মুস্তাফা জামান আব্বাসী (৮ ডিসেম্বর ১৯৩৭) বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞদের মধ্যে একজন। পিতা আব্বাসউদ্দিনের ফেলে আসা ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, চটকা, বিচ্ছেদি, মারফতি-মুর্শিদি, দেহতত্ত্ব ও বাউল গান আপন মনে গাইতে থাকেন। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নিয়েছেন বড় বড় ওস্তাদের কাছে। গাইতে ভালোবাসেন গজল, নজরুলসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও পুরনো বাংলা গান। তাঁর গান পঞ্চাশ বছর ধরে টেশিভিশন শ্রোতারা উপভোগ করছেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন কিছুদিন। বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিটি অব মিউজিকের চেয়ারম্যান ছিলেন এগারো বছর। পঁচিশটি দেশে বাংলাদেশ সঙ্গীতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বর্তমানে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনায় নিযুক্ত। এ পর্যন্ত বই লিখেছেন ষাটটি। প্রথম ফসল : মুহাম্মদের নাম পাঠক সমাদৃত। ‘স্পষ্ট জ্যোতি আল কোরআন’ নামে কোরআনের সমসাময়িক অনুবাদ করেছেন। কাব্যগ্রস্থ : গাফিল, ভ্রমণ কাহিনী : জাপান : সূর্য উঠেছে যেখানে, অচেনা চীন চেনা আমেরিকা। রম্য রচনা : স্বপ্নরা থাকে স্বপ্নের ওধারে, গোধূলীর ছায়াপথে। সংগীত গ্রন্থ : ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, ভাটির দ্যাশের ভাটিয়ালি, প্রাণের গীত, স্বাধীনতা দিনের গান, লঘুসঙ্গীতের গোড়ার কথা, রবীন্দ্রনাথ : প্রেমের গান। উপন্যাস : হরিণাক্ষি, কালজানির ঢেউ, পুড়িব একাকী, সন্ধ্যে হয় নি এখনও। আত্মজীবনী : জীবন নদীর উজানে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : রুমির অলৌকিক বাগান, গালিবের হৃদয় ছুঁয়ে, যে নামেই ডাকি, আব্বাসউদ্দিন মানুষ ও শিল্পী, বাকি জীবনের কথা, নতুন আলো ভরাও প্রাণে, জলসা থেকে জলসা, রাসুলের পদপ্রান্তে, ইমামের শুভদৃষ্টি, ভালোবাসি আজও কালও, ক’ফোঁটা চোখের জল। স্বনামধন্য কণ্ঠশিল্পী, সমাজকর্মী ও টেলিভিশনের সফল উপস্থাপক হিসেবে সারা দেশে তাঁর পরিচিতি। রয়েছে অসংখ্য সিডি, ক্যাসেট রেকর্ড। তিনি একুশে পদক (১৯৯৫) এবং জাতীয় প্রেসক্লাব শ্রেষ্ঠ লেখক সম্মাননা (২০১০) সহ শতাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। সম্প্রতি ‘নতুন এক মাত্রা’র পক্ষ থেকে তাঁর জীবন, সঙ্গীত ও সাহিত্য নিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রাবন্ধিক ও কাঠপেন্সিল সম্পাদক
সীমান্ত আকরাম
নতুন এক মাত্রা : আপনার সঙ্গীত জীবনের শুরুটা কিভাবে?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : ছোটবেলা থেকে আমরা যে পরিবারে বেড়ে উঠেছি, সেটা ছিলো কুজবিহারের বলরামপুর গ্রাম। যেটা ছিল ভাওইয়ার গ্রাম। যেখানে একজন নামকরা সঙ্গীতজ্ঞ ছিলো। সমস্ত বাংলাদেশে যার খ্যাতি রয়েছে, তিনি আমার পিতা আব্বাসউদ্দিন। তাঁর সাথে ছিল আরো অনেক গায়ক ছিল। তখনকার বড় ওস্তাদ, যারা সবাই আমাদের বাড়িতে আসতো, গানের আসর বসত। সে পরিবেশ থেকেই আমার সঙ্গীতজীবনের শুরুটা বলা যায়।
নতুন এক মাত্রা : শৈশব জীবন তো কুজবিহারে কাটিয়েছেন। সে সময়ের কোন স্মৃতি কি মনে আছে?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : কুজবিহারের বলরামপুর আমার শৈশব। জীবনের স্বপ্নলালিত একটি সবুজ সুন্দর অধ্যায়। একটি অপরূপ গ্রাম। যে গ্রাম থেকে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা যেত হিমালয় পর্বত, কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বত শ্রেণী। সেই সবের দুরন্তপনা আমাদের মাঝে খেলা করছে, সঙ্গীত যেমনটা খেলা করছে। সেখানে আমি গ্রাম উপলব্ধি করেছি। আমাদের পূর্বপুরুদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। সে সময়ে আমি আমার বাবার গানগুলো গেয়েছি আর স্মৃতিগুলো আমার গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছি আমার আত্মজীবনী ‘জীবন নদীর উজানে’ এবং ‘আব্বাসউদ্দিন মানুষ ও শিল্পী’ গ্রন্থে। বলরামপুর গ্রামটা আব্বাসউদ্দিনের পটভূমি। জালালুদ্দিন রুমির জীবনী লিখেছেন তার ছেলে। সেখানে রয়েছে কোনিয়া গ্রামের কথা এবং তার চারিপাশের পর্বত, অরণ্য, নদী-সমুদ্রে বর্ণনায় সে জালাল উদ্দিন রুমির অববাহিকা ঠিক তেমনি আব্বাসউদ্দিনের অববাহিকা হচ্ছে এই বলরামপুর গ্রাম।
নতুন এক মাত্রা : আপনার বাবা আব্বাসউদ্দিন আহমদ এ দেশের সঙ্গীত জগতে সঙ্গীতসম্রাট ছিলেন। আপনার বাবার সাথে আপনার স্মৃতিময় দিনগুলো যদি আমাদের বলেন?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : বাবার যে প্রতিভা সে প্রতিভা ছিলো গগনস্পর্শী। এ প্রতিভা পরিমাপ করার মতো মানুষ খুব কম রয়েছে। আমার যখন উনিশ বছর তখন বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। বাবার যে শেষ বাঁশি বেজে উঠেছিলো সে স্মৃতিগুলো এখনো আমাকে তাড়িত করে। বাবার একটা রোগ হয়েছিলো মোটর নিউরন ডিজিজ; কিছুদিন আগে পদার্থবিজ্ঞানী ইস্টিফেন হকিংস এ রোগে মারা গেছেন। বাবা আমাদেরকে নিজে গান শিখিয়েছেন। আমি আর আমার বোন ফেরদৌসী যখন ক্লাসিক্যাল গানের তালিম নিতাম বাবা পাশে বসে থাকতেন, দেখতেন আমরা কতটুকু শিখেছি। তখন আমাদের ওস্তাদ ছিলেন- আব্দুল গহর খান, আমার প্রথম শিক্ষক গণেষ চক্রবর্তী, ইউসুফ খান কোরাইশী, কাদের জামিরী, নাজাকাত আলী খান, সালামত আলী খান, মুন্সি রইচ উদ্দিন। তখনকার সময়ে বাবার সাথে আরো যারা গান করেছেন তাদের মধ্যে ছিলেন- নায়েব আলী টিপু, কেশবচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বসু, আব্দুল আলীম তারপর আমরা।
নতুন এক মাত্রা : সংগীত জগতে আপনার বাবার এত খ্যাতি ও সুনাম এটা কিভাবে হলো?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : আরণ্যকের লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অরণ্য অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন। না খাওয়া মানুষের অনুভূতি, নারীর বঞ্চনা যেভাবে তুলে ধরেছেন, ঠিক একই ভাবে আব্বাসউদ্দিন উত্তরাঞ্চলের না খাওয়া মানুষের গান গেয়েছেন। তিনি মানুষের সুখ-দুঃখের কথা গানে গানে তুলে ধরেছেন। আপামর জনতা তাকেও সেভাবে গ্রহণ করেছে। আমার পিতা তো প্রথম ব্যক্তি যিনি লোকসঙ্গীতকে সাধারণ মানুষের মাঝে, শহরের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। প্রথমে কলকাতায় গ্রামোফোনের রের্কডের মাধ্যমে। পরে বিভিন্ন সভায় গায়কের ভূমিকায়।
নতুন এক মাত্রা : আপনার সঙ্গীতের বিকাশ কিভাবে হলো?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : আমরা যখন ঢাকায় চলে এলাম ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর। তখন আমার বাবা আমাদেরকে নিয়ে গেলেন ভালো ভালো ওস্তাদের কাছে। তাঁর ইচ্ছা ছিল যে, তাঁর ছেলে-মেয়ে যেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে যথেষ্ট রকমের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগটা পায়। ঢাকায় যারা বড় বড় সঙ্গীতের ওস্তাদ ছিলেন তাদের সবার কাছেই সঙ্গীত শিক্ষার সুযোগটা পেয়েছি। তাদের কাছ থেকে গানের মূল রাগ-রাগিণী, তাল-লয় শিখেছি। আব্বা যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন ১৯৫৭ সালে তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। করাচি যখন গিয়েছিলাম তখন আমার প্রথম রেকর্ড হয় গ্রামোফোন কোম্পানিতে। চারটি রেকর্ড। ‘ওমন মাঝিরে কোন ঘাটে তোর ভিড়াবি নাও’, ‘ভালোবেসে দিলি এত জ্বালা নিটোর কালারে’, ‘ও ধন মোর কালাইয়ারে’, আরেকটা হল ‘কাঠর খুঠর দোতরা’।আমার সঙ্গে দোতরা বাজিয়েছিলো কানাইলাল শীল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর জীবন ১৯৫৬ থেকেই আমি রেডিওতে তালিকাভুক্ত হই। বিটিভিতে ৪০ বছর ধরে গান করেছি।
নতুন এক মাত্রা : ফেরদৌসী রহমান তো আপনার বোন। তিনিও এদেশের একজন শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতশিল্পী। তাঁর সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : আমার বাবার স্বপ্ন ছিলো, ফেরদৌসী রহমান বাংলাদেশের এমন একজন শিল্পী হবে, যাকে সবাই স্মরণ করবে। ১৯৬৫ সালে বিশ্বিবদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাবস্থায় ক্ল্যাসিকাল মিউজিকে পাকিস্তানের সম্মানজনক প্রদক ‘প্রাইড অফ পারফরম্যান্স’ লাভ করে। সে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকেও ভূষিত হয়। সে খুবই মেধাবী ছিলো। ম্যাট্রিকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছিল এবং আইএ-ও তাই করেছে। আপনারা শুনে খুশি হবেন, সে একটা বই লিখছে। তার শিল্পী জীবনের কাহিনী, বেড়ে ওঠার কাহিনী, তার জীবনের অকথিত কথা নিয়ে। সে বইটি অচিরেই বের হবে। উর্দু গজল ও বাংলা গানে সে ছিলো শ্রেষ্ঠশিল্পী।
নতুন এক মাত্রা : এই উপমহাদেশে সংগীতে দুই কালপুরুষ নজরুল-আব্বাসউদ্দিনের যোগসূত্রতাকে কিভাবে দেখেন?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : নজরুল-আব্বাসউদ্দিন হচ্ছে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রধান দুই কালপুরুষ। প্রথম মুসলমান কবি যার কবিতা সব ধর্মের লোক পাঠ করতে বাধ্য, তাঁর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। প্রথম মুসলমান গায়ক যার গান সবার কণ্ঠে। কর্ণে দিয়া মর্মে বসেছিলো। সে হলো আব্বাসউদ্দিন। দু’জনের যখন সম্মিলন ঘটলো এবং এর কারিগর আমার বাবাকেই বলা যায়। আব্বাসউদ্দিন একদিন নজরুলকে গিয়ে বললেন, কাজীদা আপনি তো অনেক ভালো ভালো কবিতা মুসলমানদের জাগানোর জন্য লিখেছেন। কিন্তু মুসলমানদের জাগিয়ে তুলার জন্য কিছু ইসলামি গান যদি লিখতেন। তাহলে এগুলো মুসলমানরা লুফে নিবে। কাজীদা বললেন, আব্বাস আমি এগুলো পারবো না। বরং তুমি গিয়ে ভগবতী বানুকে রাজি করাও। তখন আব্বা সেখানে গিয়ে হাজির। দেখলেন, ভগবতী বানু নামে এক রসাপিত মহিলা কীর্তন আর শ্যামা সংগীত গাইতে। ভগবতী বানু, আপনাদের পূজার সময় যে অনেক গান করেন, আমাদের ঈদের সময় দু’একটা গান করা যায় না। ভগবতী বানু বললেন, তুমি তো নাছোড়বান্দা যাও কাজীদাকে গিয়ে বলো লিখে দিতে, আমি রাজি আছি। আব্বা সাথে সাথে কিছু পান-সুপারি নিয়ে কাজীদার কাছে গিয়ে দেখে কাজীদা ইন্দুকে (ইন্দুবালা) গান শিখাচ্ছেন। আব্বাকে দেখে কাজীদা বললেন, ইন্দু তুমি বাড়ি যাও, আব্বাসের সাথে আমার কাজ আছে। কাজীদা হাতে কাগজ-কলম নিয়ে খস খস করে লিখে ফেললেন, ‘ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। পরদিন লিখলেন, ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলেন নবীন সওদাগর’। গান দুটো রেকর্ড করে আব্বা চলে গেলেন বাড়ি। এক মাস পর ফিরে এসে দেখেন গ্রামে-গঞ্জে, হাট-বাজারে সবাই গুন গুন করে গাচ্ছে, ‘ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। এক গানেই মাত। গ্রামোফোনে হাজার হাজার কপি রেকর্ড হতে লাগলো। আব্বার ছবি দিয়ে হাজার হাজার পোস্টার বেরিয়েছে। এরপর প্রতি মাসে নতুন নতুন গান রেকর্ড হতে লাগলো। ‘বাজিছে ধামামা বাঁধরে আমামা শির উঁচু করি মুসলমান’, ‘তাওফিক দাও খোদা ইসলামে’, ‘আমার মোহাম্মদের নামের ধেয়ান’, ‘আল্লাহ নামের বীজ বুনেছি’, ‘নাম মোহাম্মদ বলোরে মন নাম আহম্মদ বলো’ এ রকম শত শত গান। তখন এত মুসলমান শিল্পী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। অন্যদের দিয়েও গাওয়ানো হলো। তখন দেখা যায়, গিরীশ চক্রবর্তীর নাম বদলে রাখা হলো দেলোয়ার হোসেন। নজরুল ছিলেন সবার। তিনি কোন ধর্মকে ফেলে দেন নাই। তিনি যে শ্যামা সংগীত লিখেছেন, অমুসলমানরাও তাঁর মতো করে লিখতে পারেননি। গান লেখার প্রতি তাঁর ভাব-গাম্ভীর্য ছিলো অঢেল। আমার লেখা ইংরেজিতে ‘Kazi Nazrul Islam, Man and Poet’ বইয়ে এগুলো তুলে ধরেছি। আমরা ছিলাম ঘুমন্ত জাতি, দুই শ’ বছর ঘুমিয়েছি আমরা। যখন থেকে পলাশীর প্রান্তরে আমাদের সূর্যাস্ত হলো, তখন থেকে আমরা লেখাপড়া করতাম না। আমরা হলাম চাষি মুসলমান, জেলে মুসলমান, খেটে খাওয়া মুসলমান। যখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা হলো। তিন’শ চার’শ ব্রিটিশের মধ্যে তিন চারজন মুসলমান সুযোগ পেতো। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর সেখানে প্রথমে শত শত, তারপর হাজার হাজার, তারপর লক্ষ লক্ষ গ্র্যাজুয়েট হলো। এখন সারাবিশে^ হাজার হাজার মুসলমান ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও প্রফেসর। এটা দেশ আলাদা হয়ে যাওয়ার ফল। এর মূলে ছিলেন নজরুল-আব্বাসউদ্দিন। নজরুল ও আব্বাসউদ্দিন তারা দু’জনে মিলে মুসলমানদেরকে জাগিয়ে তুলেছেন। নজরুল সম্পর্কে যে ভুল বুঝাবুঝি, এটা সম্পূর্ণভাবে অন্যদিকে তাঁকে প্রবাহিত করার প্রচেষ্টা। নজরুল-আব্বাসউদ্দিন এ দু’জন বাংলা সংস্কৃতির নির্মাতা।
নতুন এক মাত্রা : ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিটি অব মিউজিকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ফোক মিউজিক রিসার্চ গ্রুপের পরিচালক ও সংগ্রাহক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার প্রাপ্তিটা কতটুকু বা কী দিতে পেরেছেন?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিটি অব মিউজিকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি এগারো বছর। সঙ্গীতজ্ঞদের বিশ্ব অধিবেশনে একাধিকবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছি। পৃথিবীর ২৫টি দেশে আমাদের ভাটিয়ালি-বিচ্ছেদি-ভাওয়াইয়া-চটকা-নজরুলগীতি পরিবেশন করে সুনাম কুড়িয়েছি। ৫০ বছর ধরে ফোক মিউজিক রিসার্চ গ্রুপের পরিচালক ও সংগ্রাহক হিসেবে কয়েক হাজার গান সংগ্রহ করেছি। বাংলাদেশে লোকসঙ্গীতের সবচেয়ে বেশি গান সংগ্রহ আমার কাছে। এগুলোকে আমি বই আকারে করেছি। ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি-১’, ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি-২’, ‘ভাটির দ্যাশের ভাটিয়ালি’, ‘লঘু সংগীতের গোড়ার কথা’ ও ‘প্রাণের গীত’। বইগুলোতে হাজার হাজার গান আমি লিপিবদ্ধ করেছি। লোকসঙ্গীত নিয়ে অনেকেই বই লিখেছেন। ড. আশরাফ সিদ্দিকী, আশু বাবু আরো দশ বারো জন। কিন্তু সুরের দিকটা ছিলো অবহেলিত। আমি যেহেতু গানের লোক তাই কথা ও সুর দুটাকে সমন্বয় করে বইগুলো করেছি।
নতুন এক মাত্রা : আপনি তো শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। শিল্প-সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়াটা কতটুকু প্রয়োজন বলে মনে করেন?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তো বটেই, তা না হলে হবে না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিল্প-সাহিত্যের চর্চা না হলে নতুন প্রজন্মের জন্য টিকে থাকা কঠিন হবে। আজ আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে প্রাইমারি স্কুলে, সেকেন্ডারি স্কুলে গান শিখানোর ব্যবস্থা নেই। আমাদের ছেলে-মেয়েরা বিভিন্ন কম্পিটিশনে গায়, সেখানে আমি জাজ হই। কণ্ঠ, বাদ্য ও নৃত্য এ তিনটার সমন্বয়ে যেটা হয় সেটা হলো সঙ্গীত। সেখানে দেখি যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তারা ঝরে পড়ে।
নতুন এক মাত্রা : আপনি দীর্ঘদিন টেলিভিশনে কাজ করেছেন। সংগীতের বিভিন্ন ধারাকে পরিচিতি করেছেন। শিল্পী তৈরির ক্ষেত্রেও আপনার ভূমিকা অনেক। সে অভিজ্ঞতা শুনতে চাই।
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : লোকগীতি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, জারি, সারি, মারফতি নানা ধরনের লৌকিক অঙ্গের গানগুলো আমি বিভিন্ন নামে বিটিভিতে প্রায় ৪০ বছর প্রোগ্রাম করেছি। সে গানগুলোতে আমরা বাংলাদেশকে খুঁজে পেয়েছি। সে সব নদীর বাঁকে বাঁকে বাংলাদেশের নদীর টান অনুভব করেছি। ‘ভরা নদীর বাঁকে’, ‘আমার ঠিকানা’ ও‘ লৌকিক বাংলা’ ইত্যাদি নামে লোকসংগীতের প্রোগ্রাম করেছি। আমার বাবার সমবয়সী ও বাবার পরে যারা যারা ছিলেন- বেদারউদ্দীন, সোহরাব হোসেন, আব্দুল আহাদ, আব্দুল লতিফ তাদেরকে আমি উপস্থাপন করেছি। আমার পরে যারা বাংলাদেশের নামকরা শিল্পী সবাইকে আমি পরিচিতি করিয়েছি। এদের মধ্যে রথীন্দ্রনাথ রায়, নাদিরা বেগম, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, কিরণচন্দ্র রায়, আরতি ধর, আব্দুল আলী, মমতাজ বেগম, আবু বকর সিদ্দিক, ফেরদৌসী রহমান, নাশিদ কামাল। সবাইকে নিয়ে প্রোগ্রাম করার আনন্দটা আমার সৌভাগ্যের। একসময় হুমায়ূন আহমদের নাটক দেখার জন্য রাস্তাঘাটে লোকজনের চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। তখন ওরা অভিনয় করেছে- আসাদুজ্জামান নূর, রামেন্দু মজুমদার, মমতাজউদ্দীন আহমদ, ফেরদোসী মজুমদার। মোস্তফা মনোয়ার আর আবদুল্লাহ আল মামুনদের প্রযোজনায় এসব নাটক হতো। তখন আমার লোক সংগীতের অনুষ্ঠান দেখার জন্যও রাস্তায় জনশূন্য হয়ে যেত। সেটা শুধু ঢাকার রাস্তা নয়, সমস্ত বাংলাদেশে যেখানে টেলিভিশন ছিলো। সমস্ত কাজ বাদ দিয়ে তারা লোকসংগীতের নির্যাসটুকু গ্রহণ করেছে। আব্বাসউদ্দিনের লোকসংগীতে প্রবহমান আমার এ সকল অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, নদীর বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে দিয়েছি। তখন অনুষ্ঠানগুলো অনেক কষ্ট করে করতে হয়েছে। এগুলো আমি টাকার জন্য বা নামের জন্য করিনি। লোকসংগীতের ভালোবাসা থেকে প্রায় পাঁচ’শজন শিল্পীকে গান শিখিয়েছি। সেটা জীবনে একটা আনন্দময় সঞ্চয়।
নতুন এক মাত্রা : বর্তমান সময়ে লোকসংস্কৃতি বা লোকগীতি অনেকাংশেই বিলুপ্তির পথে। এর থেকে বাঁচার উপায় বা সংরক্ষণে আপনার মতামত জানতে চাই?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : লোকসংস্কৃতিহীন বাংলাদেশ অনেকখানিই মৃত। যদি লোকসংগীত বা লোকসংস্কৃতি না থাকে তাহলে মানুষের মনের মাঝে যে হাহাকার, সে হাহাকার কিভাবে বাজবে। ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া মরে গেলে আমরা সামগ্রিকভাবেই ধিকৃত হবো। আজ এই লোকসংস্কৃতির সংকট উত্তরণে সকলকে একত্রে লড়াই করে যেতে হবে। আমরা যখন ভারতে ছিলাম তখন মাড়োয়াড়িরা আমাদের সংস্কৃতি দখল করেছে, যখন পাকিস্তানে ছিলাম তখনও তাই। আমরা যদি অন্য সংস্কৃতি গ্রহণ করি তাহলে নিজেরাই নিজেদের কবর রচনা করবো।
নতুন এক মাত্রা : সাহিত্য অঙ্গনে আপনার আগ্রহটা কিভাবে?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : আমার আব্বাকে দেখে। আমার আব্বা একটা মাত্র বই লিখে গেছেন ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’। সেখানে তাঁর সংগীত জীবনকে তুলে ধরেছেন। গানগুলো তো সব রেকর্ড নেই। বইয়ে যা আছে তাই-ই থেকে যাবে। সেটা ভেবেই আমি লেখালেখিতে আগ্রহী হই।
নতুন এক মাত্রা : আপনি নজরুলকে নিয়ে উপন্যাস (পুড়িব একাকী) লিখেছেন। নজরুলকে নিয়ে উপন্যাস লেখার আগ্রহ কেন?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। ওনাকে বললাম, আপনি কি নজরুলকে নিয়ে কিছু চিন্তা করছেন? তিনি বললেন, না, এখনো কিছু চিন্তা করিনি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলাসাহিত্যে একজন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। তিনি নজরুলকে নিয়ে কোন কাজ করেননি। হুমায়ূন আহমেদ আমার বন্ধু ছিলেন। ওনিও নজরুলকে নিয়ে কোন টাচ করেননি। কথাটা আমাকে পীড়িত করে, কষ্ট দেয়। কারণ, নজরুলের জীবন ছিলো সবচেয়ে বর্ণাঢ্য, সবচেয়ে বেদনার্ত, সবচেয়ে ড্রামাটিক। কাজেই তাকে নিয়ে একটা উপন্যাস বাংলার কোন লেখকের লেখার কথা। আমার বাবা জীবদ্দশায় বলে গেছেন, তুমি যদি কিছু লিখ, তবে প্রথমে মোহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে লিখবে। সেটা আমি করেছি, মোহাম্মদ (সা.) এর জীবনী নিয়ে পাঁচ’শ পৃষ্ঠার বই ‘মোহাম্মদের নাম’। তারপর যদি কিছু লেখ সেটা লিখবে নজরুলকে নিয়ে। কারণ নজরুল ছাড়া আব্বাসউদ্দিন হয় না। সেটাও আমি করেছি নজরুলকে নিয়ে বাংলাসাহিত্যে একমাত্র উপন্যাস ‘পুড়িব একাকী’।
নতুন এক মাত্রা : আপনি এ পর্যন্ত ৫০ এর অধিক বই লিখেছেন। কিভাবে এত বই লিখেছেন। সামনে বইমেলায় কী বই আসছে?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : আমি একজন সাহিত্যিকের জীবনী পড়েছি। তিনি সেখানে লিখেছেন, যদি লেখক সারাদিন একটুও না লিখে তাহলে সে লেখক হলো না। সে প্রতিদিন লিখবে। যে প্রতিদিন লিখবে না, সে কিন্তু অভ্যাস হারিয়ে ফেলবে। তখন থেকে আমি ঠিক করলাম প্রতিদিন একটি লেখা হলেও লিখতে হবে। যে সাহিত্যিক হবে সে সার্বক্ষণিক সাহিত্যিক হবে। যে গায়ক হবে সে সার্বক্ষণিক গায়ক হবে। সামনের বইমেলায় তেমন কোনো বই আসছে না। ইবনুল আরাবী অনুবাদের একটা কাজ করছি সে জন্য খুবই ব্যস্ত। কাজটা দু’বছর লাগবে। সামনের বইমেলায় রাসূল (সা.) এর জীবনী নিয়ে একটি বই আসছে। ইতোমধ্যে রাসূল (সা.)কে নিয়ে ‘মোহাম্মদের নাম’ ও ‘রাসূল (সা.) এর পদপ্রান্তে’ নামে দুটো বই লিখেছি। তৃতীয় বইটি হবে তাদের জন্য, যারা নবীন, তরুণ প্রজন্ম, যারা রাসূল (সা.)কে জানতে চায়, শিখতে চায়। তারা ভারি ভারি বই পড়ে না। এই বইটি হবে গল্পচ্ছলে রাসূল (সা.) কে তাদের সামনে তুলে ধরা। ছোট ছোট ড্রইং স্কেচ এর সহযোগে বইটি হবে। নাম দিয়েছি ‘রাসূল (সা.) তাঁর নাম’।
নতুন এক মাত্রা : দেশে শিল্প-সাহিত্যের মূল্যায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে- এ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : আজকাল লেখকের একটা স্বাধীন লেখা, লেখক যেটাকে ভালো মনে করে, সেটা সব পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয় না। মতের মিল না হলে সেটা সেখানে স্থান পায় না। মানুষের অধিকারটা জন্মগত এটাকে বাধা দেয়া ঠিক হবে না। মানুষের লেখার অধিকার, গান গাওয়ার অধিকার সেগুলোকে বাধা দেয়া ঠিক নয়। টেলিভিশনে আব্বাসউদ্দিনকে নিয়ে বছরে একটা মাত্র প্রোগ্রাম হতো সেটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমিতে বছরে একটা অনুষ্ঠান হতো সেটাও বন্ধ। এক সময় সেখানে আমি ডিজি ছিলাম। বছরে একটা প্রোগ্রাম রেডিওতে হতো, সহ্য হলো না, সেটাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এটা কি স্বেচ্ছাচারিতা নয়? যে আব্বাসউদ্দিন সংস্কৃতির জন্য এত কিছু করে গেলেন এটা তাঁর জন্য অপমান। এটা নজরুলের জন্য অপমান। আমরা আজ স্বাধীন নই। বাঙালির রক্তে আজ বহু রক্ত এসে রঞ্জিত হয়েছে শুধু তাই নয়, নানা রকমের মত আমাদের মনকে করেছে বিষাক্ত। আমরা এক হতে পারিনি।
নতুন এক মাত্রা : আমাদের সাহিত্য-সংগীতে দেশের আপামর জনসাধারণের কথা কী প্রকাশ পাচ্ছে?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : আমাদের সাহিত্য-সংগীতে আপামর জনসাধারণের কথা অনেকটাই উপেক্ষিত। আমরা যারা শহুরে সাহিত্য রচনা করছি, তারা ঐ দিকে দৃষ্টিপাত করি না। আমাদের আগে যারা সাহিত্যিক ছিলেন যেমন- সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। তিনি তো সারা জীবন প্যারিসে ছিলেন, কিন্তু গ্রামের সমস্যা নিয়ে বই লিখেছেন। আবুল কালাম শামসুদ্দিন কাশবনের কন্যাকে নিয়ে বই লিখেছেন। জহির রায়হান সমসাময়িক জীবদ্দশা নিয়ে বই লিখেছেন। আজকে যারা নতুন লেখক তারা শহর জীবন নিয়ে আক্রান্ত। শহরের মানসিকতা, রোমান্টিকতা, তরল লাবণ্য সৌন্দর্যমণ্ডিত সাহিত্য হলেও আপামর জনতার কথা সেখানে কতটুকু ঠাঁই পাচ্ছে সেটা বিচার্য। পশ্চিম বঙ্গের সাহিত্যিকদেরকে সাধুবাদ জানাই। তারা একটা উপন্যাস অনেক বছর স্টাডি করে লেখে। আমাদের লেখকরা একটা লেখা লিখতে গিয়ে কতক্ষণ চিন্তা করে, সেটা ভাববার বিষয়। আমাদের দেশে টেলিভিশন পত্র-পত্রিকায় এত এত আয়োজন তার সাথে কয়জন সম্পৃক্ত। যারা গায়, তারাই শুনে। যারা লেখে, তারাই পড়ে।
নতুন এক মাত্রা : সংগীত ও সাহিত্য নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : আমি যেন সত্যিকারভাবে আল্লাহ যা চেয়েছেন অর্থাৎ আল্লাতে সমর্পিত হওয়া এবং রাসূল (সা.) অনুসরণ করে যাওয়া। তারপরে আরো যারা যারা আছেন যারা আল্লাহর সঙ্গে আছেন সর্বসময়ে যাদেরকে আমি সন্ধান পাই, সেগুলোর কিছু কিছু সন্ধান যেন আমার লেখার মধ্যে এবং আমার গানে মধ্য দিয়ে যেতে পারি। এটাই আমার ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
নতুন এক মাত্রা : শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় নবীনদের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
মুস্তাফা জামান আব্বাসী : আমরা যখন শিখতাম ফোর টাইমস প্র্যাকটিস করতাম। আজকালকার ছেলে-মেয়েরা সকালে একটু প্র্যাকটিস করেই শেষ। তা হবে না। সকালে বসে যাবে, দুপুরে বসে যাবে, বিকেল ও রাতে বসে যাবে তাহলে সাধনাটা ঠিকভাবে হবে। সংগীত-সাহিত্য ছেলেখেলা নয়, গভীরভাবে অধ্যয়নের বিষয়। এক-দু ঘণ্টা নয়, কমপক্ষে দশ ঘন্টা সাধনা করতে হবে। একদিন আমাকে ফিরোজা বেগম জিজ্ঞেস করলো, তুলু (আমার ডাক নাম) তুমি কতক্ষণ প্র্যাকটিস করো। আমি বললাম, দু-তিন ঘণ্টা হবে। তখনও তিনি দশ ঘন্টা প্র্যাকটিস করতেন সে সময়ে। যারা দু-একটা রেকর্ড শুনে গান গেয়ে হাত তালি পায়, বিভিন্ন যন্ত্রসহযোগে গান করে ফুর্তি পায়। নিজেকে ভাবে আমি তো লতা মঙ্গেশকর হয়ে গেলাম, তা নয়। লতা মঙ্গেশকর যখন খালি গলায় একটা গান গাইবে- ‘একবার বিদায় দাও আমায় ঘুরে আসি’। সাথে শুধু একতারা বাজছে। ঐ গলাটাই তাঁর যন্ত্র। ঠিক তেমনি আব্বাসউদ্দিন যে গানগুলো গেয়েছেন, সাথে একটা দোতরা আর একটা মন্দিরা, সেখানে আর কোন যন্ত্র ছিলো না। কণ্ঠটাই যন্ত্র। সংগীত হবে কণ্ঠের অনুগামী। আরেকটা কথা বলি, আমাদের দেশে শিল্পী-সাহিত্যিকরা আত্ম-প্রশংসায় বেশি নিমজ্জিত। আমি মনে করি, কাউকে অতিরিক্ত আত্ম-প্রশংসা মানে তাকে চপেটাঘাত করা। আমরা আত্ম-প্রশংসায় এত বেশি মগ্ন যে আমাদের পতন ঐ আত্ম-প্রশংসার মধ্যে নিহিত আছে।