গ্লাসগো যাচ্ছি বাস ৯০০ ধরে। দীর্ঘ একহারা গড়নের একতলা বাসগুলো হলুদ রঙের। প্রতি কুড়ি মিনিট অন্তর ছাড়ে, অন্তরের কাছাকাছি দুই ভ্রাতৃপ্রতিম শহর এডিনবরা ও গ্লাসগোর মাঝে সারাদিন-সারারাতই দৌড়ায় বাসগুলো। রিটার্ন টিকেটের মূল্য ১২.৫ পাউন্ড। বাসস্টেশনে একজন প্রৌঢ় আমায় বলেছিলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আজ এডিনবরায় বরফ পড়ার কথা। তখন বেলা সাড়ে দশটা, কোথায় বরফ? আবহাওয়ার পূর্বাভাস যে সর্বদাই ভুল হয়- এমন একটি বিদ্রুপাত্মক, প্রাজ্ঞ মন্তব্য তিনি ছুঁড়ে দিলেন। গ্লাসগো যাবার পথেই বরফ নামতে দেখলাম, বৃষ্টির মতো তুষারপাত হচ্ছে। বাইরে তাপমাত্রা আন্দাজ করা যায়, বাসের ভেতরটা অবশ্য মানবত্বকের জন্য আরামদায়ক।
গ্লাসগো নামলাম যখন ঘড়ির কাঁটা am ছেড়ে pm এর দিকে ঝুঁকে পড়েছে। দেড় ঘণ্টার ভ্রমণ। বরফপতন দেখতে দেখতে ক্লান্ত দু’চোখে ঘুম নেমে এসেছিলো। জেগে দেখি বাস বুকানন কোচস্টেশনে ঢুকছে। বন্ধুদের উষ্ণ গৃহ ছাড়া বিলেতে আমি আর একটি আবাসনই চিনি, সেটা হলো স্কটিশ ইয়ুথ হোস্টেল (সিহা)। গ্লাসগোতে তিনদিন থাকার জন্য আমি স্কটিশ ইয়ুথ হোস্টেলই বেছে নিয়েছি। তাদের পথনির্দেশনা অনুসরণ করে এসে পৌঁছাই সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনে। মাঝের পথটুকু তুষারপাতে ভিজে গেলাম, তবে ওভারকোট থাকায় ভেতরের আমি শুষ্ক। জীবনে অনেক বৃষ্টিতে ভিজেছি, কিন্তু তুষারে ভেজা এই প্রথম। আমার ভেতর বালকের উল্লাস! উষ্ণতালোভে গ্লাসগো রেলস্টশনে ঢুকে পড়ি। ঢুকেই চিনতে পারি স্টেশনটি, বাইশ বছর আগে মধ্য ইংল্যান্ডের শহর ইয়র্ক থেকে ট্রেনে চড়ে এই রেলস্টশনেই আমি নেমেছিলাম। এখানেই আমার বন্ধু জাহিদুল ইসলাম আমায় নিতে এসেছিল। জাহিদ তখন স্ট্রাথক্লাইড ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ পড়ছে। দীপ্তিকে নিয়ে একটি উঁচু কাউন্সিল ভবনের ওপরের দিকের একটি অ্যাপার্টমেন্টে সে থাকতো। ওদের বড় ছেলে তূর্য তখন ছোট, বৃষ্টির জন্ম হয়নি।
তুষারপাত তখনো চলছে, পুরো গ্লাসগোকে সাদা চাদরে না ঢেকে সে থামবে বলে মনে হচ্ছে না। সেন্ট্রাল রেলস্টেশনের বিপরীত ফুটপাথ থেকে ৪ নম্বর বাস ধরে উডল্যান্ড (Woodland) স্টপেজে এসে নামি। নেমে চতুর্দিকে তাকাই, কোনদিকে যাবো। কাগজে লেখা নির্দেশনা বলছে পাশের পথটিই আমার বেছে নেয়া উচিত। এরপর খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কেবলই উপরে ওঠা। পথঘাট পিচ্ছিল, তাই আমাকে সতর্কভাবে পথ চলতে হয়, এক বিশ্বস্ত কুকুরের মতো চাকা-লাগানো সুটকেসটি আমাকে অনুসরণ করে; যেন গলায় লাগানো চেন, রড ধরে তাকে আমি টেনে নিয়ে চলি।
গ্লাসগোর ইয়ুথ হোস্টলটি এডিনবরা থেকে পৃথক। এই প্রথম একটি বৃহৎ ও পুরনো, ইংলিশ বা স্কটিশ যাই বলি না কেন, বাড়িতে আমার থাকা হচ্ছে। এটি একটি বনেদি পাড়া, দ্বিতল বাড়িগুলোর বেসমেন্টে একটি পুরো ফ্লোর, সব মিলিয়ে তিনতলা বলাই সঙ্গত। চিলেকোঠা থাকলে চারতলা হতো, তবে এ বাড়িতে চিলেকোঠা নেই। বেশ বড় একটি লাউঞ্জ দেখলাম, লাল কাপড়ে মোড়ানো সোফা দিয়ে সাজানো। সিহা হোস্টেলে আমি তিনদিন থাকবো, ভাড়া লাগবে ৪২ পাউন্ড। সোয়ানসিতে বাস করা আমার চিকিৎসক বন্ধু মেসবাহ রহমান ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে আগেই তা পরিশোধ করে রেখেছে। রিসেপশন কাউন্টারে কাজ করা একজন সুদর্শন যুবক ও একজন অপরূপা যুবতী আমার নাম-ধাম রেজিস্ট্রারে তুলে সাদরে ভেতরে যাবার আহবান জানালো।
আমার রুম নম্বর হচ্ছে ১১৩। লম্বা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দোতালার কক্ষটিতে যাই। এ ধরনের সিঁড়ি পুরনো বাংলা ছবির জমিদার বা রাজগৃহে দেখা যায়। পুরোটা কার্পেটে মোড়ানো, উপরে বৃহৎ ঝাড়বাতি, একটা রাজকীয় বা জমিদারসুলভ আবহাওয়া। আমার থাকার ব্যবস্থা অবশ্য জমিদারদের খানসামার মতো, এক কক্ষে ছয়জন। তাতে কী? করিডোরে এসে দাঁড়ালেই একটা জমিদার-জমিদার বা রাজা-রাজা ভাব এসে যায়, চওড়া কাঠের সিঁড়ি বেয়ে অযথাই উঠি-নামি।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে পুরোপ্রস্থ শীতবস্ত্র গায়ে চড়িয়ে বেরুই। আমার নির্ভরতা বাস নাম্বার ১১, অর্থাৎ ঈশ্বরপ্রদত্ত পদযুগল। হাঁটতে আমি পছন্দ করি, এতে থেমে থেমে পরিপার্শ্ব, মানুষজন, ঘরবসতি দেখা যায়। সিহা হোস্টেলের রিসেপশন থেকে একটি ম্যাপ নিয়ে বেরোই। আপাতত গন্তব্য সিটি সেন্টার। সারা শহরে তেমন লোকজন দেখা না গেলেও সিটি সেন্টারে লোকের কমতি নেই। কেন্দ্রের কেন্দ্রাতিগ টানে চলে এসেছে পরিধির মানুষ। সেখানে আলোঝলোমল দোকানপাট, খাবার ও পানীয়ের আকর্ষণীয় আউটলেট (outlet)। পৃথিবীর সব বড় বড় ব্র্যান্ডের দোকান এখানে রয়েছে। একটি বৃহৎ চত্বরকে কয়েকটি সরলরেখা টেনে ভাগ করলে যা হয়, অনেকগুলো আয়তক্ষেত্র বেরিয়ে আসে, সিটি সেন্টারটি তদ্রƒপ। বিভাজন করা সরলরেখাগুলোই সড়ক, প্রত্যেকটির আবার আলাদা নাম। এখানে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ চেনা দায়, ফলে দিকভ্রান্ত হয়ে শুধু ঘুরতে হয়। অবশ্য বিভ্রান্ত করার প্রচুর উপাদান চতুর্পার্শ্বেই ঘূর্ণমান। তাদের প্রহেলিকায় নিমজ্জিত হতে হতে এসে পড়ি জর্জ স্কোয়ারে। পুরনো মিউনিসিপাল ভবনটির সম্মুখে এই চত্বরে এসে মনে পড়ে জাহিদ আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলো। পাথরের দু’টি সাদা সিংহ তেমনি পা ভাঁজ করে বসে আছে, তাদের দ্যুতিহীন চোখের সম্মুখ দিয়ে, হিং¯্র থাবাকে উপেক্ষা করে কত মানুষ চলে গেছে, ভাবি। আশ্চর্য ব্যাপার হলো সিটি সেন্টারটি সমতলে বিছানো হলেও এর ঠিক পাশেই খুব উঁচু নয়, কিন্তু যথেষ্ট খাড়া পাহাড়।
জর্জ স্কোয়ার (George Square) গ্লাসগো শহরের প্রধান নাগরিক চত্বর। ১৭৮১ সালে নির্মিত এই চত্বর ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় জর্জের নামে নামাঙ্কিত। এখানে বলশালী এক-পা বাড়ানো ঘোড়ার পিঠে রানী ভিক্টোরিয়ার তেজোদীপ্ত মূর্তি রয়েছে। রয়েছে স্কটল্যান্ডের বেশ কিছু কৃতী সন্তানের মূর্তি। এরা হলেন আবিষ্কারক জেমস ওয়াট (James Watt), রাজনীতিবিদ স্যার রবার্ট পিল (Robert Peel), কবি রবার্ট বার্নস (Robert Burns) এবং কবি ও ঔপন্যাসিক স্যার ওয়াল্টার স্কট (Sir Walter Scott)। যদিও জর্জ স্কোয়ারকে গ্লাসগো শহরের কেন্দ্র বলে মনে করা হয়, আসলে ভৌগোলিক হিসাব-নিকাশে শহরের কেন্দ্রটি এখান থেকে এক মাইল পশ্চিমে ব্লিথসউডে (Blythswood) অবস্থিত। আমি বেশ কিছু সময় এখানে কাটাই, ঘুরে ঘুরে কীর্তিমানদের মূর্তি দেখি, ভাবি মহাকালকে এরা জয় করেছে আপন প্রতিভা বা শক্তির জাদুতে। সময়প্রবাহে হারিয়ে গেছে অজস্র মানুষ, কিন্তু এঁরা দাঁড়িয়ে আছে মহাকালের বেদিতে। মৃন্ময় মানুষের চিন্ময় হবার সুযোগ হয়তো নেই, কিন্তু কেউ কেউ হিরণ্নয় প্রতিভার আগুনে শুদ্ধ করে তোলে অপরাপর মানুষকে, সে আগুনের দ্যুতি উজ্জ্বল করে তোলে সভ্যতাকে।
জর্জ স্কোয়ার পেরিয়ে বুকানন আর্ট গ্যালারির কাছে একটা ভিড় দেখে এগিয়ে যাই। দেখি ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন সাদা মানুষ, তাতে কালো মানুষদের সাথে একাত্মতা ঘোষণার বাণী উদ্ধৃত। হ্যান্ডমাইক নিয়ে বক্তৃতা করছেন একজন কালো মানুষ, শ্রোতৃমণ্ডলীতে কালোদের আধিক্য চোখে পড়লেও বেশ কিছু সাদা মানুষকেও দেখলাম। এখানে মানুষের ¯্রােতে ককেশীয়দেরই প্রবল আধিক্য, এরপরে চোখে পড়ে মঙ্গোলীয় চেহারা। নিগ্রয়েড ধারার (race) মানুষ চোখে পড়ে কদাচিৎ, ভারতীয় চেহারাও কম। মুখোমুখি হলে কালো মানুষেরা তাকায়, মিলিয়ে নেবার চেষ্টা করে, আর ভারতীয়রা চোখের দৃষ্টি (eye contact) এড়িয়ে চলে কি এক বিব্রতভাবে, অথচ উল্টোটাই হওয়া উচিত।
রাত বাড়লে (তখনো আটটা বাজেনি) এবং শীতের প্রকোপ বেড়ে গেলে হোস্টেলে ফিরে আসি। কক্ষের অন্যান্য বোর্ডাররা তখনো ফেরেনি। কিছুক্ষণ পরে লিম নামের একজন চাইনিজ (এখানেও চাইনিজ?) যুবক কক্ষটিতে প্রবেশ করে। সে কিছুক্ষণ আগে গ্লাসগো এসে পৌঁছেছে। নবনগরসন্দর্শনে সে খুব উত্তেজিত। ইংরেজিতে সে বেশ কাঁচা, আর আমি চীনা ভাষা একবর্ণও জানি না। ওর সাথে কথা বলার সময়ে দোভাষীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম।
২
কাল সারারাত তুষারপাত হয়েছে। ভোরবেলা জেগে দেখি সিহার সামনের রাস্তা, রাস্তায় পার্ক করে রাখা কয়েকটি গাড়ি, সমুখের গাছপালা, যতদূর চোখ যায় শুধু বরফ আর বরফ। সিহা হোস্টেলটি একটি অনুচ্চ পাহাড়ের উপর বসানো, এর নিচেই একটি পার্ক, নাম কেলভিনগ্রুভ। নাম শুনেই যার কথা মনে পড়েছে তিনি লর্ড কেলভিন, তাপ ও তাপপরিমাপ নিয়ে pioneering গবেষণাগুলো এঁরই, তাঁর নামেই কেলভিন স্কেল বা পরম তাপমাত্রা (Absolute Scale)। পার্কটিও তাঁর নামেই নামাঙ্কিত। পার্কের ভেতরে লর্ড কেলভিনের স্ট্যাচু রয়েছে।
পাথর নির্মিত প্রশস্ত সিঁড়ি নেমে গেছে, পুরোটা বরফে ঢাকা। অত্যন্ত পিচ্ছিল, সাবধানে পা ফেলে নামতে হলো। নেমে যে দৃশ্য দেখলাম তা এই বরফ-না-দেখা চোখে অভূতপূর্ব! পথ, মাঠ, গাছপালা, কুঞ্জবীথি, ফোয়ারা সবকিছু বরফে ঢাকা। লন্ডন যাওয়ার পথে আমি বাস থেকে বরফরাজ্য দেখেছি (ঘোড়ার পিঠ থেকে ফুল দেখার মতো) আর এখন আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ফুলের সাথেই বসবাস করছি। বিহ্বলিত হয়ে ছবি তুলি, এক তরুণ যাচ্ছিল পথ ধরে, বোঝাই যায় শিক্ষায়তনে যাচ্ছে, তাকে অনুরোধ করি ফোয়ারাটির সমুখে আমার ছবি তুলে দিতে। পার্ক থেকেই দেখা যায় গ্লাসগো ইউনিভার্সিটির গোথিক স্থাপত্যে নির্মিত প্রধান ও প্রাচীনতম ভবনটির চূড়া। তরুণটি সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কোন বিষয় নিয়ে সে পড়াশোনা করছে জানতে চাইলে তার উত্তর, অ্যারোনটিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং (Aeronautical Engineering)। শুনে আমার কেমন যে লাগে! পেশার নানাচক্রে পড়ে ছেড়ে আসা অধীত বিষয়টির প্রতি জমে থাকা অনুরাগ একবুক দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসে, তরুণকে আমার আপন মনে হয়। এর কিছু সময় পরে আরেক শিক্ষার্থীর সাথে আলাপ করে জানতে পারি সে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করছে। আমি একজন কবি ও লেখক জেনে সে খুব খুশি। বলল, ‘Wow! I am meeting a writer!’ দেখি পার্কের বিভিন্ন পথ দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদল বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাচ্ছে। পথচারীদের বাইরে যথারীতি স্বাস্থ্যউদ্ধারে আসা মানুষেরাও ছিল, কাঠামো সচেতন ছিপছিপে যুবতীরা ট্রাকস্যুট পরে দৌড়াচ্ছে, বয়স্ক মানুষেরা কুকুর নিয়ে হাঁটছে, মা-বাবা শিশুদের নিয়ে বরফের মাঠে খেলছে। একটি পার্কের ভেতরে বসন্তকালে যে দৃশ্য দেখা যায়, সে দৃশ্যই। তবে বসন্ত এলে ওই ঘুমন্ত পুষ্পদল যেমন বহুবর্ণ ও বিভায় প্রস্ফুটিত হবে, তেমনি প্রস্ফুটিত হবে মানবীর রূপ, শীতবস্ত্রগুলো ঝরে যাবে শীতের পত্রালির মতোই। হায়! তখন আমি থাকবো না।
কেলভিনগ্রুভ পার্ক থেকেই এই লালরঙের বিশাল ভবনটি দেখি, রাজপ্রাসাদের মতোই তার সৌকর্য। স্থাপত্যের টানে সেদিকে এগিয়ে যাই, কেলভিন নদীর উপরে নির্মিত পাথুরে সেতু পার হই। নদী বলা ভুল হবে, খাল, তাও সঙ্কীর্ণ, নালা বলাই বোধকরি সঙ্গত। এরা কিন্তু প্রকৃতির যেখানে যা রয়েছে তা যত্ন করে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি সেটি একটি চিত্রশালা ও জাদুঘর, নাম কেলভিনগ্রুভ আর্ট গ্যালারি অ্যান্ড মিউজিয়াম। প্রাচীন স্থাপত্য আমাকে সর্বদাই মোহিত রাখে, ভবনটির চতুর্পার্শ্ব ঘুরে, যেন সে এক অনিন্দ্য অবগুণ্ঠিত রূপসী, ছবি তুলি। ভেতরে যাওয়ার শখ হয়, কিন্তু তখন সময় নেই।
মেসবাহ আমায় বলেছিল, আমি যেন স্কটিশ এক্সিবিশন সেন্টারে যাই। সে লক্ষ্যেই ক্রমাগত পশ্চিমে ধাই, রাস্তার ঢাল বেয়ে নামি। একটা ফুটওভার ব্রিজ পাই, লালরঙের সুড়ঙ্গ, নিচে মোটরওয়ে ও রেলপথ চলে গেছে, তার শেষপ্রান্তেই স্কটিশ এক্সিবিশন সেন্টার। সে চত্বরে ঢুকে আমি মুগ্ধ। প্রথমেই চোখে পড়ে গোলাকার, একটু কাত করে বসানো স্টেডিয়ামের মতো একটি আধুনিক স্থাপত্য। এর নাম হাইড্রো (Hydro), মিউজিক কনসার্ট হল। অন্য স্থাপত্যটি সামুদ্রিক ঝিনুকের খোলের মতো, অনেকটা সিডনি অপেরা হাউজের মডেল, সেটি আর্ট সেন্টার। বন্ধ দুটোই, সন্ধ্যায় হাইড্রোতে কনসার্ট হবে, এক্সিবিশন হলে তার টিকেট বিক্রি হচ্ছে, আর এ মুহূর্তে কোনো চিত্রপ্রদর্শনী নেই। ভেতরের চিত্র কী দেখব, আমি তো বাইরের রূপেই বিমোহিত!
এগোতেই ক্লাইড (Clyde) নদীর দেখা পাই, যে নদীর কারণেই গড়ে উঠেছে গ্লাসগো, একটি ছোট্ট যাজকপল্লী থেকে আজকের বিশাল অত্যাধুনিক নগরীতে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসখ্যাত ক্লাইড নদীর তীরে অতীতে অনেক বিশাল ও বিখ্যাত জাহাজ নির্মিত হয়েছে। যেখানে এক্সিবিশন সেন্টার গড়ে উঠেছে এটি ছিল একটি ডক এরিয়া, নাম ‘কুইন্স ডক’। ওপাড়ে যেখানে বিবিসি স্কটল্যান্ড এবং আরও দু’টি নয়নাভিরাম আধুনিক স্থাপত্য নিয়ে গড়ে উঠেছে সেখানে ছিল ‘প্রিন্সেস ডক’। নদীর উপরে একটি সাদারঙের ধনুকের মতো বাঁকানো ছাদঢাকা সেতু, সেটি পেরিয়ে বিবিসি স্কটল্যান্ডের দিকে এগুই। দিনটি রৌদ্রালোকিত হলেও তাপমাত্রা শূন্যের কাছাকাছি। শীত থেকে বাঁচতে ও বিবিসি দেখার লোভে ভেতরে প্রবেশ করি। সেখানে বিভিন্ন প্রকার আসন ছড়ানো, সমুখেই একটি ছোট্ট ক্যাফে। এটি পাবলিক এরিয়া, অফিস বা স্টুডিওর ভেতরে যেতে হলে অনুমতি নিতে হবে এবং প্রবেশপত্র লাগবে। সিঁড়ি উঠে গেছে অনেকগুলো তলা পর্যন্ত; বেশ অভিনব নকশা, বিবিসি কর্মীদের ওঠা-নামা নিচ থেকেই অবলোকন করা যায়।
ক্যাফে থেকে একটা সুপ নিই, দর্শনার্থীরা এখানে বসে কিছু না কিছু খায় বা পান করে, বিশেষ করে কফি এদের প্রিয় পানীয়। একজন ভদ্রমহিলা একাই দোকানটি চালাচ্ছেন, তার কর্মদক্ষতা মুগ্ধ করার মতো। দেখি চায়ের দাম ৪৫ পেন্স। এখানে আসার পথে একটি স্ট্রিটভ্যান থেকে চা পান করেছিলাম, দাম নিয়েছিল ৮০ পেন্স। এক বৃদ্ধ দম্পতি ভ্যানের উপর বসানো স্ট্রিটশপটি চালাচ্ছিল, আমাকে কী বাঙাল ভেবে ঠকিয়েছে, নাকি ওটাই দাম? এদেশের মানুষ অবশ্য অন্যকে ঠকাতে অভ্যন্ত নয়।
বিবিসি চত্বরে দু’টি স্থাপনার একটি ডিমের মতো, সেটি একটি ৩D প্রেক্ষাগৃহ, অন্যটি প্যারাবোলার অর্ধাংশ, আয়ত চোখের মতো, সেটি বিজ্ঞান মিউজিয়াম। গ্লাসগোর মিউজিয়ামগুলোতে প্রবেশ সাধারণত ফ্রি, কিন্তু এটিতে নয়, তাও একেবারে ১০ পাউন্ড। অগত্যা বিজ্ঞানচেতনা সরিয়ে রেখে প্রকৃতিমুগ্ধতা জাগিয়ে তুলি। বিজ্ঞান জাদুঘরের কাছে সিগারেট খাচ্ছিলো তিন পুলিশ (এখানে দেখছি ধূমপায়ীর সংখ্যা কম নয়, ভবনের ভেতরে নিষেধ, তাই বাইরে খাচ্ছে)। তারা আমাকে নদীতীরবর্তী আরেকটি মিউজিয়ামের কথা বলে, ট্রান্সপোর্ট মিউজিয়াম, সেখানে প্রবেশ ফ্রি।
লন্ডনের যেমন টেমস নদী, গ্লাসগোর তেমনি ক্লাইড নদী। এডিনবরায় সমুদ্রপ্রণালী রয়েছে, কিন্তু এতটা প্রশস্ত নদী নেই। খুব কি প্রশস্ত? বাংলাদেশের অনেক খাল এর চেয়ে চওড়া। একসময় নদী ছিলো এ শহরের প্রাণ, পণ্য আনা-নেয়া ঘিরে ব্যস্ত ছিল সধৎরঃরসব জীবন। এ নদীর কূল থেকেই হাজার হাজার স্কটিশ গত শতাব্দীর প্রথম দিকে জাহাজে চেপে নতুন ভূখন্ড আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলো। কেবল একটি বছর ১৯২৮ সালেই চলে গিয়েছিলো ২৬ হাজার স্কটিশ। আমেরিকা যে আজ এত যুদ্ধংদেহী তার কারণ হতে পারে স্কটিশ ও ইংরেজ উত্তরাধিকার, কেননা আজ যতই নম্র হোক, ইতিহাস বলে যুদ্ধবাজ ইংরেজদের চেয়ে কম আগ্রাসী ছিলো না স্কটিশরা। আজ সেই নৌকাও নেই, নদীপথে বাণিজ্যও নেই, যুদ্ধের রূপও পাল্টেছে।
নদীতীর ধরে হেঁটে ট্রান্সপোর্ট মিউজিয়ামে পৌঁছাই। এর প্রকৃত নাম Riverside Museum। ভেতর ঢুকে অনেক প্রাচীন যানবাহন দেখলাম, ইতিহাস ও বিবর্তন বোঝাতে আধুনিক বাহনও সংগ্রহ করা হয়েছে। মিউজিয়ামটির বাইরে একটি ডক, তাতে একটি ঐতিহাসিক পালতোলা জাহাজ ভিড়িয়ে রাখা হয়েছে। এর নাম গ্লেনলি (Glenlee)। এক শতাব্দী পুরনো জাহাজ, প্রথমে ছিল পণ্যবাহী, বহুদিন স্পেনীয়রা এটিকে প্রশিক্ষণ জাহাজ বানিয়েছিলো, এখন এটি একটি ভাসমান জাদুঘর। তখন সূর্য পশ্চিমাকাশে, তার আভা এসে পড়েছে নদীতীরবর্তী বাড়িঘর, গির্জা, নোঙরকরা স্পিডবোট, দূরের বরফঢাকা পাহাড়ে। এক দারুণ প্রশান্তিকর পরিবেশ! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালাম আমাকে এই নান্দনিক পটভূমিতে এনে স্থাপন করার জন্য। নোঙরকরা স্পিডবোটগুলোর কাছে একটি উঁচুস্থানে প্রবল শীতকে উপেক্ষা করে বসে রইলাম দৃশ্যপটের একটি ক্ষুদ্র অংশ হয়ে, ক্ষুদ্র, কিন্তু অবলোকনের ক্ষমতাসম্পন্ন লৌকিক মানুষ।
সন্ধ্যার আগেভাগেই বিকেলের ক্রমবিলীয়মান আলোর ভিতর দিয়ে একই পথে ফিরে এলাম, তবে লাল সুড়ঙ্গে ঢুকিনি, নদীতীর ধরে যে চমৎকার হাঁটার পথ আছে, তা ধরে চলে আসি সিটি সেন্টার বরাবর। পথে আরও কয়েকটি সেতু, ওপাড়ের কাচঢাকা রেস্তোরাঁ, বাড়িঘর, এপাড়ের বিলাসবহুল হোটেল প্রভৃতি দেখি। নয়নে যতটুকু দেখা যায়, যতটুকু ভরে নেয়া যায় মগজে। ততক্ষণে আমার ক্যামেরার মেমোরি পূর্ণ (full), মোবাইলের চার্জ নিঃশেষিত।
সারাদিন তেমন কিছু পেটে পড়েনি, ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে খাবারের দোকান খুঁজি। তারা অপ্রতুলতো নয়ই, বরং সুপ্রতুল। তবে বেশিরভাগেরই খাদ্যমূল্য আমাকে কাচের বাইরে রাখে। আমার গন্তব্য হয় ভাজা মুরগি, না হয় পাউরুটির ভেতর ভাঁজ করে রাখা গো-মাংস, সঙ্গে চিকন করে কাটা আলু ভাজা আর নরোম পানীয়। তখনই দেখি ভারতীয় খাবার চিকেন টিক্কা মশলার মেন্যু, সঙ্গে নিজের পছন্দের যে কোনো ড্রিংক। পাশের ছবিটি দেখে নিশ্চিত হই কিছুটা ভাত ও কিছুটা নানরুটি রয়েছে। মূল্য ৫.৯৯ পাউন্ড। The Castle Glass নামের খাঁটি স্কটিশ রেস্তোরাঁটিতে বীরদর্পে ঢুকে পড়ি আর দেখি পৃথিবীর মানুষেরা বিরামহীন পানাহারে মত্ত। ভাবি, এত খাদ্য আসে কোথা থেকে? ভারতীয়রা কী পছন্দ করে তা এদের জানা দেখছি। একেবারে সোনায় সোহাগা।
হোস্টেলে ফিরে দেখি একজন কোরিয়ান ভদ্রলোক একগাদা বই নিয়ে ঢুকছেন। কিসের বই জানতে চাইলে বললেন, ‘বিলেত ভ্রমণ গাইড’। তার মহা আয়োজন দেখে আমি চমকিত। জন নামের কোরিয়ান ভদ্রলোক খ্রিস্টধর্মাবলম্বী এবং গভীর অনিসন্ধিৎসু পর্যটক। আজ পুরো ৪ ঘণ্টা কাটিয়ে এসেছেন কেলভিনগ্রুভ মিউজিয়ামে, আমি যার পাশ ঘেঁষে, কেবল ছবি তুলেই, ফিরে এসেছি। ইনি বিজ্ঞ মানুষ, ইংরেজি বলেন স্বচ্ছন্দে।
৩
গতকালের মতো আজও রৌদ্র উঠেছে, বরফ অনেকটাই অপসৃত। হোস্টেল থেকে বেরিয়ে এবার বামদিকে নয়, ডানদিকে যাই, সেখানে ঘোড়ার পিঠে এক সমরনায়ক সদর্পে বসে আছেন, যিনি সফলভাবে (পড়তে হবে নির্মমভাবে) জালিওয়ালানাবাগে ভারতীয় সৈন্যদের হত্যা করে সিপাহি বিদ্রোহ দমন করেছিলেন। কেবল ভারত নয়, দক্ষিণ আফ্রিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ইংরেজ বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে স্কটিশরা। অস্ত্রচালনা ও শৌর্যে তারাও কম নয়। এডিনবরা ও গ্লাসগো- স্কটল্যান্ডের দুই প্রধান নগরীতে আমি অনেক স্ট্যাচু দেখেছি যা বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত (তাদের ভাষায় আত্মোৎসর্গ) সেনা অফিসার ও সেনাসদস্যদের স্মৃতিতে নির্মিত। এসব যুদ্ধের কিছু, যেমন প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, তারা আত্মরক্ষার লড়াই করেছিলো সত্যি, কিন্তু বেশিরভাগ যুদ্ধই নতুন উপনিবেশ সৃষ্টি এবং পুরনো উপনিবেশে বিদ্রোহ দমনে সংঘটিত হয়েছে। এসব বীর (?) যোদ্ধাদের বেশিরভাগেরই মৃত্যু ঘটেছে বিদেশের মাটিতে, যা প্রমাণ করে তারা পরদেশ লুণ্ঠনে গিয়েছিলো।
আজ প্রথমে যাই গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। কেলভিনগ্রুভ পার্কের দিক দিয়ে প্রবেশ করলে প্রথমেই যার স্ট্যাচু চোখে পড়ে, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং লর্ড কেলভিন, তাপবিজ্ঞানের জনক। এরপরে বিখ্যাত দার্শনিক টমাস কার্লাইলের মূর্তি। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গোথিক স্থাপত্যরীতির বিশাল ও উঁচু ভবনটিতে ঢুকতে গিয়ে আমার চোখ ছানাবড়া। খিলানের নিচে পাথরের ওপর বসানো পেতলের প্লেটে ইংরেজিতে লেখা ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো। প্রতিষ্ঠিত ১৪৫১’, অর্থাৎ সাড়ে পাঁচশ বছরেরও বেশি পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়টি! ইংরেজ ভাষাভাষী দুনিয়ায় এটি চতুর্থ প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। এরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করছে, ভারতবর্ষে মোগলরা তখন দুর্গ আর প্রাসাদ বানাচ্ছে। এরাও কম দুর্গ আর প্রাসাদ বানায়নি, কিন্তু কাজের কাজটিও করেছে, বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছে। বস্তুত জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে থাকার কারণেই পৃথিবীকে পদানত করতে সুবিধা হয়েছে ব্রিটিশদের। কেবল শৌয-বীর্র্য নয়, সমরাস্ত্র আর যুদ্ধকৌশল কূটকৌশলের সাথে মিশে তাদের পৃথিবী শাসনে সহায়তা করেছে।
উঁচু ভবনটির ভেতরে ঢুকে আমি মুগ্ধ, যেমন বহিরাঙ্গে রাজকীয়, অভ্যন্তরেও তেমনি রাজকীয়। প্রশস্ত ও উঁচু করিডোরে বনেদি ঝাড়বাতি, মূল্যবান কার্পেট এক অভিজাত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবে। দু’দিকেই করিডোর গেছে, আমি ডানদিকে গিয়ে চওড়া, উঁচু সিঁড়ি পেলাম, সেখানে ধ্রুপদী অর্থনীতি শাস্ত্রের জনক এডাম স্মিথের মার্বেল মূর্তি আর দেয়ালে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাবশালী উপাচার্যের মুখাকৃতি পাথরে খোদিত পেলাম। এডাম স্মিথ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন পড়িয়েছেন জেনে শিহরণ জাগলো। এ সময়েই তিনি তাঁর সাড়া জাগানো গ্রন্থ ‘An Inquiry into the Nature and Wealth of Nations’ লিখেন। পথে দেখা তিন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ছাড়াও এ বিশ্ববিদ্যালয় জেমস ওয়াটের মতো বিজ্ঞানী, ফ্রান্সিস হাচেসনের মতো দার্শনিক, জোসেফ লিস্টারের মতে শল্যবিদের পীঠস্থান। সাতজন নোবেল প্রাইজ বিজয়ীর সূতিকাগার। দু’জন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এখানকার ছাত্র ছিলেন। দোতলায় কিছু দূর যেতে ডানদিকে ঘুরে যে প্রকাণ্ড হলঘরটি পেলাম, তা একটি গির্জার মতো। পুরাকালে হয়তো তাই ছিলো, এখানে প্রার্থনাসভা বসতো, এখন এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটকক্ষ। পেছনের দেয়াল জুড়ে বিখ্যাত সব অধ্যাপকদের ছবি। তাঁদের বেশিরভাগই এই সুপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, জ্ঞানের জগতে অনেকেরই বিশাল অবদান রয়েছে। তাদের অবয়বসমূহ দেখি আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে নিযুক্ত মৌলিক গবেষণাবিহীন অনেক গৌণ অধ্যাপকের কেবল পদের বড়াই স্মরণ করে সঙ্কোচবোধ করি।
প্রাতরাশ হয়নি, একজনের সাহায্য নিয়ে অনেকগুলো ব্লক ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া এ১ খুঁজে পাই। প্রাচীন ভবনে, উপরের শ্রেণিকক্ষেও দেখেছি, ভারী পাথুরে দেয়ালের ভেতরে অত্যাধুনিক অভ্যন্তরভাগ, আধুনিক সব উপকরণ, আসবাবপত্র। আমি পরিজ, পাউরুটি, মাখন আর চা নিই। ক্যাশ কাউন্টারে যে বয়স্কা ভদ্রমহিলা কাজ করছিলেন, তিনি আমায় সাহায্য করেন। ওপাশের কাউন্টার থেকে আমি সিরাপ মিশিয়ে নিতে পারি পরিজে, তিনি আমায় জানালেন। সিরাপ ঢালতে গিয়ে কিছুটা হাতে পড়ে গেলে দেখি তা ভীষণ আঠালো। আমি মন্তব্য করি, ‘Porridge is like superglue’; শুনে কাফেটেরিয়ায় কাজ করা সবাই হেসে উঠলেন। দেখি ওই বয়স্ক ভদ্রমহিলা আমার হাত মোছার জন্য ভেজা কাপড় আর শুকনো টিস্যু নিয়ে এসেছেন, নিজেই হাত মুছে দিলেন। তার এই মাতৃময়ী আদরটি আমায় অভিভূত করে।
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইনগেটে একদল চীনা শিক্ষার্থীকে চীনা ভাষায় কিচির-মিচির করতে শুনি। কী পড়ছে ওরা জিজ্ঞেস করলে জানতে পারি ‘মিডিয়া স্টাডিজ’। ওরা সবাই ওই বিষয়েই পড়ছে। সমুখের পাহাড়ের ঢালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুতল বিশিষ্ট গ্রন্থাগারটি চোখে পড়ে, ঢাকার অনেক প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির গোটা ক্যাম্পাসের চেয়ে বড় লাইব্রেরিটি।
কাল দেখিনি, আজ কেলভিনগ্রুভ মিউজিয়ামের অভ্যন্তরে প্রবেশ করি। ঢুকেই যে প্রকাণ্ড হলঘরটিতে পা রাখি তার বিপুল উঁচু ছাদ, প্রশস্ততা গির্জার অভ্যন্তরভাগের সদৃশ্য। বামদিকে ঘুরে যে কক্ষটিতে (এটিও বিশাল উঁচু) প্রবেশ করি, সেটি জীবজন্তুর ফসিলে সাজানো। এক অতিকায় হাতির রসঢ়ড়ংরহম প্রাণহীন অস্তিত্বের সমুখে গিয়ে নির্ভয়ে দাঁড়াই। ওপাশে একটি ডাইনোসরের ফসিল, সেটি আবার ভয়-ধরানো শব্দ করছে। মা-বাবা ভয় ভাঙানোর বিভিন্ন করসৎ করে গেলেও বেশিরভাগ শিশুকেই দেখলাম সে স্থান থেকে সরে যেতে চাইছে, মা-বাবাকে অন্যদিকে টানছে।
এখানে বেশ কিছু বিখ্যাত ফরাসি ইমপ্রেশনিস্ট পেইন্টার- যেমন গঁগ্যা (Paul Gauguin), ভ্যান গগ (Vincent van Gog), মাতিসে (Henri Matisse), দেগা ( Edgar Degas), মনে ((Claude Monet) প্রমুখের ছবি আছে। দেয়ালে তাঁদের কিছু বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত। এসব ছবি মহামূল্যবান। বিখ্যাত স্প্যানিশ সুররিয়ালিস্ট চিত্রকর সালভাদর দালির (Salvador Dali) একটি ছবি ‘বার্থ অব ক্রাইস্ট’ (Birth of Christ) বেশ আলাদাভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে। সেটি আরও দামি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে গোটা ব্রিটেনে সবচেয়ে প্রখ্যাত বিশজন চিত্রকর, যাদের ‘গ্লাসগো বয়েজ’ (Glasgow Boys) নামে ডাকা হয়, তাদের চিত্রকর্ম নিচের গ্যালারিতে রাখা। এদের অনেকেই চিত্রশিল্পে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘স্যার’ উপাধি পেয়েছিলেন। এই প্রভাববিস্তারী চিত্রকরদের পরবর্তীকালে যে চারজন চিত্রকর সুবিখ্যাত হন, তাদের ছবি দোতালায় প্রদর্শিত হচ্ছে। ছবিতে বহু উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করার কারণে এদের বলা হয় ‘The Colourist Painters’।
দুপুর নাগাদ হোস্টেলে ফিরে আসি, আমার শিশুদের (তারা কেউ এখন শিশু নেই, তবু আমার চোখে তারা শিশুই) কথা বলতে হবে। একটু বিশ্রাম নিয়ে, ওদের সাথে কথা বলে বাইরে বেরোই। মেজবাহ বলেছিলো ডে-টিকেট কিনে সারা শহরে ঘুরতে, কিন্তু আমাকে টানছে গতকাল দেখা ক্লাইড নদী, তার সুনন্দ তীর, অনিন্দ্য স্থাপনাসমূহ। বাইশ বছর আগে যখন এসেছিলাম, তখন কি নদীটি দেখেছিলাম? জাহিদ কি আমাকে ক্লাইড নদীর তীরে নিয়ে এসেছিলো? মনে পড়ছে না। আর ওইসব আধুনিক স্থাপত্য তার অনেক পরে, বেশিরভাগই নতুন মিলিনিয়ামের শুরুর দশকে ২০০০ থেকে ২০০৭-এর ভেতরে নির্মিত। সবচেয়ে নতুন হচ্ছে কনসার্ট হল ‘হাইড্রো’। প্রিয় প্রাঙ্গণে পুনর্বার যাই, কাল যেসব ছবি তুলতে পারিনি, সেসব ছবি তুলি। রিভারসাইড মিউজিয়ামের ডকে, যেখানে ঐতিহাসিক পালতোলা জাহাজ গ্লেনলি (Glenlee) নোঙর করা, তার পাশে দিকচক্রবালের সমূহ সৌন্দর্য অবলোকন করে শেষ বিকেলটি কাটাই। জাহাজটি পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছে চারবার, দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে এক ভয়ঙ্কর ঝড়ে পড়েও ডুবে যায়নি। রবার্ট ওয়েন নামের একজন ক্যাপ্টেন ছিলেন তখন জাহাজটির পরিচালনায়, তিনিই সুদীর্ঘ ১১ বছর এর ক্যাপ্টেন ছিলেন। আমার মনে পড়লো রবার্ট ওয়েন (Robert Owen) নামের এক শ্রমিকদরদি ইংরেজ মিল-মালিকের, কথা যিনি ঊনবিংশ শতকে তাঁর শ্রমিক কল্যাণমূলক কাজের জন্য ব্যবস্থাপনার সকল বইয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে নদীতীর ধরে ফিরে আসি। সবুজ বাতির সবুজাভা নিয়ে হাইড্র্রো জ্বলছে। আর্মাডিলো আর্ট গ্যালারি, বিবিসি স্কটল্যান্ড, সায়েন্স মিউজিয়াম, আইম্যাক্স সিনেমা (iMax Cinema), গ্লাসগো টাওয়ার, বেলস ব্রিজ (Bells Bridge) বিভিন্ন বর্ণের আলোয় উদ্ভাসিত। এখানে কয়েকটি কাচঢাকা হোটেল রয়েছে, জ্বলছে সেগুলোও। মনে হলো স্বর্গোদ্যানে রয়েছি! ওইসব স্থাপনার সৌন্দর্য দেখে দেখে নদীতীর ধরে হাঁটা মনোমুগ্ধকর। সোজা সিটি সেন্টারে না ঢুকে নদীতীর ধরে এগিয়ে যাই, সিহা হোস্টেলে শুনেছিলাম কিছুদূর গেলেই গ্লাসগো গ্রিন (Glasgow Green) নামক উদ্যান পাবো। পথে অনেকগুলো সেতু- ক্লাইড আর্ক, কিংস্টোন, পঞ্চম জর্জ, গ্লাসগো, সাউথ পোর্টল্যান্ড প্রভৃতি পেরিয়ে যাই। বিবিসি স্কটল্যান্ডের সমুখে প্রথম সেতুটির নাম মিলেনিয়াম ব্রিজ, শেষ সেতুটির নাম ডালমামিক। মোট সেতুর সংখ্যা একুশ, হেঁটে গেলে দু’ঘণ্টার পথ। আমি অতদূর যাইনি, অর্ধেক পথের কিছু বেশি গিয়েছি। এলবার্ট নামক ব্রিজটির কাছেই গ্লাসগো গ্রিন পার্কটি। গাছপালা তেমন নেই, শীতের প্রভাবেই হয়তো সবুজও তেমন চোখে পড়লো না। রাত নেমে এসেছে, একেবারে নির্জন পথ ধরে হাঁটতে একটু ভয়ও করছিলো। একটি বেঞ্চিতে বসে রাত্রির নির্জনতা উপভোগ করি।
গ্লাসগো সিটি সেন্টারে যেন মানুষের ঢল নেমেছে, একটু উঁচু বা নিচু ঢাল থেকে যা দেখা যায় তা হলো অজস্র মানুষের মাথা, ঢাকা শহরের পথ-ঘাটের একটি ছায়া যেন। ক্রিস্টাল প্যালেস রেস্তোরাঁটি তার আকর্ষণীয় খাবার দিয়ে আমাকে বোধহয় বিশ্বস্ত (loyal) কাস্টমার বানিয়েছে। আজও যাই সেখানে, আজ ভিড় আরও বেশি। দেখি খাবারের দাম এক পাউন্ড বেড়ে গেছে, ড্রিংকও ফ্রি (complimentary) নয়, সব মিলিয়ে প্রায় দশ পাউন্ড পড়বে। তখন মনে পড়লো আজ শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিনের প্রারম্ভ। তখন বিনয়ের সঙ্গে বলতেই হয়, ‘না, আমি খাবারটি নিচ্ছি না’।
তখন তরুণপ্রবাহ নেমেছে পথে, পিতা-মাতার নিয়ন্ত্রণের বাইরে আজ তাদের স্বাধীন রাত, দলে দলে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা। প্রতিটি রেস্তোরাঁ গমগম করছে, খাদ্য আর পানীয়ের জোগান যেন অন্তহীন, চাহিদাও কম নয়। বেশিরভাগ তরুণই দলবদ্ধ হয়ে ঘুরছে। আমি যেখানে ডিনার করছিলাম সেই ম্যাগডোনাল্ডসে এক যুবা মাতাল হয়ে হৈ-চৈ করছিল, দেখলাম মুহূর্তের মাঝে পুলিশ এসে তাকে দোকান থেকে বের করে নিয়ে গেলো। আরেকজন পুলিশ ভিতরে এসে গ্যাট হয়ে বসে রইলো চারিদিকে ঈগলচোখ মেলে। দেখলাম কোনো কোনো ভবনে কিছু সরু বাঁকানো পথ নেমে গেছে বেজমেন্টে, সেখানে মিউজিক পার্টি বা সিনেমা হবে। পানীয় ও খাবার আছে, যাকে এরা বলে প্রি-পার্টি ডিনার। জীবনের উতরোল আনন্দ সবদিকে বহমান। শীত ও অর্থ- দুই সীমাবদ্ধতা আমাকে সেই উতরোল আনন্দের প্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনে।
সিটি সেন্টার থেকে হেঁটে হোস্টেলে ফেরার পথে আমি দিক হারিয়ে একেবারে উল্টো দিকে চলে গিয়েছিলাম। দিনে তবু কিছুটা চেনা যায়, রাতে সবদিক সমান মনে হয়। একজন যুবক আমাকে সঠিক দিকটি দেখিয়ে দেয়। প্রধান মোটরওয়ের পাশে, আধো-অন্ধকারে সিহা থেকে যে ম্যাপ এনেছিলাম তা মেলে ধরে সে আমাকে বিপরীত দিকে যেতে বলে। যখন রুমে ফিরেছি, তখন জন নামের কোরিয়ান ভদ্রলোক, ও লিম নামের চীনা যুবকও ফিরেছে। ব্রায়ান নামের লম্বা সাদা চুলের স্কটিশ ভদ্রলোক এবং মিগুয়েল নামের স্প্যানিশ যুবক যাচ্ছে মিউজিক পার্টিতে। প্রথমজন শ্রোতা, দ্বিতীয়জন গিটারবাদক। এশিয়া যখন উষ্ণতার সন্ধানে গৃহমুখী, ইউরোপ তখন বেরিয়ে পড়ছে শীততীব্র পথে!