চার.
ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শিবপুর গ্রামে জন্ম। পিতার নাম ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ ও মাতার নাম ওমর-উন-নেসা। প্রতিভা, পরিবেশ ও ঘরানার এক শৈল্পিক সমন্বয় ঘটেছে তার জীবনে। পাঁচ বছর বয়সে পিতার কাছে সরোদে হাতেখড়ি। সেই সঙ্গে গানের অনুশীলন করতেন। অল্প বয়সে গান গেয়ে তিনি অনেকবার স্বর্ণপদক লাভ করেন। পিতা তাকে মাইহারে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কাছে পাঠিয়ে দেন। পিতৃব্য আলাউদ্দিন খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি। সুদীর্ঘ কুড়ি বছর নিরলস সাধনার পর সরোদে দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯৫১ সালে বোম্বে যান এবং প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী শান্তি বর্ধনের ‘লিটল ব্যালে ট্রপের’ সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে চীন, ১৯৫৫ সালে রাশিয়া, ইউরোপ আর যুক্তরাজ্য সফর করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সঙ্গীত পরিবেশন করে তিনি প্রচুর প্রশংসা অর্জন করেন। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘আলী আকবর কলেজ অব মিউজিক’-এ কয়েক বছর অধ্যাপনা করেন। বিদেশে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের স্থান প্রতিষ্ঠায় প্রশংসনীয় অবদান রাখেন। তাঁর বেশ কয়েকটি লং-প্লেসহ অন্যান্য রের্কড বের হয়েছে। ১৯৬৫ সালে ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণ রেখা ছায়াছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের সম্মান লাভ করেন। ‘নতুন পাতা’ ছায়াছবির সঙ্গীত পরিচালকের জন্য বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন। এছাড়া তিনি যে সকল ছায়াছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন সেগুলো হলো : মেঘে ঢাকা তারা, ত্রি-সন্ধ্যায়, যেখানে দাঁড়িয়ে, শ্বেত ময়ূর, বাংলাদেশের পলাতক ও তিতাস একটি নদীর নাম এবং বোম্বের গরম হাওয়া। তিনি রবীন্দ্রনাথ ও যামিনী রায় এর ওপর নির্মিত প্রামাণ্য চিত্রে আবহ সঙ্গীত রচনা করেন। সঙ্গীতশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার হিসেবে গৌরবের উচ্চতম আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ১৯৮৯ সালের ৩ অক্টোবর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
মোবারক হোসেন খান
১৯৩৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম ওস্তাদ আয়েত আলী খান ও মাতার নাম ওমর-উন-নেসা খান। শৈশব কাল থেকে সঙ্গীত অনুশীলন শুরু করেন পিতার কাছে। প্রথম বেহালা পরে ক্রমান্বয়ে চন্দ্রসারং, মন্দ্রনাদ ও সুরবাহার শেখেন। ১৯৫৪ সালে তিনি তদানীন্তন রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে ‘মন্দ্রনাদ’ শিল্পী হিসেবে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এবং ১৯৫৮ সাল থেকে নিয়মিত সুরবাহার পরিবেশন শুরু করেন। তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গেও বেশ কিছুকাল জড়িত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইতিহাস শাস্ত্রে এমএ পাস করেন ও তদানীন্তন রেডিও পাকিস্তানে চাকরি নেন।
মোবারক হোসেন খান সঙ্গীত বিষয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রণেতা। তাঁর রচিত সঙ্গীতবিষয়ক গ্রন্থগুলোর মধ্যে সঙ্গীত প্রসঙ্গ, বাদ্যযন্ত্র প্রসঙ্গ, সুরের রাজা, সুরের বাউল, সুর নিয়ে যার খেলা, সুর লহরী, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও তাঁর পত্রাবলী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তিনি সাহিত্যিক হিসেবেও সুপরিচিত। তাঁর অনেকগুলো শিশুতোষ গ্রন্থ ও অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্যে ‘‘রিমির কথাবলা’’ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য এবং অনূদিত গ্রন্থের মধ্যে ক্যাপ্টেন দুহিতা, নিঃসঙ্গ, সাতনরী গপপো, আইভানভ উল্লেখযোগ্য। মোবারক হোসেন খান একাধারে একজন গীতিকার, সুরকার, যন্ত্রবাদক, সঙ্গীতগবেষক ও অনুবাদক।
সঙ্গীত-গবেষণা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘কৃতী সন্তান’ ১৯৮৪ সালে কুমিল্লা ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক ও ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্র্রীয় ‘একুশে পদক’ সম্মানে ভূষিত হন। তা ছাড়া অনুবাদক হিসেবে তিনি ১৯৮৪ সালে হুমায়ূন কবীর স্মৃতি পুরস্কার ও নজরুল পদক লাভ করেন। তিনি রেডিও বাংলাদেশের সিনিয়র পরিচালক ও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে নিয়োজিত ছিলেন।

আফজালুর রহমান
১৯৩৫ সালের ২৪ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের হালদার পাড়ায় জন্ম। পিতার নাম আবদুর রাজ্জাক। পিতা সরকারি চাকুরে ছিলেন। আফজালুর রহমানের ডাক নাম সাফু। শৈশবে টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান। অন্ধত্বের অভিশাপ মোচনের জন্যই যেন তিনি শৈশবকালে সঙ্গীতের প্রতি অনুরক্ত হন। তাঁর এই সঙ্গীতপ্রীতি প্রথম লক্ষ্য করেন তাঁর ভাগ্নে রাকিবউদ্দিন আহমেদ। বাংলাদেশের একজন প্রতিথযশা চলচ্চিত্রকার রাকিবউদ্দিন আহমেদ পেশায় প্রকৌশলী। তিনি তার বৃত্তির টাকা দিয়ে আফজালুর রহমানকে একটি বেহলা কিনে দেন এবং হেমন্ত কুমার রায়ের কাছে বেহালা শেখার ব্যবস্থা করে দেন। সে সময় থেকেই আফজালুর রহমানের সঙ্গীত সাধনার শুরু। তারপর তিনি ওস্তাদ আলউদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর ভাগ্নে ওস্তাদ ইসরাইল খানের কাছে বেহালায় তলিম নেন। সেখান থেকে তিনি ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর কাছে সঙ্গীতে তালিম নিতে কুমিল্লায় যান। তিনি গুরুর বাড়িতেই থাকতেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রথম বেহালা ও পরে সরোদ সাধনা করেন। আফজালুর রহমান রেডিও এবং টেলিভিশনের সঙ্গীত অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে থাকেন। অন্ধশিল্পী ১৯৫৭ ও ১৯৭৭ সালে তাঁর বাদনের জন্য জেলা প্রশাসক কর্তৃক পদকে ভূষিত হন। ১৯৭৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতী সন্তান রূপে সংবর্ধিত হন। কুমিল্লা ফাউন্ডেশন ও ক্রীড়া এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে তিনি নিয়মিত মাসিক ভাতা পেয়ে থাকেন। ২০০৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ওস্তাদ খুরশিদ খান
১৯৩৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাদেকপুর গ্রামে জন্ম। পিতার নাম রাশেদ আলী খান ও মাতার নাম আম্বিয়া খানম। তাঁর মা বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা। খুরশিদ খান শৈশবকাল থেকে মামার বাড়িতে মানুষ। বড় মামা ওস্তাদ আবেদ আলী খানের কাছে সেতার তালিম গ্রহণের মধ্যে দিয়ে তাঁর সঙ্গীতজীবনের শুরু। পরে মাতামহ ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর কাছে দীর্ঘদিন সঙ্গীতে তালিম নেন। তারপর মেজো মামা ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খানের কাছে কলকাতায় পাঁচ বছর সেতার শিখেন। ১৯৫৭ সালে ভারতের করিমগঞ্জে একটি সঙ্গীত শিক্ষালয় স্থাপন করে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬১ সাল থেকে রেডিওতে নিয়মিত সেতার পরিবেশন করেছেন। ১৯৬৪ সাল থেকে টেলিভিশনে সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন এবং ১৯৯২ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যালয়ের উচ্চাঙ্গ যন্ত্রসঙ্গীত শিক্ষক। তিনি আগরতলা সঙ্গীত সম্মেলন, অল-ইন্ডিয়া রেডিও সঙ্গীত সম্মেলন, পাকিস্তান সঙ্গীত সম্মেলন, আলাউদ্দিন সঙ্গীত সম্মেলন, প্রভৃতিতে অংশগ্রহণ করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। তিনি সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে চীন ও কানাডা সফর করেন। ১৯৮৪ সালের নভেম্বর মাসে একক শিল্পী হিসেবে পশ্চিম জার্মানি সফর করেন। সফরকালে তিনি বার্লিন মিউজিক স্কুল, বার্লিন কনসর্ট হল, মিউনিক, মুনস্টার ও বনে একক সেতার পরিবেশন করে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা অর্জন করেন। তিনি আমেরিকার বিভিন্ন অংগরাজ্যে সেতার পরিবেশন করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। খুরশিদ খান বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সেতার বাদক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সঙ্গীতজ্ঞ ও শিল্পী সৃষ্টির এক উর্বর ভূমি। কত যে সঙ্গীতজ্ঞ ও শিল্পী এ জেলায় জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের নাম শেষ হয়েও হয় না শেষ। ওস্তাদ আলী আহমেদ খাঁ, মহিউদ্দিন খাঁ, ইরশাদ খাঁ, অমর পাল, ওস্তাদ খুরশিদ খান, হাসান আলী খান, সুবলদাস, রাজা হোসেন খান, শেখসাদী খান, আশীষ খান, বিদ্যুৎ খান, কিরীট খান, শাহাদাত হোসেন খান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সঙ্গীত ঐতিহ্যের পাঠস্থান। এ জেলার সঙ্গীত সাধকরা যুগ যুগ ধরে এ জেলাকে করেছেন ধন্য। মর্যাদা ও খ্যাতির আসনে করেছেন প্রতিষ্ঠিত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুণ্যভূমি সঙ্গীত ঐতিহ্যের বাহন হয়ে চিরদিন পথিকৃতের ভূমিকা পালন করবে আর সঙ্গীতের সমৃদ্ধির পথ সমুজ্জ্বল করার দিকদর্শনের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সংযোজনের অবদান রেখে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
তথ্যসূত্র-
আবুল কাসেম, কুমিল্লার ইতিহাস (আদিপর্ব)।
শ্রী কৈলাসচন্দ্র সিংহ, রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস (বৃহত্তর কুমিল্লার ইতিহাস) ।
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ও মোবাশ্বের আলী সম্পাদিত কুমিল্লা জেলার ইতিহাস, প্রকাশক-জেলা পরিষদ কুমিল্লা।
শোয়েব চৌধুরী সম্পাদিত, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ইতিবৃত্ত, প্রকাশক- এডভোকেট আবদুল লতিফ, সাবেক সংসদ সদস্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।।
মুহম্মদ মুসা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিবৃত্ত, প্রকাশক- অধ্যাপক আব্দুন নুর।
মনসুর কামাল সম্পাদিত কালোত্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়া, প্রকাশক : মোহাম্মদ আরজু।
আমির হোসেন সম্পাদিত চেতনায় স্বদেশ, প্রকাশক- অধ্যাপক রফিকুল হক শামীম।
আমির হোসেন সম্পাদিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ইতিহাস, জ্ঞানজ্যোতি প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা।