পূর্বসূত্র:
হানুফার জ্বিন ছাড়িয়ে নাম কুড়ায় মমিন। মেয়েটি তাকে ভাই বলে ডাকে। পরদিন মেয়ের হাত দিয়ে সে তার জন্য খাবার পাঠায়। সে ইতঃস্তত করে। কারণ এসব নানান জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এদিকে খলিলের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। তাকে ঝাড়-ফুঁক দেওয়ার জন্য মমিনের ডাক পড়ে। সে গিয়ে তার জন্য দোয়া করে। তাকে নিয়ে বাইরে বের হয়। এইভাবে নানান অনুষঙ্গে বড়বাড়ির লোকজনের সঙ্গে মমিনের সম্পর্ক বাড়ছে। আজিম মণ্ডলের বড় মেয়ে হাসনা বেগম বাড়িতে এসে খবর দিয়ে যায় তার শ্বশুরবাড়ির জ্ঞাতি-গুষ্ঠিরা তার বাপকে মারার ষড়যন্ত্র করছে।
গোসল করে বাড়িতে ফিরলেন আজিম মণ্ডল। স্বামীর কাছে ছুটে গেলেন খোদেজা বিবি। তিনি প্রায় চিৎকার করেই বলতে গিয়েছিলেন কথাটা, যে, তাকে মারার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কিন্তু হঠাৎই চুপ করে গেলেন। তার মনে হলো আগে খাওয়া-দাওয়া হোক, তারপর ধীরে-সুস্থে বলবেন। তাকে পড়িমরি করে ছুটে আসতে দেখে অবাক হন আজিম মণ্ডলও। -কী ব্যাপার হাসনার মা? কী হয়ছে?
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান খোদেজা বিবি, হঠাৎ কী বলবেন বুঝে পান না। বিব্রত হন। তার মুখে অদ্ভূত হাসি ফুটে ওঠে। বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। শেষ পর্যন্ত লজ্জায় নীরবে হাসেন একটু। স্ত্রীর এই অদ্ভূত আচরণে কিছুটা বিস্মিত হলেও মজা পান আজিম মণ্ডল। তার মুখেও অদ্ভূত একটা হাসি ফুটে ওঠে, তাতে একইসঙ্গে বিস্ময় ও কৌতুক ভাসে। উঠোন জুড়ে রোদ ছড়িয়েছে। সেই রোদে ভেসে যাচ্ছে খোদেজা বিবির মুখ। তার দিকে তাকিয়ে কিছুটা যেন বিবাগী হয়ে গেলেন আজিম মণ্ডল। কতই বা বয়স হয়েছে। চল্লিশের কমই হবে। শরীরের বাঁধন এখনো ঢিলে হয়ে যায়নি। কাজের চাপে, রোদ-বৃষ্টির প্রকোপে মুখের রঙে বেশ কালচে কালচে ভাব। যৌবনের সেই রং ও ঔজ্জ্বল্য লুপ্তির পথে। তবু কিছু লাবণ্য আছে এখনো। কৈশোরে বিয়ে হয়েছে তাদের। আত্মীয়তার সূত্রে আগে থেকেই জানাশোনা ছিল। তারপর মুরুব্বিরা যখন তাদের বিয়ে দেন তখন হ্যাঁ কিংবা না বলার মতো বুদ্ধি বা সাহস ছিল না তাদের। আসলে সেরকম রেওয়াজই ছিল না তাদের পরিবারে। বাপ-মা, জ্ঞাতি-গুষ্ঠিরা যা ঠিক করে দেয় তা-ই তাদের মেনে নিতে হয়। তাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কিন্তু এতে কোনো আফসোস হয়নি আজিম মণ্ডলের। খোদেজা বেগম দেখতে-শুনতে হয়তো তেমন একটা সুন্দরী নন, কিন্তু একেবারে ফেলনাও নন। গুণের জোর তার এতটা বেশি যে রূপের ঘাটতি চোখে পড়ে না। ঘোর সংসারী মানুষ তিনি। সংসারের কাজ ছাড়া তার আর কোনো সাধ-আহ্লাদ আছে বলে মনে হয় না। সংসারের কাজ তার না করলেও চলে। কাজের মানুষের অভাব নেই এই সংসারে। কিন্তু কাজ ছাড়া থাকতে পারেন না তিনি।
কী যে হলো আজ আজিম মণ্ডলের, ভাল করে তাকালেন তিনি স্ত্রীর দিকে। আগের চেয়ে শরীর ভারি হয়েছে খোদেজা বিবির। কিন্তু সমানে ছোটাছুটি করতে পারেন এখনো। গায়ে শক্তিও আছে। জনা কুড়ি লোকের জন্যে রাঁধা ভাতের হাঁড়ি, কিংবা চালের ধামা, বা পানির বালতি এখনো সহজেই তুলতে পারেন। যদিও সেসব কাজ এখন কাজের লোকেরাই করে।
আজ কেন যেন তার মনটা বেশ দুর্বল হয়ে গেল। আজকাল দু’দণ্ড বসে স্বামী-স্ত্রীর কুশল বিনিময়টাও হয় না। প্রত্যেকদিন তিনি সকালে উঠে বের হন। দুপুরে ফিরে খেয়ে-দেয়ে একটু বিশ্রাম নেন কি নেন না, আবার বের হন। কোনো কোনো দিন তা-ও হয় না, একেবারে রাতে ফেরেন। বাড়িতে যতটুকু সময় থাকা হয় ততক্ষণ নানা জনের নানা সমস্যা ও আবদার নিয়ে থাকতে হয়। বৃদ্ধ বাপ-মার কাছে বসতে হয় কিছুক্ষণ। এভাবে কীভাবে যেন সময় পেরিয়ে যায় প্রত্যেকদিন, স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করার বা সময় কাটানোর ফুরসত হয়ে ওঠে না। আর স্ত্রীও সে সময় ব্যস্ত থাকেন সংসারের ঝামেলা নিয়ে। একমাত্র রাতটাই থাকে তাদের হাতে। কিন্তু দুজনেই থাকেন ক্লান্ত। তাছাড়া ছোট মেয়েটা এখনো মায়ের ন্যাওটা, মা ছাড়া শুতে চায় না সে। সুতরাং রাতেও খোশ-গল্পের সুযোগ খুব কমই হয়।
বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছেন খোদেজা বিবি। স্বামী তার আচরণে বিস্মিত, হয়তো বা উদ্বিগ্নও, কিন্তু তিনি তার কাছে ধরা দিতে চান না, স্বাভাবিক হতে চান, সেজন্য যে পরিবেশ দরকার তা এখানে নেই। হেঁশেলঘরে দুই জা আর কাজের মেয়েরা রয়েছে। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। শেষ পর্যন্ত, কিছুটা নিজের অজান্তেই, অথবা অন্য কারো নির্দেশনায় যেন, ধীরে ধীরে স্বামীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কী সুন্দর চেহারা তার স্বামীর। চোখ দুটি কী গভীর! তাতে ক্ষণিকে আদর, ক্ষণিকে ভালবাসা, ক্ষণিকে কৌতুক, আবার ক্ষণিকে ক্রোধ কীভাবে যে ভেসে ওঠে। মানুষটা বড় বাহিরমুখি, ঘরে যেন মন বসে না। বাইরে ঘুরে বেড়াতে এত ভাল লাগে? ক্লান্তি আসে না? বউ-ছেলেমেয়েদের জন্যে মন টানে না? জিজ্ঞেস করলে কেবল হাসেন তিনি। বলেন, কী কর্ইবো বুলো, মাইন্ষে ডাইক্লে আমি থাকতে পারিনি। ক্যান, ঘর-সংসারের কুনু অসুবিধা হোছে? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর আছে! খোদেজা বিবি বলেন, না, অসুবিধা আর কী। আপনের যা ভাল লাগে তাই কর্ইবেন। খোদেজা বিবির আজ মনে হচ্ছে একথা বলার সময় আর নেই। তাকে ঘরমুখি করতে হবে। তার শত্রুর সংখ্যা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনার কোনো মানে আছে?
স্বামীর সামনে গিয়ে আরো বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়লেন তিনি। তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। এই দৃষ্টিতে আরো কিছু আছে- মুগ্ধতা, সেটা অনুভব করে তার শরীরে শরমের শিহরণ বয়ে যায়। দ্রুত হেঁশেলঘরের দিকে তাকালেন তিনি। ওরা কাজে ব্যস্ত। তবু কখন কে তাকায় কে জানে। লজ্জার সীমা থাকবে না কেউ দেখে ফেললে। তিনি চোখ ফেরালেন। স্বামীর হাত থেকে ভেজা লুঙ্গি ও গামছা টেনে নিলেন। সেগুলো বাঁশের ডাপে মেলে দিতে দিতে বললেন, অ্যাতো দেরি কইরলেন! হাসনা আইসি ঘুইরি গেল।
-তাই নাকি? স্বাভাবিক হলেন আজিম মণ্ডলও। -ক্যান? আমার সাথে দেখা না কইরিই চইলি গেল?
ব্যাপারটা অস্বাভাবিক। এরকম কখনো হয়নি এর আগে। বাপ-মেয়ের সম্পর্কের রসায়নটা এমনই গভীর। ছেলেই তার প্রথম সন্তান। হাসনা দ্বিতীয়, কিন্তু মেয়েদের মধ্যে বড়। মেয়েটা তার দেখভাল করত, তাকে শাসন করে রাখত। চোখের সামনে রাখবেন বলে কাছে-কোলে বিয়ে দিয়েছেন, নিজেদের মধ্যে। তা না হলে অনেক ভাল ভাল সম্বন্ধ এসেছে মেয়ের, কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত খালাতো বোনের ছেলেকে বেছে নিয়েছেন। অবশ্য তার বোনেরও খুব ইচ্ছে ছিল। সব মিলিয়ে খারাপ হয়নি সম্বন্ধটা। জামাই উদ্যোগী মানুষ, সাহেব বাজারে কাপড়ের দোকান দিয়েছে। ব্যবসা নতুন, সে নিজেও নতুন ব্যবসায়ী। কিন্তু নিষ্ঠা আছে তার। ব্যবসাতে ধীরে হলেও উন্নতি হচ্ছে সেটা আশার কথা। -ম্যাডা আমার খুব পয়মন্ত। প্রসঙ্গ উঠলে লোকেদের সামনে গর্ব করে বলেন তিনি।
-বইস্তে বুইল্লে না? না খায় চইলি গেল?
-এই সাত-সকালে অর কাম নাই? জামাই বাজারে যাবে।
অবাক হলেন আজিম মণ্ডল। -তাহিলে আইলো ক্যান? কী ব্যাপার? কুনু জরুরি কাম ছিল নাকি?
সে কথার উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেলেন না খোদেজা বিবি। নানা-নানা, করতে-করতে ছুটে এল ইফফাত, লাফ দিয়ে একেবারে নানার কোলে উঠে বসল। আজিম মণ্ডলকে সে অকস্মাৎ-ধাক্কা সামলাতে একটু বেগ পেতে হলো। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে সেকি চুমোচুমি। রান্নাঘরে নানিদের সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে বাইরে গিয়েছিল সে। মেয়েটা কখনো স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না। সব সময় দৌড়ের ওপর থাকা চাই। কিছু-না-কিছু তাকে করতেই হবে। আর মেজাজও বেশ চড়া। তার কথা না শুনলে সবাইকে বকা-ঝকা করে তটস্থ করে তুলবে। যে আজিম মণ্ডলকে এ বাড়ির বড়রাও সমীহ করে চলে, সেই তিনিও এই ক্ষুদে মেয়েটির কাছে জব্দ। সবাই সেটা উপভোগ করে।
-কাইল আসিস্নি ক্যান বুল্ তো! আমি তোর লেগি না খায় বইসি থাইকি-থাইকি হয়রান হয় গেনু!
সত্যিই তাই। ইফফাত সাধারণত দুপুরের আগে আগে আসে, প্রায় প্রত্যেক দিনই। গতকাল আজিম মণ্ডল সে সময় বাড়িতেই ছিলেন। পদ্মা থেকে বড় বড় পাঁচটা ইলিশ এনেছিলেন। যদিও তার মধ্যে থেকে একটা ইলিশ মেয়ের বাড়িতে গেছে, তবু তিনি প্রত্যাশা করছিলেন নাতনিকে পাশে বসিয়ে ইলিশ-ভাত খাবেন। মেয়েটা ইলিশ খুব পছন্দ করে। তার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছেন তিনি। কিন্তু সে আসেনি। মনটা খারাপ হয়েছিল।
-আমারে দাওয়াত ছিল যে!
-তাই নাকি? কুন্ঠে?
-আবল চাচার বাড়িত্।
আবল মানে আবুল হোসেন, ইফফাতদের একটা বাড়ির পরেই তার বাড়ি, সম্পর্কে সে তার চাচা হচ্ছে।
-ও, তাই তো বুলি বইন আমার আইস্লো না ক্যান।
-অ্যাখুন বুইঝ্লেন তো? বুকা কুন্ঠেকার!
নানি এবার হাসতে-হাসতে বললেন, এই, থাম্ তুই! খালি পাকা পাকা কথা।
-তুই-ই থাম।
-কী! আমাক্ তুই তুই-তুকারি করছিছ্? দাঁড়া, মজা দেখাছি।
তিনি তেড়ে মারতে গেলেন। হই-হই করে উঠল ইফফাত- নানা, নানা, নানি মার্ইছে। নানার কোলে ছটফট করতে লাগল সে। নানা ধমকে উঠলেন, এই, খবদ্দার! আমার বুবুক্ মাইরো না বুল্ছি। আমি কিন্তুক্ ছেইড়ি দিবোনানি, হ্যাঁ। তবু নানি নাতনির পিঠে কয়েকটা হালকা চাপড় মারলেন। -নানি, নানি, মাইরো না, নানি। ইফফাতের কৃত্রিম আর্তনাদ শেষ হওয়ার আগেই নানি তার কাজ শেষ করে নাতনিকে জড়িয়ে ধরলেন। ইফফাত অনুযোগ করল, ইস! মাইরি-টাইরি অ্যাখুন আবার আদর হোছে! ছ্যাড়ো, ছ্যাড়ো।
নানি বললেন, ওরে আমার বুড়ি রে! আমি তোক্ মার্ইতে পারি, বুল্? তুই আমার বুবু না?
-উম! মাইরি-টাইরি অ্যাখুন দরদ দেখাছে। নানা, মার্ইলো না, বুলেন?
-মার্ইলো তো। এই এরফানের মা, তুমি মিছি কথা বুইল্ছো ক্যান? তুমি মার্ইলে তো!
-না, না, আদর করনু। হয়ছে, এবির চল, নানার সাথে ভাত খা গা।
খাওয়া-দাওয়ার পর ইফফাত একটু বেরুলো। তখন স্বামীকে একলা পেয়ে খোদেজা বিবি বললেন, আইজ আর বাহিরে যায়ো না।
-ক্যান? যাবো না ক্যান?
-ইফফাত আইসিছে। তুমি চইলি গেলে উই কাইন্দ্বেনি।
একটু দুর্বল হলেন আজিম মণ্ডল।
-তা ঠিক। কিন্তু ওদিক আবার ভুবন দাস খবর পাঠায়ছে।
-পাঠাইক্। ও পরে গেলেও চইল্বে।
-ঠিক আছে, দেখা যাইক। ইট্টুক বেলা গেলে না হয় যাবোনি। তে হাসনা কী মুনে কইরি আইসিছোল? আইস্লো তে আইস্লো, আবার তাড়াহুড়া কইরি চইলি গেল যে! কিছু বুইল্লো না?
-বুইলিছে তো। তুমাক বুলে মারার ষড়যন্তর হোছে!
-কী যে বুলো না এরফানের মা। খালি বাজে কথা।
-বাজে কথা না। হাসনার শাশ্ড়ি লিজের কানে শুইনিছে।
-বুবু?
বিহানকে এখনো বোন বলেই সম্বোধন করেন আজিম মণ্ডল। প্রায় সমবয়সী তারা। -বুবু লিজের কানে শুইনিছে? কী কইরি শুইন্লো?
-তা জানিনি। হাসনা যা বুইল্লো তাই বুলছি আমি।
একটু গম্ভীর হলেন আজিম মণ্ডল।
-বুবু তো আজেবাজে কথা বুলার মানুষ না।
-হুম। আমরা বুইল্লে তো শুনো না। এবির যদিল্ তুমার সুমতি হয়। মানুষের ঝুট-ঝামেলা লিই শত্রু বাড়ায় কী ফায়দা বুলো তো? এবির ক্ষ্যান্ত দ্যাও।
আবার কোত্থেকে ছুটে এলো ইফফাত। -নানা, আমাক গাঙের ধারে লিই চলেন না। কতদিন গাঙ দেখিনি। গাঙ দেখতে মুন যায়ছে।
-হঠাৎ গাঙ দেখার সখ হইলো তোর? কী ব্যাপার রে বইন?
-হ্যাঁ, সখ হইলো। লিই যাবেন কিনা তাই বুলেন।
-হ্যাঁ, লিই যাও, অক্ গাঙ দেখায় আইসো।
-আচ্ছা, ঠিক আছে।
নাতনিকে নিয়ে গাঙ দেখতে বেরুলেন আজিম মণ্ডল।
নয়
কদিন থেকে বৃষ্টির প্রকোপ বেশ কম। মাঝে মাঝে সূর্যের মুখও দেখা যাচ্ছে। তবে ভ্যাপসা গরমে জীবন ওষ্ঠাগতপ্রায়। আজিম মণ্ডল এক হাতে ছাতা ফুটিয়ে ধরেছেন, যদিও ছাতার এখন কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ বৃষ্টিও নেই, রোদও নেই। তা হলে কী হবে, ছাতা ছাড়া তার একদমই চলে না। কী গ্রীষ্ম, কী বর্ষা, কী শীত, সব মওসুমেই তার হাতে একটা ছাতা থাকবে, তা কাজে লাগুক বা না লাগুক।
ইফফাত হাঁটছে নানার হাত ধরে। তবে মাঝে মাঝে তাকে কোলে বা কাঁধে নিতে হচ্ছে। কারণ রাস্তা কোথাও কোথাও এতই খারাপ- কাদা-পানিতে ছয়লাপ একেবারে। তবু তো ভাল রাস্তা ধরেছেন আজিম মণ্ডল। কথায় বলে, সুপথ দূর ভাল। সেজন্য তিনি কোনাপাড়ার মধ্যে দিয়ে পথ ধরেছেন। এই পাড়াটা আসলে মধ্যপাড়ার দক্ষিণাংশ, কিছুটা ছড়ানো। পাড়াটা গড়ে উঠেছে বড়পুকুরের কোণকে ঘিরে, পশ্চিম এবং দক্ষিণ পাড় ঘেঁষে। এ পাড়ার বাশিন্দারা দুটি বংশে বিভক্ত। দুটোই মণ্ডল বংশেরই ধারা, ভাগ হতে হতে কিছুটা দূরে চলে গিয়েছে সম্পর্কটা। তবে বিয়ের সূত্রে এখন নানান জটিল সম্পর্কে আবদ্ধ।
কোণাপাড়া পেরিয়ে সড়ক ধরে পশ্চিম দিকে যেতে হয়। সেখানে মোল্লাপাড়ার মোড়। এটাকে ঈদগাহ মোড়ও বলে। কারণ মোড়ের ওপরেই এপাড়ার ঈদগাহ। সেখান থেকে দক্ষিণে সোজা পদ্মা নদী। অবশ্য নদীর আগে পাবনা রোড, আর তার উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে চলা খালটা পেরতে হয়। সেখানে একটা পাকা সাঁকো আছে। সাঁকো ঘেঁষে শ্যামা ডাক্তারের ওষুধের দোকান।
তিনি ওষুধ বিক্রি করেন বটে, রোগীও দেখেন। এ অঞ্চলে অসুখ-বিসুখে তিনিই ভরসা। বেশিরভাগ রোগীরাই আসে তার কাছে। ডাক পড়লে তিনিও যান রোগীর বাড়িতে। ডাক্তারের বয়স সত্তর পেরিয়েছে। চুল-দাড়ি সাদা ফকফকে। দাঁতও পড়েছে কয়েকটা। বাড়ি পাশের গ্রাম ডাঁশমারিতে। কত আর দূরত্ব, হয়তো মাইল আড়াই হবে। প্রতিদিন সকালে সাইকেলে চড়ে আসেন। সারাদিনের জন্যে চলে আসেন। আগে দুপুরে চলে যেতেন আবার বিকেলে আসতেন। যেতেন সন্ধ্যের পর। ইদানীং শরীর বেশি চাপ সইতে পারে না। তাই দুপুরে আর যান না। সকালে আসার সময় সামান্য ছাতু আনেন, সেটাই কখনো গুড় দিয়ে কখনো লবণ-মরিচ দিয়ে মাখিয়ে খেয়ে নেন। দুপুরের বিশ্রাম এখানেই সেরে নেন। সেই কোন কাল থেকে তিনি এখানে বসছেন। ছোটকালে আজিম মণ্ডল দেখেছেন ডাক্তারের ঘরটা ছিল ছোট্ট একটা কুঁড়ে, পাটখড়ির বেড়া চারপাশে, ওপরে খড়ের চালা। এখন সেটা বেশ খানিকটা বড় হয়েছে, বেড়া সরিয়ে উঠেছে মাটির দেওয়াল, আর ওপরে টিনের চাল। টিনের গরম ঠেকাতে মাথার ওপর বাঁশের বাতার চাতালও দিয়েছেন। তখন তার যৌবন বয়স। চেহারা ছিল রাজপুত্রের মত। শহরে কোন এক এলএমএফ ডাক্তারের কাছে বেগার খেটে ডাক্তারি শিখেছেন। তবে তার হাত-যশ ছিল, খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এখন এ কূলে তেমন কেউ আর নেই তার। দুটো ছেলেই ভারতে পাড়ি জমিয়েছে। সেখানে তারা ভালই আছে। একটা মেয়ে ছিল, সে বিয়ের পরপরই মারা গেছে। তার স্ত্রীও গত হয়েছেন বছর দুয়েক আগে। এখন ঝাড়া হাত-পা। ছেলেরা ডাকে তাকে, কিন্তু তার এক কথা- যাব না, বাপ-ঠাকুরদার ভিটি ছেইড়ি কুনুঠে যাব না। অবশ্য তার জমি-জমা সবই বেচে-কুচে নিয়ে গেছে ছেলেরা। থাকা বলতে ভিটেটাই। ওইটুকুই আঁকড়ে পড়ে আছেন তিনি এখনো।
অনেকদিন দেখা-সাক্ষাৎ নেই তার সাথে।
দোকানে এখন একটাই রোগী। ফাঁকা দেখে ভেতরে ঢুকলেন আজিম মণ্ডল।
-আদাব, কাকা।
-আরে আজু মুণ্ডল নাকি? আসো, আসো। বসো।
-বইস্পো না কাকা, সাথে আমার লাতনি আছে। অনেকদিন দেখা নাই, মুনে করনু ইট্টুক্ খবর লিই যাই।
-ও, এইডি তুমার লাতনি? হাসনার বিটি নাকি?
বড়বাড়ির প্রায় সবাইকেই চেনেন তিনি। বাড়িতে আসা-যাওয়া আছে। নানান অনুষ্ঠানে দাওয়াত পান তিনি। ইফফাত যখন হাসনার পেটে তখন একবার তার ভীষণ জ্বর হয়েছিল। প্রায় প্রত্যেকদিন তিনি বড়বাড়িতে গিয়ে হাসনাকে দেখে এসেছেন। -কী রে, ক্যামুন আছিছ? তোর মা ক্যামুন আছে?
ঘাড় নেড়ে ইফফাত জানায়, ভাল আছে।
-ওমা, আজু, তুমার লাতনি কি বুবা নাকি? কথা বুইল্ছে না যে?
-বুবা হবো ক্যান? অতো সুজা না।
-ওরেব্ববা! কী তেজ! বেশি তেড়িবেড়ি কইরলে কিন্তুক আমি ইঞ্জেকশন দিই দিবো হ্যাঁ।
এবার একটু ঘাবড়ে যায় ইফ্ফাত। নানার কোল ঘেঁষে বসে, তাকায় তার দিকে। নানার দৃষ্টিতে হয়তো আশ্বস্তি ছিল, সে চোখ বড় বড় করে পালটা হুমকি লাগাল- ইঞ্জিকশন আমি ভাইঙ্গি ফেলবো।
-ওরে সর্বনাশ! এ তো ডাকাত ম্যা গো।
নানাকে ঠেলা লাগায় ইফফাত, বারবার ঠেলে, এখানে আর থাকবে না সে। তাই দেখে শ্যামা ডাক্তার বলেন, না রে, ভয় নাই। আমি তোক্ ইঞ্জেকশন দিতে পারি? তুই যে আমার বড়দিদি।
আবার নানার মুখের দিকে তাকায় ইফফাত। ফিসফিস করে বলে-দিদি মানে কী?
আজিম মণ্ডলও ফিসফিস করে বলেন, দিদি মানে বইন।
মুখ বাঁকায় ইফফাত। -আমি আর কারু বইন না। আমি খালি আমার নানার বইন।
-আচ্ছা, ঠিক আছে। আমার উপুর তোর রাগ হয়ছে তো? আমি তোর রাগ ভাঙ্গাই দাঁড়া।
ডাক্তার তার চেয়ারের পেছনের র্যাক থেকে একটা বোতল নামালেন। সেটা একটা তেনা দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন, তুমার এই লাতনি একদিন খুব বড় হবে আজু, দেখো আমি বুইলি রাখনু। যা তেজ! বলে একটা কাপ ধুলেন। তারপর বোতল থেকে মধুর মতো তরল ঢাললেন কাপটায়।
-আমার উপুর তোর রাগ হয়ছে তো? তে তোর রাগ আমি মিটাছি আমি থাম। লে, ইট্টুক্ মধু খা।
কিন্তু কোনো মতেই মধু মুখে তোলে না ইফফাত। শেষে আজিম মণ্ডল তার মুখে তুলে ধরলেন।
-লে, খা বুবু, খুব ভাল মধু।
শেষ পর্যন্ত খায় ইফ্ফাত। এই ফাঁকে ডাক্তারের পরিবারের কিছু খবর জানা হয়ে যায় আজিম মণ্ডলের।
-অরা এমনিতে ভালই আছে। তে বিদ্যাশ বুইলি কথা। ওইখিনকার লোকেরা অরখে রিফুজি বুইলি গাল দ্যায়।
-আমারে এখিনেও তো তই হয়। বিহার-মুশ্শিদাবাদ-মালদহ থেইকি আসা লোকেরখে এখিনকার মানুষেরাও ভাল চোখে দ্যাখে না। রিফুজি বুইলি গাল দ্যায়।
-হুঁম। তুমরা বুলো, আমি কখুনো বুলিনি। মানুষ কেউ সাধ কইরি ভিটি ছাড়ে না বুইঝ্লে। অরে দুঃখডাও আমারে বুঝা উচিত।
সায় দেন আজিম মণ্ডল- হ্যাঁ, ঠিক বুইলিছেন।
ডাক্তার বলে চলেন, আমি অরখে বুইলিছুনু, আমারে তো কুনু অসুবিধা হোছে না, তাহিলে আমরা যাবো ক্যান? ওইখিনে আমারে লেগি ইট্টুক হা-হুতাশ কইরবে সেরকুম কুনু মানুষও কি আছে? বুলো? তে ছেলিরা বুইল্লো, এডি নাকি মুসলমানের আর ওইডি নাকি হেন্দুরে দ্যাশ। এই ক’বছরেই বুইঝ্ছে কথাডা কত বড় ভুল। তে অ্যাখুন আফসোস কইরি তো কুনু লাভ নাই।
-হ্যাঁ, কাকা, মানুষ তো ভবিষ্যত দেখতে পায় না, আন্দাজ করে। কখুনো ঠিক হয়, কখুনো আবার ভুলও হয়। কেউ জিতে, কেউ ঠগে। সব ভাগ্য।
-হ্যাঁ, ভাগ্য মানা ছাড়া আর কুনু সান্ত¦না নাই।
ইফফাত উসখুস করছে। ওঠা দরকার। আজিম মণ্ডল বললেন, কাকা, আপনের কুনু সমস্যা হলে আমাক্ খবর দিবেন।
-না বাবা, আমার কুনু সমস্যা নাই। আর কডা দিন, বুলো? মইরলে পাড়া-প্রতিবেশিরা আছে, অরাই আগুন দিবে। তার কণ্ঠ ভারি হয়ে এল। তিনি জানেন, বয়স হয়েছে, যে কোনো সময় মৃত্যু হতে পারে। এ সময় সব মানুষেরই একটাই চাওয়া-পাওয়া, ছেলেমেয়ে, জ্ঞাতি-গুষ্ঠি, নাতি-নাতনিরা চারপাশে খলবল করবে। শেষ নিঃশ্বাসের সময় মুখে একটু শরবত, নিদেনপক্ষে পানি দিবে। একটু কাঁদবে। তারপর সবই ভুলে যাবে। ভোলাটাই স্বাভাবিক। না ভুলতে পারলে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠত। মানুষের জীবনের প্রবহমানতা হারিয়ে যেত। একদিন ডাক্তারকেও ভুলে যাবে সবাই। কিন্তু মরার আগেই যে তাকে স্মরণ করার লোকেরা হারিয়ে গেছে।
কী বলে যে এই বুড়ো মানুষটাকে প্রবোধ দিবেন ভেবে পাচ্ছেন না আজিম মণ্ডল। লোকটার চোখের কোণ চিকচিক করছে। এই বয়সে কান্না এলেও লোকে কাঁদতে পারে না। সেই অবস্থা শ্যামা ডাক্তারের।
-একবার বেড়ায় আসলেও তো পারেন। লাতি-লাতনির মুখ দেখা হতো। বললেন আজিম মণ্ডল।
-হ্যাঁ, এক-একবার মুনে করি যাবো। কিন্তুক্ যাইনি তার কারণ অরা আমাক্ আর আসতে দিবে না। আমি ওই দ্যাশে থাকতে পারবো না।
আজিম মণ্ডল বললেন, এডিই জীবন, কাকা। দুঃখ কইরেন না। আল্লা যা করে ভালর জন্যেই করে। হয়তে অ্যার ভিতরেও কুনু কল্যাণ আছে, আমরা সাদা চোখে বুঝতে পারছিনি।
-ঠিক বুইলিছো, ওই কথা মুনে কইরিই বুকে পাথর বাইন্ধি আছি। দ্যাখা যাইক, উপুরঅলা কী করে।
ইফফাত ধাক্কাতে শুরু করেছে। উঠতে হলো মণ্ডলকে।
নাতনিকে কখনো কোলে কখনো ঘাড়ে নিয়ে হাঁটেন আজিম মণ্ডল। সে আর হাঁটতে চায় না। রাস্তায় মাঝে মাঝে দাঁড়াতে হয়। লোকজনের সঙ্গে দেখা হয়, তাদের সঙ্গে কথা বলতে হয়। বিরক্ত হয় ইফফাত।
-খালি দাঁড়ায়. খালি দাঁড়ায়। আর দাঁড়াবেন না বুলছি। ধমক লাগায় সে নানাকে।
নানা বোঝায় তাকে- শুন্ বুবু, মানুষের সাথ্ দেখা হলে সালাম দিতে হয়, কথা বুইল্তে হয়। তাহিলে আল্লা খুশি হয়। মানুষও খুশি হয়।
-আমার যে দেরি হয় যাইছে।
-আচ্ছা, হোইক্ না ইট্টুক দেরি, কী আর অ্যামুন ক্ষতি হবে বুল্ তো? তুই যখুন বড় হবি তখুন তোর কাছেও কত মানুষ যাবে…
-ক্যান যাবে? কেউ যাবে না।
-যাবে, যাবে। তুই কত বড় হবি, তখুন তোর কাছে কত কামে যাবে মানুষ। তখুন মানুষের সাথ্ কথা বুলবি, পার্ইলে সাহায্য করবি। ঠিক আছে? মান্ষে তাহিলে দুয়া কর্ইবে। তুই আরো বড় হবি। দেখলিনি শ্যামা ডাক্তার কাকা কী বুইল্লো? তুই অনেক বড় হবি। বড় হওয়ার মানে কী জানিস?
-কী?
-বড় হওয়ার মানো হলো, অন্য মানুষের উপকার করা।
এসব কথার কিছুটা বোঝে, কিছুটা বুঝতে পারে না ইফফাত। হয়তো একদিন বুঝবে, মনে পড়বে আজকের কথা কোনো এক ভবিষ্যতের দিনে।
নাতনির সঙ্গে ছেলেমানুষের মতো কত যে আবোল-তাবোল গল্প করেন আজিম মণ্ডল। তিনিও যেন ফিরে পেয়েছেন তার ছেলেবেলা। পদ্মা নদীর উথাল-পাথাল ঢেউ, দূরন্ত ঝাপটা বাতাস, তীর জুড়ে কাশবন, নদীর বুকে ছুটে চলা পালতোলা নৌকা, গাঙশালিকের কিচিরমিচির, সবই তো সেই আগের মতোই। কেমন করে যে তিনিই বুড়ো হতে চলেছেন। নদীর তীরে বসে শৈশব-কৈশোরের গল্প করতে করতে, বুড়েমি ভুলতে ভুলতে, হাসতে হাসতে, হারিয়ে যান তিনি বিশাল আকাশে।
দশ
ইফফাতকে রাখতে আজ নিজেই মেয়ের বাড়ি গেলেন আজিম মণ্ডল। ইচ্ছা নাতনিকে রেখে জুমা মসজিদে মাগরিব পড়ে ফিরবেন। অনেক দিন জুমা মসজিদে ওয়াক্তিয়া নামাজ পড়া হয় না তার। বাড়িতে থাকলে, যেমন ফজরের আর এশার নামাজ, বাড়ির মসজিদেই পড়া হয় বেশিরভাগ। জোহর, আসর আর মাগরিবের নামাজ বাইরে যখন যেখানে থাকেন সেখানেই পড়ে নেন।
সন্ধ্যের আগে পুরুষ মানুষ কেউ বাড়িতে থাকে না সচরাচর। বাইরে থাকলে তো কথাই নেই। অন্যথায় খেলার মাঠে, নাহয় পাড়ার মোড়ে, কিংবা মসজিদের বারান্দায়। বাপকে টেনে নিয়ে গিয়ে ঘরের মধ্যে বসাল হাসনা। শাশুড়ি এলেন একটু পর। কোনো ভূমিকা ছাড়াই বললেন, ভাই, সোনা আমার, তুমি এসব দলাদলি ছ্যাড়ো। অরা তুমাক মারার ষড়যন্তর কর্ইছে। কী দরকার অ্যার ভিতর থাকার!
-না বুবু, দলাদলি কিসের? পাড়া-প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজন বিপদে পইড়্লে সাহায্য কর্ইবো না, বুলো?
-কর্ইবে না ক্যান, কর্ইবে। ট্যাকা-পাইসা দিবে, বুদ্ধি-পরামর্শ দিবে, লাঠালাঠি কর্ইবে ক্যান? কী দরকার?
সমবয়সী বোনকে এমনিতেই সম্মান করেন আজিম মণ্ডল। তাতে এখন তো সম্পর্কে বিহান। তার সঙ্গে তর্ক করতে চান না তিনি। মেয়েমানুষ এত কিছু বুঝবেও না। তিনি কথা বলেন না বেশি। মাগরিবের আজান হয়। বাড়ির উঠোনে এক পাল মুরগি ততক্ষণে শোরগোল তুলে দিয়েছে। তিনি মসজিদের উদ্দেশে বেরুলেন।
হাসনাদের শ্বশুরবাড়ির পুবে একটু হাঁটলেই রাস্তার পাশে মসজিদ। উত্তর পাশে রাস্তার ধার ঘেঁষে আকাট জঙ্গল। আর মসজিদের দক্ষিণ এবং পূর্ব ও পশ্চিমে বাড়ি। মূল মসজিদটা দৈর্ঘে কুড়ি, প্রস্থে পনের হাত হবে। তার সামনে হাত দশেক প্রস্থ বারান্দা। মাটির দেওয়াল, কিন্তু মেঝেটা ইঁট-সুরকির। ওপরে টিনের চাল। মসজিদের সামনে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। সেখানে একটা বড়-সড় ইঁদারা। এই ইঁদারার পানি দিয়ে অজু করেন মুসল্লিরা। পাড়ার অনেকে এই পানি খাওয়ার কাজেও ব্যবহার করেন। লোকজন জামাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, কাতারবন্দি হচ্ছে। অজু সেরে নামাজে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ইকামত শেষ। তকবির ধরতে পারলেন না আজিম মণ্ডল।
এই মসজিদে নামাজির সংখ্যা অনেক। এই বর্ষাকালেও তিন কাতার মুসল্লি হয়েছে। পাড়ার লোক তো আছেই, পাশের পাড়ার লোকরাও সুযোগ পেলে এই মসজিদে নামাজ পড়েন।
জামাতের পর বেশিরভাগ মুসল্লি বেরিয়ে গেলেন। ইমাম আসলাম মৌলবি ঘুরে মুসল্লিদের দিকে মুখ করে বসেছেন। আজিম মণ্ডল তার সামনে গিয়ে সালাম দিয়ে বসলেন। মৌলবি সাহেব তার আপন মামা। তিনি এই আহলে হাদীস সমাজের সর্দার। সরল মানুষ। লম্বা, মোটাসোটা দলদলে শরীর। মুখভর্তি ঘন দাড়ি বুকসমান। এই অঞ্চলের একজন মানী-গুণী লোক হিসেবে পরিচিত তিনি। বছরের বেশির ভাগ সময়ই তার বাইরে বাইরে কাটে। ওয়াজ করতে যান বিভিন্ন এলাকায়। দেখতে কিছুটা গোবেচারা হলেও অনলবর্ষী বক্তা তিনি। যখন ওয়াজ শুরু করেন তখন তিনি এই দুনিয়ার মানুষ থাকেন না। সাধারণ লোকেরা বলে তখন তার ওপর জ্বিন ভর করে। এর থেকে তার আয় হয় ভাল। বর্ষাকালে মাহফিল হয় না। সেজন্য এসময় তিনি বাড়িতেই থাকেন। মসজিদের পশ্চিমে, একেবারে তার গা লাগোয়া বাড়ি মৌলবির।
ভাগ্নেকে দেখে হাসেন তিনি। সরল হাসি। আজিম মণ্ডলের মনে হয় তাকে দেখে মামু খুশি হয়েছেন। তার নিজেরও ভাল লাগে। গত জুমার জামাতে মৌলবি সাহেব ছিলেন না। সেজন্যে দেখা হয়নি।
হাত বাড়িয়ে দেন আজিম মণ্ডল। মৌলবিও হাত বাড়ান। মুসাফাহ করেন তারা। দু’জনে দু’হাতে দু’জনের হাত ধরে থাকেন খানিকক্ষণ। হাত ধওে ঝাঁকাতে থাকেন তারা। এটাই মুসাফার রীতি।
-ক্যামুন আছেন মামু?
-আল্হামদুলিল্লাহ। তুমি ক্যামুন আছ?
-আল্হামদুলিল্লাহ। মামি ভাল আছে?
-ভাল। যাও না তো। আফসোস করে তুমার মামি।
-মায়ের শরীল ভাল না। সেদিন বুইল্ছলো ভায়েক অনেকদিন দেখিনি।
-ক’দিন থেকি যাব-যাব করছি। আমি তো অ্যাখুন বাড়িতেই আছি। আইস্তে বুইলো তো! তুমার বাপও তো আইস্তে পারে।
-বাপ লইড়্বে? তাহিলেই হয়ছে।
-তুমার বাপ চিরদিনই এক রকুম থাইকি গেল। এ রকুম মানুষ আর দেখিনি।
তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন আরো কয়েকজন মুরুব্বি।
বাড়ি ফিরতে বেশ দেরিই হলো আজিম মণ্ডলের। বর্ষাকালের রাত। গাছপালার আড়াল পথের ওপর। গাঢ় অন্ধকারে খালি চোখে কিছু দেখা যায় না। টর্চের আলোয় পথ দেখে হাঁটেন তিনি। পশ্চিম দিকে এগিয়ে, হাসনার শ্বশুরবাড়ি পেরেতেই একটা মোড়। রাস্তাটা উত্তরে গেছে কাটাখালির দিকে, আর দক্ষিণে বড়বাড়ি। মোড়টা ঘুরতেই একটা ঢিল এসে পড়ল আজিম মণ্ডলের পিঠে। চমকে উঠেছিলেন তিনি। কখনো এরকম হয়নি তার এ জীবনে। দ্রুত ধাতস্থ হয়েই টর্চেও আলো ছুঁড়ে দিলেন পেছন পানে। দু’জন মানুষ ছুটে উত্তরদিকে পালিয়ে গেল বলে মনে হলো তার, ঠিক বুঝতে পারলেন না। তখন ঢিলটার খোঁজ করলেন। পড়ে রয়েছে একটা লাল মাটির ঢেলা। একেবারে শুকনো মাটির শক্ত ঢেলা।
এদিক-ওদিক ভাল করে আলো ফেলে দেখলেন আজিম মণ্ডল। রাস্তায় কেউ নেই। এই বর্ষার দিনে এরকম শুকনো মাটির ঢিল নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে আনা। কেউ পরিকল্পনা করে ঢিল এনেছে, হয়তো ওঁত পেতে ছিল। তিনিই কি লক্ষ্য ছিলেন? নাকি অন্য কাউকে ভেবে তাকে মেরেছে? ব্যাপারটা তাকে ভাবিয়ে তুলল। খোদেজা বিবি, হাসনা আর তার শাশুড়ির কথা মনে পড়ল তার। তাদের দেওয়া খবরের সঙ্গে কি এর কোনো সংযোগ আছে? একটা বিষয় তাকে খুব বিব্রত করে তুলল। এখানে তাকে ঢিল মারার মতো সাহস তাহলে কারো মধ্যে গজিয়েছে। কথাটা মনে হতে তার গোটা শরীর তিরবির করে জ্বলে উঠল। কিন্তু কোনো চেঁচামেচি বা শোরগোল না করে তিনি বাড়ির পথ ধরলেন।
গোটা পথটা তার হাতের তালুর মতো চেনা। কোথায় পানি, কোথায় কাদা, কোথায় খাদ, কোথায় ঢিবি, সব তার মুখস্থ। চোখ বুঁজেও তিনি এই পথে চলতে পারবেন। তবু আজ কিসের ঘোরে সারাটা রাস্তা টর্চ জ্বেলে রাখলেন আজিম মণ্ডল। বাড়ির ওয়াক্তিয়া মসজিদটা একটা বিশাল ঝোপের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বৈঠকঘরের দরোজা বন্ধ। জানলা দিয়ে কেরোসিন বাতির কাঁপা কাঁপা আলোয় বারান্দার অন্ধকার আবছা। সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই চারপাশে টর্চের আলো ছুঁড়লেন।
বৈঠকঘরের মধ্যে বাতির আলোয় পড়ছিল আব্দুল মমিন। জানালা গলে টর্চের আলো চোখে পড়ে তার। জানালার কাছে গিয়ে সে কাউকে ঠাহর করতে পারল না। কিন্তু তার মনে হলো আজিম মণ্ডলই হবেন। সে দরোজা খুলে বাতি হাতে বাইরে বেরিয়ে এল। -কে?
-আব্দুল মমিন? আমি রে বাপ।
তার কণ্ঠে যেন কিছু বিহ্বলতা প্রকাশ পেল।
-জি, চাচাজি। কিছু বলবেন?
বারান্দায় উঠে এলেন আজিম মণ্ডল। একেবারে মমিনের মুখোমুখি।
-পইড়্ছেলে?
-জি।
আসলে ছেলেটাকে থাকতে দিয়েছেন, বেশ কিছুদিন হয়ে গেল তার ভাল রকম খোঁজ নেওয়া হয়নি। এ বাড়ির লোক তো তার সব চেনা। এদের আদব-চরিত্র সব তার জানা। এরা কী করতে পারে তা তার অজ্ঞাত নয়।
-কুনু অসুবিধা হোছে না তো বাপ?
-জি না। আমি ভাল আছি, আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বিনয়ে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম মমিনের।
-তুমি ভর্তি হয়ছো?
এই তো দিন কয়েক আগে ভর্তি হয়েছে সে। তার জানানোর ইচ্ছা ছিল আজিম মণ্ডলকে, কিন্তু দেখা পায়নি বলে হয়নি। আজ কৈফিয়তের সুরে সে বলল, মনে করেছিলাম আপনার দোয়া নিব…কিন্তু…
-আচ্ছা, ঠিক আছে। আমার দুয়া তো আছেই। তুমার বাপ আমার খুব পিয়ারের মানুষ ছিল। অল্পদিনের পরিচয়, কিন্তু তাতেই আমরা খুব ঘনিষ্ঠ হয়ছুনু। তে চলো ব্যাটা, এশার নমাজ পইড়ি লিই। ওয়াক্ত মুনে হয় হয় গেছে।
তারা দু’জনে মিলে মসজিদ খোলেন।
-মসজিদের বাতিডা যে কুণ্ঠে আছে!
মমিন এতদিনে জেনে ফেলেছে আজিম মণ্ডল এই মসজিদে কমই আসেন। সে তুলনায় এই কয়দিনেই সে সবকিছু চিনে ফেলেছে। সে বলল, চাচাজি, আপনি বসুন। আমি দেখছি সব।
-বাহ! তুমি তো সব বুইঝি লিইছো দেখছি। খুব ভাল, খুব ভাল।
সে তার বাতিটা আনতে চেয়েছিল। মণ্ডল নিষেধ করেছেন। তার কাছে তো টর্চ আছে, বাতির দরকার নেই। মণ্ডলের টর্চ নিয়ে মসজিদের বাতিটা খুঁজে বের করে মমিন। জ্বালায় সেটা।
-তুমারে পাড়ার মসজিদডা ওই রকমই আছে, না লষ্ট হয় গেলছে?
-এখন আরো ভাল হয়েছে চাচা।
-তাই নাকি? বাহ!
খুব অভিভূত হয় মমিন। পিতার অবর্তমানে তার ওপর এরকম দরদ আর মুরুব্বিয়ানা খুব একটা দেখায়নি কেউ।
টিউবয়েল থেকে দু’জনের জন্য পানি তুলে আনে মমিন। দু’জনে অজু করে। তারপর সে আজান দেয়। প্রাণ ভরে কণ্ঠে যতটা পারে দরদ ঢেলে উচ্চারণ করে আজানের প্রতিটি শব্দ। ঝিঁঝিঁ পোকার সমস্বর সঙ্গীতমুর্চ্ছনা ছাপিয়ে তার কণ্ঠ সঙ্গীতের মতো ভিজে বাতাস আর ঘন অন্ধকারে ভেসে ভেসে দূরে চলে যায় কোথাও। আর মসজিদের বারান্দায় বসে এই তরুণ নবাগত ছেলেটির সুমধুর আজান আজিম মন্ডলের অন্তর গলিয়ে দেয়। কী এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরে ওঠে তার মন। তার মনে হয় এই ছেলেটা তার সংসারে ফেরেস্তার মতো আবির্ভূত হয়েছে। [চলবে]