ধান জোছনার উলকি
মঈন শেখ
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৮
প্রকাশক: দেশজ প্রকাশন
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
মূল্য : ২৮০ টাকা
মঈন শেখ- একজন তরুণ কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তে দেশজ প্রকাশন, ঢাকা থেকে প্রকাশ হয়েছে তার নতুন গল্পগ্রন্থ ‘ধান জোছনার উলকি’। শুধু প্রকাশ হয়েছে বললে কৃপণতা হবে- কপালে জয়তিলক নিয়েই বাংলা সাহিত্যের গল্পসম্ভারে যুক্ত হয়েছে মঈন শেখের ধান জোছনার উলকি। দেশজ জাতীয় পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতা ২০১৮’র গল্প ক্যাটাগরীতে পুরস্কার জয়ী গ্রন্থ এটি।
বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাশিল্পী ও অনুবাদক নাজিব ওয়াদুদ- মঈন শেখ সম্পর্কে বইটির ফ্ল্যাপ কাভারে অত্যন্ত সততার সাথে লিখেছেন,
‘মঈন মূলত গ্রামের গল্প লেখেন। সে গ্রাম তার খুব জানাশোনা। তার চরিত্ররাও তার অভিজ্ঞতার ভেতরকার মানুষ। তারা অধিকাংশই একেবারে সাধারণ মানুষ। তাদের অভাব-অনটন, সুখ-দুঃখ, সাফল্য-ব্যর্থতা, আকাক্সক্ষা-আশাভঙ্গ এসব নিয়েই তার গল্প। তার গল্পবুননের কৌশল আকর্ষণীয়, এতে এক ধরনের কৌতুকবোধ মিশে থাকে। তার ভাষাও শক্তিশালী। আর সংলাপ উঠে আসে চরিত্রদের অন্তর্দেশ থেকে।’ একথা বলার পরে মঈন সম্পর্কে আর খুব বেশি কিছু বলার থাকে না- প্রয়োজনও পড়ে না।
ছোটগল্পে মূলত জীবনের যে কোন একটা অংশের সামগ্রিক রূপ চিত্রিত করা হয়ে থাকে। গঠন ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে গল্পে তিনটি প্রধান প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ঘটনাপ্রধান, চরিত্রপ্রধান ও ভাবপ্রধান। যদিও এই প্রধান তিনটি প্রবণতা বা ধারাকে বিষয় ও আঙ্গিকগত বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতায় বিভক্ত করা যায় বিভিন্ন উপশাখায়। সেদিকে না গিয়ে বলি, মঈন শেখের গল্পে প্রধান এ তিনটি প্রবণতাই বিদ্যমান। এ গল্পগ্রন্থটি অতি পরিচিত ও জীবন ঘনিষ্ঠ বিষয়ের নয়টি গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে।
গ্রন্থের ১ম গল্প ‘ময়দা’-
গল্পকার সুনিপুণভাবে ক্ষুধা চিত্রিত করেছেন এ গল্পে। জরিনা বেগমের অভাবের সংসার। স্বামী দ্বিতীয় বউ নিয়ে আলাদা থাকে। খবর নেয় না। আট সদস্যের সংসারে ভাত না পেয়ে রুটি খেয়ে বেঁচে থাকা। মাঝে কোন একবেলা ভাত হয়তো জোটে, তারও আবার তরকারি জোটে না। রুটিটাও ঠিকমতো তিনবেলা নয়। অর্থাৎ কোনমতে বেঁচে থাকা। লেখকের ভাষায়-
খাদ্যের অখাদ্য রূপকে ওষুধের মতো অর্থাৎ জানটাকে জিইয়ে রাখা করে খেলেও আজ একজন ক্ষেপেছে বেজাই। সাতদিন হলো এই পরিবারের ওপর ময়দার শুভদৃষ্টি আষ্টেপৃষ্ঠে উঠে পড়ে লেগেছে। যে দৃষ্টি জিহ্বার স্বাদগ্রন্থির সৃষ্টি ক্ষমতাকে ভোঁতা করে লালবাতি জ্বালিয়েছে। ময়দার একঘেয়েমি ভাবটা সবকিছু নিম করে দিয়েছে। … আট সদস্যের পরিবার। দশ হলেও বাড়ির কর্তা দ্বিতীয় বউ নিয়ে কর্মস্থলে ঘাপটি মেরেছে। ছোট্ট একটা বাড়ি ভাড়া করে বয়সের পাক উবরিয়ে নিয়েছে যৌবনের গেরস্থালির ঠিকাদারি। না ফুরানো বাসর। মজা করেই… (গল্প: ময়দা- পৃষ্ঠা:৭)
বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত। পানি বিনে যেমন মাছ বাঁচে না, বলতে গেলে ভাত ছাড়া বাঙালিও তেমনই। মাছে ভাতে বাঙালি। সেই মাছ তো দূরের কথা ভাতই ঠিকমতো পড়ে না যে পেটে, সেই পেটের কী যে নিদারুণ জ্বালা! মাঝে মধ্যেই পাঁচদিন সাতদিন ধরে ভাতের স্বাদ না পাওয়া সেই জীবন যন্ত্রণার রূপ যে কী- ভুক্তভোগী ছাড়া তা জানে না কেউ। কবির ভাষায়,
এ কষ্ট কেবল প্রসূতির ব্যথা যেন
কোন ভাবে বিবরণে বোঝানোর নয়।
সাতদিন ভাত না পাওয়া ছোট্ট শিশুটিও আর রুটি খাবে না। তাই ভাতের আশায় নতুন বৌ নিয়ে আলাদা বাসায় ভাড়া থাকা পিতার কাছে ছুটে যায়। পিতা হাট থেকে কেনা মালা আকারে বাঁধা কৈ মাছ মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে সৎমায়ের কাছে পাঠায় রান্না করতে। উপবাসি মেয়ে মাছ ভাত রান্নার ঘ্রাণে বড় আশান্বিত হয়ে, মুগ্ধ হয়ে ভাবে- একটু পরেই বাপের সাথে বসে ভাত মাছ খাবে। এমনই এক মুহূর্তে পিতা আসে। মেয়েকে দরোজার বাইরে ডেকে ময়দার প্যাকেট হাতে ধরিয়ে বলে- এই লে, এর মইদ্দে দুইসের ময়দা আজে। যাইয়াই তুর মাওক রুটি বানাতে বুলিস। তাড়াতাড়ি বাড়িত যাবু।’ (গল্প: ময়দা- পৃষ্ঠা:১৪)
পাঠককে কাঁদাতে একজন লেখকের তখন আর কোন কিছুরই দরকার পড়ে না।
মঈন শেখ এখানে বিবরণে বিবরণে ক্ষুধার রূপ কেমন তা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন- এখানে ছোট্ট মেয়ে বেনু প্রতীক মাত্র। এই প্রতীকেই পুরো সংসারের বর্ণনায় সফল হয়েছেন। তদুপরি, গল্পটির কোথায় যেন একটু অসংগতি আছে মনে হয়। গল্পের শুরুতেই বলা হচ্ছে মোট দশ সদস্যের পরিবার। অথচ গল্পে পাওয়া যায় সাতজনের অস্তিত্ব। আর তিনজন কোথায়? এদের অবস্থা ও অবস্থান গল্পে উল্লেখ করা হয়নি। জরিনা ও তার ছয় ছেলে মেয়েসহ সাতজন এবং পরিবারের কর্তা সরকার সাহেব ও তার নতুন বৌ মিলে দুজন। মোট নয়জনের হিসেব গল্পে পাওয়া যায়। দশজন সদস্য তথ্যবিভ্রাটই মনে হয়।
অন্যদিকে, গল্প অনুযায়ী হিসেব করলে সরকারের দ্বিতীয় বিয়ের সময় বড় ছেলের বয়স কত হয়? বড় ছেলের শিক্ষা ও কর্ম হিসেব করলে জরিনার বিয়ের বয়স কোনমতেই চৌদ্দ বছর নির্ধারণ করা যায় না। বিয়ের চৌদ্দ বছর অতিক্রমকালে পঞ্চম মেয়ে বেনুর বয়স কত? সে কি আদৌ ছাগল চরানোর উপযুক্ত ছিলো?
যাই হোক, তারপরেও বিষয় নির্বাচন, বর্ণনাভঙ্গি ও গল্পের পরিণতি মিলে এটি অনন্য সাধারণ একটি গল্প।
‘আরিফ মোল্লার দুইদিন’ আত্মদহনের একটি গল্প। গ্রামের কামলা ও জমিনদার শ্রেণীর হালচাল, উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও মিমাংসার আলোকে চিরায়ত গ্রামীণ জীবনধারার একটুকরো প্রতিচ্ছায়া খুব সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এ গল্পে। তবে, গল্পের প্রধান চরিত্র আরিফ মোল্লার সংলাপ স্বভাবগত আঞ্চলিক ভাষার স্থলে মাত্র একটি স্থানে শুদ্ধ চলিত ভাষায় পড়লে পাঠকের মনে খটকা লাগবে বৈকি!
‘ভ্যানচালকের কপালে ভাঁজ পড়ল। অবাক হলো মোল্লার আসা দেখে। সত্যিই যাবে নাকি মোল্লা? মজিদ কয়েকবার ফুঁ দিলো ডান পাশের কাঠে। তবু হাত দিয়ে পাশ দেখিয়ে বলল- বস দাদা, বস!
– এই তুর ট্যাকাত ভ্যানোত যামু ক্যান? ফকিন্নির ব্যাটা! ট্যাকার গরম দ্যাখাস নাকি? এই শালা, একবেলা খাইয়া আর এক বেলা তো না খাইয়া থাকিস, বউ তো মানুষের বাড়িত কাম কইরা বেড়ায়, আর এমন কামের দিনে শালা বাবু সাইজ্যা মুড়োত যাওজে। কিসের ন্যাঙটা ফুটানি করিস, শরম লাগে না? (গল্প: আরিফ মোল্লার দুইদিন- পৃষ্ঠা:১৬)
‘বিকল্পের ভাবনায় বিভোর মোল্লা। অনেক সাত-পাঁচ ভেবে, সতের-বিশ ভেবে একটা ভাবনা উপস্থিত করেছে মোল্লা। তবে ভাবনার গূঢ়ার্থ একদম ভেতরেই থাকল। যা প্রকাশ পেল তা বাইরেরটা। অনেক হম্বিতম্বি করল বাহির বাহির।
– সব শালাদের দেখে নেব। মোড়লের কাছে নালিশ দিয়েছি। সন্ধ্যার বিচারেই হাত মোড়া করে সবাইকে পিটুনি খাওয়াবো। শালাদের খুব বাড় বেড়েছে।’ (গল্প: আরিফ মোল্লার দুইদিন- পৃষ্ঠা:২২)
‘বৃষ্টিকুসুম’ সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা ও স্বাদের একটি গল্প। অসাধারণ গল্প- যা প্রকৃতির খেয়াল ও গ্রাম্য সাধারণ মানুষের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার নিয়ে লেখা। বৃষ্টিকুসুম পাঠককে নিয়ে যাবে সম্পূর্ণ নতুন এক ভুবনে।
‘এবার মুখ খুললো সখেনা- এই হারামি, কুসুম যে তোর ভাগ্নি হয়রে। ও কথা যে মুখে আনাও পাপ।
– কুসুম আমার ভাগ্নি হবে কেন? সে তো কুসুম। সে তো বোনের সতীনের মেয়ে।
– ওরে হারামিরে, সেকি তোকে ভাই বলে? মামা বলে ডাকে। বোনের সতীন সেও তো তোর বোন। তোর ভাগনে শরীফের সে যে আপন বোন।
– ও মা, তুমি হিসাব যা করছো, তাতে দুনিয়ায় তো আদম আর হাওয়া ছাড়া কেউ থাকতো না। আমি হিসাব-ধর্ম বুঝি না। আমার কুসুমকে এনে দাও।
– ও আল্লাহ, তুমি মাফ করো। এই শুয়োর, এবার থামেক। আল্লার গজব নামবে। ধ্বংস হবি হারামি। ও আল্লাগো, তুমি কোন হারামি আমার পেটে দিয়াছিলা গো? (গল্প: বৃষ্টিকুসুম- পৃষ্ঠা: ৩০, ৩১)
‘ধানকাব্য’, ‘ফসলের ডাক’, ‘উপেনের একদিন’ এসবই বেশ ভাল মানের গল্প। কী বিষয়, কী বর্ণন সবকিছুতেই লেখকের স্বকীয় স্বাক্ষর লক্ষ্য করা যায়। মঈন শেখের লেখায় ভোট, মার্কার মতো জটিল বিষয় কিংবা প্রেম-ভালবাসা, গ্রামীণ সমাজ জীবনে ব্যক্তিবিশেষের শোষণ, রক্তচক্ষু, প্রতারণা, প্রতিরোধ এসব নিয়ে হাস্য-রসাত্মক গল্প উঠে আসলেও এখানে অনুপস্থিত একজন স্বার্থক গল্পকারের আপন দর্শন। যদিও কবি-লেখকগণ তাঁদের লেখায় আপন সময়কে ধারণ করেন- তথাপি, বৃহৎ সমাজ জীবনের অস্থিরতা, দেশের রাজনৈতিক ডামাডোল, অত্যাচারে, নির্যাতনে দম বন্ধ হয়ে আসা মানুষের পক্ষে কোন প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়নি মঈনের লেখায়। একজন প্রকৃত গল্পকারের ভাবনায়-রচনায় এসব বিষয় উঠে আসলে গল্পকার অবশ্যই কালের গায়ে খোদিত হয়ে যান- নিঃসন্দেহে উপকৃত হোন বর্তমান ও আগামীর পাঠক।
‘ধান জোছনার উলকি’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ বেশ আকর্ষণীয়। ছাপা ঝকঝকে। সবকিছু মিলিয়ে পাঠক মনে নাড়া দিতে সক্ষম মাত্র দুইশত টাকা মূল্যের এই বই। গল্পগ্রন্থ ও গল্পকারের জয় হোক ♦ ♦ ♦