সাহিত্যের অনুষঙ্গ ও অন্যান্য প্রবন্ধ
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৮
প্রকাশক : দেশজ প্রকাশন
প্রচ্ছদ : সাইফ আলি
মূল্য : ২৮০ টাকা
বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য তরুণ লেখক মুহাম্মদ ফরিদ হাসান প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, এমনকি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কলাম লিখছেন সমানতালে। দীর্ঘদিন ধরে লিখলেও ‘সাহিত্যের অনুষঙ্গ ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ তাঁর প্রথম গ্রন্থ। এটি লেখকের প্রথম বই হলেও শুধু তথ্য নির্ভর বা আনাড়ি উপস্থাপন নয়, বইটিতে প্রকাশ পেয়েছে বিবিধ মৌলিক গবেষণা। ২০১৭ সালে দেশজ পাণ্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় প্রবন্ধ ও গবেষণা শাখায় পুরস্কারপ্রাপ্ত এ গ্রন্থে সাহিত্যের মোট ২৯টি গুরুত্বর্পূণ বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এতে স্থান পেয়েছে দেশি-বিদেশি সাহিত্য ও সাহিত্যিক, চিত্রকলাসহ বিভিন্ন গবেষণাধর্মী জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ ও নিবন্ধ। বইটির প্রথম প্রবন্ধ ‘সাহিত্যের অনুষঙ্গ’-এর শুরুতেই লেখক বলেছেন, ‘একজন সাহিত্যিক মাত্রই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ, তাঁর হৃদয় প্রবলভাবে সংবেদী, তাই জীবনের নানা রূপ ও রং তিনি উপলদ্ধি করেন সর্বাগ্রে। জীবনকে দেখার তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণের মতো নয়, বরং আলাদা। তাই রাষ্ট্রে-সমাজে সাহিত্যিক মানেই একজন বিশেষ মানুষ’। শত শত বছর ধরে লেখকগণ সাহিত্যে যেসকল উপকরণ ব্যবহার করে আসছেন তা প্রায় একই। ভাবের দিক থেকে প্রায় সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও উপস্থাপনায় ছিলো বৈচিত্র্য। পাশাপাশি যুগের সাথে তাল মিলিয়ে জীবনের সাথে সাথে সাহিত্যেও যোগ হয়েছে নানা অনুষঙ্গ। আবার এমনও কিছু উপকরণ রয়েছে বর্তমানে যার প্রয়োজনীয়তা নেই বললেই চলে। যেসব উপকরণ সাহিত্যে স্থান পেয়েছে তা সময়কে ধরে রাখবে। সময়ের ¯্রােতধারায় ভাববাদ ও বস্তুবাদে যে পরিবর্তন এসেছে তা উপস্থাপন করতে গিয়ে আলোচ্য প্রবন্ধে লেখক বলেছেন, ‘যাপিত জীবনের অনুষঙ্গ বাড়লে সাহিত্যের অনুষঙ্গও বাড়বে-এমনটাই স্বাভাবিক। এ কারণে ফেসবুক, টুইটার, নাগরিক প্রেম, মোবাইল, ভার্চুয়াল, গেম, এসি, রকেট, সেলফি, মেসেজ, কল, ইন্টারনেট প্রভৃতি প্রযুক্তিজাত অসংখ্য শব্দ সাহিত্যের অনুষঙ্গেও তালিকায় যুক্ত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাব ও বক্তব্য অক্ষুণœ থাকলেও অনুষঙ্গ ঠিকই বদলে গেছে। উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। বাংলা সাহিত্যে ‘চিঠি’ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গের স্থান দখল করে ছিলো।’ মূলত সময় পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উপকরণ। সময় সব ঠিক করে দেয়, জীবনের প্রয়োজনে কী কী উপকরণ থাকবে অথবা থাকবে না। লেখক প্রবন্ধটির শেষপ্রান্তে এসে বলেছেন, ‘লেখক তাঁর সময়কে ধারণ করেন এবং চিন্তা-চেতনা ও উপলদ্ধিতে তিনি সময়ের চেয়েও এগিয়ে থাকেন।’
‘সালভাদর দালি : খেপাটে এক সৃষ্টিশীল’ প্রবন্ধটি আলোচ্য গ্রন্থের বিশেষ একটি রচনা। সালভাদর দালি চরিত্র বা জীবনী শিশু কিশোরদের মনের দিক দিয়ে বড় করতে এবং তাদেরকে গুণীমানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে ভূমিকা রাখবে বলে বিশ^াস করি। একজন সাধারণ মানুষ কিভাবে বিশ^খ্যাত হতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ চিত্রশিল্পী দালি। লেখকের বক্তব্যে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে সালভাদর দালির জীবন ও যাপন। প্রাবন্ধিক লিখেছেন, ‘শৈশব থেকেই দালি ছিলেন বিচিত্র, অস্থির ও দুরন্ত। ছেলেবেলা থেকেই দালি চেয়েছেন সবাই তাকে দেখুক এবং এ দেখা হবে ভিন্ন দৃষ্টিসম্পন্ন।’ শুধু তাই নয়, দালি যশ ও খ্যাতি পেতে চাইতেন। পৃথিবী জয় করার স্বপ্নে বিভোর দালিকে নিয়ে লেখক বলেছেন, ‘শৈশব থেকেই দালি খ্যাতি চাইতেন, উচ্চ আশা ছিলো প্রচুর। তিনি পথিবী জয় করার স্বপ্ন দেখতেন।’ বলা চলে পৃথিবীতে যতজন খ্যাতিমান মানুষ রয়েছেন সম্ভবত সালভাদর দালিই তাঁদের মধ্যে ব্যতিক্রম। তার জীবন পদ্ধতি ছিলো আকর্ষণীয় এবং পিকুলিয়ার। অথচ নবযৌবনে তীব্র আত্মবিশ^াস থেকে দালি নিজেকে নিজেই মেধাবী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বসেন। ফরিদ হাসান জানাচ্ছেন, ‘তাঁর বয়স যখন মাত্র ২৫ বছর, তিনি নিজেকে ‘জিনিয়াস’ বলতেন এবং দাবিতে আত্মবিশ^াসের কোনো ঘাটতি ছিলো না।’ দালি সত্যিই পৃথিবী জয় করেছিলেন। তাঁকে মানুষ শতশত বছর মনে রাখবে। তাঁর সৃষ্ট চিত্রকর্মই বলে দেয় একজন রসিক মানুষ কতোটা সিরিয়াস হতে পারে। তাইতো প্রাবন্ধিক বলেছেন, ‘চিত্রকর হিসেবে দালি যেমন ছিলেন অসম্ভব প্রতিভাবান, তেমনি ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন বিস্ময় জাগানিয়া, ঘোরলাগা চরিত্র।’
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই? কবিতাটির কথা উঠলেই যতীন্দ্রমোহন বাগ্চীর নাম চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তবে কাউকে যতীন্দ্রমোহন বাগ্চীর আরেকটি কবিতার নাম বলতে অনুরোধ করা হয়, তবে অনেকেই বিব্রত হবেন নিশ্চিত। প্রতিভাবান অথচ কম আলোচিত মানুষ যতীন্দ্রমোহন বাগচী। তাঁর সম্পর্কে পাঠককে উল্লেখযোগ্য ধারণা জোগাবে ‘যতীন্দ্রমোহন বাগ্চী : শতাব্দীর আলোয় রাখা মুখ’ প্রবন্ধটি। যেসব পাঠক কাজলা দিদি কবিতাটি মনে রেখেছেন কিন্তু তাঁর অন্য সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে আরো বিশদ জানতে চান তাদেরকে প্রবন্ধটি পড়ার পরামর্শ দেয়া যেতে পারে। একজন কবি তাঁর কবিতাতেই বেঁচে থাকেন শত শত বছর। তাইতো যতীন্দ্রমোহন বাগ্চী সম্পর্কে লেখক বলেছেন, ‘জগৎ স্বাভাবিক নিয়মে কবির লৌকিক দেহকে দীর্ঘদিন অক্ষত না রাখলেও তাঁর সৃষ্টিকর্মগুলো ঠিকই পরম যত্নে তুলে নেয় ‘সোনার তরী’তে। সাধারণের চেয়ে একজন কবির প্রাপ্তি এখানেই ভিন্ন, স্বতন্ত্র এবং মহিমামণ্ডিত।’
ইয়োহান সেবাস্টিন বাখ্ : সুরের সাধক, হেনরিক ইবসেন : প্রথা ভাঙার নাট্যকার, বার্নার্ড শ’ : মহাকালের যাত্রায়সহ প্রতিটি প্রবন্ধই পাঠককে যেমন ভিন্ন ভিন্ন চমকপদ তথ্য উপহার দেবে, তেমনি সাহিত্য পাঠ এবং চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তরুণ প্রাবন্ধিক মুহাম্মদ ফরিদ হাসানের প্রথম প্রকাশিত বইটি পাঠক মহলে সমাদৃত হবে- এ প্রত্যাশা করছি।
‘সাহিত্যের অনুষঙ্গ ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের বইমেলায়। এটি জাতীয় দেশজ পাণ্ডুলিপি প্রতিযোগিতা-২০১৭ পুরস্কারপ্রাপ্ত গ্রন্থ। এর প্রচ্ছদ করেছেন সাইফ আলী। মূল্য ধরা হয়েছে ২৮০ টাকা ֍ ֍ ֍