[নাজিব কিলানি (১৯৩১-১৯৯৫) আধুনিক আরবি সাহিত্যের এক ঝড়তোলা লেখক। তিনি একজন ঔপন্যাসিক হলেও আরবি ছোটগল্পে রয়েছে তার ব্যাপক অবদান। মিসর, মিসরের সামাজিকতা, সামাজিক বৈষম্য, মানবিকতা, অহিংসা, বৈষম্য মুক্ত সমাজ বিনির্মাণ তাঁর লেখার মূল অনুপ্রেরণা। অত্যাচারিত জনগোষ্ঠীর আর্ত-চিৎকার তার লেখার প্রাণশক্তি। এ গল্পটি তার মাওয়িদুনা গাদান গল্পগ্রন্থের কুলুবুন নিসা শীর্ষক গল্পের অনুবাদ।]
সুরাইয়া বিছানায় শায়িত। চোখে মুখে বিরক্তি। চেহারা বিষণ্ন। চিবুক কুঁচকানো। কপাল কুঞ্চিত। সুরাইয়া তপ্ত শ্বাস নেয়। বিছানা থেকে উঠার চেষ্টা করে। কিন্তু রুগ্ন বাহু তাকে উঠতে সাহায্য করে না। আবারো শুয়ে পড়ে। ঘুমানোর চেষ্টা করে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। হুসাইন তার কান্নার শব্দ শুনতে পায়। দৌড়ে খাটের দিকে এগিয়ে আসে। সুরাইয়ার পাশে উবু হয়ে দাঁড়ায়। মমতার সাথে সুরাইয়ার হাত শক্ত করে ধরে। তখনও সুরাইয়ার হাত কাঁপে। হুসাইন বলে :
– সুরাইয়া তোমার কী হলো? তুমি কাঁদছ? না না! কাঁদবে কেন? ডাক্তার জানিয়েছে তোমার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে বেশ ভালো।
সুরাইয়া অশ্রুসিক্ত শাড়ির আঁচল ছেড়ে দেয়। মুখ বাঁকিয়ে হাসতে হাসতে বলে :
– আমার অবস্থা ভালো? কে বলেছে আমার শরীর ভালো? সত্যিই আমার শরীর খুব ভালো। কিন্তু ! …
সুরাইয়া আরো কথা বলতে চায়। কিন্তু দীর্ঘ রুগ্নতা ও কান্নার চোট তাকে কথা বলতে বাধা দেয়। তবুও বলে- আসলে শারীরিক উন্নতি বলতে তার এখনও কিছুই হয়নি। এক বৎসর যাবৎ তার শারীরিক অবস্থার কোনোই উন্নতি নেই। উপরন্তু নতুন করে যোগ হয়েছে যকৃতের পীড়া। সে এখন বেঁচেই আছে একগাদা ঔষধের উপর। তার বেঁচে থাকা নিতান্তই নিয়তি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে ফিসফিস করে বলে :
– আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন। সত্যিই আমার সাথে সংসার করতে এসে তোমাকে অনেক কষ্টই দিলাম।
– তুমি এসব কী বলছ? এসব অন্যায্য কথা। এমন কথা দ্বিতীয়বার যেন আর না শুনি। আমি কি তোমার স্বামী নই?
– তা ঠিক। তবে আমি কখনই ভুলতে পারব না আমি তোমাকে কী আর্থিক সংকটেই না ফেললাম। সত্যিই আমার চিকিৎসা ব্যয় করতে গিয়ে তুমি আর আগের মতো কোনো খরচই করতে পার না। এমনকি তোমার জামা-কাপড়ও কিনতে পার না।
হুসাইন হেসে দেয়। সুরাইয়ার মলিন গালে মমতা ভরা টোকা দেয়। হুসাইন বলে :
– প্রিয়তমা এই কি শুধু আমার কাজ? পোশাক কেনা? কাপড়- চোপড় কেনা? প্রিয়তমা, আমি চাই তুমি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠো। এতে যদি আমার সব অর্থ শেষ হয় তবুও।
– উহ! অসুস্থতা! অসুস্থতা যেন ভয়ঙ্কর ভূতের মতো। আমাদের বাড়ির সবকিছু গিলে ফেলবে। আমাদের অর্থকড়ি … আমাদের সুখ-শান্তি … সব… । তবুও তার তৃপ্তি হবে না।
– ধৈর্য ধরো প্রিয়তমা!
হুসাইন সুরাইয়ার চোখের দিকে তাকায়। সুরাইয়া চোখ বন্ধ করে। সুরাইয়া ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। তার কাছে সবকিছু সংকীর্ণ হয়ে আসে। কষ্ট গোপন করার চেষ্টা করে। হুসাইন মমতাভরে তাকে ডাক দেয় :
– তুমি কষ্ট পেলে? আমি কি তোমার জন্য ব্যথানাশক ও উপশমকারী ঔষধ আনব?
– ব্যথানাশক…। হ্যাঁ! আমাদের জীবনটাই তো টিকে আছে ব্যথানাশক ঔষধের উপরে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত… আমরা সবাই ঘুমিয়ে আছি। আমাদের কারুরই ঘুম ভাঙে না যতক্ষণ না অসুস্থতা পেয়ে বসে। কিংবা কোনো বিপদ আপতিত না হয়। আমি চোখ বন্ধ করেছি এই তো সমস্যা! আস্থা- আমি আর চোখ বন্ধ করব না। জীবনের বাকি কয়দিন আমি তাকিয়েই থাকব। যত কষ্টই হোক না কেন? হুসাইন বুঝেছ?
সুরাইয়ার কথাবার্তায় কর্কশতা ফুটে উঠে। অকস্মাৎ সে হুসাইনের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণকণ্ঠে বলে :
– হুসাইন
– হ্যাঁ
– আসলে তোমার বিয়ে করা উচিত।
হুসাইন যেন সম্বিত ফিরে পায়। মুচকি হাসির রেখা মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। বিরক্তির সাথে বলে :
– তুমি কি আমার সাথে ঠাট্টা করছ?
– সুরাইয়া নিশ্চুপ।
– কথা বলছ না কেন? এটি বিদ্রুপ। এ অন্যায়।
সুরাইয়া হুসাইনের দিকে না তাকিয়ে, তার কথাকে কোনোরূপ গুরুত্ব না দিয়ে বলে :
– আমি তোমাকে বাহিয়্যার কথা বলছি। তোমার জন্য বাহিয়্যার প্রস্তাব করছি। সে আমার বান্ধবী এবং খালাতো বোন। সে যথেষ্ট ভদ্র ও সৌজন্যপ্রবণ। সুন্দরী। গতকাল তুমি ওকে দেখনি, ও আমার সেবা-শুশ্রুষা করছিল?
হুসাইন বিস্মিত হয় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তার দু’চোখ বেয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সুরাইয়া ঠাণ্ডা মাথায় বলে :
– আলহামদুলিল্লাহ। এতদিনে আমার মন থেকে এক ভারী বোঝা অপসারিত হলো। মনের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে পুষে রাখা কথা বলতে পারলাম। সুরাইয়া ফুঁপিয়ে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে বলে :
– কেন? কেন তাকে আমি অবিবাহিত রাখব? অথচ তার এখন ভরা যৌবন চলছে। আমি তো কাল-পরশু যেকোনো সময় মারা যাবো। তখন সে অবশ্যই বিয়ে করবে। ঘরে আমার তিন বছরের কন্যা সন্তান। সে তো বিয়ে না করে বিধবার জীবন যাপন করবে না। কোন অপরিচিতকে সে বিয়ে করে সুখী দাম্পত্য রচনা করবে তা না জেনে তাকে আমি ছেড়ে দিবো কেন?
তার চোখের পানি শুকিয়ে আসে। বিগত যৌবন স্মৃতিতে ভেসে ওঠে। যৌবনের সবই তো সুন্দর ছিল। অতীত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য স্মরণ করে। সেইসব স্মৃতি আজ মর্মর বৃক্ষশাখার মতো। অসুস্থতা সবকিছু বিবর্ণ করে দিলো। আমি ভাবতে পারি না-শিগগির অথবা বিলম্বে এর কোনো সমাধান হবে না। আমার অসুস্থতার চেয়ে হুসাইনের কষ্ট আমাকে বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছে। সে বলে :
– কোনো সমস্যা নেই। শিগগির সে বাহিয়্যাকে বিয়ে করবে। বাহিয়্যা নিশ্চয়ই আন্তরিকতার সাথেই তার দায়িত্ব পালন করবে। আমার মেয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিবে। এটিই অনেক বড় কথা। আমার অবর্তমানে হুসাইনও তার সাহচর্যে আনন্দেই কাটাবে। হুসাইন তার কথা শুনে মুচকি হাসে। মনে ধরে। আড়চোখে দেখে যাতে আমি বুঝতে না পারি। হায় দুর্ভাগ্য! আমি ভুলেই গেছি- নারীরা চিতাবাঘের মতো একচোখ খোলা রেখে ঘুমায়।
সুরাইয়া নস্টালজিয়ায় ভোগে। নারীচরিত্র তাকে তাড়া করে। তার পাশে অন্য নারীর ছায়ামূর্তি কল্পনা করে। যে তার স্বামীর ভালোবাসার অংশীদার হবে। তার ভালোবাসার ভাগীদার হবে। ভালোবাসা ছিনতাই করবে। সে বিড়বিড় করে বলে :
– এখানে আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। আমার স্বামী একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। তাই তার জন্য এমন প্রস্তাব করেছি। সম্ভবত আমিই প্রথম স্ত্রী যে তার জীবদ্দশায় স্বামীর জন্য দ্বিতীয় বিয়ের প্রস্তাব করেছে। এর বড় কারণ হলো হুসাইন ভদ্র, সজ্জন। তবুও মানুষের মন। যা কখনও ত্যাগ, অগ্রাধিকারও শুভ কাজে অনীহা পোষণ করে। কে জানে? আমার অসুস্থতা আরো দীর্ঘতর হয় কি না?
সুরাইয়ার ব্যথা তীব্রতর হয়। মনে হয় নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে যাবে। সে চিৎকার করে ওঠে :
– উহ! উহ! হুসাইন… ঔষধ দাও। আমি মরে যাবো। … আমাকে বাঁচাও…
মাত্র কয়েক মিনিট। সুরাইয়া গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে। নাক ডাকে। এসবই ঔষধের ফল। তখনও তার কপালের চামড়া কুঁচকানো যা তার রাগ, ক্ষোভ, বিরক্তি বা আরো কিছুর প্রকাশ।
হুসাইন চাকরিজীবী। সহজ-সরল। বি.বি.এতে ডিপ্লোমা। পল্লী-গ্রামের সহজ-সরল মানুষের মতোই ধৈর্য, সম্ভ্রমবোধ, মর্যাদা, শ্রদ্ধা সবই তার মধ্যে আছে। ফলে সহসা সুরাইয়ার প্রতি আড়ষ্ট কিংবা বিরক্ত হয় না। বরং সর্বদাই ধৈর্যের পরিচয় দেয়। কয়েক বৎসর যাবৎ সে দিনরাত সুরাইয়ার পাশে আছে। তার চাওয়া-পাওয়াকেই গুরুত্ব দিয়েছে। অবশ্য তার মধ্যেও জৈবিক চাহিদা মাথা চাড়া দিয়েছে। যৌবনের ডাকে শিহরিত হয়েছে। তবুও সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। এড়িয়ে গেছে। তার স্ত্রী, কন্যা, মায়ের দিকে তাকিয়ে সব বিসর্জন দিয়েছে। হুসাইন অস্বস্তি ও পেরেশানির সাথে বেরিয়ে যায়। নিজে নিজেই বলে :
– সুরাইয়া এসব কী বলছে? সত্যিই কি আমাকে বিয়ে করতে হবে? কিন্তু কিভাবে? না! না … সুরাইয়া সত্যিই পূত-পবিত্রা। তার নিখাদ ভালোবাসাই তাকে তাড়িত করেছে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে। যাতে আমি জীবন- যৌবন নিয়ে কোনো কষ্টে না ভোগী। কে জানে? এটিই হয়তো আমার জন্য অগ্নিপরীক্ষা। আমার ধৈর্যশীলতার প্রমাণ। তার প্রতি আমার ভালোবাসা ও অনুরক্ততার প্রমাণ। হতে পারে এসব তার অর্থহীন প্রলাপ। সে চিন্তা ঘুরিয়ে ফেলে। কিন্তু আমিই বা কেন হুট করে কোনো কথা না বলে বেরিয়ে গেলাম। এটি কি তার জন্য শক্ত প্রমাণ হয়ে গেলো না? এর অর্থ কি এই যে আমিও …।
হুসাইন লজ্জিত হয়। লজ্জায় মরে যায়। সে কল্পনায় দেখে বাহিয়্যা তাকে সালাম দেয়। তার সামনে দিয়ে ফ্যাশন করে হেঁটে যায়। অসুস্থ স্ত্রীর সামনে বিনয়ী হয়ে দাঁড়ায়। চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে তাকে বিদায় জানায়। এ দুই দৃশ্যের মাঝে কী ভয়ঙ্কর পার্থক্য! হুসাইন অন্তরে অজানা কাঁপুনি উপলব্ধি করে। এক অজানা অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়। ভীতি ও শঙ্কার সাথে ফিসফিস করে :
– এ আমার কী হলো! আমি কি বাহিয়্যাকে ভালোবেসে ফেলেছি! কী লজ্জাকর। কী ভয়ানক প্রতারণা! কী অধঃপতন! সামান্যতম মানবতা ও মানবিকতা দেখাতে পারছি না। সত্যিই আমি নির্বোধ। বদমাশ। আমি সুরাইয়ার সুরা পান করেছি। আর সে অসুস্থ হইবা মাত্র আমি তাকে ত্যাগ করছি। তাকে এড়িয়ে চলছি । ভীরু-কাপুরুষের মতো তার কাছ হতে পালাতে চাইছি। সত্যিই কি দুনিয়া পাশবিকতার রণক্ষেত্রে! নাকি প্রেম, ভালোবাসা, নান্দনিকতা, মানবিকতার সবুজ উদ্যান। হায় দুনিয়া! এ অসম্ভব! শিগগির আমি সুরাইয়ার কাছে যাবো। তার বিপক্ষে যুক্তি দিব। তাকে চিরন্তন ভালোবাসার নিশ্চয়তা দিব। তার প্রতি আমার তৃপ্ততা ও আনন্দের সর্বাত্মক জানান দিব। অশ্রু বিসর্জন করব। তাকে বলব- তুমি আর কখনও আমার সামনে বাহিয়্যার নাম উচ্চারণ করবে না। কখনও তার নাম মুখে আনবে না।
হুসাইন এবার তুষ্ট হয়। তার আত্মা শান্তি পায়। এমন সিদ্ধান্ত নিতে পেরে তার নিজের কাছে ভালো লাগে।
দিনে চলে যায়। অস্বস্তি বাড়ে বৈ কমে না। হুসাইন তপ্ত নিঃশ্বাস নিঃসরণ করে। সুরাইয়ার সময় ঘনিয়ে আসে। আস্তে আস্তে সে কবর পানে ধাবিত হয়। মায়ের অসুস্থতায় তার ছোট্ট কন্যাটিও শেষ হতে থাকে। হুসাইনের বৃদ্ধা মা সব সময় জায়নামাজেই বসে থাকেন। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া জায়নামাজ থেকে ওঠেন না।
এদিকে হুসাইনের দেহস্থিত শয়তান চিৎকার করে ওঠে। হুসাইন সুরাইয়ার দিকে তাকায়। রুগ্ন, শীর্ণ, দুর্বল দেহ বৈ আর কিছুই দেখে না। রোগে শোকে ক্রমশ শীর্ণ কায়া হয়ে পড়ছে। দ্রুত জীবনাবসানের জানান দিচ্ছে।
বাহিয়্যা লাজনম্র। মোহময়ী। শয়নে জাগরণে সে শুধুই হুসাইনকে দেখে। তার কল্পনায় এক সুপুরুষ, ধৈর্যশীল মানুষের ছায়া ঘোরাফেরা করে। শেষ পর্যন্ত সে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়। তার চিন্তা মানস দিগন্তে হারিয়ে যায়। যাহোক এখন আর সুরাইয়ার কাছে গেলে আগের মতো জড়োসড়ো কিংবা সংকুচিত হয় না। তার সাথে সহাস্য আলাপচারিতা করে।
হুসাইন টেনশনে পড়ে। তার কাঁপুনি, বুক দুরুদুরু বেড়ে যায়। অন্যমনস্ক হতে থাকে। কথায় কথায় ক্ষেপে যায়। খিটখিটে স্বভাবের হয়। রাগলে সাথে সাথে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। যেন বাড়ির বাইরে প্রশান্তির কিছু পেয়েছে সে। বাইরে বেরুতে পারলেই যেন দায়িত্বখানিকটা লাঘব হয়। হোক তা অল্প সময়ের জন্য। সুরাইয়া চিন্তামুক্ত হতে পারে না। বিষন্নতা তাকে ঘিরে ধরে। হুসাইনের কার্যকলাপ তাকে আরো চিন্তিত করে। চিন্তায় তার মাথা ভারী হয়ে আসে। ফিসফিস করে বলে- সে তো অসহায়। তার তো আর বেশি বাকি নেই। শিগগির সে এ দুরবস্থা থেকে রেহাই পাবে। ইয়াআল্লাহ তুমি সহজ করে দাও।
চিন্তার এ ঝঞ্ঝা হোসাইনকে নিয়ে খেলা করে। সে উত্তরণের পথ খোঁজে। এখান হতে বেরুতে চায়।
হুসাইন স্থিরতা ফিরে পায়। শান্ত হয়। তাকায়- সামনে বিশাল বাস্তবতা দেখে। দেখে অনেক কিছু ঘটে গেছে। হুসাইন বাহিয়্যাকে বিয়ে করেছে। হ্যাঁ হুসাইন তাকে বিয়ে করেছে। তবে এ বিয়েতে ঢোল তবলা বাজেনি। গান বাজনা হয়নি। খাবারের বিশাল আয়োজন হয়নি। পানের ছড়াছড়ি হয়নি। কারণ সুরাইয়া তখন অসুখাক্রান্ত। শয্যাশায়ী।
তার বাসর রাত ছিল অনেকটা শোকসন্তপ্ত। তবে হুসাইন মহাখুশি। তার তনুমনে আনন্দের ঢোল বাজে। তার মনোজগতে পিয়ানো, ম্যান্ডোলিন সুর তোলে। সে একটুও লজ্জিত হয় না। তার মনে হয় না এতে গাদ্দারি, প্রতারণা বা অন্যায় কিছু আছে। কিন্তু এটি হলো কী করে?
হুসাইন পুরো ঘটনা মনে করতে পারে না। অল্প কিছু মনে করতে পারে। তার শুধু মনে আছে সুরাইয়া নিজে বাহিয়্যার সাথে তার বিয়ের সকল দরজা উন্মুক্ত করে দেয়। বৃদ্ধা মা তাকে এ পথে রাস্তা দেখায় এবং বিয়ের জন্য চাপ দেয়। আর বাহিয়্যা তো আছেই। সেও এ বিয়েকে উসকে দিয়েছে। বিশেষত তার মায়াবী চাহনি, মিষ্টি চেহারা, বারবার দেখা করা সবই ঘনিষ্ঠতাকে ত্বরান্বিত করে। তার এও মনে আছে তার উন্মত্ত যৌবন, ভয়াবহ অবসর, নিরাপদ দিবস যাপন এ সবই তাকে সব সময় ফিসফিস করে বলতো তোমার বিয়ে করা উচিত।
হুসাইন নববধূর সাথে মধুর সময় কাটায়। অসুস্থ সুরাইয়া তাদের নব সুখে কোনো বিঘ্ন করে না। তাদের আনন্দোজ্জ্বল সময়কে ঘোলাটে করে না। সুরাইয়ার প্রলাপ কিংবা তার চিকিৎসাব্যয় কোনো কিছুই তাদের আনন্দে বিঘন ঘটায় না।
সুরাইয়ার ব্যাপক পরিবর্তন হয়। কিন্তু সুস্থ হয় না। তার নীরবতা, কথা না বলা, একদম চুপসে যাওয়া এর কারণ কী? কেন সে এমন চুপ হয়ে গেল? কেন তার চোখের পানি শুকিয়ে এলো? কেন সে আর কাঁদে না? এসব কি তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসার ইঙ্গিত নাকি বয়ে যাওয়া ঝড়ের ফলশ্রুতি?!
একদিন সকাল বেলা। হুসাইন সুরাইয়ার কাছে যায়। প্রতিদিনের মতো আজও সে তার কপালে একটি রুটিন চুমো দেয়। কপাল প্রচণ্ড গরম। গরমে যেন ত্বক জ্বলে যাবে। ফিসফিস করে বলে- হায় আল্লাহ! কী প্রচণ্ড জ্বর। মনে হচ্ছে শরীর থেকে আগুন বেরুচ্ছে। সুরাইয়া হুসাইনের মনের কথা বুঝতে পারে। অর্থপূর্ণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হুসাইনের দিকে তাকায়্। যেন তাকে বলতে থাকে- শোনো এটি অসুস্থতার জ¦র নয়। এই জ¦রের অন্য একটা নাম আছে। নারীরা এ জ্বরকে স্বামীহারা জ্বর বলে। এ জ্বর জীবনের যবনিকা টেনে দেয়।
সেদিন সন্ধ্যা বেলা। হুসাইন বাহিয়্যার সাথে তার ঘরেই। তারা খোশগল্পে মত্ত ছিল। যথাসম্ভব আস্তে কথা বলে। ফিসফিস করে চুপিসারে কথা বলে। পাশের ঘরেই সুরাইয়া। এ দু’ঘরের মাঝে রয়েছে সংযোগ দরজা। যা ছিল খোলা। সুরাইয়া বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে। সুরাইয়া কান ছেড়ে দেয়- ওপাশের ঘরে কী কথা হচ্ছে তা শুনতে। দুলহা-দুলহানের কথা শুনতে তার কৌতূহল তীব্র। তাদের কথা শুনে তার শরীরে কাঁপুনি ধরে। ক্রোধ ও হিংসায় কাঁপতে থাকে। ঘুমাতে পারে না।
অনেক চেষ্টার পর সুরাইয়া কষ্ট করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। অবদমিত হিংসা তাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে। প্রতিহিংসা বিশেষত প্রেমঘটিত বিদ্বেষ মানুষকে প্রাণান্তকর শক্তি জোগায়। অপ্রতিবোধ্য প্রাণশক্তি দেয়। সুরাইয়া স্বামীর ঘরে যায়। যাবার আগে কাপড় দিয়ে চেহারা মুড়িয়ে নেয়। শয়তানাকৃতি ধারণ করে। সে ঘুমন্ত বাহিয়্যার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার রুগ্ন হাতে থাকা চাকু দিয়ে বাহিয়্যাকে আক্রমণ করে।
বাহিয়্যা ভয়ে চিৎকার দেয়। পরপর চিৎকার দিতে থাকে। হুসাইন বিছানা থেকে লাফ ছেড়ে ওঠে। ততক্ষণে সুরাইয়া বাহিয়্যার দিকে চাকু ছুড়ে মেরেছে। তার বুক জখম হয়েছে। জখম থেকে রক্ত বেরুচ্ছে। হুসাইন অবচেতন মনে সুরাইয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সুরাইয়াকে সরিয়ে দেয়। ঝটকা দিয়ে ফেলে দেয়। বাহিয়্যার নাগালের বাইরে তাকে ফেলে দেয়। হাত থেকে চাকু পড়ে যায়। সুরাইয়াও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পড়া মাত্র নিঃসাড় হয়ে যায়। যেন শবদেহ। কোনো নড়াচড়া নেই। কিন্তু চাহনিতে তখনও শয়তানি দৃষ্টির বিদ্যমানতা। চেহারায় বিদ্বেষের নগ্নতা। বাহিয়্যা সামান্য আহত এবং আশঙ্কামুক্ত।
হুসাইন বলে :
– আমি তাকে হত্যা করতে চাইনি। আমি তোমাকে তার হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। তার হাতে চাকু ছিল বলেই তাকে ধাক্কা দিয়েছিলাম। বাহিয়্যা ঠাণ্ডা মাথায় বলে :
– তুমি তাকে হত্যা করেছ নাকি? সে মারা গেছে এই যা! সে তো দীর্ঘদিন যাবৎই মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
পরদিন সকালবেলা। সুরাইয়া তার শয্যায় যথাশায়িত। হুসাইন, বাহিয়্যা আরো অন্যান্য আত্মীয়স্বজন তার শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে। তারা অশ্রু বিসর্জন করে। তার রূহের মাগফিরাত করে। সবাই বিড়বিড় করে বলে- আল্লাহ তাকে রহম করুন। মহিলাটি ছিল সত্যিই অনুপম, ফেরেস্তার মতো। অন্য কেউ বলে- ঠিকই বলেছেন। সেই তো হুসাইনকে বিয়ে করতে চাপ দিয়েছিল। বাধ্য করেছিল। কী তার আত্মত্যাগ!
হায় নারীর মন! নারীর মন বোঝা বড় দায়।