একাদশ শতকের মধ্যভাগে প্রাচীন বাংলার অধিকাংশ অঞ্চলই পাল রাজাদের হাত ছাড়া হয়ে পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুরাগী সেন ও বর্মন রাজাদের অধিকারে চলে যায়। উত্তর বাংলায় সামন্তচক্রের বিদ্রোহের সময়ে পাল সাম্রাজ্যে দুর্বলতার সুযোগে সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন ধীরে ধীরে নিজ ক্ষমতার উন্নতি সাধন করেন। পাল সম্রাট মদন পালের রাজত্বকালে তারা সর্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়। পশ্চিম ও উত্তর বাংলা থেকে পাল শাসন এবং দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা থেকে বর্ম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তারা প্রায় সমগ্র প্রাচীন বাংলায় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। সেনদের শাসনপ্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির নদীয়া আক্রমণ পর্যন্ত সময় ধরে পাল শিল্পকলার ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। তবে ক্রয়োদশ শতকের প্রথমে মুসলমানদের আগমনে প্রাচীন বাংলার ইসলামী শাসনের সূত্রপাত হয়। সময়ের ব্যবধানে একমাত্র আসাম ছাড়া সমগ্র প্রাচীন বাংলায় মুসলমানদের অধিকার বিস্তৃতি লাভ করে। ভিন্নধর্মী অর্থাৎ ইসলামী শাসনের যুগে পূর্ব আদর্শ আর সংস্কৃতির ধারা ক্ষুণ্ণ ও ব্যাহত হয়। শুরু হয় পাল শিল্পকলার অবক্ষয় যুগ। তা ছাড়া সেন ও বর্মন রাজারা ছিলেন বেদ-ব্রাহ্মণ্য তথা বর্ণাশ্রম-আশ্রয়ী হিন্দু ধর্মের উদ্যমী পরিপোষক। তাদের আমলে বাংলার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের যে নিগৃহীত হতে হয়েছিল তারও ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। এ রকম প্রতিকূল পরিবেশে স্বাভাবিকভাবেই পাল শিল্পকলার প্রবহমান ধারা দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল হয়ে পড়লেও পাল শিল্পকলা একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। মুসলমানদের আগমনের পরও তা টিকে রয়েছে এখনো। তবে মাঝখানে একটুখানি ভাটা পড়েছিল এই যা। কী ধর্ম বিশ্বাস আর কী সংস্কৃতিতে তুর্কিরা ছিলেন স্বতন্ত্র ধারার মানুষ। তাদের হাতে পৃষ্ঠপোষকতা পেলো মঠ, মন্দির, বিহারের পরিবর্তে মসজিদ, মক্তবসহ ইসলামী উপাসনা গৃহ। ফলে পূর্বভারতীয় শিল্পরীতির পরিবর্তন হয়ে গড়ে উঠতে থাকলো ইসলামী চেতনার শিল্প।
চতুর্দশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই বাংলার সুলতানি শাসনে এক নবযুগের সূচনা ঘটলো। ইলিয়াস শাহের (১৩৪২-৫৭ খ্রি.) আমল থেকে বাংলার স্বাধীন সুলতানরা দেশ শাসনের ব্যাপারে হিন্দু জমিদার ও প্রশাসকদের সঙ্গে এক বোঝাপড়ার মাধ্যমে দেশে সুশাসন প্রবর্তনে সক্ষম হন। মুসলমানরা নতুন সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক হিসেবে সর্বভারতীয় স্বীকৃতি অর্জন করেন।
পরিপূর্ণভাবে ইসলামে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানরা দেশজ সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ ভাবে যত্নবান ছিলেন। তাঁরা রামায়ণ, মহাভারতসহ বিভিন্ন সংস্কৃত গ্রন্থ বাংলা অনুবাদের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তবে স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্র ইত্যাদি শিল্পে একটা পরিবর্তনের হাওয়া বইতে থাকে। সে জন্য সুলতানি আমলে বাংলার স্থাপত্য কর্মগুলো একদিকে যেমন সমকালীন সুলতানি স্থাপত্যের প্রভাব প্রদর্শন করে অন্যদিকে সেগুলো বিশেষভাবে বাঙালির সৃজনশীলতার সাক্ষ্যও বহন করে। দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হলেও সুলতানদের অনেকেই মুসলিম দুনিয়ার সংস্কৃতির প্রতি ছিলেন বিশেষ ভাবে যত্নবান। তার প্রমাণ পাওয়া যায়, নসরৎ শাহ কর্তৃক পারস্যের বিশিষ্ট চিত্ররীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে।
চিত্রকলায় আধুনিকতার প্রবেশ ঘটলেও পূর্বভারতীয় রীতিও আধুনিকতার সাথে সাথেই থেকেছে। ১৭ শতকের গোড়া থেকেই সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারি চিত্রশালায় ন্যাচারাল হিস্ট্রি পেইন্টিং শুরু হয়েছিল। ১৯ শতকের শুরুতে যে সকল শিল্পী দিয়ে ন্যাচারাল হিস্ট্রি পেইন্টিং করানো হতো তারা সকলেই ছিলেন দেশীয় শিল্পী। এই ভারতীয় শিল্পীরা মুঘল রাজপুত চিত্রকলার ঐতিহ্য রীতি বা টেকনিক, টেম্পারা ও জলরঙ দিয়ে ছবি তৈরি করতেন। এ চিত্রের ফিনিসিং পদ্ধতিও এদের নিজস্ব। বর্তমানে এ রীতি প্রাচ্যকলা রীতি হিসেবে পরিচিত
ত্রয়োদশ, চর্তুদশ শতকে মুসলমান শাসনের শুরুতে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাংলায় মূর্তি ও চিত্রকলার অনুশীলন বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে পটচিত্রে প্রাচীন ধারার কিছুটা আভাস তখনও টিকে ছিল। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সাথে সাথে শিল্পীদেরও কাজের ধারার পরিবর্তন হয়েছিল। নতুন শাসকদের নিজস্ব উদ্যমে নতুন এক রীতির স্থাপত্য কর্মের সূত্রপাত হয়। এই ধারার শিল্প হিসেবে টিকে আছে গৌড়ের মসজিদ ও সমাধিসৌধগুলো। পোড়ামাটির তৈরি ইট ও টালি এবং দেশীয় শিল্পীদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এ সমস্ত স্থাপত্যকর্ম। ইটে এবং টালিতে যে জ্যামিতিক নকশা ও লতা-পাতা-ফুলের অলঙ্করণ পাওয়া যায় সেগুলো পশ্চিম এশিয়ার আরবীয় ও ভারতীয় নকশার সম্মিলিত রূপ। রক্ষণশীল ইসলামী মতবাদে মানুষ ও পশুপাখির চিত্র ভাস্কর্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই এ সময়ের শিল্পকর্ম হয়ে উঠেছে ইসলামী মূল্যবোধ অনুযায়ী। ভাস্কর্য শিল্প বিলুপ্ত হলেও চিত্র ও স্থাপত্য টিকে ছিল ভিন্ন বিষয়বস্তু এবং আঙ্গিকগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
স্থাপত্য শিল্পে পাল ঐতিহ্য পোড়ামাটির ফলক ব্যবহার হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেসব ফলকের বিষয় হয়েছে ফুল, লতা-পাতা এবং জ্যামিতিক নকশা। পাল শিল্পের উপাদান ঠিক রেখে পাল পরবর্তী শিল্পের গঠনশৈলীর পরিবর্তন হয়েছে। সাথে সাথে শিল্পও ধর্ম বা শাস্ত্র নির্ভরতা থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃতি ও মানবিক আবেদন ধারণ করতে শুরু করেছে। কালীঘাটের পটের আদর্শ খাঁটি বাংলার নিদর্শন নয়। ইউরোপীয়ভাবে প্রাচীন আদর্শ রূপান্তরিত হয়েছে।
ঐতিহাসিকদের মতে ১৩শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাংলা মুসলমানদের অধিকারে আসার পর এ অঞ্চলে শিল্পচর্চার ধারা ব্যাহত হলেও পরবর্তীকালে অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুসলিম শাসনের সময়ে শিল্পচর্চার কেন্দ্র হিসেবে মুর্শিদাবাদের উত্থান ঘটেছিল। মুর্শিদাবাদ শিল্পকলায় শিল্পের বিষয়বস্তু এবং প্যাটার্নের পরিবর্তন এলেও পাল শিল্পের রেখাচর্চা লোপ পায়নি। ১৮শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মুর্শিদাবাদ অঞ্চল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রভূমি হিসেবে সমৃদ্ধি লাভ করে। ১৭৩০ সালে হুগলির তীরে ব্রিটিশদের অবস্থানের পর মুর্শিদাবাদ শহর সমগ্র ভারতের বাণিজ্যের সাথে যুক্ত হয়ে উন্নতির শিখরে পৌঁছায়। মোগল সম্রাটদের অনুকরণে এই মুর্শিদাবাদের নবাবেরাও শিল্পীদের দিয়ে তাদের প্রতিকৃতি, শিকার দৃশ্য ও বিভিন্ন সামাজিক দৃশ্য অঙ্কন করাতেন। এসব শিল্পেও পাল শিল্পের রেখা ঐতিহ্য রক্ষা করা হয়েছে। রক্ষা করা হয়েছে স্থাপত্য ও সমাধিতে অলংকরণ ঐতিহ্য।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর এদেশে ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি আধিপত্য বিস্তার লাভ করে। ১৭৭৩ সালে রেগুলেটিং অ্যাক্ট চালু হওয়ার পর কলকাতা কার্যত ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী হয়ে ওঠে। ইংরেজ তথা ইউরোপীয়দের আগমনের ফলে তাদের শিক্ষা সংস্কৃতির সাথে এদেশের সংস্কৃতির মিশ্রণে একটি নতুন সংস্কৃতির রূপ প্রাধান্য লাভ করে। এই মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব শিল্প ক্ষেত্রেও পড়ে। ফলে কলকাতায় এক মিশ্র ধারার শিল্পী জন্ম লাভ করেন যাঁরা কোম্পানি শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।
এ সময়ের স্থাপত্য, চিত্র এবং ভাস্কর্য শিল্পে ইউরোপীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। দেশীয় শিল্পবোধের সাথে ইউরোপীয় ভাবধারার সংমিশ্রণে বাংলা এক নতুন শিল্পকলার আমেজ অনুভব করে। শিল্পের মন্থরগতিও সরব হয়ে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে।
ইংরেজদের আগমনে স্থাপত্য শিল্পে বাংলায় এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। দুশ’ বছর আগে স্থাপত্যের যে কৌশলপদ্ধতি নিয়ে যে সমস্ত ইউরোপীয় শক্তিগুলো উপমহাদেশে স্থাপত্য স্থাপন করেছিল তার মধ্যে ডাচ, ফ্রেন্স, পর্তুগিজ, ড্যানিস উল্লেখযোগ্য। আর্মেনিয়ার, গ্রিক, জার্মান এবং পরে ইংরেজরা এসে এক্ষেত্রে নতুন সংযোজন ঘটিয়েছে। আঠারশ শতকের শেষ ভাগে নির্মিত অল্পসংখ্যক স্থাপনা ব্রিটিশ স্থপতি দ্বারা নকশা করা হয়েছে যা বিশেষভাবে ব্রিটিশ স্থাপত্য কৌশলের ওপর নির্ভর করে।
ইংরেজ আমলে স্থাপত্যে নতুন কোনো রীতি পুরোপুরি উদ্ভব হয় নি যেমন হয়েছিল মুসলিম আমলে। তখনও মধ্যযুগ কিংবা প্রাচীন যুগের ধারা একেবারে বিলুপ্ত হয়নি। এ সময়ে রেখা মন্দিরের মতো স্থাপত্য কৌশল ক্রমশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। আধুনিককালের স্থাপত্যে সমতল সাদ ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে প্রাচীন বা মধ্যযুগের প্রচলিত কুটির দেওল-দোচালা, জোড় বাংলা, চৌচালা, ডবল চৌচালাসহ বিভিন্ন প্রকৃতির মন্দির স্থাপত্য এখনও প্রবহমান। আধুনিককালেও বাংলার চালাঘরের প্রভাব দেখা যায় হিন্দু ও মুসলিম স্থাপত্যে। পাল এবং পরবর্তী সেন যুগের স্থাপত্যে পোড়ামাটির ফলক দ্বারা অলংকৃত স্থাপত্যের প্রচলন থাকলেও আধুনিককালে সে স্থানে স্থান পেয়েছে অপেক্ষাকৃত সহজ প্রক্রিয়ার পালেস্তারার।
ঊনবিংশ শতকের কিছু পরের স্থাপত্যে আবার দেশীয় রীতির সদ্ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এর পরে ভারতীয় রীতি-বৈশিষ্ট্য ও আধুনিক রীতি-বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ দেখা যায়। যেমন রাজপুতের কিছু ইমারত, জোদপুরের মিউজিয়াম ইত্যাদি। এ রীতি চলতে থাকে বিশ শতক পর্যন্ত। অর্ধবৃত্তাকৃতির নানাধরনের খিলান, দরজা ইত্যাদির উপরিভাগে ত্রিকোণাকার কারুকার্য খচিত এবং আধা ফরিস্থিয়ান রীতির স্তম্ভ রয়েছে প্লাস্টারের ওপর লতা-পাতার মটিফ।
ঢাকার আহসান মঞ্জিল এই স্থাপত্যরীতির দৃষ্টান্ত। আধুনিক প্যাটার্নের বহু স্থাপত্য পৃথিবীর বহু দেশের অনুকরণে তৈরি হলেও এখনো বাংলার বহু মন্দির স্থাপত্য এবং সাধারণ স্থাপত্য, পাল স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব ধারণ করে গড়ে উঠেছে তা অস্বীকার করবার উপায় নেই।
ইংরেজ শাসন আমলে চিত্রকর্মে ইউরোপীয় প্রভাব থাকলেও মধ্যযুগীও বা মার্গরীতির বৈশিষ্ট্য থেকে চিত্রশিল্প আর ভাস্কর্যশিল্পও একেবারে উঠে আসতে পারেনি। বিষয়গত দিক থেকে পরিবর্তন হলেও চিত্রের আঙ্গিক ও গঠন প্রক্রিয়াতে পাল শিল্পধারার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। কেননা ইউরোপীয় বণিকেরা শিল্পকর্ম সৃষ্টির জন্য সে সমস্ত শিল্পী নিয়োগ করতেন তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন স্বদেশী শিল্পী। তাঁরা পূর্বের দেশীয় অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই শিল্প চর্চা করতেন। ফলে বিষয়গত পরিবর্তন হলেও চিত্র ও ভাস্কর্যের আঙ্গিক ও টেকনিকগত তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
চিত্রকলায় আধুনিকতার প্রবেশ ঘটলেও পূর্বভারতীয় রীতিও আধুনিকতার সাথে সাথেই থেকেছে। ১৭ শতকের গোড়া থেকেই সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারি চিত্রশালায় ন্যাচারাল হিস্ট্রি পেইন্টিং শুরু হয়েছিল। ১৯ শতকের শুরুতে যে সকল শিল্পী দিয়ে ন্যাচারাল হিস্ট্রি পেইন্টিং করানো হতো তারা সকলেই ছিলেন দেশীয় শিল্পী। এই ভারতীয় শিল্পীরা মুঘল রাজপুত চিত্রকলার ঐতিহ্য রীতি বা টেকনিক, টেম্পারা ও জলরঙ দিয়ে ছবি তৈরি করতেন। এ চিত্রের ফিনিসিং পদ্ধতিও এদের নিজস্ব। বর্তমানে এ রীতি প্রাচ্যকলা রীতি হিসেবে পরিচিত। ভারতের ইংরেজরা ব্রিটিশ অ্যাকাডেমিক ধারায় চিত্র রচনার উৎসাহ জোগাতেন। এই ধারাই জলরঙের গুরুত্ব এবং ব্যবহার প্রাধান্য পায়। ব্রিটিশদের ধারা হলো জলরঙ, আর ভারতীয় চিত্র রচনার ধারা হলো রৈখিক। রেখার সাহায্যে নির্মাণকে প্রাধান্য দেয়া।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে কোম্পানি ধারাটি বন্ধ হয়ে যায়। এ ধারার আগেই কলকাতার বটতলা এবং কালিঘাট অঞ্চলে দু’টি উল্লেখযোগ্য চিত্রকলার সূত্রপাত হয়েছিল। এ ধারা দু’টি মধ্যযুগীয় এবং লোক চিত্রকলার ধারা অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
বটতলার শিল্পীরা কাঠের মসৃণ পাটায় রৈখিক ছবি খোদাই করতো আর কালিঘাটে তৈরি হতো পটচিত্র। রেখানির্ভর এই সব চিত্রের প্রভাব পরবর্তীকালের অর্থাৎ চল্লিশ দশকের আধুনিক চিত্রশিল্পীদের আঁকতে দেখা যায়। কাজেই বলা যায় পাল চিত্রধারার প্রভাব এই আধুনিককালেও ম্লান হয়ে যায়নি চিত্রাঙ্গন থেকে।
পাল চিত্রকলার আঙ্গিক আর ভাস্কর্যের আঙ্গিকের মধ্যে তেমন পার্থক্য দেখা যায় না। উভয়ই রেখার টানে ভাবগাম্ভীর্য ও বিষয়বস্তুকে পরিস্ফুটিত করা হয়েছে বলেই ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্য এবং দিমাত্রিক চিত্রে রেখার প্রভাব স্বাভাবিক কারণেই বেশি। এই রেখার প্রভাব পাল-পরবর্তী ভাস্কর্যে স্পষ্ট প্রতীয়মান। যদিও একাদশ শতকে ভাস্কর্যের দেহ গঠনে শক্তির রস মাধুর্যের প্রভাব অনেকটা স্থান পায় এবং দ্বাদশ শতাব্দীতে গিয়ে তা দাঁড়ায় অলংকরণমুখর ও কারুকার্যমণ্ডিত রূপে। দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ভাস্কর্য শিল্পের গতি ক্ষীণ হতে থাকে। কারণ এ অঞ্চলে তখন মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। মুসলিম আমলে চিত্রকলার উন্নতি সাধন হলেও ভাস্কর্য হয়ে পড়ে কোণঠাসা। তবে একথা স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, বাংলার ভাস্কর্যকলায় যে কমনীয়তা, সজীবতা ও সংবেদনশীলতা পাওয়া যায় তার শিল্পাদর্শ সুপ্রাচীন পাল প্রতিমাকলারই রূপরেখা।
দ্বাদশ শতাব্দীর পরে ভাস্কর্যে ভারতীয় প্রভাব অনুভব হয় না। মুসলমান আগমন এবং মুঘল শাসনের কারণে ভাস্কর্য চর্চার পরিবর্তিত রূপ প্রবাহিত হয় স্থাপত্য ও চিত্রকলায়। চিত্র ও স্থাপত্যকলাতেই ভাস্কর্যের বিকাশ অব্যাহত থাকে। স্থাপত্যের অংশ হিসেবে ভাস্কর্য জ্যামিতিক ও নকশাধর্মীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করে বেঁচে থাকে।
১৬শ শতকের প্রথম ভাগে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসার নামে ভারতবর্ষে আসে এবং ১৭৫৭’তে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর প্রায় দুশ’ বছর বাংলার শাসন ইংরেজদের হাতে চলে যায়। ১৭৭০ সালের দিকে সমগ্র বাংলায় ব্রিটিশ আধিপত্য ঘটে। এ সময় বিদেশী শাসকদের চাহিদা মেটাতে গিয়ে শিল্পকর্ম অনেকটা প্রাণহীন অবস্থায় পড়ে। সাথে সাথে নতুন এক শিল্পভাবনার উদ্ভব ঘটে যাকে আমরা আধুনিক শিল্পকলা নাম দিতে পারি। ১৭ শ’ শতকের মধ্যেই ইউরোপীয় সংস্কৃতি বাঙালি সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে। পাশ্চাত্য শিল্পকলাও তখন থেকেই এদেশে প্রভাব বিস্তার করে। ইউরোপীয়রা মার্বেল ও ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য নিয়ে এসেছে। চিত্রের মধ্যে তৈলচিত্র পদ্ধতিটিও স্থানীয় শিল্পীদের দৃষ্টি কেড়েছিল। ধর্মনির্ভর ভাস্কর্যের পরিবর্তে ইউরোপীয়রা স্মৃতি রক্ষার নিমিত্তে রাজধানী ও অন্যান্য শহরের পথে-ঘাটে ও মাঠে-ময়দানে ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠার রীতির প্রবর্তন করেন। ইংরেজদের অনুকরণে খ্যাতনামা ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি বা ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠা করেন ইংরেজরা। ইউরোপীয় রীতিতে স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা ভারতীয় শিল্পীদের অবশ্যই প্রভাবিত করে এবং শিল্প বিদ্যালয়েও শিক্ষাপদ্ধতির ভিত্তিতে এক সুনির্দিষ্ট শিল্পধারা গড়ে ওঠে যা ‘অ্যাকাডেমিক স্টাইল’ নামে পরিচিত। এরপর ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দি ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট’। এখানে ভারতীয় শিল্পীরা দেশীয় রীতি চর্চা করলেও ইউরোপীয় প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি ভাস্কর্য শিল্প। এ কথা অবশ্যই বলা যায় যে, আধুনিক ভাস্কর্যশিল্প বিশেষ করে দেশীয় এবং ইউরোপীয় রীতিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। উভয়ই রীতির মিশ্রণে ভাস্কর্যশিল্প সমাদৃত হয়েছে শিল্পমানব সত্তায়। পাল শিল্পকলা এখন ইতিহাস হলেও ঐতিহ্যগুণে তা এখনও সমৃদ্ধ ।।