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন, দ্বেষ-দ্বিধা নিয়ে যে মধ্যবিত্ত আধুনিক সমাজে বিবর্ধিত তারই বিদ্যুৎচ্ছটা উদ্ভাসন তাঁর গল্প। গল্পশৈলি শক্তিশালী এবং সামর্থ্যবান। হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪) প্রথাবিরোধী সাহসী লেখক হুমাযুন আজাদের গল্পগ্রন্থ যাদুকরের মৃত্যু (১৯৯৬)। প্রতীকী এ গল্পে সমাজ-রাষ্ট্রের রূপটি তুলে ধরেন লেখক। হুমায়ুন আজাদ গল্পে খুব বেশি তাঁর শিল্পমেধাকে কাজে লাগাতে পারেননি। তবে শিল্পনন্দনের চেয়ে রাষ্ট্র-সমাজ বেশি কিংবা জরুরি হয়ে পড়ে তাঁর কথনে। ফলে চিত্রল বর্ণনাগুলো হয়ে পড়ে দুর্বল, অভিসন্ধিযুক্ত। তিনি মেধাবী, সৃজনশীল কিন্তু উপযোগিতার দ্বারা হয়ে পড়েন অসংযমী, যা তাঁর শিল্পকে করে বাধাগ্রস্ত। আতা সরকার (জ. ১৯৫২) উপন্যাস লিখলেও প্রধানত গাল্পিক। গল্প লিখেই তিনি প্রতিষ্ঠিত। তাঁর অনেক উপন্যাসই প্রায় বড়গল্পই বলা যায়। লেখকের গল্পগ্রন্থ : বিপজ্জনক খেলা সম্পর্কে রিপোর্ট, নিষিদ্ধ রাজনীতির গল্প, সুন্দর তুমি পবিত্রতম, ব্রেকহীন বাস চলছে চলছে (১৯৯৭), সাহসী মানুষের গল্প, নির্বাচিত গল্প, রে স্বপ্ন রে দুবৃত্ত। “ল্যাম্পপোস্টের শেয়াল” গল্প থেকে নিলে দেখা যায় ‘নিঝুম নিশীথ রাতে ছোট বউ চাপা গলায় গোঙিয়ে গোঙিয়ে কাঁদে। মাঝ-রাতের হিমেল বাতাস বুড়ি ছমিরনের চোখ লেগে এসেছিল। এক লহমায় ঘুমঘোর কেটে যায়। চোখ খুলতেই দপ করে লাফিয়ে ওঠে আসমান-ভরা চান-তারা। পাশ ফিরে শোয়’- এরপর ঘটনার সীমানা ধরে চলে আসে অন্য ঘটনা। যে চরিত্ররা এসে গেছে তাদের ফ্লাশব্যাক, বাঁচার সংগ্রাম, কাতরতা-প্রেম-স্বপ্ন-আশা। খুব ঋজু এক্সপ্রেশান, প্রান্তিক মানুষের ভেতরেই জীবনকে, তার সত্যকে, বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা; গল্পপ্লট যেন সেখানেই নির্মিত হয়। সরল ভাষাভঙ্গি, প্রচ্ছন্ন মেজাজ, উক্তিকে পৌঁছিয়ে দেন কাক্সিক্ষত প্রবাহে। আতা সরকার দীর্ঘদিনে গল্পচর্চায় এগিয়েছেন, কিন্তু প্রকরণ সমকাল-স্পর্শী হয়নি। স্থিরতা বা আলস্য ইদানিংকার গল্পে পরিলক্ষিত। তাঁর উত্তরণের পথটির জন্য নিরীক্ষা দরকার।
জাফর তালুকদার (জ. ১৯৫২) ‘চারদিকে এত যে মানুষের শোরগোল, কোলাহলের ঢেউ- সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই মোটেও। মেলা দেখার মতো ভিড়টা ধীরে ধীরে জনারণ্যে পরিণত হয়ে যাওয়ার পর তার ধ্যান যেন ছিন্ন হলো হঠাৎ। প্রচণ্ড নগ্ন কালীর মতো উঠে দাঁড়াল দীপ্র ভঙ্গিতে। তারপর হঠাৎ কাঠশক্ত শিশুটিকে বুকে টেনে তুলে দিশাহারার মতো ছুটে চলল সরদারবাড়ির দিকে।’ জাফর তালুকদার এমন দৃষ্টিকোণে লেখেন অন্নদাস (১৯৯০), মানুষের গন্ধ (১৯৯০), প্রেমের গল্প (১৯৯১), নির্বাচিত গল্প (২০০৪)। বাস্তবানুগ প্রকৃতিটি তাঁর ধরা পড়ে কথনপ্রয়াসে। প্রকৃতি আর বাস্তবতা পরম্পরা সৃষ্টির পর, জীবনের বাস্তবতা সেখানে নির্মম দুঃসহতায় প্রকরণে পর্যবসিত হয়। গল্পকারের কণ্ঠ প্রয়োজনমতো ধ্বনিতে আটকায়, কখনো ধীর আবার অস্থির কিংবা দ্রুত; আঞ্চলিক সংলাপে অবিকৃত প্রলাপ, দ্বান্দ্বিকতা কঠোর- সেকারণেই তা উচ্চকিত নয়, প্রচ্ছন্ন- এরকম সবমিলিয়ে জাফর তালুকদারের গল্প। সমাজবাস্তবতাই তাঁর আঙ্গিক, সেটি এ সময়ে আরও প্রখর, উত্তরণ আছে, বৈচিত্র্যও স্বাভাবিক; তবে শেষাবধি জীবনই জয়ী তাঁর গল্পে।
ইমদাদুল হক মিলন (জ. ১৯৫৫) উপন্যাস লিখেই সফল হয়েছেন। তাঁর গল্পে উপন্যাসের জীবনেরই পুনরাবৃত্তি। মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের রোম্যান্টিক প্রেম ও রোম্যান্স তাঁর লেখায় প্রতিফলিত। তাঁর ভাষায় আছে গল্পবলার ক্ষমতা। গল্পকাঠামোতে অভিজ্ঞতার প্রাচুর্য কম, সে কারণে জীবন বৈচিত্র্যময়রূপে পরিবেশিত হয় না। ইমদাদুল হক মিলনের গল্পগ্রন্থ : ভালোবাসার গল্প (১৯৭৭), নিরন্নের কাল (১৯৭৯), প্রেমের গল্প (১৯৮৩), হে প্রেম (১৯৮৩), ফুলের বাগানে সাপ (১৯৮৩), বালিকারা (১৯৮৩), আহারী (১৯৮৪), তোমাকে ভালোবাসি (১৯৮৫), নির্বাচিত প্রেমের গল্প (১৯৮৫), বাছাই গল্প (১৯৮৬), তাহারা (১৯৮৬), মর্মবেদনা (১৯৮৮), প্রেম নদী (১৯৮৮), প্রেমিক প্রেমিকা (১৯৮৮), বারো রকম মানুষ (১৯৮৮), ভালোবাসার নির্বাচিত গল্প (১৯৮৯), যদি জানতে (১৯৯০), প্রেম ভালোবাসা (১৯৯০), ভালোবাসা (১৯৯০), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯০), গোপন দুয়ার প্রভৃতি।
উপস্থাপনার রীতি এবং দ্বিধাহীন বাচনশৈলি মহীবুল আজিজ (জ. ১৯৬২)র কথনগুণ। তাঁর গল্প বিস্তৃত হয় আভ্যন্তরীণ অন্তরীণ সূক্ষ্মতর প্রবৃত্তি সম্ভাবনার সূত্রানুসন্ধানের প্রয়াস থেকে। প্রবহমান সময় বিন্যস্ত তাঁর গল্পে। আছে উইট এবং প্রতীকী পরিচর্যা। গ্রাম উন্নয়ন কমপ্লেক্স ও নবিতুনের ভাগ্যচাঁদ (১৯৮৮), দুগ্ধগঞ্জ (১৯৯৭), মৎস্যপুরাণ (২০০০), আয়নাপড়া (২০০৬) এসব গল্পের ভেতর দিয়ে স্বকালের ব্যক্তিমানুষ ও সমাজের সঙ্গতি-অসঙ্গতি সূত্রকে নির্দেশ করেন। মামুন হুসাইন (জ. ১৯৬২) চৌম্বক কিন্তু দুর্বিনীত শৈলী। মার্কেজীয় (গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ) অন্তর্বয়ন পরিলক্ষিত। ডিটেইলের ভেতরে চরিত্র সৃষ্টি করে মামুন হুসাইনের গল্প। চেতন-অভিজ্ঞতা তাঁর গল্পের পুঁজি। প্রচুর ও অনেকরকম বিষয় যেমন সংস্কার-বিশ্বাস-মূল্যবোধ-ইতিহাস-আর্থ-সমাজ বিস্তৃত ক্যানভাসে ধরা পড়ে। গল্পে আঘাত ও দ্বন্দ্ব অনেকটা নতুন-পুরনো, বিজ্ঞান-ধর্ম, শাস্ত্রাচার-আধুনিক মূল্যবোধের। বিপরীতাত্মক এসবের বাইরেও যে কূটাভাস নেই তা নয়। নানাবিধ জটিল সময়ের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী পটভূমিটির বিস্তারণ ঘটে। বর্তমান-অবর্তমান কিংবা বিবর্তমান টানাপোড়েন সমূলে সামূহিক সম্ভাবনা সম্পর্কে যেন পাঠককে আশ্বস্ত করে। তাঁর গল্প থেকে একটু উদাহরণ : ‘নীতিশ একেকজনের নাম শোনে, আর ভেতরে উদ্বাস্তু হয়- মনোরঞ্জন রায়, স্বরূপভাদুড়ি, স্বরাজ ঘোষ, অশ্বিনীকুমার, চিত্তরঞ্জন দাস, বাবুল কুমার এরা সবাই ধবংশযজ্ঞের বর্ণনা দেয় এবং শেষ্মা জড়ানো কণ্ঠে, বক্তৃতা শেষ হওয়ার আগেই উপস্থাপকের হাত জাপটে বিলাপ শুরু করে: আলমারি, জমি গাছ, বাছুর, ছাগল, সেলাইকল, সিন্দুক, বই, আলনা সব আমরা শত্রু আইনে হারিয়ে ফেলেছি; এখন যাবো কোনে, আপনারা বড় বড় লিডার, খোলাসা করে কবেন আমাদের!’ এভাবে বস্তুনিষ্ঠ সময় প্রকরণে বাধা পড়ে। মামুন ডিটেলের লেখক কিন্তু তার দৃষ্টিকোণ বহুকৌণিক ও গভীর, মানবতার সন্তপ্ত হাতে বিদ্রূপ-ব্যক্তিত্বে সমাজ-রাজনীতির প্রতিক্রিয়াশীল চারিত্র্য উন্মোচন করেন। সেজন্য তাঁর নির্মাণ অনেকান্ত, জটিল, শিকড়শুদ্ধ। সর্বসাকুল্যে আকর্ষণীয় ফর্মটি তাঁর তৈরি হয়- অনেক, বিরাটাকার জীবনাগ্রহে। প্রধানত তাঁর ভাষা স্মৃতি-নস্ট্যালজিয়ার গভীরে; কিন্তু লোকায়ত ধারণার উৎফুল এবং বিরোধ দুটোই মধ্যবিত্তসুলভ আবেগ অর্জন করে। নব্যনিরীক্ষারীতিতে নৃতাত্ত্বিক রিচ্যুয়ালের পথটি পুনরোন্মোচন করে। মামুন হুসাইনের উপস্থাপন রীতি ও বাচনশক্তি আকর্ষণীয়। কারণে বলা চলে- তাঁর পটচিত্রের উইট আর সূক্ষ্ম প্রতীকী ট্রিটমেন্ট। তাঁর গল্পগ্রন্থ : শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারী (১৯৯৫), মানুষের মৃত্যু হলে (২০০০), কয়েকজন সামান্য মানুষ (২০০৩), বালক বেলার কৌশল (২০০২), আমার জানা ছিল কিছু (২০০০), নিরুদ্দেশ প্রকল্পের প্রতিভা (২০০২), একটি স্মারকগ্রন্থের জীবনপ্রণালী (২০০৫),রাষ্ট্রযন্ত্রের খেলাধুলা(২০০৭), যুদ্ধাপরাধ ও ভূমিব্যবস্থার অস্পষ্ট বিজ্ঞাপন (২০১১), অন্ধজনের জাতককথা (২০১৪)।
পারভেজ হোসেন (জ. ১৯৬৪) সাম্প্রতিক লেখায় ব্যক্তিবাস্তবতার স্বরূপটি প্রতিষ্ঠিত। অনেকটা উচ্ছ্বাস আছে, আছে পরিবেশ বয়ানের সহিষ্ণুতা। ক্ষয়িত রক্তপুতুল (১৯৯০), বৃশ্চিকের জাল ও অন্যান্য (১৯৯৩) এসব গল্পে উপনিবেশ-উত্তর অস্তিত্ব, সংকট, মনস্তত্ত্বের একটা স্বরূপ পরিলক্ষিত। তাঁর গল্প প্রবল বাস্তবানুগ। এক ধরনের গতিও আছে। সমকালের প্রতিক্রিয়াশীল বাস্তবতায় শ্রেণিচরিত্রের রূপ অঙ্কন এবং তার বিপরীতে ক্ষয়িষ্ণু চরিত্র সৃষ্টিতে পারভেজ হোসেনের প্রকরণ সঠিক পথেই প্রবাহিত। এখন তাঁর বিকশিত রূপটির জন্য পাঠকের আকাঙ্ক্ষা।
নাজিব ওয়াদুদ (জ. ১৯৬১)-এর গল্প কাক ও কারফিউ (১৯৯৮), পরে বেরয় নষ্ট কাল অথবা হৃদয়ের অসুখ (২০০৮), কমরেড ও কিরিচ (২০১০), পদ্মাবতী কিংবা সুন্দরী মেয়েটির নাক বোঁচা (২০১১), বরেন্দ্রবাংলার গল্প (২০১২) ও সেরা পঁচিশ (২০১৭)। বিশ্বসংসার তন্ন করা লেখক কখনও নিম্ন- মধ্যবিত্ত, কখনো বিত্তহীন দরিদ্র শ্রেণিহীন কৃষককে তাঁর গল্পের প্রতিপাদ্য করেন। এতে তার অভিজ্ঞতায় মূর্ত হয়- তারই গ্রাম-মাটি ও মানুষী নদী যেখানে তিনি নির্মাণ করেন জগলু, হারেজুদ্দীনের মতো শাণিত চরিত্র। এছাড়া তার গল্পে বিচিত্র বিষয়ের বিচিত চিন্তা সংগ্রোথিত- খুন, আইন-মামলা-রাষ্ট্র, শোষক-শোষিত বিস্তর রঙে বিভাময় যেন। কখনোবা তিনি পাশ ফেরান বিজ্ঞানের বিচিত্র অনুষঙ্গে। তবে মুসলিম কৃষ্টি বা ধর্মীয় রিচ্যুয়াল তাঁর লেখায় দৈনন্দিনতার সঙ্গে তীব্রতররূপে মিশে গেছে। যে সত্যাসন্ধ লেখকের গদ্যকে করে নির্ভার ও শক্তি-শৃঙ্খলিত; প্লটের বর্ণনরীতিতে সংযুক্ত যে অভিপ্রেত সংলাপ- তা গল্পে আনে দ্রুততা ও শৈল্পক বিশ্বস্ততা। বস্তুত, গল্পধারায় অনেকটা আবু ইসহাক ও শাহেদ আলীর সমধর্মী মনে হয়। যদিও এ অনুরক্তি তাঁর স্বাতন্ত্র্যকে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন করে না।
সাদ কামালী (জ. ১৯৬২) কালের মাত্রাকে ধরতে চান গল্পে। সমাজের হাড্ডিসার মানুষকে তুলে আনেন আধুনিক প্রকরণে। সংস্কার-কুসংস্কার, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, আর্তি-ভয়, দ্বিধা-দোটানা ইত্যাকার সব বিষয় কীভাবে জীবনে গ্রাস করে; অন্তেবাসী মানুষকে পরিহাসপ্রিয় করে তোলে- তারই সংবাদ আছে তাঁর গল্পে। “আগুনের গ্রহণ” উদ্ধৃত করলে তার স্বরূপটি চেনা যায় :‘আবুল ফজল নিশ্চিত হয় আগুনই তার স্ত্রী। আগুনের মমতাময় স্পর্শে তার দৃষ্টি ঠাণ্ডা এবং হৃদয় হয় উষ্ণ। শরীর বোধ করে বিলাস বৈভব। আগুনের ছোঁয়ায় কর্ণিয়া আরও বড় হলে চতুর্পার্শ্বে রঙ টলটল করে, দৃষ্টি হয় প্রখর। সকলের ইন্দ্রিয় সে সময় দৃষ্টির স্নায়ুতে অতিরিক্ত শক্তি ও ক্ষমতার যোগান দেয়।…’ এ শৈলীতে অন্তর্জগতের সংবাদ এক রকমের নিবিড়তায় যেমন আচ্ছন্ন হয় তেমনি তৈরি করে পরিস্রুত বাস্তবতার পটচিত্র। আত্মসমীক্ষার ভেতরে একরকমের জীবনবাদকেই প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি গল্পে। অবশেষে নিঃশব্দ অন্তিমে (১৯৯২), অভিব্যক্তিবাদী গল্প (১৯৯৬), উপকথার আপেল (১৯৯৬), আগুনের গ্রহণ (২০০০) এসব গল্পে লেখকের পরিশ্রম বিসর্জিত আত্ম-অনুভূতির তাপে কিংবা মনস্তত্ত্বের বিবরণ-দক্ষতায়। নব্বুই-পরবর্তী সময়ে বাস্তববাদী এ গল্পকারের গল্পভাষা আমাদের একটু আস্বস্তই করে। লেখকের ২০১৪ তে বেরিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প। সব গল্পের সংকলনও বাজারে এসেছে। সেলিম মোরশেদ (জ. ১৯৬১) ‘প্রতিশিল্প’ গোষ্ঠীর লেখক। কাটা সাপের মুণ্ডু (১৯৯৩) গল্পের নামগল্প রচিত ভিক্ষুক হেমাঙ্গিনীর যৌনজীবন নিয়ে। পাল্টা কথার সূত্রমুখ অথবা বুনো শুয়োরের গোঁ তাঁর অন্য গল্পগ্রন্থ। অতিরিক্ত নিরীক্ষাধর্মী প্রচেষ্টা তাঁর গল্প-শিল্পের ক্ষেত্রে বড় বাধা। বাঘের ঘরে ঘোগ (২০০৮) জীবন বাস্তবতার স্বরূপে নির্মিত গল্প।
শাহাদুজ্জামান (জ. ১৯৬০) ছোট ছোট বাক্যের, অভিনব কাব্যকথায়, অন্তস্তলের সমীক্ষায় গল্প বলতে পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন শাহাদুজ্জামান। আধুনিক সময়ে গল্পভূমির বদলকে নিছক ডকুমেন্টারী বা ফিচারধর্মীতায় না নিয়ে শাহাদুজ্জামান পলায়নপর মনোবৃত্তি কিংবা জটিল পরিপার্শ্বের সংকটকে অতলস্পর্শী করে তোলেন। মনোজগতের বিচিত্র রহস্যকে সন্ধিৎসু পাঠে গড়ে তোলেন তিনি। “ইব্রাহীম বক্সের সার্কাস” গল্পটি এক্ষেত্রে উল্লেখনীয়। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থূলতাও ধরা পড়ে। কয়েকটি বিহ্বলগল্প (১৯৯৬), পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ (১৯৯৯), শাহাদুজ্জামানের গল্প, অগল্প, না গল্প সংগ্রহ, কেশের আড়ে পাহাড় তাঁর গল্পগ্রন্থ। ইমতিয়ার শামীম (জ. ১৯৬৫) রাজনীতিসচেতন, প্রখর উত্তাপতাড়িত। প্রলম্বিত তাঁর গল্প। ডিটেলের ভেতরে থাকে জীবন ও সমাজের আন্তঃপাঠ। পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল রূপ, ক্ষয়িষ্ণু ব্যক্তিসর্বস্ব চরিত্র তৈরি হয় তাঁর গল্পে। অতঃপর ক্রমশ যাবতীয় শোষণ ও প্রতিরোধের শক্তিতে পরিণত হয় তার চরিত্ররা। প্রাণ-উদ্দীপক ভাষায়, গল্পের টানে, বিদ্রূপ কিংবা রঙ্গরস বাদ যায় না। নিরাভরণ; তাই ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, বরং কাক্সিক্ষত চরিত্রের প্রবৃত্তি ও সম্ভাবনাকে অন্বেষণের কর্মে লিপ্ত হন শামীম। এক্ষেত্রে প্রথম থেকে এ পর্যন্ত তিনি সচেতন। উদাহরণে আনা যায় “অচরিতার্থ পূর্বজন্ম” এবং শেষদিকের রচনা “জলাভূমি”। ক্লেদাক্ত চরিত্র নির্মিতি পায় শহর বা গ্রাম উভয় পটভূমিতে। তাঁর প্রথম গল্পের বই শীতঘুমে একজীবন (১৯৯৬) এরপর গ্রামায়নের ইতিকথা (২০০০), কয়েকটি মৃত মুনিয়া (২০০২), মাৎসন্যায়ের বাকপ্রতিমা (২০০৫) ইত্যাদি।
মনিরা কায়েস (জ. ১৯৬১) মনিরা কায়েস পরিশ্রমী গল্পকার। তাঁর গল্পজমিনে ক্রমশ আলো-অন্ধকারের উস্কানী ও আওয়াজ নির্মিত হতে থাকে। এক পর্যায়ে মধ্যবিত্ত অসঙ্গতি ও মানুষের স্বর জমাটবদ্ধ হয়, প্রতিরোধটি কার্যকরণ সম্বন্ধ নিয়ে সামনে চলতে থাকে। সেজন্য প্লট দৃঢ়শক্তিতে দাঁড়ানোর শক্তিও অর্জন করে। দিব্যকান্তি মেলে একেবারে কিছুদূর পৌঁছার পর- কিন্তু স্মর্তব্য, সেটি সরল ছাঁচে নয়, সহজ আয়োজনে নয়; প্রচণ্ড বিদ্রূপে, কষাঘাতে; অনেকদূর পর্যন্ত সে বর্ণনা, “ঠাকুমার ঝুলি অথবা কথামনুষ্যপুরাণ”-এর আবেদ : ‘রাতে শোবার সময় হঠাৎ মাকে মনে পড়ে। অনেকদিন বাড়ি যাওয়া হয় না। বাড়ি থেকে একরকম পালিয়েই আছে সে। … সে বিড় বিড় করতে করতে কোল বালিশটা আঁকড়ে ধরে, কোনও কৈফিয়ৎ নাই, কোনও জবাবদিহিতা নাই…’ এরপর ‘ফ্যানটাসির জগত’ ছেড়ে স্পট বদল, ক্রমশ প্রবাহ বাগমারা, গোদাগাড়ী, নাচোল; সঙ্গে ঘটনার ভেতরের ঘটনা, রাজনৈতিক সামাজিক কিংবা উত্তর-উপনিবেশ আধুনিক সময়ের কতো কিছু। মাটিপুরাণ পালা (১৯৯৯), জলডাঙ্গার বায়োস্কোপ (২০০১), ধুলোমাটির জন্মসূত্র (২০০৪), কথামনুষ্যপুরাণ (২০০৭) তাঁর গল্প। হুমায়ূন মালিক (জ. ১৯৫৭) দুর্দান্তরূপে গল্পভূমিতে আবির্ভূত। জীবনের হলাহল আকণ্ঠ পানকারি এ গল্পকার মায়াবাস্তবের আত্মকথন, মৃত্যুঞ্জয়ের সপ্তম জন্ম, ক্ষয়িষ্ণু মানবের পোর্টফোলিও, ধ্রৌমযজ্ঞ (২০০৫), গোলাপ সংহিতা (২০০৬) লিখেছেন। খুব স্বল্প সময়ে নিজের শৈলীটি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন হুমায়ুন মালিক। ‘শব’, ‘রক্ত’, ‘লাশকাটাঘর’, জাদুবাস্তব, সহিংসতা যে প্রতীকেই পরিব্যাপ্ত হোক; গল্প-ট্রিটমেন্টে তা দুর্দামরূপে প্রতিষ্ঠিত। নিষ্ঠুর বাস্তববাদী গল্পকার। দীর্ঘায়ত হয়ে পড়ে তাঁর গল্প, সেখানে জাতিগত, ধর্মগত, সংখ্যালঘুগত বহুবিষয় উঠে আসে। দরিদ্র, অশিক্ষিত প্রান্তিক মানুষের সংকটও অনুপস্থিত থাকে না। একটু উদাহরণ ‘জুমাঞ্জি কোবরাকে ডেকে বলে, দেশে কি বিদেশে আমার যুক্তিপ্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে এখন বড় অন্তরায় মাত্র একটি। ওরা প্রাসাদ থেকে কেবল একটি দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বেরোয়। সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেসনোট দেয়, ফুকো পালাতে গিয়ে কোবরার গুলিতে মারা পড়েছে। যারা শোনে তারা ধন্ধে যেমন মরেছিল গোয়েবা।’ এভাবে অপ-তৎপর ক্রিয়াকাণ্ডের স্বরূপে মানুষের ট্রিটমেন্ট কী, তা বোঝাতে চান।
ওয়াসি আহমেদ (জ. ১৯৫৫) বীজমন্ত্র, তেপান্তরের সাঁকো, শিঙা বাজাবে ইসরাফিল (২০০৬)র লেখক স্বগতোক্তির ভেতর দিয়ে পৌঁছান অনেক পথ। ‘লেকসার্কাসের মাঝারি উঁচু ঘরবাড়ি, আম-নারকেল-নিমগাছের উপর দিয়ে চিলের মতো উড়ে উড়ে ঝুপ করে ধানমণ্ডির লেকে গিয়ে নামল’- এ রূপের পরিবেশ বাড়তে থাকে, গল্পের আয়োজনে আসে মগ্ন-আত্মলীন পরিবেশ, এরপর বের হয় চরিত্র সুখী যুবতী আর মোটা বেড়াল। খুব মজার তাঁর গল্প-উচ্চারণ। মধ্যবিত্ত আবেগের সঙ্গে কর্কশ বাস্তবতা। মাঝে আসে মিথ, প্রতন-বুদ্ধি, ‘ইসরাফিলের শিঙা’ এসব। কিন্তু প্রধানত নাগরিক বা প্রান্তিক মানুষের মানচিত্রই উঠে আসে তাঁর গল্পে। জটিল সময় আবর্তের গল্পকার কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর (১৯৬৩-২০১৫)। এ সময়ের বাংলাদেশে সন্ত্রাস, পুঁজির দাপট, অচল স্বাধীনতা সবকিছুতে আমাদের গ্রাম-শহর যেন নাভিশ্বাস। গল্পকার এ বাস্তবতাকে মূলস্পর্শী করে তোলেন, পরিশোধনের পথ নেই কিন্তু বাসনাগুলো তো প্রচ্ছন্ন তা ব্যবচ্ছেদ করে দেখান। মৃতের কিংবা রক্তের জগতে আপনাকে স্বাগতম (২০০৫), স্বপ্নবাজি (২০০৭) এমন দুটো গল্পগ্রন্থেই গল্প-উপভোগের সীমানাকে তিনি দিয়েছেন বাড়িয়ে। আচ্ছন্নতা আর কুসংস্কার তাড়া করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্যক্তিসর্বস্ব মানুষকে। জীবনকে স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের সঙ্গে বেধে ফেলে। এ কারণে গল্পভাষা যায় বদলে, চাঞ্চল্যময় পরিকাঠামোর জন্য নির্মাণও হয় আলাদা, ফলত পাঠযোগ্যতা অর্জন করে গল্প, পায় উত্তাপমুখরিত শিল্পকাঠামো। শাহীন আখতার (জ. ১৯৬১)শাহীন আখতারের গল্পগ্রন্থ বোনের সঙ্গে অমরলোক (২০০২)। নারীবিশ্বাসের নিজস্ব দর্শনটি তাঁর গল্পে প্রতিষ্ঠিত। এতে তিনি অনেকটা ‘উপন্যাসের জীবনী’রই সংক্ষিপ্ত রূপ ঘোষণা করেন। শিস ও অন্যান্য গল্প (২০১৩) লেখকের দশটি গল্পের গ্রন্থন। “শিস” গল্পটি নাগরিক জীবনের বিচিত্র পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষা নিয়ে চিত্রিত।
জাকির তালুকদার (জ. ১৯৬৫) স্বপ্নপুরাণ কিংবা উদ্বাস্তুপুরাণ দিয়ে যে লেখকের যাত্রা শুরু তাতে সম্ভাবনা ও আশান্বিত হওয়ার ঘটনা ছিল অনেক। কিন্তু পুনরাবৃত্তির যাঁতাকলে বা প্রচারমোহের আবর্তে ক্রমশ নিম্নগামী জাকির তালুকদার। এক সময়ের উস্কানো মিথের চিন্তাজগত কিংবা তার মিথস্ক্রিয়া আর তেমন টানে না। তবুও বিশ্বাস, অবহেলিত জনপদের বিপুল অভিজ্ঞতাকে নিয়ে তাঁর হাতে এখনও পৌরাণিক পুনর্নির্মাণের গল্প জেগে আছে। বিশ্বাসের আগুন, কন্যা ও জলকন্যা (২০০৩), চলনবিলের রূপকথা (২০০৪), মাতৃহন্তা ও অন্যান্য গল্প (২০০৭)। আহমাদ মোস্তফা কামাল (জ. ১৯৬৯) প্রত্যেক গল্পেই যেমন মেসেজ থাকে তেমনি এক প্রকার দ্বিতীয় মানুষ (১৯৯৮), আমরা অপেক্ষা করছি, অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না বলে- এসব গল্পগ্রন্থেও মেসেজ আছে। তবে শুধু মেসেজ নয় দার্শনিকতা অনেক যুক্তি পায় আহমাদ মোস্তফা কামালের গল্পে। চরিত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর মনোজগতের প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এক মনোটোনাস জগত কিংবা আবেগকাতরায় আত্মরতি পেয়ে বসে। কিন্তু কৌশলে দার্শনিক-বীক্ষায় শরীর মনের যাবতীয় সন্তাপ রচিত হতে থাকে। প্রবণতায় এ লেখক একটু আলাদা, গতানুগতিক নয়। কারণ, শেষ পেরেকে পাইয়ে দিতে চান ধ্রুপদী আস্থার স্বপ্নটি। লেখকের রাজনীতি, আর্থ-সমাজ তথৈবচ নয়- সর্বোপরি জীবনবাদই জয়ী সমস্ত ডিটেলের ভেতর দিয়ে। ‘এঁকেবেঁকে সে এ পথ থেকে ও পথে ঘুরে বেড়ায়, ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ে, কিন্তু কিছুতেই আর বাড়ি যাওয়ার পথটি খুঁজে পায় না … এক জটিল গোলকধাঁধায় প্রবেশ করেছে…।’ গল্পের সামগ্রিক আবহটি এ পথেই বিস্তৃতি- সেখানে স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা-ভোগ-বাসনা-চাতুরি সবই থাকে। এরূপে ঘনীভূত সংকট তৈরি করে দিনান্তের দৃষ্টি। গল্পকারের ভাষা সুন্দর, সংহত, বিনয়ী। কিন্তু গভীরতা থাকলেও মাঝে মাঝে অগভীর মনে হয়। দার্শনিক মনটুকু যেন গল্পশরীরের কর্মপ্রবাহে অনাস্থা আনে। গল্পের জমাটবদ্ধ রূপে সেটা একটু বাধাই বটে। হামিদ কায়সার এ সময়ের সম্ভাবনাময় গল্পকার হামিদ কায়সার। সমাজ-অভ্যন্তরের স্বীকৃতি তাঁর কলকব্জার মানুষ (১৯৯৯) ও খেলা দেখে যান বাবু (২০০৭) গল্পগ্রন্থ। প্রশান্ত মৃধা (জ. ১৯৭১) বহুপ্রজ লেখক প্রশান্ত মৃধা। তিনি নিস্পৃহ নিয়োজিত গল্পকার। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ কুহকবিভ্রম (২০০০), ১৩ ও অবশিষ্ট ছয় (২০০১), আরও দূর জন্মান্তর(২০০৪), শারদোৎসব (২০০৬), বইঠার টান (২০০৬), গল্পের খোঁজে (২০১১)। গল্পভাষার নির্মাণকৌশলে তিনি রেখেছেন স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর। এক ধরনের মাইক্রোস্কোপিক আখ্যা তাঁর গল্প; গল্পের নির্মাণপথে চরিত্রের অন্তরদেশ-সম্পর্ক-প্রবাহে ধারাবাহিক বর্ণনা থাকে- যেখানে অসহায়ত্ব, বিকারগ্রস্ততা, অবদমন, ক্লান্তি উঠে আসে। কখনও তিনি প্রান্তমুখী। সে অনুষঙ্গি ভাষাটি তাঁর নিজস্ব। জীবনের সবরকম পর্যায় ও স্পর্শ গুরুত্ববহ পর্যাবৃত্ত রচনা করে। সর্বোপরি গল্পকে ‘গল্প’ বানানো এবং বলায় তার মুন্সিয়ানা- অনপেক্ষ ও ভিন্নতর। অদিতি ফাল্গুনী (জ. ১৯৭৪) অদিতি ফাল্গুনী লেখক, অ্যকটিভিস্ট। গল্পের কৌশল সৃজনে তিনি সমাজবাদী দৃষ্টিচেতনার সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানকে চিহ্নিত করে। তাঁর ক্রম-সম্পসারণ ঘটে গল্পের বিষয়ে ও ফর্মে। শিল্পকে নিছক আনন্দের জন্য নয়, নারীর অবস্থান ও সমাজমুক্তির পরোক্ষ বার্তায় তিনি নির্মাণ করেন শিল্পগত ধারণা। ইমানুয়েলের গৃহপ্রবেশ (১৯৯৯), বানিয়ালুকা ও অন্যান্য গল্প (২০০৫), চিহ্নিত বারুদ বিনিময় (২০০৭), তিতা মিঞার জঙ্গনামা (২০০৯), অপৌরুষেয় ১৯৭১(২০১১) ও ধৃতরাষ্ট্রের বালিকারা তাঁর গল্পগ্রন্থ।
৪
বাংলাদেশের ছোটগল্পে সাম্প্রতিক সময়ে আরও অনেকেই যুক্ত হয়েছেন। তবে তাঁদের গল্পস্বর এখনও যে প্রতিষ্ঠিত- তা বলা যাবে না। আর এখানে যাদের নাম এসেছে তারাও সার্বভৌম নন (একাত্তর-পূর্ব গল্পকার ব্যতিরেকে)। অনেকেই হয়তো আড়ালে আছেন কিংবা যাদের নাম উল্লেখ আছে- তাঁরাও পূর্ণাঙ্গ নন। তবে, বাংলাদেশের ছোটগল্পের যে প্রবৃদ্ধি তার একটি রূপরেখা এখানে সংক্ষিপ্ত-আকারে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে। এ প্রবন্ধটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, কিন্তু ইঙ্গিতবাহী। পরবর্তীর্তে রচনাটিঅধিক বিস্তৃত করার সুযোগ রয়ে গেছে।