
নির্বাচিত কবিতা নুুরুল আমিন প্রচ্ছদ : অলক রায় প্রকাশক জোনাকি প্রকাশনী প্রকাশকাল : ২০১৭ মূল্য : ৩০০ টাকা
‘ফিদেল ক্যাস্ত্রো অ্যাওয়ার্ড-২০১৭’ প্রাপ্ত সাহিত্যিক ড. নুরুল আমিন, একজন বিদগ্ধ গবেষক হলেও মূলত কবি। যদিও তাঁর এ পর্যন্ত প্রকাশিত বাইশটিরও অধিক গ্রন্থের মধ্যে মাত্র সাতটিই কবিতার বই। আর এ সাতটি কাব্যগ্রন্থ থেকে বাছাই করা কবিতার সমন্বয়ে ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর নির্বাচিত কবিতা-ই প্রমাণ করে তিনি মূলত কবিই। এ-সংকলন গ্রন্থের প্রথম কাব্যগ্রন্থটির প্রকাশকাল ১৯৭৮ (যেখানে শুরুর কবিতাটি ১৯৭৭-এ রচিত) আর সর্বশেষ গ্রন্থের প্রকাশকাল ২০১৭। অর্থাৎ কবি নুরুল আমিন চল্লিশ বছরের অধিক সময় ধরে সপ্রেম কাব্যলক্ষ্মীর ঘর করেছেন। কবিতার সঙ্গে তাঁর এ ঘর-সংসার আমৃত্যু অটুট থাকবে বলেই মনে হয়। তাই তাঁর নির্বাচিত কবিতা-র মনোযোগী পাঠক হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণ ও সহজ-সরল স্বীকারোক্তির অকুণ্ঠ প্রকাশ মেলে ধরলাম।
প্রথমেই স্বীকার্য, স্বপ্নাদ্য সুন্দরের কবি নুরুল আমিনের কবিতায় একজন পর্যবেক্ষকের সূক্ষ্ম দৃষ্টি স্বতঃতই বিদ্যমান, তেমনি সারল্য-প্রাঞ্জলতাও তার অনুষঙ্গী। তবে ঐ গুণ শুধু তাঁর কাব্য ক্ষেত্রে নয়, তাঁর গদ্য রচনার ক্ষেত্রেও বর্তমান। তাই তাঁর প্রথম প্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থ সম্পর্কে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন :
অধ্যাপক নুরুল আমিনের আবুল মনসুর আহমদের কথাসাহিত্য বইটি একটানে পড়ে ফেলেছি। এটির প্রথম গুণ, সুখপাঠ্যতা- যা অনেক গবেষণাগ্রন্থের থাকে না। দ্বিতীয় গুণ, গবেষণার শ্রমজনিত স্বেদবিন্দু এই বইয়ে নেই- যা অনেক গ্রন্থে থেকে যায়। তৃতীয় গুণ, অধ্যায় বিন্যাসের পারিপাট্য- যা অনেক গবেষণাকর্মে থাকে না। এর ফলে বইটি উপাদেয় হয়েছে। [কলকাতা ১৬.১০.১৯৮৪) দ্র. গবেষণা ১৯৮৬, পৃ. ২৫]
এভাবে সারল্য ও প্রাঞ্জলতায় গদ্যের মননশীলতার সীমানা পেরিয়ে কাব্যেও তিনি চমৎকার সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন, তা মানতেই হয়।
আশ্চর্যের বিষয়, তিনি যখন কবিতা লেখেন পাণ্ডিত্যকে পাশ কাটিয়ে চলেন সচেতনভাবে। তাই তাঁর কবিতা পাথরের গিরি-গুহা-নিঃসৃত প্রস্রবণের মতো। অতি হালকা তরঙ্গ তোলে ধীর লয়ে বয়ে চলে। তিনি মূলত রোমান্টিক কবি। তবে বিপন্ন ছিন্নমূল মানুষও তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না। কারণ রোমান্টিক হলেও তাঁর অন্বেষার মূলমন্ত্র কিন্তু মানবতা। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন সুন্দরের। মানুষের দুঃখ, বেদনা, বিচ্ছেদ তাঁকে ব্যথিত করে। তাঁর ভালোবাসার গহীন নদীর তলায় মূলত দেশ ও মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। তাই তিনি মানুষের দুঃখ দুর্দশা ও বিপর্যস্ত পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজেন। সভ্যতাকে তিনি সকল বর্বতার বিপরীতে সুসভ্য হওয়ার পথে দেখতে চান। তাঁর পথ বিচিত্রগামী। মানব হৃদয়ের নানা রং : ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস, ঐতিহ্য, তাঁর নিজস্ব উপস্থাপন-ভঙ্গিতে সর্বাঙ্গীণ মাধুর্যে কবিতায় উঠে আসে। প্রত্যয়দীপ্ত, স্পষ্ট ও সাবলীল বক্তব্য তাঁর কবিতাকে দিয়েছে অভিনবত্ব।
ছাত্রজীবন থেকেই নুরুল আমিন কাব্যসাধনায় নিমগ্ন। দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় সুতীক্ষè পর্যবেক্ষণের বাঁকে বাঁকে তিনি সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য কবিতার ডালি। এর অনেকটা পত্র-পত্রিকা-লিটল ম্যাগ ইত্যাদিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তবে প্রচ্ছদ-বন্দি হয়েছে সাতটিতে : লৌকিক অলৌকিক (১৯৭৮), লেগে আছে শ্যামাল ছায়া (১৯৮৮), বুনো হাঁস পাতি হাঁস (২০০৭), স্বপ্ন দেখি সুন্দরের (২০০৮), ভালোবাসার গহীন নদী (২০১৬), চৈতি চাঁদের ওম (২০১৭) ও চাঁপাকলি মন (২০১৭)। এর মধ্যে নিঃসন্দেহে লেগে আছে শ্যামল ছায়া, স্বপ্ন দেখি সুন্দরের, ভালোবাসার গহীন নদী এবং চৈতি চাঁদের ওম কাব্যগুণ সমৃদ্ধ ও পাঠকপ্রিয় গ্রন্থ। এ-সব কাব্যে কবি নুরুল আমিন-এর কবিতার ভাব গভীর কিন্তু ভাষা অতি সরল। গুরুগম্ভীর ভাবকে এত সহজে কাব্যে রূপ দেয়ার ক্ষমতা তাকে অনন্যতা দিয়েছে। সে জন্য ১৯৮৮তেই পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত লেখক আজহারউদ্দীন খান বলেছিলেন, ‘সহজ সরল পঙক্তির মধ্যে গভীর ব্যঞ্জনা’ তিনি ফুটিয়ে তুলতে পারেন। তিনি যাই বলেন সহজবোধ্য এবং সাবলীলভাবে বলেন। সহজ, সরল বোধগম্য উপস্থাপনা তাঁর কবি-মানসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই তাঁর কাব্যের ভিতর একজন সরল মানুষকে আমরা খুঁজে পাই। কবির ব্যক্তি-জীবন আর কাব্য দুয়ের মধ্যে একটি সমান্তরাল সম্পর্ক। জীবন এবং কাব্য কোনোটিকেই তিনি সর্পিল করে তুলেননি। সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন কবি প্রাণ খুলে লিখে যাচ্ছেন তাঁর সুমধুর মন্ত্র-শ্লোক। সবি স্পষ্ট, পরিষ্কার স্বচ্ছ; কী ভাব, কী ভাষা, কী শব্দ, কী বাক্য, কী বক্তব্য। মনে হয় কবিতার ভিতর একজন সজীব কবি বসবাস করছেন। অর্থাৎ কবি নুরুল আমিন হৃদয় উজাড় করে কবিতা লেখেন। আর তাঁর কাছে যেন অপরিসীম মান্যতা পেয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের অবিস্মরণীয় বাণী : ‘সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার সরলতা।’
আধুনিক বা উত্তরআধুনিক- সকল চৈতন্যে কবির অপার বিস্ময় মানব-চিত্ত। আর এ চিত্তের রহস্যময়তার খুঁজেই শুরু হয় কবি নুরুল আমিনের কাব্য অভিসার ‘চিত্ত নামের হরিণী’। ১৯৭৭ সালে লেখা এ কবিতা দিয়েই শুরু নির্বাচিত কবিতা, যেখানে চিত্ত নামের হরিণীর গমনাগমন তিনি অকপটে স্বীকার করেন এবং তাঁর কাছে ‘চর্যার হরিণীর মতো এ চিত্ত বিষম হেঁয়ালি-’ তাই তিনি বলেন :
মাঝে মাঝে এমন বদলে যাই
ভাবতেও অবাক লাগে।
কোনো কোনো মানুষের গন্ধ
তখন বিষম ভালো লাগে,
ভালো লাগে আকাশের চাঁদ পাখি
সবুজ নিসর্গ
কিংবা কারো কারো ঘৃণা;
(চিত্ত নামের হরিণী: লৌকিক অলৌকিক)
কোনো কবির কাছে ‘কারো কারো ঘৃণা’ও যে ভালো লাগে- তা বিস্ময়ের নয় কি? অর্থাৎ কারো ঘৃণাও ভালোবাসার বস্তু হতে পারে তা কবি নুরুল আমিন অকপটে বলতে পারেন। কেননা তাঁর কাছে হৃদয়বৃত্তির আবর্তন-বিবর্তন একটি শাশ্বত ব্যাপার- চিরকালীন। তাই নুরুল আমিনের বহু কবিতায় হৃদয়ের রং বদলের মূর্ত-বিমূর্ত বিচিত্র প্রকাশ ঘটেছে :
অজস শব্দ পাখির শব্দের মতো নির্জন অন্তরে আমার-
যেন রূপসার জলে শুধুই হাসছে উচ্ছলতায় নির্ভার হাসি,
হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশ আচ্ছন্ন করে স্নিগ্ধতার গান-
প্রেয়সীর নাকী সুরে কান্নার মতো, কালিন্দী-কূলের বাঁশির মতো
বেদনা-ক্লান্ত শুধুই গড়ছে নিরুপম এক অনিন্দ্য রহস্যপুরী,
শব্দে শব্দে স্বয়ম্বরা বৃষ্টি-নৃত্য মেতে উঠে অন্তরে আমার
(আমার অর্থবোধ, শিল্পবোধ : লেগে আছে শ্যামাল ছায়া)
গোর্কি বলেছেন, মহৎ শিল্পীদের রচনায় বাস্তবতা ও রোমান্টিকতা বিমিশ্রিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ রোমান্টিকের বাস্তবজীবন-প্রীতি ও বাস্তববাদীর রোমান্টিক-ভাবালুতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কবি নুরুল আমিনেও এর প্রমাণ মেলে।
বিষয়ের নব-উপস্থাপনে নুরুল আমিন কবিতাকে দিয়েছেন বাস্তববাদের ব্যঞ্জনা। মেঘ (মেঘদূত) বর্ষা (বর্ষার দিনে) বা বৃষ্টি তাঁর কাছে সামন্তবাদী আয়েশি প্রেমের বিষয় নয়, বাস্তবতার চিরকুট। স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা ‘এই শহরে বৃষ্টি’ কবিতাটি তারই প্রমাণ :
বৃষ্টি তো নয় এমন বৃষ্টি তেজস্ ক্রিয়ায়
ফলতে থাকে মধ্য রাতে মধ্য শীতে-
ফুটপাথের ঐ শুয়ে থাকা মানুষগুলো
লাশের মতো জমতে থাকে বি আর টি সি-র
ছাউনি তলে, পাশেই আমার মিস্কা হোটেল
মদ্যপায়ী ফুলেল বাবুর স্বর্গপুরী-
এই শহরে, বৃষ্টি পড়ে গুঁড়ি গুঁড়ি।
(এই শহরে বৃষ্টি : লেগে আছে শ্যামল ছায়া)
প্রেমবিষয়ক কবিতায় কবি ভালোবাসার গহীন নদীতে অবস্থান করেছেন। প্রিয়ার নানারূপ ছলচাতুরী সত্ত্বেও কবি তাঁর প্রেমে অবিচল। তবে তিনি দেহের চেয়ে প্রিয়ার অন্তরকে বেশ গুরুত্ব দেন। হৃদয় পাওয়ার পর দেহ তাঁর কাছে অত্যাশ্চর্য হয়ে দেখা দেয়:
আমি তো তেমন বন্ধন প্রত্যাশী, হৃদি-গেহ
সদা জাগ্রত থাকুক তোমার কল-গুঞ্জনে,
এই নশ্বর রূপে তোমার অবিনাশী দেহ
বেঁচে থাকার সাধে করুক উন্মত্ত উন্মনে,
(আবহমান : লেগে আছে শ্যামল ছায়া)
জীবনবাদী কবি জীবন-চুম্বকের অদৃশ্য আকর্ষণে ক্রমাগত এগিয়ে যান। ক্লান্ত হলে প্রিয়ার নাম জপতে জপতেই ঘুমিয়ে পড়েন। সুপ্তির ভিতরও স্পর্শ পান প্রিয়ার।
দেশপ্রেমমূলক কবিতায় ধরা পড়ে কবির প্রগাঢ় ভক্তি শ্রদ্ধা ভালোবাসা। অক্ষরবৃত্তের ধীরে লয়ে কবির সেই প্রগাঢ় অনুভূতির প্রকাশ ‘এই আমার দেশ’ কবিতা- যেখানে কবি নৈসর্গিক বাঙলার শাশ্বত রূপ এঁকেছেন অনুপম শব্দচিত্রে :
ওই আকাশের নীল ছুঁয়ে যাওয়া প্রসৃত মাঠ
যেন ঝালর ঝুলানো নীলাম্বরী সিক্ত সবুজের দেহ,
ঝিল্লি-মুখর রজনী-রাগে হৃদয়ের ব্যাকুলতা
সহস্র তারে বীণার ঝংকার, এই আমার দেশ।
(এই আমার দেশ : লৌকিক অলৌকিক)
দেশের শেকড়ের টান মানুষকে দৃঢ় করে এবং ভাষা-সংস্কৃতির বলয়ে সেই দৃঢ় মানুষ বলিষ্ঠ জাতি গড়ে তোলে। তার বিপরীতে নৈতিক অবক্ষয় দেখলে কবির মন কেঁদে ওঠে :
এই সবুজ দেশটা আমার দিন দিন
কেমন রাঙা হলুদের মতো মরে যাচ্ছে,
কোথাও কোনো কিছু বাকি নেই
গ্রামের সুবজ মাঠ ধানশালিকের গান
সব যেন উজাড় হয়ে যাচ্ছে।
(আমার কি কিছু করার নেই : স্বপ্ন দেখি সুন্দরের)
রাজনৈতিক অনুষঙ্গেও নুরুল আমিন কবিতা লিখেছেন প্রচুর। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতার চেতনা তাঁকে কাব্য-রসদ জুগিয়েছে। তাঁর কাছে-
একুশ মানেই গণতন্ত্র, মা- কে মা বলার অধিকার
দুঃসাহসে পথ চলা রক্ত-নদীর স্রোতে অদম্য বান,
মাতৃকার মমতার টানে অবাধ্য ছুটে চলা সন্তান
(চেতনার স্রোতোবহা নদী : স্বপ্ন দেখি সুন্দরের)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নিহত হওয়ার ঘটনা কবিকে দারুণভাবে ব্যথিত করে; এ অমানবিক নিষ্ঠুর কাণ্ড একজন দেশপ্রেমিক কবি সহজে মেনে নিতে পারেন না। তাই নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেলের আর্তনাদ যেন তিনি আজও শুনতে পান।
কবি নুরুল আমিন একজন মানবতাবাদী কবি। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা অভাব-শোষণ নির্যাতন বিপন্নতা তাঁকে পীড়িত করে। দেশে বিদেশে সকল অমানবিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদমুখর। যেখানে মানবতা লঙ্ঘিত হয়েছে সেখানেই তাঁর কলম খড়গ হয়ে উঠেছে :
বিংশ শতাব্দীর যন্ত্রণাকাতর আমি একবিংশের নব অভিবাসী
সামান্য আশ্রয় আর নিরাপত্তা খুঁজি অস্তিত্বের শান্তি অভিলাষী।
মানুষ রূপের হায়েনার দম্ভে- ক্ষমতার দ্বন্দ্বে অসহায় আমি
ঝাঁপ দিয়ে পড়ি সাগরের জলে, পথ খুঁজি কাঁটা তারের বেড়ায়,
কখনো পতাকা ফেলানীর রক্তে, কখনো আইলন নিষ্পাপ সন্তান
সাগরের তীরে গোলাপি পতাকা- মানব জন্মের অপমান!
বিশ্ববিবেকের টনক নড়ে কি, জানি নে, অথচ করেছে নির্ঘুম
লাশ-কাটা ঘরে অস্থির বরফে খুঁজি আমি চৈতি চাঁদের ওম।
(চৈতি চাঁদের ওম : নির্বাচিত কবিতা)
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা এ কবিতা সাম্প্রতিক কালের (১৮.২.১৬)। তবে ১৯৭৭ সালে রচিত কবিতায়ও দেখা যায় তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন :
ইদানীং সভ্যতা সভ্য মানুষের অসভ্য আচরণ
বর্মীবাজের নখর থাবা-
লুটতরাজ খুন রাহাজানি নারী-ধর্ষণ,
নগ্ন নারীদের পণ্য সম্ভার, ইদানীং সভ্যতা নগ্নতার!
…ইদানী সভ্যতা আমার ঠিকরে যাওয়া চোখ
আগুন আগুন
ওরা আমার মায়ের আবরু নিয়ে ছিনিমিনি খেলে
আমি ওদের চুরমার করে দেবো।
(ইদানীং সভ্যতা : লৌকিক অলৌকিক)
সম্প্রতি আমরা ‘বর্মীবাজের নখর থাবা’ স্বচক্ষে দেখেছি। রোহিঙ্গাদের নিয়ে তারা যে অমানবিক আচরণে মেতেছে তা সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। অথচ কবি নুরুল আমিন সত্তর দশকেই কবিতায় সেই প্রতিবাদ উত্থাপন করেছিলেন। এটি মানবতাবাদী কবির দূরদর্শী ভূমিকা বৈকি!
দেশের সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার জন্য তিনি দায়ী করেন নানা প্রক্রিয়ার শোষক শ্রেণিকে। তাদেরকে তিনি মশার সঙ্গে তুলনা করেছেন; এবং সাফ জানিয়ে দিয়েছেন :
তবে শোনো হে মশক সৈন্যদল, তোমরা শোষক
আর শোষকের সঙ্গে শোষিতের সহবাস হয় না।
হয় না, হয় না।
(মশার সঙ্গে সহবাস : স্বপ্ন দেখি সুন্দরের)
শুধু তাই নয়, স্বার্থপর শোষকদের বিরুদ্ধে কবি নুরুল আমিন তীব্র প্রতিবাদী। তাই বলেন-
দাঁত দিয়ে ছিটতাম
পাষণ্ড মানবে
যারা মানুষের দুর্গতি পুঁজি করে
স্বার্থের ডালাস গড়ে তোলে
(না টর্নেডো না হ্যারিকেন : স্বপ্ন দেখি সুন্দরের)
তাঁর কবিতায় রাজনীতি আছে। সেখানে তিনি স্পষ্ট গণতন্ত্রপন্থী। স্বৈরশাসকের দমন-পীড়ন নীতিকে তিনি ঘৃণা করেন। সামরিক সরকারের কার্ফ্যু, ব্যারিকেড, হয়রানি এসব তাঁর কাছে বর্বরতার শামিল :
সেখানে পাখিরা বড় বেশি অসহায় কার্ফ্যুতে ভয়ার্ত মানুষের মতো
বেদনায় গোঙাতে- গোঙাতে শুধু কারাগারের প্রকোষ্ঠে
নির্যাতিতা ধর্ষিতা টরচার্ড রাজবন্দির ধ্বংসাবশেষ
সকল শুভ্রতার কলকাকলি চিল-বাজের থাবায় তড়পাতে-তড়পাতে
অন্যরকম যন্ত্রণার শব্দে মুগ্ধ হয় বিদ্ধ হয়
কালো পেঁচা হয় অবশেষে-
(কালো পেঁচার দেশে : লেগে আছে শ্যামল ছায়া)
কবি প্রতিবাদী হতে ভয় পান না। কারণ তিনি জানেন যে কবির কলম দমন-পীড়নকে তোয়াক্কা করে না, তিনি মরতে পারেন না। কবি তাঁর কাব্যের মধ্য দিয়ে পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন যুগ যুগান্তরে। তাই বর্ণবাদীরা বেঞ্জামিন মলয়ঁসকে ফাঁসিতে ঝুলালেও কবি নুরুল আমিনের দৃপ্ত উচ্চারণ-
ফাঁসি দিয়ে কবিদের মারা যায় না
ফাঁসিতে কবিরা মরে না
ফাঁসি দিয়ে কী লীভ
কবি তো বেঁচে থাকে
মানুষের হৃদয়ে
(ফাঁসি দিয়ে কবিদের : লেগে আছে শ্যামল ছায়া)
উত্তর-আধুনিক যুগের কবি নুরুল আমিন। তাঁর কাব্যে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনার অবতারণা রয়েছে। বিষয়ের ক্ষেত্রেও তিনি প্রগতিশীলতার প্রসারক। দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, রাজনীতি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ তাঁর কাব্যে অনন্যরূপ লাভ করেছে।
পূর্বেই উল্লিখিত ড. আমিন বাংলা ভাষার একজন একনিষ্ঠ সফল গবেষক। ভারতের প্রখ্যাত পণ্ডিত ড. পবিত্র সরকারের ভাষায়, ‘তাঁর কাজ (গবেষণাকর্ম) ও দৃষ্টিকোণ বাংলাদেশের বিদ্যাচর্চার উন্নত ঐতিহ্যকেই তুলে ধরে।’ এক্ষণে তাঁর কবি সত্তার বহুমাত্রিক পরিচয়েও আমরা মুগ্ধ হলাম। তাই তিনি একজন গবেষককবি বা কবিগবেষক বৈকি। সমাজ দেশ রাষ্ট্র রাজনীতি ব্যক্তিতন্ত্র প্রভৃতির ওপর তাঁর কাব্যিক পর্যবেক্ষণমূলক দৃষ্টিপাত মনোমুগ্ধকর। সাহিত্যে সত্য বিষয়টি তুলে আনতে তিনি সচেষ্ট এবং সফলও বটে। পুনর্বার বলি, তিনি একজন গবেষক, অথচ তাঁর কাব্য একজন কবির রচনা, গবেষকের গাম্ভীর্য দিয়ে তিনি কাব্যকে ভারাক্রান্ত করেননি। সরস শব্দ, অনুপম বাক্য-বন্ধ, লোকপ্রিয় বিষয় ও প্রাঞ্জল প্রকাশভঙ্গি কবি নুরুল আমিনকে অনন্যতা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী অলক রায়ের চমৎকার প্রচ্ছদ-চিত্র ও শিল্পী উত্তম বড়ুয়ার সজ্জায় ১৬০ পৃষ্ঠার মনোরম নির্বাচিত কবিতা গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ঢাকার জোনাকি প্রকাশনী। প্রকাশ সন ২০১৭, মূল্য ৩০০