হাসন রাজা- ধমনিতে তাঁর জমিদারের নীল রক্ত, হাতে ভোগের উপচে পড়া পেয়ালা এবং জীবনের এক অংশ ভোগ-সম্ভোগে মত্তও ছিলেন তিনি। কিন্তু উত্তরকালে সবকিছুকে উপেক্ষা করে অনাসক্ত জীবনাচারে অভ্যস্ত হয়ে তিনি মজেছিলেন এক বিশেষ নেশায়- মরমিবাদের ভাবদর্শনে। আত্ম-উপলব্ধির এই পর্যায়ে তিনি নিজেকে খুঁজে পান মাটির পিঞ্জরায়:
মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারে,
কান্দে হাসন রাজার মন মনিয়ায় রে।
নিজেকে উপলব্ধি করতে তাঁর অন্তরাত্মার প্রবল আর্তি জমিদার হাসন রাজাকে নিয়ে যায় কাব্য-গীত ভুবনের এক নতুন জগতে, সৃষ্টি করে স্বকীয় এক সঙ্গীত আঙ্গিক, এক নতুন ঘরানা- হাসন রাজার গান। তাঁর রচিত কাব্য গীতির সুর-বৈভব, ভাব-ঐশ্বর্য, দার্শনিকতা ও গায়কী শৈলী গুণ-বিচারে অপূর্ব। কিন্তু একটু অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে লক্ষ করলেই দেখা যায়, এর মাঝে লুকিয়ে আছে হাসন মানসের নানামুখী প্রবণতা। অনেকটা শ্রেণীগত অবস্থান ও আত্ম-উপলব্ধিগত নানা অস্থিরতার অভিঘাত এক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করলেও মরমিকবি হাসন রাজার নিজস্ব মত ও পথ নির্মাণে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং তা অবশেষে এক মোহনায় মিলিত হয়ে বাংলাসাহিত্যে সৃষ্টি করে এক নতুন ধারা- হাসন রাজার নন্দনতত্ত্ব।
হাসন রাজা উপলব্ধি করেন, মানবজীবনের সবচেয়ে বড় দুষ্টচক্র হলো ইন্দ্রিয় ও রিপু। এগুলো অদৃশ্যভাবে বিভ্রান্ত করে কাম, লোভ-লালসা, মোহ-ভোগের মায়াজালে মানুষকে বন্দী করে। এতে মানুষ পার্থিব ব্যস্ততায় নিজের প্রকৃত করণীয় এবং স্রষ্টা বা আল্লাহকে ভুলে যায়। অথচ স্রষ্টা সর্বত্র বিরাজমান। তিনি আছেন সৃষ্টিতে, বিশ্ব প্রকৃতিতে, ব্যক্তি স্বরূপে। হাসন দর্শনের মূল সুর তার সর্বেশ্বরবাদ বা সর্বব্যাপী সত্তায় বিধৃত, যা পরিণতিতে তাঁর ‘সকলই তুমি অন্তর্যামী, তুমি ভিন্ন কিছু নয়রে’– কথায় এসে মিশে যায়। এ বিষয়টি চরম জ্ঞানবাদের ধারাতেই হাসন রাজা উপলব্ধি করে স্রষ্টার প্রেমে মজে যান। তিনি তাঁর উপলব্ধিগত চেতনা নানামাত্রিক দ্যোতনায় উপস্থাপন করেন কাব্য-গীতির আদলে। এক্ষত্রে একজন দার্শনিকের গভীর অন্তর্দৃষ্টি তাঁর কবি মন আচ্ছন্ন করায় তাঁর গান হয়ে ওঠে হৃদয়গ্রাহী, চিরায়ত ও জন-নন্দিত।
হাসন দর্শন, হাসন কাব্য-গীতি, হাসন মানসকে বুঝতে হলে, জানতে হবে তাঁর একান্ত ভুবনকে। হাসন রাজা সিলেটের সুনামগঞ্জের লক্ষণছিরি গ্রামে ১৮৫৪ সালের ২৪ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা দেওয়ান আলী রাজা ও বৈমাত্রেয় ভাই উবেদুর রাজার অকাল মৃত্যুতে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে জমিদারির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। অল্প বয়সে জমিদারি, সংসার ও বিপুল বিত্তবৈভব হাতে পেয়ে জমিদার হাসন রাজা কিছুটা বেপরোয়া হয়ে ভোগ-বিলাসে মেতে ওঠেন। নারীর প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। হাসন পরিবারের উত্তরসূরি সাদিয়া চৌধুরী পরাগ ‘প্রেম বাজারে হাসন রাজা’ নিবন্ধে লিখেন, ‘জমিদার দেওয়ান হাসন রাজা যৌবনে বহু সুন্দরী রমণীর শয্যাসঙ্গী হয়ে সন্তান-সন্তানাদির জন্মদান করেছিলেন।’ (প্রসঙ্গ হাসন রাজা- আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত। বাংলা একাডেমি, ঢাকা। ১৯৯৮, পৃষ্ঠা ১৪৮)। হাসন দৌহিত্র অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ জানান, ‘কবির ৪ জন পত্নী ছাড়াও ১৬ জন উপ-পত্নী ছিল।’
নারীপ্রীতি ছাড়া কিছু অদ্ভুত কিসিমের সখ হাসন রাজাকে পেয়ে বসেছিল। তিনি বর্ষাকালে মানুষের ঘাড়ে চড়ে হাটে যেতেন। দু’জন জোয়ানের কাঁধে চড়ে মাঝে মধ্যে সুনামগঞ্জ শহরে ঘুরতেন। তিনি ঘোড়দৌড় পছন্দ করতেন। এ ছাড়াও তিনি নৌকায় গানের জলসা বসাতে বেশ পছন্দ করতেন। এ ধরনের এক গানের জলসার বর্ণনা দিয়েছেন সৈয়দ মুজতবা আলী ‘হাসন রাজা-২’ প্রবন্ধে (ভাদ্র ১৩৭৬ বঙ্গাব্দে সাপ্তাহিক দেশ-এ প্রকাশিত)। এতে মুজতবা তাঁর শৈশব হাতড়িয়ে লিখেন, ‘ভাওয়ালির খোলা জানালা দিয়ে রোমাঞ্চিত হয়ে দেখি, হাসন রাজা বেগুনি রঙের মখমলের পায়জামা, লাল রঙের কোট আর সবুজ রঙের পাগড়ি পরে নৌকার মাঝখানে ধেই ধেই করে চক্রাকারে নৃত্য করতে করতে গান গাইছেন, আর তাঁর চতুর্দিকে মণ্ডলাকারে বসে গণ্ডা আষ্টেক খাবসুরত যুবতী মৃদঙ্গ, মন্দিরা, হারমোনিয়াম, ক্লারিওয়েট, ব্যালাসরেঙ্গী বাজাচ্ছে (তখন অবশ্য ওই যন্ত্রগুলো চিনিনি- পরবর্তীকালে ইনরিট্রসপেকট্ এদেরকে শনাক্ত করেছিলুম।) আর মাঝে মাঝে দোহার দিচ্ছে। হাসন রাজার অবস্থা তখন অন্তত আমার কাছে মনে হয়েছিল – উন্মাদ প্রায়।’
জমিদারির বিত্তবৈভব ও বয়স দোষে প্রথম জীবনে হাসন রাজার মধ্যে বিলাসিতা লক্ষ করা গেলেও জীবনের এক বিশেষ সময়ে এসে তিনি আত্ম-উপলব্ধির মাধ্যমে অনাসক্ত জীবনাচার আত্মস্থ করে আত্ম-অনুসন্ধানে মগ্ন হন। আত্ম-জিজ্ঞাসার আলোকে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করেন,
যমের দূতে আসিয়া তোমার হাতে দিবে দড়ি,
টানিয়া টানিয়া লইয়া যাবে, যমের পুরীরে।
সেই সময় কোথায় রইব (তোমার) সুন্দর সুন্দর স্ত্রী
কোথায় রইবো রামপাশা, কোথায় লক্ষণ ছিরি রে।
করবায় নিরে হাসন রাম পাশায় জমিদারি।
অন্য এক গানে তিনি একইভাবে বলেন,
আশয় বিষয় পাইয়া হাসন, তুমি কর জমিদারি
চিরদিন থাকিবায়নি হাসন রাজা লক্ষণছিরি।
কান্দে কান্দে হাসন রাজা, কি হবে উপায়,
হাশরের দিন যখন পুছিবে খোদায়।
ছাড় ছাড় হাসন রাজা, এই ভবের আশ,
একমনে চিন্তা কর, হইবায়, বন্ধে দাশ।
একদিকে জীবনের সব বর্ণিল আয়োজন, অন্যদিকে পরম প্রভুর পথে প্রত্যাবর্তনের আকুল আগ্রহ জাগতিক হাসন রাজার ভেতরে অন্য এক হাসন রাজার জন্ম দেয়। স্রষ্টার স্বরূপকে অন্তঃচক্ষু দিয়ে দেখে হাসন রাজা চমকে ওঠে :
আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপরে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ,
(আর) দিলের চক্ষে চাইয়া দেখ বন্ধুয়ার স্বরূপরে।।
ঝলমল করে (ওরে) রূপে বিজলীর আকার,
মনুষ্যের কি শক্তি, চক্ষু ধরিবার।
হাসন রাজা রূপ দেখিয়া হইয়া ফানা ফিলা
হু হু হু হু ইয়াহু ইয়াহু, বলে আল্লা আল্লা।
জমিদার হাসন রাজার মাঝে আসে বিরাট পরিবর্তন। তিনি সংসার, বিষয়-সম্পত্তি ও ভোগ বিলাসের মায়াজাল ছিন্ন করে ক্রমে আল্লাহপ্রেমে ঝুঁকে পড়েন আধ্যাত্মিক মরমিবাদের দিকে। গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর মতে, ‘প্রথম জীবনে হাসন রাজার চরিত্র দোষ দেখা দিয়েছিল। নারী সম্পর্কে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তবে বয়োবৃদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চরিত্রের এইসব স্খলন-পতন ক্রমশ দূর হয়ে যায়।’ (প্রসঙ্গ হাসন রাজা/ আবুল আহসান চৌধুরী। বাংলা একাডেমি, ঢাকা। ১৯৯৮, পৃ: ১৫৬)। আত্ম-উপলব্ধির এই পর্যায়ে মরমিবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হাসন রাজার মনে জ্বলে উঠে প্রেমের আগুন :
আগুন লাগাইয়া দিল কুনে হাসন রাজার মনে,
আগুন লাগাইয়া দিল কোনে হাসন রাজার মনে।
তাকে ধরতে গিয়ে হাসন খুঁজে পান নিজেকে-
আমি ধরিতে না পারি গো তোরে,
চিনিতে না পারি গো তারে
কেরে সামাইল আমার ঘরে।
ধরতে গেলে পাই না তারে লড়ে আর চড়ে,
আন্ধাইর গুন্ধাইর ঘরের মাঝে হুড় হুড় গুড় গুড় করে।
কত রঙ্গে রঙ্গে সে যে রঙ্গের খেলা করে,
বাজিকরের বাজির মত খেলে তর তরে।
জাতিয়া জুতিয়া ধইলাম আমি দেখিতাম তারে,
দেখতে দেখতে দেখি ধরছি হাসন রাজারে।
আবার অন্যত্র তিনি লিখেন-
হাসন রাজায় কয়, আমি কিছু নারে, আমি কিছু নয়,
অন্তরে বাহিরে দেখি, (কেবল) দয়াময়’।
এই দয়াময় কোন সময় তাঁর কাছে ‘আল্লাহ’, কোন কোন সময় শ্রীহরি-শিব শংকরী কালি, আবার কোন সময় ‘নিরঞ্জন’। তিনি বলেন,
হাসন রাজার বাউলা মনে সদায় রাখিও আল্লাহ,
আর কিছু মনে আসলে পড়িও নাওজুবিল্লাহ।
আবার অন্যত্র নিজ ধর্মচিন্তার বিপরীতে এসে তিনি জানান,
আমার হৃদয়েতে শ্রীহরি, আমি কি তোর যমকে ভয় করি
শত যমকে তাড়িয়ে দিব, সহায় শিব শংকরী।
অথবা-
হাসন রাজা কালী ভক্ত কালীপদ সার,
কে বুঝিতে পারে মায়ের অন্ত ব্যাপার।
আবার তিনি বাউল গুরুবাদের একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন,
গুরুর পদে করবে সাধন,
(ওরে) গুরুর বাক্য ঠিক রাখিলে
পাবে রে তুই নিরঞ্জন।।
এইভাবে তিনি বিভিন্ন প্রতীক, রূপক, ভাব, চিত্রকল্পের মাধ্যমে তাঁর আরাধ্য ‘পরমাত্মার সন্ধানে’ নিরন্তর ব্যস্ত-ব্যাকুল থেকেছেন। ‘মৌলা’ নামের আরাধ্য এ শক্তির প্রেমে তিনি এতই বিভোর যে, তিনি নিজেকে ‘বাউলা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন,
বাউলা কে বানাইল রে হাসন রাজা রে,
বাউলা কে বানাইল রে,
বানাইল বানাইল বাউলা তার নাম হয় মৌলা,
দেখিয়া তার রূপের চটক হাসন রাজা হইল আউলা।
লক্ষ করলে দেখা যায়, হাসন মানসে বাউল উপাদানের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। বাউল তত্ত্বের ভাবনির্ভর অনেক গানও তিনি লিখেন। দেহমাঝে পরমাত্মার সন্ধানে বাউলদের যে আত্ম-অনুসন্ধান হাসন রাজার দর্শনেও তার সন্ধান মেলে। তিনি তাঁর পিয়ারীকে আপন দেহ-ভুবনের মাঝেই দেখেছেন :
রূপ দেখিলাম রে নয়নে, আপনার রূপ দেখিলাম রে,
আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল মোরে।
দেখা দিয়া প্রাণ লইয়া সামাইল ভিতরে
আদম ছুরত দেখা দিল ধরিয়া আমারে।
এ ধরনের অনেক বাউলীয় বা বৈষ্ণবীয় মনোভাবের কবিতা তাঁর লেখনীতে স্পষ্ট হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি বাউল ছিলেন না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি কিছুটা নিরাসক্ত জীবনাচার আত্মস্থ করলেও তিনি সংসারত্যাগী ছিলেন না। হাসন দৌহিত্র অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ হাসনকে বাউল বলতে একেবারে নারাজ। তাঁর মতে, ‘হাসন চিশতিয়া তরিকার লোক।’ তিনি শরিয়ত পন্থী একজন খান্দানি সাধক। সৈয়দ মাহমুদ আলী তাঁর পীর ছিলেন। অবশ্য পরে এক সময় পীরের সংস্রব ত্যাগ করে আত্মজ্ঞানের মাধ্যমে হাসন রাজা তাঁর মত প্রকাশ করেন :
অন্য পন্থে না যাইয়া প্রেম পন্থে গেলে,
পাইবায় পাইবায় খোদা হাসন রাজা বলে।
তাঁর এই প্রেম পথে খোদা তথা আল্লাহ-ই সব। প্রেম-পাগল হাসন রাজার গভীর মগ্নলীলায় স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ-ইলাহি, কামনা-বাসনা নেই।
পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা, নগর, বন্দর, গ্রাম- সব পেরিয়ে নদীগুলো যেমন সাগর সঙ্গমে একাকার হয়ে যায়; তেমনি হাসন মানসে একমুখী ধারা লক্ষণীয়। জীবন, জগৎ ও সৃষ্টি বিষয়ে হাসন মানসে নানামুখী দৃশ্যমান প্রবণতা লক্ষ করা গেলো পরিশেষে তা কিন্তু ইসলাম নির্দেশিত জীবন পথে এসে একাত্ম হয়ে যায়। হয়তো তাই আধ্যাত্মিক সাধক হাসন রাজা বলতে পেরেছেন :
হাসন রাজায় সদায় দেখে আল্লাহ্
কি বুঝবে রে মোল্লা।
হাসন রাজা সদায় দেখে আল্লাহ্।
এক বিনে দুই নাই কেবল এক আল্লাহ্,
যত দেখি সংসারেতে কেবলই এই হিল্লা।
আল্লাহ্ বিনে কিছু নাই ইল্লাল্লাহ্ ইল্লাল্লাহ্,
হাসন রাজা গান গায় হইয়া ফানাফিল্লাহ্।
আল্লাহর প্রেমেই হাসন রাজা ফানাফিল্লা, আল্লাহ প্রেমেই হাসন রাজা দেওয়ানা। ‘হাসন রাজা প্রেমের মানুষ, প্রেমের নাচন করে।’ হাসন কণ্ঠে ধ্বনিত হয় :
সোনাবন্দে আমারে দেওয়ানা বানাইল,
দেওয়ানা বানাইল মোরে পাগল করিল
সোনাবন্দে আমারে দেওয়ানা বানাইল।
এই সোনাবন্দের রূপে হাসানের বাঁকা দুই নয়নে নিশা লেগে যায়:
নিশা লাগিলরে, বাঁকা দুই নয়নে
নিশা লাগিল রে।
হাসন রাজা পিয়ারীর প্রেমে মজিল রে।
হাসন রাজা খুব বেশি গান লিখেননি। হতে পারে তা ৪-৫ শত। সব উদ্ধার করাও সম্ভব হয়নি। তবে জীবদ্দশায় ১৯০৭ সালে (১৩১৪ বঙ্গাব্দে) সিলেটের ইসলামিয়া প্রেস থেকে প্রকাশ করা হয় হাসন রাজার কালজয়ী পঙক্তিমালার প্রথম সংকলন ‘হাসন উদাস’। অনেকটা প্রাচীন পুঁথির আদলে প্রকাশিত এই বইয়ে হাসন রাজার ২০৩টি গান সংকলিত হয়। পরবর্তীতে ১৯২৪ সালে (১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ১৭ বৈশাখ) কবির জ্যেষ্ঠপুত্র দেওয়ান গনিউর রাজা চৌধুরী বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ বের করেন। বর্তমানে দুর্লভ বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ১১৩ এবং এতে সংকলিত গানের সংখ্যা ২০৬। এসব গানে শিল্পসমৃদ্ধ ভাব জাগানিয়া কথার সাথে আঞ্চলিক সুরের মিলনে অপূর্ব এক শৈলী নির্মিত হয়। সংখ্যায় কম হলেও গানগুলোর ভাবঐশ্বর্য বাংলা কাব্য-গীতির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
হাসন রাজার গানের সাহিত্য মূল্য ও দার্শনিকতা অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৯২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর ‘ইন্ডিয়ান ফিলসফিক্যাল কংগ্রেসে’র কলকাতা অধিবেশনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ‘গ্রাম্য কবি’ হিসেবে অভিহিত করলেও এটা স্বীকার করতে ভুল করেননি যে, ‘ব্যক্তি স্বরূপের সহিত সম্বন্ধ সূত্রেই বিশ্বস্ত’- বড় ধরনের এ দর্শন তত্ত্বটির সন্ধান হাসন রাজার গানেই তিনি পেয়েছেন। প্রভাত কুমার শর্মার মতে, ‘হাসন রাজা সাহেব খাঁটি মরমি ও কবি ছিলেন। একটা কিছু তাঁহার সম্মুখে ছিল, যাহা তিনি ধরিয়াও ধরিতে পারছিলেন না। সেই অনুভূতির ব্যথায় তিনি অস্থির হইয়া কাঁদিতেছেন, আবার ক্ষণিকের জন্য আনন্দে নাচিতেছেন। তাঁহার এই হাসি-কান্নার কাহিনী নীল আকাশের মতো গভীর, দূর দিগন্ত রেখার মতো ঝাপসা, সন্ধ্যার অন্ধকারের মতো রহস্যময়- এইখানেই তাঁহার কবিত্ব, এইখানেই তিনি মরমি।’ ড. আশরাফ সিদ্দিকীর মতে, ‘তিনি প্রকৃতই একজন আধুনিক সুফি- যার উৎসমুখ উপমহাদেশের বহু শাখায় বিস্তৃত অধ্যাত্ম-অশ্বত্বের প্রান্ত মূলে, যার ব্যাখ্যা দিতে পারে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, দর্শনতত্ত্ব, লোকত্তত্ত্ব এবং লোয়াকত অভিজ্ঞান।’ (হাসন রাজা (নিবন্ধ) ড. আশরাফ সিদ্দিকী। বাউলা-হাসন রাজা স্মরণ সন্ধ্যা স্মরণিক। ৪ নভেম্বর ১৯৯৭। ত্রিতরঙ্গ সঙ্গীত দল, চট্টগ্রাম।) হাসন রাজা বাঙালির সম্পদ। গান দিয়ে যে ক’জন কবি নিরাভরণ হৃদয়ানুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন, হাসন রাজা নিঃসন্দেহে তাদের অন্যতম। তার গান শ্রোতার উপলব্ধি চেতনায় অনুরণন তোলে, নেশা জাগায়।।