
বাংলা সাহিত্য : সটীক গ্রন্থপঞ্জি সংকলক : মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিন প্রকাশক : আইবিএস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশকাল : ২০১৫ মূল্য : ২০০ টাকা
‘বাংলাসাহিত্য : সটীক গ্রন্থপঞ্জি’ একটি ব্যতিক্রমী গবেষণা। এই গ্রন্থটি সংকলনের মহতী দায়িত্ব পালন করেছেন মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিন। এই গ্রন্থ বিষয়ে বলতে গেলে আগে যে কথা বলতে হয় তাহলো, কতগুলো বই আছে যা মানুষ ট্রেনে, বাসে বসে পড়ে। আবার কখনো অবসর যাপনে আনন্দ লাভের উদ্দেশ্যে পড়ে থাকে। শুধু তাই নয়; এই সকল গ্রন্থ পাঠক তার দীর্ঘ জীবনে বারবার অধ্যয়ন করে থাকেন। তবুও গ্রন্থটির যে রস তা আস্বাদিত হয়ে নিঃশেষিত হয় না। এই শ্রেণির গ্রন্থ যদি বলি তাহলে বলতে হয়, মাইকেল মধুসূদন দত্তের সৃজিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসামান্য সৃষ্টি ‘গল্পগুচ্ছ’, কাজী নজরুল ইসলামের শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলন ‘সঞ্চিতা’ কিংবা ফররুখ আহমদের অমর কীর্তি ‘সাত সাগরের মাঝি’র কথা। এছাড়া আর এক শ্রেণির বই আছে যা সৃজনশীলতা ও মননশীলতার সমন্বয়ে রচিত। যা পাঠককে তথ্য পরিবেশনের পাশাপাশি সাহিত্যের এক অপার জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। যেমন : বুদ্ধদেব বসুর ‘কালের পুতুল’। আর এক ধরনের গ্রন্থ রয়েছে যা পাঠক পড়া তো দূরের কথা ইচ্ছা করে কিনতেও আগ্রহী হবেন না। কিন্তু তারপরও এই শ্রেণির গ্রন্থেও প্রয়োজনীয়তা থেকেই তার পাঠকপ্রিয়তার সূচনা ঘটে। এই শ্রেণির গ্রন্থ পাঠকের মনে কোন প্রকার প্রশমন বা আনন্দ সৃষ্টি তো করেই না বরং পাঠককে পাঠবিমুখ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। পাঠবিমুখতা তৈরি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকার পর এই শ্রেণির গ্রন্থ আমাদের টেবিলের কাছে থাকাটা অতীব প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। বিশেষত যারা গবেষণা করতে চান তাদের জন্য এই শ্রেণির গ্রন্থ অবশ্যই আবশ্যকীয়। মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিন সংকলিত বাংলাসাহিত্য : সটীক গ্রন্থপঞ্জি হলো এই বিভক্তির তৃতীয় শ্রেণির অন্তর্গত। কেননা পাঠক এই গ্রন্থে পাবেন শুধু তথ্যের পিরামিড। এমনকি গ্রন্থেটির নাম দেখেও অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারে এই ভেবে যে, গ্রন্থটিতে সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের প্রকাশ সালসহ তালিকা মলাটবদ্ধ করেছেন সংকলক। তাহলে মস্তবড় ভুল ধারণা মনের মধ্যে লালন করে বসবেন তা নির্দ্বধায় বলতে পারি। কারণ এই গ্রন্থটিতে সংকলিত হয়েছে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া) সমূহ থেকে যে সকল বিষয়ের উপর গবেষণা করে গবেষকগণ এম. ফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন সে সকল অভিসন্দর্ভের শিরোনাম। শিরোনামের সাথে আছে ঐ অভিসন্দর্ভের আলোচ্য বিষয়ের সারবস্তু। এই সারবস্তু পাঠের মাধ্যমে আমরা একজন পরিশ্রমী সংকলকের পরিচয় পাই এবং সংকলক হিসেবে মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিনের যে সততা, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আর এই সারবস্তু উল্লেখের জন্য সংকলককে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতেই হয়। কারণ সারবস্তুটি পাঠককে অভিসন্দর্ভটির প্রতি আগ্রহী হতে উৎসাহিত করে থাকবে।
গবেষণাকর্মটি সম্পাদনের বছরের উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কোন বিভাগের তত্ত্বাবধানে কাজটি সুস্পন্ন হয়েছে, কতটি পৃষ্ঠা রয়েছে গবেষণাকর্মটিতে, তাও পাঠকের সম্মুখে দাখিল করেছেন। আর যে বৈশিষ্ট্য এই গ্রন্থের মধ্যে পাই তাহলো, প্রতিটি অভিসন্দর্ভের অধ্যায় এবং অধ্যায়ের আলোচিত বিষয় সমূহের উপস্থাপনা।
সূচিপত্র : অবতরণিকা। প্রথমভাগ। নজরুল-জীবনী। প্রথম অধ্যায় : বাল্য ও কৈশোর। দ্বিতীয় অধ্যায় : সৈনিক। তৃতীয় অধ্যায় : সৈনিক কবি। চতুর্থ অধ্যায় : সাংবাদিক। পঞ্চম অধ্যায় : কুমিল্লা ও দৌলতপুর। ষষ্ঠ অধ্যায় : বিদ্রোহী। সপ্তম অধ্যায় : বিপ্লবী। অষ্ঠম অধ্যায় : সংসারী। নবম অধ্যায় : সাম্যবাদী। দশম অধ্যায় : বুলবুল। একাদশ অধ্যায় : মসীযুদ্ধ। দ্বাদশ অধ্যায় : প্রেমিক। ত্রয়োদশ অধ্যায় : মোহাম্মাদী বনাম সওগাত। চতুর্দশ অধ্যায় : কবি সংবর্ধনা। পঞ্চদশ অধ্যায় : সুরসাধক। ষোড়শ অধ্যায় : নিদ মহলার আঁধারপুরে।
এই গবেষণাকর্মটি দুটি ভাগে বিভক্ত। ঠিক একই ভাবে দ্বিতীয় ভাগেরও উল্লেখ করেছেন সংকলক।
বাংলা সাহিত্য : সটীক গ্রন্থপঞ্জি সংকলটি বিষয়গত দিক থেকে দুইটি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে পিএইচডি থিসিসের তালিকা এবং সর্বশেষ অধ্যায়ে এম.ফিল অভিসন্দর্ভ সমূহের তালিকা। গ্রন্থটি প্রকাশ করছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশ স্টাডিজ (আইবিএস)। এই সংকলন প্রকাশের জন্য যে ব্যক্তিটির নাম স্মরণ করা আবশ্যকীয় তিনি হলেন ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বরোচিষ সরকার। তার প্রেরণা ও উৎসাহ এমন একটি সংকলন তৈরিতে সংকলককে সাহস জুগিয়েছে। আমাদের সংকলক তাই ভুলেননি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে। তিনি ভূমিকা অংশে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। সেই অংশটি পাঠকের জন্য তুলে দিলাম : প্রথমেই ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা জানাই এ কাজের পরিকল্পক আইবিএসের অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকারকে।
এই গ্রন্থের প্রয়োজনীয় দিক আগেই কিছুটা বলেছি। তারপর আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে সকল তরুণ অনুসন্ধানী গবেষণায় নিজের মৌলিকত্বের পরিচয় দিতে চান, তারা গ্রন্থটি অবশ্যই সংগ্রহ করতে পারেন। কারণ এই সংকলিত গ্রন্থ অভিসন্দর্ভের বিষয় নির্বাচনে আপনার প্রধান সহায়ক হতে পারে।
এই সংকলিত গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৫ সালে। গ্রন্থটির বিষয়ে আরো আগে আলোচনা হলে একটুও আশ্চর্য হতাম না। কিন্তু হয়ত সমালোচকের শুভদৃষ্টির অভাবে এখন গ্রন্থটি রয়ে গেছে পাঠকের দৃষ্টির আড়ালে। তবে একটু দেরিতে হলেও এই গ্রন্থ বিষয়ে যে এই সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবেশন করতে পারছি, তা আগ্রহী পাঠকের কৌতূহল নিবারণে কিছুটা সহায়ক হবে। আর যারা গবেষণায় নিজস্বতা উপস্থাপন করতে চান তাদের সংগ্রহের তালিকার প্রথমে জায়গা করে নেবে। আর আমিও অধ্যাপক ড. স্বরোচিষ সরকারের কথা দিয়ে নিবন্ধটি শেষ করতে চাই। ‘বাংলা সাহিত্য নিয়ে ভবিষ্যতে যাঁরা গবেষণা করবেন, গ্রন্থপঞ্জিটি তাঁদের সহায়ক হবে এই প্রত্যাশা।’