মানবমুক্তির কবি, স্বপ্নদ্রষ্টা কবি ও গণজাগরণের কবি ফররুখ আহমদ জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হয় আড়ম্বপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এ-উপলক্ষে ২ জুন শনিবার ঢাকার বেইলি রোড গাইড হাউজ মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক উৎসব পালিত হয়। বাংলাসাহিত্যের অমর কবি-প্রতিভা ও কালজয়ী কবি ফররুখ আহমদ (১০ জুন ১৯১৮-১৯ অক্টোবর ১৯৭৪) জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লোকবিজ্ঞানী ও কবি আশরাফ সিদ্দিকী।
অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক মুস্তাফা জামান আব্বাসীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন: ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ আব্দুল গফুর, কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই, আলমগীর মহিউদ্দিন, প্রফেসর চেমন আরা, কবি আল মুজাহিদী, ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ, ড. মাহমুদ শাহ কোরেশী, অধ্যাপক মুহাম্মদ মতিউর রহমান, সদস্যসচিব মুহাম্মদ আব্দুল হান্নান, আজাদ রহমান, মিন্টু রহমান, প্রফেসর তুহিন মুখোপাধ্যায়, সেলিম আউয়াল, মাজহারুল হান্নান, অধ্যাপক গুলশান আরা প্রমুখ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন দেশের নবীন-প্রবীণ কবি, লেখক ও শিক্ষাবিদগণ। অনুষ্ঠানে প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন কথাসাহিত্যিক মাহবুবুল হক।
জাতীয় জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ কালের বাধা ও সংকীর্ণতা অতিক্রম করে মৌলিক প্রতিভার মহিমায় তিনি আজ বিশ্ব কাব্যসাহিত্যে এক অনন্য কবি হিসেবে স্বীকৃত। কবি ফররুখ আহমদের প্রতি সুধীমহলের দৃষ্টি নিবন্ধ হয়েছে এবং তার ওপর চলছে প্রচুর আলোচনা ও গবেষণা। এক্ষেত্রে নতুন নতুন গবেষকদের মনোনিবেশ আমাদেরকে উৎসাহিত করছে। এভাবে কবি ফররুখ আহমদ আমাদের জাতীয় মননের অনিবার্য কবি হিসেবে সমাদৃত হচ্ছেন। ইতোমধ্যেই তার কাব্য-কবিতা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হচ্ছে। এ জন্য কবি ফররুখকে নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে, এটা খুবই আশাব্যঞ্জক বিষয়।
সভাপতির ভাষণে মুস্তাফা জামান আব্বাসী বলেন, ফররুখ আহমদ জাতীয় ঐতিহ্য ও জনমানস ধারণ করে কাব্য-চর্চায় ব্রতী হন। তিনি একান্তভাবে স্বদেশ, স্বজাতি ও সমকালীনতাকে ধারণ করে স্বতন্ত্র ভাষা ও অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যে বাংলাসাহিত্যে স্বাতন্ত্র্যিক উজ্জ্বল ধারা সৃষ্টি করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে সৃষ্ট মন্বন্তরে লাখ লাখ মানুষের দুর্দশাগ্রস্ত জীবন ও করুণ মৃত্যুর বিষয় নিয়ে ‘লাশে’র মতো তিনি অসাধারণ কবিতা লিখেছেন। তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। একাধারে রোমান্টিক কাব্য, মহাকাব্য, সনেট, ব্যঙ্গকবিতা, শিশুসাহিত্য, কাব্যনাট্য, গীতিনাট্য, ব্যঙ্গনাট্য, ছোটগল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন। বিচিত্র ভাব-বিষয়, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভাষা, আধুনিক শিল্পকৌশল এবং সর্বশ্রেণির মানুষের উপযোগী কাব্য-কর্মের বিশাল ভাণ্ডার তিনি উপহার দিয়েছেন।
বক্তাগণ বলেন, জাতীয় রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের বসতবাড়ি সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হোক। সুনসান নীরবতা আর সৌন্দর্যের মাঝে ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের কবিসত্তার নানা স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে আছে বাড়িটি। গ্রামীণ পরিবেশ আর সামনের গড়াই নদের নির্মল হাওয়া প্রাণ জুড়িয়ে দেয় দর্শনার্থীদের। মাগুরা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে শ্রীপুর উপজেলার গড়াই নদীর পাড়ের মাঝআইল গ্রামের সৈয়দ বাড়িকে ঘিরে তাই পর্যটনকেন্দ্র গড়ার দাবি করছি। ফররুখ আহমদ জন্ম নেন ও দীর্ঘকাল বসত করেন বাড়িটিতে। পেছনে কবির স্মৃতি সংসদের নির্মাণাধীন ভবন। সারা বাড়িজুড়ে কবির অশরীরী উপস্থিতি। সবখানেই যেন তিনি আছেন, আছে তার কালজয়ী কবিসত্তার প্রবল উপস্থিতিও। বাংলা একাডেমি থেকে নতুনভাবে পূর্ণাঙ্গ রচনাবলি প্রকাশ করা হোক। রাজধানীতে কবি বেনজীর আহমদের বাগানবাড়িতে চিরশায়িত কবির কবরস্থান সংরক্ষণ করা হোক। আয়োজিত অনুষ্ঠানে কবি ফররুখ আহমদ রচিত এবং তাঁকে নিবেদিত কবিতা ও গান নিয়ে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়; এতে দেশের বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
– অরণ্য অরুণ