
সুন্দরের সপ্তপদী
ফজলুল হক তুহিন
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৬
প্রকাশক : পরিলেখ প্রকাশন
প্রচ্ছদ : কালিদাস কর্মকার
মূল্য : ১২০ টাকা
একজন সৃজনশীল মানুষের প্রধানতম বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হলো, নিজেকে বারবার অতিক্রম করা। অর্থাৎ তিনি তার সৃজনকর্মের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রতি মুহূর্তে নতুন করে আবিষ্কার করেই আনন্দ পান। তার এই নিজেকে আবিষ্কারের নেশায় তাকে করে তুলে নিরাক্ষাপ্রিয়। আর নিরাক্ষাপ্রিয় এই সকল কবি, কখনো কবিতার বিষয়বস্তু ও ভাব-ভাষা নিয়ে নিরীক্ষা করে থাকেন; আবার কখনো আঙ্গিক নিয়ে। আঙ্গিক নিয়ে আধুনিক যুগে প্রথম প্রচেষ্টা শুরু হয় খুব সম্ভবত মাইকেল মধুসূদন দত্তের সনেট চর্চার মাধ্যমে। সনেট চর্চার যে সূচনা উনিশ শতকে শুরু হয়, বিশ শতকে এসে তা বিভিন্ন ছন্দ-অভিজ্ঞ কবির হাতে নবরূপ লাভ করে। এই সনেট ছাড়াও আঙ্গিক গত দিক থেকে চর্চা হতে থাকে হাইকু, রুবাইয়াত। এমনকি সাম্প্রতিক কালে এসে যুক্ত হয়েছে লতিফা নামীয় আরবি কবিতার আঙ্গিক। সে দিক থেকে সপ্তপদী ধারণাটি বাংলা কবিতায় নতুন। বিশ্বসাহিত্যে সপ্তপদীর ধারণা আছে কি না সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত জানতে পারি না। আমার অধিতবিদ্যা বলে সপ্তপদী আঙ্গিকগত ভাবনা বাংলা কবিতায় প্রথম দেখতে পাচ্ছি কবি ফজলুল হক তুহিনের সৃজিত কাব্যগ্রন্থ সুন্দরের সপ্তপদী-তে। সাত লাইনের বিশেষ ভাব বিশিষ্ট কবিতা হলো সপ্তপদী। যদিও সপ্তপদী বিষয়ে আমাদের অলংকারশাস্ত্রে এখনো তেমন কোনো আলোচনা পাই না। অতএব এ কথা অবশ্যই বলতেই হয় যে, সপ্তপদী আঙ্গিকটির স্রষ্টা হলেন শূন্য দশকের কবি ফজলুল হক তুহিন।
সত্তরটি চমৎকার কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে কবি ফজলুল হক তুহিনের নান্দনিক কাব্যগ্রন্থ সুন্দরের সপ্তপদী। কাব্যটিতে প্রকৃতির সাথে কবি মনের সৌন্দর্য প্রীতির সংশ্লেষ ঘটেছে। কবি প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে স্রষ্টার সৌন্দর্যের মধ্যে ডুব দিয়ে সাঁতরান। কবির ভাষায় :
আজ বসন্ত আমি খুঁজে ফিরি এর শিল্পীকে
কত বর্ণের কত গন্ধের কত বিচিত্র রূপ চারদিকে
মুকুলে মুকুলে ফুলে নিসর্গে বহে একি সুন্দর আনন্দ
হৃদয়ে বুঝেছি তুমিই সৃজন শিল্পী তুমিউ সুর সঙ্গীতে
তুমি এঁকে দাও প্রকৃতির সব রঙরূপরেখা
এখানেই আমি ডুবি, সাঁতরাই, পাই তোমারই দেখা
তবে আজকের বসন্ত কারো অনন্ত মন পৃথিবীতে।
(সুন্দরের সপ্তপদী-৩)
শুধু বসন্ত বন্দনায় নয়। বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিও কবির মনে রসের সপ্তধারা তৈরি করে। গতিমান জলভরা মেঘ দেখে আপ্লুত হয়ে ওঠেন। বর্ষার সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে চলে যান সোমপুর বিহারের পুরাকীর্তির জৌলুসহীন ধ্বংসাবশেষে। সেখানে গিয়ে কবি গৌতম বুদ্ধের অমিয়বাণী “অহিংসা পরম ধর্ম” শোনেন। তবে সেই বাণী এখন আর উজ্জ্বল নয়। কালের পরিক্রমায় হয়ে ওঠে ধুলোয় ধূসর। কবির ভাষায় :
বুদ্ধ, আপনি একবার এসে পাহাড়পুরের এই সোমপুর বিহার দেখুন
কালের শাসনে সূর্যাস্তের রঙে জৌলুসহীন এই ধ্বংসাবশেষ
ধুলোর শরীরে কেমন ধূসর বাণী : অহিংস পরম ধর্ম
তবুও গগনে পবনে জমিনে প্রাণজ জোছনা জীবন জ্বেলেছে অবিনাশী
জোছনার এই রঙ ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া লালচে ইটের প্রাচীরে
না বলা কথার কত টেরাকোটা নকশা এঁকেছে
এখানে প্রাচীন সব সুন্দর এসেছে নীরবে মহাকালের আবীরে॥
(সুন্দরের সপ্তপদী-৮)
সোমপুরের মহাকীর্তির গৌরব আজ ধূসরিত। ময়নামতির রক্তাভ ইটের ভগ্নস্তূপের কান্না কবি হৃদয়ে আঘাত হানে। তার মনে পড়ে এই ধ্বংসস্তূপের বুকে একদিন হতে জ্ঞানের চর্চা। কবি বুদ্ধের ধ্যানের ছবি দেখতে পান সেই বিহারের দেয়ালে। নিজেকে যেন স্থাপন করেন বুদ্ধের জায়গায়। “নয়া সভ্যতার হাসি ভুলে বুদ্ধের ধ্যানের মধ্যে ডুবে ডুবে/ আমি বধিকক্ষে পেলাম জ্ঞানের গুপ্তধন-সুন্দরের রহস্যের ধারা॥” বুদ্ধের জগৎ তাকে যেমন জ্ঞান দান করে তেমনি হযরত খানজাহান আলী (রহ.) নির্মিত ষাট গম্বুজের উপরে কড়ই পাতার ছায়া চুপি চুপি বলে যায় প্রার্থনার কথা। কিভাবে একদিন মিলেছিলেন মানুষের সাথে। আসে কালাপাহাড় জাগ্রত সবুজ ঘাসে চেতনার সরোবরে। কবি সুন্দরের পিপাসী হয়ে ইতিহাসের পথে যেমন বিচরণ করছেন কল্পনার চাদরে। তেমন আবার পরিব্রাজকের মত ছুটে যাচ্ছেন দার্জেলিঙে। দার্জিলিঙের পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা বল্লমের মত সারিসারি ঝাউ গাছ কবিকে দেখে স্যালুট করছে। তিনি সেই পাহাড় থেকে মেঘকে দেখে মেঘের সাথে নিজের মনের পাখা মেলে ঘুরছেন এ যেন ম্যাজিক রিয়েলিজম। কবির ভাষায় :
বল্লমের মতো সারি সারি ঝাউ গাছের স্যালুট নিতে নিতে
আকাশের সিঁড়ি বেয়ে ঈগলের মতো পাখা মেললাম
তুলোতুলো মেঘের আকাশে, হেসে ওঠে দার্জিলিং
মেঘের পালক দুই হাতে সরিয়ে পুবের পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে
মেলে দিলাম দুচোখ-আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে
বিস্মিত বিমুগ্ধ হতে হতে আমি ডুব দিলাম সূর্যের সরোবরে
শতমুখী আলোর অশ্চর্যে হারালাম-সুন্দরের কাঞ্চনজঙ্ঘার চরাচরে॥
(সুন্দরের সপ্তপদী-৪৪)
কবি ফজলুল হক তুহিন সৌন্দর্যের সন্ধানে হেঁটেছেন ইতিহাসের পথে। তবে সমকালকে তিনি পরিহার করেননি। অবহমান বাংলার যে সৌন্দর্য তা কবিকে আলোড়িত করেছে। সবুজ ধানের শিষের দোল তার হৃদয়ে তৈরি করে আলোড়ন। তবে কবি এই রূপ বর্ণনা করলেন চিত্রকরের মত। ৩৩ নম্বর সপ্তপদীতে সেই চিত্রিত প্রকৃতির নান্দনিক রূপ পাই :
সবুজ ধানের নবীন শিষের নাচে হাওয়ায় দোল
কারুময় কাজে হাজার রঙের প্রজাপতি মেলেছে আঁচল
বাহারি ফড়িং বাতাসভেলায় উড়ছে তুমুল
দুটি টুনটুনি লাফিয়ে বেড়ায়, সুবাস ছড়ায় আমের মুকুল
নতুন পাতায় সবুজ পোশাক রোদের খেলায় স্বপ্ন বোনায়
আমার মতন পথিক পাগল সুন্দরে দেয় গহিন সাঁতার
চৈতালি ক্ষণে কৃষকের মনে জট খুলে যায় তাবৎ ধাঁধার।
(সুন্দরের সপ্তপদী-৩৩)
আবহমান বাংলার যে ঋতু বিচিত্রতা, সেই বর্ণনা রয়েছে এই কাব্যটিতে। তবে তিনি ভুলেননি পাহাড়ের নৈর্সগিক সৌন্দর্যের কোমল পরশ পেতে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চোখ মেলে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলেন। এ যেন মহান আল্লাহ পাকের সেই আয়াতের অনুসরণ যে, “তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়, আর আমার নিদর্শন লক্ষ কর এবং আমার প্রশংসা কর।” পাহাড় চূড়ায় মেঘ আর পাইনের ভালোবাসা দেখে “দ্য লাস্ট ডেজ অব পাম্পেই” সিনেমার শেষ দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যায়। যেখানে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েও গ্লকাস ও আয়োনি চোখ চোখ রেখে চুমু খায়। কবি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ সেই দেখলেন যেনো পাইনের ও মেঘের মধ্যে। আর হাঁসের ডানার মত মেঘকে উড়তে দেখে নিজেও হারিয়ে গেলেন মেঘের সাথে। কবির বর্ণনায় :
হাঁসের ডানার মতো মেঘের মেয়েরা উড়ে উড়ে বেড়ায় দশদিগন্ত
আমরাও মেললাম ডানা, ঈগলের মতো ঘর বাঁধলাম আকাশেল ঠিকানায়
বিমুগ্ধ নির্বাক হতে হতে মনে হলো প্রকৃতির কুহক করেছি জয়।
ওই তো ডাকছে রোদ ঝিলমিকি সারি সারি পাহাড় বেষ্টিত সুন্দরের হিমালয়।
(সুন্দরের সপ্তপদী-৪৫)
পাহাড় চূড়ায় ওঠার সময় মনে পড়ে যাচ্ছে ট্রেন ভ্রমণের অনুভূতি। এ যেন “ঝিকমিক ঝকঝক অরণ্যের সবুজ হৃদয় ছুঁয়ে ছুঁয়ে ট্রেন চলেছে নাচের ছন্দে।” আর সেই ট্রেন ভ্রমণ কবির “জানালায় মেঘের পরীরা দিয়ে যায় চুমু।” আবার “পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সাপের মতো পেঁচানো সরু পথ দিয়ে পিঁপড়ার মতো” নামতে নামতে দুরুদুরু বুকে শুনতে পান ঝরা ধারা আছড়ে পড়ার শব্দ। আর সেই শব্দের কুহকে মোহিত হয়ে কবি চোখ মেলতেই মনের দরজা খুলে গেল যাদুর ছোঁয়ায়। আর তখনই তো মনে পড়ে :
….হিম ধারায় পা ডুবিয়ে গা ভাসিয়ে
স্নাত হতে হতে মনে হলো পেয়েছি জান্নাত, এখানেই কেটে যাক দিনরাত॥
(সুন্দরের সপ্তপদী-৪৭)
আগেই বলেছি ঋতু বৈচিত্র্যের সাথে সাথে প্রকৃতির যা বিভাবরীর নবায়ন ঘটে সেই পোর্টেট এঁকেছেন শব্দের কালো আছড়ে। চিত্রকরের তুলির দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন গোধূলি লগ্নের সূর্যালোকের চিত্র। বৈকালিক পরিবেশে পুকুরের পানিতে সূর্যের সোনালি আভা যে স্বর্ণমণ্ডিত ঢেউয়ের সৃজন করে। সেই দৃশ্য দেখি:
এ-এমন এক পুকুর যেখানে সারাক্ষণ জল করে টলমল, মিহি ঢেউ করে খেলা
গোধূলি বেলায় সূর্যের রঙ মনের হাউসে আলপনা আঁকে ঢেউয়ের বাঁকে
রাতের আঁধারে জোছনার লিপি জলের জগতে হয়ে ওঠে বাক্সময়
নক্ষত্র হয়ে আমি চুপচাপ পানকৌড়ির মতো জলে ডুবে দেখি সুন্দরের জয়।
(সুন্দরের সপ্তপদী-৫২)
জোছনা রাতের যে মায়াময় রূপ তাও আছে এই সপ্তপদীটিতে। কাব্যটিতে আছে পদ্মাপাড়ের প্রকৃতির ব্যঞ্জনা; যে সৌন্দর্য আকুল করেছিল বিদ্রোহী কবিকে। আর সেই বিদ্রোহের সমাবেশ দেখি বৈশাখের কালো মেঘের মধ্যে। কালবৈশাখীর তাণ্ডবলীলা একদিকে যেমন ধ্বংসের অন্যদিকে সৃজনের ধারা বহন করে চলেছে। অর্থাৎ এখান ধ্বংস ও সৃষ্টি পাশাপাশি যেমন কোলাকুলি করে অবস্থান করে আছে। এটা বলা বাহুল্য হবে না যে আমাদের সাহিত্যে কালবৈশাখীকে নিয়ে খুববেশি কবিতা সৃজন হয়নি। যা হয়েছে তা খুব সামান্য। তবে কালবৈশাখী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও ফররুখ আহমদকেও আকৃষ্ট করেছিল। তাদরেই উত্তরসূরি কবি ফজলুল হক তুহিন কালবৈশাখের চিত্র আঁকলেন ৫৫ সংখ্যক সপ্তপদীতে।
সারাদিন রোদের রাজত্ব শেষে সন্ধ্যার গগনে কালো মেঘের গুঞ্জন
অন্ধকার চিরে ফালা ফালা করে দেয় বিদ্যুতের আলোক করাত
হঠাৎ আলোর ঝলকানি- অপ্রকাশ্য সব মুহূর্তেই বাতিময়
থেকে থেকে মেঘের গর্জনে তুমুল বৃষ্টিতে দিগন্তব্যাপিয়া
কালবৈশাখীর স্বর
ভেঙে পড়ে ঘরবাড়ি, গাছপালা; ভেসে যায় ফসলের ক্ষেত, নাও. চর
সকালেই দেখি মাটি ফুঁড়ে হাসছে বীজের সবুজ অঙ্কুর
আমি হাঁটি আর কান পেতে শুনি বিনাশের পর সৃজনের সুর॥
(সুন্দরের সপ্তপদী-৫৫)
কবি মাতৃজঠর থেকে আত্মপ্রকাশের যে পবিত্র পরিবেশ সেই সেখানের প্রাণের বিকাশে যে সাধনা তার প্রসঙ্গেও তুলে এনেছেন কাব্যিকতার মধ্য দিয়ে। এখানে তার দার্শনিকতা ফুটে ওঠে। তার কাব্যটিতে আরো ছড়িয়ে আছে নাগরিক বাতাসের বিষবাষ্প, পলিমাটির ঘ্রাণ, পূর্বপুরুষের কালো জমিনে বৃক্ষের চারা রুয়ে দেয়া, মাটি কর্ষণ, পাটিপুলি ও ধানের মৌ মৌ ঘ্রাণের মাতাল কৃষক-কৃষাণির ভালোবাসার চিত্র। পুরো কাব্যটি হয়ে ওঠে সুন্দরের উইকিপিডিয়া।
আগেই বলেছি সপ্তপদী এই ধারণাটি নতুন। এই কাব্যগ্রন্থের সব কবিতা অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত ছন্দে বিন্যাস দেখা যায়। কাব্যটি প্রকাশিত হয়েছে জানুয়ারি ২০১৬ সালে। প্রকাশ করেছেন পরিলেখ প্রকাশনী। কালিদাস কর্মকারের ছবি অবলম্বনে সুন্দর প্রচ্ছদে আবদ্ধ গ্রন্থের মূল্য রাখা হয়েছে ১২০ টাকা। আমি এই কাব্যগ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করছি ♦♦♦