আধুনিক কবিতার কথা উঠলে অনেক কিছু মনে আসে। শিল্প বিপ্লবের কথাও এসে যায়। তার কারণ এর সঙ্গে আধুনিক কবিতার জন্মের সম্পর্ক কার্যকারণ সূত্রে গাঁথা। উনিশ শতকের সেই মাঝামাঝি সময়ে শক্তির নানাবিধ উৎস বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল তার হাত ধরেই জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সঞ্চারিত হয় অবিশ্বাস্য গতি ও চাঞ্চল্য। সাহিত্য ভাবনার চারণভূমি মানব হৃদয় হলেও তা সমাজবিচ্যুত কোনো বিষয় নয়। অতএব, বিজ্ঞানের নতুন নতুন সব আবিষ্কার এবং তার ফলে সৃষ্ট বৈপ্লাবিক পরিবর্তনসমূহ মানুষের মনে যে স্বতঃস্ফূর্ত, বিচিত্র সাড়া জাগিয়ে ছিল সেসব অনুভূতি ডিজেল ইঞ্জিনের অন্তর্জটিল কল-কব্জার চেয়ে কোনমতেই কম জটিল ছিল না। সেজন্যই তখনকার নতুন কবিতা হয়ে উঠেছিল অস্বচ্ছ। সেসব রচনায় মনের বহু তরান্বিত ভাব প্রকাশের উপযোগী ভাষা ছিল না। অল্প কিছু ব্যতিক্রম, যেমন টমাস হার্ডি বা জেরার্ড মেনলি হপকিনসের কবিতা; অবশ্যই ছিল যেমনটা থাকে সব যুগেই। তবে ভাষার অস্পষ্ট মোড়ক পেরিয়ে ভাবনার বা সামগ্রিক কবিদৃষ্টির স্তরে পৌঁছাতে পাঠককে প্রায়শই অনেকটা বেগ পেতে হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। আবার একই কারণে কাব্যবস্তুর স্বাদ গ্রহণে অপারগ পাঠকগোষ্ঠীর কাছ থেকে দুর্বোধ্যতার অভিযোগটি উঠে আসে। তাহলে দেখতে পাচ্ছি, আধুনিকতার উন্মেষকাল থেকেই কবিতা ওই অভিযোগে কম-বেশি আক্রান্ত। কবিতা, তা সত্ত্বেও, ভেতরের সবটুকু জটিলতা নিয়েও কঠিনতার অভিযোগ মেনে নিতে রাজি হয়নি কখনোই। বরঞ্চ সে সাধ্যমতো সহজ হতে চেয়েছে সব কালেই। অবশ্য সহজ ভাষায় রচিত কবিতা সবসময় সহজবোধ্য হবে এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। ভাষিক সহজতা কাব্যভাবনাকেও সাবলীলভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে এ-রকম কবিতা হাজার হাজার নেই। তারাপদ রায় বা মুস্তফা আনোয়ারের মতো কবিদের লেখা ব্যতিক্রম।
উনিশ শতকের চেতনা আলোড়িত করে দেয়া বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো যুগধর্মের কারণেই আজ মামুলি ব্যাপার। এখন তো ‘জিন’- এর ভেতর অবিশ্বাস্য প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করে একটি ছোট প্রাণীকে বিরাট আকার ও প্রচন্ড ক্ষমতা দেয়ার চেষ্টা চলছে; আংশিক সাফল্যও অর্জিত হয়েছে। কবিতার দৈর্ঘ্য তুলনামূলকভাবে ছোট হয়ে এসেছে। উনিশ শতকের এবং বিশ শতকের প্রথম দিককার বর্ণনামূলক কবিতার কথা যদি আমরা মাথায় রাখি, দেখা যাবে কবিতার শরীর বেশ হ্রস্ব হয়ে এসেছে পরবর্তী ৩০/৪০ বছরে। একটি বড় বিষয়কেও যতদূর সম্ভব অল্প কথায় ধরতে চেয়েছেন কবিরা। ডব্লিউ বি ইয়েটস, আর-লিডটন রবিনসন, রবার্ট ফ্রস্ট, ওয়াল্টার ডে লা মেয়ার, এডওয়ার্ড টমাস, ওয়ালেস স্টিভেন্স, এজরা পাউন্ড, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, এডুইন মুইর, রবার্ট গ্রেভ্স প্রমুখ কবিদের অসংখ্য লেখায় তার স্বাক্ষর বিদ্যমান। দৃষ্টান্তস্বরূপ ডে লা মেয়ারের ষোলো পঙক্তির কবিতা Estranged (বিচ্ছিন্ন)- এর দ্বিতীয় স্তবকটি উদ্ধৃত করছি- A bird in an empty house/sad echoes makes to ring/Flitting from room to room/On restless wing. ওই সংক্ষিপ্তি এক পর্যায়ে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়ায় যে, কমাতে কমাতে কবিরা শেষ পর্যন্ত দু’/এক লাইনের কবিতাও লিখে ফেলেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ওস্তাদি দেখিয়েছেন এজরা পাউন্ড। এবং তার বেলাতেই আমরা প্রথম দেখেছি যে, একটি চিত্রকল্পই একটি সম্পূর্ণ কবিতা হয়ে উঠেছে।
এসবেরই প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কবিতায় বর্ণনামূলক শক্তির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। কার্লোস উইলিয়ামস, টি এস এলিয়ট, সিসিল যে লিউইসের মতো কবিরা স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই সে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিষয়টি আরও স্পষ্ট আকার পেয়েছে সি এইচ সিশন (Sisson), জন অ্যাশবেরি, রবার্ট ওয়েলস প্রমুখের কবিতায়। বাংলা ভাষায় এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান আছে আল মাহমুদ ও বিনয় মজুমদারের। বিশেষত ‘চক্রবর্তী রাজার অট্টহাসি’তে মাহমুদ এ বিষয়ে শক্তিমত্তার প্রমাণ রেখেছেন। ব্রিটেনের ষাটের প্রজন্মের কবি এন্ড্রু মোশন এবং সত্তরের প্রজন্মের মিক ইমলা, পিটার রির্ডি প্রমুখের কবিতায় narrative style এর নিজত্বপূর্ণ ধরন লক্ষ করা যায়। ইমলা বা রিডিং এর কোনো কোনো কবিতা পড়ে আমার মনে হয়েছে উপন্যাসের অংশ-বিশেষ পাঠ করলাম। এই যে বর্ণনাপ্রবণ হয়ে ওঠা, এর ফলে কবিতা দীর্ঘ হয়ে উঠছে। বর্ণনা কবিতাকে লম্বা হতে কিভাবে সাহায্য করে তা আমরা গিন্সবার্গের কবিতাতেও দেখেছি। যাহোক, এসব লেখায় ‘ঘটনার ঘনঘটার-র’ উল্লেখ না থাকলেও (না থাকাই কাম্য) আধুনিক narrative poetry-র অন্যরকম কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে যা উত্তরকালে কাহিনিকাব্যের বর্ণনা থেকে তাকে আলাদা করেছিল। সেই বৈশিষ্ট্যকে বুঝতে হয় পরিশ্রুত আবেগের বিশেষ চেতনা দিয়ে। কেমন ভাষায় ও ভঙ্গিতে লিখতে পারলে একটি কবিতাকে স্মরণীয় করে তোলা সম্ভব হবে তা নিশ্চিতভাবে না জানলেও কবিগণ কিন্তু এ ব্যাপারে রীতিমতো তৎপর। কিন্তু যে কোনো উপায়ে কাব্যভাষা পৃথক করে তোলাটাই মুখ্যতম বিষয় নয়। উদাহরণ হিসেবে আমি সাইয়িদ আতিকুল্লাহ নামটি ব্যবহার করবো। বাংলাদেশের পঞ্চাশের প্রজন্মের এ কবি ভাষিক স্বাতন্ত্র্য অর্জন করতে পেরেছেলেন। তা পাঠক হৃদয়ে সাড়া জাগাতে পারেনি। অন্যদিকে অনেক খ্যাতিমান কবিও কাব্যভাষাকে তেমন আলাদা করতে না পারলেও সংবেদি ও সুপাঠ্য কবিতা লিখতে পেরেছেন, যেমন সিকদার আমিনুল হক।
ভাষারও সীমাবদ্ধতা আছে। ধ্যানী কবিদের গভীর মনোভাব ও স্বপ্নকল্পনা সাকার করে তোলার ক্ষেত্রে ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় শব্দ বা শব্দবন্ধ জোগান দিতে পারে না। তার ভাবনার বিশিষ্ট ধরনকে ধারণ করার মতো যথেষ্ট শব্দ তার মাতৃভাষার ভান্ডারে নেই এই মর্মে একদা আক্ষেপ করেছিলেন জাঁ আঁতুর র্যাবো। এটাকে অর্ধসত্য হিসেবে ধরে নিলে কবির ক্ষমতার প্রশ্নটি আসে। সৃজনক্ষমতা যতো বেশি হবে বলবার কথাটি ততো সাবলীলভাবে লেখক প্রকাশ করতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস। জন অ্যাশবেরির কথাই ধরা যাক। ব্যর্থতাবোধ, আত্মসংযম, বস্তুর রহস্যময়তা, যুক্তি ও যুক্তিহীনতা এবং প্রতিদিনের অসংখ্য সংকর অনুভূতি যেরকম ভাষায় তিনি ব্যক্ত করতে পেরেছেন তা একান্তই তার নিজের। কাব্য সম্পর্কে তার ভাবনাও অন্যদের চেয়ে স্পষ্টত আলাদা এবং প্রায়শই তা নবীনতামুখি। What is poetry কবিতায় তিনি বলেছিলেন Poetry is trying to avoid ideas। এর অর্থ বিষয়বস্তুকেন্দ্রিক ভাবনা থেকে কবিতার মুক্তি চেয়েছেন তিনি। অন্যদিকে হোর্হে লুই বোর্হেসের কথা ভাবুন। কেন্দ্রীয় চিন্তা বা থিমকে কতো গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। পরন্ত তার মিথভিত্তিক কবিতাগুলোতে মানব নিয়তি ও অপরাপর বিষয় যেরকম দাঢ্য অকপটতায় উপস্থাপিত গোটা বিশ্বকবিতার পরিপ্রেক্ষিতেই তা বিরল। ও-রকম অনাসক্ত, সারল্যখচিত কিন্তু আবেগনিবিড় উচ্চারণ বাংলা কবিতায় সচরাচর দেখা যায় না। সুনিয়ন্ত্রিত ভাবাবেগ ও শব্দপ্রয়োগ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণার যে সঠিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বোর্হেস তা, আমি মনে করি, আধুনিকোত্তর সহজ কবিতার নতুন চেহারা সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। আপাতত, রাজবাড়িগামী প্রশস্ত রাস্তায় উঠবার আগে ওই রাস্তার সঙ্গে যুক্ত সরু অথচ ইশারাস্বচ্ছ পথটি চিনে নেয়া খুবই প্রয়োজন।
রোমান্টিক যুগে এমন ধারণা চালু ছিল, যার কল্পনাশক্তি যতো প্রখর তিনি ততো ভালো কবি। অবশ্য সেকালের পন্ডিতদের সমর্থনপুষ্ট এ বিশ্বাসে ভাঙ্গন ধরতে খুব বেশি সময় লাগেনি। যুগ সন্ধিক্ষণে- আধুনিক কবিতার জন্মের প্রাক্কালে উত্তুঙ্গ কবিকল্পনা অবসিত হয়ে পড়লো। আর কেবল কল্পনার ডানায় ভর করে অলীকের বা অস্পষ্টতার চর্চা করাই যে বড় কবির চারিত্র্য নয় সেটা প্রমাণ করলেন সমযুগেরই একজন। সেজন্যই তো ওয়ার্ডসওয়ার্থ রোমান্টিক যুগের পুরোধাদের একজন। ব্যক্তিকে সমুদ্র-সমভূমি-উপত্যকা অধ্যুষিত মহাবিশ্বের পটভূমিতে দেখা, বিশ্বপ্রকৃতির সর্বত্র ঈশ্বর অন্বেষণ, শৈশবজিজ্ঞাসা- এসব ওজনদার চিন্তা কতো সহজ-সচ্ছল, নিবিড় উচ্চারণের ভেতর দিয়ে বাণীবদ্ধ হয়েছে তার হাতে, সেকালে, ভাবলে অবাক হতে হয়। মর্মসন্ধানী গভীর কবিতা জঠিলতামুক্ত ভাষার দীপ্তিতে অনুরাগী পাঠকের হৃদয় আলোকিত করতে সক্ষম, সেটা সামান্য কৃতি নয়। এ কাজ যিনি করতে পারেন তেমন কৃতী কবির রচনার মধ্যে পাঠক কখনো কখনো নিজেকে দেখতে পান। কবির ভাবনার মধ্যে নিজের ভাবনার ছায়া লক্ষ করেন। লেখকের যোগাযোগ সক্ষম ভাষার পাশাপাশি হৃৎক্যামেরায় বন্দি অনুভূতির চেনা-অচেনা দুর্লভ আলো-আঁধার কেবল তখনই মর্যাদা পায় উন্নত সাহিত্যশিল্পের।
কল্পনাউর্বর রোমান্টিক কবিতার পরিণতির ভেতরেই আধুনিক কবিতার বীজ নিহিত। একালে নাগরিক নির্বেদ, ক্লান্তি ও ব্যর্থতা, বর্ধিষ্ণু বিশাল নগরের বিপরীতে ক্ষয়িষ্ণু গ্রাম সমাজের হাহাকার এসব নিয়ে রচিত নতুন আধুনিক কবিতা ভিড়ের যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলতে অনিচ্ছুক। সে বরং ব্যক্তি মানুষকে তার নিরাময়হীন নৈসঃঙ্গের পটভূমিতে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে আগ্রহী। মহাজীবনের জঙ্গমতা তো আধুনিক মানষকে ফাপড়ে ফেলে দেয়। সে আরও একা হয়ে পড়ে। আধুনিক কবিতা যদি ভাবাবেগের অতিরেককে, উদ্ভট বা অতিকল্পনাকে প্রশ্রয় দেয় তা হলে তা আর আধুনিক থাকে না। পরাবাস্তব কবিতার কথা কেউ কেউ বলতে পারেন। কিন্তু এ জাতীয় কাব্যেরও একটা বড় অংশ সফল হয়নি। প্রধান কারণ ওই কল্পনা-ভাষার আতিশয্য। উচ্চাশী কবিকে তাই এসব ব্যাপারে সতর্ক থাকতেই হয়। বাংলা কবিতায় আমি ভাবি, এতকাল ভাবাবেগের তুমুল চর্চা হয়েছে। এখন চিন্তার চর্চা বেশি হওয়া উচিত। জীবনের নানা দর্শনকে, গূঢ় অনুভবকে যুগোপযোগীভাবে পরিবেশন করার গরজে কবিতায় অনেকেই নিরেট গদ্যে আশ্রয় নেন। ফলে ভোঁতা গদ্যের নির্বিচার প্রয়োগ অনেকের নিরেট গদ্যের আশ্রয় নেন। ফলে ভোঁতা গদ্যের নির্বিচার প্রয়োগ অনেকের কবিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে, আবেগ নিয়ন্ত্রণের নামে রাশি রাশি কল্পনাসুষমাহীন মামুলি পঙ্ক্তি ঢুকে পড়ছে কবিতার সংরক্ষিত এলাকায়। সেসব লেখায় আমরা হয়তো দেখবো ভাষার সারল্য, কিছু যুগসম্মত কায়দা-কৌশলও; কিন্তু পাবো না শাঁস, মানে কবিতার ভেতরের poetry নামের সেই আসল বস্তুটিই।
উনিশ শতরেক দ্বিতীয়ার্ধের এবং বিশ শতকের প্রথম দিকের কবিতায় ভাব-কল্পনার অস্বচ্ছতা রীতিমতো লক্ষ করা গেছে। ওই সবকিছুর নবজন্ম ঘটে নব্য আধুনিকদের হাতে। কবিকল্পনা এরপর আর অতটা স্বাধীনাত ভোগ করতে পারলো না। কান্ডজ্ঞান তাকে শাসন করলো পদে পদে। আর এখন, একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, দেখতে পাচ্ছি, শুধু পরিশোধিত আবেগের পাশা-পাশি বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, আধুনিকোত্তর কবিতায় প্রযুক্ত কলাকৌশল ব্যবহারের পেছনে যুক্তিও থাকতে হবে। তবে নতুন কালের কবিতা দাবি করে নান্দনিকতার একটি অর্থসঙ্গতিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল এবং অনাড়ম্বর চেহারা। অনেকেই মনে করেন এ যুগের আধুনিক কবিতা অর্থপূর্ণ না হলেও ক্ষতি নেই। আমি বলবো, ক্ষতি আছে। কেননা একটি প্রবন্ধের বা একটি নাটকের ক্ষেত্রে আমরা যেভাবে সচরাচর অর্থ খুঁজি, ঠিক সেভাবে কবিতার মানে না খুঁজলেও চলবে। কিন্তু ভাবের একটি স্পষ্ট ইশারা ছাড়া আমাদের চলবে না। সে কারণে এখন উৎকৃষ্ট কবিতা, যা একই সঙ্গে নতুন কবিতা, লেখার জন্য মাথায় শুধুই Logic of imagination রাখাই যথেষ্ট নয়, Logic of concept রাখাও জরুরি।
একটি কবিতায় কল্পনার স্থান কতটুকু হবে, ভাবাবেগের মাত্রা কেমন হবে সেটা বলা অসম্ভব। এটা পুরোপুরি নির্ভরশীল কবি বিশেষের সাহিত্যরুচি ও মনোদৃষ্টির ওপর। তাছাড়া নির্দিষ্ট কোনো ভাব থেকে উৎসারিত কাব্য উপলব্ধির তারতম্যের সঙ্গে কল্পনার মাত্রার ব্যাপারটি যুক্ত। আমি ‘জল’ লিখবো না ‘পানি’ লিখবো এটা আমি স্থির করতে পারি। কিন্তু মৃত্যুর মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে বেশি কল্পনার আশ্রয় নেবো- এরকম সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারি না। কারণ কল্পনার ব্যাপারটা আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। তা সত্ত্বেও কাব্যবোধ একটা বড় ব্যাপার। তার সঙ্গে থাকবে উন্নত সাহিত্যরুচি। দু’য়ে মিলে ভেতর থেকে ঠিক করে দেবে; সেজন্য আমরা দেখি, মেধাউজ্জ্বল কল্পনা ফলপ্রসূ হয় তখনই যখন কবির ভাবনায় অস্পষ্টতা সবচেয়ে কম থাকে এবং ভাষায় জড়তা না থাকে। একাধারে গভীর ও সহজ কবিতা সৃষ্টির জন্য চিন্তার স্বচ্ছতা ও তার সাবলীল প্রকাশ অপরিহার্য। যতই কায়দা-কৌশল করা হোক না কেন, কবি তো লেখার মাধ্যমে কিছু একটা বলতে চান। সেই ‘বলবার’ কথা’টি প্রথমে তার নিজের কাছে পরিষ্কার হতে হবে। তা না হলে কবিকল্পনা ও তার প্রকাশ ধোঁয়াশে হতে বাধ্য। এরকম পরিস্থিতিতে কবিতার ভেতরে ঢোকা কঠিন হয়ে পড়ে এবং তা কিছুই বোঝাতে পারে না।
সহজ কবিতাকে হালকা কবিতা বলে চিনতে ভুল করেন অনেকেই। আটপৌরে ভাষায় রচিত কবিতা একইসঙ্গে সহজবোধ্য ও শিল্পঋদ্ধ হতে পারে তখনই যখন তাতে থাকে ইঙ্গিতময়তা এবং হৃদয়গ্রাহী বাকপ্রতিমার চমৎকার ভারসাম্য। পূর্বতন আধুনিক কবিতার বড় বৈশিষ্ট ছিল কল্পনার রহস্যের স্বাধীন প্রয়োগ। এ যুগের আধুনিক কাব্য শুধু ‘কল্পনার রহস্য’-এ তৃপ্ত নয়। সে চায় ওই কল্পনার কূটার্থ। মাথার ভেতর কাব্যের একটি স্বচ্ছ পটভূমি, যেখানে কবির সৌন্দর্যবোধ আর আবিষ্কার প্রবণতা একসূত্রে মিলেছে, না থাকলে কোনো কবিতাই কূটার্থঘন হয়ে উঠতে পারে না। লিখতে বসে একজন কবি অন্তত একজন প্রাবন্ধিক বা একজন কথাকারের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করেন। তারপরেও এটা কোনো অবস্থাতেই ভুলে থাকা চলবে না যে, কাব্য শূন্যের উপর দাঁড়াতে পারে না। তাকেও কিছু-না-কিছু বলতেই হয়।
বহুকাল আগে সমালোচক হার্বাট রিড বলেছিলেন : The poetry remains in the obscurity। কথাটির মানে এ নয় যে অস্পষ্টতাই কবিতার সবকিছু বা প্রধানতম কিছু। হ্যাঁ, কাব্যে অস্পষ্টতার বিশেষ মূল্য আছে যদি-না সে অস্পষ্টতা দ্বারা পুরো কবিতার ভাবটি আক্রান্ত হয়। যে কোনো ভাষার একজন প্রধান কবির বেশিরভাগ কবিতা ওই অষ্পষ্টতা গুণে (অন্যান্য সদবৈশিষ্ট্যেও) সমৃদ্ধ হয়ে থাকে। দুর্বোধ্য কবিতার থেকে এ-সব রচনার পার্থক্যই হলো, পুরোপুরি অর্থোদ্ধার সম্ভব না হলেও প্রযুক্ত শব্দাবলীর সঠিক প্রয়োগের ফলে তারা এক কাক্সিক্ষত দ্যোতনায় একটা-না-একটা গূঢ় অর্থের আভাস তুলে ধরে পাঠকের সামনে।
কূটত্বের সমস্যা স্বীকার করে নিয়েই কবিতাকে হতে হয় যথাসম্ভব সহজ আর সংক্ষিপ্ত। কেবলই চিত্র বা চিত্রকল্প, জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা কিংবা মনোভাব প্রকাশী মামুলি ধরনের পঙ্ক্তিমালা নয়, এসবের চেয়েও বেশি কিছু, অনেক কিছু চাই একালের আধুনিক কবিতা। এ সময়ের কবিতাকে পরোক্ষ উক্তির নতুন অর্থ, স্পষ্ট আভাসের ভেতর দিয়ে অর্জন করে নিতে হবে বহুকৌণিক উজ্জ্বলতা। এবং এ পথে অগ্রসর হতে পারলে বাংলা কবিতা নতুন পথের দিশা পেতে পারে বলে আমি মনে করি।