দিকভ্রান্ত রোদ
এখনো কি শীতার্ত তুমি
কোন এক আর্তনাদে কম্পমান নিদ্রাহীন তোমার চুম্বন
অচেনা ধূসরে; এখনো কি খেলা করে
দীঘল কেশদাম, অন্ধকারে?
এখনো কি প্রাচীন বাতাসে স্বপ্নাক্রান্ত ছায়া
উড়ে যায় হতাশ বাদুড় যেন;
অবিনশ্বর আলখাল্লার নীচে কম্পমান
দিকভ্রান্ত রোদ, আততায়ী সূর্যাস্তে ক্রমশ
গভীর হয় অন্তরঙ্গ আলোকে?
এখনো কি অবিরাম মৃত্যুর ঘ্রাণ
তোমাকে বিবশ করে অনন্ত জ্যোতির দিকে
ক্রমাগত তোমার আত্মা সামিল শরীরহীন যাত্রায়।
তোমাকে যে ডেকেছিল হিয়ার নিভৃতে
এখনো কি সেই কাল ইহকাল কেবলি মাতাল
ছায়া কংক্রীটে?
এখনো কি কষ্ট জাগে
এখনো কি মনে হয় প্রেম শুধু একা, একপক্ষ
মনে হয়, যদি ভালো না বাসিস তবে বেঁচে গেলি
কি জানি!
ভালবাসা মরে গিয়ে বেঁচে যায়
তুমিও কি বুড়িগঙ্গার ওপারে কোন এক অপরাহ্নে
একটি শালিক হয়ে বেঁচে গেছো?
অনন্ত যাত্রার পর
ছায়াহীন কায়াহীন কবিতারা নদী হলে
কবিরা তো ইলিশের দেহ
সেই দেহে শুধু ঘ্রাণ শুধু অর্ঘ্য
শুধু এক ভালোবাসাবাসি
এখনো পারোনি যেতে
ছেড়ে এই সবুজের ঘ্রাণ, হা’মুখ আকাশ
ধূলোর সংসার আর সঘন রাত্রিকে
কবিরা এমনি হয়
যেতে যেতে ফিরে আসে ধ্বনিময় সংরাগে
নিভৃত আশ্বাসে।
আষাঢ় এবং রবীন্দ্রনাথ
যে উড়ে এলো তার নাম মেঘ নয়
শুভ্রতায় ঢাকা সে দেহ তবে কি রবীন্দ্রনাথ
সফেদ দাড়ীগুলো সারারোদ ভাসলো আকাশে
অতঃপর রাত্রির অবসরে তার ধূসর গমন
সে ঘন হলো এবং পরিপক্ক শব্দফল হয়ে
মেঘফল হয়ে নেমে এলো
নদী ও মৃত্তিকায়
আষাঢ়ের প্রথম দিনে এভাবেই জল হলেন রবিবাবু,
কবিতা হলেন
আজি হতে শতবর্ষ আগের সেই সে কবিতাখানি
কি নিপুন উৎসাহে পৃথিবী ভেজালো
কবি ভিজলেন কবিতা ভিজলো এবং তাহার রমণী
পদ্মায়, বজরাতে নয় ফেরীর শরীরে; কি অদ্ভূত
বিরহী ভংগী দেহসৌষ্ঠবে
আষাঢ় এলে বিষাণের সুর সংগীতে, প্রকৃতি
এবং কবিতায় নদীদের আনাগোনা, শব্দ উৎসব
ইলিশ আয়োজন চারদিকে
আষাঢ়ষ্য প্রথম দিবসে আকাশে রবীন্দ্রনাথ আর তার মৃনালিনী
ইলিশের ঘ্রাণ হয়ে পদ্মায়, কদম সংগী যেন জলে ও সবুজে।
দেহ সর্বনাশে
উৎসর্গ : শহীদ বিধান চন্দ্র মন্টু
হঠাৎ বলেছো ’যাই’ তারপর চলে গেছো তুমি
এভাবে সবাই যায় এভাবেই ছায়াহীন ভূমি
কতোটা সহজ এই টুপ্ করে ঝরে পড়া ঘাসে
অজানা নদীর সুর এঁকে দিতে দেহ সর্বনাশে
মরণ মহুয়া যেন কী যে নেশা শুধু কাছে টানে
অনলে কেমন দাহ কতো সুখ পতঙ্গই জানে
তুমিতো জেনেছো সবি স্বাধীনতা তোমারি যে দান
আপন শোণীত দিয়ে লিখে গেছো তারি জয়গান
তোমাকে কিভাবে ভুলি তুমি আছো দেহ আর গীতে
তোমার মহিমা আঁকা সীমাহীন শ্রাবণে ও শীতে
আকাশ বাড়িয়ে বাহু দিয়ে যায় ছোঁয়াটুকু তার
অদেখা নদীর বুকে কী নিবিড় জীবনের ভার
সমাধী যতোই সাজে কতোরুপ বাঁশেদের ঝাড়ে
নিয়তি নয়ন হয়ে জল-বীজে কাছে ডাকে তারে।
একাকি বোদলেয়ার
মানিকগঞ্জ থেকে উড়ে আসা মেঘ ভিজালো ঢাকা
জৈষ্ঠ্যের অহংকার চূর্ণ করে আষাঢ়ের প্রথম রাতে
ভিজালো সে নগর আর ভিজালো রাজপথ
জলস্নাতা ফার্মগেট বাংলামটর বেইলী রোড
ভিজলো কবিতা এবং কবির অন্তর
আহা বিরহী চিত্তে কী নিপুন ময়ূর কম্পন
তোমার পাঠানো বৃষ্টিতে আজ নিশ্চিত ডাকবে ডাহুক
পানকৌড়ি ছোটাছুটি অলস টগরে, ফুটবে কদম দুলবে কেয়া আর
ঘ্রাণের শহরে জেগে থাকবে রাত এবং কিছু মল্লিকা বারান্দার টবে
মনিপুরী নৃত্য এঁকে ক্রমাগত মাতাবে বাতাস
তুমিতো আষাঢ় বালিকা
ছায়া দাও মেঘ দাও অতঃপর স্বস্তির জলে ভরাও হ্রদপুর
তোমার প্রস্থানে একি ক্রন্দন আকাশের
বিজলী মেলেছে পাখা, মেঘেরাও যেন এক বিরহীর ক্লান্ত ডানা
বৃষ্টিতে মূখর রাত
গন্ধাবলী বুকে নিয়ে ছুটছে গোল্ডলাইন
এবং কবির দরোজায় নিঃসীম স্মৃতির হানা
কবিও কি ঝরবে এখন
মানিকগঞ্জ থেকে ভেসে আসা বৃষ্টিতে
সুরের স্পর্শ নিয়ে সে তো আজ ঘুমহীন
একাকি বোদলেয়ার।
রিলকের পাপ
আমি যেদিন কবিতা লিখতে শুরু করলাম সেদিনই রিলকের সমাধিতে
খসে পড়লো এক টুকরো চাঁদ, দুটি নক্ষত্র এবং কয়েকটি পুষ্পমালতি
শব্দের নিগূঢ় বন্ধনে বাঁধা পড়তে পড়তে অমিত্রাক্ষর ক্রমাগত সুতনী এমজি
আর আমার প্রেয়সীর চন্দনচর্চিত কপোলে শেষ পৌষের রোদ যেন আলোর বিষ্ঠা
নবী নয় ছবি হতে হতে ফিরে দাঁড়ালো আদমসুরাত
আমি যেদিন কবিতা লিখতে শুরু করলাম সেদিনই
পৃথিবীতে বাজলো ভোরের ঘন্টা
পবিত্র বাতাসে উড়ে যেতে থাকলো জন্মের গ্লানি, মুছে যেতে থাকলো সৃষ্টির ক্লেদ
পূন্যস্নানে মশগুল ভোরের অতিথি আর ছায়াগামী রিলকের পাপ।
মরাগাঙ্গে জীবনের পাল
চোখের আড়ালে ছিলে কতোরূপ হয়নি তো দেখা
অযুত প্রাণের কথা হয় নাই কবিতায় লেখা
পাখিরা গিয়েছে ডেকে তবু ফুল ফোটে নাই গাছে
দেখিনি আলোর ছবি তার বুকে কতো প্রেম আছে
হয়নি ডাহুক আঁকা জলবনে নিকষ আঁধার
কেবলি হয়েছি মনে এ জীবন শুধুই বাধার
আকাশে ছিলোনা ‘তারা’ মেঘলোকে বিনাশের ডাক
পুড়েছে দিনের রাখি পুড়ে পুড়ে হয়ে গেছে খাক
দুপুর আরতি ফেলে শালিকেরা পালিয়েছে দূরে
বেজেছে বিরান বাঁশী সকরুণ পলাতক সুরে
সেসব এখন স্মৃতি কোন এক দুখময় কাল
তোমার ছোঁয়াতে আজ মরাগাঙ্গে জীবনের পাল
এসেছো প্রণয় তুমি নেড়ে নথ আকালের ভূমে
তোমাতে জীবন আঁকি তোমাতেই সুগভীর চুমে।