বাংলা ভাষায় কার্যকরভাবে বাংলার, এবং ভারতবর্ষেরও, ইতিহাসের চর্চা বঙ্কিমচন্দ্রই আরম্ভ করেছিলেন। পরে এ-বিষয়ে অগ্রগতি হয়ে থাকলেও ইতিহাস বিচারে অনেকে সুষ্ঠু চিন্তার পরিচয় দিতে পারেননি। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময়ে (১৯০৫-১১) হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ রাজনৈতিক রূপ লাভ করলে ক্রমে সাহিত্যক্ষেত্রেও সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্র্যবোধ প্রবল হয়ে ওঠে। ১৯৩৮ সালে বঙ্কিম-জন্মশতবর্ষ উদযাপনকালে কলকাতার গড়ের মাঠে মওলানা আকরম খাঁর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ‘আনন্দমঠের বহ্নিউৎসব’ স্মরণ করলে এবং ১৯৯০-এর দশকে প্রকাশিত আহমদ ছফার ‘শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ পড়লে ও এই ধারার অন্যদের বক্তব্য অনুধাবন করলে বোঝা যায় ‘মুসলিম-সাম্প্রদায়িকতাবাদী’ চিন্তায় বঙ্কিম-বিদ্বেষ কত প্রবল। বহ্নিউৎসবে বাজার থেকে সব ‘আনন্দমঠ’ কিনে এনে, কাঠের চলা দিয়ে সাজানো চিতার উপর রেখে, কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে উল্লাস করা হয়েছিল। সেদিন বাঙালি মুসলমান সমাজ থেকে কেউ কেউ এই কার্যধারাকে ভুল ও অনুচিত বলে প্রতিবাদ লিখেছিলেন।
আমার ধারণা, পক্ষপাতমুক্ত স্বাধীন মূল্যবোধ ও যুক্তি অবলম্বন করে যাঁরা ইতিহাস বিচার করেন এবং বঙ্কিমের উপযোগিতা বুঝতে চান, তাঁদের মনে এই বঙ্কিম-বিদ্বেষ দানা বাঁধে না। বঙ্কিম যাঁদের বিরুদ্ধে লেখনি চালনা করেছিলেন তাঁরা যবন; যবন আর মুসলমান সম্পূর্ণ এক নয়; মুসলমানদের কিংবা ইসলামের বিরুদ্ধে বঙ্কিম লেখনি চালনা করেননি। কোনো কোনো জায়গায় যদি তিনি যবনের জায়গায় মুসলমান লিখেও থাকেন তবু বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না যে, তা দ্বারা তিনি যবনই বুঝিয়েছেন। অবশ্য বাংলায় ও ভারতে যবনরা মুসলমানও। বঙ্কিম বাংলার ও ভারতের যবনদের বিরুদ্ধে লেখনি চালনা করেছিলেন তারা ‘পররাজ্যগ্রাসকারী’ বলে, মুসলমান বলে নয়।
বঙ্কিমের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও সীমাবদ্ধতা অত্যন্ত স্পষ্ট – বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। ন্যায় ও কল্যাণের পক্ষে বঙ্কিমের প্রেরণাদায়ক গুণের দিকটা অনেক বড়। তাঁর হিন্দুত্ববাদে মানববাদের (humanism) ও সর্বজনীন পার্থিব কল্যাণের কথাই আছে। ঈশ্বরের কথা তিনি বলেছেন বটে তবে তাঁর ঈশ্বরের স্বরূপ রামমোহনের ব্রহ্ম কিংবা কোরআনের আল্লাহর মতো। পূজা-অর্চনা, স্বর্গ-নরক, জন্মান্তরের জন্য পুণ্য অর্জন – ইত্যাদির প্রতি তাঁর আগ্রহ কিংবা আস্থা ছিল না।
বাংলাদেশে উন্নত নতুন ভবিষ্যত সৃষ্টির প্রয়োজনে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে ব্রিটিশ-শাসিত বাংলার রেনেসাঁস ও বঙ্কিমচন্দ্রের পুনর্পাঠ আজ একান্ত দরকার। বর্তমানে বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনেকের দৃষ্টি একান্ত মুগ্ধ ও বদ্ধ। এই মুগ্ধতা ও বদ্ধতার সঙ্গে কোনো কোনো জায়গায় ভণ্ডামিও হয়তো থাকে। নতুন সৃষ্টি ও প্রগতির জন্য দরকার স্বাধীন চিন্তাশীলতা এবং অনাচ্ছন্ন বিশ্লেষণমূলক বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। তার জন্য সাহসেরও দরকার হয়। পূর্বসিদ্ধান্তমুক্ত বিশ্লেষণমূলক বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের জ্ঞান, সাংখ্যদর্শন, বাঙালির বাহুবল, ভারত-কলঙ্ক, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং পরাধীনতা, প্রাচীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং পরাধীনতা, প্রাচীন ভারতবর্ষের রাজনীতি, প্রাচীনা এবং নবীনা, বঙ্গদেশের কৃষক, বাঙ্গালা শাসনের কল, বাঙ্গালার ইতিহাস, বাঙ্গালার কলঙ্ক, বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা, বাঙ্গালার ইতিহাসের ভগ্নাংশ, বাঙালির উৎপত্তি, ধর্মতত্ত্ব, দেবতত্ত্ব ও হিন্দুধর্ম, বঙ্গদর্শনের পত্রসূচনা, বঙ্গদর্শনের বিদায়গ্রহণ প্রভৃতি প্রবন্ধ ও সন্দর্ভের পুনর্পাঠ আজ আমাদের জন্য একান্ত দরকারি। বঙ্কিমবিচারে হিন্দু মহাসভাপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মুসলিম লীগপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি হিন্দু ও মুসলমান কোনো সম্প্রদায়ের জন্যই কল্যাণকর নয়। সমালোচনায় ও মূল্যবিচারে মানববাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে আমরা কল্যাণকর মনে করি। বঙ্কিমের ভুলের সমাধান বঙ্কিম-বিরোধী পাল্টা ভুল দিয়ে করা উচিত নয়। ভারত ভাগে এবং বাংলা ভাগে কাজ করেছিল হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ, ব্রিটিশ সরকারের divide and rule policy, হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগের পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতি এবং শেষ পর্যায়ে কংগ্রেসের হিন্দু মহাসভা দ্বারা পরিচালিত হওয়া। এসব কিছু জানতে না চেয়ে আহমদ ছফা লিখেছেন : “বাংলাদেশ বিভাগ করার জন্য কোনো একজন ব্যক্তিকে যদি দায়ী করতে হয়, তিনি অবশ্যই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।” এমন কথা ভারত-ভাগ প্রসঙ্গে মোগল সম্রাট আরোঙ্গজেব সম্পর্কেও কিছু লোকে লিখে থাকেন। তাঁরা সম্রাট আকবরের রাষ্ট্রনীতি সমর্থন করেন। আরোঙ্গজেবের রাষ্ট্রনীতিকে তাঁরা ভুল মনে করেন। আহমদ ছফার আকবরের নীতির সমর্থক হওয়ার কথা নয়, আরোঙ্গজেবের নীতিরই সমর্থক হওয়ার কথা। এক দিকে আরোঙ্গজেব অন্যদিকে বঙ্কিম। মাঝখানে আকবর, দারাশিকু। বাবর, হুমায়ুন, জাহাঙ্গীর, শাহজাহানের রাষ্ট্রনীতি আকবরের নীতিরই কাছাকাছি, আরোঙ্গজেবের নীতি তাঁদের থেকে দূরে।
সম্রাট আকবর শাসন পরিচালনার জন্য ভারতকে পনেরটি সুবায় বিভক্ত করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারতে পনেরটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হতে পারত। প্রয়োজনে ষোলোটি কিংবা সতেরোটি জাতিরাষ্ট্র হতে পারত। তা হয়নি। সুবাগুলোর ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ছিল। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসনমুক্ত ভারতে পনেরো-ষোলোটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হলে উপমহাদেশে জাতি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হত। এতদিনে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবকে নানাভাবে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে
ইতিহাস কেবল অতীত-ঘটনাবলির বিবরণ নয়; ইতিহাস হল পরিবর্তনের গতিধারা ও রহস্য উদ্ঘাটনের বিদ্যা। কারণ-করণীয়-করণ ও ফলাফলের সূত্র ধরে পরিবর্তনের গতিধারাকে বুঝতে হয়। অতীতের পরিবর্তনের রহস্য জেনে, বর্তমান অবস্থা বুঝে, বাস্তবসম্মত উপায়ে মানুষ নিজেদের কল্যাণে ভবিষ্যত পরিবর্তনের গতি কিছুটা হলেও নির্ধারণ করতে পারে। এই উপলব্ধি বঙ্কিমের ছিল। বঙ্কিম আক্ষেপের সঙ্গে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন : “বাঙ্গালী আজকাল বড় হইতে চায়, – হায়! বাঙ্গালীর ঐতিহাসিক স্মৃতি কই?” তারপরেই তিনি লিখেছিলেন : “বাঙ্গালার ইতিহাস চাই। নহিলে বাঙ্গালী কখনো মানুষ হইবে না। যাহার মনে থাকে যে, এ বংশ হইতে কখনো মানুষের কাজ হয় নাই, তাহা হইতে কখনো মানুষের কাজ হয় না। তাহার মনে হয়, বংশে রক্তের দোষ আছে। তিক্ত নিম্ববৃক্ষের বীজে তিক্ত নিম্বই জন্মে – মাকালের বীজে মাকালই ফলে। যে বাঙ্গালীরা মনে জানে যে আমাদিগের পূর্বপুরুষ চিরকাল দুর্বল – অসার, আমাদিগের পূর্বপুরুষদিগের কখনো গৌরব ছিল না, তাহারা দুর্বল অসার গৌরবশূন্য ভিন্ন অন্য অবস্থা প্রাপ্তির ভরসা করে না – চেষ্টা করে না। চেষ্টা ভিন্ন সিদ্ধিও হয় না।” (বঙ্গদর্শন, অগ্রহায়ণ ১২৮৭)
বঙ্কিম বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন যে, বাংলার ইতিহাসে অগৌরবের দিক যেমন আছে, তেমনি গৌরবের দিকও আছে। ‘গণেশের রাজ্যধিকার; চৈতন্যের ধর্ম; রঘুনাথ, গদাধর, জগদীশের ন্যায়; জয়দেব, বিদ্যাপতি, মুকুন্দদেবের কাব্য’কে তিনি ‘বাঙ্গালার অবিনশ্বর কীর্তি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “বাঙ্গালার ইতিহাস নাই, যাহা আছে তাহা ইতিহাস নয়, তাহা কতক উপন্যাস, কতক বাঙ্গালার বিদেশী বিধর্মী অসার পরপীড়কদিগের জীবনচরিত মাত্র। বাঙ্গালার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গালার ভরসা নাই। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙ্গালী, তাহাকেই লিখিতে হইবে।….. এই আমাদিগের সর্বসাধারণের মা জন্মভূমি বাঙ্গালাদেশ, ইহার গল্প করিতে কি আমাদিগের আনন্দ নাই?” কোনো কোনো লেখায় যবনদের বঙ্কিম ‘পররাজ্যগ্রাসকারী পরপীড়ক’ বলেছেন।
ব্রিটিশ-শাসিত বাংলায় অবস্থান করে তুর্কি-মোগল শাসিত বাংলার কথা ভেবেও বঙ্কিম হয়ে ওঠেন প্রবলভাবে স্বাধীনতাকামী। তিনি দেখতে পান ইংরেজ শাসনের আগে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বাংলা শাসিত হয়েছে বিদেশি, বিভাষী, বিধর্মী, তুর্কি, পাঠান, মোগলদের দ্বারা। এই শাসকেরা হয়তো প্রথম থেকেই যবন বলে অভিহিত হয়ে আসছেন। যবন গ্রীক শব্দ, অর্থ বিদেশি। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণকালে এই শব্দ ভারতীয় কোনো কোনো ভাষায় প্রবেশ করে। পরে এর অর্থ সম্প্রসারিত হয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যবন শব্দটি আছে। আধুনিক যুগে রঙ্গলাল, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র প্রমুখের লেখায় আছে। জাতীয়তাবোধ ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যতম চালিকাশক্তি। জাতীয় ঐক্যের কথা ভাবতে গিয়ে সেদিন তিনি ‘ধর্মবল’কে ঐক্যের অবলম্বন মনে করেছিলেন। তিনি হিন্দুত্বের মধ্যে জেরেমি বেন্থাম, স্টুয়ার্ট মিল, অগাস্ট কোঁৎ, ডারউইন, স্পেন্সার, মেথ্যু আর্নল্ডের চিন্তাধারাকে সমন্বিত করতে প্রয়াসপর হয়েছিলেন। হিন্দুসমাজের ভেতর থেকে প্রবল প্রতিকূলতা সামনে নিয়ে তিনি লিখেছেন, “হিন্দুধর্ম মানি, কিন্তু হিন্দুধর্মের বোকামিগুলি মানি না।” প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দুরা শেষ পর্যন্তই তাঁকে হিন্দুত্ববিরোধী মনে করেছে। তাঁর মৃত্যুকালে প্রতিক্রিয়াশীলদের ভূমিকা লক্ষ করলে এটা বোঝা যায়। জাতীয় ঐক্যের কথা ভাবতে গিয়ে হিন্দুত্ববাদী বঙ্কিম লিখেছেন, “এখন তো দেখিতে পাই, বাঙ্গালার অর্ধেক লোক মুসলমান।” তাঁর সিদ্ধান্ত : বাংলায় বহিরাগত মুসলমানের সংখ্যা নগণ্য। সপ্তদশ শতাব্দীর সন্দ্বীপের কবি আবদুল হাকিম যাঁদের সম্পর্কে লিখেছিলেন, “যেসবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, / সেসবে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।” বঙ্কিম তাঁদেরকেই বহিরাগত মুসলমান বলেছেন – যবন বলেছেন। তাঁরা বাংলার মধ্যযুগের শাসক শ্রেণির অন্তর্গত বাংলার মুসলমান সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁরা ‘আশরাফ’ বলে আত্মপরিচয় দিয়েছেন। বঙ্কিমের মতে, “দেশীয় লোকেরা যে স্বধর্ম ত্যাগ করিয়া মুসলমান হইয়াছে, ইহাই সিদ্ধ। দেশীয় লোকের অর্ধেক অংশ কবে মুসলমান হইল? কেন স্বধর্ম ত্যাগ করিল? কেন মুসলমান হইল? কোন জাতীয়েরা মুসলমান হইয়াছে? বাঙ্গালার ইতিহাসে ইহার অপেক্ষা গুরুতর তত্ত্ব আর নাই।” বাংলা হিন্দু-মুসলমানের দেশ, কেবল হিন্দুর দেশ নয় – একথা স্বীকার করে নিয়েও বঙ্কিম হিন্দু-জাতীয়তাবাদী ছিলেন। তিনি আদর্শ হিন্দুজীবন, আদর্শ হিন্দুজাতি, আদর্শ হিন্দুরাষ্ট্র কল্পনা করেছেন। মুসলমানদের তিনি হিন্দুজাতির (nation), হিন্দু রাষ্ট্রের (state) অন্তর্ভুক্ত করে দেখেছেন। এতেই তিনি অনেক মুসলমানের বিরাগভাজন হয়েছেন। বিচার করতে গেলে দেখা যাবে, হিন্দুত্বের কথা বললেও তাঁর চিন্তা যতটা ধর্মীয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মানবতান্ত্রিক – পার্থিবতাবাদী। বঙ্কিমের ধর্মচিন্তা ও ঈশ্বরের স্বরূপ সন্ধান করলে অনেক রহস্য উন্মোচিত হবে এবং তা সকলের জন্যই কল্যাণকর হবে। ঈশ্বর কী? ঈশ্বর কেন? – বঙ্কিম ঈশ্বরের প্রয়োজন কেন অনুভব করেছিলেন?
আজ নতুন রেনেসাঁসের লক্ষ্য হবে আধুনিক যুগের অন্যায়-অবিচার, ভাওতা-প্রতারণা, মিথ্যা ইত্যাদি থেকে মুক্ত হওয়া ও নবসৃষ্টির কাজে নিবেদিত হওয়া। রেনেসাঁসে সব সময় আবিষ্কার-উদ্ভাবন থাকে। অতীতকে বর্জন করে কিংবা অস্বীকার করে কিংবা বিকৃত করে ‘গতি’ সম্ভব হলেও ‘প্রগতি’ সম্ভব হয় না। ক্লাসিকদের প্রতি আকর্ষণ ও শ্রদ্ধাবোধ দরকার। নতুন রেনেসাঁস সৃষ্টির জন্য নতুন ক্লাসিক সৃষ্টির স্পিটির দরকার
বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের (১৯০৫-১১) সময় থেকে রাজনৈতিকভাবে হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতাবাদ ও মুসলিম-সাম্প্রদায়িকতাবাদ প্রতিদ্বন্দ্বী রূপ নিয়ে সামনে আসতে থাকে। তখন সাম্প্রদায়িকতাবাদী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তার মানবতান্ত্রিক পার্থিবতাবাদী দিকটি বহুলাংশে চাপা পড়ে। আহমদ ছফার বইয়ের ‘শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ – এই কথাটি স্বাধীন বাংলাদেশে এক ধারার লোকদের কাছে খুব প্রিয় হয়েছে। তাঁরা যে বঙ্কিমচন্দ্রের কিংবা আহমদ ছফার চিন্তাকে ঠিকমতো বুঝতে পেরেছেন, বুঝতে চেয়েছেন – তা মনে হয় না। তাঁদের মধ্যে ভারতবিদ্বেষ – হিন্দুবিদ্বেষও – প্রবল। তাঁদের মানসিকতা অনেকটা ব্রিটিশ আমলের মুসলিম লীগের নেতা ও কর্মীদের মানসিকতার মতো। বখতিয়ার খিলজিকে এবং আরোঙ্গজেবকে তাঁরা অনুপ্রেরণার উৎস রূপে দেখেন। বঙ্কিম-প্রশ্নে আহমদ ছফা তাঁদের সগোত্র।
মধ্যযুগে এবং ইংরেজ আমলেও উচ্চশ্রেণির হিন্দুদের মনে যবনদের প্রতি ক্ষোভ ছিল। যবনে ব্রাক্ষণে বিরোধ ছিল। বঙ্কিমেরও ক্ষোভ ছিল যাবনি শাসনের প্রতি। আরোঙ্গজেব ও বখতিয়ার খিলজির তরবারির শক্তিকে বঙ্কিম তাঁর কলমের শক্তি নিয়ে মোকাবিলা করতে চেয়েছেন। রঙ্গলাল, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্রের মধ্যেও এই মনোভাব ছিল। তবে লেখক হিসেবে তাঁদের শক্তি ও প্রভাব কম ছিল। বহিরাগত তুর্কি-মোগল শাসনের প্রতি এঁদের সকলেরই অসহিষ্ণুতা ছিল। যবন বলতে তাঁরা বুঝতেন পররাজ্যগ্রাসকারী, বিদেশী, বিভাষী, বিধর্মী, বিজাতি। আহমদ ছফার লেখায় এ কালের সাম্রাজ্যবাদী কর্মকাণ্ডের প্রতি বিরূপ মনোভাব নেই। সে কালের যবনদের সঙ্গে মুসলমান হিসেবে তিনি একাত্মতা অনুভব করেন। এর ফলেই তিনি বঙ্কিমের প্রতি বিদ্বিষ্ট।
বঙ্কিমচন্দ্র সারাজীবন এক রকম চিন্তা করেননি। ‘ভারততীর্থ’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ভারতের সকল জাতি-উপজাতির, সকল ধর্মাবলম্বীদের, আদিবাসী ও বহিরাগত সকল জনগোষ্ঠীর ভারতীয় হয়ে একদেহে লীন হওয়ার প্রবল আশা ব্যক্ত করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের মনেও সে রকম আশাই ছিল বলে অনুমান করি। বঙ্কিমচন্দ্রের আদর্শ হিন্দুজীবন, আদর্শ হিন্দুজাতি ও আদর্শ হিন্দুরাষ্ট্রের রূপ ও স্বরূপ সন্ধান করলে এটা বোঝা যাবে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য কিংবা বহুত্বমূলক সমন্বয় বঙ্কিম কামনা করতেন। বঙ্কিমের লেখায় আছে – “বাঙ্গালা হিন্দু-মুসলমানের দেশ, একা হিন্দুর দেশ নহে। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান এইক্ষণে পৃথক – পরস্পরের সহিত সহৃদয়তাশূন্য। বাঙ্গালার প্রকৃত উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় যে, হিন্দু-মুসলমানে ঐক্য জন্মে। যতদিন উচ্চশ্রেণির মুসলমানদিগের মধ্যে এমন গর্ব থাকিবে যে তাঁহারা ভিন্নদেশীয়, বাঙ্গালা তাঁদের ভাষা নহে, তাঁহারা বাঙ্গালা শিখিবেন না বা বাঙ্গালা লিখিবেন না, কেবল উর্দু-ফারসির চালনা করিবেন, ততদিন সে ঐক্য জন্মিবে না। কেননা জাতীয় ঐক্যের মূল ভাষার একতা।” বদরুদ্দীন উমরের ‘বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ লেখাটির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। বাংলার আশরাফ মুসলমানদের বাঙালি মন অর্জনের ইতিহাসও অনুসন্ধানের দাবি রাখে। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনকালের অবস্থা আর বঙ্কিমের কালের অবস্থা এক রকম নয়। বাংলাদেশে আজও মুসলিম বাংলা প্রতিষ্ঠার চিন্তা কারা করেন?
বঙ্কিমের লেখায় আছে – “মনুষ্যজাতির প্রতি যদি আমার প্রীতি থাকে, তবে আমি অন্য সুখ চাই না।” বঙ্কিম লিখেছেন, “যে কণ্ঠ হইতে কাতরের জন্য কাতরোক্তি নিঃসৃত না হইল, সে কণ্ঠ রুদ্ধ হউক। যে লেখনি আর্তের উপকারার্থে না লিখিল, সে লেখনি নিষ্ফলা হউক।” বঙ্কিমের উক্তি – “তুমি যে উচ্চ কুলে জন্মিয়াছ, সে তোমার কোনো গুণ নহে, অন্যে যে নীচ কুলে জন্মিয়াছে, সে তাহার দোষ নহে। অতএব পৃথিবীর সুখে তোমার যে অধিকার, নীচকুলোৎপন্নেরও সেই অধিকার। তাহার সুখের বিঘ্নকারী হইও না; মনে থাকে যেন যে সেও তোমার ভাই – তোমার সমকক্ষ।” সকল ধর্মের উপর স্বদেশপ্রীতি।”- নানা বিষয়ে এমনি অনেক অসামান্য উক্তি বঙ্কিমের লেখা থেকে উদ্ধৃত করা যায় যেগুলো মুসলমান বাঙালির মুখেও আছে। আহমদ ছফা কী করে এই বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘শতবর্ষের ফেরারি’ বলে তিরস্কার করতে পারলেন? বঙ্কিমচন্দ্র যদি কোনো ভুল করে থাকেন, তাহলে আহমদ ছফা ও তাঁর সগোত্ররা যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তাতে তো আরো অনেক বড় ভুল হয়েছে। বঙ্কিম পড়লে মুসলমানদের কী ক্ষতি হবে? বইয়ের নামটি দিয়েই তো ছফা মুসলমানদের মনে বঙ্কিমের প্রতি বিরূপতা সৃষ্টির আয়োজন করলেন। হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের হিন্দু জাতীয়তাবাদ (আসলে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতবাদ), মুসলিম লীগের মুসলিম জাতীয়তাবাদ (আসলে মুসলিম-সাম্প্রদায়িকতাবাদ) এবং ব্রিটিশ সরকারের Divide and Rule Policy-র আবর্তে পড়ার ফলে ভারত উপমহাদেশের প্রদেশগুলোতে সুষ্ঠু জাতীয়তাবোধ বিকশিত হয়নি, জাতি-সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানও হয়নি। সম্রাট আকবর শাসন পরিচালনার জন্য ভারতকে পনেরটি সুবায় বিভক্ত করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারতে পনেরটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হতে পারত। প্রয়োজনে ষোলোটি কিংবা সতেরোটি জাতিরাষ্ট্র হতে পারত। তা হয়নি। সুবাগুলোর ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ছিল। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসনমুক্ত ভারতে পনেরো-ষোলোটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হলে উপমহাদেশে জাতি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হত। এতদিনে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবকে নানাভাবে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।
বাংলাদেশে জাতীয়তাবোধ, জাতীয় চেতনা, জাতীয়তাবাদ সুষ্ঠু রূপ নেয়নি। একদিকে দেখা যাচ্ছে, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমূহকে নিয়ে উদ্বেগ, অপরদিকে দেখা যাচ্ছে ‘মুসলিম বাংলা’র চিন্তা। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ কিংবা ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ যাঁরা বলেন, একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে কোনো রকম জাতীয়তাবাদ, জাতীয় চেতনা, জাতীয়তাবোধেই নেই। বাংলাদেশের জনগণের উপর আস্থা হারিয়ে ১৯৮০-র দশক থেকে তাঁরা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে এবং ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কে ছোটাছুটি করেন। আহমদ ছফার জাতীয়তাবোধ, জাতীয় চেতনা, জাতীয়তাবাদের স্বরূপ কী? তিনি কি ‘বাংলাদেশি মুসলিম জাতীয়তাবাদী’? বাংলাদেশে যাঁরা বঙ্কিম বর্জন চান তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা কি ঠিক? মুসলমানদের কি বঙ্কিম পড়া উচিত নয়? আহমদ ছফার ‘শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ বইয়ের যে প্রভাব বাংলাদেশে দেখতে পাই তা হল, তরুণ সমাজের একাংশে বঙ্কিমের লেখার প্রতি বিরূপতা। আহমদ ছফার অন্ধভক্ত যাঁরা, তাঁরা তরুণদের মধ্যে এই রকম মনোভাবই সৃষ্টি করতে তৎপর। আমার মনে হয়, যাঁরা ‘মুসলিম বাংলা’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন, বঙ্কিম পড়লে তাঁরাও উপকৃত হবেন। হিন্দু বাংলা ও মুসলিম বাংলার ধারণাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা দরকার। দুনিয়ায় নানা ধর্ম আছে, নানা মতাদর্শ আছে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সহিষ্ণু মনোভাব ও সম্প্রীতি দরকার। খারাপটা পরিহার করতে হবে, ভালোটা অবলম্বন করতে হবে।
যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরেই ১৯৭২ সালে আহমদ ছফা লিখেছিলেন, ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’। তাতে উনিশ শতকের বাংলার জাগরণের প্রতি – কলকাতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রতি ছফার বিরূপতার প্রকাশ আছে। ঢাকাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের প্রতিও তিনি তীব্র বিরূপতার প্রকাশ করেছেন। এই পাইকারি বিরূপতা কি কোনো কল্যাণ আছে? হিন্দু-মুসলমান বিরোধের অপঘাত সত্ত্বেও ব্রিটিশ-শাসিত বাংলার জাগরণ থেকে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলেরই প্রেরণা পাওয়ার মতো, শেখার মতো অনেক কিছু আছে। আহমদ ছফা চেয়েছেন স্বতন্ত্র মুসলিম রেনেসাঁস। মুসলমান পিছিয়ে ছিল কেন? মুসলমানকে উন্নতি করতে হলে নানা কাজের সঙ্গে নিজের অতীতকে জানতে হবে। সে অতীতের আরম্ভ দ্বিজাতিতত্ত্ব থেকে নয়, বখতিয়ার খিলজি থেকেও নয়, বাংলাভাষার দেশে জনপ্রবাহের আদি থেকে। বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস কেবল আশরাফ মুসলমানদের ইতিহাস নয়। এই ব্যাপারটির স্বীকৃতি মুসলিম-বাংলাকামীদের মধ্যে নেই। বখতিয়ার খিলজির সতেরো ঘোড়া আর মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব তাঁদের খুব প্রিয়। বাংলাদেশে বিরাজিত বাস্তবতায় তাঁদের মনের কথা হয়তো তাঁরা স্পষ্ট করে বলতে পারেন না।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা সমীচীন মনে করি যে, ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ উপন্যাস পরিষদের উদ্যোগে ‘বঙ্কিমচন্দ্র : সার্ধশত জন্মবর্ষে’ নামে আমরা একটি অনুষ্ঠান করেছিলাম। তখন ওই অনুষ্ঠানের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের অন্যান্য বিষয়ের চর্চার পাশাপাশি বঙ্কিমচর্চার কথা আমরা বলেছিলাম। তার বিরোধিতা করে তখনকার রাষ্ট্রপ্রতি এইচ এম এরশাদসহ মুসলিম বাংলা ধারার বহু ব্যক্তি নানা পত্রিকা অবলম্বন করে দীর্ঘদিন ধরে সীমাহীন তৎপরতা প্রদর্শন করতে থাকেন। উত্তেজনার মধ্যে আমাদের মতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কিছু পত্রিকা উপন্যাস পরিষদের অনুষ্ঠানের যৌক্তিকতা প্রদর্শন করে কিছু লেখা প্রকাশ করে। যাঁরা আমাদের বিরোধিতা করেছিলেন তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ আওয়ামী লীগ বিরোধী ও বামপন্থী ধারার বিরোধী লোকজন। বঙ্কিমচন্দ্র বিষয়ক চিন্তায় আহমদ ছফা ওই ধারার লেখকদের সগোত্র। ওই ধারার কিছু লোক উপন্যাস পরিষদের অনুষ্ঠানে এসে আমাদের প্রশ্ন করে বিব্রত করতে চেয়েছিলেন, পারেননি। এসবের কিছু বিবরণ ‘বঙ্কিমচন্দ্র : সার্ধশত জন্মবর্ষে’ বইটিতে আছে।
ঘটনাক্রমে লেখক ও গবেষক ড. ইসরাইল খান আমার অজান্তে উপন্যাস পরিষদের উক্ত অনুষ্ঠানের সব বক্তার সব বক্তব্য টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করে রেখেছিলেন। সেই রেকর্ডকৃত বক্তৃতাগুলো নিয়ে এবং আরো কিছু লেখা নিয়ে তখন উপন্যাস পরিষদ থেকে আমরা ‘বঙ্কিমচন্দ্র : সার্ধশত জন্মবর্ষে’ গ্রন্থটি প্রকাশ করি। আহমদ ছফার ‘শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ গ্রন্থটি আমাদের ‘বঙ্কিমচন্দ্র : সার্ধশত জন্মবর্ষে’ গ্রন্থের প্রতিক্রিয়ায় লেখা। তখন ছফার সঙ্গে এ-নিয়ে আমার আলাপ হয়। আমি তাঁর মত বুঝতে চেয়েছি, কিন্তু একমত হতে পারিনি। এখন সে বিষয়ে যেতে চাই না। বঙ্কিমচন্দ্র : সার্ধশত জন্মবর্ষে, দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে জাগৃতি প্রকাশনী থেকে। সেটি পড়লে পাঠক আমাদের অবস্থান, দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তার এবং আমাদের বিরুদ্ধ পক্ষের অবস্থান, দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তার পরিচয় পাবেন। জাতীয় কর্তব্য জ্ঞানে এক সঙ্গে দুটি বই-ই পাঠক পড়তে পারেন। জাতীয় জীবনে নানা বিভ্রান্তিকর চিন্তা, মিথ্যা ও ভুলের মধ্যে আমরা পড়ে আছি। এই অবস্থা থেকে আমাদের উদ্ধার পাওয়া দরকার।
Hero Worship, বীরপূজা, Personality cult, ব্যক্তিপূজা ইত্যাদি নানা জাতির মধ্যে নানাভাবে চালু আছে। উনিশ শতকের বিখ্যাত ইংরেজ চিন্তাবিদ কার্লাইল ১৮৪০-এর দশকে Heroes and Hero Worship নামে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী গ্রন্থ লিখেছিলেন। ইউরোপীয় সভ্যতায় সেই বই কিছু প্রভাব ফেলেছিল। বইটিতে Hero ও Charisma (সম্মোহনশক্তি), ধর্মীয় বীর, জননেতা বীর, দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক-চিন্তক বীর, কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী বীর, জাতীয় জীবনে এ-সবের ভূমিকা তিনি আলোচনা করেছেন। বীরদের সাচ্চাভক্ত, অন্ধভক্ত, ভণ্ডভক্ত ইত্যাদির ভূমিকা তিনি তাঁর উপলব্ধি অনুযায়ী বলেছেন। কার্লাইল বীরপূজাকে ক্ষতিকর মনে করে জনমন থেকে বীরপূজার প্রবণতা দূর করার চেষ্টা করেছেন। মূর্তিপূজা ও ভাবমূর্তির পূজা কোনোটাই বিজ্ঞান সম্মত নয়। বাংলাদেশে এখন বীরপূজা, বীরের অন্ধভক্ত, বীরের ভণ্ডভক্ত ইত্যাদির প্রাচুর্য আছে। সাচ্চাভক্ত অবশ্যই খুব কম। প্রগতির প্রয়োজনে এ বিষয়ে মূল্যবোধ ও বিচার-বিবেচনা দরকার।
আহমদ ছফাও কিছু লোকের কাছে বীর। তাঁরও অন্ধভক্ত এবং হয়তো ভণ্ডভক্তও রয়েছেন। তাঁরা অত্যন্ত কর্মতৎপর। সাচ্চাভক্তও কি আছেন তাঁর? এ প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য, আহমদ ছফার জীবন ও কর্মেরও বিচার-বিশ্লেষণ দরকার। জাতীয় পর্যায়ে ভক্তি অন্ধ কিংবা ভণ্ড প্রকৃতির হলে তা ক্ষতির কারণ হয়। সাচ্চাভক্তি কি সহজে দেখা দেয়? জাতীয় জীবনে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি সমর্থন ও সক্রিয়তা এবং অসত্য ও অন্যায়ের প্রতি অসহযোগ ও ঘৃণা একান্ত দরকার। তা না থাকলে জাতির জীবন অসার হয়ে পড়ে। আহমদ ছফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিলেন, বন্ধুও ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে আমি যতটা জানি, ততটা হয়তো খুব কম লোকেই জানেন। সেসব বিষয়ে যেতে চাই না। ছফার লেখাগুলো বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পড়লে অন্তত কিছু রহস্য বোঝা যায়। তাঁর শক্তির সঙ্গে দুর্বলতার পরিচয়ও তাঁর লেখায় আছে।
আহমদ ছফার লেখায় নানা গুণাগুণ আছে, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ভুলভ্রান্তিও আছে। তিনি আত্মপ্রচারে অত্যন্ত তৎপর ও পারদর্শী ছিলেন। তাঁর লেখক-ব্যক্তিত্বকে বুঝতে হলে নিরাসক্ত মন নিয়ে, বিশ্লেষণমূলক ও বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাঁর রচনাবলি পাঠ করা দরকার। আমার ধারণা, তাঁর মানসপ্রবণতায় ও মতামতে মৌলিক ত্রুটি আছে। তিনি কবি, ছোটগল্পলেখক, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, সর্বোপরি তিনি একজন চিন্তক। অনায়াসে লিখতেন তিনি। স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। কর্মীও ছিলেন তিনি। তাঁর লেখার – চিন্তার ও কাজের মূল্যবিচার কেবল অন্ধভক্ত ও ভণ্ডভক্তদের দ্বারা সম্পন্ন হতে পারে না। সাচ্চাভক্ত দরকার।
আমরা চাই, বাংলাদেশে নতুন রেনেসাঁস। তার জন্য দরকার অতীতের রেনেসাঁসের তাৎপর্য গভীরভাবে উপলব্ধি করে আজকের বাস্তবতায় নতুন রেনেসাঁসের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া। আন্তরিকতা লাগবে। আগেকার রেনেসাঁস ছিল মধ্যযুগের গর্ভ থেকে আধুনিক যুগকে মুক্ত করার এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে নবসৃষ্টির অভিযাত্রা। বিরোধের মোকাবিলা করে রেনেসাঁস বিকশিত হয়েছিল। আজ নতুন রেনেসাঁসের লক্ষ্য হবে আধুনিক যুগের অন্যায়-অবিচার, ভাওতা-প্রতারণা, মিথ্যা ইত্যাদি থেকে মুক্ত হওয়া ও নবসৃষ্টির কাজে নিবেদিত হওয়া। রেনেসাঁসে সব সময় আবিষ্কার-উদ্ভাবন থাকে। অতীতকে বর্জন করে কিংবা অস্বীকার করে কিংবা বিকৃত করে ‘গতি’ সম্ভব হলেও ‘প্রগতি’ সম্ভব হয় না। ক্লাসিকদের প্রতি আকর্ষণ ও শ্রদ্ধাবোধ দরকার। নতুন রেনেসাঁস সৃষ্টির জন্য নতুন ক্লাসিক সৃষ্টির স্পিটির দরকার।
আহমদ ছফাও রেনেসাঁস চেয়েছেন। তিনি চেয়েছেন মুসলিম রেনেসাঁস। তাঁর চিন্তা ১৯৪০-এর দশকের ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’র চিন্তার ধারাবাহিকতায় বিকশিত। বাঙালি মুসলমানদের পশ্চাৎবর্তিতায় তিনি ব্যথিত। ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইতে তিনি বাঙালি মুসলমানদের মনের যে পরিচয় দিয়েছেন তাতে মুসলমানদের পশ্চাৎবর্তিতার জন্য তাঁর তীব্র মনোবেদনার প্রকাশ আছে। তবে এই বিবরণ মনগড়া – বাস্তবের সঙ্গে এর মিল অল্প আছে। এভাবে মনের ক্ষোভ প্রকাশ করে আঘাত দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের উন্নতিতে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব নয়। এতে বরং তাদের হীনতাবোধ বাড়ছে, মুসলমানি চেতনা শক্তিশালী হচ্ছে না, বিকারপ্রাপ্ত মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশে মুসলমানরা রেনেসাঁসের-ধারায় নেই – রেনেসাঁসের ধারায় উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টাও তাদের নেই। ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’র মুসলমানি রেনেসাঁ সৃষ্টির চেষ্টা ব্রিটিশ আমলেই শেষ। ১৯৪৭-এর পর ঢাকায় এর কোনো বিকাশ কি ঘটেছে? তমদ্দুন মজলিশের পাকিস্তানবাদ তো স্ফুলিঙ্গের মতো ব্যাপার ছিল। ১৯৪৭ সালে আরম্ভ হয়ে ১৯৫২ সালে এসে তা স্তিমিত হয়ে যায়। মৌলবাদ-বিরোধী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে মুসলমানি চেতনার যে পুনরুজ্জীবন দেখা যাচ্ছে, তাতে রেনেসাঁসের কি কোনো অভিব্যক্তি আছে? ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইয়ের ‘উত্তর ভূমিকা’য় আবুল ফজল সম্পর্কে ছফা যেসব কথা লিখেছেন তাও মনগড়া। আবুল ফজল কখনো নাস্তিকতা প্রচার করেননি। রাজনীতিতে ইসলামের অপব্যবহার দেখে একটি লেখায় তিনি যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তাতে আইয়ুব সরকারের মুসলিম লীগের লোকেরা তাঁকে নাস্তিক বলেছে। আবুল ফজল কখনো নামাজ-রোজার বিরুদ্ধে কিছু প্রচার করেননি, – কাপড়ের গোলটুপি কখনো কখনো তাঁর মাথায় দেখা গেছে। তিনি ধর্মান্ধতার ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করার ঘোর বিরোধী ছিলেন। ছফা যা লিখেছেন তা প্রকৃত ঘটনার বিবরণ নয়, মনগড়া বিবরণ। ছফার লেখায় আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহের হোসেন, আবুল ফজল, আবদুল কাদির প্রমুখের চিন্তাধারা ও কাজকর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাবের প্রকাশ আছে। তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে ছফার সংশ্রব ছিল। পরে জাসদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হলেও, তমদ্দুন মজলিসের এবং আবুল হাশিমের প্রভাব তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। মোশতাকের পর বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হওয়ার পর আবুল ফজল সরকারের মন্ত্রী-পর্যায়ের উপদেষ্টা হয়ে অনুচিত কাজ করেছিলেন এবং তাতে তাঁর মর্যাদাহানি ঘটেছে। আমি নিজেও এজন্য লিখিতভাবে তাঁর নিন্দা করেছি। তবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা হারাইনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব নিজে উদ্যোগী হয়ে আবুল ফজলকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু মুজিব-শাসন নিয়ে আবুল ফজল সন্তুষ্ট ছিলেন না। উপাচার্য থাকা কালে শিক্ষা বিষয়ক কিছু ব্যাপার নিয়ে তিনি একাধিকবার সাংবাদিক সম্মেলন করে সরকারি নীতির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। সরকারে উদ্দেশে নানা রকম পরামর্শও তাঁর তখনকার লেখায় আছে। পরে সায়েম সরকারই তাঁকে উপদেষ্টা হিসেবে পাওয়ার চেষ্টা করে, এবং সেই চেষ্টায় সাড়া দিয়ে তিনি মন্ত্রীর পদমর্যাদায় সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা হন। আমাদের অবশ্যই ঘটনাবলি যেভাবে ঘটেছিল সেভাবে দেখার চেষ্টা করা উচিত। বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের উক্তি ছফা নিজের ভাষায় যেভাবে উল্লেখ করেছেন তা বহুলাংশে মনগড়া। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যাদর্শ বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যাদর্শ অবলম্বন করেই বিকশিত। ছফা তাঁর বইগুলোতে নানা প্রসঙ্গে নিজের মতলব অনুযায়ী অনেক কথা বানিয়ে লিখেছেন।
ছফা বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশংসা করেও অনেক কথা লিখেছেন। তবে মুসলমানদের মনে বঙ্কিম-সাহিত্যের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টির যে চেষ্টা করেছেন, তা সমর্থনযোগ্য নয়। ব্রিটিশশাসিত বাংলার রেনেসাঁস থেকে মুসলমানদের মনকে সরিয়ে এনে মুসলমানি রেনেসাঁস সৃষ্টির চিন্তাও যথেষ্ট কল্যাণকর নয়। ১৯২০-এর ও ৩০-এর দশকে ঢাকার ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বাঙালি মুসলমান সমাজে চিন্তাচর্চার এবং ভ্রান্ত বিশ্বাসের বন্ধন থেকে বাঙালি মুসলমানদের মনকে মুক্ত করার এবং রেনেসাঁসের ধারায় চলার যে চেষ্টা করেছিল, তাকে কলকাতা-অনুসারী মনে করে ছফা তার প্রতি বিরূপতা সৃষ্টির যে চেষ্টা করেছেন, তাও সমর্থনযোগ্য নয়। কোনো কোনো দিক দিয়ে মনে হতে পারে যে ছফা সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন ও সৈয়দ আলী আহসানের চিন্তাধারার অনুসারী। আমি যতটা দেখেছি তাতে বলতে পারি, প্রথমে ছফা তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে ও আবুল হাশিমের সঙ্গে এবং পরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে সক্রিয় ছিলেন। তবে চিন্তায় ও লেখায় ছফার স্বাতন্ত্র্যও ছিল। ছফার আবেগ-উচ্ছ্বাসপূর্ণ লেখা থেকে তাঁর স্বাতন্ত্র্যটাকে বুঝতে পারা সহজ কাজ নয়।
যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সময়ে প্রতিবাদের ফলাফলের কথাও ভাবা উচিত। ফলাফলের কথা না ভেবে বাংলাদেশে ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে যাঁরা মুসলমানদের মনে ক্রমাগত আঘাত করেছেন এবং গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে ব্যর্থ করে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রচার করেছেন, তাঁরা এখন ইসলামের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন। তাঁরা সুবিধাবাদী নন তো কী? তাঁদের কাজের ফলাফলের মধ্য দিয়ে আহমদ ছফার চিন্তা কার্যকর হচ্ছে। এতে দেশের কি কোনো কল্যাণ হচ্ছে? বাংলাদেশের নতুন রেনেসাঁস, সর্বজনীন গণতন্ত্র ও জনগণের রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার উপায় সম্পর্কে মত প্রকাশ করা এখন বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় কর্তব্য ।।