পরম সাঁতার
মুসা আল হাফিজ
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৭
প্রকাশক : শব্দতারা
প্রচ্ছদ: কাজী যুবাইর মাহমুদ
মূল্য : ১৫০ টাকা
মুসা আল হাফিজের সম্প্রতি প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘পরম সাঁতার‘। শব্দতারা প্রকাশন, সিলেট থেকে বইটি বের হয়, ২০১৭। ৬৪ টি কবিতার সমন্বয়ে এ কাব্যের অবয়ব নির্মিতি। আধ্যাত্মিকতার পরম সাঁতারে আত্মলীন হলেও কবি এখানে যুগ- যন্ত্রনার অভিঘাতে জর্জরিত- নীলকণ্ঠ। ‘সবুজ আগুন’ ও ‘মাধুর্যের তুফান’ বুকে নিয়ে কবি যেন ‘অলৌকিক বজ্রপাত’ হতে চাইলেন।
এ কাব্যের ভেতরে ডুব দিলে মনে হয় অস্তিত্বের একেবারে গভীর থেকে শুরু করে উপরের দিকে দৃষ্টিসীমার শেষ নক্ষত্রেও অন্য রকম এক সাঁতারের উচ্ছাস। হৃদয়ের শক্তিতে সম্পন্ন হয় এই সাঁতার ও উড়াল। এখানে যেন অনন্ত ও মুক্ত এক দরোজায় বাতাসের শিহরণ জাগে। জানা ও অজানার অন্তর্লীন বাসর জমে উঠে। সাঁতারুরা দেখেন, নাম না জানা সুদূর থেকে নেমে আসা আলোর বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছে। বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে অনুভব। সিক্ত হচ্ছে স্বপ্ন, প্রেম, ধ্যান, বাক্য ও শব্দাবলী।
কবি এই বৃষ্টির সহোদর, রহস্যের সাঁতারু। তিনি ঈভের হ্রদের মৎস-ক্রীড়া শেষে পরম সাঁতারে মগ্ন হলেন। ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল। বিবর্তনের পথে মুসা আল হাফিজ নিজেকে ভেঙ্গেচুরে আবার নির্মাণ করেছেন। ঈভের হ্রদে যিনি ছিলেন পর্দাবৃত, সালঙ্কার, কল্লোলিত, পরম সাঁতারে তিনি বর্ণিলতার পর্দা ভেদ করেন, উচ্চারণে অকুণ্ঠ ও দ্বিধাহীন হয়ে উঠেন, অন্তর্মুখীতায় অতলগামী হয়ে উঠেন। না আলো না অন্ধকারে মনের দুষ্পাঠ্য পৃষ্ঠা থেকে পাঠ করেন রক্তাক্ত সব জেন্দাবেস্তা।
তার উচ্চারণের নদী বয়, শুনা যায় ‘তুহিন সংলাপ’ ‘হরিৎ ফোয়ারাগুলো সুন্দরের ঘাসে, ঘামে মন মেখে দেয়।’ সবুজের মস্তকে ঝলসায় ‘অনন্তের জ্যোতি’ তার পাশেই ‘অন্ধকার অন্ধকারকে লাথি মারছে’। ‘অন্ধকার অন্ধকারকে চুমো’ দেয়। ‘নক্ষত্র রোদন করে উল্টানো পূর্ণিমায়।’ ‘জখমী সূর্য থেকে চুইয়ে পড়ছে লাল পুঁজ আর সন্ধ্যার লাল প্রস্রাব।’
নিজের ধরণে বৃহৎ বিশ্ব ও জীবনকে সনাক্ত করেন তিনি – যেমন করেন ব্যক্তিবিশ্বকে। ফাসির দড়ি থেকে বয়ে যাওয়া রক্তস্রোতে শরীর রঞ্জিত করার মতো তার কবিতার ক্ষত- বিক্ষত হাত নিজের রক্তে নিজেকে ভিজিয়ে চলে। অফুরান গোধূলি দ্বারা আক্রান্ত তার শব্দাবলী বস্তুহণনের মুখচ্ছদ হয়ে উঠে। পঙক্তিমালা ঝোঁপের আড়ালে গড়ে তুলে মেদিনীর গোপন- মৌচাক। যেখান থেকে শুধু ঝরে পড়ে ফোটা ফোটা মাধুরি। দূরে, কোথাও ‘সূর্যেও আয়াতগুলো ফুটতে থাকে।’ জ্বলতে থাকে নিষ্কম্প শিখায়। এর বিচ্ছুরণে ও নিমজ্জনে যুক্ত ও লগ্ন হয় বিচিত্রসচ্চল জীবন। ফলত তা থেকে মন্দ্রিত হয় ‘জীবনের ঝংকার’ এবং ‘হাসির দানার মতো ছড়িয়ে পড়ে প্রকৃতির প্রাণে।’
কিন্তু এই তাবৎ আয়োজন ছদ্মবেশি দার্শনিকতার চবুতরায়। আধ্যাত্মিকতা এখানে এনে দেয় সুরসাম্যের বৈতাল। দর্শন মুখোমুখি করে জটিলতার, জিজ্ঞাসার এবং খোঁড়ল ও আবর্তনের।
আমরা বইয়ের প্রথম কবিতাটির দিকে নজর দিতে পারি। প্রথম কবিতায় দেখি, ‘আরেক পৃথিবী’র গ্যালারি উন্মোচিত হচ্ছে। কবি প্রশ্ন তুলছেন- ‘আমরা কোথায় আছি?’ জবাব দিচ্ছেন- ‘আছি- যেখানে থাকা নেই।’ ‘না থাকা’ ‘থাকা’ এবং ‘থাকা- না থাকা’র জিজ্ঞাসা, অনিশ্চয়তা এবং নিশ্চিতি দু’টি লাইনে জড়ো হয়েছে। প্রশ্ন ও উত্তর আপাত নিরিহ, সরল কিন্তু এর ভেতরে চিন্তার যে চোরাস্রােত, ইঙ্গিতে কথা বলার যে সূক্ষ্মতা, তা আমাদের বিচারকে জটিল করে তুলে।
‘আমরা কোথায় আছি’ আমরা কেন জানবো না? কেন প্রশ্ন উঠছে? আমরা কি জানি না আমরা কোথায় আছি? যখন ‘কোথায় আছি’ তা অজ্ঞাত, তখন কি আমরা স্বাভাবিক জগতে আছি? না আমরা স্বাভাবিক?
তখন কি আমরা নিজেদের চিরচেনা পরিমন্ডলে না এর বাইরে? না কি আমরা নিজেদের পরিপার্শ্ব সম্পর্কে অচেতন, অজ্ঞ? প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের প্রেক্ষিতে পরিবেশ- পরিপার্শ্ব যখন অধিকতর পরিচিত হচ্ছে, মানুষ অজানাকে অধিকমাত্রায় জানছে, তখন এ প্রশ্ন কেন? তবে কি এ উন্মোচন ও অবগতির আড়ালে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর অন্ধকার, ভারি অজ্ঞতা?
কবির জিজ্ঞাসা হয়তো এসব জিজ্ঞাসা ধারণ করছে কিংবা হয়তো ধারণ করছে কোনো অতিলৌকিক সম্ভাবনা। বস্তুবিশ্ব অতিক্রমী কোনো অবস্থানের ইশারা কি নিহিত আছে এ প্রশ্নে? সমস্ত কিছুই একটি তরঙ্গিত মোহনায় মিলিত হয়, যখন তিনি বলেন- ‘আছি, যেখানে থাকা নেই।’ হ্যাঁ, নিজেকে প্রশ্ন করুন আমি, আমরা, মুসলিম উম্মাহ কিংবা মানবসমষ্টি কি যথার্থ ‘থাকা’র মধ্যে আছি?
‘থাকা’র তাৎপর্যকে অন্যভাবেও ভাবা যায়। হতে পারে আমাদেরই যাপিত জীবনে আমাদেরই জগতে গোপনতম অন্তর্গত বিচারে এই ‘থাকা’র নিগূঢ়তা ব্যাপক। অস্তিত্বের সত্যে সত্তার স্থিতি হতে পারে ‘থাকা’র উদ্দেশ্য। সেই ‘থাকা’ হতে পারে আমাদের অন্তরলোকের নিবিড়তম কোনো অনুভবলোকে। অথবা ‘থাকা’টা হতে পারে নিজেদের ছাড়িয়ে গিয়ে শাশ্বত আনন্দলোকে নিজেদের আবিষ্কারের মধ্যে। সেই ‘থাকা’ ও তার পর্যায় এবং স্থান- কালের একক কোনো অর্থ উন্মোচন আসলেই দুরূহ- অস্তিত্ব যেখানে গিয়ে বলে- ‘আছি, যেখানে থাকা নেই।’
নিজেকে জানার কতো ধাপ পেরুলে ‘থাকা নেই’ এ থাকা যায়? ভারতীয় দর্শনে আত্মাকে বলা হয়েছে মুক্ত, শাশ্বত, নিত্য। বলা হয়েছে বিশুদ্ধ চেতনা। জৈন দর্শন সম্যক জ্ঞান, সম্যক দর্শন ও সম্যক চরিত্রের মধ্যে দেখিয়েছে আত্মার মোক্ষলাভ। এ দর্শনের মতে মুক্তাবস্থায় আত্মা অনন্ত জ্ঞান ও অনন্ত শক্তি লাভ করে। ফলত তখন আত্মার থাকা সীমাবদ্ধ থাকাকে অতিক্রম করে। যাকে আমরা অবস্থিতি মনে করি, এ থাকা তখন তাকে অতিক্রম করে। ন্যায় ও বৈষয়িক দার্শনিকরা দুঃখের আন্তরিক নিবৃত্তি দেখেছেন, প্রাচীন, মীমাংসক দার্শনিকরা স্বর্গসুখ দেখেছেন, এবং বেদান্তবাদী দার্শনিকরা জীবত্মার সাথে ব্রক্ষের একাত্মতা দেখেছেন আত্মার মুক্তিতে।
বৌদ্ধ দর্শনে আত্মার প্রমুক্তিকে নির্বাণ বলা হয়েছে। নির্বাণের ব্যাখায় রয়েছে ৪টি মতবাদ।
প্রথমত নির্বাণ হলো পূর্ণ বিলুপ্তি।
দ্বিতীয়তঃ নির্বাণ হলো আনন্দের অবস্থা।
তৃতীয়তঃ নির্বাণ হলো এক অচিন্তনীয় অবস্থা।
চতুর্থতঃ নির্বাণ হলো এক অপরিবর্তনীয় অবস্থা।
নাগশেন তার শাগরেদ মিলিন্দাকে নির্বাণের অবস্থা সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কখনো তাকে সমুদ্র কখনো বা পর্বতের শৃঙ্গ কখনো মধুর মিষ্টতায় সাথে তুলনা করেছেন। তবে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এগুলো উপমা মাত্র। এদের দ্বারা নির্বাণের প্রকৃত অবস্থাকে হৃদয়ঙ্গম করা কখনো সম্ভব নয়। মুসা আল হাফিজ নির্বাণের বর্ণনা দিচ্ছেন না। শুনাচ্ছেন আরেক পৃথিবীতে আত্মঅবস্থানের ইতিবৃত্ত। একটি ধাপ, একটি মুক্তি ও মোক্ষ লাভের বর্ণনা। স্থানিকতা পেরিয়ে যাওয়ার ইতিকথা – যেখানে আত্মা জানাচ্ছে- ‘আছি, যেখানে থাকা নেই।’
ফরাসী দার্শনিক জ্যাঁ পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী দর্শন স্বরণ করা যেতে পারে। যা মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করে, সাধারণ অর্থে নয় বিশেষ অর্থে। বিমূর্ত কাল্পনিক ধারণা হিসেবে নয়, মূর্ত ও বাস্তব ধারণা হিসেবে। এ দর্শনের মতে প্রত্যেক মানুষের কাছে তার আপন অস্তিত্ব ও সমস্যাই প্রধান ও বড় সমস্যা। তার অভিমত, মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত অস্তিত্বশীল, যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজেকে পূর্ণ করতে সক্ষম। সে তার কর্মেও সমষ্টি ছাড়া কিছু নয়। সে তার অস্তিত্ব ছাড়াও আর কিছু নয়।
ইসলামি দর্শনের সুফিভাবধারা কিংবা ইকবালের খুদি তত্ত্বে অস্তিত্বকে আমরা স্বতন্ত্র ঔজ্জল্যে প্রত্যক্ষ করি। মুসা আল হাফিজের অস্তিত্ব সন্ধান সুফি ঘরাণার দর্শনজাত। যেখানে একের পর এক জগত পাড়ি দিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জগতে আবিষ্কার করতে হয়।
দার্শনিক কবি ফরিদ উদ্দীন আত্তাবের ‘মান্তিকুত তায়র’ এর পাখিরা যেভাবে নিজেদের বৃত্ত থেকে বের হয়ে সাত জগত অতিক্রম করে ভিন্ন এক পৃথিবীতে পরম অস্তিত্বে জীবিত হয়, মুসা আল হাফিজের ‘আরেক পৃথিবী’ তেমনই এক অভিযাত্রার ফসল। সেখানে যাওয়ার পথে বহু বার জীবনকে, বহুবার মরণকে বরণ করতে হয়-
‘আমরা মৃত্যু বরণ করে করে এখানে এসেছি
আমরা বারবার জীবিত হয়ে এখানে এসেছি’
(আরেক পৃথিবী)
সেখানকার চিত্ররূপ কেমন? কোনো কিছুই এই চেনা বিশ্বের মতো নয়-
এখানে বৃষ্টি সিক্ত করে এবং শুকিয়ে দেয়
এখানে সূর্য এবং চাঁদ হাজির হয় না লজ্জায়
কেননা এখানে প্রতিটি চেহারায় চাঁদ, প্রতিটি কপোলে সূর্য।
(আরেক পৃথিবী)
না। ‘সিক্ত করে এবং শুকিয়ে দেয়’ এমন বৃষ্টি আমাদের কবিতায় বর্ষিত হতে দেখিনি কিংবা যেখানে ‘প্রতিটি চেহারায় চাঁদ, প্রতিটি কপোলে সূর্য’র উপস্থিতি দেখে চাঁদ- সূর্য ‘হাজির হয় না লজ্জায়’, সেখানে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়নি আগে। কবি নিয়ে গেলেন এবং দেখালেন-
এখানে হৃদয় থেকে বইছে নদীনালা
ওরা আকাশে উড়ে যায় জমিনের মাধুরী নিয়ে
ওরা জমিনে নেমে আসে আকাশের শুভেচ্ছা নিয়ে।’
(আরেক পৃথিবী)
দেখুন ! ‘নদীনালার উৎস হৃদয়।’ ‘নদী আকাশে উড়ে যায়।‘ আকাশে ছড়ায় ‘জমিনের মাধুরী।’ নদী নেমে আসে আকাশ থেকে। নিয়ে আসে উর্ধ্বজগতের শুভেচ্ছা। এমন নদী আমাদের কবিতায় প্রবাহিত হয়েছে কি? অবশেষে তার প্রবাহ দেখলাম এবং দেখেই দর্শকেরা প্রশ্ন তুলছি এ কোন নদী? এ প্রবাহ কি নিছক কবি কল্পনায়? বাস্তবে এর কোন পরিচয় আছে কী ?
প্রতীকের আবরণ সরালেই খোলাসা হবে এর পরিচয়। সম্ভবত নদী হচ্ছে হৃদয়বৃত্তির সেই ধারা, যার প্রাণেশ্বৈর্য এবং প্রেমবিগলিত আর্তি ও প্রার্থনা আকাশ ছাড়িয়ে যায়। ফলত আকাশ থেকে নেমে আসে স্রোত। শুভেচ্ছাধারা। সুফিসাধক নদীটিকে এভাবেই প্রত্যক্ষ করবেন। পরাবাস্তববাদী পাঠক দেখবেন কলাকৈবল্যের বিচারে, রোমান্টিকতায় অনুরাগী দেখবেন কবিকল্পনার বৈচিত্র ও শক্তি। যে যেভাবেই দেখুন, নিবিড় ও নিমজ্জিত অনুভবে ধরা দেবে, মানুষের চিরায়ত ভাবলোক ও ঐশীসূত্রে এসব চিত্রের উৎস- পরম্পরা। বিশ্বাস, শাশ্বতপ্রেম এবং পরমের সাথে মানবাত্মার যোগাযোগেই আছে এর মর্মাগ্নি-
এখানে কথা বলছে পাহাড় আর
গাছে গাছে দাউ দাউ সবুজ আগুন
মদের মৌতাতে বেহুঁশ মেঘমালা।
কথা বলা পাহাড় মনে করিয়ে দিচ্ছে হযরত মুসা (আ.) কে। তুর পাহাড়ে চারদিক থেকে না দেখা সত্ত্বার কথা তিনি শুনলেন। সবুজ বৃক্ষে তখন আগুন জ্বলছিলো। যে আগুন কাউকে পোড়ায় না। আগুন যতই জ্বলছিলো, বৃক্ষ ততই অধিকতর সবুজ হচ্ছিলো। কবি তাই একে বলছেন ‘সবুজ আগুন? না কি এ আগুনে নিহিত জীবনের সবুজাভ সম্ভাবনা দেখেছে কবির চোখ- যে সম্ভাবনার ধারা বর্ণনা দিয়েছে ধর্মের ইতিহাস।
সেই সবুজ আগুন, বেহুঁশ মেঘ, জমিনে মাধুরী, আকাশের শুভেচ্ছা, মদের মৌতাত, চেহারায় চাঁদ, কপোলের সূর্য আর মরণ- জীবনের ভিড়ে আমাদের বা কবির কাজ কী? জানাচ্ছেন কবি- ‘এখানে সাত আকাশের সমান আকাশ বুকে নিয়ে আমরা বসে যাই ধ্যানের নিকেতনে।’
দ্বিতীয় কবিতা ‘শেষ রাতে’ সেই নিকেতনের উৎসবে উচ্ছলিত। যে উৎসবে আমন্ত্রণ করা হচ্ছে চাঁদকে। কোন চাঁদ? যে চাঁদকে স্বপ্নেও দেখেনি আসমান। আমন্ত্রণ করা হচ্ছে আগুনকে। কোন আগুন? যাকে নেভাবার সাধ্য নেই পানির।
হে চন্দ্র, যাকে আকাশ স্বপ্নেও দেখেনি, এসো
হে আগুন যাকে পানি নেভাতে পারে না, জ্বলো
হে রক্ত পরিণত হও মদে
হে হৃদয় কাবাব হয়ে যাও
(শেষ রাতে)
এসো এসো বলে সবাইকে জড়ো করে উৎসব হবে? উৎসবে আর কারা অংশীদার? সেখানে জয়ী হচ্ছে কোন কোন শিহরণ? কবি জানাচ্ছেন –
যে দিগন্তের নাম জানা নেই সেখান থেকে আসছে ঝিরঝিরে হাওয়া
যে নদীতে সুর বয়ে যায়, তার রূপালি স্রোত
আমাকে ভাসিয়ে নিতে অজানা পাহাড় থেকে ছুটে আসছে
(শেষ রাতে)
‘স্বপ্ন আর জ্যোৎস্নায় তৈরি ফুলের শিহরণে’ জেগে আছে রাত, মদুর ভা- পেয়েছে ‘আনন্দের মধুকর’ তার ‘পাখার হালকা কম্পন’ তথা প্রেমার্ত মনের উত্থানে ও জাগরণে চমকে উঠছে অপরূপ বাগান।
এই বাগান কোথায়? জানতে চেয়ো না
বাগানই রহস্য এবং সে নিজেই তার দর্শক
প্রতিটি বৃক্ষ মাতাল প্রতিটি পাতা নৃত্যপর
(শেষ রাতে)
এই বাগানের ভেতর চাইলেই প্রবেশ করা যায় না। নাসিকা থাকলেই এর সুগন্ধি লাভ করা যায় না। ঐ যে দার্শনিক কবি রুমী বলেছেন-
তা যে যহরো আয শকর দর নাগ- যারী
কার তু আয গুলজারে ওহদত বু বরী
যে যাবৎ তুমি বিষ ও মিসরী (অর্থাৎ বস্তু ও আধিক্যের জগৎ) অতিক্রম না করবে, তাবৎ তৌহিদের বাগানের খুশবু তুমি পাবে না।
কিংবা প্রেমিক কবি শেখ সাদী যেমন বলেছেন উৎসবময় পৃথিবীর কথা-
জাঁহা পুর সামা আস্ত ও মস্তি ও সুর
ও লেকিন চেবি নদ দর আয়না কুর
সারা জগত সঙ্গীতে উত্তাল, প্রেমময়তায় পরিপূর্ণ, সুরে কম্পমান। কিন্তু একজন অন্ধ আয়নার মধ্যে কী দেখবে?
যারা খুশবু পায় আর যারা চোখ দিয়ে দেখে, তাদের নিয়েই মুসা আল হাফিজের উৎসব। মাদকতাভরা রাতে চেতনা হারানো আর অস্তিত্ব নিয়ে মেতে থাকার উৎসব।
এখন অমৃতসুধা আর ইচ্ছে মতো পান
এখন স্বর্গীয় শরাবখানা প্রমত্ত্ব হবে
এখন নিজের পুতুল ভেঙে বেহুঁশ হবো
সুন্দরের মুখমন্ডলে চুমুর আরামে।
এবং সজাগ হবো প্রেমের তন্ততে
(শেষ রাতে)
প্রেমের তন্তুই এখানে আসল পথ্য ও পাথেয়। জান্নাতও যার ঐশ্বর্যে লোভাতুর। রহস্য ও তত্ত্বজ্ঞানী শেষ পর্যন্ত তাই আবিষ্কার করেন-
‘জান্নাতের তিয়াসে কতো কেটেছে রাতদিন
কিন্তু প্রেমিকের তন্তুর লাগি তিয়াসী জান্নাত
(শেষ রাতে)
যুগচিন্তা ও সমকালীন বাস্তবতায় চিৎকৃত কবি মুসা আল হাফিজ। তার কবিতায় যখন ভাতের ‘থালায় অস্তমিত সূর্য’ ‘মাথার উপর দিগন্তের ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ’ ‘উঠানে অগ্নিবৃষ্টি নিয়ে কাপালিক ড্রোন, তখন দুঃসময় কতটা ভারি, বুঝাই যাচ্ছে। যখন ‘বধির সাপের মতো দিবসের ঘরে নেমে এসেছে দূর্যোগ’ ‘ফসল তোলার স্বপ্নকে ঘিরে ধেই ধেই করে নাচছে বিনাশী প্লাবন’, তখন অত্যাচারি সময়ের জটিলতা ও বিপর্যয়ের গভীরতা বুঝা যায়।
তারপরও মুসা আল হাফিজের আশাবাদী এবং সংকট উত্তরণে সৃজনশীল সংগ্রামে প্রত্যয়ী। তিনি যখন দেখেছেন ‘উঠানে প্রত্যাশার পায়চারি নেই’ তখন প্রশ্ন তুলছেন ‘প্রেমের কবিতা’ রচনায় মগ্ন কবি কেবলই প্রেমের কবিতা লিখে চলবেন? অন্য কোনো তীব্র ও কার্যকর সম্ভাবনার পথ ধরে হাঁটবেন না? তার শব্দাবলিকে করে তুলবেন না হ্যারিসনের সংগীত?
যখন চিত্রকল্পনাগুলো দুর্ভিক্ষের মড়ার মতো জানিয়ে দিচ্ছে আসল বাস্তবতা, কবি তখন নতুন জিজ্ঞাসা ও কর্তব্যবোধে মথিত। নিজের কর্মপন্থা ও প্রেমের প্রতি অঙ্গীকারকে নিজেই নবনিরীক্ষণ করছেন –
‘আমার ডানে বর্ণহীন দিন বায়ে গভীর ভয়াল কৃষ্ণব্বির
দূরে, সভ্যতার গোলাঘরে ডাকাতি চলছে প্রহর ব্যাপী
বেলাশেষের হু হু হাওয়া সেই সংবাদ জানিয়ে গেলো যখন,
তখনো লিখবো প্রেমের কবিতা?’
‘বিবেকের পূণ্যপাত্রে প্রস্রাব করছে বস্তুর পুরোহিত
নারী ও নিসর্গ নিয়ে তুমুল জমেছে যখন প্রগতির দাবা
তখনো লিখবো প্রেমের কবিতা?
(তখনো?)
হ্যাঁ, প্রেমের কবিতাই তো লিখছেন কবি। প্রেমই তো তাকে দেখায়-
‘বসন্তের সংবিধান সংশোধিত করছে কাকের সংসদ
স্বার্থের দাঁত দিয়ে ইঁদুরেরা কেটে ফেলছে হৃদয়ের অভিধান।’
(তখনো?)
প্রমের বহ্নি আছে বলেই তার চোখ সজাগ এবং সময়ের চোখে, মুখে, কপোলে লেপ্টে থাকা কৃত্রিম আবরণ সরিয়ে সেখানে এঁকে দেয় যথার্থ চিত্ররাজী। তার এই চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সময়, সমাজ ও মানুষের দীপ্ত অনুভব। সংশোধন ও প্রতিবাদের নৈয়ায়িক প্রতীক। যা দৃশ্যরচনার ভেতর দিয়ে সম্পন্ন করে দ্রোহ। প্রতারক আধুনিকতার স্থলন দেয় ধরিয়ে। বয়ান করে মানুষ ও স্বপ্নের বিরুদ্ধে তার অপরাধ। নির্দেশ করে মানুষ ও মানুষের পৃথিবীর উজ্জ্বল উদ্ধার ֍ ֍ ֍