দুই.
ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খশরু
সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পরিবারের বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একমাত্র কৃতী সন্তান সঙ্গীত সাধক মোহাম্মদ হোসেন খশরু যিনি ভারতীয় রাগ সঙ্গীতে সমগ্র ভারত উপমহাদেশে অতি উচ্চ আসনে স্থান লাভ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ধন্য করে গেছেন।
এই সঙ্গীত সাধকের জন্মভূমি কসবা থানার মইনপুর গ্রামে। পিতার নাম ছিল জয়নুল হোসেন।
ওস্তাদ খশরুর পিতা জয়নুল হোসেন একজন প্রখ্যাত বাঁশিবাদক ছিলেন। তিনি শৈশবেই পিতার কাছে বাঁশি বাদন শিখেছিলেন। তিনি খুব ভালো বাঁশি বাজাতে পারতেন এবং বাঁশি বানাতেও পারতেন। তিনি খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি ১৯২৩ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ এবং এমএ ও আইন পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী লাভ করেন। ওস্তাদ খশরু এর নানা ওস্তাদ জানে আলম চৌধুরী ছিলেন কুমিল্লার প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি বাঁশি ছেড়ে নানার কাছে সঙ্গীত তালিম নিতে লাগলেন। তার ছিল প্রখর স্মৃতিশক্তি। একবার যা শুনতেন তা অনায়াসেই আয়ত্ত করে ফেলতেন। তিনি ভারত উপমহাদেশের যেসব প্রখ্যাত সঙ্গীত সাধক এবং ওস্তাদের কাছে রাগসঙ্গীতের তালিম নেয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন তাঁরা হলেন ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ, ওস্তাদ আলাদিয়া খাঁ, ওস্তাদ কালে খাঁ, ওস্তাদ নাসিরউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ মোহাম্মদ আলী, ওস্তাদ বালদ খাঁ, জদ্দার বাঈ, ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ, ওস্তাদ মাইজুদ্দিন খাঁ অন্যতম। তিনি ওস্তাদ মসিত খাঁর কাছে তবলার তালিম নেন এবং তবলা বাদনে তাল লয় জ্ঞানের ক্ষেত্রে এক অনন্য কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন। পূর্বে উল্লেখিত বিভিন্ন সঙ্গীত সাধক ও ওস্তাদগণের কাছে তিনি ধ্রুপদ-ধামার, সাদরা, খেয়াল, ঠুমরী, টপপা এবং হোরী অঙ্গের রাগ-রাগিণীর তালিম নিয়েছিলেন।
সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ তাঁর সঙ্গীত পারদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে ‘দেশ মনি’ রূপে আখ্যায়িত করেন। ওস্তাদ খশরু অসংখ্য ছাত্রছাত্রীকে সঙ্গীতে তালিম দিয়েছিলেন যাদের অনেকেই সঙ্গীত জগতে গৌরবের আসন লাভ করে গেছেন।
কাজী নজরুল ইসলামের সাথে ১৯২২ সালে ওস্তাদ খশরুর বন্ধুত্ব হয়। নজরুল ইসলাম তাঁর কাছে বহু রাগ শিখেছিলেন। শচীন দেব বর্মন (এসডি বর্মন), সুর সাগর হিমাংশু কুমার দত্ত, সন্ধ্যা মুখার্জী, শৈলবালা দেবী, বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, বেদার উদ্দিন আহমেদ, ফেরদৌসী রহমান, হোসনা বানু খানম প্রমুখ তাঁর শিষ্য-শিষ্যাদের অন্যতম।
ওস্তাদ মোহাম্মদ খশরু বহু রাগ রাগিণীও সৃষ্টি করে গেছেন এবং তবলার বোল ও নৃত্যের বোল ও বাও সৃষ্টি করে গেছেন। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ছাড়াও তিনি মুরশিদী, মারফতী, গজল, কীর্তন, ভজন, হামদ, নাত প্রভৃতি গানে সমান পারদর্শী ছিলেন।
ওস্তাদ খশরু লক্ষেèৗ মরিস সঙ্গীত কলেজের সহ-অধ্যক্ষ এবং কলকাতার ‘কলেজ রো মিউজিক’ কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি উর্দু, হিন্দি ও বাংলায় অসংখ্য গান রচনা করে গেছেন।
উপমহাদেশ খ্যাত সঙ্গীত সাধক ওস্তাদ মোহাম্মদ খশরু ১৯৫৯ সালের ৬ আগস্ট ইন্তেকাল করেন। তাঁর একমাত্র মেয়ে কানিজ ফাতিমা একজন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘প্রাইড পারফরম্যান্স’ সম্মানে ভূষিত করে।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রাক্তন মহাপরিচালক জনাব মোবারক হোসেন খান এই সঙ্গীত সাধকের জীবন সাধনার সঠিক মূল্যায়ন করে বলেছেন যে, সঙ্গীত ইতিহাসে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খশরু একটি চিরস্মরণীয় নাম।
সঙ্গীত সম্রাট ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ
আলী আকবর খাঁর জন্ম তিতাস পাড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার শিবপুর গ্রামের বিশ্বনন্দিত সঙ্গীত পরিবারে। তিনি সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর একমাত্র উত্তরসূরি। আলাউদ্দিন খাঁর তিন মেয়ের মধ্যে বড় ও মেজো মেয়ে জীবিত নেই। তৃতীয় মেয়ে রৌশন আরা অন্নপূর্ণা যিনি আলাউদ্দিন খাঁর ধ্রুপদ শৈলীর আসল জিনিস ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। রৌশন আরা অন্নপূর্ণা ভারত রহস্যময়ী সঙ্গীতজ্ঞরূপে অভিহিত। বর্তমানে তিনি ভারতের বোম্বে শহরে বসবাস করে আলাউদ্দিন খাঁর ঘরানার ধ্রুপদ সঙ্গীতশৈলী তালিম দিয়ে সঙ্গীতজ্ঞ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। আলী আকবর খাঁ তিন বছর বয়সে ভারতের মাইহার রাজ্যে পিতা আলাউদ্দিন খাঁর কাছে সঙ্গীতের প্রথম পাঠ গ্রহণ করেন। একই সময় বোন রৌশন আরা অন্নপূর্ণা এবং বিশ্বনন্দিত নাট্যশিল্পী উদয় শংকরের ছোট ভাই রবি শংকর আলাউদ্দিন খাঁর কাছে তালিম নিতেন। রৌশন আরার মেধা ছিল খুব প্রখর। আলাউদ্দিন খাঁ যে সুরটি তালিম দিতেন কোন কোন দিন আলী আকবর ও রবি শংকর তা শিখে নিতেন রৌশন আরার কাছ থেকে। আলাউদ্দিন খাঁ শিক্ষক হিসেবে ছিলেন ভয়ানক রাগী। তাই ভয়ে আলী আকবর ও রবি শংকর দ্বিতীয় বার তাঁকে বলতে সাহস করতেন না।
আলী আকবর খাঁ ক্রমাগত বিশ বছর পিতার কাছে প্রত্যহ পনের থেকে আঠার ঘন্টার তালিম নিয়েছেন। কুড়ি বাইশ বছর বয়সে তিনি যোধপপুর মহারাজার সভা কলাবৎ নিযুক্ত হন এবং ওস্তাদ (ফার্সি অর্থ শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতকার) উপাধি লাভ করেন। এত অল্প বয়সে ওস্তাদ উপাধি পাওয়া ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। সে সময় তিনি রাজপুতানী মেয়ে রাজদুলারীকে বিয়ে করেন। উপমহাদেশের গর্ব পিতা আলাউদ্দিন খাঁর যোগ্য উত্তরসূরি আলী আকবর খাঁ কলকাতার সানন্দা ম্যাগাজিনের সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বাবা বলতেন (আলাউদ্দিন খাঁ) চন্দ্র সূর্য যত দূরে তুমি ভারতীয় সঙ্গীতকে তত দূরে নিয়ে যাবে।’ আলাউদ্দিন খাঁর মত পুত্র আলী আকবরও সুরের নাগাল পাওয়া জন্য কঠোর সাধনায় নিমগ্ন আছেন। আলী আকবর খাঁ বেশ কিছু মৌলিক সুর সৃষ্টি করেছেন।
আলী আকবর খাঁর খুব ইচ্ছা ছিল তানসেন-আলাউদ্দিন ঘরানার ধ্র“পদ সঙ্গীতকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কলকাতায় একটি মিউজিক কলেজ প্রতিষ্ঠা করার। ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি কলকাতায় একটি মিউজিক কলেজ খুলেও ছিলেন। তিনি ভারত সরকারের কাছে ভূমি এবং অর্থের জন্য অনেক ধরনা দিয়েও কোনো সাড়া পাননি। রাগ ও অভিমানে তিনি খুবই ক্ষুব্ধ হন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি মিউজিক কলেজ চালানো স¤ভব নয়। ফলে তাঁর স্বপ্নের মিউজিক কলেজটিও বন্ধ হয়ে যায়। এমন সময় সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য পাশ্চাত্য সঙ্গীত জগতের প্রখ্যাত বেহালাবাদক ইয়েহুদি মেনুহিনের কাছ থেকে বিশেষ আমন্ত্রণ পেয়ে ১৯৫৫ সালে আলী আবকর খাঁ প্রথম বারের মত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। উল্লেখ্য যে, পিতা আলাউদ্দিন খাঁ (১৯৩৫-১৯৩৬ সাল পর্যন্ত) ইউরোপ এবং আমেরিকা সর্বপ্রথম ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে গেছেন। আমেরিকা সফরের পর আলী আকবর খাঁ সারা বিশ্ব চষে বেড়িয়েছেন। শিল্পী হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে উপমহাদেশের সঙ্গীত ও সংস্কৃতির দূত হিসেবে তিনি এশিয়া, আফ্রিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপ সফর করেন। এই ভ্রমণ তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।
তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পাশ্চাত্য সঙ্গীত সাধক ইয়েহুদি মেনুহিন, জন হ্যান্ডি ডিউজ, এলিংটন, অ্যাডলার এবং জহুলয়াস ব্রিমের সাথে দ্বৈত সঙ্গীত (সরোদ) পরিবেশন করেছেন। তিনি তাঁর ভগ্নিপতি ও আলাউদ্দিন খাঁর জামাতা রৌশন আরা অন্নপূর্ণার স্বামী পন্ডিত রবি শংকরকে ভারতের সঙ্গীত জগতে পরিচিত করেন।
আলী আকবর খাঁর মিউজিক কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সফল হয় আমেরিকায়। তিনি আমেরিকার সানফ্রান্সিকো শহরের রাফায়েলে ভারতীয় ধ্রুপদ সঙ্গীত শিক্ষাদানের জন্য ‘আলী আকবর কলেজ অব মিউজিক’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই মিউজিক কলেজের মাধ্যমে পাশ্চাত্যে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। তিনি আমেরিকান নাগরিকত্ব গ্রহণ করে বসতি স্থাপন করেছেন। প্রথমা স্ত্রী রাজদুলারী মারা যাওয়ার পর তিনি আমেরিকান মেয়ে সঙ্গীত পাগল মেরিকে বিয়ে করেছেন। আলী আকবর খাঁর সান্নিধ্যে এসে স্ত্রী মেরি ভারতীয় সঙ্গীত সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান আহরণ করেছেন। স্ত্রী মেরি ভারতীয় সঙ্গীতের মর্মবাণী পাশ্চাত্য সঙ্গীতজ্ঞগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। এ জন্য আলী আকবর খাঁ আমেরিকার ‘ম্যাকার্থি গ্র্যান্ট’ লাভ করে সঙ্গীত জগতে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আলী আকবর খাঁর পূর্বে পৃথিবীর অন্য কোন দেশের সঙ্গীতজ্ঞ এই দুর্লভ সম্মান লাভের অধিকারী হতে পারেননি। ১৯১৭ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি আমেরিকার সঙ্গীতে সর্বোচ্চ খেতাব ‘হেরিটেজ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছেন।
এই বিশ্বনন্দিত সঙ্গীত সাধক ১৯৬৩ ও ১৯৬৬ সালে ভারতীয় শিল্পীর জন্য শ্রেষ্ঠ সম্মান ‘রাষ্ট্রপতি পুরস্কার’ ও ‘পদ্ম ভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি ভারতের সঙ্গীত নাটক একাডেমির অ্যাওয়ার্ড এবং ফেলো হিসেবে সম্মানিত হন। তাঁর বোন রৌশন আরা অন্ন-পূর্ণাও উক্ত অ্যাকাডেমির অ্যাওয়ার্ড এবং এর ফেলো হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন। উল্লেখ্য যে ১৯৫২ সালে ভারতে এ অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড প্রবর্তন করা হয়। সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ প্রথম সঙ্গীতজ্ঞ যিনি নাটক অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড এবং এর ফেলো সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভারতের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় আলী আকবর খাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার উপাধি প্রদান করে। আলী আকবর খাঁ ইউরোপ এবং আমেরিকার ‘দ্য গ্রেট মাইস্টো অব মিউজিক’ হিসেবে পরিচিত। আলী আকবর খাঁর বড় ছেলে ওস্তাদ ধানেস খাঁ জীবিত নেই। দ্বিতীয় ছেলে আশিষ খাঁ একজন বিশ্ববিশ্রুত সঙ্গীতজ্ঞ। পিতার মত আশিষ খাঁ আমেরিকা এবং ইউরোপে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত তালিম দিয়ে যাচ্ছেন।
আলী আকবর খাঁ বাংলাদেশে শেষ এসেছিলেন ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। এসেছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তথ্যমন্ত্রী হাবিব উল্লাহ খানের আমন্ত্রণে। ঢাকার পর তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয় কুমিল্লায়। সেখান থেকে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে যান জন্মভূমি নবীনগর থানার শিবপুর গ্রামে। প্রায় পঁচিশ হাজার লোক সমবেত হয়েছিল তাঁকে দেখার জন্য। এ দৃশ্য দেখে সংবর্ধনা সভায় আবেগে আপ্লুত হয়েছিলেন আলী আকবর খাঁ।
তিতাস পাড়ের অহঙ্কার ‘অন্নপূর্ণা’
সঙ্গীতের তীর্থভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশ্ববিশ্রুত সঙ্গীত সাধক সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর তৃতীয় কন্যা রওশন আরা বেগম অন্নপূর্ণা। বিখ্যাত আলাউদ্দিন ঘারানার এক বিরল প্রতিভা সঙ্গীত তাপসী অন্নপূর্ণার জীবন কাহিনী অনেকের কাছেই অজ্ঞাত।
আলাউদ্দিন খাঁর ভুবনখ্যাত সঙ্গীতের অপরিমেয় ভাণ্ডার থেকে যে তিনজনকে উজাড় করে সুরের ইন্দ্রজাল বিলিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা হলেন বিশ্ববিখ্যাত সরোদ বাদক পুত্র ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, সেতার বাদক জামাতা পন্ডিত রবি শংকর এবং সুরবাহার বাদক কন্যা রওশন আরা বেগম অন্নপূর্ণা।
ভারতের ধ্রুপদ সঙ্গীতের জগতে রওশন আরা বেগম এক বিশুদ্ধ সঙ্গীত তারকা। সঙ্গীত অনুশীলন, সঙ্গীত প্রশিক্ষণ এবং সঙ্গীত পরিবেশনে অন্নপূর্ণার সবিশেষ শুদ্ধতা প্রসঙ্গে ভারতের সঙ্গীত বোদ্ধাগণ বিনত শ্রদ্ধায় তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছেন।
অন্নপূর্ণার সঙ্গীত প্রতিভা সম্পর্কে বিশ্ববরেণ্য সঙ্গীতসাধক স্বামী পণ্ডিত রবি শংকর তাঁর রাগ অনুরাগ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘অন্নপূর্ণার’ বাজনা সম্পর্কে আমি বলতে পারি তা অবশ্যই উন্নত স্তরের বাজনা। মুক্তকণ্ঠে একটা কথা বলব যে, যদি ভারতবর্ষে সত্যিকার রীতি এবং পদ্ধতি রেখে সুরবাহার বাজায় তো সে একমাত্র অন্নপূর্ণা। রাগের শুদ্ধতা ধ্রুপদ আলাপে আলাপচারী ও জোর যা কিনা প্রাণকেও ছোঁয়ায়- একমাত্র ওই বাজায়। ভগবানের একটা আশীর্বাদ যেন ওর সঙ্গীত। সব বড় ঘরের শিল্পীদের যেটা আসে না। যাদের আসে তারা তো যেন রক্তের ভেতর সঙ্গীত নিয়ে জন্মায়।’
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীত চারণ-তীর্থ মাইহারের ‘মদিনা ভবন’। এই বিখ্যাত মদিনা ভবন থেকে সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টিকারী প্রতিভা আলাউদ্দিন খাঁর তালিম পেয়ে বহু সঙ্গীতজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছে। প্রিয়তম শিষ্য রবিশংকর যখন মাইহারে আলাউদ্দিনের সযতœ তালিম নিচ্ছেন ঠিক সে সময় ১৯৪১ সালে তার অনুমতি সাপেক্ষ রবি শংকরের সঙ্গে অন্নপূর্ণার বিয়ে হয়। তখন রবি শংকরের বয়স একুশ এবং অন্নপূর্ণার বয়স পনের। অন্নপূর্ণা ভারতীয় ধ্রুপদ সঙ্গীতকলায় এক সুদক্ষ সুরবাহার বাদক এ কথা আগেই বলা হয়েছে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর প্রবাদতুল্য এই সঙ্গীত শিষ্যা সঙ্গীত শিক্ষার প্রারম্ভ থেকে আজ পর্যন্ত নিভৃতচারী এক প্রচারবিমুখ শিল্পী। নীরবে নিভৃতে সঙ্গীতের মশাল জ্বালিয়ে এখন তিনি ভারতের বোম্বেতে সুরের আরাধনা করে চলেছেন। কেউ বলেছেন রবি শংকরের চেয়েও অন্নপূর্ণা এক সিদ্ধহস্ত শিল্পী। তাঁর বাদনশৈলী ও পরিবেশন নিপুণতায় রবির আলোকচ্ছটা ম্লান হয়ে যাবে বলে স্বামীকে ঊর্ধ্বে রাখার মানসে তিনি বড় জলসায় সঙ্গীত পরিবেশন করেননি। আবার কেউবা বলেছেন সঙ্গীতের বিস্ময়কর প্রতিভা রওশন আরাকে ঋষি প্রতিম পিতা আলাউদ্দিন খাঁ-ই বারণ করেছিলেন যাতে করে রওশন আরা অন্নপূর্ণা সঙ্গীতজ্ঞ- জামাতা রবি শংকরকে ছাড়িয়ে না যায়।
সেই থেকেই নাকি শুধু ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গীত প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্নপূর্ণা নিজে তৃপ্ত থাকছেন। রওশন আরা অন্নপূর্ণার জীবনের বড় ট্র্যাজেডি স্বামী রবি শংকরের সাথে বিচ্ছেদ। তার মূলে রবি শংকরই নাকি বিশেষভাবে দায়ী- এ কথা রবি শংকর নিজেই তাঁর রাগ অনুরাগ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
রবি শংকরের মেজো ভাই রাজেন্দ্র শংকরের স্ত্রী লক্ষ্মী শংকরের ছোট বোন কমলাকে নিয়েই রবি শংকর অন্নপূর্ণা ছাড়াছাড়ি। কোন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান মোতাবেক কমলাকে বিয়ে না করে যখন তাকে নিয়েই রবি শংকর সামাজিক উঠাবসা ও ঘর করতে থাকে তখনই অন্নপূর্ণা তাঁর একমাত্র পুত্রসন্তান শুভ শংকরকে (জন্ম ১৯৪৩) নিয়ে পিতৃগৃহ মাইহারের ‘মদিনা ভবনে’ চলে আসেন। (রবি শংকরের এ ঘটনা ভারতের পৌরাণিক কাহিনী কচ ও দেবযানীর’ কথা স্মরণ করিয়ে দেয়)।
অন্নপূর্ণা কয়েক বছর ‘মদিনা ভবনে’ থাকার পর বোম্বেতে গিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেখানে সঙ্গীত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং শিষ্যদের তালিম দিতে থাকেন।
জীবন সায়াহ্নে উপনীত হয়ে আজও তিনি সে ধারা অব্যাহত রেখে অগণিত শিষ্য সৃষ্টিতে ব্যাপৃত আছেন। তিনি যুগপৎ সুরবাহার, সেতার, সরোদ, বেহালা, বাঁশি ইত্যাদি তালিম দিতে সমান সিদ্ধহস্ত। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে নিখিল ব্যানার্জী, ওস্তাদ বাহাদুর খাঁ, পান্নালাল, খুরশিদ খান উল্লেখযোগ্য।
সঙ্গীত সাধক ওস্তাদ ফুল মুহম্মদ খান
এই প্রখ্যাত সঙ্গীত সাধকের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার শ্রীরামপুর গ্রামে। শ্রীরামপুর গ্রামে বহু সঙ্গীত সাধক জন্মগ্রহণ করেন। ইংরেজ আমলে কলকাতার তানসেন সঙ্গীত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন এই গ্রামের কৃতী সন্তান সঙ্গীত সাধক মরহুম ওস্তাদ আলী আকবর খান।
ওস্তাদ ফুল মুহম্মদ খানের পিতার নাম ছিল নদের চাঁদ। তাঁর পিতা ছিলেন একজন সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি তাঁর পিতার কাছেই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত তালিম নেন। তিনি ভারতের শিলং, গৌহাটি, কলকাতা ও মাইহারে দীর্ঘদিন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে তিনি সিলেট যান। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এই কুশলী সঙ্গীতশিল্পী দীর্ঘ দুই যুগের অধিককাল সিলেটের সঙ্গীত অঙ্গনে একজন সঙ্গীতের শিক্ষাগুরু হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ওস্তাদ ফুল মুহম্মদ খান সিলেট বেতার কেন্দ্রের একজন নিয়মিত শিল্পী ছিলেন।
তাছাড়া তিনি সিলেট জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমির উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ওস্তাদ ফুল মুহম্মদ খান ঠুমরীতে দেশে একজন অনন্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। সিলেট শহরে এই সঙ্গীত সাধক অসংখ্য সঙ্গীতের ছাত্র-ছাত্রী সৃষ্টি করে গেছেন।
১৯৯৫ সালের ৬ মার্চ সিলেট শহরে তিনি নব্বই বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
এই সঙ্গীত সাধকের মৃত্যুতে সিলেটবাসী শোকসভার মাধ্যমে যে সম্মান শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন তা দেশের জন্য একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ওস্তাদ ফুল মুহম্মদ খান একথাই নতুন করে প্রমাণ করে গেলেন যে, সত্যিকারের গুণী লোক কোন এলাকার লোক নন। সমগ্র দেশই তার এলাকা। (চলবে)